Tuesday, February 16, 2010

পরাবাস্তববাদ বনাম বাস্তববাদ!


আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যখন দেখি, কোন একজন প্রকাশক জাঁক করে বলছেন, 'এই দেশে ভালো পান্ডুলিপির বড়ো অভাব'।

তখন আমার ইচ্ছা করে পায়ের চটি খুলে একে আচ্ছা করে পিটাই। আফসোস, নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই কর্ম সম্পাদনের উপায় এখনও চালু হয়নি। তাই বলে আমার দুর্দান্ত ক্রোধের কী হবে? টিস্যুতে থুথু ফেলে গোল করে বল পাকিয়ে টিভি পর্দায় ছুঁড়ে দেয়া ব্যতীত উপায় কী! ক্রোধ এবং টিভি দুইয়ের-ই একটা গতি হলো।

রফিকুল আলম। মানুষটা একজন ডক্টর। ফাইন আর্টস তাঁর বিষয়, সঙ্গীতেও। মানুষটার প্রতি এটাই আমার মুগ্ধতার কারণ না।
আমি এমন অনেক ডক্টরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যাদেরকে আমার ভাষায় বলি, 'পাইপ মানুষ'। এরা পৃথিবীতে এসেছেন একটা পাইপ হয়ে, যার শুরুটা খাদ্য গ্রহন দিয়ে শেষাংশটা খাদ্যের অবশিষ্টাংশ বের করে দেয়ার জন্য। এরা বিশেষ একটা বিষয়ে কোন রকম এই ডিগ্রিটা যোগাড় করেন এরপর আর কোন কাজ নাই। হর্স মাউথ- কেবল বকে যাওয়া, জানার আর প্রয়োজন নাই।

কিন্তু ড. রফিকুল আলম নামের মানুষটার অগাধ পান্ডিত্য, সরলতা, বিনয় আমাকে চমকে দেয়! সবচেয়ে বেশি যেটা আমাকে আকৃষ্ট করে সেটা হচ্ছে তাঁর সততা। এই দেশে এখন সৎ মানুষের বড়ো অভাব। যেটা আমি আমার ভাষায় বলি, "একজন ভালো ম্যানেজার, ভালো শিল্পী, ভালো সাহিত্যিক মানেই একজন ভালো মানুষ না"।

ফাইন আর্টসের উপর তাঁর গবেষণামুলক প্রচুর প্রকাশনা আছে, দেশে বিদেশে। সম্প্রতী তিনি লিখেছেন, আমাদের মত সাধারণদের বোঝার উপযোগী করে অন্য ঘরানার একটা লেখা। সুরিয়ালিজম নামের অসাধারণ একটা লেখা। এটা এবারের বইমেলায় প্রকাশ হয়নি। যে প্রকাশক ছাপাবেন তিনি কলকাতা থেকে ফিরলে হয়তো ছাপা হবে। এখানেই আমার আপত্তি। কেন এটা বইমেলায় যাবে না, কেন?
তাহলে এই বইমেলা কাদের জন্য? কারা কারা লিখছেন, কাদের কাদের বই এখানে বের হচ্ছে, কেমন কেমন করে ছাপা হচ্ছে? এই বইমেলা নামের মেলাটা চলে গেছে কতিপয় নির্লজ্জ, অমর্যাদাসম্পন্ন মানুষের হাতে। এরা কেবল লেখাই ফেরি করেন না, ফেরি করেন এমন ভঙ্গিতে যেটা করতে একজন কমার্শিয়াল সেক্স ভলান্টিয়ারও রাজি হবেন না, আই বেট।

