Tuesday, June 29, 2010

বৈদেশ পর্ব: সাত

বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন আমাকে আটকে দিল। এরা আমার পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে বলল, আসেন আমার সঙ্গে।
আমি মনে মনে বলি, হে পরম করুণাময়, ড্রেনটা কেন রাস্তার মাঝখানে এসে পড়ে! কারণ আমার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর না। সালটা সম্ভবত ৮৪, সার্ক দেশগুলো ঘুরতে বেরিয়েছি। ঠিক এমন করেই ইমিগ্রেশনে আমার পাসপোর্টটা নিয়ে গেল। গেল তো গেল, ব্যাটাকে আর খুঁজে পাই না। আমার সঙ্গি যিনি ছিলেন তাঁর পাসপোর্টটাও নিয়ে গেছে। তিনি সেসময় ওই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন টাকার বিনিময়ে।

এবার আমার কপালে দুর্ভোগ আছে কারণ 'স্পীড মানি' নামের ঘুষ তো আমি দেব না। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো তার পদস্থ কর্মকর্তার কাছে। আমি পুলিশ-আর্মির পদবির ব্যাজ নাট-বল্টু মনে রাখতে পারি না তবে অনুমান করি এই ভদ্রমহিলার পদবি এ.সি। এই ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করছিলেন যথেষ্ঠ মার্জিত ভঙ্গিতে।
'আপনি তাহলে জার্মান যাচ্ছেন'?
'জ্বী'।
'কি, প্লেজার ট্রিপে'?
আমি কেন যাচ্ছি বিস্তারিত বলার পর এই ভদ্রমহিলা আন্তরিক ভঙ্গিতে কিছু সদাশয় কথা বললেন, আরে, এ তো আমাদের দেশের জন্য একটা অতি চমৎকার সংবাদ ইত্যাদি। তারপর বললেন, 'যে ডেস্কে আপনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ওখানে ফিরে যান। আমি বলে দিচ্ছি। কোন সমস্যা হবে না'।
আমি খানিকটা হোঁচট খেলাম। পুলিশ-টুলিশ টাইপের কারও মুখে এমনটা শুনব অন্তত এটা আশা করিনি! মনটা ভাল হয়ে যায়, অভিমান নিয়ে [১] আমার দেশত্যাগের বিষণ্নতা নিমিষেই নিস্প্রভ হয়ে আসে।

অন্যরা যেমন একজন চীনাম্যানের সঙ্গে অন্য একজন চীনাম্যানের চেহারা আলাদা করতে পারেন না তেমনি আমিও একজন ইউনিফর্মধারীর সঙ্গে অন্য একজন ইউনিফর্মধারীকে আলাদা করতে পারি না। তবুও আমি প্রায় নিশ্চিত, আমি ঠিক ডেস্কের সামনেই এসে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু ওই ডেস্কে বসা মানুষটি ষাড়ের মত চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ন-আ-আ, আমার এখানে না'
আমার সঙ্গে সঙ্গে ওই ভদ্রমহিলাও হতভম্ব। আমি ওই ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'এটা কি হলো? হতে পারে আমার ভুল হয়েছে, তাই বলে তিনি এমন করে চেঁচাচ্ছেন কেন'? 
ভদ্রমহিলা বিব্রত, বিড়বিড় করে বলছেন, 'এ পাগল নাকি, দেখছে তার সিনিয়র বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে'!
আমি ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, 'একটা এয়ারপোর্টই প্রথম একটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এখানকার একজনের আচরণ গোটা দেশ সম্বন্ধে অন্যকে বাজে ধারণার জন্ম দেয়। এটা খুব বাজে হলো, খুব বাজে'।
ভদ্রমহিলা নীচু স্বরে বলছেন, 'আসলে বুড়া মানুষ, অনেকক্ষণ ধরে লাগাতার ডিউটি করছেন। আমি রিপোর্ট করলে, তার বাচ্চা-কাচ্চা...বোঝেনই তো'।
আমি বললাম, 'এটা তো কোনো ব্যাখ্যা হলো না! বুড়া মানুষ, লাগাতার ডিউটি! এমনটা হলে এদের এখানে না বসালেই হয়'।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
আমাদের দেশের পুলিশ-টুলিশ টাইপের লোকজন দুঃখ প্রকাশ করেন এই অভিজ্ঞতাও আমার কাছে নতুন! আমি ক্রমশ ভুলে যাই চোরের মত দেশত্যাগের বেদনা।

