Friday, May 7, 2010

আমরা কি আরেকটা কানসাটের জন্য অপেক্ষা করছি?

অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। দুম করে সামনের কাতারে চলে আসার পর থেকে টানা ১৫ দিন আমি তিন-চার ঘন্টার বেশি ঘুমাতে পারিনি!
হঠাৎ করেই কম্পিউটার সংক্রান্ত কাজ বেড়ে গেল, অজস্র ইমেইলের উত্তর দেয়া। একজন মানুষ প্রচন্ড আবেগে একটা মেইল করছেন অথচ এখন আমি এর উত্তর দিতে দিনের পর লাগিয়ে দিচ্ছি তা তো হয় না। কারণ আমার হাতে নতুন করে একটা আঙ্গুল গজায়নি। 

তাছাড়া জরুরী, তাৎক্ষণিক কিছু লেখার চাপও থাকত। সমস্যাটা হয়েছিল, আমার ল্যাপটপের ব্যাটারীর এক সেকেন্ডও ব্যাপআপ ছিল না। এদিকে চোখের পলক ফেলার মত বিদ্যুৎ আসছে, উধাও হচ্ছে। 
কখনও কখনও মনে হতো বাচ্চাদের মতো পা ছড়িয়ে বসে কাঁদি। 

একদিনের কথাই কেবল বলি, বিদুৎ নামের সোনার পাখিটার অপেক্ষায়- রাত সাড়ে তিনটায় তিনি তশরীফ আনলেন। ওদিনই ব্র্যাক ব্যাংকের [১] লোকজনের অত্যাচারে একজন কৃষকের মৃত্যু হয়েছে, লেখাটা শেষ করাটা অতি জরুরী। লেখাটা শেষ করতে করতে সকাল। আমাকে আবার অতি জরুরী কাজে ছুটতে হবে, ঘুমাবার আর অবকাশ কই?

এই সব করে করে আমার ওজন আশংকাজনক ভাবে কমতে শুরু করল। চেহারায় একটা 'তক্ষক ভাব' চলে আসল। চশমাপরা তক্ষক! ফল যা হওয়ার তাই হলো, একদিন সকাল থেকে বুকে তীব্র ব্যথা। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হৃদযন্ত্র বুঝি বাদ্য বাজাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পরে জানা গেল, সমস্যাটা হয়েছে, দীর্ঘ দিন ঘুমের অনিয়মের কারণে। 
এদিকে আবার ঢাকা যাওয়া জরুরী। না গেলে কথার বরখেলাপ হয়। ঢাকা অবশ্য যাওয়ার আরেকটা কাজও ছিল, আমার ল্যাপটপের ব্যাটারী সমস্যার সমাধান করা। ব্যাটারী সমস্যার সমাধান করায় একটা বিশাল কাজ হলো, অন্তত ঘুমের যন্ত্রণার অবসান ঘটল। তো, এই সব যন্ত্রণায় জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যায়। 

কিন্তু পত্রিকায় যখন পড়ি, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে হাসপাতালে একের পর এক শিশুর মৃত্যু; তখন নিজের এই সব সমস্যাগুলো ভাবতেও লজ্জা লাগে। মনে হয় এ কিছুই না, তুচ্ছাতিতুচ্ছ।

আচ্ছা, যারা দেশটা চালান তাদের মাথায় কী এটা আসছে না বিদ্যুৎ হচ্ছে দেশের হৃদপিন্ড, এটা ব্যতীত সব অচল। গোটা দেশ অচল। জমিতে পানি দেয়ার কথা বলা হোক বা কারখানার চাকা সচল থাকার কথাই বলা হোক, এর কোন বিকল্প নাই। 
আমি একটা লেখায় বলেছিলাম, লোকজন যে রাতে ঘুমাতে পারছে না এর প্রভাব কি আমাদের আসলেই জানা আছে? আমরা একটা খিটখিটে প্রজন্ম তৈরী করছি না তো? আমি মনোবিদ নই, এঁরা ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আজ দেশে যে অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে এর পেছনে বিদ্যুতের বড়ো একটা ভূমিকা আছে।

অবশ্য আমরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অদ্ভুতসব নমুনা আমরা দেখেছি [২] কার মাথা থেকে এই ডে-লাইট সেভিং [৩]-এর আইডিয়া বের হয়েছিল আল্লা মালুম! 
পূর্বেও লিখেছিলাম, আমি এতো জটিল-জটিল বিষয় জানতে আগ্রহ বোধ করি না, কেবল চাই বিদ্যুৎ। কাকে উড়িয়ে নিয়ে আসবেন, কার সঙ্গে বসবেন এ জেনে আমার কাজ কী? আমি শান্তিতে দু-দন্ড ঘুমাতে চাই। আমার কাছে এখন গণতন্ত্রের [৪] চেয়ে বিদ্যুতের প্রয়োজন বেশী। আপনি ফ্রিগেড কেন প্রয়োজন হলে গোটা মঙ্গল গ্রহ কিনে ফেলেন আমার আপত্তি নাই কিন্তু আমাকে আগে বিদ্যুৎ দিয়ে।

