Search

Loading...

Wednesday, March 31, 2010

জুতাবাবা, গুবাবা

সেই সময়কার কথা যখন আমি লেখা ফেরি করে বেড়াই। লেখা লাগাবে গো লে-খা, আছুইন কেউ, নিবেন নি গো লেখা। তখন মাঝে-মাঝে ঢাকায় নিশি যাপন করতে হয়। নিশি যাপন করি এক সিনিয়র বন্ধুর ওখানে, নয়াবাজারে। এই বন্ধুটি এক কাগজ টাইকুনের ওখানে চাকরি করেন আত্মীয়তার সূত্রে। বন্ধুটির দবদবার শেষ নাই। বাজারে কাগজের তখন খুব সংকট। তিনি এক প্রকাশককে শস্তায় কাগজ পাইয়ে দেবেন এই শর্তে প্রকাশক আমার একটা বহি বাহির করিবেন এই নিয়ে অদৃশ্য দড়ি টানাটানি হচ্ছে। আমিও বন্ধুটির অদৃশ্য লেজ ধরে ঘুরে বেড়াই।

একদিন আমার বন্ধুটি বললেন, চল।
তিনি চল বলেছেন আমার চলতে তো কোন আপত্তি থাকার কথা না। তারপরও আমি বললাম, কোথায়, প্রকাশকের ওখানে?
তিনি বিরক্তি নিয়ে বললেন, তোমারে নিয়া হইল এইটাই সমস্যা। এক বাবার ওইখানে যাব। বাবা খুব গরম মানুষ।
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কী দিনকাল পড়ল আজকাল কি বাবারা বই ছাপানোর কাজে হাত দিয়েছেন!
বন্ধুটি যে বস্তুটির সামনে আমাকে এনে দাঁড় করিয়ে দিলেন এই বাবা নামের ছোটখাট বিশাল পেটওলা পাহাড়সম জিনিসটি রাজ্যের আবর্জনা গায়ে মেখে রাস্তায় পা ছড়িয়ে বসে আছে।

বন্ধুটি ঝলমলে মুখে বললেন,
গুবাবা খুব গরম জিনিস। দেখছিস না লোকজন কেমন ভিড় করে আছে।
আমি হতভম্ব হয়ে বন্ধুটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এই ছেলেটোর পড়াশুনা আমার চেয়ে এক কেলাশ উপরে, একটা শিক্ষিত ছেলে এই সব কী বলছে!
আমি রাগ চেপে বললাম, সত্যি সত্যি এই মানুষটা গু মাখে?
মানুষ মানুষ করছিস কেন। বাবা বলবি।
বেশ, এই গুবাবা কি সত্যি সত্যি গায়ে গু মাখে?
হুঁ।

আমার ভাল লাগছিল না, এখানে এক দন্ড থাকতে ইচ্ছা করছিল না, আমি বিরক্ত, তা বাবা কি টাটকা গু মাখেন, না বাসি?
বন্ধুটির আমার এই কথাটায় ক্ষেপে গেলেন, রসিকতা করবি না। বা... বই লেখলেই হয় না। কার মধ্যে কি আছে এইটা বোঝার ক্ষমতা তোর নাই, তুই এখনও দুধের বাচ্চা। দেখছিস না লোকজন বাবার গায়ে হাত দিয়ে দোয়া নিচ্ছে।
বুঝলাম, ইনি খুব গরম জিনিস, টাটকা গরম গু গায়ে মাখেন। তো, এখানে আমার কি কাজ?
তুই ফাজিলের মত কথা বলতাছস! টাটকা বাসি এই সব কী ফাজলামী কথা।

আমি নিশ্চ্তি এর সঙ্গে চটাচটি করা মানে আমার বই বের হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে কিন্তু কিন্তু সব সময় কি মস্তিষ্ক নিয়ম মেনে কাজ করে। আমি আমার বইয়ের কথা ভুলে গেলাম। ঠান্ডা গলায় বললাম, গুয়ের মধ্যে থাকে ক্রিমি এটাই এত কাল জেনে এসেছি। আমি বমি করব। আপনার উপর করলে রাগ করবেন?
এরপর আমরা দু-জন দু-দিকে হাঁটা ধরলাম।


আজ অনেক দিন পর আরেক বাবার খোঁজ পেলাম। ইনাকে সম্ভবত জুতাবাবা বলা চলে। এই বাবা জুতা দিয়ে পিটিয়ে
সবাইকে মানুষ করতেন কি না বুঝতে পারছি না। হলে সর্বনাশের কথা। কারণ বাবার জুতাটা প্লাস্টিক চামড়ার না, কাঠের। কাঠের জুতা খাওয়া খুব আরামদায়ক হওয়ার কথা না।

কর্ণেল এবং সান্তিয়াগো

গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের অসাধারণ একটা বই 'নো ওয়ান রাইটস টু কর্ণেল'। বইটি ছাপা হয় ১৯৫৮ সালে। মার্কেজকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় ১৯৮২ সালে।

কর্ণেল নামের চরিত্রটি জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। জীবনযুদ্ধে লড়ছেন মর্যাদার সঙ্গে, একপেট আগুন নিয়ে!
তিনি বছরের পর বছর ধরে নিয়ম করে পোস্ট আপিসে যান। যুদ্ধফেরত এই সৈনিক অপেক্ষায় আছেন সরকারের তরফ থেকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার চিঠিটার জন্য। চিঠির জন্য অপেক্ষা কিন্তু কেউ কর্ণেলকে লেখে না! এক অনিশ্চিত অপেক্ষা!
তাঁর হাহাকার করা কথাগুলো এমন, "আমার সব সহযোদ্ধারাই চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছে।"

তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও আশায় বুক বাঁধেন। কর্ণেল পত্মীর একসময় এই অপেক্ষা, শব নিয়ে অপেক্ষার চেয়েও দীর্ঘ মনে হয়। তিনি কর্ণেলের কাছে জানতে চান আগামী এই অপেক্ষার দিনগুলো কাটবে কেমন করে।
কর্ণেল পত্মী আবারও জানতে চান, খাব কি?
কর্ণেল উত্তর দেন, গু!

মার্কেজের সৃষ্ট এই চরিত্রটির সঙ্গে অনেকখানি মিল খুঁজে পাওয়া যায় আর্নস্ট হেমিংওয়ের 'দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী'-র সেই বুড়ো সান্তিয়াগোর সঙ্গে। হেমিংওয়ে ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি সাহিত্যে তাঁর অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে
'দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী'-এর কথা উল্লেখ করেন:
"His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book 'The Old Man and the Sea'..."


হেমিংওয়ের অমর সৃষ্টি বুড়ো সান্তিয়াগো। অমর সেই সংলাপ, "...মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু পরাজিত কখনও হয় না।"
বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো। যখন সবাই তাঁকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। তখনও বুড়ো স্বপ্ন দেখে, এক অদেখা স্বপ্ন! ৮৪ দিনেও একটিও মাছ পায়নি সে। ৮৫ দিনের মাথায় ১৮ ফিট লম্বা বিশাল এক মার্লিন মাছ ধরা পড়ে তাঁর বড়শিতে। শুরু হয় এক অন্য রকম লড়াই।
উত্তাল সমুদ্র, দানবীয় মাছ, ক্ষুধা-পিপাসার সঙ্গে টিকে থাকার যুদ্ধ। মাছের লোভে হাঙরের মিছিল। আমার ধারণা, সমুদ্র এখানে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, আসলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কারণ বুড়ো সান্তিয়াগোর প্রকৃতির সন্তান মাছটার প্রতি মমতার কমতি নেই। বুড়ো বলছে, "...মাছটাকে খাওয়াতে পারলে ভাল হতো...।"
আবার এও বলছে, ...মাছ, তোমার সঙ্গে আমি আমৃত্যু লড়ে যাব...।"

বুড়ো কর্ণেল এবং বুড়ো সান্তিয়াগোর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, শেষঅবধি কর্ণেলের স্বপ্ন-লড়াইটা সম্বন্ধে জানা যায় না কিন্তু সান্তিয়াগো লড়াই শেষ করে। হাঙরের মুখ থেকে ছিনিয়ে বিশাল সেই মাছটাকে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, যদিও তখন মাছটার কন্ঙ্কাল ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাতে কী, বুড়ো সান্তিয়াগো একাই লড়াই চালিয়ে তাঁর অদেখা স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় আটকে ফেলে।

কর্ণেল এবং সান্তিয়াগো এই দুই দুর্ধর্ষ লড়াকু আর কিছুই না।
জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
আমি বিশ্বাস করি, "একজনকে মেরে ফেলা যায় কিন্তু তার স্বপ্নকে মেরে ফেলা যায় না। সেই মানুষটার গলিত শব থেকে বেরিয়ে আসে এক প্রাণ, তাঁর সেই অদেখা স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় আটকে ফেলে। যারা এই স্বপ্নগুলো দেখতে পায় না তারা ভোরের ঠিক আগমুহূর্তে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যায়।

Tuesday, March 30, 2010

শুভ'র ব্লগিং-এর মুখবন্ধ বা মুখখোলা

কোন গ্রন্থ, ওহ, আমাদেরটা তো আবার গ্রন্থ বলা যাবে না, বলতে হবে, বই। তো বইয়ের শুরুতে প্রাককথন, ভূমিকা নাম দিয়ে কিছু মুখতসর বাতচিত করা হয়। এটা আর কিছু না, গান গাওয়ার পূর্বে তবলার ঠুকাঠাক! শুভ'র ব্লগিং বইটা প্রকাশের পূর্বে এই কাজটা করার প্রয়োজন দেখা দিল। এমনিতেও দীর্ঘ এক বছর একটা ওয়েব সাইটে লেখালেখির সুবাদে ওখানে অজস্র মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। এঁদের অনেকের কাছে সম্পর্কটা ছিল নিছক ভার্চুয়াল কিন্তু আমি সত্যি ভাবতাম, নিরেট বাস্তব! আমার এই সব বোকামি নিয়ে অনেকের কী হাসি! এখনও অনেকে হাসাহাসি করেন।

কখনও কখনও আমার মনে হতো হাত বাড়ালেই এদের ছুঁতে পারি। ১৫ ইঞ্চি মনিটরের পেছনে আমি নামের যে নির্বোধ মানুষটা বসে আছে সেই মানুষটা হাত বাড়িয়ে হড়বড় করে বলবে, এই পাগল, দেখ, তোকে কেমন ছুঁয়ে দিলাম। সে এক সোনালী সময়! আমার সুহৃদদের জন্যও কিছু বলার ছিল তাই লিখলাম:

"মুখবন্ধ বা মুখখোলা
‘সামহোয়্যার ইন ব্লগ ডট নেট’ নামের বাংলা এই সাইটটি সম্ভবত চালু হয়েছিল ১৬ই ডিসেম্বরে। আমি ওখানে লেখালেখি, সরি, এটাকে আবার ব্লগিং বলা হয়। তো, ‘শুভ’ নামে ব্লগিং করা শুরু করি ফেব্রুয়ারী থেকে। নিজ নামে লেখালেখি না করার পেছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না। আমি চেয়েছিলাম, অবলীলায় যে কেউ যেন আমার সঙ্গে তাঁর ভাবনা, ভাল-মন্দ লাগা শেয়ার করতে পারেন। প্রথমেই আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কর্তৃপক্ষের কাছে, নিখরচায় আমাকে এখানে লেখালেখি করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

এখানে আমার কেটেছে সোনালী সময়, সময়টা আমি বড্ডো এনজয় করেছি। আগেও তো টুকটাক লেখালেখি করেছি, কিন্তু এখানের ব্যাপারটা ছিল অন্য রকম। আগে বই লিখে পাঠকের প্রতিক্রিয়া আমি বুঝতে পারতাম না, যেটা এখানে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারতাম। যেন টিভি নাটক আর মঞ্চ নাটকের পার্থক্য!

আমার লেখা কারো ভাল লাগতো, কারো লাগতো না, কিন্তু আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, সহৃদয় যারা আমার লেখা পড়েছেন বা পোস্টে মন্তব্য করেছেন। আমার কাছে একেকটা মন্তব্যর মূল্য অপরিসীম (প্রত্যেকটা মন্তব্য আমার কাছে এখনও সংরক্ষিত)। মনে হতো এমন, এদের হাত বাড়িয়ে দিলেই ছুঁয়ে দিতে পারি। গা ছুঁয়ে বলতে পারি, এই পাগলু তোকে ছুঁয়ে দিলাম। অনেকেই এখানে আমার প্রতি বিভিন্ন সময়ে অযাচিত মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আজ আমি স্পষ্ট ভাষায় বলি, আপনাদের ঋণ আমি কি করে শোধ করি, এতো ক্ষমতা আমার কই?
কখনোই এই জগৎটাকে ভার্চুয়াল মনে হতো না, মস্তিষ্ক ভার্চূয়াল জগৎ স্বীকার করলেও হৃদয় মানতে চাইতো না!

শুভ'র ব্লগিং এই বইয়ে, আমি কোথাও কারও লগ ইন নেম, বা বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করিনি। কারণটা বললে, আমি আশা করি আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন! কাকে ছেড়ে কার কথা বলবো? এ সাইটে আমার পছন্দের মানুষের সংখ্যা এতো বেশী, বিশেষ একজনের কথা বলে অন্য মানুষটার প্রতি অন্যায় করা হয়, ভালবাসার দাবী যে বড়ো প্রবল!

প্রথমে যখন আমি এখানে লেখা শুরু করি, প্রচন্ড জড়তা নিয়ে। দীর্ঘ দিন লেখালেখি না করার জড়তা! এক সময় চুটিয়ে লিখেছি কিন্তু লম্বা একটা সময় এক লাইনও লেখা হয়নি। এক সময় আমার মনে হয়েছিল, ধুর, লেখালেখি না করলে কি হয়?
গত বছর মুক্তিযুদ্ধের বই ‘ফ্রিডম’ শেষ করতে আমার কাল ঘাম বেরিয়ে গিয়েছিল। শেষ না করে উপায় ছিল না, কারণ এই বইটার উপাত্তগুলো সংগ্রহ করতে আমার ৬ মাস লেগেছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বই লেখা ছিল আমার স্বপ্ন, যৎকিঞ্চিৎ ঋণ শোধের অপচেষ্টা।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার মতো মনন, দুঃসাহস আমি করতাম না। কিন্তু এই বইটা তাঁদের জন্য না, যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর জ্ঞান রাখেন, এটা এই প্রজন্মের জন্য, যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। তাদের মধ্যে যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি খানিকটা মমতা, আবেগ সৃষ্টি করা যায়, এটাই ছিল আমার লক্ষ! শেকড়ের কাছে ফেরা!

তো, জড়তা প্রসঙ্গে বলছিলাম, প্রথম প্রথম লেখা হচ্ছিল না। অহেতুক জড়তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল অসম্ভব স্লো টাইপিং স্পীড। এক আঙ্গুলে টাইপ করতাম, কী-বোর্ডের বাংলা অক্ষরগুলো আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতো, হা হা হা!
খানিকটা চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিলাম বলে ক্ষমা চাই, আসলে উপায় ছিল না। ‘ফ্রিডম’ থেকে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু লেখা পোস্ট করেছিলাম। প্রথম দিকে বই এবং লেখকের নাম দিতাম এই কারণে, একজন পাঠকও যদি চ্যালেঞ্জ করে বসতেন, শুভ চোর! হয় আমাকে চোর অপবাদ মেনে নিতে হতো, নতুবা প্রমাণ করতে হতো আমিই এটার লেখক। তাহলে তৎক্ষণাৎ ‘শুভ’ নামের ব্লগারের অপমৃত্যু ঘটতো। এতে করে আমার এই সাইটে আসার উদ্দেশ্য ব্যহত হতো, যেটা আমি চাচ্ছিলাম না! পরে অবশ্য আমার অন্য বই থেকেও পোস্ট করেছি। একটা উপন্যাসকে ভেঙ্গে কাটছাঁট করে অনেকগুলো পোস্ট করেছি। কয়েকজন অবশ্য ব্যাপারটা ধরে ফেলেছিলেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ তাঁরা শুভকে শুভই থাকতে দিয়েছেন।

এই বইয়ে আমার অনেক পছন্দের লেখা বাদ দিতে হয়েছে, পৃষ্ঠা সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। প্রকাশক সাহেবের মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছিল, কারণ ফর্মার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। ফর্মা বাড়া মানেই ওনার ইনভেস্ট বেড়ে যাওয়া, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। তাছাড়া আমি নিজেও চাচ্ছিলাম না বইটার দাম নাগলের বাইরে চলে যাক।
আমার অনেক পছন্দের বই দাম বেশী হওয়ার কারণে কিনতে পারিনি, এ কষ্ট এখনো আমাকে তাড়া করে!

এই সাইটে, শেষের দিকে আমি অবশ্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম, ইচ্ছা করেই। জানি না কোন এক বিচিত্র কারণে অনেকেই আমাকে পছন্দ করছিলেন না। আমি এক সময় সিদ্ধান্ত নিলাম, তা হলে কার জন্য এখানে লেখালেখি করবো, নিজের জন্য? উঁহু, আমি সেইসব মহান লেখক না, যারা নিজেদের আনন্দের জন্যই লেখালেখি করেন। ওই সব মহান লেখকদের লেখা কে পড়ল, কে পড়ল না তাতে তাঁদের কিছুই যায় আসে না! এটা তাঁদের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু এই আবর্জনা লেখকের জন্য ঠিক নাই!

মূলত আমি এখানে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে ভাবনা শেয়ার করতে, শিখতে। জানি না কেন ক্রমশ দলছুট হয়ে গেলাম, এর জন্য হয়তো বা আমিই দায়ী! এখানে আমার প্রতিক্রিয়া, আচরণ হয়তো খাপছাড়া হয়ে গিয়েছিল, মিশ খাচ্ছিল না। আমার হয়তো দেয়ার ছিল না কিছুই, কিন্তু আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি, নেয়ার ছিল অনেক কিছুই। এই সাইটে অনেকের মনন দেখে অনেক তথাকথীত জ্ঞানীরা হতবাক হবেন, ট্রাস্ট মী!
আফসোস, আমার অর্বাচীনতার কারণে আমি বঞ্চিত হলাম, আমার দূর্ভাগ্য! তবুও আমি বলব, এখানে আমি যে ভালবাসা, মমতা পেয়েছি, এ অতুলনীয়!

