Wednesday, November 25, 2009

ত্যাগবাজি!

কোরবানির শিক্ষাই নাকি ত্যাগ। বেশ, এই নিয়ে তর্ক-কুতর্ক এই লেখার বিষয় না। তবে এও সত্য, শেকড়ের কাছে ফিরে আসার অসাধারণ এক সুযোগ করে দেয় এই উপলক্ষ।

আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগের কোরবানিপর্ব আর আজকের মধ্যে অনেক ফারাক। অনেকের কাছে কোরবানি এখন হয়ে গেছে সামাজিক মর্যাদার এক কঠিন হাতিয়ার! কার গরুর উচ্চতা কার গরুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ন্যায়-অন্যায় প্রশ্নে যাই না, টাকা কী গৌরি সেন দেবে নাকি ফকির চান সেই প্রশ্নও এখন অবান্তর। 

দুই ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশে উঁচু স্কেলে '­দু-লম্বরি বেড়ে যায় এটা গজ-ফিতা নিয়ে কে মাপতে যাবে! ওই প্রসঙ্গে গিয়ে লাভ নাই কারণ যে মানুষগুলোকে দেখি ১৫/২০ হাজার টাকার গরু হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে তাদের অনেকের চুলায় আরামসে বেড়াল ঘুমায়।

সার্জেন্ট সাহেব কেনেন ৮৫ হাজার টাকার গরু! টাকা যোগায় ভূত! এমনিতে চোখে পড়ে না এদের হাত গলে একটা আধুলি ভাল কাজে গড়িয়ে যেতে! অথচ কোরবানির বেলায় দেখি একেকজন দাতা হাতেম তাই হয়ে যান। 
­কোরবানির পূর্বেই ডীপ-ফ্রীজ কেনা, বিয়ে-মুসলমানির অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা কী এই তর্কই বা কে করে!

ফ্রীজ কোম্পানিগুলো মিডিয়ায় এমন ফ্রীজেরই বিজ্ঞাপন দেয়, ওই ফ্রীজে ইয়া ধামড়া আস্ত গরু অনায়াসে এঁটে যাবে কোন জংলির মাথা থেকে এমন আইডিয়া বের হয় কে জানে! এ বছর নতুন মাত্র যোগ হয়েছে, এক কোম্পানি কসাই সাপ্লাই দিচ্ছে- মূল শ্লোগান, 'কোপা সামসু'। কী অসভ্য ভাবনা- এইসব মানুষদের চাবুক দিয়ে চাবকানো প্রয়োজন!

চোখ দিয়ে খাওয়ার নিয়ম নাই নইলে এই সময়ে একটা গরু-ছাগলও আস্ত হেঁটে যেতে পারত না। পড়ে থাকত কেবল ক-খানা হাড়! এ সময় আসলে আমাদের গ্রে-মেটার হয়ে যায় 'গোশতমেটার'! খেয়াল করে কিন্তু গোশত বলতে হবে, মাংস বলার নিয়ম নাই (মাংস নাকি মায়ের অংশ)!
আহা, প্রিয় জিনিস উত্সর্গ করতে হবে। তাই সব ধকল সামলাতে হয় বেচারা বিশেষ কিছু পশুদের। হুম, প্রিয়! বাজার থেকে কাল কিনে এনে আজই জবাই। গরুর কটা দাঁত এটাই জানি না অথচ এদের জন্য নাকি আমাদের অনেক কান্না! ইশ-শ, ভাবতেই চোখে জল না এসে পানি চলে আসে!

ভাল কথা, অস্ট্রেলিয়া সাড়ে ৬ লক্ষ উট মেরে ফেলার বুদ্ধি করছে, আমাদের স্যাররা এগিয়ে গিয়ে বললেন না কেন। আমরা নিজ খরচে আপনাদের পোর্ট থেকে নিয়ে যাব, আপনারা উট বিনে পয়সায় আমাদের দিন। কোরবানির সময় সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে বিক্রি করে দিলেই হতো। অস্ট্রেলিয়া দিত কি দিত না সেটা পরের কথা অন্তত বহিবিশ্বে বাংলাদেশের নামটা ইতিবাচক ভঙ্গিতে চলে আসত। আহারে, 'খোদা না খাস্তা' অস্ট্রেলিয়া রাজি হয়ে গেলে গরু বেচারারা এক বছরের জন্য শ্বাস ফেলে জাবর কাটার সুযোগ পেত।­

প্রকাশ্যে জবাই না করলে আমাদের যে আবার মান থাকে না, লুকজনদের(!) দেখাতে হবে না কত্তো বড় গরু-উট আর যে আমরা কত্তো বড় ত্যাগি! শিশুদের 'সাহসি-সাহসবাজী' করতেও চেষ্টার শেষ নেই!
অনেক মুসলিম দেশে প্রকাশ্যে জবাই করলে বাংলাদেশের টাকায় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং জেল। আর আমাদের সমস্ত কাটাকাটির কাজই রাস্তায়!

