Saturday, May 22, 2010

কয়েদী: রেল-বাড়ি: ১

(শুরু হলো এক অন্য রকম দিন! যথারীতি আজও সূর্য উঠেছে। ঝকঝকে গাঢ় একটা নীল আকাশ। আজ ৫৬ হাজার বর্গমাইল নামের এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগারে আটকা পড়েছে, সাকিব-লুবাবা-রাফা নামের তিনজন মানুষ। অন্য ১৫ কোটি কয়েদীর সঙ্গে। একটা রেলগাড়িতে।
আটকা পড়ে আছে সাকিবের মার দুর্বল হৃদপিন্ড, যেটা এখনো চলছে ধুকধুক করে, প্রিয় মানুষের অপেক্ষায়। প্রিয় মানুষের স্পর্শ কী মৃত্যুযন্ত্রণা কমিয়ে দেয়? কে জানে, হয়তো দেয়, হয়তো দেয় না। জানা নেই।)

‘বাবা- বাবা, এটাই কি আমাদের দাদাবাড়ি?’
‘না’, সাকিব অসংখ্যবার এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ওর এই মেয়ে এমন অবুঝ হয়েছে কেন? অবশ্য এর বয়সই বা-কি, পাঁচ শুরু হল।
‘বাবা-বাবা, ও বাবা, ঠিক করে বলোই না ছাই, এটাই কি আমাদের দাদাবাড়ি না?’
সাকিব ধমক দিতে গিয়েও সামলে নিল, ‘বললাম তো মা এটা আমাদের দাদাবাড়ি না, তোমাকে তো আগেও অনেকবার বলেছি, বলিনি?’
রাফা ওর রেশমের মতো চুল নাড়িয়ে বলল, ‘হুঁ-উ।’
‘এই তো লক্ষ্মী মেয়ে, যাও খেলা কোরো গে।’


রাফা খানিকক্ষণ লক্ষ্মী মেয়ের মতো নিজে নিজে খেলল।
‘বাবা-বাবা, ও বাবা।’
‘আবার কি মা!’
‘এটা তাহলে কাদের বাড়ি? আমরা কি এখানে বেড়াতে এসেছি?’
‘রাফা বকবক করো না তো, চড় খাবে।’


এমন শক্ত কথায় কাজ হল না। রাফা বাবার মার দেওয়ার ব্যাপারটা এখনও দেখেনি, মা হলে অন্যকথা। রাফা সাকিবের গলা ধরে ঝুলে পড়ল, ‘বলতে হবে-বলতে হবে, এটা কাদের বাড়ি?'
‘এটা সরকারের বাড়ি, রেলবাড়ি, হলো তো।’
‘রেলবাড়ি কি, বাবা?’
‘রেলগাড়িই রেলবাড়ি, খবরদার আর একটা কথা না।’
‘আচ্ছা বাবা।’
‘রাফা, আর একটা কথাও না, লুবাবা প্লিজ রাফাকে সামলাও তো বড্ড বিরক্ত করছে। শেষে মেরে-টেরে বসব।’


লুবাবা পুরনো একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। শঙ্কিত দৃষ্টিতে সাকিবের দিকে তাকিয়ে ছোঁ মেরে রাফাকে একেবারে বুকের মাঝে নিয়ে এল। সাকিবকে কেমন উম্মাদ-উম্মাদ মনে হচ্ছে। মুখে ক-দিনের না-কামানো দাড়ি, টকটকে লাল চোখ, এই ক-দিন সম্ভবত চুলে চিরুনিও পড়েনি। সাকিব যখন খুব রেগে থাকে তখনই ওকে লুবাবা ডাকে নয়তো সুর করে বলে বাবা-লু-লু-লু। লুবাবা প্রথম প্রথম রাগ করে বলেছিল: খবরদার নাম নিয়ে ফাজলামো করবে না।
বেশ, তুমি আমায় বলো কোন শালা লুবাবা নাম রাখে।
লুবাবা রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিল। সাকিব সমস্তটা দিন রাগ ভাঙাতে পারেনি অবশেষে রাতে-। 

