Loading...

Monday, August 31, 2009

খোদেজা: ৫

নিশি বেরিয়ে দেখল ছেলেটা গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছেকেমন গোল হয়ে শুয়েছেছেলেটা অদ্ভুতএর শোয়ার খাট আছে কিন্তু এর নাকি মাটিতে শুয়েই আরামআচ্ছা, সোহাগের ভাল নামটা যেন কি? কখনও সম্ভবত জিজ্ঞেস করা হয়নিসোহাগের সঙ্গে নিশির কথা হয় খুব কমনিশির মন ভাল থাকলে অবশ্য আলাদা কথা, তখন নিশি নিজ থেকেই একগাদা কথা বলে

নিশিকে সোহাগের ঘুম ভাঙ্গাতে বেগ পেতে হলোসোহাগ নিশিকে দেখে চোখ মেলল, ধড়মড় করে উঠে বসল

আফা, রাগ কইরেন না, বইয়া বইয়া ঘুমাই গেছিলামঅক্ষণই কাম শ্যাষ কইরা ফালামু

কাজ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ইচ্ছা করলে ঘুমাঘুমাবি?

না গো আফা, আর ঘুমাইতে ইচ্ছা করতাছে না

নিশি ঝোকের মাথায় বলে বসল, বাড়িতে যাবি রে, সোহাগ?

সোহাগ চোখ বড় বড় করে বলল, হেছা আফাআল্লার কিরা, মিছা কইতাছেন না

নিশির বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ঘোর কেটে গেলবাড়িতে সোহাগকে নিয়ে যাবেটা কে? জাবীরকে বললে ও ঠিক ঝাঁঝিয়ে উঠবে: তোমার কোন কান্ডজ্ঞান নাই নাকি!

নিশি হয়তো জটিলতা এড়াবার জন্য বলবে: আহা, একটা কথা বলেছি, না করলে না করবে, এ নিয়ে হইচই করার তো কিছু নাই! ছেলেটা কতদিন হলো বাড়িতে যায় নাও খুব মন খারাপ করে থাকে

হইচই-হইচইহোয়াট ডু য়্যু মীন বাই হইচই! একটা কথা বুঝে, না বুঝে বলে আমার মাথায় একটা বোঝা চাপিয়ে দিলেএমনিতেই আমার যন্ত্রণার শেষ নাই

তখন নিশির কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কোন উপায় থাকবে নানিশি প্রায়শ ভাবে, আচ্ছা এই মানুষটার সঙ্গে ও ঝুলে আছে কিভাবে? মানুষটাকে ছেড়ে যাবে ভাবলেই বুকের গহীন থেকে অজানা এক কষ্ট পাক খেয়ে উঠে কেন? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর নিশির কি কোন দিনই জানা হবে না? নিশির কি এ দ্বিধা থেকে কোন মুক্তি নেই

নিশির বিব্রত ভঙ্গি, সোহাগ, দেখব তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে

সোহাগ মিইয়ে যায়খানিকক্ষণ কি যেন আনমনে ভেবে বলে, আফা, আমি এখলা এখলা চইলা যামু, কুনু সমস্যা হইব নারাস্তাই আমারে টাইন্যা লয়া যাইব

নিশি আঁতকে উঠে, যাহ, কি বলিস, মাথা খারাপ, তুই একলা একলা যাবি কেমন করে

কুনু সমুস্যা হইব না, আফাচোক্কের নিমিষে যামু গা

নিশি আলগা গাম্ভীর্য এনে বলল, এমন পাগলামির কথা আর যেন না শুনি, আমি তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলবসে কোন একটা ব্যবস্থা করবেহ্যা রে, সোহাগ, তোর লেখাপড়া কোদ্দুর হল?

