Monday, March 29, 2010

মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ

এই দেশে যারা সাহিত্য চিবিয়ে খান তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের বই পড়লেও স্বীকার যান না। এতে তাঁদের ভারী লাজ! তাঁরা নাকি তাঁর লেখায় গভীরতা খুঁজে পান না।
আমার এই সব হ্যাপা নাই। সাহিত্য বিষয়টা আমি ভাল বুঝি না, তাছাড়া গভীরতা জিনিসটা আমি ভয়ের চোখে দেখি, ভাল সাঁতার জানি না যে!

গভীরতা থাকুক অন্যদের জন্য, হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে অনেক কঠিন সময় পার করেছি, এর কী কোন মূল্য নাই? তাঁর কোন বই হাতে নিয়েছি কিন্তু পড়ে শেষ করিনি এমনটা হয়নি, এখনো! এই যে এখনো আমাকে ধরে রাখার ক্ষমতা- কী বিপুল এক ক্ষমতা! কী এক অদ্ভুত ব্যাপার! পারলে মানুষটার হাত সোনা দিয়ে বাঁধাই করে দিতাম। হুমায়ূন আহমেদকে কোন ইশকুলে পড়তে হয় না, তিনি নিজেই একটা ইশকুল।

আজকাল তাঁর বই তেমন পড়া হয় না, কারণ বিবিধ। সম্প্রতি পড়লাম তাঁর
'মাতাল হাওয়া'। অনুমান করি, এই বইটা লেখার পূর্বে হুমায়ূন আহমেদ খানিকটা অলি পান, আ মীন মদ্যপান করেছিলেন। মাতাল হয়েই মাতাল হাওয়ায় ভাসছিলেন।

আমাদের সাহিত্যে একটা শব্দ সযতনে এড়িয়ে চলা হয়। ইংরাজি Fart শব্দটার বাংলা একটা অর্থ। লেখার প্রয়োজনে আমি নিজেও অনেক গালি ব্যবহার করি কিন্তু এই শব্দটা ব্যবহার করার কথা দূরের কথা বলারও ইচ্ছা প্রকাশ করি না। কখনো এই শব্দটা লেখার প্রয়োজন হলে আমি লিখব, পুট পুট করে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
শওকত ওসমান এটার নতুন একটা শব্দ চালু করেছিলেন, পর্দন। 

হুমায়ূন আহমেদ এই বইটায় 'প' অক্ষরবিশিষ্ট এই শব্দ অবলীলায় ব্যবহার করেছেন, যত্রতত্র। আমার ধারণা অহেতুক। যাগ গে, এটা তাঁর অভিরুচি, আমার বলার কিছু নাই। কিন্তু আমার বক্তব্য অন্যখানে।

তাঁর সৃষ্ট একটা চরিত্র হাজেরা বেগম। এই মহিলাকে দেখানো হয়েছে অপ্রকৃতস্থ যদিও পরে আমরা জানতে পারি এটা তার ভান। হাজেরা বেগম
'প' অক্ষরবিশিষ্ট এই শব্দটা তার ছেলের বউ, নাতনির সামনে অহরহ বলতে থাকেন। (পৃষ্ঠা নং: ৩৬)
বেশ। হাজেরা বেগম মানুষটা পাগল বা পাগলের ভান করছেন। কী আর করা, পাগলের সঙ্গে কী কথা!

কিন্তু গভর্নর মোনায়েম খান একজন অধ্যাপকের সঙ্গেও 'প' অক্ষরবিশিষ্ট ঠিক এই শব্দটাই ব্যবহার করেন। (পৃষ্ঠা নং: ১০৯)। হুমায়ূন আহমেদের অলিপানের প্রসঙ্গটা এই জন্যই বলেছিলাম। বেচারা খানিকটা মাতাল হয়ে পড়েছিলেন।

মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ নিজের সম্বন্ধে বলছেন, "আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেমেস্ট্রির বইখাতা খুললাম। ধুলা ঝাড়লাম। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে...আবারও কেমিস্ট্রের বইখাতা বন্ধ। ...আসামি শেখ মুজিবর রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন। আবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এখন ভাসানী কোন ঝামেলা না করলেই হলো। এই মানুষটা বাড়া ভাত নষ্ট করতে পারদর্শী। হে আল্লাহ, তাকে সুমতি দাও। সব যেন ঠিক হয়ে যায়। দেশ শান্ত হোক।" (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫)

আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি স্বাধীনতার এই উত্তাল সময়টায় হুমায়ূন আহমেদ নামের মানুষটার গাছাড়া, উদাসীন মনোভাব। যেখানে ১০ বছরের বালক গ্রেনেড মেরে পাকআর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছে সেখানে একজন তরতাজা মতান্তরে ধামড়া মানুষ গা বাঁচিয়ে চলে কেমন করে! মানলাম, একেকজনের একেক ভূমিকা। আহা, কেমেস্ট্রির ছাত্রটা যদি একখানা পেট্রল বোমা বানিয়ে কাউকে ধরিয়ে দিত তাও তো একটা কাজের কাজ হতো। আর কিছু না পারলে নিদেনপক্ষে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে একখানা ৪ লাইনের কবিতা।
কেউ কেউ বলবেন, সেদিন হুমায়ূন আহমেদকে হারালে আজ আমরা কি আরেকটা হুমায়ূন আহমেদ পেতাম? কথা সত্য, আমি আন্তরিক স্বীকার যাই, হুমায়ূন আহমেদ একজনই হয়। কিন্তু কার মৃত্যু বিছানায় হবে, না যুদ্ধক্ষেত্রে তা কে জানে? আমেরিকার 'লিচ' নামের এক ভদ্রলোকের বিশ্বরেকর্ড ছিল পিপের ভেতরে করে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উপর থেকে ঝাপ দেয়ার। তিনি অনেকবার এই কাজটা পানির মত করেছেন কিন্তু এই ভদ্রলোকের মৃত্যু হয় কলার খোসায় পা পিছলে।

মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ মাওলানা ভাসানী সম্বন্ধে লিখেছেন, "মাওলানা ভাসানীর সেই সময়ের কান্ডকারখানা আমার কাছে যথেষ্টই রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি যাননি। ...আয়ুব খানের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তিনি হয়তোবা জেলের বাইরে।...হঠাৎ ঘোষণা দিলেন, তিনি গ্রামে গ্রামে চোর-ডাকাত ধরবেন। বিশেষ করে গরুচোর।" (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫-১৯৬)
এই তথ্য হুমায়ূন আহমেদ কোথায় পেলেন এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন- এর দায়দায়িত্ব তাঁর। ধরে নিলাম, তথ্যটা অকাট্য। কিন্তু মাওলানা ভাসানী কেন এই উদ্যেগ নিয়েছিলেন এর কোন ব্যাখ্যায় তিনি যাননি। আয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি যাননি হুমায়ূন আহমেদের এই প্রসঙ্গে আমি অজস্র অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে পারি। উদাহরণ হিসাবে কেবল এই লেখাটার রেফারেন্স দিলাম

এরপর হুমায়ূন আহমেদ ভয়ংকর এক কথা লিখেছেন, তাঁর আরেক চরিত্র বিদ্যুত। বিদ্যুতের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের বাবাকে সেই আগুনে ফেলে দেয়া হয়েছে। বাবাকে আগুন থেকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুৎ কান্তি দে-র মৃত্যু হয়।
এই প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ মাতাল হাওয়ায় লিখেছেন, "তারা দেশ থেকে চোর-ডাকাত নির্মূল করতে বলছে। তারা চোর-ডাকাত এই আইডিয়া হয়তোবা মাওলানা ভাসানীর কাছ থেকে পেয়েছে।...চোর নির্মূল অভিযানের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কান্তি দে উপাখ্যানের সমাপ্তি হলো।" (পৃষ্ঠা: ২১৪-২১৫)
কী ভয়াবহ! হুমায়ূন আহমেদ কি বলতে চাইলেন, মাওলানা ভাসানী বলে দিয়েছিলেন, হিন্দুদের ঘরে আগুন লাগাও, তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেল?