সাকিব নরোম গলায় বলেছিল: পাগল নাকি, ঠাট্টা করলাম আর তুমি কি-না!
লুবাবার গলাও নরোম: কেন তুমি এমন রসিকতা করবে। তুমি তো খোকা না, জানো না নাম-ধাম রাখে গুরুজন। তোমার কি একেবারেই লঘুগুরুজ্ঞান নেই।
সাকিব হাসতে হাসতে বলেছিল: আমি খোকাই তো, এই দেখ খোকার গায়ে কোন কাপড় নাই।
ছি!
ছি কেন, খোকার গায়ে কাপড় নেই এটা বললে, ‘নজ‌-জা’ আর খোকার সঙ্গে ওইসব-।
লুবাবা সাকিবের মুখ চেপে ধরেছিল। অন্যভাবে ওকে থামানো যেত না।


এখন রাফা দুহাতে মাকে জাপটে ধরে আছে। বাবার কাছ থেকে মার ওকে সরিয়ে নেয়ার ভঙ্গি দেখে রাফা তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝতে পারছে কোন একটা সমস্যা আছে। রাফা সর্বক্ষণ মাকে লক্ষ করে। মা হাসি-হাসি মুখ করে থাকলে তার আনন্দ হয়। মা মুখ অন্ধকার করে রাখলে ওর কিচ্ছু ভাল লাগে না, এমনকি কাঁদতেও না। মার শরীরে যেমন একটা মা-মা গন্ধ বাবার ঠিক উল্টোটা। বাবার শরীরে সবসময় সিগারেটের বিশ্রি গন্ধ। ওয়াক! 
বাবা বাবাই, অন্য কিছু কখনো মনে হয়নি। তবে বাবার সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করে। বাবাও তো ওর সঙ্গে বকবক করে বিরক্ত করে ফেলে কিন্তু আজ যে বাবা এমন করল? 
লুবাবা সহজ গলায় বলল, ‘সাকিব, রাফাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ।’
সাকিব চেঁচিয়ে বলল, ‘বেশ করেছি।’
‘আঃ, চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘বেশ করছি।’
‘আঃ সাকিব’।
‘বেশ করছি।’


লুবাবা ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, সাকিবের মধ্যে এখন পাগলামীর লক্ষণ স্পষ্ট। কেবলমাত্র পাগল এবং মাতালই ক্রমাগত একই কথা আউড়ে যায়। নাকি সত্যি সত্যি মদ খেয়েছে, তা কি করে সম্ভব? অবশ্য ওরা যেভাবে জীবন যাপন করছে বদ্ধউম্মাদ হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। ওরা দু-দিন ধরে যেখানে বাস করছে, এটা আসলে একটা রেলগাড়ির কামরা। চারদিকের জানালা বন্ধ, ফাঁক-ফোকর দিয়ে আলো বাতাস আসে। দিনেই দমবন্ধ হয়ে আসে রাতে তো, লূবাবা খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

সেদিন একনাগাড়ে টেলিফোনের রিং বাজছিল। লুবাবা শাওয়ারের নিচে ভিজতে ভিজতে ভাবছিল কখন রিং থেমে যাবে। নিরুপায় হয়ে প্রায় নগ্ন লুবাবাকে ফোন ধরতে হয়েছিল। রাফা গেছে পাশের বাড়ি। ‘জুলাপাতি’ খেলতে। সাকিব বাসায় থাকলেও ফোন ধরবে না। ও নির্ঘাত ঘুমাচ্ছে। ছুটির দিনে ওর কাজ একটাই মোষের মত পড়ে পড়ে ঘুমানো। ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ছুটির দিনে কেউ বিরক্ত করলে, ঘুম ভাঙিয়ে দিলে তার মৃত্যু অবধারিত। জনে-জনে এটা বলে রেখেছে। টেলিফোনের রিং তো মাছি-মশা, কামান দাগালেও সাকিবের ঘুমের কোন সমস্যা হয় না, লুবাবা রাগ চেপে বলেছিল: হ্যালো।
কে ভাবি, ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা গলা ভেসে এসেছিল।
হুঁ, কে?
ওপাশ থেকে ফোপানোর শব্দ এল: ভাবি, আমি, ভাইয়াকে ফোন দাও, ভাইয়া বাসায় আছে তো?
তুমি কে?
আমি রায়হান।
লুবাবা নাম বলায় চিনতে পারল। রায়হান ওর দেবর। আশ্চর্য ওর গলা শুনে একদম বুঝতে পারছিল না।
হ্যালো ভাবি, হ্যালো শুনতে পাচ্ছ না, ভাইয়া কি বাসায় নেই?
আছে, সমস্যাটা কি আমাকে বলো?
তুমি ভাইয়াকে দাও।
শোনো রায়হান, ও ঘুমাচ্ছে। ওকে এখন ডেকে তোলা যাবে না। আর এক্ষণ ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিলে কি অনর্থ করবে তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
প্লিজ ভাবি, প্লিজ।
লুবাবা এবার রাগ করে বলল, সমস্যাটা আমাকে বলতে অসুবিধা আছে?
ভাবি, তুমি ভাইয়াকে বল মা কথা বলতে চান।