আমি এয়ারক্রাফটের ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। সেই পূর্বের মতই বিচিত্র অনুভূতি হয়, যে মেঘগুলো সর্বদা মাথার উপর সগর্বে ঘুরে বেড়ায় সেই মেঘগুলো এখন আমার পায়ের নীচে! 
আবার কী বিশালই না মনে হয় গোটা বিশ্বটাকে। অন্য ভুবনের এই দৃশ্যটার নীচে শত-শত কোটি মানুষ কী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়েই না হরদম অহেতুক লড়ে যাচ্ছে! আফসোস, একটাই জীবন আমাদের, কোনো অর্থ হয় না এর...। 

যাচ্ছি এমিরাটসে। টিকেটটা কাটা হয়েছে জার্মানি থেকে। সদাশয় একজন মানুষ, আরাফাতুল ইসলাম আমাকে আগেই বলে দিয়েছিলেন, আপনি ঢাকা থেকেই দুবাই হোটেলের কনফার্মেশনটা করে নেবেন নইলে আপনার কষ্ট হবে। 
দুবাই এয়ারপোর্টে আট ঘন্টা স্টপওভার ছিল। ওখান থেকে কানেকটিং ফ্লাইটে ডুজলডর্ফ। নিয়ম অনুযায়ী আট ঘন্টা স্টপওভারের কারণে আমার জন্য হোটেলের ব্যবস্থা করার কথা। এমিরাটসের ঢাকা অফিস থেকে কনফার্ম করে হোটেল কূপন আমি সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। এটা করতে গিয়ে বিস্তর ঝক্কি পোহাতে হয়েছে!

দুবাই এয়ারপোর্ট নামার পূর্বেই এয়ারক্রাফটের জানালা দিয়ে রাতের দুবাই শহরটা দেখছিলাম। এরা যে আলোর কী অপচয় করে এর নমুনা দেখে আমার বুকের গভীর থেকে কষ্টের শ্বাস বেরিয়ে আসে। এই গ্রহের আবহাওয়া পরিবর্তন করার জন্য এরাই দায়ী! আমরা প্রকৃতির বিনাশ করি ক্ষিধার জ্বালায় আর এরা করে টাকার উৎকট প্রদর্শনীর নামে অসভ্যতার কারণে। 
'গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম'-এর সমস্ত আয়োজন ছিল, 'ক্লাইমেট চেঞ্জ, দ্য হিট ইজ অন' এই নিয়ে সারগর্ভ আলোচনায়। আমি জানি না ওখানকার আলোচনায় ওরা কি কি সমাধান পেয়েছে? ওখানে আমাদের ভাবনা জানাবার ন্যূনতম কোন ভূমিকা ছিল না, থাকলে ভাল হতো। 
এই নিয়ে আলাদা করে আমার সাইটে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে পরের কোন পোস্টে। 'ক্লাইমেট চেঞ্জ, আমার ভাবনা-চোখ দিয়ে।

