Search

Loading...

Thursday, July 1, 2010

বৈদেশ পর্ব: নয়

আমার সাথে মুকিত বিল্লাহ না থাকলে সময়টা কী দুঃসহ হতো ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয়। মানুষটা প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। যেহেতু তিনি যাবেন ফ্রাঙ্কফুট, তাঁর ফ্লাইট আটটা পঁচিশে, আমারটা আটটা চল্লিশ। মানুষটা আমার কাছ থেকে বিদায় নেন।

দুবাই থেকে যখন আবার আমি জার্মানি যাওয়ার উদ্দেশ্যে চেক-ইন করলাম, তখন আবারও সমস্যা। ইমিগ্রেশনের লোকজন কেন যাচ্ছি হেনতেন এই সব একগাদা প্রশ্ন করতে লাগল। এরা আমার ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র দেখেও খুব একটা তুষ্ট হলো বলে মনে হলো না। 
এখন এদের জন্য এটা কেন এতোটা জরুরি এটা আমার মাথায় আসছিল না। বাপ, আমি ট্রানজিট যাত্রী, আমি কেন জার্মানি যাচ্ছি এতে তোদের কী কাজ? আমি তো তোদের দেশে থাকছি না, সমস্যাটা কী তোদের! তোদের দেশে থাকা দূরের কথা, দুঃস্বপ্নও দেখতে চাই না। তোদের দেশে থাকার চাইতে আমি চাইব আমার আয়ু খানিকটা কমে যাক।
কোন প্রকারে আটকাতে না পেরে পরে আমাকে বলা হলো, আমি যে জার্মানিতে থাকব ওখানকার হোটেলের রিজার্ভেশন আছে কি না? ভাগ্যিস, এটার কপিও আমার কাছে ছিল। এটা দেখাবার পর এরপর সম্ভবত এদের ফাজলামী করার আর কোন সুযোগ ছিল না। ফাজিলের দল! 
যারা আমার পাসপোর্ট দেখে বলে তোমার তো ভিসার মেয়াদ শেষ এদেরকে দেয়া হয়েছে একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্ব! আমি তিতিবিরক্ত, এদের সঙ্গে হেত্বাভাস-কুতর্ক করার কোন ইচ্ছা আমার মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না।

আমার পাশের সিটে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। প্লেন ছাড়ার পর থেকেই একটা বই বের করে কাটাকুটি খেলায় মগ্ন। সম্ভবত সুডুকো (নামের বানান ভুল হতে পারে)। তাঁর খেলার ফাঁকে টুকটাক কথা হয়। জার্মান নাগরিক। জার্মানি কেন যাচ্ছি এটা জেনে দেখি বুড়া খুব উৎফুল্ল। তিনি বলছিলেন, তোমাদের বাংলা ভাষার জন্য খুব আনন্দের দিন, না?
তাঁর কথায় সম্ভবত কিছু একটা ছিল, আমার চোখ ভরে আসে। আমি মাথা নাড়ি। ছোট্ট জানালা দিয়ে মেঘ দেখি।
নামার পূর্বে এই মানুষটার ফোন থেকেই আমি আরাফাতুল ইসলামকে ফোন করি। আমি এও আশংকা করছিলাম, জার্মানিতে নামার পর কোন-না-কোন কারণে আমাকে আটকাবার চেষ্টা করা হবে। দেখা গেল ফিরতি প্লেনে উঠিয়ে দিল, বিশ্বাস কী! ঢাকা, বিশেষ করে দুবাই এয়ারপোর্টেই যদি এতো যন্ত্রণা হয় আর এ তো খোদ জার্মানি। যাদের দেশে আমাকে বেরুতে হবে, থাকতে হবে; আপত্তিটা এদেরই প্রবল হওয়ার কথা। কেউ যদি বলে আমাদের দেশে তোমাকে ঢুকতে দেব না তাহলে আর যাই হোক এ নিয়ে কুস্তি করার জন্য কস্তাকস্তি করা চলে না।

আমি আগেই জোর অনুরোধ করেছিলাম, আমি কোন সুবিধা চাই না কেবল কেউ একজন যেন আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে যায়। আমি ঢাকার লোকেশনই মনে রাখতে পারি না তা আবার জার্মানি! আরাফাতুল ইসলাম নামের সহৃদয় মানুষটা আমাকে বারবার নিশ্চিত করেছিলেন, কোন সমস্যা নেই, আপনি চলে আসেন। আপনাকে নিয়ে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হবে।
আমি যখন ডুজলডর্ফে নামি তখন জার্মানির সময় আনুমানিক ২টা হবে। ঘুমে আমার চোখ জড়িয়ে আসছে। পূর্বের লেখায় লিখেছিলাম, দুবাই এয়ারপোর্টে [১] হোটেলে যেতে না দেয়ার কারণে ঘুমাবার সুযোগ হয়নি! দীর্ঘ ২২ ঘন্টার ধকল শরীরের উপর দিয়ে গিয়েছে। আমার তীব্র ইচ্ছা, জার্মানিতে হোটেলে গিয়ে লম্বা একটা ঘুম দেব। কেউ জাগাতে আসলে তার সঙ্গে খুনাখুনি হয়ে যাবে।

