Search

Loading...

Monday, November 30, 2009

পেটেন্ট করানো আবশ্যক

-->
আজ সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে, এখানে পেটেন্ট করার একটা শাখা থাকলে এইসব আপাততদৃষ্টিতে উদ্ভট ব্যবসায়িক আইডিয়ার পেটেন্ট করে রাখতাম। হোক উদ্ভট কিন্তু আমার আইডিয়া আমার কাছে সন্তানসম! আহারে, এটাও ফ্লপ করল!

বোতলে করে বাতাস বিক্রি করার আইডিয়া নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল এমন উদ্ভট লেখা কেউ পড়েননি। ক্ষীণ ধারণা, ধারণাটা ভুল!

ঈদের দিন আর কাজ কী! এত এত অনুষ্ঠান, কোনটাই দেখা হয় না। এরিমধ্যে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম। 'পূর্বাচল' নামের ডেভলপার, এরা ফ্ল্যাট বিক্রি করে বিজ্ঞাপনে দেখাচ্ছে, বোতলে করে বাতাস বিক্রি করছে। পরে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে, বোতলে করে বিশুদ্ধ বাতাস কিনে নিয়ে গেলে লাভ নাই; ফ্ল্যাট বা আবাসন কিনতে হবে গাছ-গাছালি পূর্ণ 'পূর্বাচলে'। 

বিজ্ঞাপনটা কারা বানিয়েছে এটা জানার উপায় আপাতত আমার নাই। কিন্তু ক-দিন পূর্বে আমার অতি পরিচিত সেলিব্রেটি টাইপের একজন বিজ্ঞাপনের জন্য কিছু আইডিয়া চাইলেন- এই উদ্ভট আইডিয়াও অন্যতম। আমিও সরল মনে দিলাম। কায়মনে প্রার্থনা করি, অন্তত এই মানুষটার কাছ থেকে ছুঁরি খেতে চাই না!

বোতলে করে বাতাস বিক্রি করার উদ্ভট আইডিয়া আর কারও মাথায় খেলা করবে না এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। এমনটা হলে বিষয়টা আমার জন্য আনন্দের, যাক বাবা, অন্তত এই দেশে এমন 'পাগলু ভাবনা' ভাবার লোক অন্তত আরও একজন আছেন। আসেন ব্রাদার, টোস্ট করে আপনার স্বাস্থ্য পান করি।
কিন্তু বাই এনি চান্স এই আইডিয়াটা আমার পোস্ট থেকে নেয়া হয়ে থাকলে বেদনার শ্বাস ফেলে বলতেই হয়, দেশটা চোর-চোট্টায় ভরে যাচ্ছে!   

আমাদের দেশে এইসব অহরহ চলেই আসছে। আমাদের দেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলো এই বিষয়ে এক পা এগিয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে ওয়েবসাইট থেকে একটা লেখা মেরে দেবে। দয়া করলে কেবল লিখে দায় সারবে, 'ওয়েব সাইট অবলম্বনে'।
অতীতে আমার বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। এক পরিচালকের কাছে আমার একটা নাটকের পান্ডুলিপি জমা দিয়েছিলাম। তিনি মনোনীত হয়নি বলে জানিয়েছিলেন। পরে এই লেখাটার প্রচুর রদবদল করে তিনি নিজেই একটা নাটক প্রসব করেছিলেন। কাজটা তিনি এমন সূক্ষ করে করেছিলেন আমার প্রতিবাদ দূরের কথা, আঙ্গুল উঠানোও সম্ভব ছিল না। 
মেনে না নিয়ে উপায় কী- কেউ কেউ ডিমে তা দিয়েই যাবে, অন্যরা সেই ডিম থেকে সদ্যজাত মুরগি গুনবেন। সবই কপাল...।

* বাতাসের ছবি: সংরক্ষিত।   :-)

সহায়ক সূত্র:
১. বাতাস বিক্রি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post.html
২. একালের ব্রুটাস...: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post.html

Saturday, November 28, 2009

গোলাম আজম: স্যার, আপনার ঈদিটা...



স্যার, সবাই যখন মাংস কোপাতে ব্যস্ত তখন কেবল আমারই কোন কাজ নাই। ভারী অকাজের একজন মানুষ- প্রায় গৃহবন্দী! ভাবলাম, আপনার মত মহাপুরুষদের জীবনী পাঠ করে সময়টা পার করি।

আহ, বীরশ্রেষ্ঠ! যেখানে গিয়ে আমরা আবেগে কাঁপি, নিজেকে এতটাই ক্ষুদ্র মনে হয়; পোকা কোন ছার! 
স্যার, আপনার হাতে ধর্মের এমন কোন ইরেজার নাই, বীরশ্রেষ্ঠদের মেডেলে যে দৈববাণী জ্বলজ্বল করে, "আমার বীর সন্তান, যাদের চেয়ে প্রিয় আমার আর কেউ নাই" এটা মুছে ফেলবেন!

কোথাও পড়েছিলাম, আমাদের ৭ বীরশ্রেষ্ঠর একজন, মতিউর রহমানকে নিয়ে এবং আপনার মতে, একমাত্র বীরশ্রেষ্ঠ রশিদ মিনহাজকে নিয়ে আপনি কিছু বক্তব্য রেখেছিলেন কিন্তু আমার দুর্বল স্মরণশক্তির কারণে তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খোঁজ-খোঁজ-খোঁজ। নিয়তে বরকত- অবশেষে পাওয়া গেল।
স্যার, আপনার বীরত্বের কাহিনি আপনি হয়তো ভুলে গেছেন কিন্তু আমরা ভুলিনি! ভাবলাম, আপনার কিছু বীরত্বের কাহিনি আবার পাঠ করা যাক। এটাই স্যার এবারের ঈদে আপনার জন্য এই অভাজনের ঈদি-সেলামি।   

১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১:
"...
করাচীতে গোলাম আজম, সকল বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং তাদের নেতৃবৃন্দকে শাস্তি দানের আহ্বান জানান। এই প্রসঙ্গে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী গ্রুপ) নাম (বিশেষ করে) উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, এসব দলের সদস্যরা এখনো পূর্ব পাকিস্তানে গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে হতাশার ভাব সৃষ্টি করছে।
...
গোলাম আজম পাকিস্তান রক্ষা ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

