Monday, October 12, 2009

মওদুদী: চলমান এক হিউম্যান-বম্ব!

সাপের খোলস বদলাবার মতো নিজের মত বদলাতেন এই মানুষটি!
“পীর মোহসনিউদ্দিন দুদু মিয়া বলেন, মুওদুদী সাহেব নিজে কোন সনদপ্রাপ্ত মাওলানা নন। হায়দারাবাদ নিজামের দরবারে তদান্তিন সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের তুষ্ট করার জন্য তিনি কাজ করতেন। সেই প্রভুদের কাছ থেকেই তিনি মাওলানা খেতাব পান।”
(দৈনিক পাকিস্তান, ২০ অক্টোবর ১৯৬৯)

বড় ভাই আবুল খায়ের মওদুদীর সুপারিশে আবুল আলা (সর্বোচ্চ পিতা) মওদুদী সাহেব হায়দারাবাদের দারুত তরজমা থেকে দর্শনের একটি গ্রন্থ তরজমা করে পারিশ্রমিক পান ৫০০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি প্রকাশনা শুরু করেন, মাসিক তরজমানুল কোরআন।
তিনি সালজুক বংশ, হায়দারাবাদের ইতিহাস, হায়দারাবাদের নিজামমুলক আসিফ জাহর জীবন চরিত রচনা করে হায়দারাবাদের নিজাম শাসন পদ্ধতি তথা রাজতন্ত্রের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে শাসক গোষ্ঠীর অনুগ্রহদৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও তার দল ‘হেজবুল্লা’ এবং মিশরের শেথ হাসান বানা ও তার দল ‘ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ’ এর প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে এদের ভাবাদর্শে একটি দল ‘জামাতে ইসলামী, হিন্দ’ গঠন করেন।

মওদুদীর মধ্যে বিভিন্ন যুগের ইসলামী চিন্তাবিদদের চিন্তাধারা ও মতামতকে নিজের করে, নিজের ভাষায় প্রকাশ করার প্রবণতা লক্ষণীয়! এবং নিজ স্বার্থে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা।

হায়দারাবাদ জীবনে তিনি 'মুসলমান' শব্দের নিম্নরুপ ব্যাখ্যা দেন: “ইসলাম জাতীয়তার যে জীবন বৃত্ত এঁকেছে, তা ঘিরে রয়েছে একটি কলেমা, লা ইলাহা ইল্লাল্লা...। এই কলেমার উপরেই বন্ধুতা এবং শত্রুতা। এটা স্বীকার করলে বন্ধু, অস্বীকার করলেই শত্রু । ”
(মওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

কংগ্রেস ও ভারতের স্বাধীনতা সম্বন্ধে বলেন: “মুসলমানদের পক্ষে দেশের এরুপ স্বাধীনতা সংগ্রাম করা হারাম, যার পরিণামে ইউরোপিয়ান অমুসলমানদের হাত থেকে ভারতীয় অমুসলিমদের নিকট হস্তান্তর হবে।”
(মওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

“তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে হারাম আন্দোলন এবং পাকিস্তানের জন্য যারা জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের হারাম মউত হয়েছে বলে ফতোয়া দেন।”
(দৈনিক পাকিস্তান, ২১ অক্টোবর ১৯৬৯)

কিন্তু ভারত বিভক্ত হলে তিনি পাকিস্তানে চলে আসেন। এ সময় তার দলের সংখ্যা ছিল ৫৩৩ জন।

“জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য- মুসলমান হিসাবে আমি এ নীতির সমর্থক নই।”
(মুওদুদীর চিন্তাধারা/ মাওলানা আবদুল আওয়াল, প্রকাশ ১৯৬৯)

“...মওদুদী তার প্রচারিত আদর্শে এ কথাই বারবার প্রকাশ করেছেন, যে, তলোয়ারের জোরেই ইসলাম দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, দাওয়াতে নয়...।”
(ড. মোহাম্মদ হাননান/ বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ৪র্থ খন্ড)

