Sunday, October 17, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৮

কাঁটায় কাঁটায় ন-টা। রাব্বি নিজের চেয়ারে ভাল করে বসতেও পারেনি। হেড অফিসের লোকজন ঝড়ের গতিতে রাব্বির রুমে ঢুকে পড়ল। তখনও রাব্বি বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! এরা নিমিষেই তার অফিস-রুমটা তছনছ করে ফেলল। এরা যখন ওর ড্রয়ারের চাবি চাইল সে হাসি মুখে এগিয়ে দিল।
ওর ড্রয়ার থেকে যখন বিপুল অংকের টাকা উদ্ধার হলো ও শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তখনও মুখের হাসি পুরোটা মিলিয়ে যায়নি! ওর ড্রয়ারে এতো টাকা থাকবে কেন? ড্রয়ারে তো কখনও টাকাপয়সা রাখে না, খুচরো পয়সাও না। ওর এই অভ্যাসটাই নাই। যা থাকে ওর ওয়ালেটে। এর মানে কী!

হেড-অফিসের লোকজনরা একেকটা টাকা গুনে দেখল, নাম্বার লিখল। একের পর এক নাম্বার বসিয়ে ফর্দ তৈরি করল। সঙ্গে নিয়ে আসা পূর্বের একটা শিটের নাম্বারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল। রাব্বিকে সই করতে বলল। রাব্বি যন্ত্রের মত সই করল।
চীফ হিসাবে সৈয়দ সাহেবও সই করলেন। রাব্বি চেয়ে চেয়ে দেখল। এই বিপুল আয়োজনে ওর করার কিছুই ছিল না কেবল যন্ত্রের মত তাকিয়ে থাকা ব্যতীত। কেউ তাকে কোন প্রশ্ন করল না, কোন ব্যাখ্যা দাবি করল না।
১ ঘন্টা পর হেড অফিসে একবার কেবল ওকে ডাকিয়ে নিয়ে টার্মিনেশন লেটারটা ধরিয়ে দেয়া হলো। রিসিভ কপিতে ওর সই রাখা হলো।
রাব্বি অবিশ্বাসের চোখে টার্মিনেশন লেটারটার দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা ইস্যু করা হয়েছে হেড অফিস থেকেই, অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে। হায় খোদা, মাত্র ১ ঘন্টাও হয়নি, কখন এরা বসল, কখন সিদ্ধান্ত নিল! এর মানেটা কি দাঁড়াল, সিদ্ধান্তটা কি আগেই নেয়া, এটা কি আগেই টাইপ করে রাখা হয়েছিল? তাই হবে। নইলে এতো দ্রুত সব কিছু গুছিয়ে আনা সম্ভব না। কিন্তু।


সমস্তটা দিন অফিসে ঝিম মেরে বসে রইল। কারও সাথে কোন কথা বলল না। অফিসেরও কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে আসল না। গোটা অফিস চাউর হয়ে গেছে, রাব্বির কাছ থেকে বিপুল টাকা উদ্ধার করা হয়েছে এবং কঠিন প্রমাণ পাওয়া গেছে, সে একজনকে দেয়া অন্যায় সুবিধার বিনিময়ে এই টাকাটা অবৈধভাবে নিয়েছে। ওর ল্যাপটপেও আপত্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে, অকাট্য প্রমাণ।
রাব্বির দমবন্ধ হয়ে আসছে। চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। এরা সব কেমন করে অবলীলায় বিশ্বাস করে বসল ও এমনটা করতে পারে! পৃথিবীর ভয়ংকর অপরাধিকেও তার বক্তব্য বলার সুযোগ দেয়া হয়। এরা কেন এমন অমানুষের মত আচরণ করছে। বছরের পর বছর ধরে যাদের সংগে চাকুরি করেছে তাদের কাছ থেকে একটা ফোন কলও পাওয়ার যোগ্যতা ও হারিয়েছে। হা ঈশ্বর, মানুষ এতোটা নিষ্ঠুর হয় কেমন করেন!