ইমিগ্রেশন, কাস্টমস সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সম্ভবত আমার দু-মিনিটও লাগেনি। আমার কাছে কিচ্ছু জানতে চায়নি, বাড়তি একটা শব্দও না। কেবল পাসপোর্ট-ভিসা মেশিনের রে-এর মাধ্যমে চেক করে নিয়েছে ঠিক আছে কি না। সীল মেরে আমার পাসপোর্ট ফেরত দেয়ার পর আমি বিভ্রান্ত চোখে বললাম, আমি কি তাহলে এখন যেতে পারি?
দায়িত্বে থাকা মানুষটা সহাস্যে বলেন, কেন নয়! আশা করছি আমাদের দেশ তোমার ভাল লাগবে।
লাগেজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। একজনকে এটা বলার পর নিমিষেই সে অন্যদের জড়ো করে ফেলল। একেকজনকে একেকটা দিক দেখার জন্য বলে আমাকে বলল, তোমার অস্থির হওয়ার কোন কারণ নেই। আমরা দেখছি।
লাগেজের হদিশ মিলল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

এয়ারপোর্টে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। কোথায়, কেউ তো নেই! এখানেও একজন ভদ্রমহিলা আমাকে ফোন করতে দিয়ে সহায়তা করেন। আমার আশা ছিল হয়তো আরাফাতই আসবেন কিন্তু তাঁর সঙ্গে মানুষটাকে দেখে খানিকটা হোঁচট খাই। আরাফাত এই মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর জানলাম ইনি আরাফাতের 'ইস্তারি সাহেবা'। মেয়েটার চমৎকার একটা নাম আছে, নামটা এখন আমার মনেও আছে কিন্তু এখন আমি এই মেয়েটির নাম দিলাম 'মায়াবতী'। কেন? সেটা পরে যথাসময়ে বলা হবে। 
আরাফাত আমাকে যেটা বললেন সেটা শুনে আমার মুখ শুকিয়ে আসে। এখুনি ছুটতে হবে, সন্ধ্যা পাঁচটায় নাকি একটা অনুষ্ঠানে আমাকে থাকতে হবে। ওয়াল্লা, আমার ঘুমের কী হবে, আমার তো ইচ্ছা করছে এখানেই রাস্তায় শুয়ে পড়ি। 
ডুজলডর্ফ থেকে বন শহরে যেতে হবে ট্রেনে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের তিনজনের দৌড় শুরু হলো। হাঁটা-দৌড়-চলন্ত সিড়ি-ট্রেন-ক্যাব-বাস-ট্রাম। 
আরাফাত বলছিলেন, রাইন নদীর একটা সেতু দেখিয়ে। সেতুর লোহার জালে হাজার-হাজার তালা। এই তালাগুলোর নাম নাকি 'লাভ লক'! এখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা তালা মেরে চাবিটা রাইন নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে থাকি এই কারণে, জার্মানদের মত মানুষরাও দেখছি আমাদের মতো অহেতুক আবেগ ধরে রেখেছে! আমি মনে মনে ভাবি, এরা কি তাহলে এখনও পুরোপুরি রোবট হয়ে উঠেনি?

হোটেলে লাগেজপত্র রেখে সম্ভবত দশ মিনিট সময় পেয়েছিলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আমি নিশ্চিত, সঙ্গে আরাফাত না থাকলে পুরো একদিন লাগত আমার হোটেল পর্যন্ত পৌঁছতে। এই সহৃদয় মানুষটা একটা শিশুর মত আগলে রেখেছিলেন আমাকে জার্মানির পুরোটা সময়। এই ঋণ শোধ হয় কেমন করে আমার জানা নেই!

ডয়চে ভেলের অফিসের কাছেই রাইন নদীতে ইয়টে করে নৌভ্রমণ টাইপের কিছু একটা। অরি আল্লা, আস্তে আস্তে দেখি এখানে বাজার জমে গেছে, লোকে গিজগিজ করছে। ইশকুল খুইলাছে টাইপ।

এখানেই পরিচয় হয় বিডিনিউজের খালেদ সাহেবের সঙ্গে। তিনি এখানে এসেছেন সস্ত্রীক। আগে কখনও দেখা হয়নি, মানুষটার কাছে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাই, সঙ্গের একজন আমার পরিচয় করিয়ে দেন। মানুষটা আমার বাড়ানো হাত ধরেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে, মনে হচ্ছিল ধরতে না পারলে সুখি হতেন। ইনি সম্ভবত বৈদেশিদের গ্লভস লাগানো হাত ধরতেই অভ্যস্থ। আহা, কেন এমন বোকামী করলাম? নিদেনপক্ষে একটা গ্লভস কেন যোগাড় করলাম না। 
আমাদের আগামীকালের অনুষ্ঠান বিষয়ে তিনি একটা টুঁ-শব্দও করলেন না। এটাই হয়তো আবেদ খানের মত তাঁরও একটা 'এস্টাইল' [২]। একেকজনের একেক 'এস্টাইল' থাকতেই পারে এতে দোষ ধরার কিছু নেই কিন্তু আমি মানুষটার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। ইয়টের ডেকের টেবিলে খালেদ সাহেব, ওঁর স্ত্রী এবং আমরা আরও দু-একজন। 
কিছু মানুষের সঙ্গ আমার বিরক্তির উদ্রেক করে। যেহেতু এখানে একজন ভদ্রমহিলা আছেন তাই অনুমতি নিয়ে আমি উঠে চলে আসি ডেকের ফাঁকা একটা জায়গায়।
আমার কাছের লোকজন বুঝতে পারেন, আমাকে আমার মত করে ছেড়ে দেন বলে কৃতজ্ঞতা।

