Wednesday, May 19, 2010

কয়েদী: ৩

শাহেদ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ডাক্তার কিসব বলছেন হড়বড় করে। অথচ ডাক্তার সাহেব কথা বলছেন ধীরলয়ে, 'আপনার বাচ্চা "হুইজি চাইল্ড"। হুইসেল থেকে হুইজি। ওকে নেবুলাইজ করতে হবে। প্রয়োজন হলে, হবে সম্ভবত, অক্সিজেন দিতে হবে। আপনি তো এখানে এইসব সুবিধা এখানে পাবেন না।'
 

শাহেদ বিভ্রান্ত গলায় বলল, 'শুধু অষুধে কাজ হবে না?'
ডাক্তার সাহেব মাথা নাড়লেন, 'উহুঁ, ওর ফুসফুসে খানিকটা সমস্যা আছে, আ লিটল বিট। দেখছেন না কি প্রচন্ড কাশি হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দিনে দুইবার, প্রয়োজন হলে চার ঘন্টা পর পর নেবুলাইজার দিতে হবে। বেশি সমস্যা হলে অক্সিজেন। নরসলের সঙ্গে ভেনটোলিন রেসপিরেটর সলিউশন এর সঙ্গে সাত ফোঁটা ইপরেভেন্ট।'
'এখানে নেবুলাইজার মেশিন নাই?'
'উহুঁ,  এত বড় হাসপাতাল, এক লক্ষ মানুষের বসবাস এখানে, অথচ জানেন মেশিনটার দাম কত, মাত্র ২৭০০ টাকা। এই অল্প টাকার বিনিময়ে কতগুলো শিশুর প্রাণ বাঁচানো যায়।' 

'একটা প্রাইভেট ক্লিনিক আছে, ওখানে খোঁজ নিয়ে দেখব?'
'দেখেন, কিন্তু আমার মনে হয় ওদের নাই, থাকলে নিশ্চই শুনতাম। এই তো কদিন আগেই একটা বাচ্চা মারা গেল। নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না।'
 

শাহেদ নিশ্চল হয়ে বসে রইল।
ডাক্তার অনুচ্চকন্ঠে ভয়ংকর শব্দটা উচ্চারণ করলেন, 'ঢাকা নিয়ে যান।'
শাহেদ ভাঙ্গা গলায় বলল, 'আপনি জানেন, কি অসম্ভব কথা বলছেন?' 

'জানি, এছাড়া কোন বিকল্প নাই, আপনার বাচ্চাটার ঠান্ডার সমস্যা ছাড়াও হাই টেম্পরেচার, বমি, ডায়ারিয়ার সমস্যা আছে। এই সব রোগ এ বয়সে হয়েই থাকে। কিন্তু একসঙ্গে হওয়ায় আপনার বাচ্চাটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।'
শাহেদ হাহাকার করে উঠল, 'ডাক্তার, সবই বুঝতে পারছি কিন্তু আপনি তো জানেন এখন ঢাকা নিয়ে যাওয়া কি অসম্ভব একটা ব্যাপার।'
 

এই ডাক্তারটা নতুন, মাত্র পাস করে জয়েন করেছেন। এখনও পুরোপুরি প্রফেশনাল হতে পারেননি। কে জানে, হয়ত চোখের ভুল- এর চোখ খানিকটা ভেজা ভেজা। ইনি এখনও এই হাসপাতালের ডাক্তারদের মতো হতে পারেননি। ভুয়া সার্টিফিকেট দিতে চান না। ওষুধ কোম্পানীর স্যাম্পল চেয়ে-চিন্তে নেয়া দূরে থাক কেউ দিলে গরীব রোগীদের বিলিয়ে দেন। অন্য ডাক্তাররা যেখানে কসাইকে ছাড়িয়ে যান, অনায়াসে মাসে ষাট সত্তুর হাজার টাকা দুনম্বরী করে উপার্জন করেন। সেখানে এই ডাক্তারের বেতন ২৫ তারিখেই ফুরিয়ে যায়।
 