তিনি বলেন, কোন ভাল মুসলমানই তথাকথিত বাংলাদেশ আন্দোলন-এর সমর্থক হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করার জন্য একমন ও দেশপ্রেমিক লোকেরা একত্রে কাজ করে যাচ্ছেন। রাজাকাররা খুবই ভাল কাজ করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শহীদ রশীদ মিনহাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগের নিদর্শন থেকে তরুণরা উপকৃত হতে পারবে।"
(এপিপি-র বরাত দিয়ে এটা দৈনিক পাকিস্তান, ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১-এ ছাপা হয়)

* আপনাদের জানা আছে তবুও বলি, শহীদ রশীদ মিনহাজ সেই ব্যক্তি:
'সিতারায়ে হরর' খেতাবে ভূষিত, 'ডেভিল ডেয়ার'খ্যাত দুর্ধর্ষ পাইলট মতিউর রহমান পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর সমস্ত কর্মকর্তাকে ফাঁকি দিয়ে মাসরুর বিমানঘাটিঁ থেকে অবাঙালী ছাত্র বৈমানিক রশিদ মিনহাজসহ একটি টি-৩৩ বিমান হাইজ্যাক করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ১৯৭১। কিন্তু বিমান ক্র্যাশ করায় রশিদ মিনহাজসহ মতিউর রহমান শহীদ হন।
পরবর্তিতে পাকিস্তান বিমানঘাঁটির প্রবেশদ্বারে রশিদ মিনহাজের ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল সমরবীর হিসাবে, তাকে অভিবাদন জানানো হত। 
অন্যদিকে মতিউর রহমানের ছবি টাঙিয়ে থুথু ফেলা হতো।

Friday, November 27, 2009

রূপান্তর!


গজদন্ত দেখে প্রাইমারি স্কুলের টিচার বলতেন: কুক্কু, তোর 'দাঁতের উপর দন্ত, শয়তানীর নাই অন্ত'বদ বন্ধুরা খেপাত আগামী দিনের ড্রাকুলা বলে
দিনে-দিনে কুক্কু ড্রাকুলা হলো না ঠিকই কিন্তু কালে কালে দুষ্টের শিরোমনি হলোটিভিতে দেখল একজন ব্লাকবেল্ট হোল্ডার হাতের এক কোপে আটটা বরফের স্ল্যাব গুঁড়িয়ে ফেলল
কুক্কু নয়টা খালি ম্যাচের বাক্স একটার উপর আরেকটা সাজিয়ে চোখের নিমিষে গুড়ো করে ফেলকুক্কু নিজের কাজে নিজেই মুগ্ধ কোমরে লাল গামছা বেঁধে ক্রমাগত মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল: পৃথিবীতে একজনই রেডবেল্ট আছে সে আমি, আমি; হা হা হা, হি হি হি, হো হো হো
এ ভালো লাগা স্থায়ী হলো নাহপ্তা পনেরো দিন ডান হাত পুরোপুরি অকেজোঅগত্যা খাবার চালান করতে, খাবারের অবশিষ্টাংশ বেরুবার পর...বাঁ হাত ব্যবহার করতে হলো, কষ্টেসৃষ্টে
দুষ্টের শিরোমনি, কিন্তু মনটা ভারী নরোম! এক ফোঁটা রক্ত দেখলে মাথা ঘুরে পড়ে যায়- কেউ কাঁদলে তারচেয়ে বেশি কান্না করে ও!



পশুর চোখের ভাষা কি মানুষ বুঝতে পারে, কে জানে! বা পশু কি তার আগাম মৃত্যু টের পায়, জানা নেই!
কোরবানি ঈদের আগের বিকেলে, কুক্কুদের সদ্য কেনা গরুটা ঘাস খাচ্ছিলগরুটার হাতির শরীর অথচ কী ভিতু! কুক্কু হুম বললেই লাফিয়ে দশ পা পিছিয়ে যায়

বিকেলের নির্জীব আলো মরে আসছে- আকাশ সিদুরে মাখামাখিগরুর বড় বড় চোখ কী টলটলে, পাতা ফেললেই জল উপচে পড়বে এমনগোটা চোখ জুড়ে আটকে আছে আস্ত সূর্যটা, পলক ফেললেই হারিয়ে যায়
কী অপার্থিব দৃশ্য, তাকাতে ইচ্ছে করে, অথচ তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়কুক্কুর মাথা খারাপের মতো হয়ে গেল ঝড়ের গতিতে বাবাকে খুঁজে বের করে ভাঙ্গা গলায় বলল: বাবা-বাবা গরুটাকে কেটো না
বাবা চোখে আগুন ছড়িয়ে বললেন: ইস, পাগল কয় কী!
বাবা গরুটা কাঁদতে কাঁদতে বলছে: এ আমার শেষ খাওয়া, আগামীকাল আমি ই-ই-ই থাকব না
বাবা খুব রাগ করলেন, তুই আমার সাথে ফাইজলামি করছ, ফাজিল কোথাকার থাপড়াইয়া কানপট্টি ফাটায়া দিমু, দূর হ আমার সামনে থিক্যা

কোরবানির দিন সকাল কুক্কু আবারও গোল বাঁধাল, বাবা-বাবা, তোমার পায়ে ধরি, এটাকে কেটো না
বাবা দাঁত ঘসে বললেন, আবার শুরু করলি! দরদ উথলাইয়া পড়ে? ক্যান রে বান্দর, তুই গরুর মাংস খাস না?
কুক্কু অনিচ্ছায় মাথা নাড়ল, খাই
তাইলে তোর সমস্যা কি? মাইয়া মানুষের মত ফিচফিচ কইরা কান্দা থামা আমার ঘরে একটা আবাল হইছে, তোরে দিয়া বংশের বাতি থাকব না আয় আমার লগেবেডা মাইনষের মুরগির কইলজা হইলে হয় না
বাবা কুক্কুকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কুক্কু জোর করছে দেখে এবার ঘাড় ধরে উড়িয়ে নিয়ে চললেন
ওখানে গরুটাকে শুইয়ে ফেলা হয়েছে ছুরি দিয়ে পোঁচ দেয়া মাত্রই গলগল করে রক্ত বেরুনো শুরু হল যারা ধরে আছেন তাদের মুখে রক্ত, একজন দাঁত খিঁচে রেখেছিলেন, তার দাঁত রক্তে লাল হয়ে আছে
জবাইয়ে কোন একটা সমস্যা হয়েছিল সম্ভবত, গরুটা হঠাৎ লাফিয়ে উঠলযারা ধরে ছিল তারা ছিটকে পড়লআধ-জবাই গরুটা বিচিত্র ভঙ্গিতে উঠোনময় দৌড়াতে লাগলসবাই খানিকটা ধাতস্ত হয়ে গরুটার পিছু ছুটছেএকসময় গরুটাকে কাবু করে ফেলা গেলএইবার কোন ভুল করা হলো না, নিখুঁত ছুঁরি চালানো হলোএকবার, বারবারকুক্কুর অজান্তেই ওর গোটা ভুবন এলোমেলো হয়ে গেল