এখানে সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। এখানেই পরিচয় হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসুদ মান্নানের সঙ্গে। এই মানুষটাকে আমার পছন্দ হয়েছিল, খুব। কারণ তিনি আর আট-দশটা আমলাদের মত না। তিনিও এসেছেন সস্ত্রীক। জনাব মসুদ মান্নানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আমার কথা হয়। আমি তাঁকে বলি, পাট নিয়ে আমাদের এখন ভারী সুসময়, সহসাই পাটের জেনেটিক প্যাটেন্ট হবে। আমি তাঁকে অনুরোধ করি, পাট নিয়ে কাজ করার জন্য, তাঁর পক্ষে যতটা সম্ভব। 
তিনি আমাকে আমার পাট নিয়ে লেখাগুলো [৩] মেইল করতে অনুরোধ করে কথা দিয়েছিলেন, তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। 
তাঁকে আমি এটাও বলি, আমাদের দেশের পাটের পণ্যে বড়ো ধরনের একটা সমস্যা আছে সেটা হচ্ছে, পাটের সূক্ষ আশগুলো খুলতে থাকে, উড়তে থাকে যা একজন মানুষের এলার্জির প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। এই আশের সঙ্গে কোন এক ধরনের আঠা মিশিয়ে আশগুলো বসানো গেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, কাল পুরষ্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে তিনি থাকবেন কি না। মানুষটা ঝকমকে চোখে বলেন, বলেন কী, থাকব না কেন, অবশ্যই থাকব। আমাদের দেশের এমন একটা দিন। বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলা ভাষাটাও সগর্বে দাঁড়াবে, এটা দেখব না, বলেন কী?
আমি মুখ ঘুরিয়ে রাইন নদী দেখি। রাইন নদী এমন ঝাপসা কেন, নাকি আমার চশমা!

রাইন নদীর হিম বাতাস। ইয়ট ফিরে আসছে। রাইনের তীরে কী চমৎকারই না ছবির মত বাড়িগুলো!

ঘড়িতে স্থানীয় সময় সাড়ে নটা। কী আশ্চর্য! বাইরে এখনও ফকফকা! সূর্য বাবাজির ডোবার নাম নেই!
হনুমানজী কি এখন তাহলে জার্মানিতে? সূর্য বগলে চেপে দিব্যি পা নাচাচ্ছেন? তাই হবে! কিন্তু আমি যে শুনেছিলাম ডিজিটাল টাইমের জটিলতার [৪] কারণে তিনি বাংলাদেশে তশরীফ এনেছিলেন। 
আহা, তিনি জার্মানিতে আসবেন জানলে আমিও সাথে চলে আসতে পারতাম।

লোকজনের ভিড়ে আমার দমবন্ধ ভাব হয়। এরিমধ্যে ঝড়ের গতিতে একেকজনের সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষ হয়। আমার ওয়ালেটে জমে গেছে অনেকগুলো ভিজিটিং-বিজনেস কার্ড। কেবল আমি বেচারারই কোন কার্ড নাই- কি লিখব আমার কার্ডে? দু-কলম লেখালেখি করা ব্যতীত আমার যে ঘটা করে বলার মত তেমন কিছুই নাই।

ঝাঁ চকচকে হোটেলে পড়ে থাকে আমার লাগেজ, গাট্টি-বোঁচকা। ফিরে আসি আরাফাত-মায়াবতীদের বাসায়। সেটার অবস্থান মোটামুটি একটা ছোটখাটো পাহাড়ের মাঝামাঝি। প্যাঁচানো সিড়ি বেয়ে বেয়ে উঠতে হয়। একেবারে উপরে নাকি অনেক পুরনো স্থাপনা, সময়ের অভাবে সেটাও দেখা হলো না।

সঙ্গে আসেন বাংলা বিভাগের হক, এই ভদ্রলোক আমাদেরকে সঙ্গ দেয়ার জন্য চলে এসেছেন। আমি আরাফাত-মায়াবতীর সাজানো গোছানো সংসার দেখি। দেখি এদের পরস্পরের প্রতি অন্য ভুবনের মায়া। আমি মনে মনে বলি, আহা, সমস্তটা জীবন যেন এরা ঠিক এমনটিই থাকে, আমৃত্যু। এই গ্রহের কোন মালিন্য যেন এদের স্পর্শ করতে না পারে।

