Tuesday, March 30, 2010

শুভ'র ব্লগিং-এর মুখবন্ধ বা মুখখোলা

কোন গ্রন্থ, ওহ, আমাদেরটা তো আবার গ্রন্থ বলা যাবে না, বলতে হবে, বই। তো বইয়ের শুরুতে প্রাককথন, ভূমিকা নাম দিয়ে কিছু মুখতসর বাতচিত করা হয়। এটা আর কিছু না, গান গাওয়ার পূর্বে তবলার ঠুকাঠাক! শুভ'র ব্লগিং বইটা প্রকাশের পূর্বে এই কাজটা করার প্রয়োজন দেখা দিল। এমনিতেও দীর্ঘ এক বছর একটা ওয়েব সাইটে লেখালেখির সুবাদে ওখানে অজস্র মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। এঁদের অনেকের কাছে সম্পর্কটা ছিল নিছক ভার্চুয়াল কিন্তু আমি সত্যি ভাবতাম, নিরেট বাস্তব! আমার এই সব বোকামি নিয়ে অনেকের কী হাসি! এখনও অনেকে হাসাহাসি করেন।

কখনও কখনও আমার মনে হতো হাত বাড়ালেই এদের ছুঁতে পারি। ১৫ ইঞ্চি মনিটরের পেছনে আমি নামের যে নির্বোধ মানুষটা বসে আছে সেই মানুষটা হাত বাড়িয়ে হড়বড় করে বলবে, এই পাগল, দেখ, তোকে কেমন ছুঁয়ে দিলাম। সে এক সোনালী সময়! আমার সুহৃদদের জন্যও কিছু বলার ছিল তাই লিখলাম:

"মুখবন্ধ বা মুখখোলা
‘সামহোয়্যার ইন ব্লগ ডট নেট’ নামের বাংলা এই সাইটটি সম্ভবত চালু হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বরে। আমি ওখানে লেখালেখি, সরি, এটাকে আবার ব্লগিং বলা হয়। তো, ‘শুভ’ নামে ব্লগিং করা শুরু করি ফেব্রুয়ারী থেকে। নিজ নামে লেখালেখি না করার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। আমি চেয়েছিলাম, অবলীলায় যে কেউ যেন আমার সঙ্গে তাঁর ভাবনা, ভাল-মন্দ লাগা শেয়ার করতে পারেন। প্রথমেই আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কর্তৃপক্ষের কাছে, নিখরচায় আমাকে এখানে লেখালেখি করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

এখানে আমার কেটেছে সোনালী সময়, সময়টা আমি বড্ডো এনজয় করেছি। আগেও তো টুকটাক লেখালেখি করেছি, কিন্তু এখানের ব্যাপারটা ছিল অন্য রকম। আগে বই লিখে পাঠকের প্রতিক্রিয়া আমি বুঝতে পারতাম না, যেটা এখানে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারতাম। যেন টিভি নাটক আর মঞ্চ নাটকের পার্থক্য!

আমার লেখা কারো ভাল লাগতো, কারো লাগতো না, কিন্তু আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, সহৃদয় যারা আমার লেখা পড়েছেন বা পোস্টে মন্তব্য করেছেন। আমার কাছে একেকটা মন্তব্যর মূল্য অপরিসীম (প্রত্যেকটা মন্তব্য আমার কাছে এখনও সংরক্ষিত)। মনে হতো এমন, এদের হাত বাড়িয়ে দিলেই ছুঁয়ে দিতে পারি। গা ছুঁয়ে বলতে পারি, এই পাগলু তোকে ছুঁয়ে দিলাম। অনেকেই এখানে আমার প্রতি বিভিন্ন সময়ে অযাচিত মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আজ আমি স্পষ্ট ভাষায় বলি, আপনাদের ঋণ আমি কি করে শোধ করি, এতো ক্ষমতা আমার কই?
কখনোই এই জগৎটাকে ভার্চুয়াল মনে হতো না, মস্তিষ্ক ভার্চূয়াল জগৎ স্বীকার করলেও হৃদয় মানতে চাইতো না!

শুভ'র ব্লগিং এই বইয়ে, আমি কোথাও কারও লগ ইন নেম, বা বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করিনি। কারণটা বললে, আমি আশা করি আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন! কাকে ছেড়ে কার কথা বলবো? এ সাইটে আমার পছন্দের মানুষের সংখ্যা এতো বেশী, বিশেষ একজনের কথা বলে অন্য মানুষটার প্রতি অন্যায় করা হয়, ভালবাসার দাবী যে বড়ো প্রবল!

