Friday, April 2, 2010

স্মৃতি রোমন্থন-চর্বিতচর্বণ-জাবরকাটা

সামহোয়্যারে সবচেয়ে বেশি ফাজলামী করতাম আমরা, আমি এবং ধুসর গোধূলি। মাঝে-মাঝে শের-শায়েরীর আসর বসত। অনেকেই এই দেয়াল ভেদ করতে পারতেন না। কেউ কেউ বিজাতীয় ভাষা বলে অনাগ্রহ দেখাতেন, বোকা-বোকা মন্তব্য করতেন। নব্য মুক্তিযোদ্ধা কেউ হিন্দি, উর্দু গুলিয়ে ফেলে চরম বিরক্ত হতেন, দেশদ্রোহী বলার জন্য মুখ হাঁ করতেন। তাতে করে আমাদের আসরের জৌলুশের কোন ঘাটতি হতো না।

একবার ধুসর গোধূলির জন্য একটা পোস্ট দিলাম। আনন্দনারায়ন মুল্লা আমার অসম্ভব পছন্দের।

"উয়ো কৌন হ্যায় জিসে তওবা কী
মিল গায়ি ফুরসাত
মুঝে তো গুনাহ কি ভি জিন্দেগী কাম হ্যায়।"
(কে সে প্রায়শ্চিত্তের পেয়ে গেল অবসর, আমার তো পাপ করার আয়ুটুকুও নেই।)


"জিন্দেগী এক আসুও কা জাম থা,
পিয়ে গায়ে কুছ, অওর কুছ ছালকা গ্যায়া।"
(জীবন ছিল এক অশ্রুর মদ, খানিকটা চুমুক দিলাম, বাকীসব গড়িয়ে গেল।)

অনুরোধের আসরে দায়ে পড়ে বাংলা অনুবাদ করতে হত আমায়। বাংলায় ভাল জানি না, হিন্দি জানব কী ছাই! তবুও চেষ্টা, সবিরাম। 

এই পোস্টটা দেয়ার পর শুরু হলো মন্তব্য। কী একেকটা মন্তব্য! বেঁচে থাকলে আনন্দনারায়ন মুল্লা তাঁর গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে লম্বা দিতেন।

মুখফোড়
:
আবে হা... আপনাগো আদাব দিতে ইয়াদ আছিল না, আগে কইবেন না হা...আদাব আরজ হ্যায়।
"কাভি কাভি হাফপ্যান্ট কা ফিতে আটাক যাতা হ্যায়
কাভি কাভি হাফপ্যান্ট কা ফিতে আটাক যাতা হ্যায়
আওর কাভি কাভি লুঙ্গি কা ভি গিট্ঠু আচ্ছাসে নাহি বানতা।"
(কখনো কখনো হাফপ্যান্টের ফিতায় গিঁট লাগে, আবার কখনো কখনো লুঙ্গির গিট্টু ঠিকমতো লাগে না)।

রাসেল(........): কামিল এ ইবলিশ
"মুঝকো খুদা নে খুদ শারাব দিয়া পিনে কো,
মুঝকো খুদা নে খুদ শারাব দিয়া পিনে কো,
ম্যায় তো বেহেক গিয়া উস কে বাদ

কেয়া হুয়া মুঝে নেহি হ্যায় ইয়াদ
তকরুর দিয়া ফির জিনে কো।"
('তকরুর' কি বুঝি নাই। লেখক ভালো বলতে পারবেন। আমি এখানে অবিকল তুলে দিলাম।)

হিমু: আমিও কিছু শায়েরী কপচাবো বলে ঠিক করেছি। নাম নিলাম মাখমুর ভজঘটোপুরি...আদাব আরজ হ্যায়!