সোহাগের অক্ষরপরিচয় আগে থেকেই ছিলনিশি কোন কোন দিন ওকে নিয়ে পড়তএকদিন বই-খাতা এনে দিল, ক-দিন সোহাগ পালিয়ে পালিয়ে থাকলনিরূপায় হয়ে একসময় ভাঙ্গ ভাঙ্গা বানান করে পড়া শুরু করলবিচিত্র সব ছড়া লেখা শুরু করল


পালকি চলে, রবিন্দ্রনার ঠকুর

"পালকি চলে

পালকি চলে

গান তরে

আগুন জলে

ছদু গায়ে

আদুল গায়ে

জাচে তারা

রদি সারে

মনা মদু

চখ মদু..."।


আরেকদিন লিখল:

"ফালাইননা খারাপ

ফালাইননা বানর

ফালাইননা দুষ্টামি করে

ফালাইননাকে লাতি মারব

ফালাইননাকে ঠাওয়া মেরে ফেলে দিব

ফালাইননা একটা মেতর, সে গু সাপ করে"


নিশি হাসি গোপন করে বলেছিল: সোহাগ, ফালাইন্যা কে রে?

সোহাগ কোন উত্তর দেয়নিমুখ নিচু করে কেবল হেসেছিলফালাইন্যা কি ওর প্রিয় বন্ধুর নাম? নিশি নাছোড়বান্দা: বল না সোহাগ, ফালাইন্যা কি তোর প্রিয় বন্ধু?

সোহাগ বলেছিল: ফ্রিয় কি, আফা?

ধুত, ফ্রিয় না, প্রিয়

সোহাগের মুখ নিচু হতে হতে গিয়ে হাঁটুতে ঠেকত,

ফালাইন্যা আবার কি নাম রে?

বুঝেন নাই আফা, ফালাইননার মাইনে হইল গিয়া যারে সবাই ফালাইয়া দেয়

কি বলিস, বুঝিয়ে বল

হের আগে হের ভাই ভইন হক্কলে মইরা যাইত তোএর লিগ্যা হের নাম রাখছিল ফালাইননা

রাখলে কি হয়?

অমা, জানেন না বুজি, ফালাইননা হইল ফালাইননা, হেরে তো আজরাইলও নেয় নাআজরাইল না নিলে মরব কেমনে? আফা, আফনে দেহি কুছতা জানেন না

এক্ষণ সোহাগ মুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে ছাদের টিকটিকি তাড়াবার চেষ্টা করছেবিচিত্র শব্দটা করতে করতেই বলল, আফা-আফা গো, দেখছেন নি, এইডা কেমুন লাফলালাফলি-ঝাপলাঝাপলি করতাছে?

নিশি অনেক কষ্টে হাসি গোপন করল, সোহাগ, এতদিন এখানে থেকেও তুই ভাষাটা বদলাতে পারলি না!

সোহাগ মুখ ভরে হাসল, আফা, আপনেগো কথা কইয়া শান্তি নাইফাপড় লাগে

সোহাগ, তোকে যে ছড়াগুলো শিখিয়েছিলাম, মনে আছে না, নাকি ভুলে গেছিস?

সোহাগের এই পরীক্ষা টাইপের বিষয়গুলো ভাল লাগে নাসে কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আফা, আমাগো গেরাম দেশের একটা ছড়া কই?

বল

"আতা গাছের মাথা নাই

মাথার মইদ্যে চুল নাই

চুলের মইদ্যে উকুন নাই

উকুনের মরন নাই

মরলে কিন্তু বাছন নাই"


নিশির এবার হাসি চাপা সম্ভব হলো না

আফা, সোন্দর না?

হুঁ, সুন্দরকিন্তু তুই দেখি দুনিয়ার সব আজগুবি কথা বলিস

সোহাগের মন খারাপ হয়ে গেলসে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আপা তার কথা খুব একটা পছন্দ করেনিআপা এমন করলে তার বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়!

নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায়?

কেউ কেউ জানতে চান, আচ্ছা, অমুক সাইটে লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?

