Friday, May 21, 2010

বৈদেশ পর্ব, চার: This is my land...

(লেখাটা উৎসর্গ করছি, আমাদের দেশের সেই সব জাত-লেখকদের (!), যারা ইতিপূর্বে বৈদেশের আমন্ত্রণে অমর্যাদার সঙ্গে বৈদেশে গিয়েছেন।)

*এখানে একটা শব্দ একজন পাঠকের তীব্র আপত্তির কারণে, এবং আরও কিছু বিবেচনায় খানিকটা বদলে 'জাত-লেখক' করা হয়েছে। কেন? এর ব্যাখ্যা আমি এখানে দিয়েছি: http://www.facebook.com/?ref=home#!/tutul?ref=sgm
লিংক খুঁজে পেতে সমস্যা হলে, একবারে নীচে পোস্টের মন্তব্য আকারে খানিকটা ধারণা দেয়া চেষ্টা থাকল।
...
আজ জার্মান এমব্যাসিতে সকাল ১০টায়, আগে থেকেই যেটার এপয়ন্টমেন্ট নেওয়া ছিল, চালু ভাষায় ভিসার জন্য আমাকে দাঁড়াতে হবে। দাঁড়াবার কথাটা কেমন করে চালু হলো তার খানিক নমুনা আজ দেখলাম!

ঢাকা শহরে কোন মানুষের পক্ষেই কাঁটায়-কাঁটায় কোথাও যাওয়া সম্ভব না। ১০ টার আগেই আমি পৌঁছে গেলাম। সময় মেনে আমাকে ঢুকতে দেয়া হবে, বেশ। কিন্তু এই সময়টাতে আমি কোথায় অপেক্ষা করব? কেন, ফুটপাত আছে না!
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজনকে পরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বৃষ্টি হলে একটা মানুষের কী উপায় হবে? এর ভালো কোন সদুত্তর এরা আমাকে দিতে পারেননি। যাক, এরা অল্প শিক্ষিত লোকজন, এদেরকে মন্দ কথা বলে ফিযুল কী-বোর্ডকে কষ্ট দেই না।


সঙ্গে আমার ভাইও এসেছে কারণ আমার ভয়াবহ কুখ্যাত স্মৃতিশক্তি [১], আমি লোকেশন মনে রাখতে পারি না, যেমনটা মনে রাখতে পারি না আমার প্রিয় মানুষদের বিশেষ দিনও [২]। আবার সাত দিন পরে এখানে এলেও আমি জার্মান এমব্যাসি খুঁজে বের করতে পারব না! 
এখন আমার ভাইকে ঢুকতে দেবে না, বসতে দেবে না। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজনকে আমি বললাম, আমি এখানে এসিতে বসে আছি কিন্তু আমার ভাই রৌদ্রে দাঁড়িয়ে আছে; আমি অসুস্থ বোধ করছি। এদের আমি ধন্যবাদ দেই, এরা আমার ভাইকে বসার জায়গা দিয়েছিলেন বলে। 

অনেকগুলো পর্ব শেষ করে, যে অফিসার আমার ভিসা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন তিনি একজন জার্মান ভদ্রমহিলা। আমার লেখার সুবিধার কারণে লিখছি, 'জর্মন মহতরমা'।
জার্মান এমব্যাসির ওয়েব সাইটের তথ্যমতে যা যা প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র সবগুলো আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রণপত্র, ২ কপি ছবি, পাসপোর্ট, ৩০ হাজার ইউরোর বীমা, জাতীয় সনদপত্র, গত তিন মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ডয়েচে ভেলে থেকে পাঠানো গাইড-লাইন, সমস্ত কিছু।

জর্মন মহতরমা সঙ্গে নিয়ে যাওয়া আমার সমস্ত কাগজ-পত্র খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখলেন। তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনি কি আগে কখনো ইউরোপে গিয়েছেন'?
আমি বললাম, 'না'।
'আপনি জার্মানি কেন যেতে চাচ্ছেন'?
আমি ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রণপত্রের কথা বললাম। কারণটাও বললাম। জর্মন মহতরমাকে বোঝাতে গিয়ে আমার কাল ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছিল, কেন আমি যেতে চাচ্ছি!

