Search

Loading...

Saturday, July 31, 2010

রামায়ন:অযোধ্যাকান্ড

রাজা দশরথের বয়স হয়েছে।  ষাট ছাড়িয়ে গেছেন। তাই তিনি মনস্থির করলেন, রামকে রাজ্যের ভার দিবেন। সভা ডেকে পরামর্শ চাইলে সবাই একবাক্যে বললেন, এর চেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত আর হয় না। স্থির হলো, পরদিন রামকে রাজায় অভিষিক্ত করা হবে। এই সংবাদে অযোধ্যায় হুলস্থূল পড়ে গেল। রামের মাতা কৌশল্যারও আনন্দের শেষ রইল না। সীমাহীন আনন্দে তিনি জনে জনে দান করতে লাগলেন।

রানি কৈকেয়ীর এক দাসি ছিল, মন্থরা। এই দাসিটির পিঠে কুঁজ ছিল বলে সবাই তাকে মন্থরার বদলে কুঁজি বলে ডাকত। এই দাসিটি দেখতে যেমন কদাকার তার মনটাও ততোধিক কুটিল। কিন্তু কেউ মন্থরাকে ঘাটাত না কারণ কৈকেয়ী এই দাসিটিকে তাঁর বাপের বাড়ি থেকে এনেছিলেন।
মন্থরার এই সব দেখে আর সহ্য হলো না। সে কৈকেয়ীর কানের পাশে তোতা পাখির মত অনবরত বকে যেতে লাগল, যেন রামের বদলে কৈকেয়ীর সন্তান ভরতকে রাজা করা হয়। মন্থরা কৈকেয়ীকে বুদ্ধিও শিখিয়ে দিল।

'দন্ডকবন'-এর ভেতরে বৈজয়ন্ত নগরে এক ভয়ংকর সম্বর নামের অসুর ছিল, দেবতাদের সঙ্গে সম্বরের ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে দশরথ দেবতাদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন এবং আহত হলে কৈকেয়ী সেবা করে দশরথকে বাঁচিয়েছিলেন। দশরথ খুশি হয়ে কৈকেয়ীকে দুইটা বর দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু তখন কৈকেয়ী বলেছিলেন, আচ্ছা, যখন প্রয়োজন হয় তখন চেয়ে নেব।
মন্থরা শিখিয়ে দিলেন, সেই বরটা এখন চাওয়ার জন্য।

দশরথ অন্দরমহলে এলে মন্থরার শিখিয়ে দেয়া কথায় কৈকেয়ী দশরথকে প্রতিজ্ঞা করার জন্য বললে, দশরথ বলেন, 'এই পৃথিবীতে রামের মত আর কাউকে আমি ভালবাসি না। সেই রামের নামে শপথ করে বলছি, তুমি যা চাইবে তাই দেব'।
কৈকেয়ী ভাল করেই জানেন, রাজা একবার কথা দিলে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। কৈকেয়ী তখন তার পাওনা বরের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, 'রামকে চৌদ্দ বছরের জন্য সন্ন্যাসী সাজে দন্ডক বনে পাঠাতে হবে এবং ভরতকে রাজা করতে হবে'।
কৈকেয়ীর এই কথা শুনে রাজা দশরথ জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি বিলাপ করতে লাগলেন, 'কৈকেয়ী তোমার পায়ে পড়ি, এই বর আমার কাছে চেয়ো না। রাম তোমার যেমন সেবা করে তেমনটা ভরতও করে না। এটা অন্যায়, ঘোর অন্যায়'। 
কৈকেয়ী তার সিদ্ধান্তে অনঢ়। তখন দশরথ কাতর হয়ে বলতে লাগলেন, 'কৈকেয়ী আমার বয়স হয়েছে আর ক-দিনই বা বাঁচব। আমাকে দয়া করো। আমার যার আছে সব নিয়ে যাও কিন্তু আমাকে এই মহা অন্যায় করতে বলো না'।
কৈকেয়ী তার সিদ্ধান্তে অবিচল। দশরথ ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারাতে লাগলেন। তিনি এই ঘোর অন্যায় সহ্য করতে পারছিলেন না। কিন্তু কৈকেয়ীর দয়া হলো না। তিনি বললেন, 'মহারাজ, একবার বর দিয়ে আবার কান্নাকাটি করছ; লোকে শুনলে হাসবে। আমি আমার পাওনা বর ছাড়ব না। তুমি রামকে রাজা করলে আমি বিষ খেয়ে মরব'।
অসহায় দশরথ রাতভর বিলাপ করতে লাগলেন কিন্তু কৈকেয়ী তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।

সকালে দশরথ নিতান্ত বাধ্য হয়ে রামকে ডেকে পাঠালেন। কিন্তু অতি বেদনায় দশরথের মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছিল না। যা বলার কৈকেয়ীই বললেন, 'রাম, মহারাজ আমাকে দুইটা বর দিয়েছিলেন, সেই বর আমি এখন চেয়ে নিয়েছি। একটা বর হলো তুমি মাথায় জটা নিয়ে গাছের ছাল পরে চৌদ্দ বছরের জন্য দন্ডক বনে যাবে, আরেকটা বর হচ্ছে ভরতকে রাজা করা হবে'। 
রাম একটুও দুঃখিত না হয়ে বললেন, 'তাই হবে। বাবা যা বলবেন তাই হবে। তাঁর উপর কোন কথা নাই। আমি আজই বনে চলে যাব'।

সব শুনে রামের মাতা কৌশল্যা তীব্র বেদনায় অজ্ঞান হয়ে গেলেন। লক্ষ্ণণও কিছুতেই এই অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিলেন না। রাম না থামালে তাঁকে কেউ থামাতে পারত না।
রামকে অনেক বেগ পেতে হলো লক্ষ্ণণ এবং কৌশল্যাকে প্রবোধ দিতে। কিন্তু সীতা এবং লক্ষ্ণণকে তাঁর সাথে বনে যাওয়াটা আটকাতে পারলেন না।

রাম তাঁর সব কিছু বিলিয়ে দিলেন। একটা নমুনা এমন: ত্রিজট নামে এক ব্রাক্ষণ ছিলেন। ত্রিজট রামের দানের কথা শুনে এসে হাজির হলেন। রাম তাঁকে দেখে হেসে বললেন, 'ঠাকুর, আপনি এই লাঠিটা যতদূর ছুঁড়ে ফেলতে পারবেন ততদূর পর্যন্ত আমার যত গরু আছে তা সব আপনার।
ত্রিজট বামুনের গায়ে জোরের অভাব ছিল না। তিনি কোমর কষে হেইয়ো বলে লাঠিটা সরযু পার করে দিলেন। এ পর্যন্ত গুণে দেখা গেল রামের এক লক্ষ গরু আছে। রাম সেই এক লক্ষ গরুর সঙ্গে উপরি হিসাবে আরও সম্পদ দিলেন।
সব বিলিয়ে রাম, লক্ষ্ণণ, সীতাকে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। সবাই বিলাপ করে বলতে লাগল, দশরথ নিশ্চয়ই পাগল হয়ে গেছেন নইলে এমন অন্যায় করেন কেমন করে? এই অনাচারের দেশে আমরা থাকব না, রামের সঙ্গে চলে যাব। থাকুক কৈকেয়ী তার ছেলে ভরতকে নিয়ে।
রাম সবাইকে হাতজোড় করে নিষেধ করলেন। কে শোনে কার কথা, সবাই রামের পিছু পিছু হাঁটতে লাগল। রথ চলা শুরু করলে সবাই পাগলের মতো রথের সঙ্গে ছুটতে আরম্ভ করল, বুড়া, যুবা কেউ বাকি রইল না। রথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন আর পারা যাচ্ছিল না তখন তাঁরা রথ-চালক সুমন্ত্রকে বলতে লাগলেন, 'ও সুমন্ত্র, একটু আস্তে যাও না, বাবা। আমরা যে আর পারি না'।

রাম সহ্য করতে পারছিলেন না কারণ রথের পেছন পেছন রাজা দশরথ, রানিরা (কৈকেয়ী ব্যতীত) পর্যন্ত ছুটে আসছেন। রাম অস্থির হয়ে সুমন্ত্রকে বলতে লাগলেন, 'জোরে চালাও, আরও জোরে'।
এদিকে দশরথ কাতর হয়ে বলছেন, 'রথ থামাও'।
সুমন্ত্র যখন দেখলেন রামের প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তখন তিনি রথের গতি বাড়িয়ে দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেলেন। রথ বিকেলে শৃঙ্গব নগরে থামল। সুমন্ত্রকে জোর করে ফিরিয়ে রাম, লক্ষ্ণণ, সীতা গঙ্গা পার হলেন।

রাজা দশরথ তীব্র ঘৃণায় কৈকেয়ীর ওখানে না গিয়ে কৌশল্যার ওখানে গেলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন তিনি আর অধিক কাল বেঁচে থাকবেন না। তাঁর মনে পড়ল, তাঁর যখন বয়স অল্প ছিল তখন একবার অন্ধকার রাতে হাতি মনে করে অন্ধ মুনির ছেলেকে তীর দিয়ে মেরে ফেলেছিলেন। ছেলে শোকে সেই অন্ধ মুনিও মারা যান কিন্তু মারা যাওয়ার পূর্বে তিনি দশরথকে অভিশাপ দিয়ে যান, তুমিও এমন করে পুত্র শোকে মারা যাবে।
রামকে বনে পাঠাবার পর ছয়দিন মাত্র দশরথ বেঁচে ছিলেন।

যে ভরতের জন্য কৈকেয়ী এমনটা করেছিলেন, সেই ভরত যখন এসে এই কান্ড শুনলেন তখন প্রচন্ড ক্রোধে তাঁর মাকে বললেন, 'তুমি আমার মা না-হলে তোমাকে আমি মেরে ফেলতাম। দাদা, তোমাকে এত মান্য না-করলে আমি তোমাকে এখনই তাড়িয়ে দিতাম। তোমার মত দুষ্ট স্ত্রীলোক এই পৃথিবীতে আর নাই। তুমি আগুনে পুড়ে মরো, নাহয় গলায় দড়ি দিয়ে মরো। ইচ্ছা হলে বনে চলে যাও'।
ভরত সবাইকে ডেকে বললেন, 'দাদার রাজ্য আমি চাই না। আমি তাঁকে ফিরিয়ে আনব'।
ভরত অনেক ক্লেশ স্বীকার করে রামকে খুঁজে বের করলেন। কিন্তু রামকে কোন ভাবেই টলাতে পারলেন না। রামের এক কথা, তাঁর পিতাকে দেয়া কথা থেকে তিনি সরে আসতে পারেন না।

অবশেষে কোন উপায় না দেখে ভরত বললেন, 'দাদা, তাহলে তোমার পায়ের খড়ম দুখানা খুলে দাও। এখন হতে এই খড়মই রাজা। আমরা এর চাকর। তোমার এই খড়ম নিয়ে আমি চৌদ্দ বছর গাছের ছাল পরে, ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করব এবং তোমার অপেক্ষা করব। চৌদ্দ বছর পর তুমি যদি ফিরে না আসো তাহলে কিন্তু আমি আগুনে ঝাপ দেব'।
হাতির পিঠে করে ভরত খড়ম নিয়ে এলেন। অযোধ্যার কাছে নন্দীগ্রামে খড়মকে সিংহাসনের উপর রেখে নিজে গাছের ছাল পরিধান করে, খড়মের উপর ছাতা ধরে, চামরের বাতাস করে রাজ্য শাসন করতে লাগলেন। কিন্তু কোন কাজ আরম্ভ করার পূর্বে খড়মের কাছে না বলে হাত দিতেন না। 

('অযোধ্যাকান্ড'। এই পর্বে রামকে আমরা দেখতে পাই অসাধারণ একটা চরিত্র হিসাবে। রামের তুলনা রাম নিজেই- এ অভূতপূর্ব! 
কৈকেয়ী এবং মন্থরার কথা বাদ দিলে আরও অনেক চরিত্রকে আমরা দেখতে পাই অসাধারণ চরিত্র হিসাবে যেখানে একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।) 

*সংক্ষেপিত
**ঋণ:
The RAMAYAN of VALMIKI: Ralph T. H. Griffith
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী 

সহায়ক লিংক:
১. আদিকান্ড: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_07.html

Friday, July 30, 2010

কনক পুরুষ: ৪

ইভা বিরক্ত হয়ে টিভি অফ করল। সিএনএন-এর অনুষ্ঠান হচ্ছে। নিউজ আর নিউজ, বিরক্তিকর। ক্লিনটন গোদা গোদা পা ফেলে দৌড়াচ্ছে, ক্যামেরাও দৌড়াচ্ছে। ক্লিনটন ক্যানের জুস খাচ্ছে, চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, বোকা বোকা হাসি হেসে ফাটা গলায় গাঁ গাঁ করছে; আরিজোনায় বৃষ্টি হবে কি না এটা ঘনঘন জানানো হচ্ছে, যেন আরিজোনার বৃষ্টির আশায় আড়িখোলার লোক উদগ্রীব হযে বসে থাকে! 
পরিবারের সবাই মিলে ‘শো বিজ’ 'স্টাইল'-এর অ্যাড দেখে কি করে কে জানে! ‘স্টাইল’-এর মডেলদের বুক কতভাগ ঢাকা আর কতভাগ খোলা এ নিয়ে থিসিস সাবমিট করা যেতে পারে। একেকজনের কী হাঁটা, কোমর একবার একহাত ডানে চলে যাচ্ছে আরেকবার দেড় হাত বাঁয়ে।