দেখি, এদের ঝুল বারান্দায় ক্ষুদ্র পটে ছোট-ছোট গাছ। কী অদ্ভুত, একটা গাছের ফুলেও সৌরভ নেই। গাছগুলোও কি রোবটগাছ হয়ে গেছে? কেবল সৌরভ আছে দেশ থেকে নিয়ে আসা গন্ধরাজ গাছের ফুলে। 
ছোট্ট পটে স্ট্রবেরী ধরেছে, একটাই। কী চমৎকারই না দেখাচ্ছে! 
স্ট্রবেরী ফলটা আমার তেমন পছন্দের না কিন্তু মাথায় দুষ্টমি চাপে, আচ্ছা, কপ করে ফলটা খেয়ে ফেললে কেমন হয়? আরাফাত-মায়াবতীর মুখটা তখন কেমন দাঁড়াবে! মুখে কিছু বলতে পারবে না কিন্তু এরা ব্যাঙের মত গাল ফুলিয়ে মনে মনে বলবে, একটাই ফল, মানুষটা কেমন করে পারল এমন হৃদয়হীন একটা কাজ করতে। হা হা হা।

ইচ্ছা ছিল, সম্ভব হলে ছোট পটের এমন একটা গাছ সাথে করে নিয়ে আসব। ক্যাকটাস, অর্কিডের উপর আমার দুর্দান্ত লোভ, ভাল লাগা। সময় স্বল্পতায় তা আর হয়ে উঠে না। হায় সময়, সময়টা মনে হয়েছে এক পাগলা ঘোড়া, যাকে বাগ মানাতে বেগ পেতে হয়েছে। তাও আরাফাত না থাকলে এই ঘোড়া আমাকে ফেলে পগারপার হতো এতে কোন সন্দেহ নেই। কেবল হোটেলে আমাকে দশ মিনিট ফ্রেশ হওয়ার জন্য মানুষটা বাসের অপেক্ষা না করে ক্যাব নেন। এখান থেকে ওখানে- আমার জন্য ঠিক করে রাখা হোটেলে কিন্তু ভাড়া আমাদের টাকায় প্রায় আটশ! আমার সঙ্গে থাকা ইউরো খরচ করবার কোন সুযোগই দেন না মানুষটা।

জমাট আড্ডা চলে। রাত গড়ায়...। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। এক ঘুমে রাত কাবার। আশ্চর্য, কোথায় গেল জেটল্যাগ, কোথায় গেল বিছানা বদল, কোথায় গেল দেশের ভাবনা? এটা কি আরাফাত-মায়াবতীদের জন্যে, প্রবাসে থেকেও মনে হয়েছে দেশেই আছি? আমি ঠিক জানি না...।

*বৈদেশ পর্ব, দশ: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_8079.html

সহায়ক লিংক:
১. বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
২. আবেদ খানের এস্টাইল: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_27.html
৩. পাট, ঘুরে দাঁড়ায় স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post.html
৪. হনুমানজী: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_30.html

বৈদেশ পর্ব: আট

আমার ইচ্ছা ছিল বৈদেশ পর্বটা একটানে লিখে যাব কিন্তু দুবাই এয়ারপোর্টে স্টপওভারের মত এই পর্বের লেখারও একটা স্টপওভার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বৈদেশ পর্ব: সাত [১] নিয়ে তীব্র জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল একজন কঠিন একটা মেইল করেছেন। এটাকে মেইল না বলে বলা যেতে পারে খড়গ দিয়ে ধড় আলাদা করে ফেলা। না, ভুল বললাম, তাহলে যন্ত্রণাটা টের পাওয়া যেত না। বলা যেতে পারে চাপাতি দিয়ে কোপানো। তিনি আমার এই পর্বের লেখা নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন এটা পড়ে আমি স্তম্ভিত, ক্রুদ্ধ!

ইতিপূর্বে আমাকে নিয়ে বা আমার লেখা নিয়ে কেউ কেউ অতি উৎকট ভঙ্গি প্রকাশ করেছেন- কেউ কুৎসিত ছবি দিয়েছেন, তো কেউ ততোধিক কুৎসিত কথা লিখেছেন। যেসব সহযোদ্ধাদের সঙ্গে লেখালেখি করেছি তারা সকালে ফোনে চমৎকার কথা বলে অন্য নামে বিকালে ঈর্ষায় কঠিন লেখা লিখেছেন। এই সব আমার গা সওয়া। এদের ভঙ্গি চেনা, এদের দৌড় জানা। এদের প্রতি আলাদা কোনো টানও নেই আমার। 
কিন্তু এখনকার বিষয়টা খানিকটা অন্য রকম। এখন যে মানুষটা আমার প্রতি যে ধারণা পোষণ করেছেন, তিনি আমার অসম্ভব পছন্দের একজন মানুষ ছিলেন বলেই আমার অনুভূতিটা অনেকটা খুব কাছ থেকে ছুঁরি খাওয়ার অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা আমার নতুন!

প্রশ্ন আসতে পারে মেইলে এই সব না লিখে এখানে কেন? তাঁর অন্য একটা মেইল "...রাতে আমার খিদে পায় বেশি, মা সবসময় আমার বিছানার পাশে বিস্কুটের টিন রাখতেন, এদেশ আসার আগ পর্যন্ত..."। এটা পড়ে আমার বুক ভেঙে কান্না আসছিল। আমার নয় ইঞ্চি মনিটর তখন ঝাপসা। এই মানুষটাই যখন এমন ভাষায় আমাকে আক্রমণ করেন তখন দরদর করে আমার শরীর থেকে রক্ত পড়ে। আমি ভেজা চোখে সেই রক্ত পড়া দেখি, আমার মোটেও ইচ্ছা করে না রক্তপাত থামাতে। আমার ইচ্ছা করে না তাঁকে বলি, তুমি আমাকে এভাবে ছুঁরি মারলে কেন? কার জন্যে?

