Thursday, May 27, 2010

প্রথম বাঙালি সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী আনিসুল হককে অভিনন্দন(!)

মুসা ইব্রাহীম অসাধারণ একটা কাজ করে ফেলেছেন। তিনি বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে এই গ্রহের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটাকে ঢেকে দিয়েছেন। অহংকারী এই এভারেস্টকে এখন থেকে অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকার ভারও সইতে হবে, সমীহের ভঙ্গিতে।

যে কোন বিষয়ে শ্রেষ্ট একজন মানুষ, বাংলাদেশের পতাকা যিনি বহন করে নিয়ে যাবেন, তাঁকে সেই দেশের মানুষকে হাত তুলে স্যালুট করতেই হবে।
মুসার কপাল ভালো, প্রতিযোগীদের মধ্যে কোন বাঙালী ছিলেন না নইলে কেউ হয়তো কারও স্লিপিং-ব্যাগে তেলাপোকা ছেড়ে দিত (হিমালয়ে যাইনি বলে আমি ঠিক জানি না, হিমালয়ে তেলাপোকা আছে কিনা? ডায়নোসর নাই, তেলাপোকা দিব্যি আছে, এই ভরসায় লিখছি), কেউ কারও স্নো-গগসের স্বচ্ছ কাঁচ ঝামা দিয়ে ঘসে দিত।
পরে ব্যর্থ হয়ে ফেরে এসে অন্যদের বিজয়ের গল্প মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখত।

আফসোস, সবাই মুসার কপাল নিয়ে আসেন না। অন্য জায়গায় পা ধরে টানাটানি করার জন্য অসংখ্য বাঙালি এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঈশ্বর হাতকে আঙুলে বিভক্ত করেছেন কাজের সুবিধার জন্য আর আমরা নিজেরা বিভক্ত হই দেশকে খাটো করার জন্যে। ওহ, ও ব্যাটা তো মিডিয়ার লোক না, ওর অর্জন হচ্ছে টিস্যু পেপার! আরে রসো, ও কি ছাই লেখে, এটা দিয়ে বাচ্চার...ও পরিস্কার করবে না কেউ।

মুসা ইব্রাহিমের অর্জনকে অন্তত খাটো করার চেষ্টা করা হচ্ছে না দেখে ভালো লাগছে। আমি এখনো বড়ো ভয়ে ভয়ে আছি, এই দেশের কেউ না আবার বলে বসেন, আরে সবটা পথ ও আবার হেঁটে গেছে নাকি? অর্ধেকটা পথ  তো গেছে ভারতীয় হেলিকপ্টারে। এটা ইন্ডিয়ার একটা চাল!

যাই হোক, আশা করছি, এই অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠবে না। কিন্তু আমি বিষাদের সঙ্গে লক্ষ করলাম, একজনের অর্জনকে বড়ো করে দেখা হচ্ছে না। এ অন্যায়! 
মুসা ইব্রাহিমের প্রথম সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যে বাঙালি তিনি হচ্ছেন, আনিসুল হক। তাকে আমি অভিনন্দন জানাই।

আনিসুল হকই প্রথম বাঙালি যিনি মুসা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রথম আলোয় (২৬.০৫.১০) তিনি লিখেছেন: "...এটা ২৫ মে কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের বেসক্যাম্পের ফোনে মুসা ইব্রাহীমের সঙ্গে প্রথম কোন বাঙালির কথোপকথন। এবং প্রিয় পাঠক, এই ঐতিহাসিক কথোপকথনটা আপনি পড়ছেন, আপনিও কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী। ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের এই গল্প আমরা করতে পারব। হা হা হা...।"

আসলেই তো তাই, আমরা আমাদের নাতি-নাতনিদের কাছে ফোকলা দাঁতে গল্প করব, নানা ভাই, কী কমু, পতম আলোর পতম বাঙালি আমাগো এই গল্পডা হুনাইছিল। এই দেখ, কেমুন লোম খাড়ায়া গেছে।

আচ্ছা, প্রথম আলো যে দ্বিতীয় শিরোনাম করেছে, "বেসক্যাম্পে ফিরে মুসা ইব্রাহিমের প্রথম সাক্ষাৎকার"। 
চট করে অনেক কিছু আমি বুঝে উঠতে পারি না, গুলিয়ে ফেলি সব। আমার এখনো চিকেন, কিচেন গুলিয়ে যায়। 
এটা নিয়ে আমি খানিকটা দ্বিধায় আছি, বেসক্যাম্পে ফিরে...মানে কী? বেসক্যাম্পে ফেরার পূর্বে বা বেসক্যাম্পের সীমানার মধ্যে আসার পূর্বেই মুসা ইব্রাহিমকে সাক্ষাৎকারের জন্য আটকে ফেলেনি তো কেউ? না-না, আমি ইয়েতি টিয়েতির কথা বলছি না- এমনিতে ইয়েতিরা মানুষের উপর খুবই বিরক্ত, এদের খুঁজে বের করার জন্য মানুষ হন্যে হয়ে আছে। 
বলছিলাম মানুষের কথা। কারণ পুরো লেখাটা পড়ে কোথাও এমনটা পেলাম না আনিসুল হক মুসাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইয়ে, মুসা ভাইয়া-মুসা ভাইয়া, আমার পূর্বে কেউ কি আপনার সঙ্গে কথা বলেছিল?