ইভা বিস্মিত হলো, জয়ের কালেকশনে দেখি প্রচুর বই। এসব বই পড়ল কখন! অডিও ক্যাসেটই হবে তিন চারশোর কম না। ডায়েরি দেখছে একুশটা। ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখল, একেকটায় একেক রকম বিষয়। কোনটায় বিজ্ঞান বিষয়ক তথ্য কোনটায় মজার মজার সব কথা, কোনটায় বা বিচিত্র সব তথ্য। তিনটা ডায়েরির পুরোটাই হলো পেপার কাটিং। সব ধুলোয় মাখামাখি।
শাশুড়ীর কাছে একটা ময়লা কাপড়-টাপড় চেয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, কাপড় দিয়ে কি করবে, বৌমা?
মা, ধুলায় দেখেন না কি অবস্থা!
‘সাবধান, বৌমা, ও কাজ করো না। আমি পরিষ্কার করতে গেলে তেড়ে আসত যেন গুপ্তধনে হাত দিয়ে ফেলেছি।
মা, ক্যাসেটগুলো ধুলো পড়ে নষ্ট হবে তো।
হোক, তুমি এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। ও একটা পাগল-ছাগল। একবার কি হলো জানে, ওর চশমা ভেঙ্গে গেল। বাড়তি চশমা নাই। নতুনটা একদিন পর পাওয়া যাবে। ডানদিকে মাইনাস সাড়ে সাত, বামেরটা সাত। সন্ধ্যায় দেখি দিপুর খেলনা বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে মগ্ন হয়ে টিভি দেখছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, কিরে জয়, এই সব কি! 

জয় বলল, কিছু না তো মা, টিভি দেখছি। চশমা ছাড়া তো কিছুই দেখি না। এটা লাগিয়ে কি বড় আর পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। 
আমি হাহাকার করে বললাম, জয়, তোর চোখ এত খারাপ!
ও হাসতে হাসতে বলল, আহ মা, এমন করে বলছ, যেন আমি অন্ধ হয়ে গেছি? 
কেমন দাঁত বের করে হাসছিল, ইচ্ছা করছিল ঠাস করে একটা চটকনা লাগাই। ওমা কি কান্ড, ওর চোখ যে এত খারাপ এটা বলে দিলাম বুঝি! বৌমা, আমি কিন্তু কিছু বলিনি।

শাশুড়ি হাসি গোপন করে আবার বলেছিলেন, ওর আরও কান্ড-কীর্তি শুনবে? বাসায় ও হঠাৎ করেই টুপি লাগানো শুরু করল। আমি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললাম, যাক এতদিনে ছেলেটার ধর্ম-কর্মে মতি হলো। ওমা, কিসের কি! টুপি লাগিয়ে দিব্যি খাচ্ছে-দাচ্ছে! সন্দেহ হলো, নাহ, গন্ডগোল আছে। জিজ্ঞেস করতেই নিরীহ গলায় বলল, মা, চুল বসাচ্ছি। 
আমার তো মাথায় হাত, চুল বসাচ্ছিস মানে? বান্দরটা বলল কি জানো? বলে, দেখো না, চুল কি শক্ত! জানো মা, মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়, ইচ্ছা করে মাথা কামিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করার ব্রাশ বানিয়ে ফেলি। আর দেখো, কেমন ভাঁজ খেয়ে পদ্মার ঢেউ খেলে থাকে। চুল ঠিক করতে দশ-পনেরো মিনিট সময় লাগে। এর কোন মানে হয় বলো, সুপারসনিক যুগে? এ অপচয়, জঘন্য-জঘন্য।
ইভা শাশুড়ীর কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছিল না। এর দেখি অদ্ভুত সব কান্ড কারখানা। ডায়েরিতে এক জায়গায় লিখে রেখেছে সংসদ বাঙ্গালা অভিধান মতে, কুত্তা মানে কুকুর। বন্ধনীতে উল্লেখ করা হয়েছে খেঁকি কুত্তা, ডালকুত্তা, নেড়ি কুত্তা। এই তিন কুত্তাকে কি করে চেনা যাবে এটা বলা হয় নাই। এটা অনুচিত হয়েছে। এদের চেনার উপায় সম্ভবত এরকম,
খেঁকিকুত্তা: দু-পেয়েরা ওর মত নয় দেখে অযথাই খেঁক খেঁক করে।
ডাল কুত্তা: ভার্সিটির ডাল খেতেও যাদের অনীহা নেই।
নেড়িকুত্তা: নেড়া মাথায় বিমর্ষ মুখে যে কুত্তা ঘুরে বেড়ায়।
জয় আরেক জায়গায় লিখেছে, এবারের কোবানী অ্যান্ড চাবানী ঈদে (যে সময় গরু ছাগল কুপিয়ে আরামসে চাবানো হয়) সুবিধে করা গেল না।


ইভা ব্যবহারে একটা কাপড় দিয়ে যতটুকু পারা যায় কম নাড়িয়ে ধুলো সরাতে লাগল। মাগো, কী নোংরা! এত নোংরা মানুষ থাকে, ছি! আর এই সব কি, যেখানে-সেখানে সিগারেটের ছাই ফেলেছে। কোথায় ফেলেনি? অডিও ক্যাসেটের খালি খাপ, পেনস্ট্যান্ড, ডেস্ক ক্যালেন্ডার-এ।
জয় ভেতরে ঢুকে খক খক করে কাশতে কাশতে বলল, ‘একি অবস্থা, ঘর দেখি ধুলায় অন্ধকার, হচ্ছে কী!’
‘দয়া করে একটাই কাজ করো; হয় কাশো, নয়তো কথা বলো।’
‘অ, এই ব্যাপার। জোরে শ্বাস নিতে গিয়ে নাকেমুখে ধুলা ঢুকে গেছে। কিন্তু তুমি করছ কি?’
‘দেখছ না, এত নোংরায় মানুষ থাকে!’
জয় ঠোঁট উল্টে বলল, ‘পরিষ্কার করে লাভ কি, আবার তো নোংরা হবে।’
ইভার খুব রাগ হচ্ছে, ‘লজ্জা করছে না তোমার এসব বলতে?’
‘কি মুশকিল, সত্য বলতে পারব না?’
কর্কশ শব্দে টেলিফোন বাজছে। ইভা বলল, ‘জয়, আমার মাথায় রাগ চেপে যাচ্ছে। তুমি যাও টেলিফোন ধরো।’
জয় টেলিফোনের রিসিভার উঠিয়ে বলল, ‘ইভা, তোমার ফোন।’
‘কে।’
'তোমার বোন ধ্রুবা। কোন সমস্যা হয়েছে কি না বুঝতে পারছি না, আমার সঙ্গে একটা কথাও বলল না।’


ইভার বুক ভয়ে কাঁপতে লাগল। কোন দুঃসংবাদ না তো? বাবার কি কিছু হলো? কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘ধ্রুবা-ধ্রুবা, কি হয়েছে?’
ওপাশ থেকে ফোঁপানোর শব্দ ভেসে এল। ইভার সহ্যাতীত মনে হচ্ছে। ‘ধ্রুবা বল, বল কি হয়েছে; বাবা ঠিক আছে তো?’
ধ্রুবা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আপু, বাবা না আমাকে চড় দিয়েছে।’
ইভার বুক থেকে পাষাণ ভার নেমে গেল। কিন্তু বাবা তো আজতক কারও গায়ে হাত তোলেননি!
‘তুই কি করেছিলি?
‘সাকলে আমি, বাবা-মা নাস্তা করছি। একটা রুটি শেষ করে আরেকটা নিয়েছি মাত্র-’
‘আহ ধ্রুবা, হয়েছে কি সেটা বলবি তো!’
‘আপু, এমন করছ কেন, বলছি তো। বাবা আমাকে বলল, ধ্রুবা এরকম চপচপ করে খাচ্ছিস কেন। আমি বললাম, চপচপ করে খাচ্ছি না তো। বাবা বললেন, ফাজিল মেয়ে চড় খাবি। আমি বললাম, চড় দিতে ইচ্ছা করলে দিয়ে ফেলো। বকছ কেন। বাবা আমাকে ঘুরিয়ে চড় দিলেন। আপু, আপু, বাবা আমাকে চড় দিলেন।’
ধ্রুবা গলা ফাটিয়ে কাঁদতে থাকল। ইভার কেন জানি হাসি পাচ্ছে। ধ্রুবা, বাবা এসব কি শুরু করছে। হাসি চেপে বলল, ‘তো এখন হয়েছে কি?’
‘হয়েছে কি মানে, বিনা কারণে চড় দিলেন, এটা কিছু না!’
‘তুই বললি চড় দিতে, বাবা দিলেন। ব্যস শেষ হয়ে গেল। ’
‘তুমি খুব মজা পাচ্ছ, না?’
‘দূর পাগল, ঠাট্টা করছিলাম।’
ধ্রুবা সম্ভবত টেলিফোন আছড়ে ফেলল।


জয় বলল, ‘কাজটা কিন্তু তুমি ঠিক করলে না।’
‘কি ঠিক করলাম না?’
‘ধ্রুবার সঙ্গে এভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি। টিন-এজ মেয়েরা সাঙ্ঘাতিক আবেগপ্রবণ হয়, উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেললে মহা সমস্যা।’
ইভা অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুমি মনে হয় টিন-এজ মেয়ে বিশারদ।’
‘ধ্যাৎ, বিয়ের আগে কোন মেয়ের সঙ্গে ভাল করে পরিচয়ই হয়নি। দেখছ তো বাঁশগাছের মতে এই আকৃতি, মেয়েদের সঙ্গে কথা বললেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে যেত। ভাল লাগার কথা সাহস করে কাউকে বলতেই পারলাম না। বাঁশগাছ দেখে মেয়েরাও গা করল না। একজনের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে, সে হচ্ছ তুমি।’
‘এ নিয়ে খুব কষ্টে আছ মনে হয়, ঘটা করে ঠান্ডা শ্বাস ফেলছ।’
জয় খসখস করে গাল চুলকে হাসল। ইভা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ‘কোনও মেয়েকে তোমার ভাল লাগেনি বলতে চাও?’
‘লাগবে না কেন, লেগেছে। তাতে কি হয়।’
‘কি হয়, সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখে মাথা ঘুরে যায়। তখন আমার মত মেয়েদের কুৎসিত মনে হয়।’
‘যাহ‌, তুমি কুৎসিত কে বলল!’
‘বলতে হবে, আমি বুঝি না, কচি খুকি?
‘বাদ দাও তো এসব।’
‘কেন, বাদ দেব কেন?’
‘আঃ ইভা, কিসব বলছ। আমি শুধু বলেছি ধ্রুবার বয়স কম, ঠিক এ মুহূর্তে ওর সঙ্গে রসিকতাটা করা ঠিক হয়নি। ব্যাস, এই তো।’
‘আমার বোনের সঙ্গে কি করব এটা তোমায় বলে দিতে হবে না।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। খাবার নিয়ে মা বসে আছেন। এসো, খেয়ে নাও।’
‘সব নোংরা হয়েছে। যাও, কাপড় পাল্টে আসছি।’
জয়ের বেরুতে একটু দেরি হলো দেখে ইভা রাগী গলায় বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছ যে, আমি কি তোমার সামনে কাপড় পাল্টাব?’

জয় দ্রুত বেরিয়ে যেতে গিয়ে যে ভঙ্গিটা করল পেছন ফিরলে দেখতে পেত ইভা হাসি চাপার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

সহায়ক লিংক: 
কনক পুরুষ, ৩: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_26.html

ছবি ব্লগ: হালকা চালের ব্লগ

প্রায়শ, এই সাইটে কঠিন কঠিন লেখা লিখতে গিয়ে ক্লান্তি লাগে আবার হালকা চালের লেখা লিখলে অনেকে রে রে করে তেড়ে আসেন :) । এখন থেকে ঠিক করেছি, অন্য একটা সাইটে পছন্দের কিছু ছবি পোস্ট, দুয়েক লাইনের হালকা চালের কিছু লেখা লেখব। 
মূলত এটা আমার নিজের জন্য কিন্তু ওখানে কেউ মাথা ঢুকিয়ে দিলে মাথা কাটা যাবে এমনটা ভাবার কোন অবকাশ নাই :)। ওই সাইটটার নাম দিয়েছি 'ছবি ব্লগ': http://chobiblog.blogspot.com/   

দেশপ্রেমিক (!)

