Monday, August 31, 2009

খোদেজা: ৫

নিশি বেরিয়ে দেখল ছেলেটা গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছেকেমন গোল হয়ে শুয়েছেছেলেটা অদ্ভুতএর শোয়ার খাট আছে কিন্তু এর নাকি মাটিতে শুয়েই আরামআচ্ছা, সোহাগের ভাল নামটা যেন কি? কখনও সম্ভবত জিজ্ঞেস করা হয়নিসোহাগের সঙ্গে নিশির কথা হয় খুব কমনিশির মন ভাল থাকলে অবশ্য আলাদা কথা, তখন নিশি নিজ থেকেই একগাদা কথা বলে

নিশিকে সোহাগের ঘুম ভাঙ্গাতে বেগ পেতে হলোসোহাগ নিশিকে দেখে চোখ মেলল, ধড়মড় করে উঠে বসল

আফা, রাগ কইরেন না, বইয়া বইয়া ঘুমাই গেছিলামঅক্ষণই কাম শ্যাষ কইরা ফালামু

কাজ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ইচ্ছা করলে ঘুমাঘুমাবি?

না গো আফা, আর ঘুমাইতে ইচ্ছা করতাছে না

নিশি ঝোকের মাথায় বলে বসল, বাড়িতে যাবি রে, সোহাগ?

সোহাগ চোখ বড় বড় করে বলল, হেছা আফাআল্লার কিরা, মিছা কইতাছেন না

নিশির বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ঘোর কেটে গেলবাড়িতে সোহাগকে নিয়ে যাবেটা কে? জাবীরকে বললে ও ঠিক ঝাঁঝিয়ে উঠবে: তোমার কোন কান্ডজ্ঞান নাই নাকি!

নিশি হয়তো জটিলতা এড়াবার জন্য বলবে: আহা, একটা কথা বলেছি, না করলে না করবে, এ নিয়ে হইচই করার তো কিছু নাই! ছেলেটা কতদিন হলো বাড়িতে যায় নাও খুব মন খারাপ করে থাকে

হইচই-হইচইহোয়াট ডু য়্যু মীন বাই হইচই! একটা কথা বুঝে, না বুঝে বলে আমার মাথায় একটা বোঝা চাপিয়ে দিলেএমনিতেই আমার যন্ত্রণার শেষ নাই

তখন নিশির কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কোন উপায় থাকবে নানিশি প্রায়শ ভাবে, আচ্ছা এই মানুষটার সঙ্গে ও ঝুলে আছে কিভাবে? মানুষটাকে ছেড়ে যাবে ভাবলেই বুকের গহীন থেকে অজানা এক কষ্ট পাক খেয়ে উঠে কেন? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর নিশির কি কোন দিনই জানা হবে না? নিশির কি এ দ্বিধা থেকে কোন মুক্তি নেই

নিশির বিব্রত ভঙ্গি, সোহাগ, দেখব তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে

সোহাগ মিইয়ে যায়খানিকক্ষণ কি যেন আনমনে ভেবে বলে, আফা, আমি এখলা এখলা চইলা যামু, কুনু সমস্যা হইব নারাস্তাই আমারে টাইন্যা লয়া যাইব

নিশি আঁতকে উঠে, যাহ, কি বলিস, মাথা খারাপ, তুই একলা একলা যাবি কেমন করে

কুনু সমুস্যা হইব না, আফাচোক্কের নিমিষে যামু গা

নিশি আলগা গাম্ভীর্য এনে বলল, এমন পাগলামির কথা আর যেন না শুনি, আমি তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলবসে কোন একটা ব্যবস্থা করবেহ্যা রে, সোহাগ, তোর লেখাপড়া কোদ্দুর হল?

সোহাগের অক্ষরপরিচয় আগে থেকেই ছিলনিশি কোন কোন দিন ওকে নিয়ে পড়তএকদিন বই-খাতা এনে দিল, ক-দিন সোহাগ পালিয়ে পালিয়ে থাকলনিরূপায় হয়ে একসময় ভাঙ্গ ভাঙ্গা বানান করে পড়া শুরু করলবিচিত্র সব ছড়া লেখা শুরু করল


পালকি চলে, রবিন্দ্রনার ঠকুর

"পালকি চলে

পালকি চলে

গান তরে

আগুন জলে

ছদু গায়ে

আদুল গায়ে

জাচে তারা

রদি সারে

মনা মদু

চখ মদু..."।


আরেকদিন লিখল:

"ফালাইননা খারাপ

ফালাইননা বানর

ফালাইননা দুষ্টামি করে

ফালাইননাকে লাতি মারব

ফালাইননাকে ঠাওয়া মেরে ফেলে দিব

ফালাইননা একটা মেতর, সে গু সাপ করে"


নিশি হাসি গোপন করে বলেছিল: সোহাগ, ফালাইন্যা কে রে?

সোহাগ কোন উত্তর দেয়নিমুখ নিচু করে কেবল হেসেছিলফালাইন্যা কি ওর প্রিয় বন্ধুর নাম? নিশি নাছোড়বান্দা: বল না সোহাগ, ফালাইন্যা কি তোর প্রিয় বন্ধু?

সোহাগ বলেছিল: ফ্রিয় কি, আফা?

ধুত, ফ্রিয় না, প্রিয়

সোহাগের মুখ নিচু হতে হতে গিয়ে হাঁটুতে ঠেকত,

ফালাইন্যা আবার কি নাম রে?