ভাল থাকবেন গো সবাই, বিশেষ করে এই সাইটের আমার পুরনো বন্ধুরা, পানির মতো টলটলে!"

Monday, March 29, 2010

মাতাল হাওয়ায় মাতাল হুমায়ূন আহমেদ

এই দেশে যারা সাহিত্য চিবিয়ে খান তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের বই পড়লেও স্বীকার যান না। এতে তাঁদের ভারী লাজ! তাঁরা নাকি তাঁর লেখায় গভীরতা খুঁজে পান না।
আমার এই সব হ্যাপা নাই। সাহিত্য বিষয়টা আমি ভাল বুঝি না, তাছাড়া গভীরতা জিনিসটা আমি ভয়ের চোখে দেখি, ভাল সাঁতার জানি না যে!

গভীরতা থাকুক অন্যদের জন্য, হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ে অনেক কঠিন সময় পার করেছি, এর কী কোন মূল্য নাই? তাঁর কোন বই হাতে নিয়েছি কিন্তু পড়ে শেষ করিনি এমনটা হয়নি, এখনো! এই যে এখনো আমাকে ধরে রাখার ক্ষমতা- কী বিপুল এক ক্ষমতা! কী এক অদ্ভুত ব্যাপার! পারলে মানুষটার হাত সোনা দিয়ে বাঁধাই করে দিতাম। হুমায়ূন আহমেদকে কোন ইশকুলে পড়তে হয় না, তিনি নিজেই একটা ইশকুল।

আজকাল তাঁর বই তেমন পড়া হয় না, কারণ বিবিধ। সম্প্রতি পড়লাম তাঁর
'মাতাল হাওয়া'। অনুমান করি, এই বইটা লেখার পূর্বে হুমায়ূন আহমেদ খানিকটা অলি পান, আ মীন মদ্যপান করেছিলেন। মাতাল হয়েই মাতাল হাওয়ায় ভাসছিলেন।

আমাদের সাহিত্যে একটা শব্দ সযতনে এড়িয়ে চলা হয়। ইংরাজি Fart শব্দটার বাংলা একটা অর্থ। লেখার প্রয়োজনে আমি নিজেও অনেক গালি ব্যবহার করি কিন্তু এই শব্দটা ব্যবহার করার কথা দূরের কথা বলারও ইচ্ছা প্রকাশ করি না। কখনো এই শব্দটা লেখার প্রয়োজন হলে আমি লিখব, পুট পুট করে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
শওকত ওসমান এটার নতুন একটা শব্দ চালু করেছিলেন, পর্দন। 

হুমায়ূন আহমেদ এই বইটায় 'প' অক্ষরবিশিষ্ট এই শব্দ অবলীলায় ব্যবহার করেছেন, যত্রতত্র। আমার ধারণা অহেতুক। যাগ গে, এটা তাঁর অভিরুচি, আমার বলার কিছু নাই। কিন্তু আমার বক্তব্য অন্যখানে।

তাঁর সৃষ্ট একটা চরিত্র হাজেরা বেগম। এই মহিলাকে দেখানো হয়েছে অপ্রকৃতস্থ যদিও পরে আমরা জানতে পারি এটা তার ভান। হাজেরা বেগম
'প' অক্ষরবিশিষ্ট এই শব্দটা তার ছেলের বউ, নাতনির সামনে অহরহ বলতে থাকেন। (পৃষ্ঠা নং: ৩৬)
বেশ। হাজেরা বেগম মানুষটা পাগল বা পাগলের ভান করছেন। কী আর করা, পাগলের সঙ্গে কী কথা!

কিন্তু গভর্নর মোনায়েম খান একজন অধ্যাপকের সঙ্গেও 'প' অক্ষরবিশিষ্ট ঠিক এই শব্দটাই ব্যবহার করেন। (পৃষ্ঠা নং: ১০৯)। হুমায়ূন আহমেদের অলিপানের প্রসঙ্গটা এই জন্যই বলেছিলাম। বেচারা খানিকটা মাতাল হয়ে পড়েছিলেন।

মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ নিজের সম্বন্ধে বলছেন, "আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেমেস্ট্রির বইখাতা খুললাম। ধুলা ঝাড়লাম। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে...আবারও কেমিস্ট্রের বইখাতা বন্ধ। ...আসামি শেখ মুজিবর রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন। আবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এখন ভাসানী কোন ঝামেলা না করলেই হলো। এই মানুষটা বাড়া ভাত নষ্ট করতে পারদর্শী। হে আল্লাহ, তাকে সুমতি দাও। সব যেন ঠিক হয়ে যায়। দেশ শান্ত হোক।" (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫)

আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি স্বাধীনতার এই উত্তাল সময়টায় হুমায়ূন আহমেদ নামের মানুষটার গাছাড়া, উদাসীন মনোভাব। যেখানে ১০ বছরের বালক গ্রেনেড মেরে পাকআর্মির বাঙ্কার উড়িয়ে দিচ্ছে সেখানে একজন তরতাজা মতান্তরে ধামড়া মানুষ গা বাঁচিয়ে চলে কেমন করে! মানলাম, একেকজনের একেক ভূমিকা। আহা, কেমেস্ট্রির ছাত্রটা যদি একখানা পেট্রল বোমা বানিয়ে কাউকে ধরিয়ে দিত তাও তো একটা কাজের কাজ হতো। আর কিছু না পারলে নিদেনপক্ষে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নিয়ে একখানা ৪ লাইনের কবিতা।
কেউ কেউ বলবেন, সেদিন হুমায়ূন আহমেদকে হারালে আজ আমরা কি আরেকটা হুমায়ূন আহমেদ পেতাম? কথা সত্য, আমি আন্তরিক স্বীকার যাই, হুমায়ূন আহমেদ একজনই হয়। কিন্তু কার মৃত্যু বিছানায় হবে, না যুদ্ধক্ষেত্রে তা কে জানে? আমেরিকার 'লিচ' নামের এক ভদ্রলোকের বিশ্বরেকর্ড ছিল পিপের ভেতরে করে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উপর থেকে ঝাপ দেয়ার। তিনি অনেকবার এই কাজটা পানির মত করেছেন কিন্তু এই ভদ্রলোকের মৃত্যু হয় কলার খোসায় পা পিছলে।

মাতাল হাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ মাওলানা ভাসানী সম্বন্ধে লিখেছেন, "মাওলানা ভাসানীর সেই সময়ের কান্ডকারখানা আমার কাছে যথেষ্টই রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি যাননি। ...আয়ুব খানের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তিনি হয়তোবা জেলের বাইরে।...হঠাৎ ঘোষণা দিলেন, তিনি গ্রামে গ্রামে চোর-ডাকাত ধরবেন। বিশেষ করে গরুচোর।" (পৃষ্ঠা নং: ১৯৫-১৯৬)
এই তথ্য হুমায়ূন আহমেদ কোথায় পেলেন এটা তিনিই ভাল বলতে পারবেন- এর দায়দায়িত্ব তাঁর। ধরে নিলাম, তথ্যটা অকাট্য। কিন্তু মাওলানা ভাসানী কেন এই উদ্যেগ নিয়েছিলেন এর কোন ব্যাখ্যায় তিনি যাননি। আয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি যাননি হুমায়ূন আহমেদের এই প্রসঙ্গে আমি অজস্র অকাট্য প্রমাণ হাজির করতে পারি। উদাহরণ হিসাবে কেবল এই লেখাটার রেফারেন্স দিলাম

এরপর হুমায়ূন আহমেদ ভয়ংকর এক কথা লিখেছেন, তাঁর আরেক চরিত্র বিদ্যুত। বিদ্যুতের বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের বাবাকে সেই আগুনে ফেলে দেয়া হয়েছে। বাবাকে আগুন থেকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুৎ কান্তি দে-র মৃত্যু হয়।
এই প্রসঙ্গে হুমায়ূন আহমেদ মাতাল হাওয়ায় লিখেছেন, "তারা দেশ থেকে চোর-ডাকাত নির্মূল করতে বলছে। তারা চোর-ডাকাত এই আইডিয়া হয়তোবা মাওলানা ভাসানীর কাছ থেকে পেয়েছে।...চোর নির্মূল অভিযানের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কান্তি দে উপাখ্যানের সমাপ্তি হলো।" (পৃষ্ঠা: ২১৪-২১৫)
কী ভয়াবহ! হুমায়ূন আহমেদ কি বলতে চাইলেন, মাওলানা ভাসানী বলে দিয়েছিলেন, হিন্দুদের ঘরে আগুন লাগাও, তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেল?

হুমায়ূন আহমেদ, কয় পেগ আপনার সহ্য হয় আমি জানি না,
লিমিট ক্রস করা কোন কাজের কাজ না। শরীরে যতটুকু সয় ততটুকুই মদ্যপান করুন। ভদকা টাইপের লিকার বাদ দিয়ে শেরী, শ্যাম্পেন ট্রাই করে দেখতে পারেন (যদিও এগুলোকে বলা হয় মেয়েদের লিকার)। এতে আপনার শরীরের জন্য মঙ্গল, আমাদের জন্যও।

*একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে আমাকে আরও খানিকটা লিখতে হয়েছে। প্রয়োজন বোধ করায় মূল পোস্টের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছি: ১৯৯২ সালে 'অন্তরঙ্গ হুমায়ূন আহমেদ' বইটা প্রকাশিত হয়, হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবির।
ওখানে হুমায়ূন আহমেদ বলছেন,
"মুক্তিযুদ্ধে আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি- বাবাকে হারিয়েছি মিলিটারির হাতে। আবার একই সঙ্গে আমার নানা, আমার মামা , এঁরা মারা গেছেন মুক্তিবাহিনীর হাতে। কনট্রাস্টটা চিন্তা করুন। সমস্ত কিছু দেখার পরে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা মেজর ওয়ার্ক যদি আমার হাত দিয়ে বের না হয় আমি মরেও শান্তি পাব না।
...দশ পৃষ্ঠা লেখা হয়েছে...আমার ডিপার্টমেন্ট একটা ছোট্ট আইসোলেটেড রুম আছে, ঐখানে গিয়ে লিখি। এটা আমি উনসত্তর থেকে শুরু করে, শেখ মুজিবের মৃত্যু পর্যন্ত শেষ করবো। (পৃষ্ঠা নং: ২৭)

আবার তিনি 'মাতাল হাওয়া' বইটার প্রাককথনে বলছেন,
"একটি মহান গণআন্দোলনকে কাছ থেকে দেখা হয় এই উনসত্তরেই।...মাতাল সেই সময়টাকে ধরতে চেষ্টা করেছি মাতাল হাওয়ায়।"

আমি অনুমান করি, ১৯৯২ থেকে তিনি মাতাল হাওয়া বইটা লেখায় হাত দিয়েছেন। প্রচুর চিন্তাভাবনা, প্রস্ততি নিয়েছেন। ফট করে তিনি কিছু একটা লিখে দেবেন এটা আশা করা বাতুলতা মাত্র!
এই প্রজন্ম এমনিতেই ভুল ইতিহাস নিয়ে বড়ো হচ্ছে আর হুমায়ূন আহমেদের মত অসম্ভব শক্তিশালী মানুষরা যদি ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেন তাহলে আমাদের দাঁড়াবার আর জায়গা থাকে না। এটা অপরাধই না, ভয়ংকর অপরাধ। আমি বিশ্বাস করি, একজন লেখককে তাঁর লেখালেখির কারণে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না কিন্তু হুমায়ূন আহমেদকে দাঁড়াতে হবে পাঠকের কাঠগড়ায়।
মাওলানা ভাসানী সম্বন্ধে তাঁর এমন নীচু ধারণা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে যাই। ভাগ্যিস মাওলানা ভাসানীকে গরুচোর বলে বসেননি!

হুমায়ূন আহমেদ মাতাল হাওয়ায় লিখেছেন,
"...আয়ুব খানের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তিনি (মাওলানা ভাসানী) হয়তোবা জেলের বাইরে।"

হুমায়ূন আহমেদ, আইউব সরকারের প্রতি মাওলানা ভাসানীর আনুগত্যের নমুনা এখানে দেখুন:

স্যালুট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, জামিল


এই দেশের সেরা এই সন্তানটার পদোন্নতি হয়েছে। আমার তো সামরিক কায়দায় এই মানুষটাকে স্যালুট করার সুযোগ নাই কিন্তু তবুও স্যালুট করি, হে বীরপ্রসু দেশমার বীর সন্তান, অনেক কাল না-ঘুমানো চোখটাকে এবার খানিকটা বিশ্রাম দাও।
তিনি কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।
কর্নেল জামিল নামের এই মানুষটার পদোন্নতি হয়ে আজ তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল।

"১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাতে ঘাতকেরা যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর হামলা চালিয়েছিল তখন সেনাবাহিনীর একজন মাত্র সাহসী সৈনিক এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁকে রক্ষার জন্য। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কর্নেল জামিলকে ফোন দেয়ার পর কী কী ঘটেছিল দেশ টিভিকে সে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তার কন্যা আফরোজা জামিল। তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর গলা কাঁপছিল। আমার মাকে বলছিলেন, জামিল কোথায়? জামিলকে দে'।
তিনি আরও বলেন, 'বাবা ফোন ধরে বললেন, জ্বী স্যার...আমি এখনই আসছি। মা যখন জিজ্ঞাসা করলো যে, বঙ্গবন্ধু ফোনে কী বলেছে, বাবা জানালেন বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি বোধহয় আর বাঁচবো না। তুই আমাকে বাঁচা'।"

কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক এই কুতর্ক থাকুক তর্কবাজদের জন্য কিন্তু একজন সৈনিকের যে দায়িত্ব, মিশন তা তিনি করে দেখিয়েছেন। একজন সৈনিক, একজন পুরুষ!
বিচিহীন অন্যদের আমি পুরুষের কাতারে ফেলতে নারাজ। আমার ধারণা, এই দেশে দায়িত্বে থাকা বিচিযুক্ত কোন পুরুষ তখন ছিলেন না, 'হিজড়ো কি মেলা'!

১৯৭৫ থেকে ২০১০, অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে কর্নেল জামিল নামের পুরুষটার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে। এই প্রজন্মের একজন আমি, আবারও তোমায় স্যালুট করি, ম্যান।
বেশ, কর্নেল জামিলকে পদোন্নতি দেয়া হলো কিন্তু তৎকালিন আর্মি চিফ অভ স্টাফ শফিউল্লাহ কেন এখনও মেজর জেনারেল থাকবেন? এই কাপুরুষ মানুষটাকে কেন মেজর জেনারেল থেকে অন্তত একধাপ নীচে নামিয়ে দেয়া হবে না?

দুই কিস্তিতে ১৬.০৮.৯৩ সালের ভোরের কাগজে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। "দেখুন, বলতে গেলে ১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর পর থেকে আমি ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিলাম...তখন অনেক কিছু মনে পড়ে। আমি ভাবি, সেদিন যদি একটা সৈন্যদল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম তাহলে কি হতো? তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুকে বাঁচানো যেত।...একাত্তর সাল থেকেই আমি অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়েছি।"
হা ঈশ্বর! একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে যখন অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ে, 'আল্লার মাল আল্লা নিয়া গেলে আমার কী করার আছে' এই বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে, তখন সেই জাতির কী হয় তা সহজেই অনুমেয়।

আমার ধারণা, একজন শফিউল্লার মত মানুষের এমন কাপুরুষিত কু-উদাহরণ সৈনিকের চেইন অভ কমান্ড নামের সাহসের শেকলটার তছনছ করে দেয়। এই মানুষটা হচ্ছেন উদাহরণের জন্য এ গ্রহের একটা জঘণ্য উদাহরণ- এমন বিপুল ক্ষতি এই দেশের আর কেউ করেছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। পথিকৃৎ তিনিই, অজান্তেই অন্যদের পথ বাতলে দিয়েছেন।
মানুষটা কেন এখনো জাপানি কায়দায় পেট চিরে আত্মহত্যা করেননি এটা ভেবে কূল পাই না।

Sunday, March 28, 2010

হুমায়ূন আহমেদ সাদাকে সাদা বলিলেন, তবে...

হুমায়ূন আহমেদ "ফাউনটেনপেন" নামের আত্মজৈবনিক লেখাটা সম্ভবত অন্যত্র লিখেতেন। হুমায়ূন আহমেদ এখন কালের কন্ঠে লিখছেন। টাকার পরিমাণটা সম্ভবত মুখ ভরে লালা চলে আসার মত। আমি নিশ্চিত, হুমায়ূন আহমেদ গোলাম আজমের পত্রিকা 'মুড়ির ঘন্টে'ও লিখবেন, টাকার অংকটা আপাদমস্তক লালায় ভিজে যাওয়ার মত হলেই হলো। যাক, সমস্যা নাই, নইলে আমরা শিখব কেমন করে? কেমন করে কলম পদতলে রেখে দিতে হয়!