ভাল হতো মেইলটার আদ্যেপান্ত এখানে তুলে দিতে পারলে। নীতিগত কারণে এটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আর মেইলে উত্তর দিতে আমার আগ্রহ বোধ হয়নি কারণ এই মানুষটা নিজেও জানেন না তিনি মেইলে কী লিখেছেন! কী তীব্র ভঙ্গিতেই না আমাকে আক্রমণ করেছেন! দিনের-পর-দিন, মাসের-পর-মাস, বছরের-পর-বছর ধরে আমার লেখার মাধ্যমে আমাকে জানার পরও আমার সম্বন্ধে কী নীচু ধারণা! হা ঈশ্বর! আমার ধারণা, তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন, প্রার্থনা করি, ঠান্ডা মাথায় নিজের মেইলটা আবারও পড়লে খানিকটা আমাকে বুঝতে পারবেন।

তিনি আরবের কোনো এক দেশে থাকেন। সেই দেশ তাঁকে অনেক কটা বছর থাকতে দিয়েছে, লালন করেছে। সেই দেশের প্রতি তাঁর আছে সুগভীর মায়া। থাকুক, এতে আমার কোন বক্তব্য নাই কিন্তু তাঁর এই আবেগ আমাকেও স্পর্শ করবে এটা ভাবাটা বোকামী! 
আমার লেখার যে অংশ নিয়ে তাঁর তীব্র আপত্তি তা হচ্ছে:
তো, দুবাই এয়ারপোর্ট দেখে আমি বিরক্ত। সুবিশাল অথর্ব এক জিনিস বানিয়েছে! ওই অনুযায়ী যথেষ্ঠ লোকবল চোখে পড়েনি। অসংখ্য পুরুষ নামের মহিলা চোখে পড়েছে। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পিচ্ছিল সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে হিজড়াদের মত হাঁটাহাঁটি করতে থাকা লোকজন বাসাবাড়ির মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাত্রির লম্বা লাইন অথচ ডেস্কে দায়িত্বে থাকা লোকগুলো নিজেদের মধ্যে ফালতু আলাপ করছে। এটা বোঝাই যাচ্ছে কারণ একজন অন্যজনের গায়ে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
যাত্রির লাইন লম্বা হয়, এতে এদের কিছুই যায় আসে না। স্রেফ দম্ভ, বেশুমার টাকার অহংকার! এই অসভ্যদের বোঝার এই বুদ্ধিটুকু কখনই হবে না যে যাত্রিরা দাঁড়িয়ে আছে এঁরা এই মুহূর্তে এদের অতিথি। আমি অন্য সময়ে প্রয়োজনে কঙ্গো এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করব কিন্তু এই সব অসভ্যদের দেশে ব্লাডার হালকা করতেও আগ্রহী হবো না। শপথ আমার লেখালেখির। 


তিনি আমাকে মেইলে জানাচ্ছেন, "এই এয়ারপোর্ট দিয়ে প্রতিদিন দেড়লাখ যাত্রী যাতায়ত করেন"।
তো? তাতে আমার কী! দেড়লাখ যাত্রী যাতায়ত করলেই এই এয়ারপোর্টটা দেখে আমাকে বিগলিত হতেই হবে কেন? কারও শতকোটি টাকা থাকলেই মানুষটা একজন ভালমানুষ হবেন এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? তার সব কিছুতেই লাফাতে হবে কেন?


জার্মানির 'ডুজলডর্ফ' এয়ারপোর্টের তেমন জৌলুশ নেই কিন্তু কোথাও কোনো অসঙ্গতি আমার চোখে পড়েনি। সম্ভবত ২ মিনিট লেগেছে আমার ইমিগ্রেশন পার হতে। আমার লাগেজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জানাবার সঙ্গে সঙ্গে অন্তত চার-পাঁচজন মানুষ ছুটে এসেছিলেন। একজন অন্যজনকে একেকটা বিষয় চেক করার জন্য বলছিলেন। এঁরা বারবার আমাকে বলছিলেন, তোমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নাই, আমরা দেখছি। এরা কিন্তু এমিরাটসের লোক ছিলেন না, ছিলেন বিমান বন্দরের।

কেউ যদি বলে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বানিয়েছে 'বুর্জ খলিফা'। 
তো? এটা দেখে আমাকে কাত হয়ে যেতে হবে কেন? আমার কাছে এটা স্রেফ একটা জঞ্জাল! আমার কোনই আগ্রহ জাগে না যে এই জঞ্জালটা দেখে আসি। এই সব আবর্জনা দেখার জন্য অনেক বড়ো মাপের মানুষ রয়ে গেছেন, তাঁদের জন্য না-হয় থাকুক।