কবে থেকে যে পরিবর্তনটা শুরু হয়েছে কেউ এটা নিয়ে আদৌ মাথা ঘামায়নি, ও নিজেও নাএখন কুক্কুর অনেক সাহস! একদিন এক বয়স্ক রিকশাওয়ালাকে চড় দিয়ে কুক্কু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলভয়ে, লজ্জায়, দুঃখে মনে হচ্ছিল মাটিতে মিশে যায় কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, কেউ কিচ্ছু বলল না! একজন তো রিকশাওয়ালাটাকে এই মারে তো সেই মারে, হারামজাদা পেসেন্জারের লগে দিগদারি করস খান... পুত, বড়ো ভাইয়ের পা ধইরা মাপ চা তোর রিকশা যে ভাঙ্গছে না এইডাই তো বাপের কাম করছে

এখন কুক্কু চুইংগাম চিবুতে চিবুতে ইট দিয়ে গাড়ির কাঁচ গুড়িয়ে দেয় কাঁচ ভাঙ্গার ঝনঝন শব্দে শরিরে ঝিরঝিরে একটা ভাললাগা ছড়িয়ে পড়েকেউ কিচ্ছু বলে না!
এখন কুক্কু যে আগুন দিয়ে সিগারেটটা ধরায় ওই একই আগুনে পেট্রোল ঢেলে একজনের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেনচড়চড় করে যখন আগুনে চামড়া, চুল পোড়ে তখন কী একটা অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে যায়কেউ কিচ্ছু বলে না!
ক্ষুর দিয়ে কারও শরিরে যখন আকিঁবুকি খেলা খেলে, ফিনকি দিয়ে যখন রক্ত বের হয়, এই গন্ধের সঙ্গে কিসের তুলনা চলে!
কেউ কিচ্ছু বলে না!

পিচ্ছিল উষ্ণ রক্তে পা মাড়িয়ে কুক্কু এগিয়ে যায়, একজন পুরুষ, সাহসি পুরুষ সবাই সমীহের দৃষ্টিতে তাকায়, বীরভোগ্যা নারীর বীরবর সন্তান!

*ছবি-স্বত্ব: সংরক্ষিত

**লেখাটা নিয়ে আমার এক সিনিয়রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মানুষটা করপোরেট ভুবনের। করপোরেট ভুবনের মানুষ হলেও তাঁকে শৈশবের কিছু সুখ-স্মৃতি এখনও হরদম তাড়া করে ফেরে! ভিড়ের মাঝে থেকেও কেউ কেউ বড়ো একা হয়ে পড়েন, মানুষটা তার একটা উদাহরণ!

যাই হোক, তিনি বলছিলেন, 'আজ যে ধর্মভীরুকে (link) ছুঁরি হাতে দেখছি হিংস্র ভঙ্গিতে, তিনি এটাকে দেখছেন ইতিবাচক ভঙ্গিতে। মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা এই হিংস্রতার বহি:প্রকাশ পশুর উপর এভাবে না-হয়ে অন্য রকম হলে সেটা হয়তো আরও ভয়াবহ হতে পারত! হয়তো সেটা হতো মানুষের উপর'।

তাঁর এই কথাটায় আমি অনেকাংশে একমত। এই ভাবনার সূত্র অন্য একটা জানালা খুলে দিল। গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আমি মনে করি, একজন মানুষের ভেতর একটা পশু এবং একটা শিশু লুকিয়ে থাকে, এদের মধ্যে অহরহ মারপিট লেগেই আছে। পশু, না শিশু? কখন কে বার হয়ে আসবে এটা আগাম বলা মুশকিল! আমরা আমাদের আদি-মানবের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যে আদিমতা আমাদের রক্তে বহন করছি, এ থেকে সহজে আমাদের মুক্তি নাই। মস্তিষ্ক আমাদের নিয়ে কি খেলা খেলবে তা আগাম বলা মুশকিল! এ পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান, শিক্ষা আমাদের ভেতর ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা পশুটার কাছ থেকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে

অফটপিক: আফসোস, আমরা কেবল একটা বৃত্তে অনবরত ঘুরপাক খাই, এটাই আমাদের নিয়তি! কেউ কেউ বৃত্তের বাইরে পা ফেলার চেষ্টা করেন, কিন্তু বৃত্তের বাইরে যাওয়ার পর্যাপ্ত জ্ঞান যে তাঁর নাই। এক পা বৃত্তে, এক পা বৃত্তের বাইরে- এদের চেয়ে অভাগা আর কেউ নাই!


শিরোনামহীন




*ছবি-স্বত্ব: সংরক্ষিত

Thursday, November 26, 2009

কোরবানি: মূল্য মাত্র আড়াই লক্ষ টাকা!

প্রায়শ পত্রিকায় ছাপা হয় সবচেয়ে দামি গরু এবং এর পাশে সেই ব্যক্তিটির ছবি যিনি এই গরুটি কিনেছেন আমি খুজে বের করার চেষ্টা করি এই দুইটা গরুর মধ্যে কার মনন খানিকটা বেশি
এবারে নাকি গাবতলিতে সাড়ে ১২ লক্ষ টাকার গরু মহাশয়কে খুঁজে পাওয়া গেছে। আসল গরুটার খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি! অপেক্ষায় আছি।
ভাল কথা, মনন নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির চমৎকার একটা কথা আছে: "ইউক্লিডটা গাধা, আস্ত গাধা! আমি প্রমাণ করে দেব ওই নির্বোধ গ্রীকটার চেয়ে ঈশ্বরের মনন অনেক বেশি।"

কোরবানির সময়ে আমরা অসংখ্য হাজি মহসীন-ত্যাগবাজ পেয়ে যাই আমার কৌতুহল কম, এলাকায় সবচেয়ে বেশি টাকার গরু কোরবানি কে দিচ্ছেন এটা জানার আগ্রহ বোধ করি না কিন্তু এই সময়টাতে অন্য কোন আলোচনার বিষয় নাই! জনে জনে জানতে চাইবেন, গরু কিনছেন?

কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, কই যান? সে হড়বড় করে বলবে, গরু বাজার
কাউকে বললেন, ভাত খাইছেন সে বলবে, না খাই নাই, খায়া গরুর বাজার যামু
বললেন, ইয়ে, আইজ কি বার? তিনি বলবেন, সুমবার, আইজ গরুর হাট নাই ইত্যাদি

তো গরু সংক্রান্ত তথ্য না-জানা অবধি নিস্তার নাই ৭ জন মিলে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনবে কিন্তু প্রত্যেকে, একেকজন ৪৯ জনকে বলে বেড়াবে, বুঝলেন, গরুর এইবার যেই দাম, বাজারে গরুই নাই অনেক যন্ত্রণা কইরা ৭০ হাজারে একটা লইলাম
বা, ৭০ হাজার টেকায় গরু কিনলাম আর হালায় রওয়ানা লয়া কি প্যাচালটাই না করল, হালার আমি বাদাইম্যা নিহি!
মূল বিষয় হচ্ছে কোন-না-কোন প্রকারে আপনাকে জানতেই হবে, শুনতেই হবে ছাড়াছাড়ি নাই
আমার এলাকায় গতবার পর্যন্ত জানতাম, ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল, এক সার্জেন্ট সাহেব কিনেছিলেন তিনি নাকি ম্যালা বড়ো চাকরি করেন! বটে রে!

এইবার এটা আড়াই লক্ষ টাকা হয়েছে কোরবানির আর ২দিন বাকি, এখনও এই রেকর্ড ভাঙ্গার সময় চলে যায়নি কিন্তু এটা ছোট জায়গা আমার মনে হয় না এই রেকর্ড কেউ ভাঙ্গতে পারবে ছোট জায়গা, এখানে আড়াই লক্ষ টাকা গরু মেলে না, উট পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই
... ... ...


আজাদ নামের একজন, ছোট্ট একটা স্টেশনারি দোকান চালান দোকানটা এতই ছোট ২জন দাঁড়াবার উপায় নেই। কখনও খুব বিরক্ত লাগে, ছাতাফাতা দোকান একটা, দাঁড়াবার জায়গাও নাই! 
টুকটাক জিনিস কেনা হয় এখান থেকে দিন দশেক আগে তার দোকানে গেছি একটা সিক্স-বি পেন্সিল কিনব বলে 
বেচাকিনি বাদ দিয়ে মানুষটা দেখি বড়ো অস্থির এক মাইকওয়ালার সঙ্গে কথা বলায় মহা ব্যস্ত কি এক মাইকিং করাবেন আমার মনে হলো, সামনে ঈদ, দোকানের বিজ্ঞাপন টিজ্ঞাপন দেবেন হয়তো আমি হাসি গোপন করি, এক কাপ চায়ে দু'কাপ চিনি- দুই হাতের একটা দোকান তার আবার বিজ্ঞাপন!

অ আল্লা, ঘটনা দেখি এটা না! কাহিনি হচ্ছে, তাঁর দোকানের সামনে একটা পুটুলিতে তিনি কিছু স্বর্নের জিনিস পেয়েছেন, দোকানে কাগজে লিখে নোটিশ টাঙ্গিয়েছেন কিন্তু এখনও কেউ যোগাযোগ করেনি অতএব ভরসা মাইকিং 
পরে জেনেছি, উদভ্রান্ত প্রকৃত মালিক উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে তার হারানো সম্পদ ফিরে পেয়েছিলেন। এই কিছু স্বর্নের জিনিস ছিল প্রায় ১০ ভরি, যার বাজারমূল্য আনুমানিক আড়াই লক্ষ টাকা! এমন লোভ সংবরণ!
আমি কেবল ভাবছিলাম, এই মানুষটার স্থলে আমি হলে কি করতাম, আমি কি পারতাম এমন লোভ সংবরণ করতে? বুকে হাত দিয়ে বললে লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে, আমি জানি না, এর উত্তর এখন আমার কাছে নাই!

আজ আমার একটা ইরেজার প্রয়োজন। আগেরটা নিয়ে বিরক্ত, ওটায় কার্বন লেপ্টে স্কেচের বারোটা বেজে যায়। ভিআইপিরা বড়ো যন্ত্রণা করছেন; তিতিবিরক্ত আমি, ভিআইপি গরুগুলোকে পাশ কাটাতে কাটাতে এগুতে থাকি।
আজ দেখি মানুষটা বড়ো বিষণ্ন! ব্যবসার অবস্থা নাকি ভাল না, এবার কোরবনি কি করবেন এই নিয়ে উদ্বিগ্ন।
আমি বলি, আচ্ছা, আমাদের এখানে আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে একজন কোরবানি দিল, জানেন? মানুষটা আকাশ থেকে পড়েন।
আমাকে বলেন, ভাই, কি কন, আড়াই লাখ টাকার গরু এইখানে পাইব কই? কে দিতাছে?
আমি বলি, মানুষটার নাম, আজাদ।

মানুষটা ভাবলেন, আমি বুঝি রসিকতা করছি। মানুষটাকে বুঝিয়ে বলি, এটা রসিকতা না, আমার প্রাণের কথা।      

*মানুষটার অজান্তেই, বিনা অনুমতিতে তাঁর ছবি তুলেছি, এটা একধরনের অন্যায়। তাঁর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। 
হোক অন্যায়, কিছু অন্যায়েও সুখ। এমন অন্যায় বারবার করলেই কী!

Wednesday, November 25, 2009

ত্যাগবাজি!