হুমায়ূন আহমেদের মত লেখকরা লেখেন সব সময় গা বাঁচিয়ে, চোখে রঙিন চশমা লাগিয়ে। এঁদের লেখা পড়লে মনে হয় এই দেশে কোন সমস্যা-অন্ধকার দিক নাই। চোখে থাকবে জ্যোৎস্নার প্রলেপ, কলমের নিব হবে খাঁটি জ্যোৎস্নার!
ইমদাদুল হক মিলন এবং হুমায়ূন আহমেদ পরস্পরকে নিয়ে যখন লিখেন, সেই লেখা পড়ে বোঝার জন্য রকেটবিজ্ঞানী হতে হয় না। এই লেখাগুলো হচ্ছে পরস্পরের পিঠ চুলকে দেয়া।

এইবার খানিকটা অন্য রকম হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ ২৬ মার্চ, ২০১০-এ 'ফাউনটেনপেন'-এ লিখেছেন, "নিজের প্রশংসা নিজে করার সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ ইমদাদুল হক মিলন। গত বইমেলা বিষয়ে তার একটা লেখা কালের কন্ঠের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছে। সে লিখেছে...তখন আমার একটা বই বাংলা একাডেমী বেস্ট সেলার ঘোষণা করেছে। প্রকাশক চাহিদামতো বই জোগান দিতে পারছে না। বইটির জন্য বইমেলার অনেক জায়গায় কাটাকাটি মারামারি হচ্ছে...।"

ইমদাদুল হক মিলনের এই লেখা যখন আমি পড়েছিলাম তখন আমি হাঁ করে ভাবছিলাম, একটা মানুষ কেমন করে এতোটা নির্লজ্জ হয়। ইমদাদুল হক মিলন সুপুরুষ একজন মানুষ। এমন একজন সুপুরুষ মানুষ পোশাক গায়ে দিয়েও নগ্ন দেখালে ভালো দেখায় না! তখন এই প্রসঙ্গে একটা লেখা দিয়েছিলাম, ইমদাদুল হক মিলন, একজন ঢোলবাজ। মানুষটা যেমন একজন ঢোলবাজ তেমনি একজন তেলবাজও!

নিজের প্রশংসা নিজে করার আরেকটা খারাপ উদাহরণ আমি দিতে পারি। ঠিক নিজের না হলেও নিজের লোকজনের। হুমায়ুন আহমেদ একদা ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বলেই যেতেন, "আমার বউ পরীর মত সুন্দর-আমার বউ পরীর মত সুন্দর-আমার বউ পরীর মত সুন্দর"। শুনে শুনে প্রায়শ মনে হতো, বেশ, তা আমি কী করব, বাপ!
এখন হুমায়ূন আহমেদের বউ পরিবতর্ন হয়েছে। বলার ভঙ্গিও খানিকটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু ঘুরেফিরে চলেই আসে- কেউ কেউ কখনো বদলান না।
'মাতাল হাওয়া'-র প্রাককথনে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, "...প্রুফ দেখা, গল্পের অসঙ্গতি বের করার ক্লান্তিকর কাজ করেছে শাওন। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।"
ফাউনটেনপেনের এই পর্বে লিখেছেন, "...একটায় থাকে কাপড়চোপড়। এটা শাওন গোছায়।" এমন অসংখ্য উদাহরণ!

হুমায়ূন আহমেদের মত বড়ো মাপের মানুষরা আমাদের মত সাধারণ কলমচিকে সমস্যায় ফেলে দেন। আমাদের গতি কী!
কখনও কখনও ইস্তারী সাহেবার কটু কথা শুনতে হয়। তখন গনগনে মুখ দেখে ভ্রম হয়, সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ ছাড়িয়ে গেছে। কটু কথাগুলোর মধ্যে সহনীয় যেটা, "কোন দিন তো দেখলাম না, কোন লেখায় আমার নাম আসতে, আমি কী তাড়কা রাক্ষসী? এ্যাহ তাইনে বড়ো লেখক হইছে, এক পাতা লেখতে ১০টা বানান ভুল। নিজের লেখা নিজেই পড়ে, এ্যাহ! নিজের বউয়ের কথা লেখকদের কেমন করে লিখতে হয় এটা হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে শেখো।"
আমি ইস্তারী সাহেবাকে কেমন করে বোঝাই আমি তো লেখক না, লেখার রাজমিস্ত্রি- আমার কাজ কেবল একের পর এক শব্দের ইট বসাবার চেষ্টা করে একটা কাঠামো বানাবার চেষ্টা করা। ব্যস, আর কিচ্ছু না...।

হুমায়ূন আহমেদের মত মানুষরা কেন যে বুঝতে চান না, ঢোল বাজানো ভাল কিন্তু মাঝরাতে ঢোল বাজানো কোন কাজের কাজ না। এটা ওয়াজ মাহফিল না যে মধ্য রাতে চারদিকে চারটা মাইক লাগিয়ে হরদম নসিহত করতে হবে।

Saturday, March 27, 2010

মহামতি ছফার সঙ্গে একদিন...

আহমদ ছফাকে অনেক বলে-কয়ে, হাতে-পায়ে ধরে রাজি করিয়েছি অল্প সময়ের জন্য হলেও আমার এখানে আসার জন্য। মানুষটা রাগী গলায় বলেছিলেন, মিয়া, তুমি কী জোঁক, নাকি কচ্ছপ! একবার কামুড় দিয়া আর ছাড়ো না। তা এতো যে ঝুলাঝুলি করতাছো, তোমার ওইখানে দেখার আছেটা কী?
আমি চিঁ চিঁ করে বলেছিলাম, ইয়ে, বলার মত তেমন কিছুই নাই।
এইবার ছফা ভাইয়ের রাগ পানি হয়ে গেল, তোমার কথা শুইনা আমি খুশী হইছি। সবাই বড় গলায় হেন আছে তেন আছে বলে। আরে ব্যাটা, তোর হেন-তেন দেখার লাইগা আমার বয়াই গেছে। সবাই লাইন ধইরা যেইটা দেখে ওইটার সামনে আমি মুতিও না।

মানুষটা ঢুকেই বললেন, ওয়াল্লা, তুমি দেখি দুনিয়ার আবর্জনা জমায়া রাখছ? 'রণ-পা' দিয়া কি করো, ডাকাতি?
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, ছফা ভাই, আপনে বললে ফেলে দেই?
ছফা ভাইয়ের চোখ চকচকে, আরে না না, আমার পছন্দ হইছে। এইটা কী বেয়ারিং-এর গাড়ি না?
জ্বী, তিন চাক্কার গাড়ি?
ওই, আমি কি তোমার মত চোকখে কম দেখি, ওই পুলা চাক্কা কয়টা এইটা আমি দেখতাছি না, আমার চোউক নাই? দেখো দেখি পুলার কান্ড, এইটার পেছনে দেখি আবার লেখা বি, এম, ডব্লিউ। খাইছে রে, আরে, এই পুলার দেখি মাতা-মুতা নষ্ট!
আমার হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে। এইটা আবার কেন লেখতে গেলাম! ছফা ভাইয়ের দেখি কিছুই চোখ এড়ায় না! কেন রে বাপু, পেছনে কি লেখা আছে এটা চোখে না-পড়লে কী চলছিল না, না?
ছফা ভাই বলেন, আরে এইটার দেখি আবার ব্রেকও আছে। তা, তোমার এই গাড়ি চলে?
জ্বী, ঠেলা দিলেই চলে।
আহ, ফড়ফড় করবা না তো! এইটা ঠেলা দিলে চলব নাতো কী 'ইগনেশন কি' ঘুরাইলে চলব, ফাজিল কোথাকার। আচ্ছা, বেশ-বেশ। আমি বসতাছি। তুমি পেছনে ধাক্কা লাগাও। শোনো, জোরে ধাক্কা দিয়া আমারে উল্টানোর চেষ্টা করবা না কিন্তু। খবরদার কয়া দিলাম, খবরদার। থাবড়াইয়া কিন্তু কানপট্টি ফাটায়া ফেলব..।
আমি গাড়ি ঠেলি। ছফা ভাই ব্রেক নামের হ্যান্ডেলটা ডানে-বায়ে ভালই ঘোরাচ্ছেন দেখি! মুখে আবার কেমন হুইহুই শব্দও করছেন। মানুষটার পাতলা হয়ে আসা লম্বা লম্বা এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। ও আল্লা, মানুষটা এমন শিশুর মত করছে কেন!


মানুষটার মেজাজ বুঝে কথা বলতে হচ্ছে। কাজটা কঠিন। আমার বাসার বৈঠকখানায় ঘরময় পাটি বিছানো। মানুষটা বসেছেন পা ছড়িয়ে, একটা পার নীচে ২টা কোল-বালিশ দিয়ে আয়েশ করে বসেছেন। একের পর এক সিগারেট টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলেছেন। টুকটাক কথা হচ্ছে।
জানতে চাইলেন, তুমি কি লেখালেখি লাইনে আছো?
আমি প্রায় শোনা যায় না এমন করে বলি, না, ইয়ে মানে, আমি ওয়েব সাইটে লেখার চেষ্টা করি। করি মানে কী-বোর্ড লইয়া কস্তাকস্তি-ধস্তাধস্তি করি।
ধুর, কলম দিয়া না-লেখলে এইটা কোন লেখা হইল! তা তোমার লেখা পড়ে-টড়ে নি কেউ?
পড়ে মানে, ইয়ে, আমি নিজে পড়ি। আমি নিজের কোনো লেখাই মিস দেই না,
কঠিন পাঠক। তাছাড়া কখনও দুই-একজনও পড়ে। পড়ে মানে গুগলে সার্চ দিলে আমার দু-একটা লেখা চইলা আসে। ইদানিং গুগলের ব্রেনে সমস্যা দেখা দিছে। ইয়ের দুধ...রগরগে শব্দ দিয়া সার্চ দিলেও আমার নিরীহ লেখাগুলা চইলা আসে।
ছফা ভাই হাসি গোপন করলেন। একটা সিগারেটের আগুন দিয়ে অন্যটা ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, লেখালেখি করা নিয়া তোমার মনে দাগ কাটছে এমন একটা ঘটনা কইতে পারবা?
জ্বী, পারব। রশীদ হায়দার বলেছিলেন, কলম ধরতে লাগে ১০ বছর, কাগজে কলম ছোঁয়াতে লাগে আরও ১০ বছর।
তোমার তো মিয়া, কাগজ-কলমের সাথে কোন সম্পর্কই নাই। তা তোমার কি ২০ বছর কি হইছে?
জ্বী না।
তাইলে তোমার লগে লেখা নিয়া কথা বইলা আরাম নাই। তুমি লেখালেখির খেলা থিক্যা বাদ।


ছফা ভাই এবার বলেন, আমার ভাতিজা নূরুল আনোয়ার বলে তোমারে মেইল করছিল। তুমি বলে শুনলাম, আমারে নিয়া লেখা দিছ?
আমি গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলি, জ্বে, কয়েকটা লেখা লিখছিলাম। কষ্ট-মনন-দারিদ্রতা এবং ছফাপুরান লেখাটা লেখার সময় মেজাজ খুব খারাপ হইছিল, খুব খারাপ।
ছফা ভাইয়ের এবার খোশ মেজাজ, 'ওঙ্কার' পড়ছ?
জ্বী-অ, ফাটায়া ফেলছেন!
আমার করা অনুবাদ 'ফাউস্ট' পড়ছ?
জ্বী। বেশি ভাল লাগে নাই।
তুমি ছোট মাছের মাথা বেশি কইরা খাইবা।
ছফা ভাই, আমি মাছ তো তেমন খাই না।


একদম মিল্লা গেছে। এই লাইগাই তো তোমার ব্রেন নাই। ব্যা-এ-এ, তুমি আমার অনুবাদ ফাউস্ট বুঝলে ছাগলও বুঝব। তোমার লাগে বকবক কইরা খিদা লাগছে। কি খাওয়াইবা?
আমি ঝলমলে মুখে বলি, আপনের 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পইড়া মাথা আউলা-ঝাউলা হয়া যাওয়ার পর বাইগুন গাছ, টমেটো গাছ লাগাইছিলাম। বাইগুন গাছে একটা বাইগুন ধরছে। একটা লম্বা, একটা সাদা বাইগুন, গোল। আপনের জন্য একটা দিয়া ভর্তা, একটা দিয়া সালুন। দু-তিনটা টমেটোও ধরছে। একটা পাকছে, ওইটা দিয়া সালাদ হইব।

ছফা এবার মাথা ফেলে দিলেন।
আমি ছফা ভাইকে আশ্বস্ত করি, না-না, ছফা ভাই, আরও আইটেম আছে। যে কমলা গাছটার নাম দিছিলাম 'ছফাবৃক্ষ', ওইটায় কমলা ধরছে। খাওয়ার পর কমলা...।
ছফা ভাই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলেন, তোমার এইসব খাওয়ার পর আমার এইখান থিক্যা যাওয়ার শক্তি আর থাকব না। তুমি বিদায় হও।
আমি হাসি গোপন করলাম। হি হি হি, আমাকে বলছেন আমারই বাসা থেকে...বিদায় হতে...হিহিহি।


*এই লেখাটা পুরোটাই বানানো কিন্তু এই লেখার ছত্রে ছত্রে আছে আহমদ ছফা নামের অসাধারণ মানুষটার প্রতি আমার অন্য ভুবনের ভালোবাসা।
ছফা, তুমি ঘুমাও।


সহায়ক সূত্র:
১. ছফাকে নিয়ে কিছু লেখা: http://tinyurl.com/4w8ggos
২. কষ্ট-মনন-দারিদ্রতা এবং ছফাপুরান  

Friday, March 26, 2010

কালের কন্ঠ, এই রসিকতার মানে কী?



আজকের কালের কন্ঠের স্বাধীনতা দিবস ২০১০-এর বিশেষ সংখ্যায় (পৃষ্ঠা: ৩) 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' লেখায় মুক্তিযুদ্ধের অসম্ভব বিখ্যাত এই ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে। ছবিটির নীচে লেখা আছে, "ছবি: সংগৃহিত"।

এটার মানে কী! কালের কন্ঠ,
"ছবি: সংগৃহিত" লিখে কী রসিকতা করা হলো, নাকি এই কু-অভ্যাসটা প্রথম আলো থেকে শিখল?
এটা অসম্ভব বিখ্যাত একটা ছবি। এই ছবিটি উঠিয়েছেন নাইব উদ্দিন আহমদ
। এই নিয়ে আমার একটা লেখা থেকে অংশবিশেষ দিচ্ছি:
"মুক্তিযুদ্ধের তেমন বিশেষ ছবি আমাদের নাই! ওই সময় আধুনিক তো দূর অস্ত, সাধারণ ক্যামেরাই বা আমাদের দেশের কয়জনের কাছে ছিল! নাইব উদ্দিন আহমেদ। যে অল্প ক-জন মানুষ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দূর্লভ কিছু ছবি আমাদের উপহার দিয়েছেন তাঁদের একজন!
একজন মুক্তিপাগল মানুষের সবটুকু শক্তি নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, সামান্য একটা ক্যামেরা নিয়ে! স্টেনগানের চেয়েও ঝলসে উঠেছে তাঁর হাতের ক্যামেরা! একজন অন্য রকম যোদ্ধা!

একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে তিনি পাক আর্মি এবং এ দেশে তাদের সহযোগী রেজাকার, আল বদর, আল শামসদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বর্হিবিশ্বে পাঠিয়েছেন তাঁর দূর্লভ ছবিগুলো। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে পাক আর্মির নৃশংসতা, বর্বরতা! গঠিত হয়েছে জনমত, বেড়েছে আন্তর্জাতিক ধিক্কার!

সব বিশ্ববিদ্যালয় তখন পাক আর্মির টর্চার ক্যাম্প। একদিন নাইব উদ্দিন আহমেদকে আটকানো হয়। ফটোগ্রাফারের পরিচয়পত্র দেখে পাক আর্মির মেজর কাইয়ুম নাইব উদ্দিনকে বললেন, তুমি কি ক্যামেরা ঠিক করতে পারো, আমার ক্যামেরাটায় সমস্যা হচ্ছে?
নাইবউদ্দিন ক্যামেরাটা দেখেই বুঝলেন, ক্যামেরা ঠিক আছে। শুধু লক করা অবস্থায় আছে, লকটা খুলে দিলেই হয়ে যাবে। ক্যামেরার লক ওপেন করে দেখলেন, আসলেই ঠিক আছে এবং ক্যামেরায় ফিল্ম ভরা। এ সময় তিনি দেখতে পেলেন, এখানে কিছু লোককে বেঁধে রাখা হয়েছে। খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় এলিয়ে পড়ে আছে একজন ধর্ষিতা। কাছেই কিছু বাড়ি পুড়ছে দাউ দাউ করে।

তিনি ক্যামেরা ঠিক করার ছলে, খুব দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিলেন পাক মেজরের ক্যামেরা দিয়েই! তারপর আবার লক করে মেজরের হাতে ক্যামেরা ফেরত দিয়ে বললেন, এখানে তো ঠিক করা সম্ভব না, ময়মনসিংহে তার অফিসে আসলে ক্যামেরা ঠিক হয়ে যাবে। পরদিন মেজর নাইব উদ্দিনের অফিসে এলে, নতুন একটা ফিল্ম কিনে আগের ফিল্মটা মিছে ছল করে রেখে দিলেন।"
বিস্তারিত এখানে

শাবাশ বীরপুরুষ, তোমাদের লাল সেলাম!

আমাদের দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনরা এখন দুর্ধর্ষ কাজ দেখাচ্ছেন। তাঁদের লাল সেলাম জানাই। আমি এই সব সেরা সন্তানদের পায়ের ধুলি নেয়ার জন্য হণ্যে হয়ে খুঁজছি।

এখানকার ইউএনও সাহেবের নির্দেশে আর্মি-র‌্যাব ব্যতীত সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গতকাল ঝাপিয়ে পড়েছে রেল স্টেশনে। ট্রেন থেকে রাজস্ব ফাঁকিবাজদের পাকড়াও করছে। ভাল! আবারও সেলাম!




আহারে, আমাদের বীরপুরুষ! এই দুর্ধর্ষ মহিলা চোরাকারবারীর বিরুদ্ধে কত্তো-কত্তো ইউনিফর্মধারী বীর, ইউএনও নামের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। অন্য ইউনিফর্মধারীর কথা না-হয় বাদ দিলাম কিন্তু ইউএনও সাহেব যখন বলছেন এই মহিলা ভয়ংকার পাজি সে অবশ্যই ভয়ংকর পাজি।
আমরা না-হয় তেমন নেকাপড়া করিনি কিন্তু ইউএনও নামের এই প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাই তো আমাদের সত্যায়িত করার বিপুল ক্ষমতা রাখেন। কে জানে, কবে আবার এই নিয়মটাই না চালু হয়, লেখকের সার্টিফিকেট দেবেন ইউএনও সাহেবদের মত লোকজন!