শাহেদ মাথা নিচু করে বসেছিল বলেই ডাক্তারের সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়েনি। শাহেদ ভাবছিল, এই ডাক্তার মানুষ নাকি, কী অবলীলায় বলে ফেলল ঢাকা নিয়ে যান, কয়েকদিন ধরেই অবরোধ চলছে। গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ। কিভাবে এই দশমাসের শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা যাওয়া সম্ভব! তার অসহায় অবস্থা কি ডাক্তার বুঝতে পারছেন না, কেন পারছেন না? প্রিয়জন কেউ যখন ছটফট করে তখন মনে হয় উপরে পরম করুনাময় নীচে ডাক্তার, মাঝামাঝি আর কেউ নাই। আফসোস, এরা কখনো এটা বুঝবে না। ডাক্তার মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বললেন, 'সরি, আপনি ঢাকা নিয়ে যান, আমি সরি।'
 

শাহেদ ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো।
ফারা দশ মাসের শিশু কুশীকে বুকে আঁকড়ে ধরে আছে। পৃথিবীতে এত বাতাস অথচ কুশী তার প্রয়োজনীয় অল্প বাতাস পুরোটা নিতে পারছে না। আহারে, যদি পারত খানিকটা বাতাস কুশীকে দিতে। আচ্ছা, কোথায় যেন দেখেছিলো মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেয়া যায়, দেখবে নাকি চেষ্টা করে, যদি হিতে বিপরীত হয়? 

শাহেদ বেরিয়ে আসতেই ফারা উদগ্রীব হয়ে বলল, 'কি বলল?'
'তেমন কিছু না।'
ফারা সবেগে মাথা নাড়ল, 'না-না, ঠিক করে বলো, তুমি সত্য বলছ না।' 

'বললাম তো কিছু না।' 
'তুমি না বললে আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করব।'
শাহেদ অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, 'গুরুতর কিছু না। ওকে নেবুলাইজার, অক্সিজেন এসব দিলেই ভাল হয়ে যাবে।' 

'ভাল হয়, ভাল হয় মানে কি, না দিলে চলবে?’ 
'না, মানে ইয়ে দিলে ওর শ্বাস কষ্টটা কমত।'
ফারা এবার ঝাঁঝাল গলায় বলল, 'তাইলে দেরি করছ কেন।' 

'ইয়ে ফারা এই সুবিধাগুলো তো এইখানে নাই।'
ফারা কান্না চেপে বলল, 'তাহলে কুশী-মার কি হবে।'
'ডাক্তার তো বলল ঢাকা নিয়ে যেতে।' 

'ঢাকা নিয়ে গেলে নিয়ে যাব, ঢাকা তো আর লন্ডন প্যারিস না। চলো এখনই রওয়ানা দেই।' 
'আঃ ফারা, বললেই কি যাওয়া যায়! 
'কেন যাওয়া যাবে না, গাড়ি নিয়ে গেলে ঘন্টা তিনেক লাগবে।' 
'সেটা সমস্যা না!'
'সমস্যাটা কি!'
শাহেদ এবার রুক্ষ গলায় বলল, 'তুমি তো কোন কিছুর খবরই রাখ না। হরতাল-অবরোধ চলছে কদিন ধরে। বললেই কি যাওয়া যায়!'
ফারা কুশীকে আরও আকড়ে ধরে বলল, 'আমি এসব জানি না, আমার বাচ্চার আল্লাহ না করুক যদি কিছু হয়ে যায় আমি তোমাকে কখ-খনো ক্ষমা করব না।'
 