আমি চিঁ চিঁ করে বলি, ইয়ে মানে লিখি তো, আমার সাইটে।

বিরক্তিভরা উত্তর, হুশ-হুশ, একটা লেখা আপনার সাইটে ক-জন পাঠক পড়ে। অমুক সাইটে যা তা লেখারও একশ পাঠক পাওয়া যায়।


এর উত্তরে আমার গুছিয়ে বলার কিছু থাকে না। সবটুকু বললে তিনি নির্ঘাত বলে বসবেন, ওরি...। অনলাইনে লেখালেখির অনেক হ্যাপা। আমি একজন দুর্বল মানুষ বলেই হয়তো বাড়তি চাপ নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনেকের কী হাসি!

এমনিতেও একটা লেখা লিখে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকি, ইশরে, কোথাও কোন ভুল হলো না তো? কেউ রে রে করে তেড়ে আসছে না তো?


আমার কেন যেন মনে হয়, গণ-সাইটে ব্লগার-লেখক থাকেন পুরোপুরি অরক্ষিত। যে কেউ যা খুশি বলে দিতে পারে। কোন অসঙ্গতি-ভুল পাওয়া গেলে ধরিয়ে দিলেই হয়- কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে এতে আমার কোন লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু কোন বেকুব কাক একজনের মাথায় হাগু করে দিয়েছে তিনি সেই রাগ-ঝালটা ঝাড়বেন এখানে এসে এটা তো কোন কাজের কাজ না। এরা কেন যে ভুলে যান ফ্রি-ইস্টাইল কুস্তিতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়- একজন বেশ্যারও কিছু অধিকার আছে। ইচ্ছা হলেই পাবলিক-প্লেসে 'ধুম মাচা দে ধুম মাচা দে, ধুম' গলা ছেড়ে গাওয়া যায় না।

হেথায় কখনও কখনও এমনটা মনে হয় কেউ কেউ লেখা পাঠ করে মাথা কিনে নিচ্ছেন। একজনকে পোস্ট দিয়ে এক ঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নইলে মানুষটা চটে লাল হবেন, শ্লেষভরা কন্ঠে মন্তব্য করবেন, 'পোস্ট দিয়ে কোথায় উধাও হইল। আসলে বলার কিছু নাই তো, তাই ভাগছে'।


দূর-দূর। অন্য কোন সাইটের চেয়ে নিজের সাইটে লেখা ঢের আনন্দের। কোন বাড়তি চাপ নেই, নিজের মতো করে লিখে যাওয়া। কেউ না পড়লে মনিটরে ঠ্যাং তুলে পেট ভাসিয়ে নিজের লেখা নিজেই পড়া। নিজের লেখা নিজে পড়া যাবে না এমন কোন বে-আইন তো আর চালু নেই!

তদুপরি এটা আজও বুঝে উঠিনি, নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায় এটা নেড়া ভালো বলতে পারবে কিন্তু আমি কেন গেছি? লোভ-লোভ! মন্তব্যর লোভ নাকি স্পর্শের লোভ, কে জানে?

চুপিচুপি পুরনো সেই কথাটার চর্বিতচর্বণ করি, আমার কাছে একেকটা মন্তব্য যেন একেকটা স্পর্শ।

Sunday, August 30, 2009

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

এই দেশটা বড়ো বিচিত্র, ততোধিক বিচিত্র এখানকার লোকজন। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে-জান হাতে নিয়ে, ওভারব্রীজ ফাঁকা থাকলেও ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা অসংখ্য গাড়ির মাঝখান দিয়ে সাপের মত এঁকেবেকে রাস্তা পার হবে। যে দেশের যে চল!