জানি-জানি, এটা পড়ে হাসতে হাসতে অনেকের চোখে জল (দু:খিত জলের জায়গায় পানি পড়বেন) চলে এসেছে, মিয়া লম্বা লম্বা বাতচিত করো, ওই দেশের লোকসংখ্যা কত আর আমাদের দেশে...ইত্যাদি।
বেশ-বেশ, কিন্তু আমাদের মিডিয়ায়, টিভিতে যখন প্রকাশ্যে জবাই, বর্জ্য, চামড়া খুলে ফেলা এইসব দেখানো হয় এটাও কী অধিক জনসংখ্যার ফল? যে দেশে জনসংখ্যা বেশি থাকে ওই দেশের লোকজনের মস্তিষ্ক এবং রেকটাম কী একাকার হয়ে যায়, নাকি? ধর্মের দোহাই দিয়ে ছোট-ছোট শিশুদের জবাইপর্ব দেখতে বাধ্য করা হয়। কী আশ্চর্য, এই বয়সে নামাজের তাগিদের আসমানি নির্দেশ নাই অথচ এই কাজটা করাতে আমরা বড়ো ব্যস্ত হয়ে পড়ি! অনেক ফরয কাজের পাত্তা নেই কিন্তু ওয়াজেব নিয়ে আমাদের বিপুল উৎসাহ।

যে শিশুটি এক ফোঁটা রক্ত দেখলে মুর্ছা যেত সে বিমলানন্দে উপভোগ করে গলগল করে বয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। এরা আগামিতে চলমান একেকজন যোদ্ধা হবে না তো কে হবে? আমাদের দেশের মনোবিদদের তেমন চল নাই, চালও নাই। কার এতো দায় পড়েছে এই অবোধ শিশুদের মস্তিষ্কে জমে উঠা বিষবৃক্ষের বীজগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখার।

আমাদের দেশে টাকা আসলে সমস্যা না, এর অনেক উপায় করা যায়। মাথাপিছু জাতীয় ঋণ আমাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া যায়। আচ্ছা, আমাদেরকে যদি এমন অপশন দেয়া হয় কোনো এক বছর কোরবানি না-দিয়ে ওই টাকায় আমরা আমাদের দেশের সমস্ত বিদেশি ঋণ শোধ করে চমত্কার একটা দেশ গড়ে তুলব। আমরা কী এই সুযোগ নেব?
কাজটা সিম্পল। যিনি যে টাকা কোরবানির জন্য নিয়ত করবেন তিনি সেই টাকা ব্যাংকে জমা দেবেন এবং তাঁকে যথাযথ রসিদ দেয়া হবে। যিনি মনে করবেন 'কোপানি এন্ড চাবানি ঈদে' পশুর গলায় ছুঁরি ঘসাঘসি না-করা পর্যন্ত ধর্ম টিকে থাকবে না তিনি তাই পালন করুন না, কেউ তাঁকে তো জোর করবে না। যার যার রাস্তা তার তার কাছে।
সমগ্র দেশের ৫ ভাগ মানুষ এই সুযোগটা নেবে কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। আহা, তাইলে আমরা যে কত্তো বড় ত্যাগি এটা প্রমাণ হবে ক্যামনে, সামাজিক-ধর্ম রসাতলে যাবে যে! 