হুমায়ূন আহমেদ, কয় পেগ আপনার সহ্য হয় আমি জানি না,
লিমিট ক্রস করা কোন কাজের কাজ না। শরীরে যতটুকু সয় ততটুকুই মদ্যপান করুন। ভদকা টাইপের লিকার বাদ দিয়ে শেরী, শ্যাম্পেন ট্রাই করে দেখতে পারেন (যদিও এগুলোকে বলা হয় মেয়েদের লিকার)। এতে আপনার শরীরের জন্য মঙ্গল, আমাদের জন্যও।

*একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে আমাকে আরও খানিকটা লিখতে হয়েছে। প্রয়োজন বোধ করায় মূল পোস্টের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছি: ১৯৯২ সালে 'অন্তরঙ্গ হুমায়ূন আহমেদ' বইটা প্রকাশিত হয়, হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবির।
ওখানে হুমায়ূন আহমেদ বলছেন,
"মুক্তিযুদ্ধে আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি- বাবাকে হারিয়েছি মিলিটারির হাতে। আবার একই সঙ্গে আমার নানা, আমার মামা , এঁরা মারা গেছেন মুক্তিবাহিনীর হাতে। কনট্রাস্টটা চিন্তা করুন। সমস্ত কিছু দেখার পরে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা মেজর ওয়ার্ক যদি আমার হাত দিয়ে বের না হয় আমি মরেও শান্তি পাব না।
...দশ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে...আমার ডিপার্টমেন্ট একটা ছোট্ট আইসোলেটেড রুম আছে, ঐখানে গিয়ে লিখি। এটা আমি উনসত্তর থেকে শুরু করে, শেখ মুজিবের মৃত্যু পর্যন্ত শেষ করবো। (পৃষ্ঠা নং: ২৭)

আবার তিনি 'মাতাল হাওয়া' বইটার প্রাককথনে বলছেন,
"একটি মহান গণআন্দোলনকে কাছ থেকে দেখা হয় এই উনসত্তরেই।...মাতাল সেই সময়টাকে ধরতে চেষ্টা করেছি মাতাল হাওয়ায়।"

আমি অনুমান করি, ১৯৯২ থেকে তিনি মাতাল হাওয়া বইটা লেখায় হাত দিয়েছেন। প্রচুর চিন্তাভাবনা, প্রস্ততি নিয়েছেন। ফট করে তিনি কিছু একটা লিখে দেবেন এটা আশা করা বাতুলতা মাত্র!
এই প্রজন্ম এমনিতেই ভুল ইতিহাস নিয়ে বড়ো হচ্ছে আর হুমায়ূন আহমেদের মত অসম্ভব শক্তিশালী মানুষরা যদি ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেন তাহলে আমাদের দাঁড়াবার আর জায়গা থাকে না। এটা অপরাধই না, ভয়ংকর অপরাধ। আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখককে তাঁর লেখালেখির কারণে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না কিন্তু হুমায়ূন আহমেদকে দাঁড়াতে হবে পাঠকের কাঠগড়ায়।
মাওলানা ভাসানী সম্বন্ধে তাঁর এমন নীচু ধারণা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। ভাগ্যিস মাওলানা ভাসানীকে গরুচোর বলে বসেননি!