উপজেলা চেয়ারমেনের বেতন একজন কাঠমিস্ত্রির সমান। তিনি যে কেমন ন্যাতা হবেন তা আর বলতে! এই ন্যাতা জনসেবা করার জন্য মুখিয়ে থাকবেন! ইনি রিলিফের গম বেচবেন না তো কো বেচবে?
মুষ্টিমেয় লেখক ব্যতীত অন্যরা লেখালেখি করবেন বিনে পয়সায়, লেংটি পরে দেশ উদ্ধার করবেন। একজন লেখকের কখনই ইচ্ছা করবে না চকচকে কাপড় পরতে, কালেভদ্রে সুস্বাদু খাবার খেতে। কারণ এঁদের রেকটাম বলে কোন জিনিস নাই অতএব খাবার গ্রহনেরও কোন তাড়া নাই। কৌপিন পরে উবু হয়ে লিখে লিখে হাতি-ঘোড়া মারবেন!

মসজিদের ইমামের বেতন হবে মেথরের চেয়েও কম! কী অবলীলায় আমরা ওঁর কাছ থেকে আশা করি ইনি ধর্ম গুলে সরবত বানিয়ে আমাদের খাইয়ে দেবেন। আমরা চুকচুক করে সেই সরবত পান করে 'সর্গে' যাত্রা করব!
অধিকাংশ মসজিদ-মাদ্রাসাই, বিশেষ করে গ্রাম-মফঃস্বলে, অবৈধ-দখলকরা জায়গায় গড়ে উঠেছে। এই নিয়ে কারও সামান্যতমও বিকার নাই। গ্রাম-গঞ্জের অধিকাংশ মসজিদগুলোয় আস্ত রেললাইন দিয়ে ঢাউস আকৃতির যে চার-পাঁচটা মাইক লাগানো থাকে এই রেললাইনগুলো চুরির মাল! একজন আমাকে জানিয়েছিলেন, আই, ডব্লিউ (রেলের ছোট পদের একজন কর্মকর্তা) সাহেব নাকি এটা দিয়েছেন। যেন আই, ডব্লিউ সাহেবের বাপের জিনিস এটা! অনেক মসজিদেরই বিদ্যুৎ সংযোগ অবৈধ!

'ঘুষ নামের সুখ-পাখিটা' নামের একটা লেখা ছিল শুভ'র ব্লগিং-এ। ওখানে লিখেছিলাম:
"আচ্ছা, আপনারা বলতে পারবেন, এ দেশে সবচেয়ে বেশি ঘুষ চালাচালি হয় কখন? দুই ঈদের আগে! এক ঈদের আগে থাকে পাক্কা একমাস রমজান। তো, রামাদান-সিয়াম-সংযমের মাসে এই কান্ডটা দেদারসে হচ্ছে...। মোদ্দা কথা, রমজানে ঘুষ খাওয়ার প্রবণতা বেশি!"

হায়রে সংযম! এ মাসে নাকি শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়। নমুনা দেখেই বুঝতে ক্লেশ পেতে হয় না। এটা লিখে তোপের মুখে পড়েছিলাম। ওয়েবসাইটে একজন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন, 'আপনি নিজে রোজা রাখেন না বলে আপনার গা জ্বলে'।

এই হয়েছে এক যন্ত্রণা! লিখে আবার জনে জনে ব্যাখ্যা দাও। ব্যক্তিগত আচারগুলোর প্রমাণ হাজির করিতে হইবে, গলায় আচার পালনের সার্টিফিকেট ঝুলাইয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিতে হইবে! নিমের ডাল লইয়া মসজিদ, বাজার, টাট্টিখানায় দাঁত ঘসিতে ঘসিতে...মুখে নিজের থুথু মাখিতে মাখিতে দাঁত পাতলা করিয়া ফেলিতে হইবে। আমি যে 'কেতনা বাড়া- কত্তো বড়ো' ত্যাগবাজ এটা প্রমাণ করিতে হইবে না!