আমি মহতরমাকে বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, 'আপনি দয়া করে ডয়েচে ভেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওরা আপনাকে আমার যাওয়ার কারণটা বিস্তারিত বলতে পারবে'।
তিনি এতে আগ্রহ দেখালেন না।
এবার তিনি একজন বাঙালী সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসলেন। আমার লেখার সুবিধার কারণে বাঙালী সাহেবের নাম দিলাম 'বাঙালীবাবু'।

অনেকে লেখার সময় লেখেন, 'সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশী', 'বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি'। 'দারোগার নায়ের মাঝির শালা'। আমি, তিন টাকা দামের কলমবাজ লিখি, 'এক কাপ চায়ে দু-কাপ চিনি'! 
বাঙালীবাবুর অবস্থা হয়েছে তাই, জর্মনদের চেয়েও তিনি এক ধাপ এগিয়ে, সাহেব-টাহেবদের সঙ্গে যে তার উঠবস। আমি নিশ্চিত, ইনি হাঁটার সময় হাঁটেন পা যথেষ্ঠ ফাঁক করে।

ফ্রেঞ্ঝ-কাট দাঁড়িতে বাঙালীবাবুর খোলতাই চেহারা। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, 'আপনি কি করেন'?
আমি হাঁই তুলে বললাম, 'লেখালেখি করি'।
'লেখালেখির বাইরে কি করেন'?
আমি বললাম, 'আপাতত কিছু করছি না'।
'তাহলে আপনার সংসার চলে কেমন করে'?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হয়, যেভাবেই চলুক অন্তত তোমার বা তোমার বাপের টাকায় চলছে না। এটা বলা হলো না কারণ আমি যাওয়ার আগে আমার সুহৃদরা পইপই করে বলে দিয়েছেন, আমি যেন মাথা গরম না করি। কেমন-কেমন করে যেন এঁদের একটা ধারণা জন্মেছে, আমার মাথা গরম!
অথচ আমার কাছাকাছি লোকজনেরা আমাকে ভীতু মানুষ বলেই তাচ্ছিল্য করেন কারণ আমি একটা পিঁপড়াও মারতে পারি না! তো, এরা প্রবাস থেকে গাঁটের পয়সা খরচ করে আমাকে ফোনের-পর-ফোন করতে থাকেন। আমার কারণে কোনো মতেই যেন বাংলা ভাষার অপমান না হয়... ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি রাগ চেপে ঠান্ডা মাথায় বললাম, 'আমার ভিসার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক'!
এই বক্তব্য থেকে তিনি সরে আসলেন- এই প্রসঙ্গে আর গেলেন না। এরপর বাঙালীবাবু বললেন, 'ওয়েল, আপনি যে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, এই টাকা কোত্থেকে আসলো'?

পূর্বেই ডয়চে ভেলে থেকে আমাকে বলা হয়েছিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট জাস্ট একটা নিয়ম। যেহেতু আমি ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রণে যাচ্ছি, আমার সমস্ত খরচ ওরা বহন করবে তাই একাউন্টে টাকা থাকা, না-থাকার তেমন কোনো গুরুত্ব নাই।
কিন্তু ব্র্যাক ব্যাংকের পাওনা টাকা [৩] পরিশোধের কারণে আমার একাউন্টে টাকাটা ছিল। কারণ ব্র্যাক ব্যাংক চাওয়া-মাত্র টাকাটা আমাকে দিতে হবে।