কখনও কখনও অতি বুদ্ধিমান, অতি দেশপ্রেমিককে যখন দেখি তখন স্তব্ধ হয়ে ভাবি, কী বুদ্ধিমান, কী দেশপ্রেমিক! আহা, এদের কথা লিখে শেষ করি কেমন করে?
তৎকালীন মনোহরদী থানার বিএনপি সভাপতি সিরাজুল হক মাস্টার বলেছিলেন, 
"যারা পোস্টারে-লিফলেটে 'আল্লাহ সর্বশক্তিমান' লিখেন তাদেরকে বলছি, আল্লাহ বাংলা পড়েন নাই, তাই 'সর্বশক্তিমান' কথাটা আল্লাহ বুঝেন না। এখন থেকে 'আল্লাহু আকবর' লিখবেন, আল্লাহ বুঝবেন।"
তাই তো! এটা আমাদের মাথায় এলো না কেন? আল্লা বাংলা বুঝবেন কেমন করে? আহা, মাস্টার সাহেবের মত বুদ্ধি যে আমাদের নাই। এর বুদ্ধির কাছে আইনস্টাইন [১] কোন ছার! কী বুদ্ধিমান (!)।

বাংলাদেশের ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের চেয়ারম্যান মওলানা (!) শামসুল হক জেহাদী বলেছিলেন,
"৭১-এ ৩০ লাখ মানুষ হত্যার অপরাধে গোলাম আযমসহ ৩০ লাখ জামাত-শিবির কর্মীকে জনসমক্ষে কতল করতে হবে। এ জন্যে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।"
এমন জেহাদীর মত দেশপ্রেমিকের কাছে মশিহুর রহমানের [২] মত দেশপ্রেমিক চাপা পড়ে যান। জেহাদীর সঙ্গে মশিহুর রহমানের তুলনা করাটাই ধৃষ্টতার সামিল! কী দেশপ্রেমিক(!)।
জেহাদী সাহেব উপায় বাতলে দিয়েছেন কিন্তু কিছু বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেননি। যেমন ৩০ লক্ষ মানুষকে জনসমক্ষে কতল করার সময় শিশু দুর্বলচিত্তদের কেমন করে ঘরে আটকে রাখতে হবে। এই বিপুল রক্ত, মৃত মানবদেহের কি গতি হবে? ওহে জেহাদী, এই ৩০ লক্ষ মানুষের শব পচে যে মহামারী ছড়িয়ে পড়বে এতে না আবার গোটা দেশ সাফ হয়ে যায়! জেহাদী, আপনি বাঁচবেন তো?

তেমনি ব্লগস্ফিয়ারেও এমন কিছু দেশপ্রেমিকের দেখা পেয়ে চমকে উঠি। নমুনা:
পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় ৮০ জন মারা গেছে অসংখ্য মানুষ পঙ্গু হয়ে গেছে। এই নিয়ে এই দেশপ্রেমিক (!) লেখাটা দিয়েছেন। এই লেখা নিয়ে অন্য দেশপ্রেমিকরা (!) মন্তব্য করেছেন:

 
এদের দেশপ্রেম আকাশ ছাড়িয়ে গেছে সম্ভবত এই কারণে পাকিস্তান আর্মি আমাদের উপর সীমাহীন অন্যায় করেছিল। 
এটা সত্য পাকিস্তানি আর্মিরা সৈনিক ছিল না, ছিল সাইকোপ্যাথ [৩]। কিন্তু সাইকোপ্যাথের মা-ও সাইকোপ্যাথ হবে নাকি? মা তো মা-ই, সে সাইকোপ্যাথের মা, নাকি মাছের মা [৪]; পার্থক্য কী!
প্রার্থনাস্থল, সেটা কোন ধর্মের এটা আলোচ্য বিষয় না, এটা আদিমানুষের হলেও কি আসে যায়! কেউ পাথরকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে, করুক না; সমস্যা কোথায়! অন্যের মত, বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করতে না পারলে দানব আর মানবের মধ্যে ফারাক কোথায়!

আর মারা গেছে পশু না, মানব-সন্তান। ভাল কথা, এই দেশে কি পাকিস্তানি জনগণ এসে অত্যাচার করেছে, নাকি পাকিস্তান আর্মি? কতিপয় রাজনীতিবিদ, জেনারেল মিলে সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত পালন করে আর্মি- এদের এই শিক্ষা দিয়েই গড়ে তোলা হয়, চেইন অভ কমান্ডের পালন। 
এই দেশেরই নাগরিক আদিমানুষদের উপর বিভিন্ন সময়ে যে অন্যায়-অত্যাচার করা হয়েছে এটা কি আমরা করেছি, নাকি আর্মি? দূরত্বের কারণে পাকিস্তানি জনগণ আমাদের সঙ্গে যেটা করতে পারেনি সেটা এই দেশের কিছু জনগণ করে দেখিয়ে দিয়েছে এই আদিমানুষদের প্রতি!
আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, যথাসময়ে সমস্ত অন্যায়, খুনের বিচার হওয়া প্রয়োজন ছিল [৫] এটা আমরা করতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে ৭১-এর খুনিদের সঙ্গে গলাগলি করেছি। কেউ কেবল গলাগলি, কেউ-বা গলা ধরে ঝুলে ছিল; পার্থক্য এটাই। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের একটা দলও বুকে হাত দিয়ে এটা অস্বীকার করতে পারবে না।

ইসরাইলের মত দেশপ্রেম আমাদের ছিল না। যদিও এর জন্য বিশ্বব্যাপি নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল কিন্তু এরা গা করেনি। লক্ষ-লক্ষ খুনের সিদ্ধান্তদাতা আইকম্যানকে শাস্তি দেয়ার জন্য এরা সংবিধান পর্যন্ত বদলে ফেলেছিল। ইসরাইলের সংবিধানে মৃত্যুদন্ড দেয়ার বিধান ছিল না। আত্মগোপনকারী নাৎসি জেনারেল আইকম্যানকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইসরাইলি মোসাদ এজেন্টরা কিডন্যাপ করে ইসরাইলে নিয়ে আসে। তখন তার বিচার শুরু করা আগে তাদের সংবিধান পর্যন্ত বদলে নেয়, সংবিধান সংশোধন করে মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা চালু করে। তারপর আইকম্যানের বিচার, মৃত্যুদন্ড এবং সেই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। একজন মানুষকে ফাঁসি দেবার জন্য একটি দেশের সংবিধান পরিবর্তন করার নজির সম্ভবত পৃথিবীতে আর নেই!

এই সব দেশপ্রেমিক, নব্য মুক্তিযোদ্ধারা [৬] কি চাইছেন, আমরাও মানব থেকে দানব [৭] হয়ে যাই? 'খোদা না খাস্তা' আমাদের মসজিদে যদি বোমা ফাটে তখন আদিমানুষরা [৮] যদি এই নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে কেমন লাগবে আমাদের...? 
(মাশাল্লা, একটা চেহারা থাকলেই বা মাথায় গামছা বাঁধলেই মাথায় ঘিলু নামের পদার্থ থাকবেই, এটা জোর দিয়ে বলা মুশকিল।)

*আদিমানুষদের নিয়ে আমার কেবলি মনে হচ্ছে, আমরা এদের সঙ্গে যা করছি, একেকটা বিষবৃক্ষ রোপণ করছি; যে ঘৃণার বীজ বপন করছি এর পরিণাম ভেবে শিউরে উঠি। আমাদের এই প্রজন্ম পাকিস্তানিদের প্রতি যে ঘৃণা নিয়ে নিয়ে বড়ো হচ্ছে তারচে আমাদের প্রতি অনেক তীব্র ঘৃণা নিয়ে আদিমানুষদের নতুন প্রজন্ম বড়ো হচ্ছে। এর পরিণাম শুভ হতে পারে না, ভয়াবহ।
সম্প্রতি জামাল ভাস্কর আদিমানুষদের এলাকা থেকে ঘুরে এসেছেন। অজানা কিছু তথ্য নিয়ে ধারাবাহিক একটা লেখা লিখেছেন। লিংক:
হেথাক তুকে মানাইছে নারে: http://www.amrabondhu.com/vashkar/1591

 সহায়ক লিংক:
১. আইনস্টাইন: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_19.html 
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html 
৩. সাইকোপ্যাথ: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_09.html 
৪. মাছের জন্য এলিজি: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_6002.html 
৫. সমস্ত খুনের বিচার: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_19.html 
৬. নব্য মুক্তিযোদ্ধা: http://www.ali-mahmed.com/2008/12/blog-post_8439.html 
৭. দানব: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html 
৮. আদিমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_23.html

Wednesday, July 28, 2010

আবারও কুইজ

(আগের কুইজের [১] মতই এটারও পুরস্কার একই।)
এই ছবিটা একটা অসম্ভব দুর্ধর্ষ ছবি এটা বললেও কম বলা হয়! আমার মত অগাবগা কল্পনাও করতে পারি না এমন একটা অসাধারণ ছবি উঠাতে পারব। একটা ছবি উঠাতে কেমন দক্ষযজ্ঞ করতে হয় তার খানিকটা নমুনা এখানে পাওয়া যাবে [২]। দালি সাহেবের কান্ড দেখুন!

ছবিটা মেহেরপুর সদর থেকে তোলা হয়েছে সে না-হয় বুঝলুম কিন্তু এমন অসাধারণ ছবিটা উঠিয়েছে কে এই সম্বন্ধে কোন দিক-নির্দেশনা এখানে নাই। আজকের কুইজটা এটা নিয়েই। কে উঠিয়েছে ছবিটা?

ক. মতিউর রহমান স্বয়ং?
খ. প্রথম আলো অফিসের কোন চাপরাসি?
গ. এমন কোন ব্যক্তি যার নাম প্রথম আলো (ছদ্মনামে আছেন, নিজ নামে আত্মপ্রকাশ করতে চান না)?
ঘ. ছবির এই কাঠবিড়ালি ক্যামেরায় (কাঠবেড়ালিরা কোন জাতের ক্যামেরা ব্যবহার করে এটা আমার জানা নাই) অটো-টাইমিং দিয়ে নিজে নিজেই এই ছবিটা উঠিয়েছে?
ঙ. অলম্পাস, নাইকন, হাট্টিমাটিম নামের কোন একটা ক্যামেরা নিজে নিজেই এটা উঠিয়েছে এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রথম আলো অফিসে মেইল করেছে?
চ. গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন জায়গায় যেসব ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে; এদের সঙ্গে প্রথম আলোর দহরম-মহরম থাকার কারণে ওখান থেকে ছবিটা সংগ্রহ করা হয়েছে?
ছ. এর কোনটাই না। প্রথম আলোর কোন একজন আলোকচিত্রি ছবিটা উঠিয়েছেন। 'প্রথম আলো তাঁকে টাকা দিচ্ছে, আবার তাঁর নামও দেবে'? প্রথম আলো এই নীতিতে বিশ্বাসী বলে তাঁর নামটা আসেনি?

*ছবি ঋণ: প্রথম আলো

সহায়ক লিংক:
১. কুইজ প্রতিযোগিতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_13.html 
২. দক্ষযজ্ঞ: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_6543.html

অতিথি নারায়ন

সচরাচর চট করে আমি মুগ্ধ হই না। আবার মুগ্ধ হওয়ার মত কিছু দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি! তখন কেউ কেউ বলে বসেন, গেরাম থিক্যা আইছেন নাকি? 
আমি মাথা নাড়ি, জ্বে। 
পিঠে গ্রাম্য ছাপ লাগা নিয়ে আমার মধ্যে উল্লেখ করার মত বিকার দেখা যায় না। আনন্দটাই বড়ো, ছাপ দিয়ে কী করব! আর আমি তো গ্রাম-গ্রাম টাইপের একটা জায়গাতেই বড়ো হয়েছি, এখনও থাকি। জায়গাটা ছেড়ে যাওয়ার গোপন কোন ইচ্ছাও আমার নাই। তাই শরীর থেকে এখনও সরষে তেলের গন্ধটা পুরোপুরি যায়নি!

একটা অতিথিশালা দেখে আমার মুগ্ধতা কাটে না, কাটবে বলে এই দুরাশাও করি না। আজকাল এই যান্ত্রিক যুগে অতিথিশালা কোথায়? সেই রাজাও নেই, বাদশাও উধাও। কার দায় পড়েছে অতিথিসেবা করার। আমরা আজ ভুলতেই বসেছি অতিথি নারায়নেরই আরেক রূপ, অতিথি নারায়ন। কিন্তু ব্যতিক্রম কোথাও-না-কোথাও থাকেই, হোক দু-একটা, তাতে কী আসে যায়!