"থোরি শারাব পিয়ে যাতা তো খারাব নেহি হোতা
থোরি শারাব পিয়ে যাতা তো খারাব নেহি হোতা
থোরি শারারাত কিয়া যাতা, আগার র‌্যাব নেহি হোতা।"
(খানিক মদ্যপান করলে মন্দ হতো না, খানিকটা দুষ্টামী করা যেত যদি র‌্যাব না থাকত।)

সুমন চৌধুরী:

"ক্যায়সে ছুপেগী তু বুরকে পেহেন কে
ক্যায়সে ছুপেগী তু বুরকে পেহেন কে
পার্দে কি আন্দার হার এক পানছি যো নাঙ্গা হোতি হ্যায়।"

* আমাদের হিন্দি ভাষায় দখল যাচ্ছেতাই। ভাগ্যিস, তখন এটা মোসতাকীম রাহীর চোখে পড়েনি। বড়ো বাঁচা বেঁচে গিয়েছিলাম!

ফিরিয়ে দাও আমার আকাশ

কল্লোল চাপা কষ্ট নিয়ে চিঠিটা পড়ছে। ভাগ্নের চিঠি, জাপানে আছে। আট বছর হলো দেশে ফেরার নাম নেই। ওর মন অসম্ভব খারাপ হয়ে যায়। বিশ বছরের যে ছেলেটা নিজে পানি ঢেলে খেত না, পানি খাব বললেই ঝকঝকে কাঁচের গ্লাসে মায়ামাখা কয়েকটা হাত এগিয়ে আসত। এখন ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটাচ্ছে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবহীন, একাকী-নিঃসঙ্গ। কী কুৎসিত একটা জীবন! আফসোস, জীবনের সেরা সময়টা হারিয়ে যায় পড়াশোনা, তথাকথিত ক্যারিয়ারের নামে। এ ছেলেটার কথা মনে হলেই কল্লোলের বুকটা কেমন ভারি হয়ে উঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

ছেলেটা কী আমুদেই না ছিল, ছিল কিছু পাগলামিও। এখানে থাকতে ও নিদেনপক্ষে তিনটা আন্ডার-গার্মেন্টস পরত। ওদের চোখে পড়ে গেলে কী লজ্জা! প্রথম দিন তো কল্লোল বুঝতেই পারেনি হচ্ছেটা কী, ভেবেছিল নতুন কিনেছে মাপ দেখছে। কিন্তু একটার ওপর আরেকটা, খটকা লাগল।
রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে পাগলা, কাহিনী কি!’
কুক্কু ভেঙেচুরে এক ফুট ছোট হয়ে বলল, ‘কিছু না মামা। এমনি-এমনি করছি।’
‘আরে পাগলা, মামার কাছে লজ্জা কি, মামা-ভাগ্নে যেখানে ভূত-প্রেত নাই সেখানে।’
‘ইয়ে, মানে মামা, আমি শার্ট ইন করলে ছেলেরা খেপায়। পেছন থেকে আমাকে নাকি দশ বছরের খোকা মনে হয়। এখন একটু হেলদি দেখাবে। দেখো, ঠিক বলিনি?’

প্রবাসে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কুক্কু এ অভ্যাস ছাড়তে পারল না। অবশ্য ওখানেও এ অভ্যাস রয়ে গেছে কিনা কে জানে! আজকের চিঠিতে লিখেছে:
“মামা বুঝতে পারছি নিয়মিত চিঠি দেই না বলে তুমি রেগে পটকা মাছ হয়ে আছ। কি করব বলো, কাজ থেকে ফিরে ঘুমুতে ঘুমুতে রাত চারটা হয়ে যায়। সকাল আটটায় স্কুলে যেতে হয়। ব্রেকের সময় ঢুলতে ঢুলতে কিছুক্ষণ ঘুমাই। স্কুল ছুটি হলে কাপড় কাচা, রান্না-বান্না, বাথরুম পরিষ্কার, কত কাজ!
মামা তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি, ওদিন তাড়াহুড়ো করে স্কুলে যাচ্ছি। ইলেকট্রিক ট্রেনের অটোম্যাটিক দরজা লেগে গেল। আমার স্কুল ব্যাগ বাইরে, আমি সরু ফিতা ধরে ট্রেনের ভেতর বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে আছি। যে স্টেশনে নামব এপাশের দরজা খুলল না, খুলল গিয়ে কয়েক স্টেশন পর। স্কুলে টিচার জানতে চাইলেন দেরি কেন হলো, আমি বুঝিয়ে বলছি। পুরোটা বলতে পারলাম না। জেনী করল কি, ও তুমি তো ওকে চেনো না, আমার বন্ধু। চোখমুখ সিরিয়াস করে বলল: কুক্ক, তুমি গডকে ধন্যবাদ দাও, আজ স্কুলব্যাগ বাইরে তুমি ভেতরে। এমন যদি হতো তুমি বাইরে ব্যাগ ভেতরে- হি হি হি, তাহলে কি হতো বলো তো?