কোরবানির শিক্ষাই নাকি ত্যাগ। বেশ, এই নিয়ে তর্ক-কুতর্ক এই লেখার বিষয় না। তবে এও সত্য, শেকড়ের কাছে ফিরে আসার অসাধারণ এক সুযোগ করে দেয় এই উপলক্ষ।

আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগের কোরবানিপর্ব আর আজকের মধ্যে অনেক ফারাক। অনেকের কাছে কোরবানি এখন হয়ে গেছে সামাজিক মর্যাদার এক কঠিন হাতিয়ার! কার গরুর উচ্চতা কার গরুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ন্যায়-অন্যায় প্রশ্নে যাই না, টাকা কী গৌরি সেন দেবে নাকি ফকির চান সেই প্রশ্নও এখন অবান্তর। 

দুই ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশে উঁচু স্কেলে '­দু-লম্বরি বেড়ে যায় এটা গজ-ফিতা নিয়ে কে মাপতে যাবে! ওই প্রসঙ্গে গিয়ে লাভ নাই কারণ যে মানুষগুলোকে দেখি ১৫/২০ হাজার টাকার গরু হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে তাদের অনেকের চুলায় আরামসে বেড়াল ঘুমায়।

সার্জেন্ট সাহেব কেনেন ৮৫ হাজার টাকার গরু! টাকা যোগায় ভূত! এমনিতে চোখে পড়ে না এদের হাত গলে একটা আধুলি ভাল কাজে গড়িয়ে যেতে! অথচ কোরবানির বেলায় দেখি একেকজন দাতা হাতেম তাই হয়ে যান। 
­কোরবানির পূর্বেই ডীপ-ফ্রীজ কেনা, বিয়ে-মুসলমানির অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা কী এই তর্কই বা কে করে!

ফ্রীজ কোম্পানিগুলো মিডিয়ায় এমন ফ্রীজেরই বিজ্ঞাপন দেয়, ওই ফ্রীজে ইয়া ধামড়া আস্ত গরু অনায়াসে এঁটে যাবে কোন জংলির মাথা থেকে এমন আইডিয়া বের হয় কে জানে! এ বছর নতুন মাত্র যোগ হয়েছে, এক কোম্পানি কসাই সাপ্লাই দিচ্ছে- মূল শ্লোগান, 'কোপা সামসু'। কী অসভ্য ভাবনা- এইসব মানুষদের চাবুক দিয়ে চাবকানো প্রয়োজন!

চোখ দিয়ে খাওয়ার নিয়ম নাই নইলে এই সময়ে একটা গরু-ছাগলও আস্ত হেঁটে যেতে পারত না। পড়ে থাকত কেবল ক-খানা হাড়! এ সময় আসলে আমাদের গ্রে-মেটার হয়ে যায় 'গোশতমেটার'! খেয়াল করে কিন্তু গোশত বলতে হবে, মাংস বলার নিয়ম নাই (মাংস নাকি মায়ের অংশ)!
আহা, প্রিয় জিনিস উত্সর্গ করতে হবে। তাই সব ধকল সামলাতে হয় বেচারা বিশেষ কিছু পশুদের। হুম, প্রিয়! বাজার থেকে কাল কিনে এনে আজই জবাই। গরুর কটা দাঁত এটাই জানি না অথচ এদের জন্য নাকি আমাদের অনেক কান্না! ইশ-শ, ভাবতেই চোখে জল না এসে পানি চলে আসে!

ভাল কথা, অস্ট্রেলিয়া সাড়ে ৬ লক্ষ উট মেরে ফেলার বুদ্ধি করছে, আমাদের স্যাররা এগিয়ে গিয়ে বললেন না কেন। আমরা নিজ খরচে আপনাদের পোর্ট থেকে নিয়ে যাব, আপনারা উট বিনে পয়সায় আমাদের দিন। কোরবানির সময় সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে বিক্রি করে দিলেই হতো। অস্ট্রেলিয়া দিত কি দিত না সেটা পরের কথা অন্তত বহিবিশ্বে বাংলাদেশের নামটা ইতিবাচক ভঙ্গিতে চলে আসত। আহারে, 'খোদা না খাস্তা' অস্ট্রেলিয়া রাজি হয়ে গেলে গরু বেচারারা এক বছরের জন্য শ্বাস ফেলে জাবর কাটার সুযোগ পেত।­

প্রকাশ্যে জবাই না করলে আমাদের যে আবার মান থাকে না, লুকজনদের(!) দেখাতে হবে না কত্তো বড় গরু-উট আর যে আমরা কত্তো বড় ত্যাগি! শিশুদের 'সাহসি-সাহসবাজী' করতেও চেষ্টার শেষ নেই!
অনেক মুসলিম দেশে প্রকাশ্যে জবাই করলে বাংলাদেশের টাকায় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং জেল। আর আমাদের সমস্ত কাটাকাটির কাজই রাস্তায়!

জানি-জানি, এটা পড়ে হাসতে হাসতে অনেকের চোখে জল (দু:খিত জলের জায়গায় পানি পড়বেন) চলে এসেছে, মিয়া লম্বা লম্বা বাতচিত করো, ওই দেশের লোকসংখ্যা কত আর আমাদের দেশে...ইত্যাদি।
বেশ-বেশ, কিন্তু আমাদের মিডিয়ায়, টিভিতে যখন প্রকাশ্যে জবাই, বর্জ্য, চামড়া খুলে ফেলা এইসব দেখানো হয় এটাও কী অধিক জনসংখ্যার ফল? যে দেশে জনসংখ্যা বেশি থাকে ওই দেশের লোকজনের মস্তিষ্ক এবং রেকটাম কী একাকার হয়ে যায়, নাকি? ধর্মের দোহাই দিয়ে ছোট-ছোট শিশুদের জবাইপর্ব দেখতে বাধ্য করা হয়। কী আশ্চর্য, এই বয়সে নামাজের তাগিদের আসমানি নির্দেশ নাই অথচ এই কাজটা করাতে আমরা বড়ো ব্যস্ত হয়ে পড়ি! অনেক ফরয কাজের পাত্তা নেই কিন্তু ওয়াজেব নিয়ে আমাদের বিপুল উৎসাহ।

যে শিশুটি এক ফোঁটা রক্ত দেখলে মুর্ছা যেত সে বিমলানন্দে উপভোগ করে গলগল করে বয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। এরা আগামিতে চলমান একেকজন যোদ্ধা হবে না তো কে হবে? আমাদের দেশের মনোবিদদের তেমন চল নাই, চালও নাই। কার এতো দায় পড়েছে এই অবোধ শিশুদের মস্তিষ্কে জমে উঠা বিষবৃক্ষের বীজগুলো খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখার।