দিন-রাত নেই, হলিডে-উইকএন্ড নেই, সাবমেরিন ক্যাবেল কাটা-ফাটা নেই; আনুমানিক ৩০০ অতিথি একটা ওয়েব-সাইটে অবস্থান করতে থাকেন, করতেই থাকেন; ছাড়াছাড়ি নাই। কী এক বিচিত্র কারণে দরোজা বন্ধ করেই এরা আসা-যাওয়া করেন। লগ-ইন এর নামে প্রকাশ্যে আসার তকলিফ করতে চান না!
তবে আমি খানিকটা ভয়ে ভয়ে থাকি অতিথিদের পদভারে না এই সাইটটা খানিকটা কাত হয়ে যায়। যেমনটা ঢাকাকে নিয়ে আমার উদ্বেগের শেষ নাই, কোনদিন না ঢাকা হুড়মুড় করে ধসে পড়ে।
সত্যি এ যুগে এমন অতিথিপরায়ণ-অতিথিপরিচর্যা-অতিথিবৎসল-অতিথিসৎকার-অতিথিসেবা-অতিথিশালা বিরল! এ অভূতপূর্ব, এ অভাবনীয়!

কুইজ প্রতিযোগির ফলাফল ঘোষণা

পত্রিকাওয়ালাদের দেখাদেখি আমিও একটা কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম। এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার দেয়ার বিষয়ে বলা হয়েছিল,
"সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্যে থেকে লটারির মাধ্যমে যিনি জিতবেন তিনি পাবেন নগদ ২০০ টাকা। যাদের নগদ টাকার প্রতি মোহ নাই তাঁদের জন্য অন্য অপশন আছে। আস্ত মুরগীর রোস্ট, কয়লার আঁচে ঝলসানো (এটার সমস্যা হচ্ছে, কষ্ট করে এসে খেয়ে যেতে হবে এবং এটাও কথা দিচ্ছি ওই আস্ত রোস্টে আমি ভাগ বসাব না।, এককিনিও না। কেবল তাকিয়ে থাকব, আপত্তি থাকলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখব।)।"

পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। বিজয়ী হয়েছেন জনাব, সুব্রত। তিনি দয়া করে alimahmed.bangladesh@gmail.com এই ইমেইলে যোগাযোগ করতে পারেন। যে কোন অপশন বেছে নিতে পারেন।
ধন্যবাদ সবাইকে কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করার জন্য। আগামীতে আরও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনের গোপন ইচ্ছা রাখি। আপনারা সাদরে আমন্ত্রিত :)। 

*ছবি ঋণ: প্রথম আলো
সহায়ক লিংক:
১. কুইজ প্রতিযোগিতা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_13.html

Tuesday, July 27, 2010

নার্গিস এবং অন্যান্য

'ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল' [১] নিয়ে পূর্বে যে পোস্টটা করেছিলাম ওখানে আমার একটা খেদ ছিল নার্গিসের ছবি উঠানো হয়নি বলে। আজ এই সুযোগটা চলে আসে। 
বাচ্চাদের স্কুল ড্রেস বানানো হবে, কাপড় সেলাইয়ের মাস্টারকে সাথে নিয়ে গেছি। আজ গিয়ে দেখি বাচ্চা আরেকজন বেড়েছে, সর্বসাকল্যে গিয়ে দাঁড়াল ২৪ জন।

উল্লেখ করেছিলাম, এখানকার সমস্ত বাচ্চাদের বাবা-মা অন্ধ কিন্তু বাচ্চাগুলো স্বাভাবিক, দেখতে পায়।

কেবল নার্গিসই ব্যতিক্রম, ও দেখতে পায় না। কিন্তু ওর শেখার আগ্রহের শেষ নাই! 
এমনিতে এখানকার বাচ্চাগুলো আমাকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। আজও এরা আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। মাথা গুণে একটা চকলেট বেশি রেখে নেয়ার জন্য বলেছিলাম, ঠিক ঠিক একটা রয়ে যায়। 
গতবার বলে আসা গল্পটা চমৎকার করে বলতে পারে। 
স্কুল চালু হয়েছে ৪/৫ দিন হবে, এখন পর্যন্ত এরা মাত্র ৪টা বর্ণমালা শিখেছে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, উল্টাপাল্টা যে কোন বর্ণমালা জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশ বাচ্চাই সঠিক উত্তরটা দিতে পেরেছে। সালমা নামের টিচার, ক্লাশ এইট পড়ুয়া পিচ্চি মেয়েটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। যেটা দেড় মাসেও হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের মাস্টার মশাই শেখাতে পারেননি!

আজ সঙ্গে রঙ-পেন্সিল নিয়ে গিয়েছিলাম। এদের সবাইকে কাগজ দিয়ে বললাম, যে যা পারো আকোঁ। এরা জীবনের এই প্রথম রঙ পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকবে। 
নার্গিসকেও আমি অবশ্যই দিতাম কিন্তু ও আগ বাড়িয়ে হইচই শুরু করে। এখানকার দু-এক জন বাচ্চা ফট করে বলে বসে, হে চোখে দেখে না, হে কি আঁকব। 
আজ এই প্রথম এখানকার এই বাচ্চাদের ধমক দেই। টিচারকে বলে দেই, নার্গিসের প্রতি যেন আলাদা করে খেয়াল করে। এবং আজকের পর এখানকার কোন বাচ্চা যেন এই ধরনের কথা না বলে যে, ও তো এটা পারবে না কারণ ও চোখে দেখে না।

কিন্তু নার্গিস যখন বলে, আমি কি আকুম? আমার মনটা অহেতুক খারাপ হয়ে যায়, জীবনে কত অকাজের জিনিস শিখলাম কিন্তু এই বাচ্চাটাকে শেখাবার মত কোন শিক্ষা কেন শিখলাম না! আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এই বাচ্চাটাকে আমি কি আঁকতে বলব? অন্ধকার? এ তো কিছুই দেখেনি, এর ভুবনে অন্ধকার ব্যতীত কোন কিছু দেখার স্মৃতি নাই- চারপাশে জ্যোৎস্নায় থই থই তবুও নিতল অন্ধকার। আমি একে কি আঁকতে বলব? এদিকে মেয়েটা যে বড়ো আশা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। 
আমি নিরুপায় হয়ে বলি, নার্গিস, তুমি ফুল আঁকো। শোনো, এই দেখো, আমি তোমার হাত ধরছি, এই ভাবে গোল গোল করে আঁকবে তাহলে ফুল হবে। নার্গিস আঁকতে থাকে।

আমার ভাল লাগছিল না, কষ্ট হচ্ছিল। আমি দুর্বলচিত্তের মানুষ, শেষে এখানে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আমি বেরিয়ে আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করি। কী কান্ড, চারপাশটা এতো চমৎকার এটা এর আগে খেয়াল করিনি। জায়গাটা কী শান্ত- মনে হয় দিনভর এখানে কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে! ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পেয়ারা গাছ, এদের একেকজনের ভাগে নাকি ২২টা করে পেয়ারা গাছ পড়েছে। পাশেই লাল মাটির উঁচু রাস্তা, দশ কদম গেলেই নাকি ভারতের সীমান্ত! আরেক দিন গেলে এই রাস্তা ধরে হাঁটব, বিএসএফ না আবার দুম করে গুলি করে বসে।
বলতে গেলে টিলার মাঝখানে স্কুলটা।


সবার আঁকা হলে আমি অবাক হই, যারা কখনও রঙ-পেন্সিল ছুঁয়ে দেখেনি এরা যা এঁকেছে আমার মত সাধারণ একজন মানুষকে মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ঠ। সবার আঁকা কাগজে যার যার নাম লিখে স্কুলের টিনের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়ার জন্য টিচারকে বলে আসি। পরবর্তীতে এরা স্কুলে ঢুকলেই যার যার শিল্পকর্মগুলো দেখবে। 
কেবল নার্গিসের ছবিটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। মেয়েটাকে ইচ্ছা করে আমি সবুজ রঙ দিয়েছিলাম। এই গ্রহে কতো বিচিত্র ঘটনা ঘটে, আরেকটা ঘটলে আসমান একহাত নীচে নেমে আসবে এই দিব্যি কে দিয়েছে? এটা আশা করতে কে আমাকে আটকাচ্ছে, একদিন এই মেয়েটাও সবুজ দেখবে...।

সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_24.html
২. হরিজন পল্লীর ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html    

Monday, July 26, 2010

কনক পুরুষ: ৩

ইভার খুব অস্থির লাগছে। জয় বলে গেল কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটায় চলে আসবে। এখান থেকে ওরা বাবার ওখানে যাবে। ওর গোল সোনালী হাতঘড়িটায় এখন বাজছে পাঁচটা বিশ। এখনও এর পাত্তা নেই। না এলে শুধু শুধু বলা কেন! অপেক্ষা করা যন্ত্রণার একশেষ। ওর শাশুড়ী মুখ কালো করে বলে গেছেন, ‘ওর আজ-ই দেরি করার ছিল। তুমি দেখো, বৌমা, ও এলে তোমার সামনে ঠাস করে চড় দেব। ওমা, তুমি হাসছ, বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি, দাঁড়াও, আসুক। তুমি কিন্তু ও আসার সঙ্গে সঙ্গে আমায় খবর দেবে।’
ইভা হাসি চেপে বলল, ‘সঙ্গে সঙ্গে খবর দিতে হবে কেন, মা!’
‘কি বলছ, দেরি হলে রাগ পড়ে যাবে না?’

এই মহিলার চেহারায় তেমন কোন বিশেষত্ব নেই, কিন্তু ইভা অসম্ভব পছন্দ করে ফেলেছে। ওর চোখ ভিজে এলো নিজের মা’র কথা মনে করে। ইভা ক্ষীণ গলায় বলল, ‘মা, আজ রাতটা বাবার ওখানে থাকলে আপনি কি রাগ করবেন?’
‘ওমা, আমি রাগ করব কি, পাগল মেয়ে। জয়ও থেকে যাক না আজ তোমাদের ওখানে।’ 

ইভার গাল টাল লাল রঙে ভেসে গেল। পালিয়ে ছাদে চলে এল। এদের ছাদটা খুব সুন্দর। চারদিক টব দিয়ে ভরে ফেলেছে। ফুলের গাছ, অর্কিড, ক্যাকটাসের কমতি নেই কিন্তু সর্বত্র অযত্নের ছাপ। কয়েকটা টবের মাটি শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে! কিছু গাছের পাতা বিবর্ণ। ইভা একটা বালতি এনে ঘুরে ঘুরে পানি দিতে লাগল। বিবর্ণ পাতাগুলো ফেলে দিল।
শাশুড়ী শুকিয়ে যাওয়া কাপড় উঠিয়ে নেয়ার জন্যে এসে সন্ত্রস্ত হয়ে বললেন, ‘করেছ কি, বৌমা!’
‘কি, মা?’
‘এই যে, পানি দিলে!’

‘শুকিয়ে ছিল যে-।
‘রাগারাগি করে ও তোমার মন খারাপ করে দেবে।’
‘রাগ করবে কেন, মা?’
‘আরে, বলো না। আমি একদিন এ অবস্থা দেখে পানি দিলাম। ওর দশ-বারোটা গাছ মরে গেল। মরল কেন, আল্লা জানে! ওর কি লাফালাফি। জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছিল। আমি হাসতে হাসতে বললাম, হয়েছে কি, তুই এরকম করছিস কেন?
ও বলল, তুমি আমার এতগুলো গাছ মেরে ফেললে, আবার হাসছ। সত্যি করে বলো দেখি একটুও খারাপ লাগছে না?
কাঁটাঅলা কয়েকটা গাছ মরে গেছে। হয়েছে কি, এসব তো আবর্জনা। কি কাজে লাগে বল। চামার শ্রেণীর গাছ সব।
তোমার তাহলে ধারণা এগুলো চামার শ্রেণীর গাছ!
তুই-ই বল, কি কাজে লাগে। না ফুল, না ফল।
জয় ঝড়ের বেগে চলে গেল। আমি কত বললাম আরে রাগ করছিস, ঠাট্টা করলাম। কে শোনে কার কথা। ওদিন রাতে ও রাগ করে ভাত খেলো না।’
শাশুড়ী এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে থামলে ইভা বলল, ‘মা, ওগুলো তো ক্যাকটাস। খুব অল্প পানি দিতে হয়। বেশি দিলে মরে যায়।’
ইভার শাশুড়ী কাপড় নিয়ে নেমে যেতে যেতে বললেন, ‘ক্যাকটাস না হয়ে করলা হলে অন্তত ভাজি করে খাওয়া যেত।’