যাগ গে, ধরে নিলাম, সরকারী চাকুরেরা বড়ই খারাপ লুক(!), দুষ্ট-পাজি। তা, ব্যবসায়ীরা কী? রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যর দাম কেমন হয় এটা ভুক্তভোগীরা ভালো বলতে পারবেন। সৌদির মতো বর্বর দেশেও নাকি রমজানে দ্রব্যমূল্যর দাম স্থিতিশীল থাকে। রমজানে আমাদের দেশে দশ পার্সেন্ট নাকি একশ পার্সেন্ট, ঠিক কত মার্জিনে এরা ব্যবসা করবেন এটা ব্যবসায়ী মহোদয়গণ নিজেরাও বলতে পারেন না।
ধরলাম, ব্যবসায়ীরা চুর(!), তস্কর-হার্মাদ।

আম-জনতা, সাধারণ মানুষ? যে কৃষক সারা বছর চুক্তিতে ত্রিশ টাকা লিটার দুধ বিক্রি করেছেন তিনি রমজানে ধাম করে ষাট টাকা লিটার করে দেন। বাড়তি টাকা দিতে না চাইলে দুধ দেয়া বন্ধ, শিশু একফোঁটা দুধ খেতে পেল কি না পেল তাতে তার কী আসে যায়! তিনি কেন এমনটা করলেন, কোন কারণ নাই? সবাই দু-নম্বুরি করছে তার বুঝি ইচ্ছা করে না!

অথচ হাক মাওলা-হাক মাওলা, প্রতি শ্বাসে ধর্মীয় বাতচিত শুনে মনে হয়, এমন লক্ষীদেশ এই গ্রহে আর কোথাও নাই। বেহেশত নেমে এসেছে ধরায়, এই গ্রহে কোথাও বেহেশত থেকে থাকলে এ দেশ ব্যতীত আর কোথায়!

Saturday, August 29, 2009

ঠাকুর, তেরে দো হাত দে দে...

ঠাকুর, তেরে দো হাত দে দে... (ঠাকুর, তোর দুই হাত আমায় দিয়ে দে)। ‘শোলে মুভির বিখ্যাত সংলাপ! বালকবেলায় যখন এটা বড় পর্দায় দেখছিলাম, উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। বুকে জগদ্দল পাথর। চোখে জল। আহা-আহা, ঠাকুরের হাত কী সত্যি সত্যি কেটে ফেলবে! ঠাকুর বেচারার কী হবে, খাবে কেমন করে? কী কষ্ট-কী কষ্ট!

কিন্তু এখন ভাবি, মানুষ হাত দিয়ে কী কেবল খায়-ই? কেউ কেউ লেখালেখিও করেন। আবার কেউ-বা, আমার মতো তিন টাকা দামের কলমবাজ লেখার চেষ্টাও করে। হায়, লেখার চেষ্টা...! এই চেষ্টাটা কত কাল ধরে চলবে?


আমি কম্পিউটার নামের যে বস্তুটায় এক আঙ্গুলে টাইপ করি, মানে করতাম, সেটার বাহারী নাম বটে ল্যাপটপ। পৃথুল- গাবদা-গোবদা টাইপের, তিন কেজির উপরে ওজন, ১ ন্যানো সেকেন্ডের ব্যাকআপের জন্য কুখ্যাত, এই জিনিসটা নিশ্চিত ল্যাপটপ নামের কলঙ্ক। সম্ভবত এই পৃথিবীর তাব ল্যাপটপ একে অনবরত অভিসপ্তাত বর্ষণ করে। জিনিসটার কোন বিকার নেই- এ চলে এর নিজের মত করে, গদাইলস্কর চালে।

যথারীতি আবারও বিগড়ে গেল। এইবার এই অবুঝকে কোন ভাবেই মানানো গেল না, বিগড়ে গেল তো গেলই। এই পোড়ার মফঃসলে সাইবার ক্যাফে দূরের কথা কাজ চালাবার মত একটা কম্পিউটারই খুজেঁ পাওয়া মুশকিল। যাদের আছে এরা খুলেও দেখেন না। আমার হাত গুটিয়ে বসে থাকা ব্যতীত কিই-বা করার ছিল? এমনিতে বোমা মারলেও লেখা বের হয় না কিন্তু্ এ সময়টাকে কী হাহাকার, আহারে, কত কিছু যে লেখার ছিল! যেমনটা চলে যাওয়া ট্রেন দেখলে মনে হয় আমার যেন কোথাও যাওয়ার ছিল কিন্তু ট্রেনে চেপে বসলে কেবলই মনে হয়, আমি তো কোথাও যেতে চাই না।