মামা জেনীটা না বড়ো ফাজিল। একদিন এমন ক্লান্তি লাগছিল, টিফিন আওয়ারে চোখ লেগে গেল। ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলে দেখি টিফিন বক্স খালি। জেনী টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে হাসিমুখে বলল: সরি, তোমার টিফিন আমি খেয়ে ফেলেছি, আমারটা তুমি খাও।
ওর খাবার চিবুতে চিবুতে বিরক্ত হয়ে আমি বললাম: জিনিসটা কি, রাবারের মতো মনে হচ্ছে!
জেনী চোখ কপালে তুলে বলল: কি বলছ, মার কী অসাধারণ রান্নার হাত। এতে কচ্ছপ কচি শুয়োরের মাংস সবই তো আছে। মামা, আমাকে ফাঁকি দিয়ে পর্ক খাইয়েছে বলে জেনীর উপর ঠিক শোধ তুলেছিলাম। কি করেছিলাম, জানো? নাহ, তোমাকে বলা যাবে না।

মামা তুমি না আমার হাতের পরোটা খেলে পাগল হয়ে যাবে। পরোটা খেতে কি মজা তুমি চিন্তাই করতে পারবে না। তবে মামা বিরাট সমস্যা, পরোটা বেলার জন্যে বেলন পাই না। প্রথমদিকে খুব অসুবিধা হতো, পরোটা তিনকোণা চারকোণা হয়ে যেত। কি করি, কি করি, হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল মদের বোতল দিয়ে বেলনের কাজ চালালাম। অ, মামা, তুমি আবার ভাবছ না তো আমি মদ-টদ খাই, ধুর পাগল! শুধু পরোটা গলায় আটকে গেলে কয়েক ঢোক-। গলায় খাবার আটকে বিধর্মীদের দেশে মারা যাই, এইটা কি তুমি চাও, নিশ্চয়ই চাও না?

আচ্ছা মামা, তুমি কি এখনো বর্ষার পানিতে কাগজের নৌকা ভাসাও? আমাদের আকাশটা কি আগের মতোই গাঢ় নীল? আমাদের ছাদের চাঁদটা কি আগের মতই মায়াবী? মামা, আমাদের পুকুরের বসার জায়গাটা কি আগের মতই আছে, নাকি ভেঙ্গে ফেলেছ। খবরদার মামা, খবরদার, ভাঙ্গলে কিন্তু তোমার খবর আছে। দেশে আসলে তোমাকে নিয়ে ওখানে বসব। রাজ্যের গল্প করব তোমার সাথে।
মামা, তোমার আগের চিঠি পড়ে জানলাম তুমি খুব হতাশ। এতোটাই ভেঙে পড়েছো ভিক্ষুক দেখে ভাবো তোমার চেয়ে কী সুখী এই লোক। কোলের শিশুকে হিংসা করো। কি হয়েছে, টাকা-পয়সার সমস্যা। ব্যস, এ-ই-ই!
ও মামা, আমাদের ওই টিয়াটা কি এখনো আছে, ওই যে ঠুকরে ঠুকরে খাঁচা ভেঙে পালিয়ে যেতে চাইত? তুমি শেষে লোহার খাঁচা বানিয়ে আনলে। ঐ টিয়াটাকে ভাল করে তাকিয়ে দেখো, দেখবে ওটা আমি। মামা- মামা, অ মামা, বড় কষ্ট!বড় কষ্ট!!