ইভা চেয়ার এনে চুপচাপ বসে সূর্যাস্ত দেখতে লাগল। আলো হঠিয়ে অন্ধকার গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। বুকে কেমন চাপা কষ্ট হচ্ছে। কী কুৎসিত বিষণ্নতা! প্রকৃতি তার সন্তানের ওপর কি প্রভাবই না ফেলে। পেছন থেতে জয় উঁচু গলায় বলল, ‘এই-এই, অন্ধকারে বসে আছ যে, ঠান্ডা লাগছে না? শরীর খারাপ করবে তো।’
ইভার হিম-হিম গলা,
করলে করবে।’
‘কি মুশকিল, জ্বর-টর হলে!’
‘জ্বর হলে তোমার কোন অসুবিধা হবে?’
‘ঘটনা কী! তুমি মনে হয় কোন কারণে আমার উপর রেগে আছ। কারণটা ধরতে পারছি না।’
‘ধরতে পারছ না?’
‘না। অ-আচ্ছা, মনে পড়েছে; পাঁচটায় আসার কথা ছিল।’
‘পাঁচটা তো বাজেনি এখনও, না?’
‘সরি, তন্ময়ের ওখানে দেরি হলো।’
ইভার গলার স্বর নিজের অজান্তেই কোমল হলো, ‘তন্ময় ভাইকে বলেছিলে আমি দেখা করতে বলেছি?’
‘হুঁ।’
‘কি বললেন?’
‘বলল তো কাল আসবে। আসে কি না জানে। এসব কথা থাক, এ নিয়ে আমার মন এমনিতেই খারাপ।’
ইভা কথা ঘুরাবার জন্যে বলল, ‘ওহ, ভুলে গেছি, তোমার কি মা’র সঙ্গে দেখা হয়েছে?’
‘উঁহু, কেন? ’
‘মা বলেছিলেন তুমি আসার সঙ্গে সঙ্গে যেন খবর দিই। দেরি করেছ বলে তোমাকে ঠাস করে চড় দেবেন। জানাতে দেরি হলে ওনার নাকি রাগ কমে যাবে। তোমার মা’র রাগী মুখ দেখে কিন্তু মনেই হয় না ওঁর মনটা এত কোমল।’
জয় আনমনা হয়ে বলল, ‘জানো, ইভা, আমি যখন খুব ছোট, মা খুব রেগে গেলে লুকিয়ে অপেক্ষা করতাম মা কখন পান খাবেন। পান মুখে দিলে মা’র রুক্ষ কালো মুখটা কেমন কমনীয় হয়ে উঠত।’
ইভা তির্যক গলায় বলর, ‘তোমার মুখটাও তো কম গম্ভীর না, পান খেয়ে দেখতো পারো।’

‘পান খাওয়া লাল-লাল দাঁত তোমার অপছন্দ হবে না বলছ?’
‘তোমাকে পছন্দ-অপছন্দ করতে আমার বয়েই গেছে।’


জয় আহত চোখে তাকিয়ে রইল। চশমার কাঁচ কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার বলে খুব একটা হেরফের হলো না। তবু ইভা না দেখে ফেলে ভেবে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার প্রয়োজন ছিল না। অন্ধকারকে কুৎসিত বলে যত গালাগাল করা হোক, এসব গায়ে না মেখে মানুষের লজ্জা তার মমতার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখে।
ইভার কি করে টের পেল কে জানে! নিঃসঙ্কোচে হাত ধরে বলল, ‘অ্যাই, কথা বলছ না যে, কি হয়েছে?’
জয় কঠিন হাতে ইভার হাত সরিয়ে পা বাড়াল। ইভা পেছন থেকে দু’হাতে ধরে ফেলল, খেয়াল নেই ওর বুক জয়ের কর্কশ পিঠ ছুঁয়ে আছে। জয়ও খুব রেগে ছিল বলেই ব্যাপারটা বুঝতে যথেষ্ট সময় লাগল। কয়েকবার ছাড়ানোর চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। কেমন অন্য রকম এক অনুভূতি। শরীরের সমস্ত রক্ত কি মস্তিষ্কে গিয়ে জমা হচ্ছে? নিজের হৃদপিন্ডের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
জয় দুর্বল গলায় বলল, ‘ছাড়ো, ছাড়ো।’
‘উঁহু, বলো রাগ করোনি?’
জয় কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কে যেন উপরে আসছে।’
‘আসুক। কি ছেলেমানুষ তুমি, ঠাট্টা করলাম আর তুমি কিনা- না, আগে বলো আমার  ওপর তোমার রাগ নেই।’
জয়ের একবার রাগ হলে কমতে সময় লাগে, চট করে নামে না। এখনও যথেষ্ট রাগ আছে। এ মুহুর্তে পরিত্রাণের উপায় নেই দেখে মুখে বলল,
না নেই।

ইভা জয়কে ছেড়ে দিয়ে হাসি চাপল। লম্বা লম্বা পা ফেলে এ যেভাবে নিচে নামছে, উল্টে পড়বে না তো আবার? জয় হনহন করে নিজের রুমে যাচ্ছিল। মা পথ আগলে বললেন, ‘তোর চোখ-মুখ লাল কেন রে, জ্বর-টর নাকি?’
জয় থমথমে গলায় বলল, ‘না।’
‘না কি রে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে একশো দুই ডিগ্রী জ্বর।’
‘একশো দুই ডিগ্রী জ্বর, তুমি কি থার্মোমিটার?’
ইভা নিরীহ মুখে বলল, ‘মা, থার্মোমিটার নিয়ে আসব?’
মা বললেন, ‘আমার কথা বিশ্বাস না হলে থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখ, পরীক্ষা হয়ে যাক।’
জয় মুখ আরও অন্ধকার করে বলল, ‘পরীক্ষার প্রয়োজন নাই।’
‘দেখলে তো অসুবিধা নাই। যাও তো, বৌমা, থার্মোমিটার নিয়ে আসো।’

জয় হুঙ্কার দিল, ‘মা, আমি কিন্তু ওটা মট্‌ করে দু’টুকরা করে ফেলব।’
‘বুঝেছি, জ্বর তোর মাথায় উঠে গেছে। আয় তোর মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালি। জানো, বৌমা, এই এটটুকুন যখন ছিল, ওর খুব জ্বর হলো। কি যে ভয় করছিল। তখন ওর সমস্ত কাপড় খুলে শরীরে স্পন্জ-’
জয় চেঁচিয়ে বলল, ‘মা-মা, তুমি বাইরের লোকের সামনে আমার সম্বন্ধে যা তা বলো, এর মানে কি! পাইছটা কী!
জয়ের মা হাসি চাপলেন, ‘এ বাইরের লোক!’

জয় এর উত্তর না দিয়ে রুমে ঢুকে দরজা আছড়ে মারল। ভেতর থেকে ধুপধাপ শব্দ ভেসে আসছে। কি যেন একটা ফেলে দেয়ায় ঝনঝন শব্দ হচ্ছে।
জয়ের মা বিরক্ত গলায় বললেন, ‘এই হলো আমার ছেলে।’
ইভা অল্প সময়ে অনেক কিছুই দেখল। শাশুড়ীর গলা শুনে বিভ্রান্ত হওয়ার অবকাশ নেই। এই মহিলার চোখে ঝরে পড়ছে ছেলের জন্যে পৃথিবীর সমস্ত মমতা। কী অসম্ভব সুন্দর একটা দৃশ্য!


জয়ের রাগ কমা দূরে থাক উত্তরোত্তর বাড়ছে। ও দেখতে ভাল না এটা যে জানে না এমন না, জানে। ও বাঁশগাছ, চশমা ছাড়া কিছুই দেখে না, ভাল করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, মানুষকে আকর্ষণ করার মত কোন গুণ ওর মাঝে নেই। এতে ওর কি হাত? আর ইভা এসবই দেখল! মুখের ওপর দুম করে বলে দিল, তোমাকে পছন্দ-অপছন্দ করতে দায় পড়ে নেই, কিছুই যায় আসে না!
ইভা পরীর মত সুন্দর বলেই কি এভাবে বলতে পারল? ওর সঙ্গে বিয়ে হয়ে মনে হয় খুব যন্ত্রণায় আছে। এতই যখন অপছন্দ ওকে বিয়ে না করলেই হত। ও তো আর বলেনি বাঁশগাছ বিয়ে করো, নইলে ত্রিশতলা থেকে ঝাঁপ দেব। সিগারেট ধরিয়ে এক দু’টা টান দিয়েই নিভিয়ে ফেলল। নিভিয়েই ক্ষান্ত হলো না দুমড়ে-মুচড়ে পিষে ফেলল। এটাও পছন্দ হলো না। উঠিয়ে কুটি কুটি করে ফেলল।
খুঁজে রকওয়েলের ‘নাইফ’ বের করল। এটা ওর প্রিয় গান। প্রত্যেকবার শোনার সময় নতুন মনে হয়। মনটা অন্য রকম হয়ে যায়।


আড়চোখে ইভাকে ঢুকতে দেখে চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইল। ইভা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাটের মাঝখানে বসে পা দোলাতে লাগল। আশ্চর্য কী নির্বিকার ভঙ্গিতেই না পা নাচাচ্ছে! জয় অবাক হয়ে ভাবল, পাশের কেউ পা নাড়ালে ও অসম্ভব বিরক্ত হয়। চড় দিতে ইচ্ছা করে। এখন তো মোটেও খারাপ লাগছে না, সমস্যাটা কি! কেমন টুং টুং শব্দ হচ্ছে। মুখ নিচু করে রেখেছিল বলেই উৎসটা ধরতে পারছে না। মুখ তুললে আবার মান থাকে না। মাথা যথাসম্ভব না নাড়িয়ে লুকিয়ে দেখল ইভার ফর্সা দু’হাতে টকটকে লাল কাঁচের চুড়ি। অবাক কান্ড, চুড়ি কখন পরল!
ইভা পা নাচানোর বেগ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এসব সাজ-পোশাক তাহলে খুলে ফেলি?

জয় চোখ তুলে থমথমে মুখে বলল, ‘আমাকে বলছ কেন?’
আরে এ দেখি সাজগোজ করে আছে, কি চমৎকারই না দেখাচ্ছে! তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে দেখে কেমন লজ্জা-লজ্জা লাগছে।
ইভা বলল, ‘বললে না বাবারও ওখানে নিয়ে যাবে। আমিও কি বোকা, সত্যি ভেবে সেই কখন থেকে কাপড় বসে আছি।’
‘তোমার ভাবভঙ্গি দেখে তো মনে হচ্ছে না। ’
জয় ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমার ভাবভঙ্গি নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন দেখি না। বেশ বুঝতে পারছি আমাকে বিয়ে করে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছ।’
ইভা হাসি চাপল। এ মুহুর্তে হেসে ফেললে অনর্থ হয়ে যাবে। কেমন গাল ফুলিয়ে বসে আছে, অবিকল শিশুর মত দেখাচ্ছে। ইভা অনেক কথাই বলতে চেয়েছিল কিছুই বলতে পারল না।
বেরুবার সময় ইতস্তত করে বলল, ‘তুমি কি এ-ই পরে যাবে? ’
‘এই, এই মানে কি?’
‘বলছিলাম, কাপড় পাল্টে নিলে ভাল হতো না।’
‘কেন, স্যুট টাই পরে যেতে হবে? এসব পরে গেলে তোমার খুব অসুবিধা হবে, মান থাকবে না। আমাকে আরও খারাপ দেখাবে, এই তো?’
‘না বলছিলাম-।’
জয় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘আমার যা খুশি তাই পরে যাব। ইচ্ছে হলে হাফপ্যান্ট পরব। চিকন চিকন ঠ্যাং বেরিয়ে থাকবে, থাকুক, হু’জ কেয়ার।’


স্কুটার ঝড়ের গতিতে এগুচ্ছে। ইভার মন ভার হয়ে আছে। এ একহাত দূরে কেমন জড়সড় হয়ে বসে আছে ও। পুরো ম্যাচ শেষ করে বাতাস বাঁচিয়ে সিগারেট ধরাল। ইভা মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই আস্ত সিগারেটটা ফেলে দিল। ও এটা কেন করল কে জানে? সিগারেটের ধোঁয়ায় ওর কষ্ট হবে ভেবে? ইভা চোখে জল নিয়ে ভাবল মানুষটা পাগলাটে হলেও এর মনটা নরোম। অন্যকিছু ভাবার চেষ্টা করল, সোডিয়াম লাইটের জঘন্য আলোয় দেখল, ড্রাইভারের পেছনের বোর্ডে লেখা: 
"আজনবি পরিবহন।
চালোক নন্নু মিঞা।
শারি ওড়না
সাবদান।"

নান্নু মিঞা কেবল এটুকু লিখেই ক্ষান্ত হয়নি। সাবধান এর নিচে দু’টা হাড়, একটা খুলি এঁকে দিয়েছে। হাড় না কি এটা অবশ্য আন্দাজ করে নিতে হয়। কেমন লাউয়ের মত দেখাচ্ছে!
ইভার বুক থেকে পাষাণ ভার নেমে গেল। স্কুটার থেকে নামার সময় ঝলমলে মুখে বলল, ‘আবার দেখা হবে, নান্নু ভাই।’
লোকটা বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে রইল, তাজ্জবের কথা, আফায় নাম জানল কেমনে!