লিখতে না পেরে আমার তখন কেবলই মনে হচ্ছিল আমার যেন হাত থেকেও নেই।


ওদিন হঠা একজন ফোনে জানতে চাইলেন, আচ্ছা, কলম দিয়ে লেখেন না কতদিন? মানুষটা ভালই চমকে দিতে পেরেছিলেন। তাই তো! লম্বা শ্বাসও ফেললাম, আমার মত কলমচির কলমে লেখার সুযোগ কই- পত্রিকার জন্য লেখা, নাতিন, সেই দিন আর নাই! ভরসা, ওয়েব সাইটে লেখা। কম্পিউটারে না-লিখে উপায় কী!


একজন আবার বলেই বসলেন, মিয়া, রঙ্গ করো, তোমার লেখা পড়ার জন্য কে মুখিয়ে বসে আছে। আরে কী মূশকিল, এটা কি আর আমার জানা নাই, বিলক্ষণ জানা আছে। কেউ পড়বে না বলে কি আমি নিজের লেখা নিজে পড়তে পারব না, আজিব! এমন কোন আইন চালু আছে?


যাই হোক, ল্যাপটপের ডাক্তাররাসব আবার আসন গেড়েছেন ঢাকায়। কী যন্ত্রণা, ল্যাপটপ বগলে চেপে ঢাকায়- এ্যাহ, বললেই হলো আর কী! এই হয়েছে এক যন্ত্রণা- গোটা বাংলাদেশ ঢাকার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সমস্ত কিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। আহ ঢাকা, দেশের ১৫ কোটি লোক সব্বাই ঢাকায় বসবাস করছে, এটা দেখব সেই দিন আর দূরে নাই। যারা এর ব্যতয় করবে, ঢাকায় হিজরত করবে না তাদের কপালে চটি-খড়গ!

শাহাদুজ্জামানের মত অল্প-কিছু মানুষ ঠিকই আঁচ করতে পারছেন ঢাকা কলাপস করবে। তাঁকে আন্তরিক সেলাম।

যেটা ওই পোস্টে লিখেছিলাম:

কোন এক লেখায় আমি লিখেছিলাম, আমরা সব লাটিম বনবন করে ঘুরাচ্ছি ঢাকাকে কেন্দ্র করে! এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে ঢাকার উপর থেকে যত দ্রুত সম্ভব চাপ কমানো অতি আবশ্যকএখান থেকে সরাতে হবে ক্যান্টনমেন্ট, সরকারি যত আপিসতারচেয়ে জরুরি হচ্ছে কল-কারখানাগুলো সরানো
সরানো মানে নতুন করে হতে না দেয়া, সরিয়ে নিতে লোভ দেখানোজোর করে তো এটা করা যাবে নাএ জন্য মোটা মাথা থেকে চিকন বুদ্ধি প্রসব করতে হবে, যারা রংপুর, খুলনায় শিল্প-প্রতিষ্ঠান করবেন তাদের জন্য থাকবে ট্যাক্সসহ অন্যান্য কর আদায়ের বেলায় বিরাট ছাড়এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মান থাকবে এদের জন্য আমার ধারণা, এরা প্রয়োজনে বায়ারকে হেলিকপ্টার ভাড়া করে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।‍