শাহেদ ঝিম মেরে আছে। ওর মাথাটা ঠিক কাজ করছে না। 
'ফারা, একটা ক্লিনিক আছে, চলো ওখানে খোঁজ করে দেখি। ওদের নিশ্চয়ই নেবুলাইজার মেশিন আছে।'
ক্লিনিকের মালিক ডাঃ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, 'নাই, এইসব রেখে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নাই।'
ফারা কিভাবে জানি টের পেল। একহাতে কুশীকে ধরে অন্য হাতে শাহেদকে আকড়ে ধরে আছে। বিড়বিড় করে বলল, 'চলো এখান থেকে যাই।'
শাহেদের অসহ্য রাগ হচ্ছে। ইচ্ছা করছে পায়ের জুতা খুলে আলম নামের এই ডাক্তারকে পেটায়। ওর শিক্ষা, অবস্থান, ঔচিত্যবোধ বাধা হয়ে আছে। বুচার কোথাকার, এই ক্লিনিকের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। রিএজেন্ট এর চড়ামূল্যের দোহাই দিয়ে সর্বোচ্চ টাকা টেষ্টের নামে নিচ্ছে। অথচ ২৭০০ টাকা দিয়ে একটা নেবুলাইজার মেশিন রাখবে না। কত শিশুর প্রাণ রক্ষা পেত।
 

শাহেদ অসহ্য রাগ চেপে বলল, 'এইসব রাখলে সময় নষ্ট।' 
ডাক্তার বললেন, 'একবার নেবুলাইজার দিলে কত দেবেন, পঞ্চাশ টাকা। একটা শিশুকে নেবুলাইজার দিতে অন্তত দশ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ে আমি দুজনকে দেখতে পারি। আশি দুগুনে একশো ষাট টাকা পাব, আপনিই বলেন-?'
'আমি বলি কি, আপনার চেয়ে কসাই অনেক ভালমানুষ। বাজারে গিয়ে মাংশের দোকান দেন। পুঁজি লাগলে আমার কাছ থেকে নিয়েন।'
ফারা ভিত গলায় বলল, 'চলো-চলো এখান থেকে।'
 

শাহেদের বাসায় ফিরে মেজাজ আরও খারাপ হলো। সবার এক কথা, ঢাকায় নিয়ে যাও। আরে, এরা কী দেশের খবর রাখে না; বললেই হলো।
মা ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বলেই চলেছেন: খোকা, দেরি করিস নে, আল্লার নাম নিয়ে রওয়া দে।
শাহেদ হিম গলায় বলল, 'মা তুমি কি বলছ, জানো?' 

'আয়তুল কুরসী পড়ে রওয়ানা দে, কিচ্ছু হবে না।' 
'দোয়া-দরুদ পড়ে রওয়ানা দিলে হরতাল উঠে যাবে নাকি?'
'তুই তো ধর্মকর্ম করিস না এইজন্যই তোর বাচ্চার অসুখ হয়।'
'বেশ হয়, তুমি তো মহিলা হুজুর! আমার যে ছোটবেলায় সারা গা পচে গিয়েছিল সেটা কি?
তখন আয়তুল কুরসী পড়লে না কেন?
'তুই আমার সামনে থেকে যা।' 
'আমার বয়ে গেছে তোমার সামনে থাকতে।'
'আর শোন, আমার নাতিনের যদি কিছু হয় তোকে আমি এ বাড়ি থেকে বের করে দেব।' 

'বাড়ি-বাড়ি, বাবার এই বাড়ি যেন আমার বুকে একটা পাথর রেখে গেছে। আমি মরে গেলে এ বাড়ির একটা পাথর আমার কবরে রেখে দিও।'
 

ফারা শাহেদকে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নির্ঘাত একটা অনর্থ হতো। শাহেদ পাগলের মতো বিড়বিড় করছে: ইস কারও মেয়ে কারও নাতনি; যেন আমার কিছু না! কুশীটার কষ্ট দেখলে বাঁচতে ইচ্ছা করে না। সত্যি সত্যি মরে যেতে ইচ্ছা করে। শাহেদ দুহাতে মুখ ঢেকে ক্রমাগত বলতে থাকল: মা কুশী, মা- কুশী।
 

সহায়ক লিংক:
১. কয়েদী, ১: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5073.html
২. কয়েদী, ২: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_18.html