আমাদের দেশে টাকা আসলে সমস্যা না, এর অনেক উপায় করা যায়। মাথাপিছু জাতীয় ঋণ আমাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া যায়। আচ্ছা, আমাদেরকে যদি এমন অপশন দেয়া হয় কোনো এক বছর কোরবানি না-দিয়ে ওই টাকায় আমরা আমাদের দেশের সমস্ত বিদেশি ঋণ শোধ করে চমত্কার একটা দেশ গড়ে তুলব। আমরা কী এই সুযোগ নেব?
কাজটা সিম্পল। যিনি যে টাকা কোরবানির জন্য নিয়ত করবেন তিনি সেই টাকা ব্যাংকে জমা দেবেন এবং তাঁকে যথাযথ রসিদ দেয়া হবে। যিনি মনে করবেন 'কোপানি এন্ড চাবানি ঈদে' পশুর গলায় ছুঁরি ঘসাঘসি না-করা পর্যন্ত ধর্ম টিকে থাকবে না তিনি তাই পালন করুন না, কেউ তাঁকে তো জোর করবে না। যার যার রাস্তা তার তার কাছে।
সমগ্র দেশের ৫ ভাগ মানুষ এই সুযোগটা নেবে কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। আহা, তাইলে আমরা যে কত্তো বড় ত্যাগি এটা প্রমাণ হবে ক্যামনে, সামাজিক-ধর্ম রসাতলে যাবে যে! 

*ছবি ঋণ: ১. http://www.grumpyoldsod.com  ২. পত্রিকার বিজ্ঞাপন

**ফেসবুকে এই লেখাটি অন্য একজন শেয়ারের  কল্যাণে (http://www.facebook.com/aurnabarc), ওখানে Nazmul Hasan Darashiko কঠিন এক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন:
"ভালো লাগে নাই - সব শেয়ালের একই রা! ঘুরে ফিরে একই কথা - দেশ বাচাতে, দশ বাচাতে আর কিছু বন্ধ করার দরকার নাই, কোরবানী বন্ধ কর - তাইলেই হবে।" 

সেখানে আমার উত্তর ছিল এই:
"ডিয়ার Nazmul Hasan Darashiko,
আপনার ভাল না-লাগা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই- এটা আপনার নিছকই ব্যক্তিগত। 

কিন্তু... সবিনয়ে বলি, আপনি যে লিখেছেন, "...দেশ বাচাতে, দশ বাচাতে আর কিছু বন্ধ করার দরকার নাই, কোরবানী বন্ধ কর - তাইলেই হবে।"
এখানে আমি আপনার সঙ্গে অ
মত পোষণ করি। কোরবানি বন্ধ করে দেয়া হোক ওই লেখায় কিন্তু এটা বলার চেষ্টা করা হয়নি। কোরবানি চালু-বন্ধ সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। যেটা আমি লেখার শুরুতেই বলেছিলাম...।
ওখানে আমি যেটা বলার চেষ্টা করেছি, সেটা হচ্ছে ভঙ্গি। উৎকট আচরণ, যেটা 'ত্যাগবাজি'-তে অনেকটা বলা হয়েছে বলে এখানে আর চর্বিতচর্বণ করি না। 

হ্যাঁ, ওখানে একটা অপশন রাখার কথা বলা হয়েছিল, তবে বলা হয়নি যে এটা চলতেই থাকবে। এবং প্রসঙ্গটা এসেছে এভাবে:
"আমাদের দেশে টাকা আসলে সমস্যা না, এর অনেক উপায় করা যায়। মাথাপিছু 'জাতীয় ঋণ' আমাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া যায়। আচ্ছা, আমাদেরকে যদি এমন অপশন দেয়া হয় কোনো এক বছর কোরবানি না-দিয়ে...তিনি তাই পালন করুন না, কেউ তাঁকে তো জোর করবে না। যার যার রাস্তা তার তার কাছে।"
কেউ চাইলে টাকাটা দেবে। কেউ না-চাইলে দেবে না, তার মত করে কোরবানি করবে। সমস্যা তো নাই।

দেশের প্রয়োজনে 'জাতীয় ঋণ'-এর মত অনেক উপায়ের মধ্যে এটাও ছিল। ওখানে 'জাতীয় ঋণ'-এর একটা হাইপার লিংকও জুড়ে দেয়া হয়েছে। ওই লেখায় আমার প্রস্তাব ছিল এমন:
যাদের চাইবেন তাঁরা মাথাপিছু জাতীয় ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন। তাঁকে 'জাতীয় ঋণমুক্ত ব্যক্তি' হিসাবে একটা সনদ ধরিয়ে দেয়া হবে। মন্দ কী!
অতি সাধারণ এক ভাবনা, সদ্যজাত শিশুর ন্যায় আমার মাথায়ও জাতীয় ঋণের খড়গ ঝুলছে। আমি কেন ঋণগ্রস্ত হয়ে মারা যাব? 

যাই হোক, এর বাইরে একটু বলি, খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নাই, আজ থেকে ১৫-২০ বছর পূর্বেও কিন্তু লোকজনেরা কোরবানি দিয়েছেন কিন্তু এখনকার মত ভাবনাগুলো এমন উৎকট ছিল না। যার যার সাধ্য অনুযায়ী কোরবানি দিতেন, কেউ না-পারলে না দিতেন। কিন্তু কোরবানি এখন সামাজিক মর্যাদার কঠিন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরুর উচ্চতা আমাদের উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত যাদের হাতে টাকা-পয়সা নাই তাঁদের জন্য এই সময়টা যে কী কষ্টের এটা কেবল এঁরাই টের পান, হাড়ে হাড়ে। জনে জনে এসে জানতে চাইবে মানুষটা কোরবানি দিচ্ছে কিনা!
আপনি কী বললে বিশ্বাস করবেন, সুদে টাকা এনেও এখন লোকজনেরা কোরবানি দেন। কেন? ভাল কোনো সদুত্তর নাই। মানুষটার না-বলা কথাটা বুঝতে সমস্যা হয় না, মান থাকে না যে। 

কোরবানির সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কোরবানিটাও জরুরি...। 
ভাল থাকুন।"

সহায়ক সূত্র:
১. ইদ...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_30.html
২. উট...: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_9297.html 
৩. প্রকাশ্যে জবাই...: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_1172.html 
৪. জাতীয় ঋণ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_4340.html 

Tuesday, November 24, 2009

ভালবাসার রসায়ন!