লুবাবার গা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে তবুও ঘেমে গোসল হয়ে গেল। অবশেষে সাকিব দয়া করে সিকিভাগ চোখ খুলে পাশ ফিরে বলল, এখন না রাতে।
লুবাবা ভাবল ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকছে। গা ধরে এবার ঝাঁকাতেই সাকিব বলল: তুমি নিমফোম্যানিয়াক নাকি!
সাকিবের কথার অর্থ এতক্ষণে বুঝল। কী লজ্জা-কী লজ্জা! পাশাপাশি রাগে গা জ্বলে গেল। ওর এখন ইচ্ছা হয়ে থাকলেও নিমফোম্যানিয়াক হয়ে গেল, বাহ! অথচ সাকিব যখন খুশি যেভাবে খুশি-।
লুবাবা হিসহিস করে বলল: আমি তোমার সঙ্গে গা ঘষাঘষি করতে আসিনি। তোমার মা টেলিফোনে কথা বলতে চাচ্ছেন।


সাকিব যে ভঙ্গিতে ছুটে ফোন ধরল এই গতির সঙ্গে কেবল তুলনা চলে সপাং করে পড়া একটা চাবুকের সঙ্গে।
সাকিব টেলিফোন ধরেই ব্যাকুল হয়ে বলেছিল, হ্যালো মা।
ভাইয়া-ভাইয়া, হ্যালো ভাইয়া।
ও রায়হান তুই, ফোন দে মাকে।
এরপর রায়হান কি সব বলছিল সাকিব গুছিয়ে কিছুই বুঝতে পারছিল না। রায়হান কথা বলতে গুলিয়ে ফেলছে কেন, গাধা নাকি!
সাকিব চেঁচাচ্ছিল: রায়হান পরিষ্কার করে বল কি হয়েছে! আগের মত উল্টাপাল্টা বলে দেখ, এমন মার দেব জনমের মত টেলিফোন করা ভুলিয়ে দেব।
রায়হান থেমে থেমে বলেছিল: ভাইয়া, তোরা চলে আয়, মার অসুখ। মা-মা, মা, তোদের দেখতে চেয়েছে।
আবার বল।


সাকিব এবার রিসিভার কানে চেপে গভীর মনোযোগ নিয়ে মোনার চেষ্টা করছিল। রায়হান হুবহু আগের বলা কথাগুল্ই আউড়ে গেল। সাকিবের পায়ে জোর নেই। ভাঙা গলায় বলল: কাল থেকে হরতাল শুরু হচ্ছে এটা জেনেও বলছিস চলে আসতে?
ওপাশে কোনো সাড়া-শব্দ নেই লাইন কেটে গেল নাকি, রায়হান কি ফোন রেখে দিল!
হ্যালো রায়হান, হ্যালো।
হ্যা ভাইয়া, চলে আয়।


লুবাবা গা মুছে ফিরে এসে ভারী অবাক হয়েছিল। সাকিব রিসিভার হাতে ঠায় বসে আছে। অভিমান ভুলে ছুটে এসে সাকিবকে ধরে অবাক হয়ে বলেছিল: কি হয়েছে?
সাকিব শিশুর মত চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার মা, আমার মা মারা যাচ্ছে।

*রেল-বাড়ি, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_23.html

সহায়ক লিংক:
কয়েদী, ৪: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_22.html

কয়েদী, ৪: গণতন্ত্রের লেবেনচুষ!