আমি রাগ চেপে উত্তর দিলাম, 'আমার পরিবার কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই টাকা থাকাটা আমার জন্য বিচিত্র কিছু না'।
এরপর বাঙালীবাবু বললেন, 'ভাল কথা কিন্তু হঠাৎ করে তিন মাসের মধ্যে আপনার এই একাউন্টেই এই টাকা আসলো কেমন করে'?
আমি বললাম, 'আমার বিভিন্ন একাউন্ট থাকতেই পারে, এক একাউন্ট থেকে অন্য একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করাও আমার জন্য অস্বাভাবিক কিছু না'।
বাঙালীবাবু, 'তা ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক এই সময়টাতেই কেন আপনার টাকাটা আসলো'?
এবার আমার চোয়াল শক্ত হয়, 'হ্যাঁ, আসলো, সো? এটা দেখার দায়িত্ব ইনকাম ট্যাক্স বিভাগের, আপনাদের না। এবং ইনকাম ট্যাক্স বাবদ সরকার আমার কাছে কোনো টাকা পাওনা নাই। এর সনদপত্র লিখিত আকারে সরকার আমাকে দিয়েছে। চাইলে আমি এটা দেখাতে পারি'।

কিন্তু বাঙালীবাবু সেদিকে গেলেন না, এবার বললেন, 'ডয়েচে ভেলের এই আমন্ত্রণে গিয়ে আপনি কি করবেন'?
এবার আমার অজান্তেই গলায় খানিকটা কাঠিন্যতা এসে পড়ে, আমি চোখ-মুখ শক্ত করে বলি, 'ওখানে গিয়ে আমি কী করব, এটা ডয়েচে ভেলে ভালো বলতে পারবে'!
বাঙালীবাবু বললেন, 'আপনি যাচ্ছেন অথচ আপনি জানেন না'?
আমার গলার স্বর অপরিবর্তিত থাকে, 'যেটা জানি সেটা আমি আপনাদেরকে বারবার বলেছি, অন-লাইনে লেখালেখির কারণে ওদের ওখানে ২৩০ মিলিয়ন মানুষ যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষার পক্ষ থেকে আমার ওখানে থাকার কথা। কেন যাচ্ছি এটা তো আমন্ত্রণপত্রেই পরিষ্কার লেখা আছে'।

বাঙালীবাবু, 'ওখানে কেন থাকতে হবে আপনাকে'?
আমি বিরক্ত, 'এটা আমার জানার কথা না। এটা ডয়েচে ভেলে ভালো বলতে পারবে। তাদের জিজ্ঞেস করুন। ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রণপত্রে ফোন নাম্বার, ফ্যাক্স, ই-মেইল সবই তো আছে'।

বাঙালীবাবু এবার অন্তর্ধান হন, তার ফ্রেঞ্ঝ-কাট দাঁড়িসহ মানে তিনি যাওয়ার সময় ফ্রেঞ্ঝ-কাট দাঁড়িও নিয়ে যান। আমি অনুমান করি, তিনি দূরে কোথাও যাননি। শেষ পর্যায়ে ওনাকে আবারও দেখেছিলাম।

এবার আবারো জর্মন মহতরমার আগমন, তিনি ফিরে আসার পর আমি ওনাকে অভব্যতার সীমা না-ছাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম: আমার ব্যাংক একাউন্টে টাকা কোত্থেকে আসল এটা কেন আমার কাছে বারবার জানতে চাওয়া হলো? আমার ভিসার সঙ্গে এটার কী সম্পর্ক?
তিনি বিড়বিড় করে কিসব যেন বললেন, এটা ফর্মালিটিজ, হেনতেন বা...। 
এবার জর্মন মহতরমা আমার কাছে জানতে চান, 'আপনি যেজন্য যাচ্ছেন এটা কি ওরা আপনাকে জার্মানীতে না দিয়ে এই দেশে দিতে পারে না'? 