কোন বাহনে যখন আমি আমার ডেরায় ফিরি তখন হাতে কিল মেরে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠি, আহ, এটা সোজা স্বর্গের দিকে যাচ্ছে
অধিকাংশ সময়েই পাশ থেকেই চিলকণ্ঠে একজন বলে উঠেন, স্বর্গ না ছাই, নরক-নরক, আস্ত নরক!

তিনি আর কেউ নন, বাবুদের মা, ইস্তারি সাহেবা ট্রেনে ওনার চিল-চিৎকারে আশেপাশের লোকজন ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে ভেবে অস্থির হন পারলে গার্ড সাহেব ছুটে আসেন, এমন!
ইস্তারি সাহেবার সাফ কথা, এই রাস্তা সোজা নরকে, পোড়ো বাড়ি-ভূতের বাড়ি দিকে যাচ্ছে ভূতের বাড়ি নামের ওই 'খান্ডারা' নাকি অভিশপ্ত (আজিব, ১০০ বছর পুরনো হলেই বুঝি একটা বাড়ি ভূতের বাড়ি হয়ে যায়?) 
তো, আমি নাকি বুঝতে পারছি না, আমার অজান্তেই ওই অভিশপ্ত বাড়িটা আমাকে ফাঁদে আটকে ফেলেছে ইচ্ছা করলেই আমি এখান থেকে পালাতে পারব না, প্রাণ না-যাওয়া অবধি আমার ছাড়াছাড়ি-নিস্তার নাই
ভাগ্যিস, তিনি এটাকে ভূতের বাড়ি বলে দাবী করেন, পেত্নির বাড়ি বললে আবার আরেক ঝামেলায় পড়তাম পেত্মির একটাই মাত্র চোখ, তাও আবার আমার দিকে, কী সর্বনাশ! আই বেট, পেত্মির সঙ্গে আমার কোন একটা সম্পর্ক খুঁজে বের করে ফেলতেন! 
পারতপক্ষে কক্ষনই পেত্মির ছবি আঁকার চেষ্টা করি না কী প্রয়োজন বাপু, খামাখা সন্দেহ বাড়িয়ে
পিগমীদের মধ্যে একটা কাজের প্রথা চালু আছে। বিবাহিত পুরুষদের কপালে খোদাই করে তাদের স্ত্রীদের নাম লিখে দেয়া হয়। আফসোস, আমাদের এখানে বিবাহিত পুরূষদের সনাক্ত করার কোন উপায় চালু নাই! থাকলে বেশ হতো, পেত্মির চোখ এড়িয়ে থাকা যেত!

স্ত্রিয়াশ্চরিত্রম- "স্ত্রিয়াশ্চরিত্রং পুরুষ্যস্য ভাগ্যং দেবাঃ ন জানন্তি কুতো মনুষ্য:‍"! ওনার সমস্যার আদিঅন্ত নাই আমার বিরুদ্ধে এনতার-একগাদা অভিযোগ আমি বিবাহবার্ষিকী মনে রাখতে পারি না বাচ্চাদের বয়স ভুলে যাই- এইসব নাকি আমার চালের একটা অংশ কথায় কথায় চুতিয়া বলি এটাও নাকি খুব বড় ধরনের অপরাধ। আমার ছাতাফাতা লেখালেখি নিয়েও ওনার দেখি ভারী রাগ- ব্যাকরণ মানি না, এক পাতা লেখতে ১০টা বানান ভুল! বটে! তাহলে আপনি নিজেই লিখে ফেলুন না, আটকাচ্ছে কে?

প্র তিনি হিসহিস করে বলেন, এই দেশে নাকি আমার মত একটা জঘণ্য মানুষ খুঁজে বের করা যাবে না
আমি মাথা দোলাই চিঁ চিঁ করে বলি, ভুল এই দেশে কেন এই গ্রহে নাই কেন, একটা বইয়ে আপনাকে উৎসর্গে লিখে দিয়েছি না, "বাবুর মা, আমার মত একজন পোকামানবের সঙ্গে বসবাস করার চেয়ে কঠিন কিছু আর এই গ্রহে নাই"।

সরল স্বীকারোক্তি করেও কোন ফায়দা-তারতম্য হয় না ইদানিং তিনি আবার একটা ওয়েবসাইটে আমার নামে যা-তা, কুৎসা রটাচ্ছেন আমি নাকি এই ভূতের বাড়িতে ওনাকে আটকে রেখেছি (হরর-রহস্য গল্প আর কী!), ওনার ভুবন, আত্মীয়-স্বজন এঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ অতি ক্ষীণ, ইত্যাদি ইত্যাদি!
ওই ওয়েবসাইটে অনেকে অনাবশ্যক সমবেদনা প্রকাশ করেছেন, তাই তো-তাই তো, এ অন্যায়-এ অন্যায়। কেউ কেউ অদেখা জন্তুর সঙ্গে আমার সাদৃশ্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন! কেন রে বাপু, অন্য একজনের সংসারে আগুন লাগিয়ে দাম্পত্য জীবনে গন্ডগোল লাগাবার প্রয়োজনটা কী!


এই দম্পত্তিকে দেখিয়ে আমি হড়বড় করে ইস্তারি সাহেবাকে বোঝাবার চেষ্টা করি, ভালবাসার রসায়ন কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী।
ইস্তারি সাহেবা কাতর হয়ে অস্ফুটে বলে উঠেন, আহারে-আহারে, এত কষ্টেও এদের ভালবাসার রসায়ন কী অটুট!
আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচি...।

*কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না এই শর্তে আপনাদের কানে কানে বলি, এরা কিন্তু দম্পত্তি না কেবল একই পথের পথিক। 
**ছবি-স্বত্ব: সংরক্ষিত।   

Sunday, November 22, 2009

আ বিগ জিরো!

আগাম সতর্কীকরণ: পোস্টটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। ছোটদের দেখা, পড়া নিষেধ!



