Saturday, June 12, 2010

পেঁচবুক ওরফে ফেসবুক এবং বিবিধ

'পেঁচবুক' ওরফে ফেসবুক জিনিসটায় আমি খুব একটা আরাম পাই না। জানি না কেন আমার কাছে এটা হিজিবিজি হিজিবিজি মনে হয়! আমার একটা ফেসবুক একাউন্ট আছে বটে, কেউ বন্ধু হওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট পাঠালে চোখ বুজে কনফার্ম বাটনে চাপ দিয়ে দেই। এখন পর্যন্ত বন্ধুর সংখ্যা সম্ভবত দুশো ছাড়ায়নি।
কেউ কেউ যখন বলেন আমার বন্ধু সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার তখন আমি চোখ বড় বড় করে বলি, 'উরি বাবা', উরি বাবা!

ফেসবুকে আমার থাকা হয় খুবই কম। সলাজে কখনও আমার পছন্দের কোনো লেখা শেয়ার করি। কেউ কেউ পড়েন, এই-ই। এখানে, অন্যদের কিন্তু আমার উপর বিরক্তির শেষ নাই কারণ এঁরা বিভিন্ন বিষয়ে আমন্ত্রণ জানান কিন্তু এতে আমার কোনো যোগ নেই। বিরক্তির একশেষ এই সব মানুষদের মধ্যে দু-একজন ব্যতীত...।

একটা বিষয় এখানে খুব চালু, 'লাইক দিস'। ইহা পছন্দ করিলাম। একজন হয়তো লিখল, 'জানেন, আমার না চুল কাটাবার পয়সা নেই'। 
ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো 'লাইক দিস' পড়ল। একজনের চুল কাটাবার পয়সা নেই অথচ আমরা দাঁত কেলিয়ে রাখছি। কী চরম অমানবিকতা- কী নিষ্ঠুর রসিকতা!
সম্প্রতি দেখলাম, মাহমুদুল হাসান রুবেল তার একটা লেখা শেয়ার করেছেন, "মৃত্যুর কাছে অসহায়"- ওখানে তিনি লিখেছেন তার বাবা হাসপাতালে মারা যাচ্ছেন... এর হৃদয় বিদারক বর্ণনা। 
এখানে কোনো মন্তব্য নাই তবে এখানেও পাঁচজনের 'লাইক দিস'! একজনের বাবা মারা যাচ্ছেন এখানে লাইক দেয়ার কি আছে কে জানে!
কি জানি, এই সবই হয়তো এখানকার নিয়ম, যা আমি খুব ভালো একটা বুঝি না। মৃত্যু নিয়ে রসিকতা করাটাও হয়তো এক প্রকার রসিকতা! ফেসবুক তাহলে রসিকতার ভান্ডার হয়ে যাচ্ছে, কাত করলেই গড়িয়ে পড়বে!

তবে ফেসবুকের বিপুল ক্ষমতা দেখে আমার মুগ্ধতার শেষ নেই। নিমিষেই একটা লেখা বা প্রসঙ্গ পঙ্গপালের মত ছড়িয়ে যায়। এই দানবীয় ক্ষমতার প্রতি আমার সীমাহীন সমীহ আছে। 
ফেসবুক নিয়ে ক-দিন ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে গেল আমাদের দেশে। আমাদের দেশের বুদ্ধিমান আমলারা এটা বন্ধ করে দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ [১] বলতে কি বোঝায়। 
প্রক্সি সার্ভার দিয়ে ফেসবুকে লগ ইন করে প্রায় সবাই দাঁত বের করে একজন অন্য জনকে বলত, আহারে, ফেসবুকে ঢুকতে পারছি না। অনেকে অবশ্য বিভিন্ন কারণেও মন খারাপ করতেন, তিনি নাকি তাঁর ফার্মের গরুকে খাওয়াতে পারছেন না, গরু ভেগে যাবে বলে। এই দেশের লোকজনের মাথা খারাপের মত হয়ে গেল! দেশটা বন্যায় ডুবে গেলেও সম্ভবত এতটা কাতরতা থাকত না- সম্ভবত কলাগাছের ভেলায় করে ফেসবুক ব্যবহার করতে পারলে আর কোন ক্ষোভ থাকত না।

কেবল বাংলাদেশেই নাকি এর ব্যবহারকারী ন-লাখ! ভাবা যায়! ফেসবুকে একটা একাউন্ট না থাকাটা এখন মাথা কাটা যাওয়ার মত অবস্থা, যেমন কেউ যদি শোনে কারও সেল ফোন নাই অনেকটা এমন। কারও ফেসবুক নাই এটা জানার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভবত তার শরীর থেকে ভক করে সরষে তেলের গন্ধ বের হয়! মানুষটাকে গ্রাম্য-গ্রাম্য মনে হয়।
...
সম্প্রতি ফেসবুক সংক্রান্ত, বিখ্যাত লেখক (!) আনিসুল হক সাহেবকে [২] নিয়ে কঠিন একটা লেখা আমাকে লিখতে হয়েছিল। লেখাটা কঠিন করে লেখার আদৌ ইচ্ছা আমার ছিল না। কিন্তু বিষয়টা কেবল একজনের ফেসবুকের স্ট্যাটাসই ছিল না। ছিল অধিকারের। বিষয়টা ইতিপূর্বেও অনেকেবার ঘটেছে। 
আনিসুল হকের মত প্রিন্ট-মিডিয়ার লোকজন এটা কবে বুঝবেন, এই গ্রহে অসংখ্য শব্দ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একজন পরম মমতায় শব্দগুলো জড়ো করে তাঁর নিজস্ব একটা ভুবন রচনা করেন। সেই মানুষটার সন্তানসম লেখা যখন অবলীলায় নিয়ে নেয়া হয় তখন এটাকে বলা যেতে পারে 'শব্দ ছিনতাই'!