একটা উদাহরণ দেই, প্রথম আলোতে ১৪ ফেব্রুয়ারী ছাপা হয়েছে শাহাদত সোহাগ নামের একজন লেখকের বিজ্ঞাপন। এটায় আবার ঘটা করে লেখা, "পরিবর্তন হোক লেখালেখিতেও।" বটে রে, ইনি লেখালেখিতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে চাইছেন।
তো, এই ভদ্দরনোক একই সঙ্গে ৩টি বই প্রসব করেছেন। তা করুন, প্রসব বেদনা তার, আমার কী!
মূল ঘটনায় আসি, বিজ্ঞাপনে লেখা "বই ৩টির দ্বিতীয় মুদণ চলছে।" মুদণ কি জিনিস আমি বুঝি নাই। হয়তো আধুনিক বাংলা! হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন মুদ্রণ। বেশ-বেশ। এই বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে ১৪ তারিখ। মানে ম্যাটারটা বা বিজ্ঞাপনটা দেয়া হয়েছে ১৩ তারিখ। প্রথম আলোর নিয়মানুযায়ী ২দিন পূর্বে বিজ্ঞাপন জমা দিতে হয়। তাহলে ১১ তারিখে জানা গেল, প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ। বাহ, কী সোন্দর!
মাত্র ১১ দিনে এই লেখকের ৩টি বইয়েরই প্রথম মুদ্রণ শেষ। বাপু রে, একই সঙ্গে যেমন ৩টা বাচ্চা যেমন প্রসব করা যায় না তেমনি ৩টা বইও শেষ হয়ে যায় না। এইসব লেখকদের জরায়ুর জন্য আমার প্রার্থনা করা ব্যতীত আর কীই বা করার আছে!

ড. রফিকুল আলম যখন আমার বইটা উল্টেপাল্টে দেখছিলেন, নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছিল। কেবল মনে হচ্ছিল, কি লিখি আমি, কি অধিকার আছে আমার এইসব ছাইপাশ লেখার?

রফিকুল আলমের সুরিয়ালিজম, এই অসাধারণ ম্যাটারটার জন্য প্রকাশকদের প্রকাশের জন্য যেখানে প্রতিযোগীতা করা প্রয়োজন ছিল সেখানে ব্যাটারা লম্বা লম্বা বাতচিত করেন, দেশে ভালো স্ক্রিপ্ট কুতায়(!)? বটে রে, এই দেশের ক-জন প্রকাশক স্ক্রিপ্ট পড়ে দেখেন? এক প্রকাশক তো বাংলা একাডেমী কোথায় বলে আমাকে প্রচুর ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলেন! আফসোস, এই দেশে সমস্ত সু বা ভালো পরখ করে রায় দেন অপদার্থরা! কতিপয় প্রকাশক নামের আকাটমূর্খ নির্ধারণ করেন কে লেখক, কে লেখক নন।

একজন পাঠক হিসাবে আমি সুরিয়ালিজম বইটা আগ্রহের সঙ্গে পড়তে চাইতাম। কারণ বাংলায় এইসব বিষয় নিয়ে খুব কমই লেখা হয়েছে। সুরিয়ালিজম-এর ব্যাখ্যা দেবেন এই বিষয়ে অগাধ জ্ঞান যাদের, তাঁরা। আমি আমার অল্প জ্ঞানে, মোটাদাগে যেটা বুঝি, "সুরিয়ালিজম হচ্ছে, একটা অদেখা স্বপ্ন। যে স্বপ্ন সবাই দেখতে পায় না, কেউ কেউ দেখে। চট করে এই ছাড়া-ছাড়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা চলে না। আপতত দৃষ্টিতে সেই স্বপ্নটা কয়েক মুহূর্তের কিন্তু ব্যাপ্তি রাতভর।"

তাঁর সুরিয়ালিজম বইটা বের হয়নি তাতে কী, আমি সাথে করে পান্ডুলিপিটা নিয়ে এসেছি। চিত্রকলাই বুঝি না তা আবার সুরিয়ালিজম! পড়ে কতটুকু বুঝলাম সেই পান্ডিত্য এখানে ফলাই না কিন্তু ইতিমধ্যে একটা অভাবনীয় কান্ড ঘটে গেছে। যে হাত কখনও তুলি ছুঁয়ে দেখেনি সেই হাতে তুলি উঠে এসেছে। যারা আমার লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত তারা
হয়তো জানেন, কাঠপেন্সিলের সঙ্গে আমার খানিকটা সখ্যতা আছে। কাঠপেন্সিল নিয়ে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করি। 'ডুডল' নামের অজান্তেই আঁকাআঁকি নামের কিছু জিনিস চাল করে আমি আমার লেখার মধ্যে ঢুকিয়ে দেই। গালভরা স্কেচ নামের এই জিনিসগুলো অনেকের বিরক্তি উৎপাদন করলেও আমি নির্বিকার থাকি।