প্রথমে যখন আমি এখানে লেখা শুরু করি, প্রচন্ড জড়তা নিয়ে। দীর্ঘ দিন লেখালেখি না করার জড়তা! এক সময় চুটিয়ে লিখেছি কিন্তু লম্বা একটা সময় এক লাইনও লেখা হয়নি। এক সময় আমার মনে হয়েছিল, ধুর, লেখালেখি না করলে কি হয়?
গত বছর মুক্তিযুদ্ধের বই ‘ফ্রিডম’ শেষ করতে আমার কাল ঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল। শেষ না করে উপায় ছিল না, কারণ এই বইটার উপাত্তগুলো সংগ্রহ করতে আমার ৬ মাস লেগেছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই লেখা ছিল আমার স্বপ্ন, যৎকিঞ্চিৎ ঋণ শোধের অপচেষ্টা।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার মতো মনন, দুঃসাহস আমি করতাম না। কিন্তু এই বইটা তাঁদের জন্য না, যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর জ্ঞান রাখেন, এটা এই প্রজন্মের জন্য, যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। তাদের মধ্যে যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি খানিকটা মমতা, আবেগ সৃষ্টি করা যায়, এটাই ছিল আমার লক্ষ! শেকড়ের কাছে ফেরা!

তো, জড়তা প্রসঙ্গে বলছিলাম, প্রথম প্রথম লেখা হচ্ছিল না। অহেতুক জড়তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল অসম্ভব স্লো টাইপিং স্পীড। এক আঙ্গুলে টাইপ করতাম, কী-বোর্ডের বাংলা অক্ষরগুলো আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতো, হা হা হা!
খানিকটা চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিলাম বলে ক্ষমা চাই, আসলে উপায় ছিল না। ‘ফ্রিডম’ থেকে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু লেখা পোস্ট করেছিলাম। প্রথম দিকে বই এবং লেখকের নাম দিতাম এই কারণে, একজন পাঠকও যদি চ্যালেঞ্জ করে বসতেন, শুভ চোর! হয় আমাকে চোর অপবাদ মেনে নিতে হতো, নতুবা প্রমাণ করতে হতো আমিই এটার লেখক। তাহলে তৎক্ষণাৎ ‘শুভ’ নামের ব্লগারের অপমৃত্যু ঘটতো। এতে করে আমার এই সাইটে আসার উদ্দেশ্য ব্যহত হতো, যেটা আমি চাচ্ছিলাম না! পরে অবশ্য আমার অন্য বই থেকেও পোস্ট করেছি। একটা উপন্যাসকে ভেঙ্গে কাটছাঁট করে অনেকগুলো পোস্ট করেছি। কয়েকজন অবশ্য ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ তাঁরা শুভকে শুভই থাকতে দিয়েছেন।

এই বইয়ে আমার অনেক পছন্দের লেখা বাদ দিতে হয়েছে, পৃষ্ঠা সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। প্রকাশক সাহেবের মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছিল, কারণ ফর্মার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। ফর্মা বাড়া মানেই ওনার ইনভেস্ট বেড়ে যাওয়া, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। তাছাড়া আমি নিজেও চাচ্ছিলাম না বইটার দাম নাগলের বাইরে চলে যাক।
আমার অনেক পছন্দের বই দাম বেশী হওয়ার কারণে কিনতে পারিনি, এ কষ্ট এখনো আমাকে তাড়া করে!

এই সাইটে, শেষের দিকে আমি অবশ্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম, ইচ্ছা করেই। জানি না কোন এক বিচিত্র কারণে অনেকেই আমাকে পছন্দ করছিলেন না। আমি এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, তা হলে কার জন্য এখানে লেখালেখি করবো, নিজের জন্য? উঁহু, আমি সেইসব মহান লেখক না, যারা নিজেদের আনন্দের জন্যই লেখালেখি করেন। ওই সব মহান লেখকদের লেখা কে পড়ল, কে পড়ল না তাতে তাঁদের কিছুই যায় আসে না! এটা তাঁদের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু এই আবর্জনা লেখকের জন্য ঠিক নাই!

মূলত আমি এখানে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে ভাবনা শেয়ার করতে, শিখতে। জানি না কেন ক্রমশ দলছুট হয়ে গেলাম, এর জন্য হয়তো বা আমিই দায়ী! এখানে আমার প্রতিক্রিয়া, আচরণ হয়তো খাপছাড়া হয়ে গিয়েছিল, মিশ খাচ্ছিল না। আমার হয়তো দেয়ার ছিল না কিছুই, কিন্তু আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি, নেয়ার ছিল অনেক কিছুই। এই সাইটে অনেকের মনন দেখে অনেক তথাকথীত জ্ঞানীরা হতবাক হবেন, ট্রাস্ট মী!
আফসোস, আমার অর্বাচীনতার কারণে আমি বঞ্চিত হলাম, আমার দূর্ভাগ্য! তবুও আমি বলব, এখানে আমি যে ভালবাসা, মমতা পেয়েছি, এ অতুলনীয়!

ভাল থাকবেন গো সবাই, বিশেষ করে এই সাইটের আমার পুরনো বন্ধুরা, পানির মতো টলটলে!"