আমি মনে মনে উল্টা গুনছি, দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার...শূন্য। এতে নাকি মেজাজ ভালো থাকে, মন প্রসন্ন হয়। আমি গলায় মধু ঢেলে বললাম, 'ওহ, তাহলে তো দারুণ হয়। আপনি যদি একটু ডয়েচে ভেলেকে একটু বলে দিতেন, প্লিজ। এতে করে আমি সুখি হতাম, বড়ই সুখি। কারণ তাহলে আমার আর কষ্ট করে জার্মান যাওয়া লাগে না। সবচেয়ে ভাল হয়, এটা আমার বাসায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করলে'।
 
এবার তিনি খসখস করে কাগজে লেখা শুরু করলেন। জানালেন, এই কাগজগুলো আমাকে দিতে হবে। সময় সাত দিন।

১. জার্মান এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে যাবে এবং দোভাষীর ব্যবস্থা করবে এটা ডয়েচে ভেলের কাছ থেকে লিখিত আকারে আনতে হবে।
২. আমার ওয়েবসাইটের লেখালেখির প্রিন্ট আউট।
৩. আমার প্রকাশিত বই।
৪. আমার বিবাহের কাবিননামা।
৫. আমার বাচ্চাদের বার্থ সার্টফিকেট।

আমি জর্মন মহতরমাকে বোঝাবার চেষ্টা করি, এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে, কোনো সমস্যা হবে না। এটা তাঁদের দায়িত্ব।
উত্তর নেগেটিভ। 

ওয়েব সাইটের লেখালেখির প্রসঙ্গে আমি বললাম, 'আমি সঙ্গে করে ল্যাপটপ নিয়ে এসেছি। আপনি চাইলে আমি এখনই ওয়েবসাইট ওপেন করে দেখাতে পারি। ওখানে আমার বইয়ের লিস্টও আছে'। 
উত্তর নেগেটিভ।

আচ্ছা..., ভাল কথা, আমার প্রকাশিত বইয়ের সঙ্গে ডয়েচে ভেলের আমন্ত্রণের কী সম্পর্ক, কি সম্পর্ক ভিসার সঙ্গে? 
অবশ্য এটা আমার জন্য অতি আনন্দের বিষয়। আমি গোপনে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আমার বই আমি ব্যতীত [৫] অন্য কেউ পড়ে না, সেখানে জার্মানিরা আমার বই চাচ্ছে এই আনন্দ কোথায় রাখি? এত দিনে এসে নিজেকে কেমন বিখ্যাত-বিখ্যাত মনে হচ্ছে। ঈশ্বর মুখ তুলে চেয়েছেন! বাঙালীরা আমার বইয়ের মর্ম বুঝল না, বুঝল গিয়ে জর্মনরা। তাও এই জর্মন মহিলা পড়বেন বলে পণ করেছেন! কী আনন্দ আজি আকাশে-বাতাসে...! কিন্তু এখন আমি খানিকটা ধন্ধে আছি, আমার বই তো বেশ কয়েকটা। কোনটা এই মহতরমাকে দেব, প্রেমের উপন্যাস দিয়ে না-আবার কোন বিপদে পড়ি। সমস্যা হয়ে গেল হে...!

আর আমার বিবাহের কাবিননামা এবং বাচ্চাদের বার্থ সার্টিফিকেট আমি নিয়ে যাইনি কারণ, জার্মান এমব্যাসির ওয়েবসাইটে বিস্তারিত লেখায় বলা আছে, marriage certificate, birth certificate of children (if applicable).

"...if applicable"... যদি...। আমার যেটা মনে হয়েছিল, যেহেতু আমি একা যাচ্ছি এটার প্রয়োজন পড়ার কথা না। যদি এমনটা হতো সঙ্গে আমার বউ যাবে তাহলে এটার প্রয়োজন পড়তেই পারে কারণ বউয়ের নাম করে অন্য একটা মেয়েকে জার্মানিতে পাচার করে দিলুম। হতে পারে না এমন?
বা সঙ্গে শিশু থাকলে বার্থ সার্টিফিকেট অতি প্রয়োজন। না-হলে মনে হতে পারে আমি শিশু পাচারকারী। এমন ভাবনা কাজ করাটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। এতে আমি দোষ দেখি না।

কিন্তু এখানে আমি তো একা যাচ্ছি, সঙ্গে তো এরা কেউ যাচ্ছে না! যাগ গে, কেউ শখ করে চাইলে কী আর করা!
কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। বাচ্চাদের বার্থ সার্টিফিকেট, এটা কে দেবে? বাচ্চার বিষয়ে তো বাচ্চার মা ব্যতীত অন্য কেউ বলতে পারবে না, আমিও না! মুশকিল-মুসিবত!