কেবল মুনিম ভয়ে ভয়ে একটু পরপর উঁকি দিয়েছে। একবার অনেক সাহস করে বলেছে: স্যার একটু চা দেই।
চা খেতে রাব্বির কোন ইচ্ছাই ছিল না কিন্তু মুনিমের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য মাথা নাড়ল। এই প্রথম মুনিমের চা বিস্বাদ লাগল। এক ঢোক খেয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। আজকের চাটা কেমন বিস্বাদ লাগছে! রাব্বি একের পর এক সিগারেট টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলেছে। দুপুরে খেতেও গেল না।
আবারও মুনিমের যন্ত্রণা। রাব্বি কিচ্ছু বলেনি অথচ গাধাটা প্যাকেট লাঞ্চ রেখে গেছে। প্যাকেটের জায়গায় প্যাকেট পড়ে রইল। ও ছুঁয়েও দেখল না। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি সব গুলিয়ে গেছে। নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তালামারা ড্রয়ারে টাকা আসবে কোত্থেকে, তাও বিরাট অংকের টাকা? চাবি অবশ্য যে কেউ হাতিয়ে নিতে পারে। কিন্তু ল্যাপটপের ওই আপত্তিকর ফাইল, তথ্য কেমন করে আসল? ওদের প্রত্যেকের নিজস্ব পাসওয়ার্ড আছে। তাহলে?


এইবার রাব্বি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারল না। মুনিম কেবল উঁকি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি। ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
আহ, কেন তুমি বারবার বিরক্ত করছ!
স্যার, একটু কথা আছিল।
এখন কোন কথা বলতে ইচ্ছা করছে না, তুমি যাও এখান থেকে।
স্যার, আপনারে চাকরি থিক্যা বাইর কইরা দিব এইটা আপনি এখন জানলেন! আমরা সকালেই জাইনা গেছি। সৈয়দ স্যার এইটা নিয়া কার সঙ্গে জানি ফোনে কথা বলতাছিল।
সৈয়দ সাহেব তাহলে এর পেছনে আছেন?
জ্বী স্যার।
রাব্বির কথা বলতে ভাল লাগছে না। মুনিম বিদায় হলে ও বাঁচে। এটা ও খানিকটা আঁচ করতে পারছিল কিন্তু মেলাতে পারছে না।
মুনিম ফিসফিস করে কী যেন বলল। রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, কি বলছ!
মুনিম গলা আরও নামিয়ে বলল, স্যার, শামসির স্যারও এর সঙ্গে আছেন।
রাব্বি চেঁচিয়ে বলল, ক্কি, কি বললা তুমি। ফাজলামি করো, থাপ্পড় দিয়া দাঁতসব ফালায়া দেব। ফাজিল কোথাকার!
স্যার, মিথ্যা বললে আপনের জুতা দিয়া পিটাইয়েন। আমার বাচ্চার কসম, আমি মিথ্যা বলতাছি না।
মুনিম, তুমি জানো, তুমি কী বলছ!
জাইনাই বলতাছি, স্যার।
আহ-।
স্যার, কাইল আপনে বিকালের আগেই বাইর হয়া গেছিলেন। আমি ভাবলাম আপনে রুমে আছেন। চা নিয়ে ঢুকলাম। দেখি, শামসির স্যার আপনার চেয়ারে বসা, আপনার ড্রয়ারে কি জানি ঘাটাঘাটি করতাছে। আমারে দেইখা চোরের মত হাত সরাইয়া ফেলল। চিক্কুর দিয়া কইল, এই স্টুপিড রুমে না জিগাইয়া ডুকলি কেন রে হারামজাদা। স্যার, আপনেই কন, অন্যদের রুমে আমি কি না জিগাইয়া ঢুকি? খালি আপনার রুমে না জিগায়া ঢুকি, আপনে কখনও কিছু মনে করেন না এই লাইগা।


রাব্বি মাথা ফেলে দিল। হে প্রভু, হে পরম করুণাময়, এটা শোনার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল ছিল। এখন সব হিসাব মিলে যাচ্ছে। তাই হবে, কেবল শামসিরের পক্ষেই সম্ভব। শামসিরই ওর পাসওয়ার্ড জানে। নিয়ম নাই কিন্তু সীমাহীন হৃদ্যতার কারণে ওরা পরস্পরের পাসওয়ার্ড সেই কবে থেকেই জানে। কেবল এই ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডই না, চাপে থাকলে একজন অন্যজনের মেইলও চেক করে। প্রয়োজনে রিপ্লাইও দেয়।
শেষ পর্যন্ত শামসির, তুই-ও!