হুমায়ূন আহমেদ মাতাল হাওয়ায় লিখেছেন,
"...আয়ুব খানের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তিনি (মাওলানা ভাসানী) হয়তোবা জেলের বাইরে।"

হুমায়ূন আহমেদ, আইউব সরকারের প্রতি মাওলানা ভাসানীর আনুগত্যের নমুনা এখানে দেখুন:

স্যালুট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, জামিল


এই দেশের সেরা এই সন্তানটার পদোন্নতি হয়েছে। আমার তো সামরিক কায়দায় এই মানুষটাকে স্যালুট করার সুযোগ নাই কিন্তু তবুও স্যালুট করি, হে বীরপ্রসু দেশমার বীর সন্তান, অনেক কাল না-ঘুমানো চোখটাকে এবার খানিকটা বিশ্রাম দাও।
তিনি কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।
কর্নেল জামিল নামের এই মানুষটার পদোন্নতি হয়ে আজ তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।

"১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাতে ঘাতকেরা যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর হামলা চালিয়েছিল তখন সেনাবাহিনীর একজন মাত্র সাহসী সৈনিক এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে রক্ষার জন্য। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কর্নেল জামিলকে ফোন দেয়ার পর কী কী ঘটেছিল দেশ টিভিকে সে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তার কন্যা আফরোজা জামিল। তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর গলা কাঁপছিল। আমার মাকে বলছিলেন, জামিল কোথায়? জামিলকে দে'।
তিনি আরও বলেন, 'বাবা ফোন ধরে বললেন, জ্বী স্যার...আমি এখনই আসছি। মা যখন জিজ্ঞাসা করলো যে, বঙ্গবন্ধু ফোনে কী বলেছে, বাবা জানালেন বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি বোধহয় আর বাঁচবো না। তুই আমাকে বাঁচা'।"

কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক এই কুতর্ক থাকুক তর্কবাজদের জন্য কিন্তু একজন সৈনিকের যে দায়িত্ব, মিশন তা তিনি করে দেখিয়েছেন। একজন সৈনিক, একজন পুরুষ!
বিচিহীন অন্যদের আমি পুরুষের কাতারে ফেলতে নারাজ। আমার ধারণা, এই দেশে দায়িত্বে থাকা বিচিযুক্ত কোন পুরুষ তখন ছিলেন না, 'হিজড়ো কি মেলা'!

১৯৭৫ থেকে ২০১০, অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে কর্নেল জামিল নামের পুরুষটার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে। এই প্রজন্মের একজন আমি, আবারও তোমায় স্যালুট করি, ম্যান।
বেশ, কর্নেল জামিলকে পদোন্নতি দেয়া হলো কিন্তু তৎকালিন আর্মি চিফ অভ স্টাফ শফিউল্লাহ কেন এখনও মেজর জেনারেল থাকবেন? এই কাপুরুষ মানুষটাকে কেন মেজর জেনারেল থেকে অন্তত একধাপ নীচে নামিয়ে দেয়া হবে না?

দুই কিস্তিতে ১৬.০৮.৯৩ সালের ভোরের কাগজে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। "দেখুন, বলতে গেলে ১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর পর থেকে আমি ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিলাম...তখন অনেক কিছু মনে পড়ে। আমি ভাবি, সেদিন যদি একটা সৈন্যদল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম তাহলে কি হতো? তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুকে বাঁচানো যেত।...একাত্তর সাল থেকেই আমি অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়েছি।"
হা ঈশ্বর! একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যখন অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ে, 'আল্লার মাল আল্লা নিয়া গেলে আমার কী করার আছে' এই বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে, তখন সেই জাতির কী হয় তা সহজেই অনুমেয়।

আমার ধারণা, একজন শফিউল্লার মত মানুষের এমন কাপুরুষিত কু-উদাহরণ সৈনিকের চেইন অভ কমান্ড নামের সাহসের শেকলটার তছনছ করে দেয়। এই মানুষটা হচ্ছেন উদাহরণের জন্য এ গ্রহের একটা জঘণ্য উদাহরণ- এমন বিপুল ক্ষতি এই দেশের আর কেউ করেছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। পথিকৃৎ তিনিই, অজান্তেই অন্যদের পথ বাতলে দিয়েছেন।
মানুষটা কেন এখনো জাপানি কায়দায় পেট চিরে আত্মহত্যা করেননি এটা ভেবে কূল পাই না।