‘রহমত, এসিটা কমিয়ে দিও।’
কুশী [১] বেদম কাশছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। এসি না চালালে ভাল হতো কিন্তু জানালা খুলে দিলে ধুলায় ওর আরও কষ্ট হবে। 

রহমত খুব আশাবাদী, ‘সার, চিন্তার কিছু নাই। হরতাল হইলেও বাবুর অসুখ বললে কেউ কিছু কইব না। ফিসাবিলিল্লাহ। টাইট হইয়া বইস্যা থাকেন।’

রহমতের আশ্বাস ফারাকে মোটেও প্রভাবিত করেনি। সে বেশ খানিকটা ভীত-সন্ত্রস্ত। শাহেদ ভোর থাকতেই বেরিয়ে পড়েছে। ক্ষীণ আশা, হরতালে যারা পিকেটিং করে এরা এত ভোরে উঠবে না। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ভালভাবেই পার হলো। ভৈরব ঢোকার মুখে আটকে গেল। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে, কালো ধোঁয়া পাক খাচ্ছে। সম্ভবত টায়ারে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।

রহমত উদগ্রীব হয়ে বলল, ‘সার, হর্ন বাজায়া স্পীড বাড়ায়া দিব?’
শাহেদ আঁতকে উঠল, ‘না-না বলো কি!’
রহমত জটলার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, সার, গাড়ি থামাব।’
‘হু।’
রহমত গাড়ি না-থামালে বিপদে পড়ত। টায়ার-টিউব, ছোট-ছোট গাছের গুড়ি ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। খুব কাছে না আসলে বোঝার উপায় নেই।
‘রহমত একদম মাথা গরম করবে না। নরোম হয়ে কথা বলবে।’
রহমত গ্লাস নামিয়ে মাথা বের করলে, জটলা থেকে নেতা টাইপের একজন এগিয়ে এল, ‘বিষয় কি, যান কই?’
রহমতের নম্র গলা, ‘ভাই একটু ঢাকা যামু।’
‘মিঞা, তুমি কি বাংলাদেশ থাহো না?’
‘ভাই, বিপদে পইড়া যাইতাছি।’
‘কিসের আবার বিপদ, রঙে বাইর হইছ।’


রহমত গাড়ির দরোজা খুলে ওই লোককে টেনে একপাশে নিয়ে গেল। অনেকক্ষণ লাগিয়ে গুজুর-গুজুর করল। একসময় হাসি মুখে ফিরে এল, ইগনেশন কি ঘুরিয়ে বলল, ‘সার, রওয়ানা দেই।’
শাহেদের বিস্মিত গলা, ‘রহমত, কি করলে বুঝলাম না!’
‘সার, একশো টাকা দিছি।’
‘কিসের জন্য!’
ওরা বলল সকাল থেকে রাস্তা পাহাড়া দিতাছে। নাস্তাও নাকি করেনি। তো, আমি বললাম ভাই আপনার মনে কষ্ট না নিলে আমি আপনেদেরকে নাস্তা করাই।’
‘তা তুমি নাস্তা করালে!’
রহমত একগাল হাসল।


ভৈরব পার হয়ে আবার দাঁড়াতে হলো, কিছু ছেলে চা-র দোকানের টুল-টেবিল জোড়া দিয়ে রাস্তার মাঝখানে বসে গল্প-গুজব করছে। গাড়ি দাঁড়  করাবার পরও ছেলেগুলো নির্বিকার। ভাবখানা এমন, রাস্তা এখানেই শেষ। 
রহমত বিনম্র গলায় বলল, ‘ভাই, আমরা একটু ঢাকা যাব।’
একটা ছেলে উদাসীন হয়ে বলল, ‘যান, হেঁটে যান। একটু কষ্ট করেন।’
অন্য ছেলেরা হইহই করে উঠল। রহমত ফিসফিস করে ছেলেটিকে কি যেন বলল। ফিরে এসে শাহেদকে বলল, ‘দুশোর কমে মানল না, সার।’
শাহেদ অন্যমনস্ক, ‘ঠিক আছে। এখন যেতে পারবে তো।’