মওদুদী বিভিন্ন সময় প্রয়োজন অনুসারে কোরানের ভুল ব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন। তাঁর স্বকপোলকল্পিত ফতোয়ার জন্য, 'আহমেদি' মতবাদের প্রতি ভয়ংকরসব ফতোয়া-বানীর কারণে বিনষ্ট হয়েছে হাজার-হাজার প্রাণ! তাঁর স্বোপার্জিত এই সম্পদ পরবর্তীতে ব্যবহার করেছে জামাত-ই-ইসলাম।

নিজের জীবন-ভিক্ষা করে ফাঁসির রশি এড়াতে পেরেছিলেন। রাওয়ারপিন্ডি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা গোলামউল্লাহ খান এক বিবৃতিতে বলেন: “কোরআনের অপ-ব্যাখ্যা করা বইগুলো মওদুদী সাহেব প্রত্যাহার করে নেবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার কথা রাখেননি।"


যে কোরানকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি ফেৎনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছিলেন আমি সেই কোরান থেকেই ধার করে বলি:
”...ফিৎনা হত্যার চেয়েও মারাত্মক।”
(২ সুরা বাকারা: ১৯১)

”আল্লা তো ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদেরকে ভালোবাসেন না।”
(৫ সুরা মায়িদা: ৬৪)

”তাদেরকে যখন বলা হয়, ’পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না’, তখন তারা বলে, আমরাই তো শান্তি বজায় রাখি। সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে, কিন্তু এরা তা বুঝতে পারে না।”
(২ সুরা বাকারা: ১১-১২)

*ছবিঋণ: গুগল

মুক্তিযুদ্ধে: একজন সিরাজুর রহমান

যুদ্ধ নামের কদাকার পশুর মুখোমুখি হলে মানুষ কোন পর্যায়ে নেমে যায় এটা আঁচ করা মুশকিল! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়টা আজ আমরা, এই প্রজন্মের পক্ষে আঁচ করা প্রায় অসম্ভব। এটা তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারবেন যারা সেই সময়টা অতিক্রম করে এসেছেন।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা সত্য ঘটনা। বৃষ্টির মত বোমা পড়ছে। বাবা তার সন্তানকে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন। বাবা তার সন্তানের মাথায় একটা হাত দিয়ে রেখেছেন। এই অবোধ বাবা হাত দিয়ে বোমা থেকে তাঁর
সন্তানকে রক্ষা করতে চাইছিলেন। ঠান্ডা মাথায় বাবার এই আচরণ নিয়ে বেদম হাসাহাসি হবে কিন্তু তখনকার সময়ের জন্য এটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা।

১৯৭১-এর সেই উত্তাল সময়ে কতশত মানুষের প্রিয়মানুষ কে কোথায় ছিটকে পড়েছিল তার হিসাব কে রাখে! প্রিয়মানুষের একটা খবরের জন্য কেউ তার শরীরের একটা অংশ অবলীলায় খোয়াতে রাজি হতেন এ আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি।
আজকের মত তখন তো আর ইমেইল, ফ্যাক্স, ফোনের সুবিধা ছিল না। ওই সময়ে কেউ কেউ ঠিকই অসাধারণ কাজটা করে গেছেন।

যেটা আমি বারবার বলে আসছি, একটা যুদ্ধ বিশাল ব্যাপার। একেকজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেকরকম। কেবল স্টেনগান দিয়েই যুদ্ধ হয় না, একটা ফটোগান কতটা শক্তিশালী তা সহজেই অনুমেয়!
বিশেষ-বিশেষ কাউকে নিয়ে হরদম 'নর্তন-কুর্দন' করার মানে হচ্ছে অন্যদের খাটো করা, প্রকারান্তরে নিজেকেই খাটো করা। একটা বামন-বিকলাঙ্গ হয়ে বড় হয়ে উঠা।