তো, দুবাই এয়ারপোর্ট দেখে আমি বিরক্ত। সুবিশাল অথর্ব এক জিনিস বানিয়েছে! ওই অনুযায়ী যথেষ্ঠ লোকবল চোখে পড়েনি। সহায়তা নামের কোনো জিনিস এদের অভিধানে নাই! অসংখ্য পুরুষ নামের মহিলা চোখে পড়েছে- হাঁটার ভঙ্গি অদ্ভুত, হেলেদুলে। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পিচ্ছিল সাদা কাপড় গায়ে দিয়ে হিজড়াদের মত হাঁটাহাঁটি করতে থাকা লোকজন দেখে মনে হচ্ছে, বাসাবাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
যাত্রির লম্বা লাইন অথচ এই নিয়ে এদের কোন বিকার নাই! ডেস্কে দায়িত্বে থাকা লোকগুলো নিজেদের মধ্যে ফালতু আলাপ করছে। এটা বোঝাই যাচ্ছে কারণ একজন অন্যজনের গায়ে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। 
ক্রমশ যাত্রির লাইন লম্বা হয়, এতে এদের কিছুই যায় আসে না। স্রেফ দম্ভ, বেশুমার টাকার অহংকার! এই অসভ্যদের বোঝার এই বুদ্ধিটুকু কখনই হবে না যে যাত্রিরা এখানে দাঁড়িয়ে আছে এঁরা এই মুহূর্তে এদের অতিথি। আমি অন্য সময়ে প্রয়োজনে কঙ্গো এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করব কিন্তু এই সব অসভ্য এয়ারপোর্টে ব্লাডার হালকা করতেও আগ্রহী হবো না, শপথ আমার লেখালেখির।

প্রকৃতি ব্যত্যয় পছন্দ করে না। টাকার দম্ভে যে নগরী এরা বিয়েবাড়ির মত ঝলমলে আলোয় সাজিয়েছে এটা তছনছ করে দিতে প্রকৃতির এক মিনিটও লাগবে না। ভাগ্যিস, প্রকৃতি এদের তেল দিয়েছে নইলে আমাদের দেশে এসে চাকু ধার করত। ইরানিরা যে আমাদের দেশে চাকু ধার করত এটা দেখার জন্য আমাদের দাদার প্রয়োজন হয়নি, বাবাই যথেষ্ঠ ছিলেন! আসলে এদের মাঝখানে সিড়ির ধাপগুলো নেই- ক্যামেল টু ক্যাডিলাক। উত্থান অতি দ্রুত। এদের পতনও হবে অতি দ্রুত।

দীর্ঘ সময় পর ডেস্কের সামনে যখন আমি দাঁড়ালাম, ভদ্রতা করে বললাম, গুড মর্নিং। ব্যাটা অন্য একটা ডেস্ক দেখিয়ে উত্তর দিল, নেক্সট। অথচ এই ডেস্কটায় এ তেমন ব্যস্ত না! এ সম্ভবত এটাই ভাল শিখেছে, নেক্সট! অন্য ডেস্কে গেলে ব্যাটা যেটা বলল, শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এ বলছে, 'তুমি তো জার্মানি যেতে পারবে না, তোমার তো ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে'।

আমি হতভম্ব হয়ে এর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। এই নির্বোধদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে এয়ারপোর্টের মত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায়! আমি পাসপোর্টে ভিসার অংশে লেখা ভাল করে দেখিয়ে দিলাম, মোটেও আমার মেয়াদ শেষ হয়নি। এটা দেখিয়ে দেয়ার পরও এর কোন লাজ হয়েছে বলে তো আমার মনে হলো না। এরপর শুরু হলো আমি কেন জার্মানি যাচ্ছি এই নিয়ে এক লক্ষ প্রশ্ন। আমার একে বোঝাতে হয় ডয়চে ভেলে কি, কেন ওখানে যাওয়া ইত্যাদি। এর ইংরাজি দেখি আমার চেয়েও জঘন্য! পাশের একটার সঙ্গে হিন্দি একটা শব্দ বলার পর আমি চলনসই হিন্দিতে বলা শুরু করলে এ চোখ সরু করে আমার কাছে জানতে চায়, 'তুমি দেখি ভাল হিন্দি বলো, শিখলে কোথায়'?
লে বাবা, হিন্দি বলাটাও কি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে নাকি! এ আমার কাছে একের পর এক কাগজ চাইতে থাকে, আমি দেখাতে থাকি।
এক পর্যায় আমি হোটেল বুকিং-এর কূপন দেখালে সে আমাকে একটা অফিস দেখিয়ে বলল, 'তুমি ওখান থেকে সিল মেরে নিয়ে আসো'।