*কনক পুরুষ: http://tinyurl.com/29uf4sq

Sunday, July 25, 2010

জিরো ক্রেডিট: ১

পড়শী ফাউন্ডেশনের যন্ত্রণার শেষ নেই, আমাকে সামাল দিতে এদের বড়ো বেগ পেতে হচ্ছে। আমার একের পর এক আইডিয়া বাস্তবায়নের পেছনে যে টাকা খরচ হচ্ছে এর যোগান দেয়াটা এদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে।

'ন্যানো ক্রেডিট' নিয়ে কিছু কাজ করেছিলাম [১] [২] [৩] [৪]। এখানে ইনভেস্ট হয়েছে সাড়ে চার হাজার টাকা, এক মাসের লিমিট আবার পাঁচ হাজার টাকা। এই মাসের লিমিট ইতিমধ্যে প্রায় খরচ হয়ে গেছে। এই খাতে হাতে রয়ে গিয়েছিল পাঁচশ টাকা। আমি ভেবে দেখলাম, এই টাকায় তো আর ন্যানো ক্রেডিট চলবে না। তো, 'জিরো ক্রেডিট' চালু করে দিলাম।
জিরো ক্রেডিট নামটা দেখে হোঁচট খাওয়ার কথা। জিরো তো জিরো, জিরো সংখ্যাটা নেয়ার জন্য কে মুখিয়ে থাকবে। থাকবে-থাকবে, কারণ এই টাকার অংকটা পাঁচশ। যেহেতু ফেরত দেয়ার বালাই নেই তাই 'জিরো ক্রেডিট'।

পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম, পড়শী ফাউন্ডেশন থেকে আমাকে কিছু ক্রাচ দেয়া হয়েছিল। বেশ কজনকেই ক্রাচ দেয়া হয়েছিল।

এদের মধ্যে একজন, জাহাঙ্গীর আলম নামের একটা পা নেই এমন এক ভিক্ষুককে দেখতাম রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করতে। তার সাথে যে ক্রাচটা দেখতাম ওটা ছিল নড়বড়ে। তাকে একটা ক্রাচ দেয়া হয়েছিল।
জিজ্ঞেস করে জানা গেল, এই মানুষটা আগে হকারি করতেন, বাসে চানাচুর-টানাচুর বেচতেন। একদিন চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যান, পা কাটা পড়ে, কোমরেও চোট পান। আমি ভেবে দেখলাম, মানুষটার পুর্বে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা আছে।

আমি বললাম, আপনে যে ভিক্ষা করেন এইটায় তো ইজ্জত নাই।
মানুষটার সাফ উত্তর, কি করুম?
ব্যবসা করেন।
টেকা পামু কই?
টাকা পেলে ব্যবসা করবেন?
মানুষটার উৎসাহের শেষ নেই।
আমি আবারও বলি, আপনাকে পাঁচশ টাকার কাপড় কিনে দেয়া হবে। এটা আপনাকে ফেরত দিতে হবে না। আপনি আস্তে আস্তে পুঁজি বাড়িয়ে ব্যবসা করবেন। পারবেন না?
হ। খুব পারুম।

প্রথমে অবশ্য ভাবা হয়েছিল কলা-টলা বিক্রি করার জন্য কিন্তু পায়ের সমস্যার কারণে কলার ভারী টুকরি টানতে সমস্যা হবে বিধায় এটা বাদ দেয়া হয়েছিল। পরে তাই ঠিক হলো, কাপড়ের ব্যবসা।
নিয়মিত হাট করেন এমন একজনকে অনুরোধ করে পাঁচশ টাকার কাপড় এনে দেয়া হয়েছিল। কাপড় কিন্তু কম না! বাচ্চাদের কিছু ছোট প্যান্টের দাম পড়েছে সাড়ে তিন টাকা করে। ভাবা যায়! যেটা অন্তত দশ-বারো টাকায় বিক্রি করা সম্ভব।

জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যখন আমার কথা চালাচালি হচ্ছিল তখন এক মহিলা, ইনিও খানিক দূরে বসে ভিক্ষা করেন, পায়ে সমস্যা আছে। আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনে বলে ওই বেডারে ইত্যাদি ইত্যাদি?
আমি বিরক্ত হয়ে বলি, হ। তা আপনার সমস্যা কি! 
মহিলার কোন সমস্যা নেই। হাসে।
কাহিনী পরে জানা গেল, যখন জাহাঙ্গীর আলমকে কাপড়ের গাঁটরি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আসতে বলেছি।

ওমা, ওই মহিলা দেখি জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একই রিকশায় উঠতে চেষ্টা করছেন। আমি অবাক হয়ে বলি, আপনি কেন?
জাহাঙ্গীর আলমের লাজুক গলা, হে আমার পরিবার।
ওয়াল্লা, এই তাহলে কাহিনী। ইনি জাহাঙ্গীর আলমের ইস্তারি সাহেবা! বেশ-বেশ।

জাহাঙ্গীর আলমকে বিদায় করে দেয়ার পর যে মানুষটা হাট থেকে কাপড় কিনে এনে দিয়েছিলেন তিনি বলছিলেন, হে কাপড়ের গাট্টি লইয়া ভাইগা যাইব।
আমি বললাম, গেলে যাইব। কী হাতি-ঘোড়া নিয়া ভাগব!

তখন মনে ছিল না, এখন মনে মনে হাসছি। আর কিছু না-হোক অন্তত এই দু-জন আমার দু-চোখ যেদিকে যায় সেদিক পর্যন্ত আর যাই হোক ভিক্ষা করবেন না। রাস্তার পাশে বসে থাকা, কাটা পা নাড়াতে থাকা দু-জন ভিক্ষুক এখান থেকে উধাও হলো এটাই বা কম কী! অন্য কোথাও গিয়ে বসবে? বসুক না, সেটা সেখানকার লোকজনের সমস্যা; আমার কী! হা হা হা।

সহায়ক লিংক: 
১. মালতি রানি সাহা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_14.html 
২. মন মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_4248.html 
৩. রুবিনা আক্তার: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3561.html 
৪. জোহরা বেগম: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_18.html    

Saturday, July 24, 2010

আমাদের চাঁদে যাওয়া আটকাচ্ছে কে?

পত্রিকায় ঘটা করে বেরিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন (১৮ জুলাই, ২০১০), "দেশের স্কুলগুলোতে মনস্তত্ত্ববিদ থাকা দরকার।...তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্কুলে মনস্তত্ত্ববিদ নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন"।

খুবই আনন্দের বিষয়। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের জন্য, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং অটিস্টিক শিশুদের জন্য এটা একটা অসাধারণ উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই।
তবে ছোট্ট একটা কিন্তু আছে, তাঁর বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, দেশে মনস্তত্ত্ববিদে গিজগিজ করছে। হাটে-বাজারে, বাইরে বেরুলেই দু-চারজন মনস্তত্ত্ববিদের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাবে। 
আমার ধারণা ভুল হতে পারে কিন্তু অতি উন্নত দেশগুলোর সমস্ত স্কুলে মনস্তত্ত্ববিদ আছে কি না এতে আমার খানিক সন্দেহ আছে। কারণ হালি-হালি মনস্তত্ত্ববিদ পয়দা হয় না। এটা এমন এক জটিল বিজ্ঞান, যার কাজ হচ্ছে এই গ্রহের সবচেয়ে জটিল একটা বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো। যার চালু নাম মস্তিষ্ক, এক নিতল কুয়া- যেখানে তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। যেখানে খেলা করে আলো-আধার। একটু এদিক-সেদিক হলেই কেবল অন্ধকার, নিকষ অন্ধকার।

আমাদের দেশে মনস্তত্ত্ববিদ জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেই নাই। সমস্ত মেডিকাল কলেজে আছে এতেই আমার সন্দেহ আছে। এই দেশে আদৌ মনস্তত্ত্ববিদ আছে কি না এ নিয়েও আমার ঘোর সন্দেহ আছে। সন্দেহের বীজটা কোত্থেকে আসল একটু বলি, 
হুমায়ূন আহমেদ শিলালিপিতে (২৮ মে, ২০১০) লিখেছেন, "সাইকিয়াট্রিস্ট এবং লেখিকা আনোয়ারা সৈয়দ হক আমি ডিজোপেন খাই শুনে আঁতকে উঠে বলেছিলেন, এটা তো পাগলের ওষুধ। আপনি পাগলের ওষুধ খাচ্ছেন কেন?"
'পাগলের ওষুধ'? একজন মনস্তত্ত্ববিদ যখন পাগলের ওষুধ, পাগল, পাগলের ডাক্তার এই সব বলেন তখন তিনি যে একজন সাইকিয়ট্রিস্ট না এটা জানার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না। হয়তো তাঁর কাছে ডিগ্রি নামের একটা কাগজ আছে কিন্তু মানুষটার মনস্তত্ত্ব শিক্ষায় গলদ আছে। 
আর এটাই বা আমি কেমন করে ধরে নেই আনোয়ারা সৈয়দ হক এটা বলেননি! হুমায়ূন আহমেদের মত একজন লেখক যেখানে বলছেন! আবার লিখেও জানাচ্ছেন!

এই দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতে বাচ্চাদের যেসব বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় এতেও স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় দেশে কোন মনোবিদ-মনস্তত্ত্ববিদ নাই। 'ডানো' নামের একটা দুধ কোম্পানি একটা বিজ্ঞাপন নিয়ম করে দেখাত। এই দুধ খেয়ে বাচ্চারা এমন 'তনদুরুস্ত'-বলশালী হয়, উঁচু গাছ থেকে ছাতা নিয়ে লাফ দেয় [১]
আরেকটা দুধের বিজ্ঞাপন দেখায় 'এলডোরা' (নামটা সম্ভবত এটাই)। বেতমিজ টাইপের বাচ্চাটাকে ভাত-রুটি, ফল-মূল যা দেয়া হয়, সে বলে, থু! এরপর ওই কোম্পানির দুধ খাওয়ার পর বেতমিজ বাচ্চাটার বেতমিজ মা-বাবা বলে, বাবা, দেখো চাঁদ। বেতমিজ বাচ্চা বলে, খাব।
মূল বিষয় হচ্ছে এই কোম্পানির দুধ খেয়ে বাচ্চার বেতমিজ স্টমাক এমন দুর্ধর্ষ হয়েছে সে চাঁদও খেয়ে ফেলতে আগ্রহী।
বেতমিজ মিডিয়া হরদম এগুলো দেখিয়েই যাচ্ছে।

ডা. মোহিত কামাল নামের একজন মনস্তত্ত্ববিদ আছেন, তিনি আবার লেখকও বটে। আমরা জানি তিনি তাঁর বইগুলো নিজেই লিখেন এবং তাঁর বইয়ের বিজ্ঞাপনও নিজেই দেন। লক্ষ-লক্ষ টাকা ব্যয়ে বইমেলায় তাঁর বইয়ের যে বিজ্ঞাপনগুলো ছাপা হয় পূর্ণ পৃষ্ঠা, অর্ধ পৃষ্ঠা ব্যাপি; এটা প্রকাশক দেন বললে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে হবে। এটা তিনি সম্ভবত শিখেছেন সাহিত্য-গুরু আনিসুল হকের কাছ থেকে [২]
তো, ডা. মোহিত কামাল একজন মনস্তত্ত্ববিদ, লেখক- কই, তাঁকে তো দেখলাম না এই সব ভয়াবহ বিজ্ঞাপন যা শিশুদের, শিশুদের বাবা-মার ভুবন এলোমেলো করে দিচ্ছে এটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে। নাকি মাদক বিরোধী আন্দোলন করতে জোশ বেশী কারণ প্রথম আলোর মত মিডিয়ার কাভারেজ পাওয়া যায় বলে?

যাগ গে, মূল বিষয়ে ফিরে যাই, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্কুলে মনস্তত্ত্ববিদ নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন। মন্ত্রী বাহাদুররা যখন কোন কথা বলেন এই কথার পেছনে কতটুকু বাস্তবতা আছে তা যে যাচাই করেন না এটা একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ! 
দেশের স্কুলগুলোতে মনস্তত্ত্ববিদ থাকা দরকার। মনে হচ্ছে, দেশে গন্ডায়-গন্ডায় মনস্তত্ত্ববিদ বেকার বসে আছে কেবল ধরে এনে এখানে বসিয়ে দেয়ার অপেক্ষা। এমন যদি কেউ বলেন, আমাদের চাঁদে যাওয়া দরকার এটা বলতেই পারেন। বললে আটকাচ্ছে কে! 