এই মহিলার কাছে সামান্য কিশমিশ পাওয়া গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযোগ, এই মহিলা চোরাকারবারী, এই কিশমিশ ভারতীয়। কী সর্বনাশ! কী ভয়ংকর!!
এই মহিলাকে ইউএনও সাহেবের নির্দেশে কেবল বেঁধেই রাখা হয়েছে। শত-শত বীরপুরুষ দাঁড়িয়ে এই তামাশা দেখেছেন!
একে শূলে চড়াবার আয়োজন করা প্রয়োজন ছিল। মন্দ ভাগ্য, এই মহিলার শূলে চড়াবার ব্যবস্থাটা এখানেই করা হয়নি! হলে বেশ হতো, গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আরও মজার তামাশাটা সবাই দেখতে পারতেন।

আমি এই বাহাসে-কুতর্কে যাব না যে এই মহিলা চোরাকারবারী কি না?
এই মহিলাকে রেল স্টেশনে না আটকে সীমান্ত পার হওয়ার সময় বমাল আটকালে আমি না-হয় মেনে নিতাম এই মহিলা চোরাকারবারী। কিন্তু এখানে এই কিশমিশের গায়ে লেখা নাই এটা ভারতীয় কিশমিশ। ভারত থেকে বাংলাদেশে কিশমিশ আমদানী করলে ফাঁসি হয় এমন আইনও নাই! কোনটা আমদানী করা কিশমিশ, কোনটা চোরা-চালানের এটা এরা বোঝেন কেমন করে?
এই কিশমিশ নিজেই আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হিন্দিতে বাতচিত করেছে বলে আমার মনে হয় না, 'ম্যায় হিন্দুস্তানী কিশমিশ হু, মুঝে ইয়ে আওরাত নে...'। বাহ, বেশ তো, কিশমিশ নিজেই এদের সঙ্গে বাতচিতে জড়িয়ে পড়ে!

এখন আপনিই যদি আমার কাছে গোঁ ধরে বসেন হালুয়া খাব এবং হালুয়া বানাতে গিয়ে বাজার থেকে কিশমিশ আনার পথে কি আমাকেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আটকে ফেলবে, ব্যাটা তুই চোরা-কারবারী?

তদুপরি আমি এই মহিলার প্রতি তীব্র নিন্দা জানাই সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার জন্য। ধন্যবাদ জানাই আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনকে যারা সরকারের বিপুল রাজস্ব রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে গিয়ে এই মহিলাকে প্রায় উলঙ্গ করে ফেলেছেন, পুরোটা করেননি।

এইবার আমি ছোট্ট একজন রাজস্ব ফাঁকিবাজের কথা বলব। পারটেক্স গ্রুপের 'মাম' নামের মিনারেল ওয়াটার চেনেন না এটা নিশ্চয়ই কেউ বলবেন না। 'মাম'কে বলা হতো 'মিনিস্টার ওয়াটার' কারণ মিডিয়ায় আমাদের মিনিস্টার বা হোমড়া-চোমড়া কাউকে দেখালেই টেবিলে মামের বোতল চোখে না-পড়ে উপায় ছিল না।
যাই হোক, তো এই পারটেক্স গ্রুপের সাবেক সাংসদ এম, এ, হাশেম ২০০৫ সালে সাড়ে ৫ কোটি টাকা দামের রোলস রয়েস গাড়ি দেশে আনেন। লিখিত ঘোষণা দেন, এটার মূল্য মাত্র সাড়ে ৪ লাখ টাকা। তিনি ঘোষণাপত্রে লিখিত আকারে এই গাড়িটিকে স্ক্র্যাপ, বাতিল দেখান এবং এই গাড়িটিরই দুইটা দরোজা পরে আলাদা করে, স্ক্র্যাপ দেখিয়ে নিয়ে আসেন!
পরবর্তীতে হাসেম সাহেবের এই রোলস রয়েসের কী গতি হলো এটা আমার জানা নাই।

আমাদের দুর্ধর্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জানতে ইচ্ছা করে এই ছোট্ট রাজস্ব ফাঁকিবাজ
এম, এ, হাশেম সাহেবকে কি এক সেকেন্ডের জন্য হলেও কোমরে দড়ি বেঁধে আটকে রাখতে পরবেন?
স্যাররা, অপেক্ষায় আছি। আপনারা অবশ্যই পারবেন। গুড লাক!

*ছবি ঋণ: দুলাল ঘোষ

Thursday, March 25, 2010

আমার বন্ধু মহাম্মদ


এর নামটা দীর্ঘ, সবাই ডাকে মহাম্মদ, আমিও। আমরা একসঙ্গে পড়িনি কিন্তু আমার কৈশোরের একটা অংশ কেটেছে এর সঙ্গে। আরেকজন, গাদুরাটা [১] তো পচাই খেতে খেতে মরেই গেল।

মহাম্মদের সঙ্গে একবার ক্যারাম খেলা হচ্ছিল। তুমুল ঝগড়া হয়ে গেল। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ও থুতু দিল, আমি দিলাম ধাক্কা। পেছনের দেয়ালে ওর মাথা ঠুকে গেল, মাথা রক্তে মাখামাখি।
আমি ঝড়ের গতিতে ওখান থেকে উধাও হয়ে গেলাম। সোজা বাসায়। লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে বাবার সামনে পড়ে গেলাম। তিনি তখন সিড়িতে আয়েশ করে বসে বই পড়ছিলেন।
খানিক পরই মহাম্মদের বাবা আমার বাবার কাছে এসে বললেন, আপনের ছাওয়াল দেখেন আমার ছাওয়ালডার কী মার্ডারটাই না করছে।

আমি বাবাকে বলতে চেয়েছিলাম, ওই আগে আমাকে থুতু দিয়েছে। বাবা হাত উঠিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি নতমুখে চুপ করে মহাম্মদের বাবার পুরোটা বক্তব্য শুনলেন। একটা কথাও বললেন না। বাবা উঠে গিয়ে একটা আধলা ইট কুড়িয়ে নিয়ে এলেন। আমার মনে গোপন উল্লাস, বাবা নিশ্চয়ই একে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবেন।
বাবা স্পষ্ট গলায় মহাম্মদের বাবাকে বললেন, এইটা দিয়া আমার ছেলের মাথায় শক্ত করে একটা বাড়ি দেন।

আমি হাঁ করে বাবা নামের অমানুষটার দিকে তাকিয়ে আছি। এ কী মানুষ! এ এই সব কী বলছে? তখন পর্যন্ত শেখা দু-একটা গালি যে বাবাকে দেইনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব না। মহাম্মদের বাবা চলে যেতে যেতে অস্ফুটে বললেন, আমি বিচার পাইছি।
আজ বুঝি আমার বাবাকে বাবা হিসাবে যতটা না মনে রাখব তারচেয়ে শিক্ষকরূপে [২]। কী অপূর্ব তাঁর শেখাবার ভঙ্গি!

আমার বন্ধু মহাম্মদের সঙ্গে দেখা হয় এখনো, নিয়মিত। মহাম্মদ পত্রিকা বিলি করে। প্রথম দিকে আমি হাত বাড়ালে হাতটা ধরত আড়ষ্ট ভঙ্গিতে। একদিন বলেছিলাম, মিয়া, তুমি কি স্মাগলার, দু-নম্বরি ব্যবসা করো? নইলে এমন করো ক্যান? তুমিও একটা সৎ পেশার সঙ্গে জড়িত, আমিও, অসুবিধা কোথায়!
এর পর থেকে আড়ষ্টতা কেটে গেছে।

বিভিন্ন সময় টুকটাক-হাবিজাবি কথা হয়। মহাম্মদের কাছেই জানলাম, গত ঈদে চালু সমস্ত পত্রিকা
ঈদ বোনাস, ঈদের আগের দিন ওই দিনের পত্রিকা ওদের ফ্রি দিয়েছে, কেবল দেয়নি প্রথম আলো! শুনে আমি হতভম্ব। বরং উল্টোটাই হওয়ার কথা ছিল, প্রথম আলো বোনাসটা দিয়েছে অন্য পত্রিকাগুলো দেয়নি। পত্রিকাগুলোর মধ্যে আর্থিক অবস্থা সবচেয়ে ভাল এই পত্রিকাটির।
মহাম্মদের গায়েও সর্বদা দেখি অন্য পত্রিকার টি-শার্ট। কী মায়ায়ই না এ সর্বদা গায়ে টি-শার্টটা জড়িয়ে রাখে!
মহাম্মদের ক্ষোভের কথাগুলো এখানে শেয়ার করলাম না। আমার নিজেরই মুখ খারাপ করতে ইচ্ছা করছে। 

(প্রথম আলো পড়ে, এদের কর্মকান্ড দেখে [৩] আমার উপর চাপ পড়ছে, ক্রমশ মেজাজ, মুখ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে প্রথম আলো পড়া বাদ দিলাম। গুড বাই, চুতিয়া প্রথম আলো।)

কেএফসির এই সব বেনিয়া লোকগুলো কবে বুঝবে
পিৎজা বেচা আর পেপার বেচা এক জিনিস না! যখন বুঝবে তখন বিড়বিড় করে বলবে, এ গ্রহে ডায়নোসর নাই, রাশিয়া নাই, আদমজী জুটমিল নাই...।

প্রথম আলোর সাহস দেখে স্তম্ভিত হই। এরা কী তাচ্ছিল্য করেই না ছাপে বিজ্ঞপ্তি আকারে, এই দেশের সূর্য সন্তান বীর প্রতীক লালুর [৫] মৃত্যুর খবর।
প্রথম আলো পাশবিক আনন্দ পায় ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের [৬] মৃত্যুর খবর পেছনের পাতায় অবহেলায় ছাপাতে। এমন কতশত কান্ড এদের!  

*মুশকিল হচ্ছে, পড়বটা কী! কালের কন্ঠ [৪]? এতো আরও ভয়ংকর! যেদিন কালের কন্ঠ এই দেশের এক নাম্বার পত্রিকা হবে সেই দিনের কথা ভেবে শিউরে উঠি। 
আচ্ছা, এই দেশের সাংবাদিকরা মিলে একটা দৈনিক বের করতে পারেন না কেন? এরাই সাংবাদিক, এরাই মালিক। তাহলে আমরা বেঁচে যেতাম।

সহায়ক লিংক:
১. গাধুরা: http://www.ali-mahmed.com/2008/08/blog-post_03.html

২. শিক্ষক বাবা: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_21.html

৩. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/search/label/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A5%E0%A6%AE%20%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%8B 

৪. কালের কন্ঠ: http://www.ali-mahmed.com/search/label/%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A0

৫. বীর প্রতীক লালু: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_28.html

৬. ভাষাসৈনিক গাজিউল হক: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_18.html 

Wednesday, March 24, 2010

পথগাতক, আমি বড়ো একা হয়ে গেছি

ভৈরব গেছি ভয়াবহ এক ঝামেলা নিয়ে। কপালের ফের! এই দেশের অতি বিখ্যাত এক রক্তচোষার খপ্পরে পড়ে গছি। অনেকে বলবেন, মিয়া তোমার মাথায় তো এক চামচ ব্রেন ছিল শুনছিলাম, তুমি ক্যামনে খপ্পরে পড়লা।
আহা, এই খপ্পরে পড়া শিখিয়েছেন আমাদের আদিপিতা। নইলে আজ স্বর্গে বসে স্বর্গীয় লেখালেখি করতাম, ছাতার এই গ্রহে কি আর লেখালেখির নামে ছাতাফাতা ব্লগিং করি!
কপাল আমার- ড্রেন কেমন কেমন করে যেন রাস্তার মধ্যখানে চলে আসে!

একজন ওদিন বলছিলেন, আপনার সমস্যা কী! আপনি তো যোদ্ধা না, যে কেবল যুদ্ধ করে যাবেন। আমি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলে বলেছিলাম, এটা কেমন বিচার আমি জানি না, আমাকে পাঠানো হয়েছে গুলতি দিয়ে ডায়নোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে! ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার- এই নিধিরামকে আমি চিনি না কিন্তু ডন কুইক্সোটকে চিনি। ডন কুইক্সোটের মত মিছামিছির এক যোদ্ধা!

যে কথাটা তাকে বলা হয়নি, আমার প্রবল বিশ্বাস, আমি যেখানে শেষ করব সেখান থেকেই কেউ না কেউ শুরু করবে। আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে সত্যিকারের যোদ্ধা- যাদের তলোয়ারে থাকবে সূর্যের ঝলসানো আলো। ছিন্নভিন্ন করে দেবে অন্ধকার সব।

তো, মন অসম্ভব খারাপ। মন অতিরিক্ত বিষণ্ণ হলে আমার যেটা প্রয়োজন, যথা সম্ভব দ্রুত বাসা নামের আমার ছোট্ট ঘরটাতে সেঁধিয়ে যাওয়া। আজ আবার ট্রেন কয়েক ঘন্টা লেট, শালার কপাল। প্ল্যাটফরমে কাঁহাতক হাঁটাহাঁটি করা যায়?
পারতপক্ষে ওয়েটিং-রুমে আমি বসি না। কিন্তু হাতে আবার ছফা বলেই হয়তো ওয়েটিং-রুম নিয়ে তাঁর লেখা মনে পড়ছে। ওয়েটিং রুম নিয়ে আহমদ ছফার চমৎকার কথা আছে, "তসলিমা নাসরিনকে দেখলেই আমার সুদৃশ্য ওয়েটিং-রুমের কথা মনে পড়ে।"
ছফা বলে কথা! আজকের জন্য ওয়েটিং রুমে খানিকক্ষণ বসা যেতে পারে।
ওয়াল্লা, এখানে দেখি বাজার জমে আছে। একজন যে শব্দে ফোনে কথা বলছেন, আমার ধারণা ফোন রেখে খালি গলায় বললেও ফোনের অপর পাশের মানুষটার শুনতে কোন সমস্যা হবে না। তিনি বলছিলেন, 'স্যার, হেরে আমি আপনের সামনে জুতা দিয়া পিটামু'। অথচ মানুষটার পায়ে স্পন্জের স্যান্ডেল, আমার মাথায় ঢুকছিল না এ পিটাবার জন্য কি জুতা ধার করবে? নাকি ব্যাগে একপাটি জুতা লুকিয়ে রেখেছে! পিটাবার সময় বের করেই ধাঁই-ধাঁই-ধাঁই...।
মন ভালো করার জন্য এই সব বিনোদন মন্দ না।

ওয়েটিং রুম নামের এই বাজারে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। এখান থেকে বেরিয়ে দূরে গিয়ে রেল লাইনের পাশে পা ছড়িয়ে বসি। পাশেই একজন মানুষ। চা খেতে খেতে মানুষটার সঙ্গে টুকটাক কথা হয়। মানুষটা জন্মান্ধ। হেঁচকি ওঠার মত একটু পর পর টুকরা-টাকরা গানের লাইন উঠে আসছে। আমি মানুষটাকে বলি, এসমাইল ভাই, আপনে কি গান গান নাকি?
মানুষটার লাজুক উত্তর, জ্বে।
এসমাইল ভাই, আমার মন আজ খুব খারাপ। একটা গান ধরেন দেখি।
মানুষটা বিব্রত, আমার খন্জরিডা না নস্ট, বুঝলেইন। খন্জরি ছাড়া গান গামু ক্যামনে?
আমি রেললাইন থেকে দুইটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আসি। মানুষটার হাতে দিয়ে বলি, এই পাত্থর বাজাইয়া গান ধরেন।
এসমাইল মিয়ার দুখি গলা, আমি তো ভাইজান পাত্থর দিয়া গাইতাম পারি না।
আমি চকচকে চোখে বলি, পারবেন। শুরু করেন।





পেয়ে যাই কান্চন মিয়াকে। তাঁর দোতারা শুনে মনে হয়, আহা, আমিও যদি পারতাম এমন বাজাতে!




কান্চন মিয়ার কঠিন অনুরাগী!




*রক্তচোষা আর জোঁকের মধ্যে পার্থক্য কি এটা নিয়ে গবেষণা করা অর্থহীন!

Monday, March 22, 2010

ছাপার অক্ষরের সব কথা বিশ্বাস করতে নাই

একজনের অনুরোধে 'মার কাছে ফেরা' লেখাটা দিয়ে বিপদে পড়ে গেছি। আমার লেখাটার মূল উপজীব্য ছিল মা-দেশমা। এটাও বলার চেষ্টা করেছিলাম, এ গ্রহের সব মা-ই এক (এই মাটাও)।

একজন কঠিন একটা মেইল করেছেন, তবে মেইলটা ভালোবাসা দিয়ে ভাজা:
‍"আমি জানতে চাই এর মানে কি? আপনি কেন এইসব হাবিজাবি লেখা দেন? আমরা যারা প্রবাসে থাকি এই সব লেখা পড়লে আমাদের যে ভাংচুর-সমস্যা হয় এটা বোঝার ক্ষমতা আপনার নাই।...দেশে গিয়ে করবটা কি, ঘন্টা বাজাব?...পারবেন আপনি রুটি-রুজির নিশ্চয়তা দিতে।" আরও কিছু বিষয় আছে এখানে শেয়ার করতে চাচ্ছি না।

লে বাবা, মানুষটার কি ধারণা আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী? আর মানুষটাকে কেমন করে বোঝাই, এই লেখাগুলো যখন লিখি তখন আমার মনিটরে সমস্যা হয়, অক্ষরগুলো সব কেমন লেপ্টে যায়!
আর আমি চাইলে কি হয়, এই সব লেখা ভুলেও গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। ছাপার অক্ষরের সব লেখা বিশ্বাস করতে নাই।

বাদ দেন, আপনার ক্ষোভের ক্ষতে এক আঁজলা জল, পুরনো একটা লেখা এখানে খানিকটা তুলে দেই:
আমরা যারা দেশে থাকি, আমাদের অনেকের বদ্ধমূল ধারণা থাকে, যারা প্রবাসে থাকেন তাঁদের চেয়ে সুখী আর কেউ এ গ্রহে নাই! আমরা মুখ ফুটে বলি না কিন্তু মনে মনে গোপন ইচ্ছাটা লালন করি, এঁরা যেন আজীবন প্রবাসেই থাকেন। রিয়াল ডলার-পাউন্ড হালের ইউরো স্রোতের মত দেশে পাঠাতে থাকবেন। দেশে ফেরার আবশ্যকতা কী!