একজন মানুষ এতো কাছ থেকে ছুঁরি মারতে পারে কেমন করে? এই পৃথিবীতে কেন বন্ধু, কেন রোদ, কেন বৃষ্টি? কেন-কেন-কেন? রাব্বি ভেবেছিল কোম্পানির এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সাধ্যমত লড়বে। কিন্তু এই ইচ্ছাটা এখন আর তিলমাত্র নাই। মনে হচ্ছে যেন হাত থেকে ব্রক্ষ্মাস্ত্র খসে  পড়েছে।

মুনিম শান্ত গলায় বলল, স্যার, দুপুরে যখন খাইতে বাইরে গেলাম। একটা ইটের আধলা নিয়া আসছি। আমার তো আর কেউ নাই। সাত বছরের একটাই মাইয়া। আপনে খালি কথা দেন এই মাইয়াডারে দেখবেন। বেশি কিছু করতে হইব না ওরে খালি তিনবেলা চাইরটা ভাত দিবেন। আর কিছু লাগব না। আমি এক্ষণ গিয়া ইটটা দিয়া এই দুই জানোয়ারের মাথা দুই ভাগ কইরা দিয়া আসি।
রাব্বির বুক থেকে জগদ্দল পাথরটা নেমে গেল। এখন মনে হচ্ছে ওর আর হারাবার কিছু নেই। বাঁধভাঙ্গা আবেগ গোপন করে বলল, পাগলামি করবে না, খবরদার। খবরদার বললাম, খবরদার। তাছাড়া আমার নিজের যে জেল হবে না এইটার কি ঠিক আছে। যাও, আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও।


রাব্বি অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পূর্বে শামসিরকে খুঁজে বের করল। তাকে সৈয়দের রুমে পাওয়া গেল। রাব্বি শামসিরের নতচোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, কেউ কেউ ক্যারিয়ারের জন্য তার মাকে অন্যের বিছানায় তুলে দেয়। তুই তাদের একজন।
শামসির টুঁ-শব্দও করল না।
রাব্বি এবার বলল, শামসির তুই একটু বাইরে যা।  সৈয়দ স্যারের সাথে একটু কথা আছে।
শামসির নড়ল না।
রাব্বি এবার কাতর গলায় সৈয়দকে বলল, বস, আপনার সঙ্গে দুইটা কথা বলে চলে যাব। প্লিজ, শামসিরকে বলুন একটু আমাদের একা ছেড়ে দিতে। আমার ভুলের জন্য আপনার মনে যে কষ্ট হয়েছে এর জন্য আমি একটু কথা বলতে চাই।
শামসির তবু্‌ও অনড়।
সৈয়দ বললেন, সমস্যা তো নাই, বলুন না কি বলবেন?
রাব্বি গলায় তীব্র কাতরতা ফুটিয়ে বলল, প্লিজ, বস, এই একটা ফেভার করুন। লাস্ট ফেভার।
এইবার সৈয়দ মৃদু গলায় বললেন, শামসির, আপনি একটু পরে আসুন।
শামসির তীব্র অনিচ্ছায় কিছু না বলে বেরিয়ে গেলে, রাব্বি দরোজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। এবার মুখ খুলল, একেকটা শব্দ আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করছে, এরিমধ্যে কেবল একবার নীচু হয়ে সোজা হলো, আর সৈয়দ-। বস- শুয়োরের বাচ্চা, অনেক ভয় দেখিয়েছিস। জানিস না, একজন মানুষকে এতোটা ভয় দেখাতে নাই যেন তার ভয় কেটে যায়। কুত্তার বাচ্চা, তুই পশুরও অধম, পশুর জন্যে জঙ্গলের আইন, কেবল জঙ্গলের আইন। তুই না খুব গর্ব করে বলতি তোর গায়ে হাত দিতে পারে এমন কোন মানুষ আজ পর্যন্ত জন্ম নেয়নি, বলতি না? এই নে, এটা আমার পক্ষ থেকে তোর জন্য ছোট্ট উপহার-। যত দিন বেঁচে থাকবি এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবি।

সৈয়দ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, এটা কি করলেন আ-আপনি! আপনি সিক নাকি!
রাব্বি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, সিক আমি না, তুই, তুই মাদারচোদ। ড্রাইভারের খাবার নিজের বলে বাড়িতে নিয়ে যাস আবার ডাক্তারি কপচাচ্ছিস।
রাব্বি লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে পড়ল। পেছনে পড়ে রইল ভাঙ্গাচোরা একজন মানুষ।

No comments: