Friday, June 11, 2010

আবেগ-বিবেক!

নিমতলী অগ্নিকান্ড থেকে প্রকৃতি আমাদের যে শিক্ষাটা দেয়ার চেষ্টা করল তা থেকে আমরা কি শিখলাম কে জানে! পূর্বের একটা পোস্টে আমি লিখেছিলাম, প্রকৃতি চিৎকার করে করে বলছে...[১] । আমাদের আবেগ কখনো কখনো মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে। ক-দিন পর গোল্ড ফিসের মত সমস্ত কিছু বিস্মৃত হই। এই নিমতলী অগ্নিকান্ডের ঘটনা ভুলতে আমাদের খুব বেশী একটা সময় লাগবে না।

পূর্বের পোস্টে আমি উল্লেখ করেছিলাম, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে রোগীদের বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছে। ঝলসানো সমস্ত শরীর, এই অসহনীয় গরমে বারান্দায় পড়ে থাকার কী অসহনীয় কষ্ট এটা ভুক্তভোগী ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবে না, বোঝা সম্ভব না- এটা বোঝার ক্ষমতা অন্য কারও নাই! তার উপর আমাদের অতি উৎসাহী রাজনীতিবিদ, সুশীল, মিডিয়ার (এখন দেশে এদের সংখ্যা কত, আল্লাহ জানেন) পদভারে জায়গাটার সঙ্গে নরকের কোন ফারাক নাই!

চিকিৎসার পাশাপাশি অতি জরুরী ছিল ২৪ ঘন্টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে এঁদের রাখার ব্যবস্থা করা। ওই লেখায় আমি যেটা বলেছিলাম, প্রয়োজনে সচিবালয় থেকে এসি খুলে নিয়ে আসুন, জেনারেটর আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করুন কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই সব সমস্যার সমাধান করুন।

আমার জানামতে, উল্লেখযোগ্য তেমন কোন পরিবর্তনই হয়নি। লাভের মধ্যে যা হয়েছে, অতি ফোকাসের কারণে নিমতলী রোগীদের (২৪জন) জন্য অন্য রোগীরা (২৩৮জন) সীমাহীন দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই নিয়ে অসম্ভব তথ্যবহুল একটা লেখা লিখেছেন মশিউল আলম [২]। 
এমনিতেও ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে গড়ে রোগি থাকেন আনুমানিক ৩০০ জন। এই ২৫০ জনের কি দুর্ভোগ হয় তা সহজেই অনুমেয়।

নিমতলী ট্রাজেডির শিকার তিন মেয়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রী মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এটা অসম্ভব ভাল একটা উদ্যোগ। ক্ষমতাবান মানুষদের চারপাশের বর্ম একজন মানুষকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলে কিন্তু কখনও-না-কখনও সেই মানুষটা চোখেও জল আসে, মন কাঁদে। এতে চোখ সরু করে তাকাবার কিছু নেই। নিজ দায়িত্বে প্রধানমন্ত্রী এই তিনজন মেয়ের বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি নিজ মেয়ের সম্মান এদের দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আমি তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ দেই, মন থেকে। হয়তো কোন একটা উদ্যোগ না নিলে এই মেয়েগুলোর বিয়েই হতো না। অন্তত একটা গতি তো হলো।

কিন্তু এই বিয়েকে উপলক্ষ করে যে বিপুল আয়োজন করা হয়েছে আদৌ এর প্রয়োজন ছিল কি না এ নিয়ে আমার খানিক বক্তব্য আছে। এই বিয়ের অন্য প্রসঙ্গগুলো বাদ দিলেও (যৌতুকের বিষয়গুলো একরকম চলেই আসল) এই বিয়েতে অতিথি ছিলেন ৩০০০। এত অতিথির প্রয়োজন হলো কেন? এটা কি খুব ভালো একটা উদাহরণ সৃস্টি হলো?

মিডিয়ার খেলাও আমরা দেখলাম। ইলেকট্রনিক মিডিয়া তো লাইভ অনুষ্ঠানই প্রচার শুরু করল। ..., আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? আচ্ছা, ওখানকার এখন কি অবস্থা? আপনি কি বাবুর্চির সঙ্গে কথা বলেছেন, ইত্যাদি।