খোদা না খাস্তা, কেউ যদি বলে বসেন দেশে ফেরার কথা চিন্তা করছি, নিমিষেই আমাদের মুখ শুকিয়ে আসে। বুকটা ধক করে উঠে! ঝপ করে মাথাটা ভার হয়ে যায়। আমরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা শুরু করি, 'মাথা খারাপ হইছে তোমার, হে। দেশে আইসা কী করবা? এইটা একটা থাকার জায়গা হইলো! তোমাগো দেশের কুত্তা-বিলাইও এই দেশে মুতব না'।
আহ, তোমাগো দেশ...। কেউ প্রবাসে থাকলেই সেটা তার দেশ হয়ে যায়! কী সুন্দর করে আমরা লিখে দেই, আ,আ,ম,স ছলিমুল্লা, জাপান।

অবলীলায় বিস্মৃত হই এটা। আমরা যারা দেশে থাকি, প্রিয় মানুষের মুখ দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। কখনও বা সাদা-সাদা গরম-গরম ভাত দেখে আমাদের গা গুলায়। প্রবাসি একজনের কেবল ধোঁয়াওঠা ভাতের কল্পনা করেই চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। পাগলামী আর কী!
আহা, পানি চলে আসলেই হলো বুঝি, পুরুষ মানুষদের কী কাঁদতে আছে! তাই বলে
কি কান্না থামে শা...। ঠিক সময়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাটাই হলো আসল কথা, মরদের কাজ।

একবার এক ঈদে প্রবাসি এক বন্ধুর অর্থহীন মেইল পেলাম, "খাওয়াতে পারিস এক চামচ সেমাই? আল্লার কসম তোকে ১০০০ হাজার ইউরো দেব...।"
দেখো দিকি কান্ড, এ আবার আল্লার কসম খায়, কোন দিন বসে মুততে দেখলাম না! ওরে ব্যাটা শুয়োরখেকো, তুই যে হরদম পর্ক-চপ খাস, গলায় আস্ত শুয়োর আটকে গেলে গলা ভেজাবার ছলে ভদকা গিলিস এটা বুঝি জানতে বাকি আছে আমাদের? আর তোর বালিশে যে লম্বা সোনালী, কালো চুল পাওয়া যায়? চালবাজ কাঁহিকা! কসম খাস আবার...!
তবে বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না, আমার চোখ কী খানিকটা চকচক করেনি? ইশরে, ১০০০ ইউরো! বদলে এক চামচ সেমাই-ই তো চেয়েছে...। ক্যালকুলেটরে ১০০০ ইউরোর আঁক কষতে বসে যাই।

শুনতে পাই
আজকাল বাইরের শপিং-মলগুলোয় নাকি সবই পাওয়া যায়। এইসবও তাহলে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে? বর্ষায় কাগজের নৌকা ভাসানো? নিজের হাতে লাগানো সেই গাছটা? পুকুরপাড়ে বসার সেই নোংরা জায়গাটা? বাতিল হয়ে যাওয়া সেইসব মায়াভরা মুখগুলো? এক সাথে বসে বিড়ি টানার সুখ?
সব পাওয়া যায়, এক চামচ সেমাই না পাওয়ার তো কোন কারণ দেখি না? তাহলে এ ১০০০ ইউরো দিতে চাচ্ছে, এর মানে কী! এ উম্মাদ, বদ্ধ উম্মাদ!

Sunday, March 21, 2010

মা'র কাছে ফেরা



(এটা পুরনো লেখা, একজনের অনুরোধে রিপোস্ট)

মার হাতের চুড়ি কেবল এই বাক্যটা পড়েই কেমন বুকটা ধক করে উঠল। সুতীব্র ইচ্ছা হল, মাকে নিয়ে একটা লেখা দেই।

যাই হোক, অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সালটা সম্ভবত ৯০। একজন মার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তিনি হাত ভরে কাঁচের চুড়ি পরতেন যা অনেকের চোখে বৈসাদৃশ্য ঠেকত। তাঁর স্বামী নাকি খুব পছন্দ করতেন, কখনও খুলতে দিতেন না। চুড়ির প্রসঙ্গ ধরেই তাঁর প্রতি আমার আগ্রহটা সৃষ্টি হয়েছিল।

স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পর একমাত্র সন্তানকে তিল তিল করে বড় করেছিলেন। সন্তানটা ছিল মেধাবী। কালে কালে সে একটা বহুজাতিক কোম্পানির বড় কর্তা হয়। ঝাঁ চকচকে বাড়ি, অফিস, পুতুলের মত বউ। বাড়িতে ককটেল পার্টি, কিটি পার্টি হরদম লেগেই থাকে। অল্প-শিক্ষিত মাকে নিয়ে বড় যন্ত্রণা। সন্তানটা বেড়ালের মত মাকে দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের এখানে ফেলে দেয়। ওই মাটা দিনের পর দিন তাঁর স্বামীর অপেক্ষায় থেকে থেকে ক্লান্ত যখন, তখন আশায় বুক বাঁধেন, সন্তান তাকে এখান থেকে একদিন নিয়ে যাবে।

এতসব আমার জানা হত না। চুড়ির প্রসঙ্গ ধরেই জানা। আসার সময় তাঁর শীর্ণ হাত দিয়ে আমার হাত ধরে কথা আদায় করে নিয়েছিলেন, আবার আসলে যেন তাঁর সন্তানকে নিয়ে আসি। আমি কথা রাখতে পারিনি!
তাঁর সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা সীসার চেয়ে ভারী। মোদ্দা কথা, আমার মার চেয়ে মাসীর দরদ বেশি, ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফিরে আসার পর এই স্কেচটা করেছিলাম। আমি জানি ওই মার আদলের সঙ্গে হয়তো এর কোন মিল নাই। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? এ গ্রহের সব মার চেহারাই কী এক না?
আজও আমি এই কষ্টটা লালন করি। এবং অভিশাপ দেই, এমন সন্তান হওয়ার চেয়ে আমার নিজের সন্তানের যেন শৈশবেই মৃত্যু হয়। ওই অন্ধকার দিক নিয়ে এখন আর লিখতে ইচ্ছা করছে না।

'মার কাছে ফেরা' এটা পুরনো কিন্তু আমার পছন্দের লেখা। এই লেখাটা উৎসর্গ করি সেই দুখি মাকে। তাঁর সন্তানকে তাঁর কাছে নিতে পারিনি, নতজানু হয়ে মাটার কাছে ক্ষমা চাইছি...।

-----------------------

:মার কাছে ফেরা: (শুভর ব্লগিং থেকে)
"আমাদের সৃষ্টির পেছনেও একটা ছক আছে। আমরা তো আর ভার্চুয়াল বেবী না! বাবার কাছ থেকে ধার করে, মার গর্ভে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরম নির্ভাবনায় শুয়ে থাকা। ন্যানো ডট থেকে ক্রমশ ভ্রুণ। ‘বৌন অভ মাই বৌন, ফ্লেশ অভ মাই ফ্লেশ’- মার শরীরটা নিংড়ে, ছোবরা বানিয়ে ক্রমশ বেড়ে ওঠা!

সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মাকে সহ্য করতে হয় অমানুষিক যন্ত্রণা তবুও তাঁর আনন্দের শেষ নেই, এইটুকুন মাংস পিন্ডটাকে দেখে কী অপার্থিব আনন্দই না হয় তাঁর! কোথায় উধাও হয় আধ-জবাই পশুর সেই অপার্থিব কষ্ট!
ঈশ্বর নাকি তাঁর মমতা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, "আমি আমার সমস্ত মমতা মাদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি।"

একজন মানুষ প্রথমে তার পরিবারের জন্য, একটা পরিবার তার গোত্রের জন্য, গোত্র তার দেশের জন্য। আর এই দেশ হচ্ছে সবার মা। আমরা চট করে বলে ফেলি, এই দেশ আমাকে কি দিয়েছে কিন্তু দেশ তো কখনই জানতে চায় না তুমি আমার জন্যে কি করেছ? যেমন জানতে চান না আমাদের মা- খোকা, তুই আমার লাইগা কি করলি?
আমরা দুম করে বলে ফেলি, কী সব ছাতাফাতা স্বাধীনতা! আসলে স্বাধীনতা কি, এটা জানতে হবে কোন প্যালেস্টানী, ইরাকীর কাছ থেকে! মা কি, এটা জানতে হবে যার মা নাই তার কাছ থেকে!

আমাদের দেশটা ভারী নোংরা, হরেক রকম কষ্ট। দেশমাটাও বড় আটপৌরে, ভারী অসহায়। তবুও এই দেশেই আমরা বুক ভরে শ্বাস নেই। খাবার জোগাবার জন্য দেশমার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা। একটা আমের বড়া চুষে চুষে সাদা করে ফেলি, অবহেলায় আমরা দিগ্বিদিক ছুঁড়ে ফেলি। কী অনায়াসেই না এর মধ্যে থেকেও তরতর করে একটা গাছ বেড়ে উঠে! চারদিক সবুজ আর সবুজ- শস্য, ফলে ছেয়ে থাকে সব। কিন্তু বজ্জাত সন্তানগুলো সবার মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিলে মার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ব্যতীত কীই বা করার থাকে? কিন্তু তাই বলে কি কেউ তার গ্রাম্য দেশমা-র সঙ্গে বিদেশী ধপধপে মা অদল-বদল করতে সম্মত হবে?

দেশে মার শরীরের গন্ধে আমাদের দমবন্ধ ভাব হয়। কখনও কখনও অমানুষের মত অস্ফুটে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, 'তুমি যে কী মা, শরীরে পেয়াজ-রসুনের গন্ধ। ছি'!
মা অজান্তে শ্বাস চাপেন। তাঁর আর্দ্র চোখে আটকে থাকে গোটা সূর্যটা, পলক ফেললেই উপচে পড়বে। জান্তব চোখে তিনি পলকহীন তাকিয়ে থাকেন।
প্রবাসিরা গায়ে কত কিছু মাখেন, সুগন্ধের মৌতাত হপ্তাহ ছাড়িয়ে যায়, জামা ধুলেও। কিন্তু কী এক বিচিত্র কারণে মার গায়ের গন্ধের জন্য পাগল হয়ে থাকেন। পাগলসব!

মুদ্রার অন্য পিঠ। একজনের মা একটা কিছু (বলার মত কিছু না, নারকেলের নাড়ু) সাথে দেয়ার কথা বলতেই সু-পুত্র হড়বড় করে বলে উঠেন, 'আরে না, দরকার নাই-দরকার নাই'।
তবুও তার মা মৃদু স্বরে বলেন, 'না মানে...তোর লাইগা...'।
'আরে, জ্যাকসন হাইটসে সব পাওয়া যায়। সব-সব'।
আজকাল বাইরের শপিং-মলগুলোয় মার আবেগও বিক্রি হওয়া শুরু হয়ে গেছে! বেশ-বেশ!

যে মায়াভরা মুখটা কেবল অনর্থক বকেই মরত, "খোকা এইটা খাস নে-ওইটা খাস নে। রোদে ঘুরতাছিস ক্যান রে, বান্দর! চামড়াডা পুইড়া কেমুন ছালি-ছালি হইছে। তোর শইলের রঙ দেইখা কাউয়াও হাসব। পাগলা, না-খায়া যাস নে, গেলে তুই কিন্তুক আমার মাথা খাস। তুই এমন হইলি ক্যান- তুই না, তুই না, তুই একটা পাগলু।"
বোকা মা তার সন্তানকে কত চিঠিই না লিখেছে, চিঠির মধ্যে অসংখ্য গোল গোল বৃত্ত এঁকে দিয়েছে! পাগলীটা আবার লিখেছে, "খোকা, আমি তোর জন্যে কান্না করি, দেখ না, চিঠিতে এই যে গোল গোল দাগ, এখানে আমার চোখের পানি পড়েছে।"
মাটা এমন বোকা!

মা তার সন্তানের পথ চেয়ে বসে আছে, এই পথ দিয়েই তার সন্তান ফিরবে। আহারে, খোকা এতটা পথ হেটে আসবে কি ভাবে? আচ্ছা, হুট করে রাতে যদি চলে আসে? আমি ঘুমিয়ে পড়লে, খোকার ডাক শুনব তো? পাগলীটা আবার সন্তানের সেই ছোটবেলার জামাগুলো নাকে শুঁকে, সে নাকি তাঁর বাবুটার-তাঁর পাগলু খোকাটার গায়ের গন্ধ পায়!
মাটা এমন বোকা কেন!
মা’টা ভাবে, আহারে-আহারে, এই মাটির টুকরাটা দিয়ে ছোটবেলায় বাবুটা কি খেলাই না খেলত! জলভরা চোখে মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, একটা লাল টুকটুকে বলের জন্য বাবুটা কতবার গাল ফুলিয়ে বসে থেকেছে! কিনি দিতে পারিনি।

মা এবং আমাদের দেশমা, আমাদের অপেক্ষায় আছেন। আমরা ফিরব কি ফিরব না, এ সিদ্ধান্ত আমাদের!


*www.newsagency24.com চোরের এক আস্তানার নাম: https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151517933607335?notif_t=like  


**ছবি-স্বত্ব: আলী মাহমেদ

ডিজিটাল গ্রে-মেটার এবং বাঘের মিউমিউ

আচ্ছা, ডিজিটাল গ্রে-মেটার কেমন হয়? লোহা টাইপের? রঙ কি, রুপালি? যাদের মাথায় এই জিনিস থাকে এঁরা কি রোবট টাইপের নাকি পুরোপুরি রোবট? জানি না, জানার চেষ্টায় আছি। আমার ধারণা পুরোপুরি রোবট।

"ভয়েস ওভার প্রটোকল" (ভিওআইপি) অবৈধ কারবার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র‌্যাংকসটেলের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং এ প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে।" (কালের কন্ঠ, ২০ মার্চ, ২০১০)

এর পূর্বে বন্ধ করা হয়েছে "ঢাকা ফোন" এবং "ওয়ার্ল্ডটেল"। এই তিন ফোন অপারেটরের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় পৌনে ৪ লাখ! এই পৌনে ৪ লাখ গ্রাহকের সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ। এঁরা আর ফোন করতে পারবেন না।
কে বোঝাবে এদের, একটা নাম্বার মানে কয়েক শ আনন্দ-বেদনার কাব্য। কতশত মানুষের কাছে একেকটা নাম্বার দেয়া আছে। কতশত ভয়াবহ দুর্যোগে একজন তার প্রিয়মানুষকে খুঁজে পাবে না। আরেক অপারেটরের নাম্বার যোগাড় করার আগ পর্যন্ত যে বেদনা-কান্ডগুলো ঘটবে এর দায় আমরা কার উপর চাপিয়ে দেব? উপরওয়ালার উপর? হায়াত আছিল না যার মাল হে লয়া গেছে। পৌনে চার লাখ গ্রাহকের মধ্যে মাত্র একটাই কি যথেষ্ঠ না। মাঝরাতে কেবল একজন মা যখন ফোনে ক্রমাগত হাহাকার করতে থাকবেন, খোকা-খোকা, তুই কই, বুকটা কেমুন ভার-ভার লাগতাছে।। খোকা শুনবে না তাঁর কথা, কারণ শোনার যন্ত্রটা নিষ্প্রাণ, শীতল!

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের কি হবে এই ফিজুল প্রশ্নে আর গেলাম না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম এই তিন অপারেটর সত্যি সত্যি অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িত ছিল, বেশ। এর জন্য এই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করত, মোটা অংকের জরিমানা করা যেত। কোম্পানি বাজেয়াপ্ত করুক, চালাবার দায়িত্ব সরকার নিয়ে নিক। কিন্তু তাই বলে গোটা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার ভাবনা অন্তত কোন মানুষের মগজ থেকে বেরুতে পারে না, বেরুতে পারে কেবল রোবটের মাথা থেকে। মাথা মানে রূপালি রঙের ডিজিটাল গ্রে-মেটারে ভরপুর ফাইবারের একটা বাক্স আর কী!

এই পৌনে চার লাখ গ্রাহক নামের মানুষ কি দোষ করেছেন? এদের কি এটাই দোষ, এই মানুষগুলো বাংলাদেশ নামের একটা ডিজিটাল দেশে বসবাস করেন যে দেশ চালান ডিজিটাল নামের কিছু রোবট? পৃথিবীর অন্য কোন সভ্য দেশে এমন অসভ্য কান্ড ঘটতে পারে আমি বিশ্বাস করি না, আমার জানা নাই। আর এমনটা ঘটে থাকলে ওই দেশকে আমি সভ্য দেশ বলে স্বীকার করি না, সেটা সুইটজারল্যান্ড নাকি জাপান তাতে কিছুই যায় আসে না। এদের সঙ্গে মানুষখেকো জুলুদের সঙ্গে কোন তফাৎ নাই।

আমার যতটুকু মনে পড়ে, ইতিপূর্বে গ্রামীন ফোন একই অন্যায় করেছিল এবং গ্রামীন ফোনকে কয়েক শ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। ব্যস, এটুকুই!
এই তিন কোম্পানি যে অন্যায় করেছে বলে বলা হচ্ছে ঠিক একই অন্যায় যদি গ্রামীন ফোন করে তাহলে এই দেশের সরকার কি গ্রামীন ফোন বন্ধ করে দেবেন? মরিবার পূর্বে আমি কি শুনিতে পাইব বাঘ্রগর্জন?