কিন্তু তুলির সঙ্গে আমি কখনও খেলার চেষ্টা করিনি কারণ আমি তুলি দিয়ে একটা সোজা লাইনও আঁকতে পারব এই ভাবনাটাই আমার ছিল না। কিন্তু সুরিয়ালিজম বইটা পড়ে, মানুষটার সঙ্গে কথা বলে আমার হাতে কেমন কেমন করে চারকোল, তুলি উঠে এলো আমি জানি না।
এই মানুষটা অসাধারণ এই একটা কাজ করেছেন আমার মতো মানুষের হাতে তুলি তুলে দিয়েছেন। একজন শিল্পী-সাহিত্যিকের কাজই সম্ভবত এটা। তাঁদের স্বপ্নগুলো অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া।

এই মানুষটা আজ খানিকটা অসুস্থ। চলাফেরায় তাঁর বেশ খানিকটা সমস্যা হয়। আমি বিশ্বাস করি, আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, এই মানুষটা সহসাই নিজের পায়ে দাঁড়াবেন, দৌড়াতে শুরু করবেন। দাঁড়াতে তাঁকে হবেই, তিনি হাল ছেড়ে দিতে চাইলেও দেশমা তাঁকে ছাড়বে না। এই দেশে তাঁর মতো মানুষের খুব প্রয়োজন।
আমাদের দেশে স্বপ্নবাজের যে বড়ো অভাব।

আঁদ্রে ব্রেঁত, সায়মন ব্রেঁত, পল ইলুয়া, পিয়ের নাভিল, হানস আর্প, জোয়ান মিরো- এঁরা থাকুন না এঁদের মত করে, এঁদের ঘাটাচ্ছে কে?
আমার মত অতি সাধারণের চারকোল দিয়ে ঘসাঘসির যে মজা, জল-রঙে একটার পর একটা রঙ মেশাতে যে আনন্দ তা অন্যত্র কোথায়? কে বলেছে, আমার মতো অগাবগা-অ্যামেচারের টোন, টেক্সচার, রিদম, লাইন এই সব ঠিক না থাকলে মাথা কাটা যাবে! রিপিটেশন, ভেরিয়েশন, কন্ট্রাস্ট, ইউনিটি, ব্যালান্স না হলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হবে!
------------------

আগাম সতর্কীকরণ: লেখা শেষ। পরবর্তী অংশে শিল্প বোদ্ধাদের প্রবেশ নিষেধ।

এখানে আমার কিছু অপকর্ম দেব। লেখালেখি বা আমার সমস্ত অপকর্ম আমার কাছে সন্তানতুল্য। কার কার দেবশিশুর মত সন্তান আছে তাতে আমার কী, আমি আমি সন্তান নিয়েই সুখী! আমি তো আমার কালো-কালো, লিকলিকে, দুবলা সন্তানকে ফেলে দিতে পারি না।


নারী (মাধ্যম: চারকোল)




ত্রিভুজ মানুষ (মাধ্যম: জলরঙ)



গতি (মাধ্যম: জলরঙ)




মুখোমখি নারী (মাধ্যম: জলরঙ)





হয়তো মানুষ (মাধ্যম: জলরঙ)





এটা কি আমি নিজেও জানি না! (মাধ্যম: জলরঙ)

2 comments:

মুকুল said...

কথা সত্য।

ছবির চাইতে আপনার কার্টুন বেশি ভাল্লাগছে। :)

।আলী মাহমেদ। said...

:o