Sunday, November 8, 2009

এই মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়াবার জায়গা কোথায়!


এ বড়ো অভাগা দেশ, তার সেরা সন্তানদের কাউকে ধরে রাখতে পারেনি। 
কর্নেল তাহেরকে ধরে রাখতে পারেনি। হয় এদের মেরে ফেলা হয় নয়তো কলার খোসার মত ছুঁড়ে ফেলা হয়! 

যে মানুষটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে হরদম লড়ে এসেছে, বস দূরের কথা, বাপকেও ছাড়েনি। যে মানুষটা কোটি-কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করিয়েছে, কোটি টাকার ঘুষ পায়ে ঠেলেছে; মুখের একটা কথায় এই মানুষটার যুগ যুগের চাকরি চলে যায়! কী অন্যায়? প্রচলিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়নি, এই-ই অপরাধ! শত-শত ট্রেনিং এই মানুষটাকে রোবট বানাতে পারেনি। আজকাল যে রোবটের বড়ো কদর! 
অথচ এই মানুষটারই বন্ধুর মহা উপকার করে বন্ধুর গাছের কয়েকটা কাঁচা আম ঘুষ(!) পেয়ে সবগুলো দাঁত বেরিয়ে পড়ে! 

কিছু পত্রিকা যথারীতি তাদের হলুদ দাঁত দেখানো শুরু করে দিয়েছে, অন্যতম 'নয়াদিগন্ত', 'জনকন্ঠ', 'সমকাল'। এরা অসমর্থিত সূত্র উল্লেখ করে ঘটা করে যা-তা ছাপিয়েছে। একটি হত্যা চেষ্টার সঙ্গে এমন করে নামগুলো দিয়েছে মনে হচ্ছে, এরাও ওই হত্যা অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত!

'প্রথম আলো'ও হলুদ দাঁত দেখিয়েছে কিন্তু সুশীল স্টাইলে। এরা লিখেছে:
"...অনানুষ্ঠানিক সূত্রের বরাত দিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। (ওইসব পত্রিকার) প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের আটক, জরিমানা আদায়, এবং এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও আছে ...।"
বেশ-বেশ! তা প্রথম আলোর সাংবাদিক সাহেবরা কোথায়- এরা কী শপথ বাক্য পাঠ করানো নিয়ে ব্যস্ত আছেন? প্রথম আলো কবে থেকে অন্য পত্রিকার সূত্র উল্লেখ করা শুরু করল?
প্রথম আলোর চুতিয়াগিরি নিয়ে এখন আর লিখতে ভালো লাগে না, এরা ৮ নভেম্বর যে পত্রিকাখানা প্রসব করেছে, প্রসব করতে না জানি এদের কত তকলীফ হয়েছে! এই দিন প্রথম আলো নামের পত্রিকার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ পৃষ্ঠায় সবটুকুই বিজ্ঞাপন, এক লাইন খবরও নাই। চুতিয়ারা আবার চলেছে অন্যদের শপথ করাতে- দেশে এরা সবাইকে ভালো বানিয়ে ছাড়বেন, নিজেদের ব্যতীত! আমি পূর্বেও বলেছিলাম, আমাদের দেশের মিডিয়া ভালো টাকা পেলে উবু হয়ে পটিতে বসার পোজও দেবে! 

"এদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের আটক, জরিমানা আদায়, এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও আছে।"
ব্যবসায়ীদের আটক, জরিমানা আদায় এটা এরা করেছেন সুনির্দিষ্ট কমান্ড অনুযায়ী। এটার জন্য দায়ী তিনি, যিনি এই সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছেন। এটা কী ফখরুদ্দিন সাহেব, নাকি সাবেক সেনাপ্রধান সেটা খুঁজে বোর করা হোক। তাদের কাছে এটার জবাবদিহিতা চাইলেই হয়! 
বাহ রে, ওই সময় এদের কাছ থেকে যে হাজার কোটি টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে তখন দেখি পত্রিকাওয়ালাদের সবগুলো সুশীল দাঁত বেরিয়ে পড়ত। তখন দেখি আনন্দে টুঁ-শব্দও করেননি।   
"দুর্নীতির অভিযোগ"। এই বিষয়ে আমার বিস্তারিত বলার নাই। কেবল বলি, যারা এটা বলছেন তাদের শরীরে পোকা পড়ুক।
হ্যাঁ, মানুষটা বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়ে থাকলে এটা সত্য। তাঁর সহযোদ্ধাদের গরম শরীর যখন ঠান্ডা হয়ে আসছিল, তাঁর সহযোদ্ধাদের বউ, বাচ্চাদেরদের যখন চরম অপমান করা হচ্ছিল তখন মানুষটা আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করছিল, কাঁদছিল। এই শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য যদি এর শাস্তি হয় আমার বলার কিছু নাই।