যে ছেলেটি কথা বলছিল, ওই ছেলেটি গাড়ির কাছে এগিয়ে এল। শাহেদের বুক কেঁপে উঠল। তরুন রাগী যুবক, এদের বোঝা বড় দায়। যুবকটি ভব্যতার সীমা লঙ্ঘন না করে জানালায় নক করল। শাহেদ পাওয়ার উইন্ডো জানালার কাঁচ নামিয়ে মুখ বাড়াল।
‘ভাইজান, ঢাকা পর্যন্ত তো যেতে পারবেন না। ’
শাহেদ দুঃখিত গলায় বলায়, ‘বুঝলেন, আমার বাচ্চাটার না খুব অসুখ, না গিয়ে আমার কোন উপায় নেই।’
যুবকটি এবার ভাল করে কুশীর দিকে তাকাল। কুশী জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। সমস্তটা মুখ আগুনের মত গনগনে লাল। যুবকটি সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘জিস...ক্রাইস্ট!’ 

এবার মায়াভরা গলায় বলল, ‘প্রার্থনা করি আপনি  বাবুটাকে নিয়ে ভালয় ভালয় দ্রুত ঢাকা পৌঁছান। এই জনি, শুয়োরের বাচ্চা, টাকা ফেরত দে।’
শাহেদরা জোরাজুরি করেও টাকা গছাতে পারল না।


টঙ্গীর কাছে এসে শাহেদ বিমূঢ়। লোকে গিজগিজ করছে। একচুল ফাঁক নেই। অদূরে কিছু পুলিশও টহল দিচ্ছে।
রহমত গ্লাস নামিয়ে নেতা গোছের একজনকে বলল, ‘ভাইজান, আমরা একটু ঢাকা যামু।’
‘কুত্তার ছাও, নাইম্যা কথা ক।’
রহমতের দরোজা খুলে নামতে খানিকটা দেরী হওয়ায় লোকটা ওর গালে চড় কষিয়ে বলল, ‘এইবার ক, কি হইছে।’
রহমত ভয়ের চোটে তোতলাতে শুরু করল, ‘সার-সারের বাচ্চারে ডাক্তার দেখাইব। ’
‘তোর সার কি লাটসাব, গাড়ি থিক্যা নামতে ক।’
রহমত গাড়ির কাছে এসে বলল, ‘সার, একটু নামেন, ঝামেলা করতাছে।’
শাহেদ নেমে এসে নিচুস্বরে বলল, ‘ভাই কি হয়েছে?’
‘কিসু হয় নাই, হইব। আপনের মেয়েছেলেরে নামতে কন।’


শাহেদকে কিছু বলতে হলো না, ফারা আঁচ করতে পেরেছে। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। কুশীকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে দ্রুত নেমে এল।
শাহেদ কেবল তাকিয়েই রইল। একজন মোটা লাঠি দিয়ে উইন্ড শীল্ড-এ আঘাত করল। কাঁচ ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে। কুশী কাঁচ ভাঙ্গার প্রচন্ড শব্দে জেগে উঠে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। ওর দ্রুত শ্বাস পড়ছে। মুখ হাঁ করে রেখেছে। শাহেদ পুলিশদের উদ্দেশ্যে বলল, ‘প্লিজ, আপনারা কিছু একটা করেন, প্লিজ।’
পুলিশদের মধ্যে থেকে একজন রাগী গলায় বলল, ‘হরতালের মধ্যে গাড়ি বের করেন আবার প্লিজ প্লিজ করেন।’
‘আমার বাচ্চাটা অসুস্থ। ঢাকা নিয়ে যাচ্ছি চিকিৎসার জন্য, বাবা হিসাবে....।’