*লেখাটা 'একালের প্রলাপ'-এ ছাপা হয়েছিল। একটা ওয়েব-সাইটে (২০০৬) আমি যখন লেখালেখি করতাম, ওখানে এই লেখাটা দিয়েছিলাম। ওখানের কিছু মন্তব্য আমাকে বড়ো যন্ত্রণা দিয়েছিল। মন্তব্যগুলো দাঁড়ি-কমাসহ এখানে তুলে দিচ্ছি (প্রিন্ট আউটটা এখন আমার চোখের সামনে। সবার প্রকৃত নাম জানা আছে তবুও এখানে কেবল তাঁদের নিকটাই শেয়ার করব ):

প্রজাপতি
: "শুভ, বাচ্চা ছেলেগুলোকে কাঁদানোর জন্য কি লিখলেন এটা? ধুরো...আমার বন্ধুটা...।"
অনুমান করি, তাঁর সেই বন্ধুটা আজ ভালবাসা-বাসির মানুষ! বিবাহ করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন।

হযবরল: "অ মামা, আমি পরশু রাত তিনটা তক গরুর মাংস রানছি, খাইবা? পরটা আমি বানাইতে পারি না, তয় মামা সালাদ বানাই ভালো, সরিষার তেল আর কাঁচা মরিচ ডইলা। তুমি আমার জেনি রে একটু দেইখা রাইখো, মামা।..."
ঝপ করে আমার চোখের সামনে সব কেমন আধার হয়ে গেল। এটা এই ছেলেটার কান্ড- এ সুদূর আমেরিকা থেকে কি কি করল আমি জানি না। আমার চোখে জল!

অরূপ: "...এই বছরের অর্ধেকটা কাটল হোটেলে হোটেলে...কাকের বদলে গাংচিল দেখি। অচেনা শহরগুলো অচেনাই থেকে যায়। শুধু একা একা পথচলা।"
এই মানুষটা সঙ্গে ওই ওয়েব সাইটে কঠিন মারামারি-হাতাহাতি হয়েছিল। হাতাহাতি মানে আমার লেখার প্রসঙ্গ নিয়ে ভার্চুয়াল মারামারি! কিন্তু এক নিমিষেই সব ভুলে গিয়েছিলাম। আমার মাথায় আটকে গেল, হোটেলে-হোটেলে ঘুরি...কাকের বদলে গাংচিল দেখি।

এঁদের এই সব মনে রাখার আজ আর অবকাশ কই! কিন্তু আমি ভুলিনি। একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক! পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম, 'মার কাছে ফেরা' লেখাটা নিয়ে একজন কঠিন একটা মেইল করেছিলেন। ওখানকার একটা বাক্য এমন ছিল, "...আপনি আমাদের আবেগ নিয়ে খেলার চেষ্টা করেন। এটা ঠিক না, অন্যায়..."।
আজ এখন এখানে বলি, ট্রাস্ট মী, এমন অন্যায় জেনেশুনে করার কথা আমি কল্পনাও করি না। আমি কেবল আবেগের স্থানটা আলতো ছুঁয়ে দেয়ার চেষ্টা করি, প্রায়শ ব্যর্থ হই। কারণ আমি কখনও প্রবাসে থাকিনি। এই অচেনা ভুবনটা কেমন জানি না। কিন্তু এই অদেখা ভুবনটা বুকের ভেতর থেকে অনুভব করার চেষ্টা করি। আর কিচ্ছু না...।