ওখানে যাওয়ার পর দায়িত্বে থাকা মানুষটার কাছ থেকে সিল-টিল মেরে আবারও আমি এই ডেস্কে ফেরত আসলে এ আবার আমাকে অন্য একটা অফিস দেখিয়ে বলে, 'যাও এখান থেকে সিল মেরে নিয়ে আসো'। এই অফিসে যাওয়ার পর যে মানুষটা বসা ছিলেন তিনি আমাকে একটা প্রশ্নও করলেন না, খসখস করে লিখে দিলেন, ক্যানসেল। মোদ্দা কথা, আমাকে বেরুতে দেবে না, হোটেলে যেতে দেবে না। একটা দুঃখ প্রকাশ না, একটা শব্দ না। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, এমন কুৎসিত মুখ-অভিব্যক্তি আমি জীবনেও খুব একটা দেখিনি!

আমার সঙ্গে মুকিত বিল্লাহ নামের ইউরোপিয়ান কমিশনের একজন ছিলেন, তিনি যাবেন ফ্রাঙ্কফুট হয়ে ব্রুসেলস। তাঁর বেলায়ও একই অবস্থা। মুকিত চাচ্ছিলেন এই নিয়ে প্রশ্ন করতে। আমি তাঁকে বাংলায় বললাম, এরা অভব্য-অমানুষ, এদের সঙ্গে খামাখা কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নাই। কারণ এ কূপনের একটা অংশ ছিঁড়ে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিয়েছে। চলেন এখান থেকে, আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। চলেন-চলেন!

আমরা দুইজন দুবাই এয়ারপোর্টে এমিরাটসের ডেস্কে যোগাযোগ করার পরও এরা কোনো সমাধান দিতে পারল না।  এদের বক্তব্য, আপনাকে বেরুতে না-দিলে আমাদের কীই-বা করার আছে?
তবে এই বিষয়ে আমার স্পষ্ট বক্তব্য, তাহলে এমিরাটস কেন হোটেলের রাখা হবে বলে লিখিত সম্মতি দিল? এটা আমার জানার বিষয় না কোন এয়ারপোর্ট কোন অসভ্য মানুষদের আয়ত্বে। এরা প্রয়োজনে এয়ারপোর্টের ভেতর রাখার ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজন বোধ করলে এয়ারক্রাফটের ভেতরে। প্রয়োজনে আকাশে। এটা এদের সমস্যা, আমার না।
আমার প্রয়োজন ঘুম। কারণ এই সমস্তটা রাত আমার কেটেছিল নির্ঘুম। এই বিষয়ে এমিরাটসের কাছে লিখিত আকারে ব্যাখ্যা চাওয়ার আছে আমার

আমি এই গ্রহের এক নির্বোধ কারণ আমি স্মোক করি। এই বিষয়ে আমি কোনো ঠুনকো অজুহাত দাঁড় করাতে চাই না। সলাজে কবুল করি, আমি এক আহাম্মক নইলে কী আর স্মোক করি?
ওয়াল্লা, মুকিত বিল্লাহও দেখি একই পথের পথিক (তবে আমি অন্য কাউকে এই বিশেষণের আওতায় আনতে চাই না। এ আমার অধিকার বহির্ভূত)! আমরা পাগলের মতো দুবাই এয়ারপোর্টে সিগারেট খাওয়ার জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছি, ঢাকা ছাড়ার পর আমার আর সিগারেট খাওয়ার সুযোগ হয়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা কক্ষ পাওয়া গেল। ঢোকার পর আমার মনে হলো, এ নিশ্চিত হিটলারের গ্যাস-চেম্বার। 
ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না! একজস্ট সিস্টেম ভালো কাজ করছে না বা কুলিয়ে উঠতে পারছে না। আমার কেবল মনে হচ্ছিল জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। সিগারেট ফুঁকে এখান থেকে বেরুবার পর মনে হলো, আহ, হাতে প্রাণ ফিরে পেয়েছি।
কেবল আপনাকেই কানে কানে বলি, অন্যদের বলবেন না যেন, এই গ্যাস-চেম্বারে আরও কয়েকবার ঢুকেছিলাম :)! সুবিশাল গামলায় উপচে পড়ছিল সিগারেটের অবশিষ্টাংশ।

'গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম' আমাকে যে টিকেট পাঠিয়েছে এটা এমন, ২০ জুন সাড়ে নটায় আমি ঢাকা ছাড়ব, ডুজলডর্ফে পৌঁছব ২১ জুন বিকেলে। ২২ জুন আমার মূল অনুষ্ঠান। পরদিন ২৩ জুনেই আমি ফেরার ফ্লাইট ধরব।
আমার মোটা মাথায় এটা আসেনি, ফেরার সময়টা আর দুয়েকটা দিন হাতে রাখলে টিকেটের জন্য এদের কী চার আনা পয়সা বেশি লাগত? এরা তিন দিনের জন্য আমাকে হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করেছিল। অবশ্য এটা বলতে পারত, দুঃখিত, তোমাকে তিন দিনের বেশি আমরা হোটেলের সুবিধা দিতে পারব না। 
এটা কোন সমস্যা ছিল না। কারণ জার্মানিতে সহৃদয় মানুষের অভাব নাই আর আমার ঘুমাতে খুব একটা জায়গাও লাগে না। কোনো ব্যবস্থা না-হলে মেট্রো, রেল স্টেশন আছে না...।

সমস্যা এই সব না, সমস্যা হচ্ছে এরা হিটলারের আচরণ থেকে এখনও বেরুতে পারেনি। অথচ অতি দ্রুত গা থেকে এই গন্ধটা মুছে ফেলাটা এদের জন্য অতি জরুরি। এটা যত দ্রুত এরা বুঝতে পারবে ততই মঙ্গল। এরা কি কেবল এটাই চেয়েছে, অন্য একটা দেশের মানুষ এসে পুরষ্কারের নামে কাঁচের একটা চারকোনা বাক্সই কেবল নিয়ে যাবে? তাহলে ডিএইচএল সার্ভিসে কাঁচের বাক্সটা পাঠিয়ে দিলে সমস্যা কী ছিল? অহেতুক এই হুজ্জত, আমার পেছনে বেশুমার টাকা খরচের আদৌ প্রয়োজন ছিল না। এদের ভাষায়ই বলি, 'ডুমকফ'। নির্বোধ!
এরা কি এটাই চেয়েছে, আমি একজন অমানুষ হিটলারের ভাবাদর্শে গোটা জার্মান জাতিকে দেখি, এই ভুল ধারণা নিয়েই থাকি? কিন্তু এটা তো আমি করতে পারি না, হিটলারের মত মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য গোটা জাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা। জার্মান একজন মা যখন কাঁদবেন তার সঙ্গে আমিও কাঁদব, তিনি হিটলারের মা হলেও...।

*বৈদেশ পর্ব, আট: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post.html

সহায়ক লিংক: 
১. বৈদেশ পর্ব, ছয়: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_29.html    