প্রধানমন্ত্রীর আপন মেয়ের বিয়ের সময়ও ৩০০০ মানুষকে অতিথি করা হয়ে থাকলে আমার পছন্দ করার কারণ ছিলনা। কারণ এটা একটা কু-উদাহরণ। এই সব মানায় সাকাচৌ টাইপের মানুষদের [৩] 
যে দেশের প্রায় ৭৫ লাখ লোক প্রতি রাতে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়, যে দেশের ৭৫ ভাগ মানুষ ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে সেই দেশে একটা বিয়েতে ৩০০০ মানুষকে অতিথি করার ভাবনাটাই অস্বাভাবিক!
যতটুকু জানতাম, 'অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন' বলে একটা আইন ছিল। এটা এখনও চালু থাকার কথা। সম্ভবত ১০০-এর উপর হলে একটা অংকের টাকা সরকারের কোষাগারে জমা হওয়ার কথা। এখানে সম্ভবত এটা প্রযোজ্য হবে না।

কু-উদাহরণ হচ্ছে একটা চেইন। এখন যেমন গোটা দেশ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকা লাগাবার প্রতিযোগীতায় নেমেছে। কে কার চেয়ে বড়ো পতাকা লাগাতে পারে। একজন ১০ ফুট লাগিয়েছে তো অন্যজন ২০ ফুট। এখন পর্যন্ত ৬০০ ফুট দীর্ঘ পতাকা বানাবার রেকর্ড দেশে হয়েছে। এক পক্ষ আর্জেন্টিনার ৬০০ ফুট লাগিয়েছে তো অন্য পক্ষ ব্রাজিলের ৬০০ ফুট পতাকা! এই অসভ্যতা পত্রিকাওয়ালা আবার ঘটা করে ছাপায়!
দেশে ফুটবল খেলার মাঠের খবর নাই, খেলার কোন আয়োজন নাই, এতে আমাদের কোন লাজ নাই। একজন মি. সালাউদ্দিন যে কাজটা করে দেখিয়েছেন, মানুষটাকে স্যালুট না করে উপায় নেই।

আমি জানি ফুটবলপ্রেমিরা ক্ষেপে শার্টের হাতা গোটাচ্ছেন। আমি নিজে ফুটবল খেলা দেখি না এমন না। যার খেলা ভালো লাগে তার জন্যই আমার উল্লাস। কোথাও অতিরিক্ত ফোকাস হলে মূল প্রসঙ্গ অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই গ্রহের সমস্ত দল বাদ দিয়ে কেবল দুই দলকে নিয়ে মাতামাতির কোন অর্থ হয় না। আমি খুশি হবো যদি বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল বিদায় হয়। এটা আমার নিজস্ব ইচ্ছা-মত, অন্য কারও মত পরিবর্তন করাবার খায়েশ আমার নাই।

দেশটা উন্নত কোন দেশ হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে করদাতারা জানতে চাইতেন। চাইবে না কেন? কারণ সকালে দাঁত মাজার পেস্ট থেকে শুরু করে রাতে ফেস-ওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়া পর্যন্ত পরোক্ষ ট্যাক্স জনগণ তো দিয়েই যাচ্ছে। ওই সব দেশে এদের জন্য জানতে চাওয়াটা দোষের কিছু না। এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত কত টাকা খরচ হয়েছে? যে টাকাটা খরচ হচ্ছে এটা কি ব্যক্তিগত? ব্যক্তিগত হলে এই টাকার উৎস কি? ব্যক্তিগত না হলে হাজারটা জবাব দাও। ভাগ্যিস, দেশটা বাংলাদেশ।

সহায়ক লিংক:
১. প্রকৃতি চিৎকার করে করে বলছে...: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_06.html 
২. মশিউল আলম: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=13&date=2010-06-11 
৩. সাকাচৌ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_607.html 
৪. ক্ষুধার সঙ্গে রসিকতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_3172.html

আমাদের ফতোয়াবাজ


ফতোয়া নিষিদ্ধ করে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন।

প্রায় ১০ বছর হতে চলল এর সুরাহা এখনও হয়নি! সুপ্রিম কোর্টির আপিল বিভাগে এখনও শুনানির অপেক্ষায় আছে! কবে শুনানি হবে, কবেই বা এর রায় হবে কেউ জানে না!

২০০০ সালে ফতোয়ার বিরুদ্ধে বিচারপতি গোলাম রব্বানী এবং বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার আদালত কেন ফতোয়া প্রদানকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না এই বিষয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করেন।

এই প্রেক্ষিতে মুফতি (!) ফজলুল হক আমিনী [১]। ২০০১ সালে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন এবং ২০১০ সালেও এসেও এই মৃত্যুদন্ড আমিনী বহাল রেখেছেন। আমিনী বলেন, "রাব্বানী, তোমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলাম, সেটা এখনো বহাল আছে।" (প্রথম আলো ১৬.০৩.১০) 

একটা সভ্য দেশে একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে এমন হুমকি দেয়া যায়, বছরের পর বছর ধরে সেই মৃত্যুদন্ড বহালও রাখা যায় আবার এটা সেই বিচারপতিকে সদম্ভে মনেও করিয়ে দেয়া যায়! সেই দাম্ভিক মানুষটা আবার মুক্ত ঘুরেও বেড়ায়। 
এরপরও যদি বলা হয় সেই দেশে আইনের শাসন বহাল আছে, এটা বড়ো হাস্যকর শোনায়!