সরকার গ্রামীন ফোন বন্ধ করে দেবেন!
হা হা হা! অনিবার্য কারণবশত লেখা এখানেই শেষ। কারণ এখুনি আমাকে এখান থেকে সরে যেতে হবে। আমার বেদম হাসি পাচ্ছে, বেদম! হা হা হা, হাসির চোটে কম্পিউটার কোথায় ছিটকে পড়ে চাখনাচুর-খানখান হবে এর কোন ঠিক ঠিকানা নেই।

Thursday, March 18, 2010

THE BOBs এবং একজন অ-রাজনীতিবিদের কথা



আমি হচ্ছি পেছনের কাতারের মানুষ, ইশকুলেও বসতাম ব্যাক বেঞ্চে- কখনও সামনে চলে এলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি! কেমন কেমন করে যেন আমার সাইটটা THE BOBs-এর শ্রেষ্ঠ ওয়েব্লগের তালিকায় চলে এসেছে! অনুমান করি, এর পেছনে অনেকে কলকাঠি নেড়েছেন, তাঁদের সীমাহীন ভালবাসার ফসল এটা।

অভাজনের প্রতি যারা এই অযাচিত মমতা দেখিয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কোন ভাষায় এঁদের প্রতি আমার এই কৃতজ্ঞতাটা জানাব এটা আমার জানা নাই, জানা থাকলে ভালো হতো।

এখন ভোট 'দেয়াদেয়ি' শুরু হয়েছে। আমি তো রাজনীতিবিদ না যে বলব, আমাকে একটা ভোট দেন। কিন্তু তাই বলে কোন সহৃদয় আমার সাইটটাকে ভোট দিলে তাঁর প্রতি রে রে করে তেড়ে যাব এমন অকৃতজ্ঞ, বেকুব আমি না।

Best Weblog Bengali


আগ বাড়িয়ে তথ্য: এই পাতা থেকে Best Weblog Bengali
খুঁজে বের করে, তালিকার সবগুলো নাম থেকে পছন্দের নাম ক্লিক করলে পছন্দের সাইটটা আসবে। পছন্দের সাইটটার পাশে Vote for this Blog- এ ক্লিক করলে, টিক চিহ্ন দেখাবে। এরপর নীচে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে সেন্ড করলেই কেল্লাফতে...।
যারা তালিকায় আছেন সবার জন্য শুভেচ্ছা।

Wednesday, March 17, 2010

সেকালের জিউস এবং একালের আমিনী!

এসকিলাস খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ অব্দে লিখে গেছেন, সেই প্রমিথিউসের কথা। প্রমিথিউস মানুষের কল্যাণের জন্য, স্বর্গের দেবতা হেপাসটাসের স্বর্গীয় আগুন চুরি করে মানুষকে দিয়ে দিয়েছিলেন। যে কারণে জিউসের খড়গ নেমে আসে প্রমিথিউসের উপর!
জিউসের অমোঘ নির্দেশে আগুনের দেবতা হেপাসটাস ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিষণ্নচিত্তে প্রমিথিউসকে শৃঙ্খলিত করতে বাধ্য হন। কিন্তু আগুনের দেবতা হেপাসটাসের এই নিয়ে কাতরতার শেষ ছিল না!
প্রমিথিউস সমস্ত কিছু মানুষকে শিখিয়েছিলেন কিন্তু কেবল শেখেননি জিউসের হাত থেকে কেমন করে নিজেকে রক্ষা করতে হয়! প্রমিথিউস বলছেন,

"যদি এক কথায় বলতে চাও, মানুষের জন্যে আমার
সামগ্রিক অবদান কি, তবে বলতে পার:
মানুষের সমস্ত জ্ঞান ও নৈপুণ্য প্রমিথিউসেরই দান।
...
হ্যাঁ, এই সমস্ত কিছুই আমি উপহার দিয়েছি মানুষকে।
কিন্তু হায়, আজ মনে হচ্ছে: এই যন্ত্রণা থেকে নিজেকে বাঁচাবার
কৌশলটুকুই আমি বোধহয় শিখি নি।"

সেকাল আর নাই। সেকালের জিউস নাই, আগুনের দেবতা সেই হেপাসটাসও আজ নাই, মানুষের জন্য একবুক ভালবাসা নিয়ে প্রমিথিউসও আর নাই। এখন আছেন একালের আগুনমানুষ আমিনী! মুফতি ফজলুল হক আমিনী। তিনি আছেন মানুষের কল্যাণের জন্য!
মানুষের কল্যাণে (!) ফতোয়ার বিরুদ্ধে রায় দেয়ার কারণে, আমিনী ২০০১ সালে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন এবং ২০১০ সালেও এই মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছেন। এই নিয়ে আমিনীর মধ্যে হেপাসটাসের মত কোন কাতরতা, বিষণ্নতা নাই। আমিনী নির্দয়, দাম্ভিক হয়ে বলেন, "...রাব্বানী (জজ), তোমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলাম, সেটা এখনো বহাল আছে।" (প্রথম আলো ১৬.০৩.১০)

কসম, আমার লেখালেখির, আমিনী সাহেবের মত এমন আগুনপুরুষ আমি আর দেখি নাই! কোন সভ্য দেশে কোন বিচারপতিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায় সেটা আবার বছরের পর বছর ধরে বহাল থাকে। আবারও মিডিয়ায় সদম্ভে এই বহালনামা মনেও করিয়ে দেয়া যায়! বহাল তবিয়তে ঘুরেও বেড়ানো যায়!
পুলিশ এদের কেশও স্পর্শ করতে পারে না!
বড়ো বিচিত্র এ দেশ!

Tuesday, March 16, 2010

ঘুষখোর ব্যাংকের গভর্নর!


এখন আর ঘুষ দিতে আমার মোটেও আপত্তি নাই এই বিষয়ে একটা লেখা দিয়েছিলাম। 

ওখানে লিখেছিলাম, ঘুষখোরদের চাহিদামত টাকা অবশ্যই দেয়া হবে, সঙ্গে এই টাইপের নোট, একদম ফ্রি।

এই দেশে এখন ঘুষ বিষয়টা অতি সাধারণ একটা বিষয় হয়ে গেছে। সাধারণ একজন ক্লার্কের ছেলে-মেয়েরা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ছে, মেডিকালে পড়ছে কেউ জানতে চাইছে না কেমন করে? সরকারী অধিকাংশ কর্মকর্তার ঢাকায় ন্যূনতম একটা হলেও বাড়ি আছে, কেউ জানতে চাইছে না কেমনে কী! তেলিবেলি রাজাকারের নাম শুনলেও আমাদের গায়ে আগুন ধরে যায় কিন্তু ঘুষখোরের সঙ্গে লটপট-ঘসাঘসি করতে আমাদের কোন বিকার নাই! আমরা খুবই আরাম পাই। বিমলানন্দে অনেক বাবা তার মেয়েকে ঘুষখোরের বিছানায় তুলে দিতে অনাগ্রহ বোধ করেন না, অবশ্য বৈধ উপায়ে, কবুল পড়িয়ে।

এমন কি, আমাদের দেশে হুজুররা পর্যন্ত এই বিষয়ে রা কাড়েন না। কেন, কে জানে? অবশ্য কোরানে দেখলাম, সামান্য অনেক অন্যায় নিয়ে অসংখ্য আয়াত আছে কিন্তু ঘুষ নিয়ে তেমন আয়াত পেলাম না। সবেধন নীলমনি একটাই (আপ্রাণ চেষ্টা করেও একটাই পেলাম। অনিচ্ছাকৃত, অসচেতনার কারণে মিস করে থাকলে আমি আগাম ক্ষমা চাচ্ছি):
"আর মানুষের ধনসম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের ঘুষ দিয়ো না।" (২ সুরা বাকারা: ১৮৮)

ঘুষ, বিষয়টা আমরা বড়ো তাচ্ছিল্য-হালকা করে দেখি। ঘুষ একজন অন্যজনকে তখনই দেয় যখন তার পাপ ঢাকার প্রয়োজন হয়। ঘুষের কারণে একটা খুনের বিচার হয় না। ঘুষের কারণে একজন ধর্ষিতা শিশুর বাবা কাঁদেন, সেই বাবাটার কান্না কেউ শোনে না! কোরবানির পশুর কান্না বুঝি শোনা যায়? ঘুষের কারণেই আমরা এহেন কোন অন্যায় নেই যা করি না।
"রাব্বি শামসিরর নতচোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, কেউ কেউ ক্যারিয়ারের জন্য তার মাকে অন্যের বিছানায় তুলে দেয়। তুই তাদের একজন।" (জীবনটাই যখন নিলামে)
রাব্বির সুরে সুর মিলিয়ে আমিও বলি, ক্যারিয়ার-ফ্যারিয়ার বলে আলাদা কিছু নাই। ভাল টাকা পেলে...ভাল টাকার ঘুষ পেলে...।

যাই হোক, এখন আমার বিশেষ ওই টাকা দিতে গেলে টাকার ব্যবস্থাটা তো করতে হবে। আমার পরিচিত এক আর্টিস্ট বন্ধু আছেন। তাকে বলেছিলাম, টাকাটার ডিজাইন করে দিতে। বন্ধুটি আগে ছিলেন বড়ো ছটফটে, এখন চলাফেলা বড়ো স্লথ! বড়ো কোম্পানিতে চাকরি করেন বলে পেছনটা অনাবশ্যক ভারী হয়ে গেছে, চলাফেরায় স্লথ না হয়ে উপায় কী! আজকাল কথাও বলেন মেপে। আমার প্রস্তাব শুনে কেবল বললেন, পাডা। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট বন্ধুটি আমাকে বুঝি পাঁঠা বলে গাল পাড়লেন, বন্ধু মাথা নাড়লেন। খসখস করে কাগজে লিখে স্লিপটা ধরিয়ে দিলেন, পাডা- পাগলের ডাক্তার।
এমন হার্মাদের সঙ্গে কথা চালাচালি করে সুখ নাই।
কি আর করা বিমর্ষ মুখে নিজেই টাকাটার ডিজাইনটা করলাম। কেউ কথা রাখে না- কেউ সাহায্য করে না।

ঘুষখোর ব্যাংকের গর্ভনর হওয়ার জন্যও কাউকে রাজী করনো গেল না। দায়ে পড়ে নিজেই এ পদে যোগ দিলাম। কেন কেউ এই পদে যোগ দিতে সম্মত হননি এটা এখন বুঝি।
কাউকে বলবেন না, আপনাকে বলি। এখন পর্যন্ত বেতন হিসাবে আমাকে একটা কাঁচা টাকাও দেয়া হয়নি, কোন একদিন অফিস যাওয়ার জন্য গাড়িও পাঠনো হয়নি। কে এটা বিশ্বাস করবে, যথেষ্ঠ লোকবল দূরের কথা আমাকে কাজ চালাবার মতো একটা অফিস পর্যন্ত দেয়া হয়নি!
এখন হাড়ে হাড়ে বুঝি এই পদে যোগ দেয়ার জন্য কেন কাউকে পাওয়া গেল না...। কপাল!

নিশিগন্ধা


লুসীর কল্পনাতেও এটা ছিল না তাকে এভাবে পরিবারের অমতে বিয়ে করতে হবে। স্কুটার এগুচ্ছে। লুসী নরম হাতে শক্ত করে তুষারকে ধরে আছে।

তুষারের খুব অবাক লাগছে, কী থেকে কী হয়ে গেল। পণ করে গিয়েছিল লুসীর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলবে। বিয়ে ব্যাপারটা তাহলে এতই সহজ! এখন থেকে এই মেয়েটি সারা জীবন তার সঙ্গে থাকবে! ক্ষীণ আলোয় তুষার লুসীর দিকে তাকাল। কী পরম নির্ভাবনায় ওর হাত ধরে আছে। তুষারের কেবল মনে হচ্ছে মেয়েটি বড় ভুল করেছে। তুষার বিড়বিড় করে বলল, ‘লুসী, তুমি বড় ভুল করেছ।’

তন্নী দরজা খুললে তুষার হাসিমুখে বলল, ‘তন্নী, তুই আমার চায়ে চিনি বেশি দিস, তাই তোর ভাবিকে নিয়ে এলাম।’
লুসী সহজভাবে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘তুমি তাহলে আমাকে চা বানাতে নিয়ে এসেছ? আমি কিন্তু চা বানাতে পারি না। তন্নী আমাকে তোমার একটা কাপড় ধার দেবে, গোসল করব।’
তন্নী চোখ বড় বড় করে লুসীর দিকে তাকিয়ে রইল।
লুসী গলায় মুগ্ধতা নিয়ে বলল, ‘আরে তন্নী, তোমার চোখ দারুণ তো! এই রে, ছোট করে ফেললে।’
তন্নী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিল। চোখ তুলে বলল, ‘ধ্যাৎ ভা-ভাব-ভাবি, তুমি বানিয়ে বলছ। ভাইয়া যে বলে আমার চোখ হাঁসের ডিমের মতো!’
লুসী বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমার ভাইয়া তো একটা অপদার্থ। ভালো কিছু দেখার মতো ওর চোখ আছে নাকি!’

তুষার এবার ভয় ভয় গলায় বলল, ‘তন্নী, মা কোথায় রে?’
তন্নী ঠোঁট ভেঙে হাসল, ‘মা গেছেন পাশের বাড়িতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ‘বিশেষ অজ্ঞ’ মারুফা খালার ওখানে। ভোয়া শুনবেন। এর পর তারা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করবেন।’
তুষার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মা কি যুদ্ধের খবর শোনেন?’
তন্নী লুসীর হাত ধরল, ‘আসুন ভাবি, আপনার গোসলের ব্যবস্থা করি।’

তুষারের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই হয়েছে এক জ্বালা। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখন শুধু যুদ্ধের খবর। এসব আলোচনায় শুঁটকি ব্যাপারী, গরু ব্যাপারী কেউ বাদ থাকে না। এদের কথাবার্তা শুনে মন হয়, সাদ্দাম-বুশের সাথে হটলাইনে মিনিটে মিনিটে যোগাযোগ আছে।
দু-দিন আগে তুষার রিকশায় করে মগবাজারের দিকে যাচ্ছিল। রিকশা চালাতে চালাতে লোকটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আইচ্ছ্যা, কইনছেন-গণ্ডগোলডার হবর কী।
তুষার একটু অন্যমনস্ক ছিল। চমকে জিজ্ঞেস করল, কিসের গণ্ডগোল?
ও ভেবেছিল রাস্তার কোনো ঝামেলার কথা জিজ্ঞেস করছে। লোকটা ঝড়ের গতিতে রিকশা চালাতে চালাতে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ইরাকের গণ্ডগোলডার কথা জিগাইতাছি। সাদ্দাইম্যা অইল গিয়া বাপের বেডা।
তুষার তিতিবিরক্ত হয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ধুস শালা। পরক্ষণেই জমে গেল। একটা ট্রাক গায়ের উপর ওঠে এসেছিল প্রায়। তুষারের মনে হচ্ছিল ওই মুহ�র্তে তার হৃৎপিণ্ড বুঝি থেমে ছিল। একটু ধাতস্থ হয়ে লোকটাকে বলেছিল, যুদ্ধের কোনো খবর আমি জানি না। সামনে দেখে রিকশা চালাও। আর একটা কথা বললে একটা চটকনা দিব।
লোকটা মুখ ঘুরিয়ে তুষারের দিকে তাকাল। অল্পক্ষণ আগের এত বড় ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি। তার চেয়ে এত বড় পাজি ছেলেটা যুদ্ধের খবর জানে না এটা তাকে আহত করেছে।

কাল সকালে দোকানে চা খাচ্ছিল, সেখানেও তুমুল বচসা। দুপক্ষের মধ্যে খুব কথা কাটাকাটি হচ্ছে। সাদ্দামপন্থীরা সংখ্যায় বেশি। এদের মধ্যে একজন নিবিষ্টচিত্তে দু-পক্ষের আলোচনা শুনছিলেন আর দাঁত খোঁচাচ্ছিলেন। তিনি কাজটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন! গভীর আগ্রহ নিয়ে তুষার লক্ষ করছিল। অল্পক্ষণেই মুগ্ধ হয়ে গেল, খোঁচাখুঁচির কাজ এতভাবে করা যায়? অল্পক্ষণেই তার গা গুলিয়ে উঠল। খুঁচিয়ে জিনিসটা শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক বের করে আনলেন। নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলেন। ...। তুষার চোখ ফিরিয়ে নিল।
ভদ্রলোক চিবুতে চিবুতে বললেন, আরে মিয়া রাহেন, আমেরিকা যে এত্তোগুলা বুমা ফালাইছে, ইরাকের কী কিছু অইছে? বুড়ো আঙুল ডানে-বাঁয়ে করে বললেন, কিসস্যু অয় নাই, একটা বুমাও ফাডে নাই। বড় পীরছাবের মাজার-মারাত্মক জাগা রে ভাই!
এবার বুশপন্থী একজন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন, আচ্ছা, তাই নাকি! তাহলে তো ইরাকের সব মিসাইল সৌদির ওপর দিয়ে যাবে। এটা তো আরো মারাত্মক জায়গা।
ইরাকপন্থী আরেকজন টেবিলে চাপড় মেরে গ্লাস উল্টে ফেললেন, আজাইরা কথা রাহেন। আপনারা আসল খবরাই জানেন না, ইরাকের সবটা মাটির নিচে। বাড়িঘর যেগুলো আছে সব ফলস। দোতলা বাড়িকে বানিয়েছে বিশতলা। মিসাইল সব ওপরে লাগবে, নিচে কিছুই হবে না।
অন্য একজন এক ঢোকে চা গিলতে গিয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেললেন, ইরাকিরা হইল গিয়া বাঘের জাত। ইরাকের পাঁচ হাজার পাইলটের সবাই যুদ্ধে শহীদ হইতে চায়। সাদ্দাম বলল, রাখো, এভাবে না, লটারি হবে।
দোকানের বয় এতক্ষণ ধরে চুপচাপ এদের কথাবার্তা শুনছিল। ন্যাকড়া দিয়ে টেবিল পরিষ্কার করতে করতে বলল, আপনেরা একটা খবর হুনছেননি, চিটাগাং-সিলেট মাজরের সব কাছিম আর কবুতর বোলে ইরাক গেছে গা!