কানসাটের ঘটনা কি আমরা ভুলে গেছি? ভুলে গেছি আনোয়ারের মার কথা। যে মা তার নিহত সন্তানের রক্তে ভেজা জামা তুলে মিডিয়াকে দেখাচ্ছিলেন। আমি এই ছবি এখানে দিতে চাই না। খানিকটা অনুমান করতে পারি, এই পালকের মত হালকা সামান্য জামাটা মিডিয়ার কাছে তুলে ধরতে এই মার কী অবর্ণনীয় বেদনাই না হয়েছে!
আমাদের দেশে ফলোআপের চল নাই, আমরা জানি না ওই আনোয়ারের মা আজ কোথায়।

কানসাট নিয়ে আনিসুল হক সুদীর্ঘ ১০১ [৫] লাইনের কবিতা লিখেছিলেন। এ অভূতপূর্ব- সম্পাদকীয় পাতায় ১০১ লাইনের কবিতা ছাপা হওয়া সম্ভবত এ দেশে পূর্বে কখনও হয়নি, ভবিষ্যতে হবে এমন আশা ক্ষীণ! কারণ তখন দেশের সমস্ত কবি, যারা ধ্যান করতে হিমালয়ে পর্বতে গিয়েছিলেন তাঁরা ধ্যান ছেড়েছুঁড়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

আনিসুল হকের মত আমি তো আর পত্রিকা অফিসে চাকরি করি না, কবিও না। আমার গতি কী! ঘটনাটা ২০০৬ সালের। তখন চুটিয়ে ব্লগিংয়ের নামে লেখার চেষ্টা করি। আমার সহ্যাতিত মনে হচ্ছিল। তখন "কানসাট এবং আমার ইচ্ছা মৃত্যু!" এ লেখাটা লিখেছিলাম।
কিন্তু আমি শিউরে উঠি, আমরা কি আরেকটা কানসাটের জন্য অপেক্ষা করছি? হলে ভাল, জয়তু ডিজিটাল [৬]!       



"কানসাট এবং আমার ইচ্ছা মৃত্যু!

কানসাটের সময় একজন মন্ত্রীর একটা উদ্ধৃতি ছিল: দেশে নাকি উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে তাই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে, বিদ্যুৎ ঘাটতি হচ্ছে।
 

কানসাটের লোকজনরা কি পাগল হয়ে গেছে ! কিন্তু এখন সম্ভবত আমি নিজেই পাগল হয়ে যাচ্ছি ! আজকে কানসাটের ঘটনা দেখে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। কেবল মনে হচ্ছে, ঈশ্বর, মানুষের ইচ্ছা মৃত্যুর ব্যবস্থা রাখলে বেশ হতো। ঈশ্বরের ইচ্ছা তিনিই ভালো জানেন, কিছু রহস্য তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন! ধর্মীয় কোন ব্যাখ্যায় আমি যেতে চাচ্ছি না, রে রে করে সবাই তেড়ে আসবেন।
 

সক্রেটিস ঠিক তার মৃত্যুর পূর্বের ফিডো সংলাপে বলেছিলেন, "একজন দার্শনিকচেতার মানুষ মৃত্যুকে ভয় পাবে না, আনন্দের সঙ্গে বরণ করবে কিন্তু আত্মহত্যা করার কোন অধিকার তার নাই।... মানুষ হলো একজন কয়েদী- যার কোন অধিকার নাই, কয়েদখানার দরোজা খুলে পালিয়ে যাওয়ার। ... একজন মানুষকে অপেক্ষা করা উচিৎ তখন পর্যন্ত, যে পর্যন্ত না ইশ্বর তাকে তলব করেন, যেমন আমাকে এখন তলব করেছেন"।
 

অগাবগা আমার বক্তব্য হচ্ছে, একজন মানুষ যেমন একটা প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে না- তাই তার কোন অধিকার নাই কারও প্রাণ কেড়ে নেয়ার, হোক না তার নিজের প্রাণই! কিন্তু ইচ্ছা মৃত্যুর ব্যবস্থা থাকলে তো আর দোষে পেত না !
 