“সিরাজুর রহমানের (তৎকালীন বিবিসি, বাংলা বিভাগ) সাক্ষাৎকার:
১৯৭১ সালে বিবিসিতে কিছু সমস্যা ছিল। আমাদেরকে শ্রোতাদের সঠিক এবং সর্বশেষ খবর পরিবেশন করতে হবে। কোন অবস্থাতেই যেন তথ্য বিভ্রাটের আঙ্গুল না ওঠে!
আমরা বাংলা বিভাগে যারা ছিলাম, সংখ্যায় অত্যন্ত কম ছিলাম। আমাদের পক্ষে সব কিছু সামলানো কঠিন ছিল।
সৌভাগ্যবশত, তখন আশেপাশে কিছু ছাত্র ছিলেন, তাঁরা উচ্চ শিক্ষার জন্য এ দেশে এসেছিলেন। তাঁরা আমাদেরকে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন!

আমার মনে আছে, আমার সহকর্র্মী শ্যামল লোধ, কমল বোসসহ অনেক দিন সকাল ৯টা থেকে অফিসে এসে আবার রাত ২টা, কখনো ৩টায় বাসায় ফিরতাম!

এরমধ্যে আবেগের ব্যাপারটাই প্রধান ছিল। দেশ থেকে অবিরাম খবর আসছে। দেশের জন-সাধারণের দুঃখ দুর্দশা, ভোগান্তি, মৃত্যু আমাদেরকে তাড়িত করতো!

সবচেয়ে জরুরী যে ব্যাপারটা ছিল, আমাদের হাজার হাজার বাঙ্গালী যারা পাকিস্তানে আটকা পড়ে ছিলেন, দেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার কোন উপায় ছিল না তাঁদের! আবার দেশের ওরাও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। দু’ তরফ থেকেই তারা আমাদের স্মরণাপন্ন হচ্ছিলেন।
প্রথমত, আমরা বাংলাদেশ থেকে পাওয়া কিছু চিঠি
পাকিস্তানে আটকা পড়া আত্মীয় স্বজন এবং পাকিস্তানে আটকা পড়াদের চিঠি বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। কয়েক হাজার চিঠি-পত্র এভাবে এদিক থেকে ওদিকে পাঠানো হয়েছিল।

আমাদের পর্যাপ্ত লোকবল ছিল না এগুলো দেখাশোনা করার জন্য। শেষে আমরা ‘সেতু বন্ধন, সাগর পাড়ের বাণী’ অনুষ্ঠানে তাঁদের খবরাখবর চিঠি পাঠের মাধ্যমে দেয়া শুরু করলাম।
অজস্র চিঠি পেতাম আমরা। সেই সময় আমাদের শ্রোতারা কী যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন এই অনুষ্ঠানের জন্য এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি!

আরও মনে পড়ে, ১৬ ডিসেম্বর, যখন অমরা টের পেলাম
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করবে তখন আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিলাম।
আমার মনে আছে, যখন আমরা সেই অনুষ্ঠানটি প্রচার করি, ঠিক সেই সময়ে ইয়াহিয়া খান
পাকিস্তানে বেতার ভাষণ দিচ্ছিলেন।
আমি কানে ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনছিলাম আর মুখে আমাদের শ্রোতাদের বাংলায় খবরটা দিয়ে যাচ্ছিলাম, ইয়াহিয়া খান কি বলছেন একই সঙ্গে! অর্থাৎ ইয়াহিয়া যে সময় ইংরাজীতে ভাষণ দিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের শ্রোতারা
বাংলায় পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পনের খবরও শুনতে পাচ্ছিলেন ।
সেই মুহূর্তের কথা আমার মনে পড়ে, কান্না চেপে রাখতে পারছিলাম না তখন। অথচ বেতার সাংবাদিকের জন্য আবেগের প্রকাশ অযোগ্যতার পরিচয় কিন্তু তবুও সে দিন কান্না চেপে রাখতে পারিনি!

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৫ খন্ড