জরুরি কাজ ছিল বলে তুষার বেরিয়ে এসেছিল। থাকতে পারলে অবশ্য বেশ হতো। অদ্ভুত অদ্ভুত সব খবর জানা যেত।
লুসীকে বাথরুম দেখিয়ে তন্নী বলল, ‘ভাবি, তুমি কি টিকটিকিকে ভয় পাও?’
লুসী চুলের ক্লিপগুলো খুলতে খুলতে বলল, ‘না, কেন?’
‘আমাদের বাথরুমে একটা টিকটিকি আছে।’
লুসী হেসে ফেলল, ‘টিকটিকি তো আর ভয়ানক কিছু না।’
‘ওসব না, ভাবি। এই টিকটিকিটা গৃহপালিত। প্লিজ, তুমি একে মারবে না।’
‘তাই! তা আমি এটাকে মারব কেন?’
‘ওটা বড় ফাজিল। গোসল করার সময় ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে।’ বলেই তন্নী মাথা নিচু করল।
‘তন্নী, তুমি পাগল নাকি! এসব কী সৃষ্টিছাড়া কথা!’

তন্নী মন খারাপ করে ফেলল ফেলল। কথা ঘুরাবার জন্য লুসীর হাত থেকে ক্লিপগুলো নিয়ে বলল, ‘জানো ভাবি, ভাইয়া না ছ-সাত দিনে একবার গোসল করে। ও একটা বনখাটাশ। এ জন্যই তো ওর শরীরে বোটকা গন্ধ।’
‘আমার কাছে তো ভালোই লাগে।’ বলেই লুসীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
তন্নী চোখ বড় বড় করে বলল,
‘অরি আল্লাহ, বলো কী!’
‘তোমার যখন এমন কেউ হবে, দেখবে তোমার কাছেও ভালো লাগবে।’
‘যাও, ভালো হবে না বলছি। ভাবি, সত্যিই তুমি এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে এসেছ?’
‘হুঁ।’
তন্নী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘আচ্ছা সব ছেড়ে আসতে তোমার খারাপ লাগেনি?’
লুসী বিষণ্ন হয়ে বলল, ‘তোমার ভাইয়াকে আমি খুব পছন্দ করি। এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিল না।’
‘সরি ভাবি, তোমার মন খারাপ করে দিলাম।’ তন্নী সিরিয়াস মুখ করে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়ার মাঝে তুমি এমন কী দেখলে একেবারে ফট করে বিয়ে করে ফেললে!’

লুসী তন্নীর চুল টেনে বাথরুমে ঢুকল।

কল বেলের শব্দে তন্নী ছুটে গেল, ‘মা এসেছে সম্ভবত।’
লুসী সহজ ভঙ্গিতে রাহেলা বেগমকে পা ছুঁয়ে সালাম করল। তুষার হড়বড় করে বলল, ‘মা, এর নাম লুসী। তোমার বউ।’
রাহেলা বেগম স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। থেকে থেকে শ্বাস ফেলতে লাগলেন। নিস্তেজ গলায় লুসীকে বললেন, ‘আজ তোমার বিয়ের প্রথম রাত, তাই এখন তোমাকে কিছু বলতে চাই না। তোমার সাথে কাল কথা বলব।’
লুসী সহজভাবে বলল, ‘মা, আপনি যেসব কঠিন কঠিন কথা বলবেন, এখনই বলতে পারেন।’

রাহেলা বেগম চুপ করে রইলেন।
লুসী কোমল গলায় বলল, ‘আসুন মা, খেয়ে নিন। আপনি না খেলে আমরা খাব না।’
রাহেলা বেগম কিছু না বলে খেতে বসলেন। তন্নীকে লবণ এগিয়ে দিতে বললেন। সে ফিক করে হেসে ফেলল, ‘আমার চেয়ে তো ভাবি কাছে, তাকে বলো না!’
রাহেলা বেগম কঠিন দৃষ্টিতে তন্নীর দিকে তাকালেন।
তন্নী হাসতে হাসতে বলল, ‘রাগ করছ কেন মা। ভাবির সব কথা শুনলে তোমার রাগ থাকবে না। ভাবি সব ছেড়ে...।’
‘চুপ কর, তন্নী।’
তন্নী ক্ষেপে গেল, ‘না, চুপ করব না। আমার সব কথা তোমায় শুনতে হবে মা।’
তন্নী আবার প্রথম থেকে বলতে লাগল।

রাহেলা বেগম চুপচাপ খেতে লাগলেন। তুষারের মনে হলো মায়ের দৃষ্টি যেন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে আসছে। হাত ধুয়ে সহজভাবে লুসীকে বললেন, ‘তোমার জন্য দুঃখ হয়। গাধাটার মধ্যে যে কী দেখলে! তোমার হাত-গা দেখি একদম খালি। আমার ঘরে একটু আসো তো।’
লুসী ক্ষীণ গলায় বলল, ‘মা, আপনি আমাকে বৌমা না বললে আমি কিন্তু যাব না!’
রাহেলা বেগম হেসে বললেন, ‘আসো।’
লুসী আর কথা না বাড়িয়ে গুটি গুটি পায়ে পিছু নিল।

তুষার এতক্ষণে স্বস্তি�র নিঃশ্বাস ফেলল। তুষারের রুমটা তন্নী অল্প সময়ে গুছিয়ে দিয়েছে। ঢুকেই লুসী নাক সিটকাল, ‘একি অবস্থা! এভাবে কোনো মানুষ থাকে? একটা জিনিসও দেখি জায়গায় নেই!’
‘এটা তো আর তোমাদের বাড়ি না যে।’
‘দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে ঠাণ্ডা শ্বাস ফেলছ কেন? বাজে কথা বলবে না। আধ খাওয়া চায়ের কাপকে বানিয়েছ অ্যাশট্রে, ফুলদানিতে ছাই ঝেড়েছ। এই সব কী!’
তুষার কিছু না বলে চুপচাপ সিগারেট টানতে লাগল।
‘একের পর এক সিগারেট ধরিয়ে রুমটা দেখি একেবারে অন্ধকার করে ফেলেছ!’
‘আমি এমনিতে বেশি সিগারেট টানি না। টেনশন হলে বেশি হয়ে যায়।’
‘এখন তোমার আবার কিসের টেনশন!’

তুষার মাথা নিচু করে হাসল।
ঘরের বাতি কমিয়ে লুসী সহজ ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ পর তুষার আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে, আমি ঘুমুব কোথায়?’
‘তুমি মেঝেতে শোও।’
তুষার বুঝতে চেষ্টা করছে, লুসী কি ওর সঙ্গে ঠাট্টা করল! তুষার উঠে গভীর ভালোবাসায় লুসীর গায়ে হাত রাখল।
‘আহ্‌, গায়ে হাত দিচ্ছ কেন?’
লুসী তুষারের হাত সরিয়ে দিল না। তুষার একটু ইতস্ত�ত করল, হাত সরাল না।

অনেক রাত। কয়টা বাজে তুষার জানে না। পাশে লুসী ঘুমিয়ে কাদা। কোথায় যেন নিশিগন্ধা ফুটেছে। জানালার বাইরে ফকফকা জ্যোৎস্নার অজানা রহস্য, পাশে রহস্যময়ী এক নারী। সম্ভবত পৃথিবীতে রহস্য বলতে কিছু নেই। এ জ্যোৎস্না, এ নারী এক সময় তুষারের কাছে রহস্য মনে হবে না।

*তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল এটা বলতে পারলে আমার চেয়ে সুখী কেউ হতো না কিন্তু...।
তুষার, লুসীর ভালবাসা-বাসির সন্তান, গদ্য। গদ্য নামের কিশোরটি ছাদে একা। বিষণ্ন-কুৎসিত এক বিকেল। এমন একটা বিকেলে অযথাই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ার তীব্র আকা�ঙ্খা জাগে। কিশোরটি অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। মাথায় কেবল ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে বাবা-মা একসঙ্গে থাকলে কি হয়!

Sunday, March 14, 2010

শৈশব!


নঈম সাহেব দোকানে বসে খুশি মনে পান চিবুচ্ছেন। এ ক-দিন ওঁর মনে ভারী আনন্দ! কনফেকশনারীর ব্যবসাটা এখন জমজমাট। দু’জন মিলেও বিক্রি করে কূল পাওয়া যাচ্ছে না। পাশেই বেশ কটা বাচ্চাদের স্কুল চালু হয়েছে। টিফিন টাইমে বাচ্চারা সব সাফ করে দিচ্ছে। পেটিস, সিঙ্গারা এইসব আবার বিকেলে কিনে আনতে হচ্ছে। ওদিন বেশ ক’টা সিঙ্গারা থেঁতলে গিয়েছিল, কাঁচের বাক্সের এক কোনায় পড়ে ছিল।
ছোট একটা ছেলে কী চমৎকার করেই না বলল: কাকু, একটা সিঙ্গারা দেন তো।
নাঈম সাহেব লজ্জিত হয়ে বলেছিলেন: সিঙ্গারা তো নাই খোকা।
ওই তো, দেন না, কাকু।
ওগুলো ভেঙ্গে গেছে, খাওয়া যাবে না যে।
কিছু হবে না। দেন না, খুব খিদে লেগেছে।

তিনি সীমাহীন বিব্রত হয়ে যতটুকু সম্ভব টিপেটুপে ঠিক করে দিলেন। মুখ মুছে ছেলেটি টাকা দিলে হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন: ওকি, টাকা কেন।
কাকু সিঙ্গারার দাম নিবেন তো।
না-না, ঠিক আছে। ওগুলো এমনিতেই ফেলে দিতাম।
ফেলে দিলে অন্য কথা। আমি খেয়েছি, টাকা দিতে হবে না বুঝি।
ছি-ছি, টাকা লাগবে না।
উহুঁ, মা বলেন কিছু খেলে টাকা দিতে হয়।
তোমার মা বলেছেন বুঝি, ঠিক বলেছেন। আচ্ছা তুমি অন্য দিন দিয়ো।
উহুঁ-উহুঁ, আজ নিতে হবে।

নঈম সাহেব অপার বিষ্ময়ে শিশুটির দিকে তাকিয়েছিলেন। ওঁর চোখ থেকে মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ছিল। এখনকার শিশুরা কী সৎ, অমায়িকই না হচ্ছে। ওঁর ছেলেবেলার কথা মনে করে হাসলেন। তখন ফোর-ফাইভে পড়েন। এক দোকান থেকে আধসের জিলাপী কিনলেন।
দোকানি বলেছিল: খোকা বাবু পয়সা দেও।
তিনি ডাহা মিথ্যা বললেন, কি বলেন, পয়সা না দিলাম!
হই হই-এ লোক জমে গেল। সবাই দোকানিকে বকা দিল। জলিল মিঞা তোমার কী মাথা খারাপ। এই দুধের শিশু মিথ্যা বলবে, এরা হল ফেরেশতার জাত।
অন্য একজন বলল, জলিল, তোমাকে কতদিন নিষেধ করেছি দিনের বেলা গাঁজায় টান দেবে না।
জলিল মিঞা অসহ্য রাগে লাফিয়ে উঠেছিলেন: তাহলে-তাহলে, আমি কি মিথ্যা বলছি। হুলস্থূল কান্ড, বয়স্ক একলোক হাত উঠিয়ে সবাইকে থামতে বললেন, এই ছেলে, যাও, বাড়ি যাও। জলিল, কত হয়েছে, দাম আমি দেব।
জলিল মিঞা মুখ লম্বা করে বললেন: দাম লাগবো না।
এই ব্যাটা, দাম লাগবো না এটা এখন বলছিস কেন। এতক্ষণ তো আকাশ ফাটিয়ে ফেলছিলি।

নঈম সাহেব গুটিগুটি পায়ে সরে পড়ছিলেন। জলিল মিঞা পেছন থেকে চেঁচাতে থাকল: এ্যাই, এ্যাই পুলা, জিলাপীর পোটলা ফালাইয়া কই যাও।
নঈম সাহেব মহা সুখে জিলাপী চিবুতে চিবুতে বাবার সামনে পড়ে গেলেন। মুখ রসে মাখামাখি। বাবাকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। একটুর জন্যে ধরা পড়ে গেলেন!
বাবা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি খাচ্ছিস?
জিলাপী।
পেলি কোথায়?
নঈম সাহেব ঝড়ের গতিতে চিন্তা করছিলেন। বাসার কেউ দিয়েছে এটা বলে পার পাওয়া যাবে না, সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবেন। মাথায় যা এল তাই বললেন: একজন দিল।
বাবার এবার হিম গলা, এমনি দিল?
নঈম সাহেব বুঝতে পারছিলেন ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তখন আর ফেরার উপায় নেই।
জ্বি।
হুম, যে দিল সে তোর কি লাগে, মামা-ফুফা-চাচা? বল, চুপ করে আছিস কেন?
এই মুহূর্তে আকাশের সমস্ত তারা ঝপ করে নঈম সাহেবের চোখে নেমে এসেছে। একেকটা তারার কী রঙের ছঁটা! জাড়িয়ে জড়িয়ে বললেন: জ্বি, এক দোকানী দিল। আমি নিতে চাই নি, জোর করে দিয়ে দিল। বলল, না নিলে খুব রাগ করবে।
বাবা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, পয়সা না নিয়েই দিল?
জ্বি, বলল, না নিলে রাগ করবে।
আহা, তাহলে তো নিতেই হয় নইলে রাগ করবে যে। আয় আমিও আধ মন মাগনা জিলাপী নিয়ে আসি। চ-ল!

বাবা ঘাড় ধরে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চললেন। এখন কোন সংশয় নেই, পেটের জিলাপীগুলো বাবা বের করে ফেলবেন। এজন্য বাবাকে খানিকটা ফ্রিহ্যান্ড এক্সসারসাইজ করতে হবে। মাদ্রাসায় যা দোয়া-দরুদ শিখেছিলেন সব কয়েকবার রিভিশন দিয়ে ফেললেন। জলিল মিয়া নামের লোকটা অসম্ভব শান্ত গলায় বলেছিলেন: জ্বি, আমি দিছি।
বাবার তখন চন্ডাল রাগ: কেন, কেন দিলেন!
জলিল মিয়া বাবার চোখে চোখ রেখে বললেন, ছেলেপুলে নাই তো, মায়ায় পইড়া দিছি। ভুল হইছে, মাফ কইর‌্যা দেন।

ঠিক তখনি রোগামত কাল-কাল একটা ছেলে, দোকানের ভেতর থেকে উচুঁ গলায় বলল: বাজান, চুলা নিভাই ফেলমু।
জলিল মিয়ার রক্তশূন্য মুখ। বাবা হতভম্ব। টুঁ-শব্দও করলেন না। ঘোরলাগা ভঙ্গিতে জলিল মিঞাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁলেন। বিড়বিড় করে কীসব বলতে থাকলেন।

একটা ভিক্ষুক গলা ফাটিয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে।
নঈম সাহেব কড়া কথা বলতে গিয়েও বললেন না। বয়স্ক অন্ধ একটা লোক, সঙ্গে মৌ’র বয়সী একটা মেয়ে। এই মেয়েটা ঠোঁট কী ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। নঈম সাহেবের চোখ ভিজে এল, কী অনিশ্চিত একটা জীবন! এই শিশুটি অন্ধ লোকটার হাত ধরে কোথায় কোথায় ঘুরবে, কতদিন ঘুরবে? পাঁচটা টাকা দিলেন। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সমস্ত মুখ কৃতজ্ঞতায় ভিজে আছে। আশ্চর্য, এর জীবনরেখার সীমা এই! মাত্র পাঁচ টাকা পেয়ে এ অন্য জগতের আনন্দ অনুভব করছে। মেয়েটা ভিক্ষে করতে বেরিয়েছে সম্ভবত খুব বেশিদিন হয় নি। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা এর প্রবল।

নঈম সাহেব এইসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পেলেন না। টিফিন টাইম হয়ে গেছে। শিশুরা দল বেঁধে কলকল করে ঢুকছে। একা হাঁপিয়ে উঠলেন। দোকানের ছেলেটা এত দেরি করছে আজ। কল্লোলকে ঢুকতে দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘তুই।’
কল্লোল তেমন দোকানে আসে না। কল্লোল হাসিমুখে বলল, ‘কি বাবা, ঝামেলা। এরা দেখি বাজার জমিয়ে ফেলেছে।’
‘ছি, এইসব বলতে নেই। এরা খরিদ্দার, লক্ষী। হোক শিশু, আমরা যে খাবারটা খাই, পোশাকটা গায়ে দেই এতে এদের অবদান কম না।’
‘মাইগড, বাবা, তুমি দেখি একেবারে পাকা ব্যবসায়ীর মত কথা বলছ।’
‘তোদের ধারণা, ব্যবসায়ী মানেই অবজ্ঞার বিষয়, এটা ঠিক না। ব্যবসায়ী মানেই বুদ্ধিমান। এমন না হলে কেউ পিচ্ছিল টাকা আটকাতে পারে।’
‘সরি, বাবা। তুমি খালি কথার উল্টা অর্থ কর। ইয়ে বাবা, আমি তোমাকে সাহায্য করি?’
‘পাগল, তুই সাহায্য করবি, তুই! এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে পারিস না। এইসব পারবি না।’
‘ফুঃ, এটা কোন কাজ, শিশুরাও পারে।’

অল্পক্ষণেই দেখা গেল শিশুরা নঈম সাহেবকে পাত্তা দিচ্ছে না। যা বলার কল্লোলকেই বলছে, আংকেল এটা দেন, ওটা দেন, পানি দেন। একজন তো বলল, আংকেল দেখেন তো মুখে খাবার লেগে আছে কিনা।
কল্লোলের কী আনন্দই না হচ্ছে, বাবাকে খানিকটা সাহায্য করতে পেরে।
‘বাবা এখন থেকে আমি কিন্তু সময় পেলেই আসব।’
নঈম সাহেব আঁতকে উঠলেন, ‘না-না, তোর পড়াশোনার ক্ষতি হবে।’ কল্লোল কথা বাড়াল না। প্রায় রোজই দোকানে আসতে থাকল।