 

আমি যে একটা বিগ জিরো এতে অন্তত আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। আপনাদের কারও সন্দেহ থাকলে দয়া করে ‘গ’ অক্ষর-বিশিষ্ট একটা প্রাণীর সঙ্গে আলাপ করে নিতে পারেন! বিভিন্ন সময়ে আমার চারপাশের লোকজনরা তাচ্ছিল্য, চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। এদের স্পস্ট বক্তব্য, বেনাপোল বর্ডার দিয়ে যে ২০ টি গাধা বাংলাদেশ আমদানী করা হয়েছিল, আমি নাকি ওই দলটায় ছিলাম, শোনো কথা! 
কে জানে, হবে হয়তো বা!
 

কবিতা লেখার অপচেষ্টা করতাম। একবার যে কবিতাটা (আমার দাবীমতে), আসলে ছড়া। যাকে পড়তে দিয়েছিলাম তিনি খানিকটা পড়েই সর্দি মুছে ফেলে দিয়েছিলেন।
এইবার সতর্ক ছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, এই ছড়া নামের জিনিসটা ছিল এক সিনিয়রের কাছ থেকে চুরি করা। আমি বললাম, 'না আপনার হাতে দিব না, আমি পড়ি, আপনি শোনেন'। লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে আমি শুরু করলাম:

“...আমার হারানো শৈশব, ঋণী
যেসব প্রিয় মানুষের কাছে-
 একবার গা ছুঁয়ে দিলেই,  
শৈশব ফিরে পাই, বারবার।  
...
মৃত্যু এসে গা ছুঁয়ে বলে,
এই পাগল তোকে দিলাম ছুঁয়ে।
ঝাপসা মুখগুলো এসে দাড়ায়।
...
এরা একবার ছুঁয়ে দিলেই 
অমরত্ব ফিরে পাই, তবুও  
হাত বাড়ায় না কেউ।”
তিনি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হাঁই তুলে বললেন, 'হইব না তোমারে দিয়া এইসব ছড়া-টড়া । এক কাজ করো, রবীন্দ্র সঙ্গীত লেখো। কঠিন কাজ, তয় চেষ্টা করলে পারবা'। 
আমি তাঁর জ্ঞানে অভিভূত, নিশ্চয়ই তিনি দু-চারটা রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখেছেন নইলে কী আর আমাকে এহেন পরামর্শ দিতেন! কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীত লেখা আমার কম্মো না, বড়ো কঠিন যে! 

শেষে কাঠ পেন্সিল নিয়ে ঘসাঘসি শুরু করলাম। ছাগল যা পায় তাই খায়, আমিও যা পাই তাই আঁকার চেষ্টা করি। একবার একটা লাউ আঁকলাম। একজন মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, 'আরে জোস হয়েছে, এক্কেবারে আসল রকেটের মতোই দেখাইতাছে'। 
আমি চেপে গেলাম। কেউ লাউকে রকেট ভাবলে এতে আমার অন্যায় কোথায়? আরেকবার আঁকলাম কুমির। এইবার পার পেলাম না, একজন ধরে ফেললেন। 
তিনি ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন, 'তুমি যে কুমির আঁকলা, কুমির দেখছ কখনও? তুমি তো চিড়িয়াখানায় কখনও যাওনি, যাওয়ার দরকার কী, তুমি তো আবার নিজেই একটা চিড়িয়া । তা বাপ, এটা কি টিকটিকি দেখে একেছ, এক্কেরে টিকটিকির মতো দেখাইতাছে'? 
আমার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়!
 

আরেকজন ভালো একটা পরামর্শ দিলেন, 'এইসব ছাতাফাতা না আঁইকা ন্যুড ছবি আঁকো'। 
আমি বললাম, 'ভাল বলছেন, আমি কি আর আর্ট কলেজে পড়ি যে চট করে মডেল যোগাড় করে ফেলব। তা ছাড়া ধুর মিয়া, আমার লজ্জা করে'।
 

আমাদের পরিচিত একজন মহতরমা ছিলেন, আমরা আড়ালে তাকে রাজকন্যা ডাকতাম। তাদের কোন রাজ্য ছিল না কিন্তু তিনি প্রায় মিনিবাসের সমান একটা গাড়িতে করে আসা-যাওয়া করতেন (তখন বাংলাদেশে লেক্সাস ফেক্সাস গাড়ি আমদানী হওয়া শুরু হয়নি)। রাজকন্যাকে আমরা দূর থেকে দেখেই বর্তে যাই, অজান্তেই বিড়বিড় করি, এমন একটা শরীর..., অর্থ একজনের হয় কেমন করে, কেন-কেন-কেন?


সেদিন কী পৃথিবী এলোমেলো ঘুরপাক খাচ্ছিল, জানি না? রাজকন্যা দুম করে বললেন, 'তুমি নাকি ছবি আঁকার মডেল খুঁজছ'? 
আমি তো তো করে বললাম 'না-না, ইয়ে হ্যাঁ, মানে না...'। 

রাজকন্যাদেরও হয়তো ব্রেনে শর্ট সার্কিট হয়ে যায়। কে ব্রেনের দিব্যি দিয়েছে, রাজকন্যাদের মাথায় গোলমাল হতে নেই, ব্রেনের তার-তুরে প্যাচ লাগতে নেই? তিনি বিশেষ কিছু শর্ত আরোপে মডেল হতে রাজী হলেন।
ওয়াল্লা, আমি ছবি আঁকব কী, কাঁপাকাঁপিই বন্ধ করতে পারি না! 


একদিন (ওদিন সম্ভবত আমাবস্যা-পূর্ণিমা ছিল, এই সময় অনেকের মাথায় বেশ খানিকটা বায়ু চড়ে যায়, তখন তাদের আচরণের অর্থ খুঁজে পাওয়া ভার)। রাজকন্যা বিচিত্র কিছু কথা বললেন ।
আমি বিমর্ষ মুখে বললাম: 'রাজকন্যা, আমি অতি সাধারণ
একটা ছেলে, এ হয় না'!
রাজকন্যা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, 'তোমার গায়ে যখন কাপড় থাকে না তখনও কি তুমি অতি সাধারণ ছেলে'?


*এটা শুভ'র গল্প। এর সঙ্গে লেখকের কোন প্রকার যোগসূত্র খোঁজা বৃথা।
**স্কেচ-স্বত্ব: সংরক্ষিত