আমাদের দেশ যারা চালাচ্ছেন তাদের কথাবার্তা শুনলে তো মনে হয় আমরা স্বর্গে বাস করছি।
একজন মন্ত্রী সাহেব বলেছেন: "বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। দেশের মানুষ খুব আরামে আছে। ইউরোপিয়ান সমাজের মতোই বাংলাদেশের অবস্থা"।
আরেকজন মন্ত্রী বাহাদুর বলেছেন, "সুনামি-ক্যাটরিনা ছাড়া বাংলাদেশের জনসংখ্যা কমানো যাবে না "। 


ইউরোপিয়ান দেশের মতোই যদি হয় এ দেশের অবস্থা তাহলে এ দেশের লক্ষ-লক্ষ সেরা সন্তানরা কেন পড়ে আছে প্রবাসে! যাদের মনন-প্রতিভা দেখলে আমার মতো মানুষের লজ্জায় মাথা কাটা যায়। এঁরা কেন অযথাই হাহাকার করা লেখা পোস্ট করেন, "আমার মন ভালো না-আমার মন ভালো না, আমার মাকে মনে পড়ে-আমার মাকে মনে পড়ে... "!
 

সুনামি-ক্যাটরিনা তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রাকৃতির দিকে তাকিয়ে আমরা কেন হাঁ করে বসে থাকব ! যে মানুষটাকে সরকারী পোশাক পরা গুন্ডারা নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছে- কৃষক নামের ওই বয়স্ক মানুষটা; ময়লা খালি পা, গলায় গামছা, লুঙ্গি ছাড়া যার পরনে আর কিছু নাই- কয় টাকাই বা এইসব মানুষদের দাম? এমন প্রাণ এ দেশে কেজি হিসাবে বিক্রি হয় ! এদের মেরে ফেললেই তো জনসংখ্যার সমস্যটা ক্রমশ কমে আসবে !
 

আজ কেবল মনে হচ্ছে, কেন আমি হটেনড জাতি হলাম না? অন্য গোত্রের মানুষের মাংস আরামসে খেতে খেতে গল্প করতাম, আর মাংসটা ভাল সেদ্ধ হয়নি বলে খানিকটা মন খারাপও করতাম!
বিখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, "আমি আমার ভ্রণটিকে বলেছি, তুমি কি আসতে চাও পৃথিবীতে? সে বলেছে, মা, তুমি নরকে যাও, আমি এ নোংরা পৃথিবীতে আসছি না"।
 

আমি বিভ্রান্ত, দিকভ্রষ্ট! আমার আজ স্পস্ট ভাষায় বলতে ইচ্ছা করছে, আমি অন্তত মা’র কাছে-দেশমার কাছে ফিরতে চাই না, কক্ষনো না।
আমার চোখের সামনে আমার অসহায় আটপৌরে মার আঁচল ধরে টান দেবে, তাকে ক্রমশ নগ্ন করে ফেলবে, আমি নপুংশক-হিজড়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব, দেখব...আর দেখব। মা’র এমন সন্তান হওয়ার চেয়ে  আমার ভ্রণ থাকতেই মরে যাওয়া ভালো ছিল!
 

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু নাকি বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ। কিন্তু মা’র তো এই সমস্যা নাই, মার কাঁধে সন্তানের লাশ থাকার নিয়ম নাই! কে জানে, এ জন্যেই হয়তো মার শোক কম, কী অবলীলায়ই না তার মৃত সন্তানের রক্তাক্ত জামা তুলে দেখাচ্ছেন! দেখো গো, ভালো মানুষের ছেলেরা, এরা আমার বাবুটাকে কী করেছে! বাবুটা টুকটুকে একটা লাল জামা কিনে দেয়ার জন্যে কী বায়নাই না করত, অভাবে কিনে দিতে পারিনি। আজ বাবুটার জামা রক্তে কী লাল!
 

ও হে গ্রাম্য মা, মন খারাপ করে না গো, তোমার কী অপার সৌভাগ্য,  লক্ষ লক্ষ মানুষ তোমায় দেখছে! যে সব পত্রিকায় দু’লাইন খবর ছাপানোর জন্যে আমরা অনেকেই আমাদের আত্মা বিক্রি করে দেই, সেখানে প্রথম পাতায় তোমার ছবি ছাপা হয়েছে, এও কী কম! মন খারাপ করো না গো, গ্রাম্য মা!
 

মাটা এই জামাটা যত্ন করে রেখে দেবেন। কোন একদিন এই জামাটা তোবড়ানো ট্রাংক থেকে বের করবেন। জামাটা উঁচু করে গুলির ফুটোটার দিকে নির্নিমেষে তাকিয়ে থাকবেন। কে জানে, হয়তো বা ফুটোটা দিয়ে সূর্য তাঁর চোখ ঝলসে দেবে, অন্য ভুবনের এক আলোয় মার মুখটা ঝলমল করে উঠবে!"


সহায়ক লিংক:
১. ব্র্যাক ব্যাংক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html
২. ডিজিটাল টাইম নামের হাস্যকর এক খেলা: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_30.html
৩. ডে লাইট সেভিং: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_16.html৪
৪. বিদ্যুৎ না গণতন্ত্র: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_27.html
৫. ১০১ লাইনের কবিতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_28.html
৬. য়তু ডিজিটাল: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_8733.html

*ছবি ঋণ: প্রথম আলো