বৈদেশ পর্ব: ছয়

শেষ পর্যন্ত আমার জার্মানি যাওয়াটাই স্থির হলো। এর পূর্বে তিতাসের পানি কোথায় কোথায় গড়িয়েছে সেটা খোদ তিতাসেরও জানা নেই!
আমি জানতেও পারিনি কখন অপরাধটা করে ফেলেছি, আস্ত এক অপরাধি হয়ে বসে আছি। ববসের প্রতিযোগিতায় আমার সাইটটা নির্বাচিত হয়ে গেছে।
আমি নিরিবিলিতে দু-কলম লিখতাম, সেই বেশ ছিলাম। হঠাৎ করে পেছনের কাতারের মানুষটা সামনের কাতারে চলে এসে বড়ো একটা ভজকট হয়ে গেল! এরপর শুরু হলো একের পর এক নাটক। নাটকের একেক কুশীলবের কী দুর্ধর্ষ সব অভিনয়। যিনি সকালে ফোন করে অভিনন্দন জানান তিনি অন্য নামে বিকালে আমার বাপান্ত করেন। কী একেকজনের নসিহত- আমাকে কেমন করে বসতে হবে, হাঁটতে হবে এই সব এরা শেখাবার চেষ্টা করেন।

এরিমধ্যে জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে আমার ভয়াবহ ঝামেলা হলো [১]। যারা গ্রে-মেটার নিয়মিত সাবান দিয়ে ধৌত করেন তারা মূল সুরটাই ধরতে পারলেন না। ঘটা করে আমাকে জানাতে লাগলেন, তিনি কয়টা দূতাবাসে দাঁড়িয়েছেন। যেন এই ভদ্রলোকের মত আমার বিদেশে চাকরির বড়ো শখ যে আমি দূতাবাসে দূতাবাসে লাটিমের মত ঘুরপাক খেতে থাকব।
একজন গভীর সন্দেহ পোষণ করলেন, এটাই আমার প্রথম বিদেশ সফর তাই আমার ধারণা নেই ইত্যাদি। ইনার কাছেও আমাকে প্রমাণ দিতে হবে ইনি যখন ডায়াপার ভিজিয়ে ফেলেন তখন আমি বিমানে ব্লাডার হালকা করি।

তিতিবিরক্ত হলেও এই সব নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছিলাম না। তবে দূতাবাসের বিষয়টা আমি কোন অবস্থাতেই সহজ ভাবে নিতে পারছিলাম না। অশালীন, অভদ্র, অমার্জিত আচরণ করার কোন অধিকার কোন দূতাবাসের নাই। এই অধিকার অন্তত আমি কাউকে দেই না। একটা স্বাধীন দেশে একটা দূতাবাসের এই আচরণ ধৃষ্টতার পর্যায়ে পড়ে। আমার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, দূতাবাস প্রয়োজন মনে করলে ভিসা দেবে না এই নিয়ে আমি দ্বিতীয়বার একটা শব্দও ব্যয় করব না। 
কিন্তু এখানে আমার ব্যক্তিগত অপমান ছাড়িয়ে যাচ্ছিল আমার নিজের দেশের প্রতি তাচ্ছিল্য। এদিকে বাক স্বাধীনতার নামে অতি কুৎসিত ছবি, ততোধিক কুৎসিত কথা লেখা হতে থাকে আমার নামে। আমি অপেক্ষায় ছিলাম, এই বাক স্বাধীনতাটা নিজের উপর পড়লে কেমন লাগে- হিস্ট্রি রিপিট! 

আমি আয়োজকদের আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়ে দিলাম আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এটা কোন ঝোকের মাথার সিদ্ধান্ত ছিল না। আমার সমস্ত জীবনে ঠান্ডা মাথার কোন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি এমন উদাহরণ প্রায় নেই বললেই চলে। 
আমার আপন একমাত্র মামা সঙ্গে আমার সম্পর্ক এতোটাই শীতল আজও তাঁর সঙ্গে কথা বলি না। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স কেবল সতেরো। মামা নামের মানুষটার অপরাধ ছিল এটাই তিনি তখন আমাদের হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই দিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই মানুষটাকে আমার প্রয়োজন নাই। মানুষটা পরে অনুতপ্ত হয়েছিলেন কিন্তু আজও তাঁকে আমি ক্ষমা করিনি। প্রবাসী এই মানুষটা অনেক চেষ্টা করেও আমার সেল নাম্বারটা এখনও যোগাড় করতে পারেননি, সে সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি।