সহায়ক লিংক:
১. শিশু হত্যার মারণাস্ত্র: http://www.ali-mahmed.com/2008/09/blog-post_22.html
২. একটি আদর্শ বইয়ের বিজ্ঞাপনের নমুনা: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_21.html

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুলের প্রথম দিন

ছোট-ছোট স্বপ্নের [১] একটা অংশ এই ইশকুল। ইশকুলের সময় ৫টা থেকে ৬টা। ইচ্ছা করেই সময়টা কম রাখা হয়েছে কারণ দীর্ঘ সময়ে বাচ্চারা বিরক্ত হবে। একবার পড়ায় এদের অনীহা এলে ধরে রাখা মুশকিল।

ইশকুলের আজ (২৩ জুলাই, ২০১০) প্রথম দিন। আজ আমার যাওয়ার কথা না। কী করব, আমার চেয়ে লোকজনের উৎসাহ প্রবল, বাইক-বয় ২০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে এসে হাজির। যেতে হয়, ভালই হলো।
আমার ধারণা ছিল, এলোমেলো একটা অবস্থা থাকবে। তেমন কাউকেই পাওয়া যাবে না। ধারণা করি, কাঁটায়-কাঁটায় পাঁচটায় ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে। আমরা গেছি ১০ মিনিট পর। ছাত্র আরও ৩জন বেড়েছে। সব মিলিয়ে হলো ২৩ জন। আজ পেয়েছি ২০ জনকে।

হরিজন পল্লীতে যেটা করতাম, বসি বাচ্চাদের সঙ্গে মাদুরে। টিচার নামের পিচ্চি মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছিল।

তাকে নিষেধ করলাম। এই মেয়ে, তোমাকে কাল কি বলেছিলাম, বাচ্চাদের কাছে আমি যেটা চাইছি, এরা ভাবতে শিখুক এখানে টিচারের উপর কেউ নেই। টিচারের সংকোচ কাটাতে বেগ পেতে হয়।  
আক্ষরিক অর্থেই আমি অভিভূত! আজ গিয়ে দেখি, গতকাল বলে আসা অনেক কাজ এরা করে ফেলেছে। বাচ্চাদের হাতের নোখ ছোট, দাঁত পরিষ্কার। 
টিচারকে জিজ্ঞেস করছিলাম, বাচ্চাদের জন্য আর কি যোগ করা যায়? বাচ্চারা আমাকে শেখায়, বাথরুম থেকে বের হয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়।
আমি বলি, সাবান না পাইলে কি করবা?
বাচ্চারা চিন্তায় পড়ে যায়।
আমি বলি, সাবান না পাইলে ছাই। আবারও বলি, ছাই না পাইলে?
বাচ্চারা আবারও চিন্তিত। আমি বলি, ছাই না পাইলে মাটি।

সাথে নেয়া চকলেট সবগুলো রেখে এদের বলি, প্রত্যেকে একটা কইরা নিবা। যে দুইটা নিবা সে চোর। 
বাড়তি একটা চকলেট টিচারের জন্য থাকার কথা। আমাকে অবাক করে দিয়ে টিচারের জন্য একটা চকলেট থেকে যায়। হরিজন পল্লীর সঙ্গে এদের ফারাকটা আকাশ-পাতাল। ওখানকার বাচ্চাদের এটাই শেখাতে আমার প্রায় দু-মাস লেগেছে!

রাজা-রানি-রাজকুমার-দুষ্ট-স্কুলের ফাঁকিবাজি-টিচার, বাবা, মার কথা না শোনা-মিথ্যাবাদি-চোর-আল্লাহর শাস্তি-কাক এই রূপকথাটা [২] বলার পর গল্পটা এরা ভালই মনে রাখতে পেরেছে। গল্পের মূল বিষয়টাও চট করে ধরতে পেরেছে। এখন আমার স্থির বিশ্বাস এই বাচ্চারা অনেক অনেক ভালো করবে। 
এবং এটাও আমি মনে করি, হরিজন পল্লীর জন্য যে টিচার রাখা হয়েছে ওই টিচার থেকে ক্লাশ এইট পড়ুয়া এই পিচ্চি মেয়েটা অনেক ভালো করবে। অথচ ওই টিচার প্রফেশনাল, বাচ্চা পড়ানোই ওনার কাজ, সমস্তটা দিন এটাই তিনি করেন। তারপরও আমি ঠিক কি চাচ্ছি এটা সম্ভবত তিনি এখনো ধরতে পারেননি। অথচ এই মেয়েটা চট করে ধরে ফেলেছে। যার নমুনা আমি আজ দেখলাম।

গতকাল এদের যে ছবিগুলো উঠিয়েছিলাম আজ ল্যাপটপে ওই ছবিগুলো দেখিয়ে বলি, তোমরা এখানে কারা কারা আছো খুঁজে দেখো তো। একেকজন নিজেদের খুঁজে পায়, উল্লাসের চিহ্ন ছড়িয়ে পড়ে চোখে-মুখে। নার্গিস নামের মেয়েটি অতি উৎসাহে বলে, আমারটাও দেখব।
আমার মনটা গভীর বিষাদে ছেয়ে যায়। সবার মধ্যে কেবল এই মেয়েটিই চোখে দেখতে পায় না। আমি বিষাদ চেপে তাকে মিথ্যা বলি, তুমি দেখবা কিন্তু এখন তো দেখতে পারবা না। নীচুস্বরে শিখিয়ে অন্যদেরকে  বলি, এই তোমরা বলো নার্গিসের ছবি কেমন এসেছে। সবাই সমস্বরে বলে, সুন্দর। আমি আবারও বলি, কত সুন্দর? ওরা এবার উচুস্বরে বলে, অনেক সুন্দর। নার্গিসের মুখ হাসিতে ভরে যায়।
জানি না হয়তো মনটা ভারী বিষণ্ন ছিল কি না, নার্গিস নামের এই অভাগা মেয়েটার হাসিমাখা ছবি উঠাতে মনে থাকেনি, মনে থাকলে ভাল হতো। খুব ইচ্ছা করছে এই অভাগা মেয়েটার হাসিটা দেখতে...।

সহায়ক লিংক:
১. স্বপ্ন: http://tinyurl.com/3y7bpz3
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_22.html   

Friday, July 23, 2010

হক-কথা এবং ভাসানী: ১

মওলানা ভাসানী [১] নামের মানুষটা যে কী সহজ-সরল জীবন-যাপন করতেন তা এই ছবিটা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। তৈজসপত্র, রান্নার আয়োজনের নমুনা...।

অনেকে এই মানুষটাকে গুরুত্ব দিতে চান না কারণ মানুষটার মধ্যে নাকি তথাকথিত নেতাসুলভ ক্যারিশমা নাই, ছিল না নাকি (এটা আমাদের বিশেষ একটা দলের পান্ডাদের কথা, না-হক কথা)! আরে, থাকবে কেমন করে রে ব্যাটা? যে মানুষটা স্ত্রী অসুস্থ বলে চোঙ্গা ফুঁকে ফুঁকে রান্না করেন তার মধ্যে সেই জৌলুশ, দবদবা কই!
তাই মিডিয়ায়ও তাঁকে নিয়ে মাতামাতি নাই [২]। ফাঁকতালে হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষ 'মাতাল হাওয়া' লিখে মাতলামি করেন [৩] মওলানা ভাসানীকে নিয়ে যা খুশী তাই লেখেন!

কিন্তু ব্রিটিশদের (১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের আগে বাংলা এবং আসামের ব্রিটিশ বিরোধী গণজাগরণ) যেমন নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন তেমনি পাক-জান্তাদের। তিনি বাংলাদেশ হওয়ার পরও কাউকে ছাড় দেননি। 'হক-কথা' নামে একটা সাপ্তাহিত প্রকাশ হতো যেটা ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ হয়। হক-কথার প্রকাশক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। 'সংবিধানের ভারত সফর'' ৩০ জুন, ১৯৭২ সালের 'হক-কথা' থেকে হুবহু তুলে দেয়া হলো: 

"সংবিধানের ভারত সফর
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দলিল আওয়ামী সরকার প্রণীত খসড়া সংবিধান বা শাসনতন্ত্র সম্প্রতি দিল্লী সফরে গেছে। 'শুভেচ্ছা' সফরে নয়- সংবিধানের এ সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মুরব্বীদের কাছে আত্মপ্রকাশের অনুমতি প্রার্থনা।
আইন ও পার্লামেন্টারী দফতরের মন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন খসড়া শাসনতন্ত্র বহন করে নিয়ে গেছেন। দিল্লীতে ইন্দিরা কংগ্রেসের বিশেষজ্ঞরা এখন এটি পরীক্ষা করে দেখছেন। ইতিপূর্বে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনাও 'ভারত সফর' করে স্বদেশে ফিরে এসেছে।

সংবিধান বা শাসনতন্ত্র একটি দেশের জনগণের, সেই দেশের সরকারের অধিকার ও ক্ষমতার একটি পবিত্র দলিল। রাষ্ট্রের জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকে এ দলিলে। সুতরাং শাসনতন্ত্রে কি হচ্ছে জনগণেরই তা জানার হক সর্বাগ্রে এবং ষোল আনা। কিন্তু স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে জনগণ এ হক থেকে যেন বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকার খসড়া সংবিধান জনগণের নিকট প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কয়েকদিন আগেই। কিন্তু দিল্লীর মুরব্বীরা যদি রুষ্ঠ হন, তাই জনগণের নিকট প্রকাশ করার আগেই তা দিল্লীতে নিয়ে গেছেন আইনমন্ত্রী স্বয়ং। সেখানে তিনি সংবিধানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে কংগ্রেসী নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনাও করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে।

সংবিধান প্রণীত হচ্ছে জনগণের জন্য, বাংলাদেশের জনগণের জন্য। দিল্লীতে আলোচনার আগে বাংলাদেশের ক'জন রাজনৈতিক নেতার সাথে বা সংবিধান বিশেষজ্ঞের সাথে সরকার আলাপ করেছেন? বর্তমান প্রেক্ষিতে জনগণের এ একটি অতি সঙ্গত জিজ্ঞাসা।
...
স্মরণ করা যেতে পারে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনাও ইতিপূর্বে দিল্লীতেই আলোচিত এবং মূলতঃ বিবেচিত হয়েছে। ৫৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহনের খবর বাংলাদেশের রাজধানী থেকে প্রচার করা হয়নি- হয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লী থেকে। বলাবাহুল্য সে ক্ষেত্রেও একই বিব্রত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। 
আর তাই অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ঐ খবরের প্রতিবাদ করে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাংলাদেশেই প্রণীত হবে।। এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন তা দিল্লী গিয়েছিল কেমন করে এবং কেন? ইন্দিরা কংগ্রেসের অনুমতি প্রার্থনার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিহিত নেই তো?"

ছবি-স্বত্ব: রশীদ তালুকদার

সহায়ক লিংক:
১. মওলানা ভাসানীর স্বাধীনতা ঘোষণা: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_372.html 
২. মিডিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_17.html 
৩. হুমায়ূন আহমেদের মাতলামি: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_6179.html

Thursday, July 22, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, আজ থেকে

রমজান মিয়ার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল [১] তখন হাতে যে বই দেখেছিলাম তার বাচ্চার জন্য, আজ এখানে বাপ-ব্যাটাকে পেয়ে যাই।

আমার বিস্ময়ের সীমা নেই, এরা ঠিক-ঠিক কথা রেখেছেন। বলেছিলাম, একটা স্কুল-ঘরের ব্যবস্থা করার জন্য। সেই ব্যবস্থা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছিল একজন টিচার ঠিক করার জন্য। সেটাও হয়েছে। ভাল রকমই হয়েছে।
এখানে খানিকটা জটিলতা ছিল কারণ এঁরা যেখানে থাকেন এটা প্রায় দুর্গম একটা জায়গা! জায়গাটা চিনে আমার পক্ষে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিল। ডানে-বায়ে-সামনে-পেছনে অনেক হ্যাপা। আবারও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন 'বাইক-বয়'। তিনি ঝড়ের গতিতে বাইক উড়িয়ে নিয়ে যান, পেছনে আমি আপ্রাণ চেষ্টায় ঝুলে থাকি।

তো, টিচারের যে সমস্যাটা ছিল সেটা এমন, আমাদের এখান থেকে একজনের পক্ষে ওখানে গিয়ে পড়িয়ে আসাটা কঠিন। আসতে যেতেই ম্যালা টাকা খরচ হবে। 
সালমা নামের এঁদেরই একটা মেয়ে পড়ে ক্লাশ এইটে। যে পূর্বে থেকেই এখানকার দু-একজন বাচ্চাকে পড়িয়েছে। এই মেয়েটা পড়ালে বাড়তি সুবিধা যেটা পাওয়া যাবে, বাইরে থেকে টিচার আনার ঝামেলাটা থাকল না, এঁদের নিজেদের লোকজনরাই পড়াবে এবং এঁদেরই একটা পরিবারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা হলো।
টিচারকে আমি একটা গাইড-লাইনও দিয়ে এসেছি, পড়ার পাশাপাশি যেটা লক্ষ রাখবে বাচ্চাদের হাতের নোখ ছোট, দাঁত পরিষ্কার, খাওয়ার আগে হাত ধোয় কি না ইত্যাদি। এখানকার লোকজনের একটা কঠিন আবদার, বাচ্চারা আরবিও পড়বে। সমস্যা নাই, সপ্তাহে ২দিন আরবি পড়বে।