বুঝেন নাই আফা, ফালাইননার মাইনে হইল গিয়া যারে সবাই ফালাইয়া দেয়

কি বলিস, বুঝিয়ে বল

হের আগে হের ভাই ভইন হক্কলে মইরা যাইত তোএর লিগ্যা হের নাম রাখছিল ফালাইননা

রাখলে কি হয়?

অমা, জানেন না বুজি, ফালাইননা হইল ফালাইননা, হেরে তো আজরাইলও নেয় নাআজরাইল না নিলে মরব কেমনে? আফা, আফনে দেহি কুছতা জানেন না

এক্ষণ সোহাগ মুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে ছাদের টিকটিকি তাড়াবার চেষ্টা করছেবিচিত্র শব্দটা করতে করতেই বলল, আফা-আফা গো, দেখছেন নি, এইডা কেমুন লাফলালাফলি-ঝাপলাঝাপলি করতাছে?

নিশি অনেক কষ্টে হাসি গোপন করল, সোহাগ, এতদিন এখানে থেকেও তুই ভাষাটা বদলাতে পারলি না!

সোহাগ মুখ ভরে হাসল, আফা, আপনেগো কথা কইয়া শান্তি নাইফাপড় লাগে

সোহাগ, তোকে যে ছড়াগুলো শিখিয়েছিলাম, মনে আছে না, নাকি ভুলে গেছিস?

সোহাগের এই পরীক্ষা টাইপের বিষয়গুলো ভাল লাগে নাসে কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আফা, আমাগো গেরাম দেশের একটা ছড়া কই?

বল

"আতা গাছের মাথা নাই

মাথার মইদ্যে চুল নাই

চুলের মইদ্যে উকুন নাই

উকুনের মরন নাই

মরলে কিন্তু বাছন নাই"


নিশির এবার হাসি চাপা সম্ভব হলো না

আফা, সোন্দর না?

হুঁ, সুন্দরকিন্তু তুই দেখি দুনিয়ার সব আজগুবি কথা বলিস

সোহাগের মন খারাপ হয়ে গেলসে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আপা তার কথা খুব একটা পছন্দ করেনিআপা এমন করলে তার বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়!

নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায়?

কেউ কেউ জানতে চান, আচ্ছা, অমুক সাইটে লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?

আমি চিঁ চিঁ করে বলি, ইয়ে মানে লিখি তো, আমার সাইটে।

বিরক্তিভরা উত্তর, হুশ-হুশ, একটা লেখা আপনার সাইটে ক-জন পাঠক পড়ে। অমুক সাইটে যা তা লেখারও একশ পাঠক পাওয়া যায়।


এর উত্তরে আমার গুছিয়ে বলার কিছু থাকে না। সবটুকু বললে তিনি নির্ঘাত বলে বসবেন, ওরি...। অনলাইনে লেখালেখির অনেক হ্যাপা। আমি একজন দুর্বল মানুষ বলেই হয়তো বাড়তি চাপ নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনেকের কী হাসি!

এমনিতেও একটা লেখা লিখে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকি, ইশরে, কোথাও কোন ভুল হলো না তো? কেউ রে রে করে তেড়ে আসছে না তো?


আমার কেন যেন মনে হয়, গণ-সাইটে ব্লগার-লেখক থাকেন পুরোপুরি অরক্ষিত। যে কেউ যা খুশি বলে দিতে পারে। কোন অসঙ্গতি-ভুল পাওয়া গেলে ধরিয়ে দিলেই হয়- কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে এতে আমার কোন লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু কোন বেকুব কাক একজনের মাথায় হাগু করে দিয়েছে তিনি সেই রাগ-ঝালটা ঝাড়বেন এখানে এসে এটা তো কোন কাজের কাজ না। এরা কেন যে ভুলে যান ফ্রি-ইস্টাইল কুস্তিতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়- একজন বেশ্যারও কিছু অধিকার আছে। ইচ্ছা হলেই পাবলিক-প্লেসে 'ধুম মাচা দে ধুম মাচা দে, ধুম' গলা ছেড়ে গাওয়া যায় না।

হেথায় কখনও কখনও এমনটা মনে হয় কেউ কেউ লেখা পাঠ করে মাথা কিনে নিচ্ছেন। একজনকে পোস্ট দিয়ে এক ঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নইলে মানুষটা চটে লাল হবেন, শ্লেষভরা কন্ঠে মন্তব্য করবেন, 'পোস্ট দিয়ে কোথায় উধাও হইল। আসলে বলার কিছু নাই তো, তাই ভাগছে'।


দূর-দূর। অন্য কোন সাইটের চেয়ে নিজের সাইটে লেখা ঢের আনন্দের। কোন বাড়তি চাপ নেই, নিজের মতো করে লিখে যাওয়া। কেউ না পড়লে মনিটরে ঠ্যাং তুলে পেট ভাসিয়ে নিজের লেখা নিজেই পড়া। নিজের লেখা নিজে পড়া যাবে না এমন কোন বে-আইন তো আর চালু নেই!

তদুপরি এটা আজও বুঝে উঠিনি, নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায় এটা নেড়া ভালো বলতে পারবে কিন্তু আমি কেন গেছি? লোভ-লোভ! মন্তব্যর লোভ নাকি স্পর্শের লোভ, কে জানে?

চুপিচুপি পুরনো সেই কথাটার চর্বিতচর্বণ করি, আমার কাছে একেকটা মন্তব্য যেন একেকটা স্পর্শ।