আমার বক্তব্য অন্যখানে। আমি তো বলি নাই, আমি জার্মান দেশে যাওয়ার জন্য ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখে দেখে বড়ো হয়েছি। দেশটা না-দেখলে মারা যাওয়ার আগে আমার শেষ শ্বাস আটকে থাকবে। 
আর আমি তো এখানে অনাহুত কেউ না! আমি এখানে নিজ আগ্রহে আসি নাই। দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, আমি এখানে এসেছি জার্মান মিডিয়ার আমন্ত্রণে। 
এখন এটা তো আমার দায়িত্ব না, 'ডয়েচে ভেলে' কি, এরা কি ধান চাষ করে নাকি পাট? 'ডয়েচে ভেলে' কি জার্মানিতে না প্যারিসে অবস্থিত, ঝাপিয়ে পড়ে এটা এদেরকে বোঝানো!

এরা যেটা করতে পারতেন, ডয়চে ভেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার তথ্যগুলো যাচাই করে নেয়া। এই ব্যাংক স্টেটমেন্টটা ভূয়া কি না সেটা যাচাই করে দেখা।  
আমার তিন মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট নিয়ে এরা যে খেলাটা আমার সঙ্গে খেললেন, গোলটা কী হলো, ফলটা কী দাঁড়ালো? 
এর মানে হলো, তিন মাস আগে থেকেই ডয়চে ভেলের সঙ্গে যোগসাজসে, আঁতাত করে এই কান্ডটা আমি করেছি? এই পেপারগুলো তৈরি করেছি, ব্যাংকে হুট করে টাকা জমা দিয়েছি। প্রকারান্তরে এরা আমাকেই ছোট করলেন না, ছোট করলেন ডয়চে ভেলেকে, নিজের দেশকে। কেউ নিজের দেশকে নিজেই নগ্ন করলে আমার কী, বাপু!

এরা তবলার ঠুকঠাক না করে সরাসরি গান গাইলেই পারতেন। এটা বললেই পারতেন, মিয়া, তুমি যে জার্মানি গিয়ে ভেগে যাবে না এর নিশ্চয়তা কি? আমার চোখে চোখ রেখে এটা বলার সাহস হলো না, না?
এটা বললে এদের যে উত্তরটা আমি দিতাম সেটা এখানে বলে দেই: তোমার দেশে এমন কী আছে যা আমার দেশে নাই? আমি মানুষটা অতি সামান্য কিন্তু তোমার দেশের এই ক্ষমতাই নাই আমাকে আমার বিস্তৃত শেকড়সহ উপড়ে নিয়ে ওখানে আটকে রাখবে। সব গাছ 'রি-পট' করা যায় না।
এটা আমার অহংকার না, এটা আমার দুর্বলতা। আমার বাড়ির দিকে যে সরু রাস্তাটা গেছে সেটা হচ্ছে আমার স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা। তোমার কোন বা... রাস্তা স্বর্গে গেছে? নামটা বলো দিকি? বরং আমার দেশে যা আছে তা তোমাদের নাই! আমরা অন্তত কাউকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে এনে অপমান করি না।

এই আলোচনার নামে জেরা পর্বের পুরোটা সময়, লিফটের মত ছোট্ট একটা কক্ষে প্রায় ৩৫ মিনিট আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। কেন? 
প্লিজ, আমার সঙ্গে কেউ এই বুলি কপচাবার চেষ্টা করবেন না যে, এটাই নিয়ম। বা আমরা কী ব্যাংকে, গ্যাস বিল জমা দেয়ার জন্য দাড়িয়ে থাকি না?
আর মানুষের জন্য নিয়ম নাকি নিয়মের জন্য মানুষ? কোন চুতিয়ারা এই সব নিয়ম বানায়? একজন মানুষ কেন অন্য একজন মানুষের কাছ থেকে মানুষের ন্যায় আচরণ পাবে না? এটা কী খুব বড়ো একটা চাওয়া‍!
আমার সামনের মানুষটা বসে থাকবে আর আমি দাঁড়িয়ে থাকব, মে আই আস্ক, হোয়াই?