আনিসুল হক কথা বলেছেন বেসক্যাম্পের বাবুর্চির ফোনে। তিনি যখন বাবুর্চির ফোনে ফোন করেন তখন নেপালের সময় পৌনে ছয়টা, "'পৌনে ছয়টায় ফোন। হ্যালো আই ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট মুসা ইব্রাহিম স্টাটাস।'
'মুসা ইব্রাহিম স্পিকিং।'
'মুসা, আমি মিটুন দা।' আনিসুল হক।" [১]

জেনে ভালো লাগল কিন্তু আমার বুঝতে খানিকটা সমস্যা হচ্ছে। ডয়েচে ভেলে মুসা ইব্রাহিমের সাক্ষাৎকারের বিষয়ে জানাচ্ছে:
"...জার্মান সময় মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় ডয়চে ভেলেকে এই সাক্ষাকার দেন মুসা ইব্রাহীম৷ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের উত্তরাংশের বেসক্যাম্পে (তিব্বতের দিকে) তখন সবে নেমেছেন তিনি৷ চীনা এক টেলিফোন নম্বরে মুসাকে প্রশ্ন, এই যাত্রায় কোন বিপদে পড়েননিতো?...[২]"

এ তো বড়ো মুশকিল হলো! হিসাবে আমার গোলমাল না হলে, জার্মান সময় দেড়টা মানে হচ্ছে নেপালের সময় তখন সোয়া পাঁচটা! এদিকে আনিসুল হক কথা বলেছেন পৌনে ছয়টায়। এখন আমি কোথায় যাই, কার কথা বিশ্বাস করি? ডয়েচে ভেলের, নাকি আনিসুল হকের? 
আনিসুল হক কেবল একজন সংবাদকর্মীই নন, একজন লেখকও। কেবল গত বইমেলায়ই তাঁর ১২টি বই বেরিয়েছে, সেই বইগুলোর চমৎকার বিজ্ঞাপনও ছাপা হয়েছিল [৩]। যে বিজ্ঞাপনের মুগ্ধতা আমার এখনও কাটেনি। এমন একজন লেখকের কথা বিশ্বাস না করে উপায় কী! 
তাছাড়া আমরা তো আবার ছাপার অক্ষরের সব কথাই বিশ্বাস করি। ভার্চুয়াল ভুবনের কথার কী দাম!


 

ডয়েচে ভেলের মুসা ইব্রাহিমের দেয়া রেডিও সাক্ষাৎকার [৪] যখন শুনছি, তখন আমি কেন একটা বাচ্চাও বুঝবে, কথা বলার সময় মুসা তখন প্রচন্ড হাঁপাচ্ছিলেন। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ছিল না। অর্থাৎ তিনি তখনো বেসক্যাম্পের শান্ত পরিবেশে ছিলেন না বা মাত্র পা রেখেছেন।

নাহ, সব কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। স্বল্প বুদ্ধিতে এই জট খোলা আমার কম্মো না। এটা পত্রিকার জট খোলা বিভাগের জন্য না-হয় থাকুক।

এক আনিসুল হক এবং প্রথম আলোর যন্ত্রণাতেই বাঁচি না এরিমধ্যে আবার যোগ দিয়েছে, বিবিসি। বিবিসি দাবী করছে,
"বেস ক্যাম্পে ফেরার পর কোনো সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারে বিবিসি বাংলাকে মুসা ইব্রাহীম বলেছেন...।"[৫]

আমি যখন বিবিসির এই রেডিও সাক্ষাৎকার শুনছি, ওখানে মুসা বলছেন, তিনি বেসক্যাম্পে ফিরেছেন, আধা ঘন্টা হয়েছে। বিবিসি কি নিশ্চিত, এই আধা ঘন্টায় অন্য কেউ সাক্ষাৎকার নেয়নি?

বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে সময় দেখাচ্ছে, দুপুর ১টা ১৯ মিনিট। তার মানে হচ্ছে, কাঠমান্ডুর সময় (তিব্বতের এদিক-ওদিকে ঘুরপাক খেলেও কয়েক মিনিটের ব্যবধান হবে) তখন আনুমানিক ৬ টা। 
বিবিসির কথা আমি অবিশ্বাস করি কেমন করে? অবশ্য এটা সত্য, আমরা এদের অবিশ্বাস করে এদেশ থেকে ব্রিটিশ খেদিয়েছি কিন্তু এদের বানানো আইন দিয়ে এখনো এই দেশ চলে- আমাদের দেশে বিবিসি যখন খবর পরিবেশন করে তখন আমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে-শুয়ে-বসে শুনি!

এদিকে আবার ডয়েচে ভেলের সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় হচ্ছে, সোয়া পাঁচটা (যদিও এরা একবারও দাবী করেননি, প্রথম সাক্ষাৎকার এরাই নিয়েছেন)।

কথা সেটা না, এরা সবাই মিলে আমাকে কি আনিসুল হককে অভিনন্দন জানাতে দেবে না? এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়! আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বিদেশী চক্রান্ত সফল হতে দেব না। কালো হাত গুড়িয়ে দাও। 

সহায়ক লিংক:
১. প্রথম আলোর প্রতিবেদন: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=1&date=2010-05-26 
২. ডয়েচে ভেলেকে দেয়া মুসার সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদন: http://www.dw-world.de/dw/article/0,,5605963,00.html
৩. আনিসুল হক, একজন আদর্শ সাহিত্যিক: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_07.html 
৪. রেডিও ডয়েচে ভেলেকে দেয়া মুসার সাক্ষাৎকার: http://www.dw-world.de/popups/popup_single_mediaplayer/0,,5605930_type_audio_struct_11977_contentId_5605963,00.html 
 ৫. রেডিও বিবিসিকে দেয়া মুসার সাক্ষাৎকার: http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2010/05/100525_mb_musaeverest.shtml