আমি এমিরাটসে দুবাই হয়ে যাচ্ছি এটা শুনে মাহাবুব ভাই নামের এক সিনিয়র বলেছিলেন, পারলে টিকেটটা বদলে ফেলেন কারণ দুবাই এয়ারপোর্ট একটা কুখ্যাত এয়ারপোর্ট। তিনি কর্পোরেট ভুবনের একজন মানুষ, তাঁকে হরদম এদিক-ওদিক যেতেই হয়।  কিন্তু তখন তাঁর কথাটা তেমন গা করিনি।
আমার সঙ্গে ইউএন এর যে মুকিত বিল্লাহ ছিলেন তিনিও বলছিলেন পারলে তিনিও টিকেটটা বদলে ফেলতেন। কিন্তু আমাদের কারও এই উপায় ছিল না কারণ টিকেটগুলো কাটা হয়েছিল আমন্ত্রণকারীদের ইচ্ছায়, সুবিধায়।

মূল যে অংশটা নিয়ে ওনার ক্ষোভ, আমি কেন এটা লিখেছি, "অসংখ্য পুরুষ নামের মহিলা চোখে পড়েছে, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পিচ্ছিল সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে হিজড়াদের মত হাঁটাহাঁটি করতে থাকা লোকজন যেন বাসাবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে"।
আমার কাছে এমনটাই মনে হয়েছিল, এখন আমি কি এটা বানিয়ে বানিয়ে লিখব, ওহ, কী একেকটা পুরুষ দেখলুম- সিংহাবলোকনন্যায়! এই পোশাকে একেকজনকে কী চমৎকারই না লাগছিল গো। আমি 'মুগধ'!

আচ্ছা, আমাদের এয়ারপোর্টে সব লোকজন লুঙি পরে থাকলে অন্যরা এই নিয়ে মন্তব্য করলে কি তার মুখ চেপে ধরা হবে, নাকি শূলে চড়ানো হবে?

তিনি আমাকে মেইলে জানিয়েছেন, এরা কেনো লম্বা কাপড় পরে থাকে। এটা এই প্রথম তাঁর কাছ থেকে জানলাম এমন না। চামড়াপোড়া গরম লু-বাতাস যখন বয়, বাতাসের সঙ্গে উড়তে থাকে গরম বালি; এ থেকে বাঁচার জন্য গোল চাকতিতে আটকে থাকা মাথার বড়ো কাপড়টা দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে উবু হয়ে থাকতে হয়। 
সে তো মরুভূমির কাহিনি! দুবাই এয়ারপোর্টে, এখানে মরুভূমি এলো কোত্থেকে? তারপরও কারও ইচ্ছা হলে একটা না দুইটা পরুক, ইচ্ছা হলে আরও গা দুলিয়ে হাঁটুক কিন্তু এটা নিয়ে আমি লিখতে পারব না এমন টিপসই আমি কখন কোথায় দিলাম?
আমার লেখালেখি তার সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেয় না, আমাকেও না। লেখা আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে, আমি না। সাদাকে সাদা বলব, কালোকে কালো। জনে জনে জিগেস করে আমাকে লিখতে হবে নাকি! 

তাঁর তীব্র ক্ষোভ, আমি হিজড়াদের সঙ্গে উদাহরণ কেন দিলাম। তিনি কঠিন ভাষায় আমাকে এটাও জানিয়ে দিলেন, "হিজড়া না হয়ে আমি পুরুষ হয়ে জন্মেছি বলেই কী আমার এই অহংকার? হিজড়াদের প্রতি আমি তাচ্ছিল্য করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি"।
আমার কাছে এদের হাঁটার ভঙ্গিটা এমন মনে হয়েছে তাই আমি হিজড়াদের সঙ্গে তুলনা করেছি। কেউ যখন চোখ থাকার পরও অন্ধের মত চলাফেরা করে তখন আমরা এটাই বলি, দেখো, কী অন্ধের মত হাঁটছে। এর অর্থ এটা না কোন অন্ধের প্রতি তাচ্ছিল্য করা। তাচ্ছিল্যটা করা হচ্ছে সেই মানুষটার প্রতি যে চোখ থাকার পরও অন্ধের মত ভঙ্গি করছে।
একটা আরবী প্রবাদ আছে, 'কোন ল্যাংড়া-লুলা দেখলে তাকে একটা লাথি দেবে কারণ সৃষ্টিকর্তা যাকে করুণা করেননি তাকে আমার করুণা করার প্রয়োজন কি'।
এই উদাহরণটাকে কি আমরা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করব? রূপক অর্থে কি কিছুই বলা যাবে না, মুখে তালা!