অন্য কেউ হলে হয়তো আমি তেমন গা করতাম না কিন্তু তাই বলে একজন লেখক! আমরা তো আবার লেখকদের দেখে দেখে শিখি। এরা কেমন করে কপকপ করে জ্যোৎস্না খান, জ্যোৎস্নায় গোসল করেন, কেমন করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ডিম ভাজেন, শপিং মলের ফিতা কাটেন ইত্যাদি।

অভ্র-বিজয় বিতর্ক নিয়ে আমার একটা মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। গুগলে সার্চ দিয়ে এটা আমি খুঁজছিলাম। যে লিংকে গিয়ে আমি এটা পেলাম ওখানে এটা পড়ে আমি হতভম্ব [৩]। আমার মন্তব্যটা চাইল ডয়চে ভেলে আর লেখাটা লিখল গিয়ে এরা? বিষয় কী! 
পরে ডয়চে ভেলের সাইটে [৪] লেখাটা পেয়েছিলাম কিন্তু আমার জন্য বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়াল কে কারটা কপি করল?
তো, একজন লেখক যখন এমন মনোভাব পোষণ করেন তখন ডয়চে ভেলের লেখাটা যে গণিমতের মাল মনে করে ছাপিয়ে দিল তাদের খুব একটা দোষ দেই কেমন করে?

প্রিন্ট-মিডিয়ার সঙ্গে লড়াইটা এই কারণেই আমার। বাচ্চাদের নিয়ে একটা আঁকাআঁকির অনুষ্ঠানে কাভার করতে আসা জাতীয় দৈনিকের স্থানীয় সাংবাদিকরা আমার উপর প্রায় ঝাপিয়ে পড়লেন। এলাকার বলে আমার উপর এঁদের দাবীটা প্রবল, তাঁদের হইচই-এ কানে তালা লেগে যাওয়ার দশা। 
এঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, আমি কেন এক সাক্ষাৎকারে [৫] এটা বলেছি, "...অনলাইনে যারা লেখালেখি করেন তাদের প্রতি প্রিন্ট মিডিয়ার আছে সীমাহীন তাচ্ছিল্য...এখন প্রিন্ট-মিডিয়ার গালে সজোরে একটা চপেটাঘাতের ব্যবস্থা হয়েছে"।
তাঁদের ক্ষোভ, এটা আমাদেরও গায়েও লাগে ইত্যাদি।
আমি বললাম, প্রিন্ট-মিডিয়ার মধ্যে ভানবাজিটা বড়ো বেশী প্রবল, সব মিলিয়ে আমি ওই মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এঁরা কেউ বুঝতে চাইলেন না। 

তখন আমি তাঁদের বললাম, বেশ, বিশদ উত্তরটা আমি এখন দেব না, দেব ৪৮ ঘন্টা পর। আমাকে কিছুই বলতে হয়নি, ৪৮ ঘন্টাও লাগেনি, ২৪ ঘন্টার মধ্যেই [৬] এঁরা উত্তরটা পেয়ে গিয়েছিলেন।

অবশ্য আমি এটা ভেবে ভেবে খুব মজা পাই, প্রিন্ট-মিডিয়ার, বিশেষ করে পত্রিকায় চাকরি করেন এমন কারো ব্লগ-সাইট যদি 'ববস' থেকে নির্বাচিত হতো তখন তাঁদের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হতো? মতি ভাইয়ার মত মানুষরা এটা কাভার করার জন্য অন্তত অফিসের পিয়ন-চাপরাসী হলেও কাউকে পাঠাতেন। 

কোন কম্যুনিটি ব্লগে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে যখন আমাকে নিয়ে অতি কুৎসিত ছবি দেয়া হয়, ততোধিক কুৎসিত কথা বলা হয় তখন সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেন। হিস্ট্রি রিপিট- তামাশা দেখা ভাল, তবে এই তামাশাগুলো যখন নিজেদের উপর দিয়ে যাবে তখন কেমন লাগবে এটা দেখার অপেক্ষায় আছি। জয় হোক মত প্রকাশের স্বাধীনতার!
প্রিন্ট-মিডিয়ার, এমব্যাসির [৭] সঙ্গে আমার এই লড়াইটা যে কেবল আমার নিজের জন্য না এটা অনেকে বুঝতে চাইছেন না। এদের বোঝাতে আমার বয়েই গেছে।

সহায়ক লিংক:
১. ডিজিটাল: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_8733.html 
২. আনিসুল হক: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_08.html 
৩. অভ্র-বিজয়, bdnationalnews.com: http://tinyurl.com/33kuhj8 
৪. অভ্র-বিজয়, ডয়চে ভেলে: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,5590862,00.html 
৫. সি-নিউজ: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_24.html 
৬. আয়োজন করে কান্না: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_05.html 
৭. বৈদেশ পর্ব, চার: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/this-is-my-land.html 
৮. এ থিফ অফ ব্লগ সাইট!: http://www.somewhereinblog.net/blog/sali75blog/29153062