অন্য দেশের দেখাদেখি [২] এই দেশেও ফতোয়ার নামে বিভিন্ন সময়ে নারকীয় ঘটনা ঘটেছে; নারীদের দোররা মারা হয়েছে, জোর করে হিল্লা বিয়ে দেয়া হয়েছে। অসংখ্য উদাহরণ থেকে একটাই উল্লেখ করি, দাউদকান্দিতে এক মেয়েকে দোররা মারা হয়েছিল। 
এখানে আমাদের পুলিশ বাহিনীর মন্তব্যে আমি বড়ো বিচলিত হয়েছিলাম, দাউদকান্দি থানার ওসি সাহেব বলেছিলেন (ইনাদের নাকি এখন প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হবে), "বিষয়টি পুলিশের জানা ছিল না। কেউ অভিযোগ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে"। (আব্দুর রহমার ঢালী, প্রথম আলো, ২৪.০৫.০৯) 

এই প্রসঙ্গে আমি লিখেছিলাম, "কেউ অভিযোগ করলে...। আমিও ভাবছি, কোন একটা অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ব। যাকে সামনে পাব তাকেই আল্লাহু আকবর। এবং আমি অবশ্য এও লক্ষ রাখব, অভিযোগ করার জন্য যেন সংশ্লিষ্ট কেউ বেঁচে না থাকে।"[৩] 

ধর্ম থাকুক না ধার্মিকদের মাঝে তীব্র শ্রদ্ধা-বিশ্বাস নিয়ে [৪], যার যার প্রভু থাকুন না তার মত করে [৫] মোল্লাদের সমস্যা কোথায়? 
২০০১ সালে ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায়ের পরপরই ইসলামী দলগুলো এর বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। যাদের মধ্যে আমিনী এবং জামায়েত অন্যতম।
চুরি-চামারীর বিষয়ে ইসলাম কি বলে এটা জানার খুব ইচ্ছা, আমাদের ধর্মের বাহকগণের কাছে। ৯১ সালে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি মহা-কবি [৬] এরশাদ সাহেবের বিরুদ্ধে কমিশন মোট ৫৩৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ চিহ্নিত করেছিল। প্রতিটি অভিযোগের বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা মামলা দায়ের করা সম্ভব বলে অভিমতও প্রকাশ করেছিল। এবং অনেক মামলায় এরশাদ সাহেবের সাজাও হয়েছিল। এটাও আমি জানতে আগ্রহী কোন ধরনের চুরি করলে হাত কেটে ফেলার বিধান আছে।

বিচিত্র এই দেশ, ততোধিক বিচিত্র এই দেশের মানুষ! কত বিচিত্র শাসক [৭] আমাদের দেশ শাসন করে গেছেন! অন্ধকার ফিরে আসে বারবার [৮]

আর এই ছবিটিরই বা ব্যাখ্যা কি? আমাদের ধর্মবাজদের আবার খালেদা জিয়ার প্রতি অনেক অনেকখানি সমীহ আছে, ধর্মবাজরা আবার এও মনে করেন শেখ হাসিনা থাকলে ধর্মের পিলারটা নড়বড়ে হয়ে যাবে।

তো, ইসলাম ধর্মে এমন ছবির ভঙ্গির বিষয়ে কি বক্তব্য? আর যুগের পর যুগ ধরে এঁরা মহিলা শাসন কেবল মেনেই নিচ্ছেন না পুচ্ছও আন্দোলিত করছেন। এখানে ধর্ম রসাতলে যাচ্ছে না, না?

*ছবি সূত্র: প্রথম আলো

সহায়ক লিংক:
১. ফজলুল হক আমিনী: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_17.html 
২. পরম করুণাময় ভাজা ভাজা হন...: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_04.html 
৩. দোররা: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_24.html 
৪. ধর্মনিরেপেক্ষতা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6312.html 
৫. সন্তানরা যেন থাকে দুধে-ভাতে: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_06.html 
৬. মহা কবি: http://www.ali-mahmed.com/2009/03/blog-post_09.html 
৭. শাসক: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_3701.html 
৮. অন্ধকার ফিরে আসে বারবার: http://www.ali-mahmed.com/2009/07/blog-post_20.html