*পিতা ও পুত্র

Saturday, March 13, 2010

পিতা ও পুত্র


সোয়া এগারটা বাজে। নঈম সাহেব এখনও রাতের খাবার খাননি। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, কল্লোল আজ কী দেরীই না করছে। ছেলেটা যে কোথায় কোথায় থাকে, কী খায়, কে জানে! ও বড় লক্ষী ছেলে।

অবশ্য এতে ওঁর নিজের অবদানও কম না। কিছু সূক্ষ্ণ চাল দেন। এই যে এখনও খাননি, একসঙ্গে খাবেন বলে অপেক্ষা করছেন। ও বিপন্ন বোধ করবে। ওর বিব্রত মুখ দেখতে ভালো লাগে। কল্লোলের মা সম্ভবত ঘুমিয়ে কাদা। মহিলা জীবনটা ভাজা ভাজা করে ফেলল। কিভাবে স্বামীকে অপদস্ত করা যাবে-নিচু দেখানো যাবে, এ ভাবনা ছাড়া এর মাথায় অন্য কিছুই খেলা করে না! অল্প কথায়, অসাধারণ রাঁধুনি এবং দুর্দান্ত ঝগড়া বিশারদ।

ওদিন কল্লোল খেতে বসে থু-থু করে বলেছিল: ডালে কী বিশ্রী গন্ধ, মুখে দেয়া যাচ্ছে না! ওয়াক!
ফাতেমা বেগম কঠিন ভঙ্গিতে বললেন: তোর বাবাকে নতুন একটা চশমা এনে দে।
মা কী বলছ-বলছি ডালে গন্ধ, তুমি বলছ চশমার কথা!
বেচারা, তোর বাবা এই চশমায় ভাল দেখতে পায় না। দশ বছরের পচা ডাল আগ্রহ করে কিনে নিয়ে এসেছে।
নাঈম সাহেব হা হা করে হেসে বলেছিলেন: চশমা ঠিকই আছে। ওই তো তোমার ভুরুর নিচে তিলটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
চুপ, আবার আহাম্মকের মতো ফ্যা-ফ্যা করে হাসে। পচা ডাল কিনেছ পয়সা বাঁচাতে, তুমি তো আবার ডাল খাও না। আসলে আমরা মরে যাই তাই চাও, ভেবেছ, আমি বুঝি না কিছু, না!
কল্লোলের মা, দয়া করে এখন আরাম করে খেতে দাও, কাল ডাল ফেরত দিয়ে আসব।
ফিরাফিরি পরের কথা, তুমি এ কান্ডটা কেন করলে?

কল্লোল লজ্জায় মরে যাচ্ছিল, মা ওর জন্যে হূলস্থুল কান্ড করছেন। তাছাড়া বাবা ডাল খান না কথাটা ঠিক না, খান, কম খান। মিনমিন করে বলল: বাদ দাও তো, মা।
বাদ দেব কেন, এই না বললি মুখে দেয়া যাচ্ছে না!
ভুল বলেছি, খেতে অসুবিধা হচ্ছে না।
বললেই হল, ওই ভাত সরিয়ে অন্য ভাত নে।
আঃ মা, লাগবে না।
উহুঁ, ওই ভাত সরিয়ে ফেল!

কল্লোল অল্পক্ষণ পলক না ফেলে মা’র দিকে তাকিয়ে পুরো ডালের বাটি নিজের পাতে ঢেলে দিল। প্লেট উঠিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেতে লাগল। ফাতেমা বেগম হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। নঈম সাহেব চোখ বড় বড় করে কল্লোলকে দেখার চেষ্টা করছিলেন। কল্লোলকে কেমন অস্পষ্ট-ঝাপসা দেখাচ্ছিল। ছেলেটা এমন পাগলু হয়ে কেন?

কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠলেন। যাক, শেষ পর্যন্ত ফিরল! কল্লোল মাথা নিচু করে ঢুকে অস্ফুটে বলল,‘সরি বাবা, একটু দেরি হয়ে গেল।’
নঈম সাহেব নিঃশব্দে দরজা লাগালেন।
‘সরি বাবা।’
নঈম সাহেব চেষ্টাকৃত যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘এক কথা দু’বার বলছিস কেন! কই, তোকে বকা দিয়েছি।’
‘বকাবকি করো না বলেই তো আরও খারাপ লাগে।’
‘আয় খেয়েনি।’
‘এসব কী বাবা, তুমি এখনও খাওনি!’

নঈম সাহেব খাবার টেবিলে বসে কল্লোলের প্লেটে ভাত বেড়ে অল্প ভাত নিজেও নিলেন। খাবার সব কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে।
‘বাবা, এটা কিন্তু মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এ বয়সে না খেয়ে বসে থাকো শুধু শুধু।’
‘এটা তুই এখন বুঝবি না, ছেলে-মেয়ের বাবা হলে তখন বুঝবি।’
কল্লোল বেসিনে সশব্দে নাক ঝাড়ল। নঈম সাহেব তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বলবেন না ভেবেও বললেন,‘এই-এই ছোকরা।’
‘কী, অ, এই ব্যপার নাক ঝাড়া!’
‘দেখ-দেখ কান্ড ছেলের, কী অবহেলা করে বলছে, অ-এই ব্যপার। মার্জিত আচরণ বলে একটা ব্যাপার আছে, না কি?’
‘হুঁহ, মার্জিত আচরণ আমাদের মতো হাভাতের! এসব দিয়ে কী করব!’
‘কীসব কথা, ভালো আচরণ কী কেবলমাত্র খুব পয়সাঅলাদেরই থাকবে! শোন, মজার একটা কথা বলি। এক লোক ট্রেনে মহা আনন্দে পান চিবুচ্ছে। যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে নোংরা করছে। এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কড়া করে ধমক দিলেন। লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল: গরীব মানুষ মাফ করে দেন। কী বুঝলি?’
‘গরীব হওয়া বড় লজ্জা, বড় কষ্ট, বাবা। এর চেয়ে জঘন্য কিছু এ পৃথিবীতে হতে পারে না।’
‘খুবই সত্য কথা কিন্তু তাই বলে তাইরে-নাইরে করে দিন কাটালে তো হবে না। আয়, খেতে আয়।’

কল্লোল চেয়ার টেনে বসল। ভাতে তরকারী মাখতে মাখতে বলল, ‘মৌ, মা, এরা কী সব ঘুমিয়ে গেছে?’
‘হুঁ, মৌ জেগে থাকতে চেয়েছিল। ন’টা থেকেই আমার কানের কাছে ঘেনঘেন করছিল, তুই এলে এক সঙ্গে খাবে বলে। তোর মা চড় দিয়ে ওর গালে আঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিল। তোর মা যে কী জিনিস, খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই নেই।’
নঈম সাহেব চেষ্টা করেও গভীর শ্বাস আটকাতে পারলেন না। কল্লোল মুখ তুলে তাকাতেই বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কেউই চাচ্ছিল না তাকাতাকির পর্বটা অন্তত এ মুহূর্তে হোক, তবুও হল। বাবার চোখ পানিতে ছাপাছাপি অবস্থা। কল্লোলের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কী করুণই না দেখাচ্ছে বাবাকে!
‘বাবা, প্লিজ মন খারাপ করো না, শেষে আমি কিন্তু কেঁদে ফেলব।’

নঈম সাহেব বিচিত্র উপায়ে নিমিষেই মুখ হাসি-হাসি করে ফেললেন। এখন কেউ দেখলে ভাববে এতোক্ষণ খুব হাসির কথা হচ্ছিল। যেন হাসির দমকে ওঁর চোখ খানিকটা ভিজে গেছে। বাবার নিয়ন্ত্রণ দেখে কল্লোল মুগ্ধ হল।
‘হ্যাঁ রে, কল্লোল, তোর পড়াশোনা, ইউনিভার্র্সিটির কথা বল।’
‘কি বলব, বলো। ভার্সিটি বছরে তিনশো পয়ষট্রি দিনে তিনশো দিন বন্ধ থাকে। চোখের সামনে মেধাবী ছেলেগুলো লাশ হয়ে যায়। কেউ কেউ কী নিষ্ঠুর ভঙ্গিতেই না বলে, আজ কটা কলাগাছ পড়ল? ওয়াল্লা, একটাও পড়ে নাই! ধুর, ছেলেগুলো সব একেকটা ভেবাগঙ্গারাম। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে ফার্নিচারের মতো। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী নিহত ছাত্রের পরিবার-পরিজনকে ধরে কাঁদার মতো একটা ভাব করেন। ওই ছবি পরদিন দেশের প্রায় সমসত পত্রিকায় বিশাল আকারে ছাপা হয়। থু, এসবের কোনো মানে হয়, বাবা।’
নঈম সাহেব কাতর গলায় বললেন, ‘তোকে নিয়ে বড়ো ভয় রে, কল্লোল।’
কল্লোল হেলাফেলা ভাবে হাসল, ‘ফুঃ, গুলি লেগে লাশ হয়ে যাই কী না এ জন্যে?’
‘এভাবে বলিস না। আমি আর কয় দিন, বল। আমার পর মৌ, তোর মাকে তুইই তো দেখবি।’
‘বাবা, মার জন্যে তোমার এতো ভাবনা!’
‘বলিস কী পাগল, ত্রিশ বছর এক সঙ্গে ঘর করলাম! এ দীর্ঘ সময় কাঠের সঙ্গে থাকলেও তো মায়া পড়ে যায়, ও তো একটা মানুষ।’
কল্লোল এঁটো থালা একপাশে সরিয়ে বলল, ‘বাবা, হাত ধুয়েনি?’
‘না।’
‘তুমি খাও না ধীরেসুস্থে। এমনিতেও তোমার ভালো করে চিবিয়ে খাওয়া উচিত। আমি হাত ধুয়েনি?’
‘অনুমতি দিলাম না। আচ্ছা যা, ধুয়ে নে। আর শোন, বেসিনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিবি না খবরদার, টান মেরে কান ছিঁড়ে ফেলব।’

বাবার খাওয়া হয়ে গেলে কল্লোল এঁটো বাসন রান্না ঘরে জড়ো করে একে একে সব ধুয়ে ফেলল। বাবা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আহ, চা হলে মন্দ হত না।’
কল্লোল লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘বাবা, আমি বানাব?’
‘তুই বানাবি কী রে, চা করতে পারিস?’
‘চেষ্টা করে দেখতে পারি, তুমি খেতে পারবে কী না বুঝতে পারছি না।’
বাবা কী শিশুর মতোই না হাত পা ছুঁড়ছেন! এ মুহূর্তে দেখে মনে হচ্ছে ওঁর চেয়ে সুখী কেউ আর এ পৃথিবীতে নেই। অতি তুচ্ছ ব্যাপারগুলো এ মানুষটাকে কী প্রভাবিতই না করে!
‘আরে ছোকরা বলে কী! কর, চা কর।’

চা নামের যে জিনিসটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল, এর নমুনা দেখে কল্লোল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আনেকটা পাতলা সিরাপের মতো। রং টা অবশ্য ঠিক ধরতে পারছে না। এমন রং আগে কখনও দেখেছে? কই, মনে পড়ছে না তো। বাবার সামনে চা’র কাপটা রেখে ভাবছিল চট করে সরিয়ে ফেলব কী না। বাবা সেই সময়টুকু দিলেন না। লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আহ, অসাধারণ।’
কল্লোল নিজের কাপে ভয়ে ভয়ে চুমুক দিল। নিমিষেই মুখে প্রচুর ভাংচুর হল, কপালে ভাঁজ পড়ল, মুখ কুঁচকে গেল, ‘অসাধারণ! চা না, বাবা, তোমার অভিনয়। এ দেশে পড়ে আছ কী মনে করে- হলিউড চলে যাও, ওরা তোমায় লুফে নেবে।’
নঈম সাহেব হা হা করে হাসলেন, ‘তুই কী কম অভিনেতা। ওদিন ওই নষ্ট ডাল খেয়ে তোর পেট নেমে গেল। সবার চোখ বাঁচিয়ে টয়লেটে ছুটাছুটি করছিস। একবার আমার সামনে পড়ে গেলি। হড়বড় করে বললি: কী কান্ড দেখো, বাবা, তোমার ডায়বেটিস আমাকে ধরে ফেলেছে। একটু পর পর যেতে হচ্ছে।
কল্লোল খসখস করে গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘যা-ও বাবা।’
বাবা চোখ সরু করে ওর ক’দিনের না-কামানো দাড়ি লক্ষ করছেন দেখে কল্লোল তাড়াহুড়া করে বলল, ‘বাবা, আমি তোমাকে হাজার দশেক টাকা দিতে পারি।’
‘এত টাকা কোথায় পেলি?’
‘যেখান থেকেই পাই, ছিনতাই করি নি।’
‘তা না, কিন্তু এত টাকা!’
‘আঃ বাবা, সব জানা চাই। জামির কাছ থেকে, হল তো?’
‘ছি, তুই চেয়েছিলি?’
‘উহুঁ, কোথেকে আমার একাউন্ট নাম্বার জোগাড় করে জমা দিয়েছে। আগে জানতাম না। আজ জানলাম।’
‘বলিস কী!’
‘হুঁ, তাই। পরে সময় করে ওকে ফেরত দেব।’
নঈম সাহেব বিড়বিড় করতে লাগলেন ‘আশ্চর্য, কী আশ্চর্য!’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তবু কল্লোল, বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নেয়া ঠিক না। তুই টাকা ফিরিয়ে দে।’
কল্লোল একটু উষ্ণ হয়ে বলল, ‘তোমরা বুড়োরা আসলে জীবনটাকে বড় জটিল করে ফেলো। এবং তোমাদের মতো আমাদেরকেও ভাবতে বাধ্য করো। দুঃসময়ে বন্ধু পাশে এসে না দাঁড়ালে, বন্ধু আর রাজনৈতিক নেতার মধ্যে পার্থক্য কী?’ এবার ধীর গলায় বলল, ‘তাছাড়া বাবা, এ টাকা এক্ষুনি ফেরত দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এটা করলেই ও যে কী অনর্থ করবে ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কাল তোমাকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দেব।’
‘টাকা দিয়ে আমি কী করবো, তুই রেখে দে।’
‘না বাবা। তোমার ভালো কোনো জামা-কাপড় নেই, হররোজ একই কাপড় পরে দোকানে যাও। মা’রও ভালো কোনো শাড়ি নেই। মৌকেও কিছু কিনে দিয়ো।’

নঈম সাহেব মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন। মগবাজারে কনফেকশনারীর দোকান ভালোই চলছিল। হুট করে কী যে হল, বাজারে প্রচুর ধার-দেনা হয়ে গেল। একের পর এক শখের জিনিস গুলো বিক্রি করলেন। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে কালার টিভি, ভিডিও বাঁধাছাঁদা করছিলেন। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। অসম্ভব লজ্জাও হচ্ছিল। এসব তুচ্ছ জিনিসের এত মায়া!
কল্লোল ওঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল: ভালোই হল, বাবা, পরের বার আমরা লেটেষ্টটা দেখে কিনব।
মৌ ঠোঁট উল্টে তার ভাইকে কটাক্ষ করে বলেছিল: ভাইয়া রাত-দিন ছবি দেখে বলে আমি পড়তে পারতাম না। এখন কী মজা-আরাম করে পড়ব। আমি বড়ো ডিস্টার্ব হইতাম।

নঈম সাহেবের বড় বোন কার কাছে যেন খবর পেয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছিলেন। এই অসম্ভব মমতাময়ী ছোটখাটো মহিলাটি ওঁর হাত চেপে ধরেছিলেন। আর্দ্র গলায় বলেছিলেন: তোর শখের জিনিস বিক্রি করতে হবে না। আমি তো এখনও মারা যাই নাই। কত টাকা দরকার আমাকে বল, আমি দেব।
নঈম সাহেব আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন কেঁদে না ফেলতে। গাল-টাল ভাসিয়ে বলেছিলেন: তা হয় না, আপা।
কেন হয় না, আমি কী তোর কেউ না।
প্লিজ, তুমি অনুরোধ করো না। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। অন্যকিছু শুনব না।
বড় আপা আহত চোখে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর অজানা নেই- ছোট ভাইটা পাগলা ধরনের, খুব একরোখা। একবার না বললে হ্যাঁ করানো যাবে না। অস্ফুটস্বরে শুধু বলেছিলেন: তোর আসলে কার উপর রাগ আমি জানি।
নঈম সাহেব ব্যাপারটা এড়াতে চাইছিলেন বলেই উত্তর দিলেন না।

চমক ভাঙ্গল কল্লোলের কথায়, ‘বাবা একটা বাজে, ঘুমুবে না?’
‘আচ্ছা কল্লোল, জামি তোর কী রকম বন্ধু?’
‘হঠাৎ এ কথা!’
‘এমনি জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘অল্প কথায় বোঝানো অসম্ভব, বাবা। আমি ওকে ভালো বুঝতে পারি না। অনেকের সঙ্গে ওর আচরণ দেখে ইচ্ছে করবে খুন করে ফেলতে অথচ আমি যদি বলি: জামি, চোখ বুজে এখান থেকে লাফিয়ে পড়, ও লাফিয়ে পড়বে। আমি ঠিক তোমাকে বোঝাতে পারলাম না।’
‘হুম-ম, এই তাহলে কাহিনী!’
‘তুমি শোবে না?’
‘এই সিগারেটটা শেষ করে যাচ্ছি।’
‘বাবা, আজকাল খুব সিগারেট খাচ্ছ।’
‘সিগারেট তোরও খুব কম লাগে না, আই বেট। যা, ঘুমুতে যা। আর শোন, নো নাক ডাকাডাকি...।’