শাহেদ আর বলতে পারল না। ওর গলা ভেঙ্গে গেছে, চোখের পানি লুকাবার জন্য অন্যদিকে মুখ ফেরাল। কুশীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। গণতন্ত্রের শিশুর চোখের দৃষ্টি কী তীব্র! শাহেদ দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল।

...
এই লেখাটা যখন লিখি তখন হরতাল ডাকতেন শেখ হাসিনা। তখন হরতালের নামে একটা মানুষকে উলঙ্গ [৩] করে ফেললেও সমস্যা ছিল না। 
শেখ হাসিনার লোকজনরা এখন বলছেন, হরতাল একটি অকেজো ও মরচে পড়া অস্ত্র! অথচ এরাই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর [৪] হরতাল করে গেছেন। গণতন্ত্রের নামে!

নেতার ছবি পরিবর্তন হয়। পরিবর্তন হয় না কেবল কুশী নামের গণতন্ত্রের শিশুটির চোখের চাহনি। সেই তীব্র দৃষ্টির দিকে চোখ রাখার ক্ষমতা এদের কোথায়?
এখন গণতন্ত্রের এই অস্ত্রটা নিয়ে এসেছেন খালেদা জিয়া। তিনি আগামী মাসের ২৭ জুন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছেন। আহারে, এঁদের দেশের জন্য কী মায়া! গণতন্ত্রের চারাটা নইলে শুকিয়ে যাচ্ছে যে। 
আচ্ছা, আপনারা হরতাল না করে অনশন করেন না কেন? দেশেরও উপকার হলো, শরীরেরও।

বাহ, আপনি আপনার একটা মুখের কথায় গোটা দেশটাকে একটা কারাগার বানিয়ে ফেলবেন। আমাদের গায়ে গা ঘিনঘিনে শুঁয়োপোকাটা [২] ছেড়ে দেবেন। কী মজা, না?
আমাদের দেশের দুর্ধর্ষ জাজরা কত তুচ্ছ বিষয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করেন, পারেন না কেবল হরতার নিয়ে কোন রুল জারি করতে। 
আমাদের দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বগলে সংবিধানের বই চেপে, সংবিধান গেল রে বলে বুক চাপড়ে মাতম করেন। 
আমাদের দেশের হিউম্যান রাইটসের লোকজনরা কাঁদতে কাঁদতে আন্ডার গার্মেন্টস ভিজিয়ে ফেলেন, কতো তুচ্ছ বিষয়ে দুম করে মামলা ঠুকে দেন; পারেন না কেবল হরতাল নিয়ে একটা মামলা করতে। 
আমাদের দেশে জাফর ইকবালের মত মানুষরা শিক্ষা বিভাগকে হরতালের আওতামুক্ত চান। মিডিয়ার লোকজন মিডিয়া বিভাগ! গণতন্ত্রের নামের এই লেবেনচুষ মুখে দিয়ে এই দেশের সমস্ত লোক বসে থাকেন। বাহ, কী একেজন সেরা সন্তান! 'পায়ে লাগু'- কদমবুসি করি আপনাদের।

আপনি সবাইকে গণতন্ত্রের লেবেনচুষ খাওয়ান, আমি আপনার এই লেবেনচুষ খেতে আগ্রহী না। আপনার হরতালের এই আহ্বান-নির্দেশ আমি মানি না। ২৭ জুন আমি বেরুব, পারলে আপনি ঠেকান। আমি জানি, আপনার বিশাল চেলা-চামুন্ডাদের পক্ষে আমাকে আটকানো, পিটিয়ে মেরে ফেলা ডালভাত। তাতে কী আসে যায়! আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে অসংখ্য সত্যিকারের যোদ্ধা। যাদের অস্ত্রে থাকবে সূর্যের আলোর ঝলকানি। তাসের ঘরের মত উড়ে যাবেন আপনাদের মত দেশপ্রেমিক(!)

সহায়ক লিংক: 
১. কয়েদী, ৩: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_19.html
২. গা ঘিনঘিনে শুঁয়োপোকাটা: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_3036.html
৩. কয়েদী, ২: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_18.html
৩.কয়েদী, ১: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5073.html