এটাই এই দেশের চল- বানরের হাতে ক্ষুর থাকলে যা হয়। এখানে ইচ্ছা হলেই সরকারের কাস্টডিতে থাকা কাউকে ফট করে মেরে ফেরা যায়! এখানে আমাদের গৌরবময় অধ্যায় নিয়ে ব্যবসা হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা ঠিক ১৬ ডিসেম্বরে ফাঁসিতে ঝুলে পড়েন, তার লাশ ঘন্টার পর ঘন্টা গাছে ঝুলতে থাকে; আমরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখি। 
মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক একজন মানুষকে প্রকাশ্যে লাথি মারা হয়, তাকে ধরা দূরের কথা; এতে আমাদের কোন বিকার নাই। সেখানে একটা মানুষের চাকরি চলে যাওয়া এ আর বলার মত কী! 

এক সময় খুব অহংকার করে বলতাম, এই দেশ ছেড়ে আমি কোথাও যেতে চাই না- এ গ্রহ, গ্রহের বাইরে কোথাও না। শেষ সময় পর্যন্ত কচ্ছপের মতো মাটি কামড়ে পড়ে থাকব। কিন্তু এখন দাঁড়াবার মতো কোন স্থান নাই। আফসোস, আমি আশাবাদী হতে পারি না...।

আশাবাদী মানুষ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, এই মানুষটাকে আমি অসম্ভব পছন্দ করি। এমন স্বপ্নবাজ মানুষের এ দেশে বড়ো অভাব! কিন্তু এই মানুষটা তাঁর অজান্তেই আমাদের বড় ক্ষতি করে দিচ্ছেন। তাঁর লেখাগুলো পড়লে মনে হয় এই দেশে কোন সমস্যা নাই- চোখ থেকে তিনি রঙিন চশমাটা খোলেনই না। আশাবাদী হওয়া ভাল কিন্তু তাই বলে এতোটা! বালিতে উপুড় হয়ে থাকলেই কী প্রলয় থেমে থাকে? আমরা এই প্রজন্মের যারা এই মানুষটাকে অন্ধের মত অনুসরণ করি প্রকারান্তরে তাদের বড়ো ক্ষতি করে দিচ্ছেন। 

আজ আমার এই মাথা-ছাড়ানো স্বপ্ন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। সহ্যাতীত মনে হয়- এখন কেবল মনে হয়, এখান থেকে কোথাও পালিয়ে গেলে বাঁচি! কিন্তু পালাবো কোথায়? আমরা হরদম পালিয়ে বেড়াচ্ছি কিন্তু এটা তো কোন কাজের কাজ না! Martin Niemoller-এর কথাটা বিস্মৃত হই কেমন করে:
"...First they came for the jews. I was silent. I was not a jew. Then they came for the communists. I was silent. I was not a communist. Then they came for the trade unionists. I was silent. I was not a trade unionist. then they came for me. There was no one left to speak for me".

*মেইলে, ফোনে অনেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, পত্রিকাগুলোকে হলুদ পত্রিকা কেন বললাম?
আমি এর ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করি। কাউকে কাউকে অকালিন চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, কাউকে বরখাস্ত। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কার্যক্রম- তাঁদের সিদ্ধান্তের যথার্থতা সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু পত্রিকাগুলো একটি খুনের অপচেষ্টার খবরের সঙ্গে এমনভাবে এঁদের নাম ছাপিয়েছে; সরলদৃষ্টিতে মনে হবে, এঁরাও ওই খুনের অপচেষ্টার সঙ্গে জড়িত! এটা অন্যায়, ভয়াবহ অন্যায়! একজন মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার অসংখ্য প্রিয়মানুষ। এতে করে সেইসব প্রিয়মানুষদের কী অবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়। যে ভ্রুণটি এখনও পৃথিবীর মুখ দেখেনি, আসি-আসি করছে। তার সঙ্গেও যে অন্যায়টা করা হচ্ছে, এই অন্যায় হচ্ছে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অন্যায়- ক্ষমাহীন অন্যায়! পত্রিকাগুলো এই অন্যায়টাই করে গেছে, সবিরাম।