হিজড়া নামের ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের [২] নিয়ে আমি রসিকতা করতে যাব কোন দুঃখে! এঁদের যখন দেখি তখন নিজেকে বড়ো লজ্জিত মনে হয়, কেবল মনে হয়, কী অপার সৌভাগ্য নিয়েই না জন্মেছি। এঁদের নিয়ে এই উদাহরণ দেয়ায় যে মানুষটা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করেন তাঁর সঙ্গে ফিযুল বুলি কপচাবার চেষ্টা করতে আগ্রহ বোধ করি না। আমার এই অমানুষ [২] লেখাটা নিয়েও হইচই করা চলে। কেন আমি হিজড়াদের 'অমানুষ' বললাম? এরা কী মানুষ না? ইত্যাদি ইত্যাদি।

আহ, এইখানে এসে মানুষটার সঙ্গে আমার আর কোন যোগ থাকে না! আফসোস, বড়ই আফসোস। কপাল আমার, প্রিয় সব কিছু আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়! ইনি লিখেছেন, "যে রেমিট্যান্সের টাকায় গড়ে উঠা বিমানবন্দরের সুশীতল হাওয়া গায়ে মাখিয়ে আবেদ খান, আনিসুল হক, আলী মাহমেদরা বৈদেশ যাত্রা করেন"।
নো, নো স্যার, আপনি এখানে দুইটা ভুল করলেন!
এক: আনিসুল হক, আবেদ খানের সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলে। এঁরা অনেক বড়ো মাপের মানুষ, এঁদের চোখে থাকে রঙিন চশমা। এঁদের সঙ্গে তিন টাকা দামের কলমবাজ আলী মাহমেদের তুলনা করাটা হাস্যকর। আমার কলম ড্যাম চিপ! রি-সেল ভ্যালুও নেই এঁদের কলমের আছে। বাজার উঠানামা করে বলে এরা হরদম কলম কেনাবেচা করতেই থাকেন কারণ বাজারে এর কদর আছে। এরা মুখিয়ে আছেন আপনাদের মত পাঠকদের জন্য চমৎকার সব কথা প্রসব করার জন্য। আর আমার কলম কেউ সাড়ে তিন টাকা দিয়েও কিনতে চাইবে না।
দুই: দুঃখিত স্যার, আমি আপনাদের এই অর্জনটাকে খাটো করছি না কিন্তু এটা আপনার ভ্রান্ত ধারণা, রেমিট্যান্সের টাকায় এয়ারপোর্ট-রাস্তা-ঘাট-ব্রীজ করা হয় না। 
আমি কি আপনাকে মনে করিয়ে দেব, এবারের বাজেটের ১,৩২,১৭০ কোটি টাকার মধ্যে আয়ের উৎসগুলো কি কি? জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, বহির্ভূত কর হচ্ছে ১,৩২,১৭০ কোটি টাকার মধ্যে ৬০ ভাগ! অর্থাৎ ৬০ ভাগ টাকা আসছে কেবল আমাদের দেয়া কর থেকে। এই টাকাটা আসে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে আমাদের কাছ থেকেই। 
এটা আসে টাট্টিখানা হালের ওয়শরুমে আমরা ঘুম থেকে উঠে যখন দাঁত মাজি তখন থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাবার পূর্বে যে টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করি সেখান থেকে। এই টাকা থেকেই সরকার রাস্তা-ঘাট-ব্রীজ-বিমানবন্দর বানায়, আপনাদের রেমিট্যান্সের টাকায় না। 
রেমিট্যান্সের টাকায় দেশের চাকাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে এটা সত্য, চাকাটায় আলাদা গ্রীজ যোগ হয় এও সত্য। আপনি বিমানবন্দরের হাওয়ার কথা বললেন বলেই এই উদাহরণটা দেয়া।

পোস্টের শুরুতে বলেছিলাম কাছ থেকে ছুঁরি মারার কথা এবং মেইলে ছোট্ট করে লিখেছিলামও, অতি পক্ষপাতদুষ্ট মানুষদের সঙ্গে কথা বলে আমি আরাম পাই না। এটা বলার কারণ হচ্ছে, আপনি এদের জন্য গভীর মমতা দেখিয়েছেন দেখে আমার ভাল লাগছে কিন্তু আপনি কি আমার এই পোস্টেই এটা পড়েননি? "...আমার প্রয়োজন ঘুম। কারণ এই সমস্তটা রাত আমার কেটেছে নির্ঘুম"। 
আমার জার্নিটা ছিল প্রায় ২২ ঘন্টার! একফোঁটা আমি ঘুমাতে পারিনি। পরের সারাটা দিন আমার ছুটাছুটি, এর পরের দিনই আবার আমাকে ফেরার জন্য ছুটতে হয়েছে। আমার ঘুমাতে না পারার কষ্টটা আপনাকে দেখি বেদনাহত করল না! কই, মেইলে আপনি দেখি এই বিষয়ে একটা শব্দও ব্যয় করলেন না! কেন? 
আপনার কি ধারণা জাগতিক কষ্টে কাবু একজন মানুষের মত আমার ঘুমের প্রয়োজন হয় না? নাকি তিন টাকা দামের 'কলমবাজ', এরা কেবল এই গ্রহে আসেন কৌপিন পরে উবু হয়ে লেখালেখি করে গ্রহ উদ্ধার করতে? এদের জাগতিক আর কোন চাহিদা নাই?