*ছবি ঋণ: ১. http://www.grumpyoldsod.com  ২. পত্রিকার বিজ্ঞাপন

**ফেসবুকে এই লেখাটি অন্য একজন শেয়ারের  কল্যাণে (http://www.facebook.com/aurnabarc), ওখানে Nazmul Hasan Darashiko কঠিন এক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন:
"ভালো লাগে নাই - সব শেয়ালের একই রা! ঘুরে ফিরে একই কথা - দেশ বাচাতে, দশ বাচাতে আর কিছু বন্ধ করার দরকার নাই, কোরবানী বন্ধ কর - তাইলেই হবে।" 

সেখানে আমার উত্তর ছিল এই:
"ডিয়ার Nazmul Hasan Darashiko,
আপনার ভাল না-লাগা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই- এটা আপনার নিছকই ব্যক্তিগত। 

কিন্তু... সবিনয়ে বলি, আপনি যে লিখেছেন, "...দেশ বাচাতে, দশ বাচাতে আর কিছু বন্ধ করার দরকার নাই, কোরবানী বন্ধ কর - তাইলেই হবে।"
এখানে আমি আপনার সঙ্গে অ
মত পোষণ করি। কোরবানি বন্ধ করে দেয়া হোক ওই লেখায় কিন্তু এটা বলার চেষ্টা করা হয়নি। কোরবানি চালু-বন্ধ সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। যেটা আমি লেখার শুরুতেই বলেছিলাম...।
ওখানে আমি যেটা বলার চেষ্টা করেছি, সেটা হচ্ছে ভঙ্গি। উৎকট আচরণ, যেটা 'ত্যাগবাজি'-তে অনেকটা বলা হয়েছে বলে এখানে আর চর্বিতচর্বণ করি না। 

হ্যাঁ, ওখানে একটা অপশন রাখার কথা বলা হয়েছিল, তবে বলা হয়নি যে এটা চলতেই থাকবে। এবং প্রসঙ্গটা এসেছে এভাবে:
"আমাদের দেশে টাকা আসলে সমস্যা না, এর অনেক উপায় করা যায়। মাথাপিছু 'জাতীয় ঋণ' আমাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া যায়। আচ্ছা, আমাদেরকে যদি এমন অপশন দেয়া হয় কোনো এক বছর কোরবানি না-দিয়ে...তিনি তাই পালন করুন না, কেউ তাঁকে তো জোর করবে না। যার যার রাস্তা তার তার কাছে।"
কেউ চাইলে টাকাটা দেবে। কেউ না-চাইলে দেবে না, তার মত করে কোরবানি করবে। সমস্যা তো নাই।

দেশের প্রয়োজনে 'জাতীয় ঋণ'-এর মত অনেক উপায়ের মধ্যে এটাও ছিল। ওখানে 'জাতীয় ঋণ'-এর একটা হাইপার লিংকও জুড়ে দেয়া হয়েছে। ওই লেখায় আমার প্রস্তাব ছিল এমন:
যাদের চাইবেন তাঁরা মাথাপিছু জাতীয় ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন। তাঁকে 'জাতীয় ঋণমুক্ত ব্যক্তি' হিসাবে একটা সনদ ধরিয়ে দেয়া হবে। মন্দ কী!
অতি সাধারণ এক ভাবনা, সদ্যজাত শিশুর ন্যায় আমার মাথায়ও জাতীয় ঋণের খড়গ ঝুলছে। আমি কেন ঋণগ্রস্ত হয়ে মারা যাব? 

যাই হোক, এর বাইরে একটু বলি, খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নাই, আজ থেকে ১৫-২০ বছর পূর্বেও কিন্তু লোকজনেরা কোরবানি দিয়েছেন কিন্তু এখনকার মত ভাবনাগুলো এমন উৎকট ছিল না। যার যার সাধ্য অনুযায়ী কোরবানি দিতেন, কেউ না-পারলে না দিতেন। কিন্তু কোরবানি এখন সামাজিক মর্যাদার কঠিন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরুর উচ্চতা আমাদের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত যাদের হাতে টাকা-পয়সা নাই তাঁদের জন্য এই সময়টা যে কী কষ্টের এটা কেবল এঁরাই টের পান, হাড়ে হাড়ে। জনে জনে এসে জানতে চাইবে মানুষটা কোরবানি দিচ্ছে কিনা!
আপনি কী বললে বিশ্বাস করবেন, সুদে টাকা এনেও এখন লোকজনেরা কোরবানি দেন। কেন? ভাল কোনো সদুত্তর নাই। মানুষটার না-বলা কথাটা বুঝতে সমস্যা হয় না, মান থাকে না যে। 

কোরবানির সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোরবানিটাও জরুরি...। 
ভাল থাকুন।"

সহায়ক সূত্র:
১. ইদ...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
২. উট...: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_9297.html 
৩. প্রকাশ্যে জবাই...: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_1172.html 
৪. জাতীয় ঋণ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_4340.html