*সুশীল মানুষদের জন্য পোস্টের এখানেই সমাপ্তি। হাতে সময় থাকলে আমার অন্য পোস্টগুলো পড়ুন। পরের অংশে আমি কিছু কঠিন কথা বলব। পুতুপুতু মানুষদের জন্য এই লেখা না। খোকা-বাচ্চারা দূরে, প্লিজ।

এবার আমি খানিকটা কঠিন কথা বলি। আমার সামনে যে মানুষটা বসে ছিলেন তিনি কি আমার প্রভু? আমি কি এই মানুষটার কাছে আমার মর্যাদা-আত্মা বন্ধক রেখেছি? ভিসা দেওয়ার নাম করে পৃথিবীর যেখানে-যেখানে এই নিয়মটা চালু আছে সেই দেশ কতটা উন্নত এটা জেনে আমার কাজ নাই। ওই দেশের কতগুলো মিসাইল আছে, সোনা-রুপার মজুত কত টন, সংবিধান কত পুরনো বা ক্ষণে-ক্ষণে মানবতার অর্ন্তবাস চড়ান, এটা আমার কাছে জরুরি কিছু না!
যত চকচকে কাপড়ই এরা পরে থাকুক না কেন, এই সব মানুষকে আমার কাছে স্রেফ নগ্ন মনে হয়। ওদের ঢেকে রাখা একপেট আবর্জনা স্পষ্ট প্রতিয়মান হয়। সভ্যতার জন্য ইমিডিয়েট এই অসভ্য আচরণ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

ঠিক-বেঠিক এই কুতর্ক আপাতত থাকুক, থাকুক যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রসঙ্গও কিন্তু এদের দেশের মিডিয়ার আমন্ত্রণে কোনো একটা বিষয়ে ২৩ কোটি মানুষ [৬] (গ্লোবাল ভয়েসেসের মতে) য়ে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষার হয়ে ওখানে যাওয়ার কথা আমার। এরা আমার সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হয়ে থাকে; আমি ভাবতে শিউরে উঠি, অন্যদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়ে থাকে!

ওহে, আপনারা ইচ্ছা করলে আমাকে ভিসা না-দিতে পারেন, এটা আপনাদের অধিকার। আমার বয়েই গেছে- কোনো সমস্যা নাই, আমি আপনাদেরকে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেসও করব না কেন ভিসা দিলেন না। কিন্তু আমারই দেশে আমাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার কোনো অধিকার আপনাদের নাই। এই অধিকার আমি আপনাদেরকে দেই না।

জার্মান এমব্যাসি নাকি আমেরিকান এমব্যাসি তাতে কিছুই যায় আসে না। আমাদের সরকার তার সীমাবদ্ধতার কারণে আপনাদের কাছে কতটা নতজানু এটা তাদের সমস্যা, আমার না। 

আমার স্পষ্ট বক্তব্য, আপনাদের এমব্যাসি নামের এই দূর্গগুলো স্বাধীন বাংলাদেশেই অবস্থিত। এটা আমার দেশ, আমি এই দেশেরই একজন নাগরিক। "This is my land, no cowboy rides here"

বৈদেশ পর্ব, পাঁচ: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_04.html 

সহায়ক লিংক:
১. ছোট-ছোট সুখ: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post.html
২. একটি খারাপ ভুল: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_146.html 
৩. ব্র্যাক ব্যাংক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html 
৪. বৈদেশ পর্ব, তিন: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_12.html 
৫. ওড়নাসমগ্র: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_18.html
৬. গ্লোবাল ভয়েসেস: http://globalvoicesonline.org/2010/04/11/bangladesh-bangla-blogs-at-the-bobs-meet-ali-mahmed/