মাঝেমধ্যে গল্পও বলা হবে। আমার বানানো একটা গল্প আছে, যেটা আমি হরিজন পল্লীতে বাচ্চাদের শুনিয়েছি। সহজ-সরল একটা গল্প। এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার একটা রানি ছিল। রাজকুমার, তাদের একটা ছেলেও ছিল। রাজকুমার ছিল খুব দুষ্টু। সে স্কুলে যেত না। টিচার, বাবা-মার কথা শুনত না, মিথ্যা বলত, চুরি করত। একদিন ভগবান তার উপর খুব রাগ করলেন। রাজকুমারের গায়ের রঙ কালো হয়ে গেল, সে কাক হয়ে গেল। 
সে কাক হয়ে গেল, গল্পের এখানে আসলেই হরিজন পল্লীর বাচ্চারা শব্দ করে বলে, কা-কা-কা। এটা কেউ এদের শিখিয়ে দেয়নি, এরা নিজে থেকেই বলে। আমি হাসি চাপি।
তো, এখানেও এই গল্প দিয়েই শুরু হবে। হুবহু এটাই বলা হবে, কেবল ভগবানের জায়গায় আল্লাহ হবে। 

এখানে আপাতত ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল ২০ জন। ১৯ জনকে এখানেই পেয়েছি, ১জন আজ ছিল না। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান এঁরা, চোখে দেখতে পান না। আহারে-আহারে, একটা মানুষগুলোর দিনরাত নেই, কেবলই রাত! চারপাশে থইথই চাঁদের আলো অথচ সব নিকষ অন্ধকার।
এখানে এখন থাকেন প্রায় ২০টা পরিবার, সবাই পেশায় ভিক্ষুক। এঁদের কেউই চোখে দেখতে পান না কিন্তু তাঁদের সন্তানদের কোন সমস্যা নেই। কেবল একটা বাচ্চাকে পেয়েছি যে চোখে দেখতে পায় না। ব্রেইল পদ্ধতিতে আপাতত শেখাবার কোন ব্যবস্থা এখানে নাই কিন্তু ওই বাচ্চাটার বিপুল আগ্রহ। সে তার টিচারকে বাধ্য করেছে একটা বইয়ে তার নাম লিখে দিতে; এটা তার বই, কেউ হাত লাগাতে পারবে না :)।
এ আপাতত মুখস্ত পড়া পড়ুক। অন্তত স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সমানতালে চলার ভাবনাটা তার মধ্যে কাজ করুক।
(পেছনের টিনের ঘরটা এদের ইশকুল)। এঁদের যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে সেটা হচ্ছে, এঁরা কেউই চান না তাঁদের সন্তানরাও ভিক্ষুক পেশায় আসুক। এটা এঁদের স্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্ন এবং বাস্তবের মধ্যে ফারাক খুব একটা নাই। এও বিশ্বাস করি, সবাই স্বপ্ন দেখতে পারেন না, এঁরা পেরেছেন।

একদল স্বপ্নবাজদের কাছ থেকে তীব্র ভাল লাগা নিয়ে আমি যখন ফিরে আসছি মাঝপথে এই মানুষটাকে পাই, রাস্তার পাশে। এমন তো আমরা আকসার দেখি কিন্তু এই বৃদ্ধার মধ্যে এমন একটা হাহাকার, নিঃস্ব ভঙ্গি ছিল যে কষ্টটা আমাকে এখনও তাড়া করছে- সমস্ত ভাল লাগা উবে গেছে আমার। বুকে একটা ধাক্কার মতো এসে লাগে। কখনও কখনও নিজেকে বড়ো ক্ষুদ্র-নিঃস্ব-অসহায়-কাতর লাগে। আমার ভাল লাগছে না, ভাল লাগছে না আমার...

:কৃতজ্ঞতা:
আর্থিক সহায়তা: পড়শী ফাউন্ডেশন
লজিস্টিক সাপোর্ট: ফাহমি আজিজ

সহায়ক লিংক:
১. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html
২. হরিজন পল্লীর ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html 

Wednesday, July 21, 2010

টাকা পেলে আমরা সব বেচে দেব...

সুরুয মিয়ার পরিবারের [১] সঙ্গে আমি যোগাযোগ করে উঠতে পারছিলাম না। দোষটা সবটা আমার না, পূর্বে যাদেরকে নিয়ে আমি গিয়েছিলাম তারা সময় বের করতে পারছিলেন না। এই গ্রহে আমি ব্যতীত সবাই ভারী ব্যস্ত। 
আমি তো আবার লোকেশন মনে না রাখতে পারার জন্য কুখ্যাত, তার উপর জায়গাটা খানিকটা দূর্গম। এমনিতে আমাদের দেশে বিখ্যাত ব্যতীত অখ্যাত মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি জিগেস করে বের করা আর খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মধ্যে কোন ফারাক নাই! মুক্তিযোদ্ধা দুলা মিয়ার [২] বাড়ি বের করতে গিয়ে আমার কালঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল।

এই দেশে ট্রাক-ড্রাইভারের নামেও রাস্তার নামকরণ হয় কারণ তিনি বিরাট মুক্তিযোদ্ধা- যুদ্ধের সময় তিনি ট্রাক চালাতেন!  নাম ফলকে ভরে যায় রাস্তাঘাট!
কিন্তু এই সব প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে সড়কের নামকরণ দূরের কথা বাঁশের একটা খুঁটিও পাওয়া যায় না। এলাকার মানুষই চেনে না, এলাকার মানুষের বিশেষ আগ্রহও থাকে না কারণ আমাদের দয়াবান নেতাদের এতো সময় কোথায় এদের খোঁজ রাখার!

চকচকে একটা বাইক কিনেছেন এমন একজন, এই মানুষটাকে কাউবয় না বলে বলা যেতে পারে বাইক-বয়। কাউবয় যেমন ঘোড়ার পিঠে থাকতে পছন্দ করে তেমনি এই মানুষটাও বাইকের পিঠে। মানুষটা আমাকে কথা দেন যতক্ষণই লাগুক আমাকে ঠিক-ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেবেন। মানুষটা তাঁর কথা রাখেন। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

মুক্তিযোদ্ধা সুরুয মিয়া [৩], যিনি ২০০৫ সালের ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন যখন সমগ্র জাতি এই আনন্দের দিনটিকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। 
মানুষটা লাশ ১২ ঘন্টা গাছে ঝুলছিল, নামাতে দেয়া হয়নি! তাঁর জানাজা পড়া নিয়েও সমস্যা হয়েছিল। ক্ষমতাবানদের এতে ঘোর আপত্তি ছিল।
সুরুয মিয়ার পরিবারের বাসায় যেতে হয়নি রাস্তার পাশে মা-ছেলে, ছেলের নাম সেলিম মিয়াকে পেয়ে যাই। এঁরা একটা চার দোকান দিয়েছেন, দোকানে তেমন কিছুই নাই।

জেনে ভাল লাগে এরা এখন সরকার থেকে ভাতা পাওয়া শুরু করেছেন। ৬ মাসে ৯ হাজার করে ১৮ হাজার টাকা অর্থাৎ মাসে দেড় হাজার করে।
কিন্তু ভাতা পেতে গিয়ে এঁদের যে ত্যাগ করতে হয়েছে তার যে ভাষ্য শুনলাম এতে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলি! 
এই ১৮ হাজার টাকা উঠাতে এঁদেরকে ঋণ করে ১৯ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। যার চালু নাম ঘুষ। 
দোকান দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ঋণ শোধ করে হাতে কিছুই নাই! আপাতত দোকানে অল্প কিছু মাল-পত্র কেনার জন্য কিছু টাকা দেয়া হয়েছে।

প্রার্থনাস্থলে সব বিষয় নিয়েই জোশের সঙ্গে বলা হয়, বলা হয় না কেবল ঘুষ নিয়ে। কেন, কে জানে! এই দেশে ঘুষ নিয়ে মাথা ঘামাবার তেমন সময় কারও নেই! আমার মনে হয়, আমরা ঘুষ নামের টাকা পেলে করব না এমন কোন কাজ নেই। পারলে মাকেও বিক্রি করে দেব, তাঁর কিডনি-লিভার-ফুসফুস।


কৃতজ্ঞতা:
আর্থিক সহায়তা: পড়শী ফাউন্ডেশন
লজিস্টিক সাপোর্ট: ফাহমি আজিজ

সহায়ক লিংক:
১. সুরুয মিয়ার পরিবার: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_02.html
২. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_08.html
৩. সুরুয মিয়ার আত্মহত্যা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৪. দুলা মিয়ার মেয়ে: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html             

Tuesday, July 20, 2010

আমাদের পচন বনাম খেলা

এখনও বিদেশি পতাকা উড়ে পতপত করে (এটা গতকালের ছবি), আবেগ বলে কথা! 
অনেকে আমার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিশ্বকাপ নিয়ে কঠিন কিছু লেখা লেখার জন্য। এরা খানিকটা ভুল করছেন। আমার কিন্তু বিশ্বকাপের খেলা বা খেলা নিয়ে কোন আপত্তি নাই, আপত্তি হচ্ছে দানবীয় উম্মাদনা [১] নিয়ে।

আমি নিজেও খেলা পছন্দ করি। খেলা দেখতে দেখতে উত্তেজনায় হাতে দু-চারটা কিলও মেরে বসি। নিজের হাতেই মারি, অন্যের পিঠে না।

অনেকে আমার লেখার মূল সুরটা আসলে ধরতে পারেননি। আমার বক্তব্য ছিল, আমরা কেন কেবলি অন্যের চোখ দিয়েই স্বপ্ন দেখব? আমাদের কোন স্বপ্ন নাই! কেন আমরা এই স্বপ্নটা দেখতে পারছি না বিশ্বকাপে একদা আমরাও খেলব। এখুনি ঝাপিয়ে পড়ব মাঠে। খেলা নিয়ে আবেগ থাকুক না, এতে তো সমস্যা নাই কিন্তু এটা কদর্য ভঙ্গিতে কেন?
কেউ বিশ্বাস করবে, আমি একটা ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করতে পারছি না! প্রথমে আমাকে বলা হয়েছিল, আরে নাহ, খেলায় মারামারি হবে। এখন বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপ তো শ্যাষ, এখন কে খেলবে। আজব!

কী অবিশ্বাস্য, আমাদের এখন খেলার মাঠ নাই। যাও বা আছে দামাল ছেলেরা এখন আর এখানে লাফায় না। কেউ ফোন নিয়ে মেতে থাকে, দেশ কেমন এগুচ্ছে এর একটা নমুনা হলো দেশে সেল-ফোনের গ্রাহক এখন ৬ কোটি। কালে কালে শুনব ১৭ কোটি!
কেউ কফের সিরাপ খেয়ে নেশা করে ঝিমায়! 
আধুনিক স্কুল নামের রোবট বানাবার কারখানায়, ছেলেরা গারাজে কাগজ দিয়ে বল বানিয়ে লাফালাফি করে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, ম্যাচ-বাক্সের মত কংক্রিটের বস্তি [২]! আমি ভাবতেই শিউরে উঠি, ফার্মের মুরগির মত এই সব ফার্মের বাচ্চারা বড়ো হয়ে দৌড়াবে কেমন করে, রোবটের মত, নাকি ডান্ডাবেড়ি লাগানো কয়েদির মত?

কালের কন্ঠে উম্মুল ওয়ারা সুইটি চমৎকার একটা প্রতিবেদন করেছেন, 'ফিরিয়ে দাও খেলা'। আমি ধন্যবাদ জানাই পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে এরা প্রতিবেদনটার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রথম পাতায় ছাপাবার জন্য। অন্য পত্রিকাগুলো এর গুরুত্বই বুঝতে পারেনি! 
পুলিশ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংস্থা, মহিলা পরিষদ, আইন সালিশ কেন্দ্র,  জরিপ থেকে জানা গেছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন এক মাসে অপরাধ ছিল অনেক কম! গত ছয় মাসের তুলনায় ইভ টিজিং কম ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ! হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবজিসহ অন্যান্য অপরাধ কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ! সবচেয়ে কমেছে ইভ টিজিং!

খুব পেছনে যাই না, আমাদের কিশোরকালটার কথাই ধরা যাক, তখন স্কুল পড়ুয়া কাউকে দেখা যেত মাঠ দাপাচ্ছে। যারা খানিকটা দুবলা, এরা কেউ ক্যারাম খেলছে, তো কেউ দাবা। কেউ হেড়ে গলায় গান ধরছে তো কেউ 'জোশিলা' গলায় কবিতা আবৃতি। সোজা কথা, কিছু-না-কিছু-একটা নিয়ে মেতে আছে। খেলার সাথী বন্ধুটা মরমর অবস্থা, তার জন্য স্রষ্টার কাছে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে চাইছে। কোথায় গেল সেইসব সোনালি দিনগুলো।
মাছের নাকি পচন শুরু হয় মাথা থেকে, আমাদের পচন শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন আমরা খেলা ভুলে গেলাম।

সহায়ক লিংক:
১. দানবীয় উম্মাদনা: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_5250.html
২. প্রকৃতি চিৎকার করে করে বলছে: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_06.html