Search

Loading...

Saturday, August 1, 2009

খোদেজা: ৪

নিশির প্রচন্ড ক্ষুধা বোধ হচ্ছে। এতটা সময় পেরিয়ে গেছে, আশ্চর্য!
নিশি ডাকল, সোহাগ, এই সোহাগ।
উত্তর নেই। আশ্চর্য, গেল কই! ও তো কখনও না বলে ঘরের বাইরে যায় না। অনিচ্ছায় উঠে সোহাগকে পেল বারান্দার গ্রিল ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। চোখ আকাশে। কতক্ষণ ধরে এ এভাবে দাঁড়িয়ে আছে? এইটুকুন ছেলে কী দেখে আকাশে? ওর দাঁড়াবার ভঙ্গিতে কি যেন একটা আছে, বুকটা কেমন করে উঠে।

কি করিস, সোহাগ?
কিসছু না, আপা।
এভাবে কি দেখিস?
সোহাগ উত্তর দিল না। চোখ কেমন ভেজা। এ কাঁদছিল নাকি?
নিশি কোমলস্বরে বলল, সোহাগ, সারাদিন জানালা দিয়া কি দেখিস?
কিসছু না আফা, এমনই।
আহা, বল না, বলতে তো দোষ নাই। আমার কাছে তোর লজ্জা কী! বাড়ির কথা মনে পড়ছে?
সোহাগ কেঁদে না ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ন-না। তয় আমার ভইনের কথা মনে পড়তাছে। আফা, ফাপর লাগে।
ক-ক্কি, কি বললি বুঝলাম না। ফাপর কি!
মন পুড়ে আফা। কেমুন কেমুন লাগে। বুঝাইতে পারুম না গো, আফা।
সেটা বল, মন খারাপ লাগে। কেন রে?
আমার গেরামের কথা মনে অয়, আমার ভইনডা-।
সোহাগ, তোর বোন তোর চেয়ে বড়ো, না ছোট?
ছোড আফা।
তোর বোনের বয়স কত রে?
হেইডা তো জানি না। বড় ঢলডার সুময় হইছিল।
কি কস, বুঝি না। ঢল কি।
ফানি গো আফা, ফানি। যেইদিকে দুই চোক যায় হেই দিকে ফানি।
ফানি নারে গাধা, বল পানি।
শুদ্দু ভাষা কইতে ফারি না, আফা। ফাপড় লাগে।
ভালা মুসিবত। ইয়ে তোর বোন তোর থেকে কত ছোট রে?
তা ক্যামনে কই! মইদ্যে এক ভাই মইরা গেল। তয়, আমরা পিট্টাপিট্টির মতন আছিলাম। আফা, হের কতা মনে হইলে বুকে ফাপড় লাগে। দম আটকায়া আসে।

নিশি অনুমান করল, সোহাগের বয়স আট-দশ হলে এর বোনের বয়স ছয়-সাত হবে। গ্রামে তো লম্বা সময় গ্যাপ দিয়ে বাচ্চা নেয়ার কথা কেউ ভাবে না। ফি বছর বাচ্চা হয়।
তোর বোনের নাম কি, সোহাগ?
খোদেজা। আফা, হে না এমুন পাগলি, হি হি হি, হে হাসের লগে কথা কয়।
কি বলিস!
হ আফা। হের মেলা হাস। আফা, আমি নিজের চোককে দেখছি ছিনি কয়া ডাক দিলে ল্যাংড়া হাসটা আগাইয়া আসে। খোদেজারে ঠুক্কুর দেয়।
চিনি কি!
আফা, নাম গো, হাসটা নাম। হের একেটডা হাসের একেক নাম। ছিনি, লবন, মিঠাই।
বলিস কী!
মিছা কইলে আমারে য্যান বক্কিলা খায়।
বক্কিলা কি?
সোহাগ ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিল, বক্কিলা শব্দটার অর্থ এর জানা নাই। কে জানে, ভয়ংকর কিছু একটা হবে। যেটা নাম বলে সোহাগের বয়সের শিশুরা কঠিন শপথ করে। অজানা ভয়ে থরথর করে কাঁপে!
নিশির বুকের কোন এক গহীন থেকে একটা বেদনা পাক খেয়ে উঠে। এই শিশুটির অজানা বেদনাগুলো আজ বড়ো স্পষ্ট হয়ে উঠে। নিশিরা সময়মতো বাচ্চা নিলে কে জানে এর বয়সী একটা শিশু থাকত তাদের!

নিশি কথা ঘুরাবার জন্য বলল, তুই ভাত খেয়ে নিয়েছিস তো?
ভুক নাই।
আরে পাগল, বলিস কী! এত বেলা হলো তুই এখনও খাস নাই কেন! আমারও ক্ষিধা লেগেছে, আয় একসাথে খাই।
আপা, ভাইজান আইব না?
নিশি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলল, না। কেন যেন নিশির এক্ষণ পা ছড়িয়ে খুব করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। সোহাগের জন্য নাকি নিজের জন্য, কে জানে!