যেখানে একজনের যাতে ঘুম ভেঙে না যায় সেই কারণে মহা পবিত্র গ্রন্হ নিঃশব্দে পাঠ করার জন্য বলা হয় সেখানে আপনি একটা মানুষকে ঘুমাতে দেবেন না, চোখের পাতা এক করতে দেবেন না। বাহ, বেশ তো! যথার্থ কাগজপত্র-হোটেল কূপন থাকার পরও আপনি আমাকে হোটেলে যেতে দেবেন না, ঘুমাবার সুযোগ দেবেন না, কারণ কী, বাহে! কেবল যে ঘুমাতে দেবেন না এই-ই না; কোনো ব্যাখ্যাও দেবেন না, কি আমার অপরাধ? কোন কারণে আমার সঙ্গে এই আচরণ করা হচ্ছে? একজন ফাঁসির আসামীকেও তো তার অপরাধ জানিয়ে দেয়া হয়, কি কারণে তার ফাঁসি হচ্ছে।
আমার খুব দায় পড়েছে এদেরকে সভ্য বলার জন্য।

আরব জাতি নিয়ে আপনি চমৎকার সব কথা বলেছেন, শুনে প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়ার কথা। এরা আপনাদেরকে থাকার জায়গা দিচ্ছে ইত্যাদি। ভুল! এরা মানবতার কারণে আপনাদেরকে থাকার জায়গা দিচ্ছে এমনটা না, দিচ্ছে দায়ে পড়ে। কারণ এদের লোক প্রয়োজন। এমন অনেক কাজ আছে যেটা সে দেশের লোকজন করতে চায় না। আর এটা তো স্রেফ একটা লেনদেন। আমরা শ্রম দিচ্ছি এরা দিচ্ছে শ্রমের দাম। এখানেও এরা গুরুতর অন্যায় করছে, শ্রমের যথার্থ মূল্যটুকুও এরা দিচ্ছে না।
আমরা দেখেছি, কোন মুসলমান দেশে এরা কতটা আর্থিক সহায়তা দেন। আমাদের প্রকৃতিক দূর্যোগে এদের দানের বহর দেখে হাসি চেপে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।   
কেন যেন আপনার এই বিপুল উল্লাস আমাকে স্পর্শ করছে না। আরব জাতির প্রতি আপনার প্রালঢালা আবেগ থাকতে পারে, আমার নাই। আমি অধিকাংশ আরবদের পছন্দ করি না।

এরা একসময় বীর জাতি ছিল কিন্তু এখন একটা কাপুরুষ জাতি, এহেন কোন অনাচার-অন্যায় নাই যেটা এরা করে না। মুসলমানদের ক্ষতি অন্য ধর্মের লোকজনরা যতটা না করেছে তারচেয়ে অনেক বেশি এরা করেছে। ইরাকের পবিত্র স্থানগুলো যখন অপবিত্র হচ্ছিল তখন এরা বসে বসে তামাশা দেখেছে। আমি অপেক্ষায় আছি, এদের পবিত্র স্থানগুলো যখন অপবিত্র হবে সেটা দেখার জন্য, হিস্ট্রি রিপিট। 
আমেরিকা ইসরাইল যখন সভ্যতার নমুনা দেখায় [৩] তখন এরা নিশ্চয়ই উট দৌড়াবার উল্লাস বোধ করে। করে না? উট দৌড়াচ্ছে, স্পীড-স্পীড মো() স্পীড। এতে জকির প্রাণ গেল নাকি উটের সঙ্গে বেঁধে রাখা শিশুটির তাতে কি আসে যায়?
ইসলাম ধর্মের দন্ড ধরে রাখা সৌদি আরবদের ধর্মের নমুনা দেখে চোখে জল চলে আসে। গভীর রাতে 'মুতোয়া' নামের পুলিশ বাঙালির ঘরে ঢুকে জিনিস তছনছ করে। খুঁজে পায় তাঁর মায়ের ছবি, সেই মানুষটার সামনে তাঁর মার ছবিটা ছিড়ে ফেলে বলে, হারাম। সেই মানুষটা কিচ্ছু বলে না কেবল দাঁত দিয়ে কামড়ে নিজের হাত থেকে রক্ত ঝরাতে থাকে। 
এই বদমাশদের কে এই অধিকার দিয়েছে, জোর করে পুলিশ দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় নামাজ পড়িয়ে বন্ড সই দিয়ে ছেড়ে দিতে? ইসলামে কোথায় এটা লেখা আছে?

ইরান একাই লড়ে যাচ্ছে, একে থামাতে হবে। আরব জাতি আছে না! সৌদি আরবের মত মহান ধার্মিক দেশ আছে কোন দিনের জন্য? ইরানে বোমা হামলা চালাবার জন্য ইসরাইলকে বিমান চলাচলের করিডর দিচ্ছে, জায়গা করে দিচ্ছে সৌদি আরব। 
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সাড়ে ২২শ কিলোমিটারের দূরুত্বে ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরে। এখন সৌদি আরবের বদান্যতায়  ইসরাইলি বিমান অতি সহজেই ইরানে বোমা ফেলতে পারবে, ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তে পারবে। আমরা ইরানি শিশুদের দেখব ভাঙাচোরা পুতুলের মত মরে পড়ে থাকতে। যেমনটা আমরা দেখেছি প্যালেস্টাইনে, ইরাকে [৩]
এমন আরব জাতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় (!) আমার মাথা নত হয়ে আসে। ইচ্ছা করে নিজেই নিজেকে খুন করে ফেলি...।

*বৈদেশ পর্ব, নয়: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_01.html

সহায়ক লিংক:
১. বৈদেশ পর্ব: সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html
২. অমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_30.html
৩. সভ্যতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_493.html