তো, সিদ্ধান্তটা জানিয়ে নিজেকে নির্ভার মনে হলো। কারণ আমার হাতে আছে প্রতিজ্ঞার ভয়াবহ অস্ত্র। আমার প্রতিপক্ষের সংখ্যা এবং তাদের আস্তিনে লুকানো ভালবাসার অস্ত্রগুলো সম্ভবত খাটো করে দেখেছিলাম। এঁরা সবাই মিলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমি গা করি না, প্রতিজ্ঞা নামের আমার অতি চেনা এই অস্ত্রটা নিয়ে অতীতে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অভাব নেই।
প্রতিপক্ষের লোকজন একের পর এক অস্ত্র ছুঁড়তেই থাকেন, অপমানিত হয়েছে বলে তুমি যে কেবল তোমার দেশ দেশ করছ, এটা আমাদের ভারতীয়দের গায়ে লাগছে না? বাংলা ভাষায় কি কেবল বাংলাদেশের লোকজনই কথা বলে? আমরা বলি না?
শেষে এঁরা ব্রক্ষ্মাস্ত্র ছুঁড়ে দেন। কে কবে ব্রক্ষ্মাস্ত্র ফেরাতে পেরেছে? এঁরা গাঢ় স্বরে বলেন, কই, হিন্দি ভাষায় তো বাংলায় চেয়ে অনেক বেশি মানুষ কথা বলে কিন্তু হিন্দি তো এখানে নাই। আমরা এবারই প্রথম বাংলা ভাষাটাকে অনেক ভাষার সঙ্গে এখানে যোগ করতে যুদ্ধ করেছি। তুমি যদি না আসো তাহলে এই সব জটিলতায় হয়তো আগামিতে বাংলা ভাষাটা এখান থেকে বাদ পড়বে। তুমি কি চাও তোমার কারণে এটা হোক?

আমি আমার হাত থেকে অস্ত্রটা ফেলে দিলাম। পরাজিত আমি কিন্তু কিছু পরাজয়েও সুখ। আমি অনেক কিছুই হয়তো ভুলে যাব কিন্তু এই মানুষদের মমতার কথা বিস্মৃত হবো না। আমার যখন মৃত্যুযন্ত্রণা উপস্থিত হবে তখন কি এই সুখ-স্মৃতিগুলো মনে পড়বে, মস্তিষ্ক কি তখন সচল থাকবে? থাকলে বেশ হতো, যন্ত্রণাটা খানিকটা হয়তো কমত।

আমি নিস্তেজ হয়ে বলি, আচ্ছা যাও, আমি যাব। এঁরা অতি উঁচু পর্যায় থেকে দূতাবাসের জন্য জার্মান ভাষায় বিশদ লিখে চিঠি পাঠান। যেখানে লেখা, হের আলী মাহমেদকে এখানে কেন থাকা প্রয়োজন ইত্যাদি। সঙ্গে ই-টিকেট [২]
অবশেষে জার্মান দূতাবাস ভিসা দেয়।

২০ জুন রাত সাড়ে নটায় আমি দেশ ত্যাগ করি, অনেকটা চোরের মত। কারণ বাংলা ভাষার জন্য কেবল দায় পড়েছে ডয়চে ভেলের এবং আমার। সাহেবরা একটা লাড্ডু ডয়চে ভেলের হাতে ধরিয়ে দেবে, অন্যটা আমার হাতে। আমাদের যে লাড্ডু খাওয়ার বড়ো শখ...।

*বৈদেশ পর্ব, সাত: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_3252.html

সহায়ক লিংক: 
১. বৈদেশ পর্ব: চার: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/this-is-my-land.html
২. বৈদেশ পর্ব: পাঁচ: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_04.html