...ঢাকায় ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে গাড়িতে আটকে থাকার চেয়ে দু-চার ঘন্টার জন্য হেলিকপ্টারে চাপতে চাইবেন না এটা আমি বিশ্বাস করি না। আরেকটু আগ বাড়িয়ে যোগ করি, দেখা যাবে, ওই বায়ার হয়তো ফার্স্ট ক্লাসে লক্ষ মাইল প্লেনে ভ্রমণ করেছেন কিন্তু হেলিকপ্টারে চড়ার সৌভাগ্য কখনই হয়নি। যেটা হবে এই দেশে এসে। দেশে ফিরে বায়ার তাঁর পরিচিত লোকজনদের, জনে জনে বলে বেড়াবেন, হেই ম্যান, বুঝলা... গেসিলাম বেংলাডেসে, ইমাজিন, হেলিকাপ্টারে করিয়া ফ্যাক্টারিতে নিয়া গেল। বিলিভ মী, হোল হেলিকাপ্টার হামার জইন্যে...।

Sunday, August 9, 2009

হায় ঢাকা...

ঢাকায় আমার যে অল্প ক’জন বন্ধু বান্ধব আছে, এরা যতোক্ষণ পর্যন্ত স্বীকার না যান, যে আমাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি ঢাকামুখো হওয়ার কথা কল্পনাও করি না! কাউকে পটাতে পারলে আমার আনন্দ দেখে কে, একেবারে হাত পা ঝাড়া! এদের পিছু পিছু আরামসে ঘুরে বেড়াই... আহ, কি যে শান্তি লাগে! ছোটবেলায় বাবার আঙ্গুল ধরে ঘুরে বেড়ানোর মজা পাই!

ঢাকায় গেলে আমার মনে হয় কোটি-কোটি পিপড়া কি এক কাজে-অকাজে সর্বদা ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকের হাসিতে মনিটরের পর্দা কেঁপে উঠবে, জানি কিন্তু এটাই সত্য; আমার কেবল মনে হয়, এই রে, হারিয়ে গেলাম বুঝি!
তার উপর লোকেশন মনে না থাকার বিষয়ে আমি অতি কুখ্যাত!

লেখালেখির কাজে আজিজ সুপার মার্কেটে আমাকে প্রায়ই যেতে হতো, এখনো যেতে হয়। যার কাছে যেতাম তাঁর অফিস ছিল দোতলায়, যদিও ওঠার জন্য অনেকগুলো সিড়ি আছে কিন্তু মনে রাখার জন্য সব সময় আমি একই সিড়ি ব্যবহার করতাম। সমস্য হতো ওয়াশরুম বা বাথরুমে গেলে, ওই ফ্লোরেই কিন্তু একটু দূরে। এখানকার সব রুমগুলো প্রায় এক রকম হওয়ায়, ফিরে এসে আমি ঠিক চিনতে পারতাম না। পরে ভয়ে আর ওয়াশ রুমে যেতে চাইতাম না।

এখানে প্রুফ দেখার জন্য অনেকক্ষণ থাকা হয়, কাঁহাতক আর ব্লাডারের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়! পরে একটা বুদ্ধি বের করলাম, বাথরুম থেকে ফিরে এসে যে সিড়ি পেতাম সোজা নীচে নেমে যেতাম। তারপর সেই আমার অতি পরিচিত সিড়ি দিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে ফিরে আসতাম। একদিন ধরা খেয়ে গেলাম।
যার কাছে যাই, প্রকাশক, তিনি সিড়ি বেয়ে উঠার সময় আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন, বললেন, বিষয়টা কি, গেলেন বাথরুমে, আসলেন নীচে দিয়ে!
আমি কথা ঘুরাবার জন্য বললাম, ইয়ে, মানে, নীচে একটা ইয়ে কেনার ছিল আর কি!
তিনি গলা ফাটিয়ে হেসে বললেন, চালবাজি করেন আমার সঙ্গে, এই নিয়ে আজ আপনাকে তিন দিন এই কান্ড করতে দেখলাম!

লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়, ওই মানুষটার আর বুঝতে বাকী রইল না যে আমার স্মরণশক্তি গোল্ডফিশের সমান। কী লজ্জা-কী লজ্জা, সহৃদয় মানুষটা পরে অবশ্য আমার সঙ্গে অফিসের কাউকে দিয়ে দিতেন! আমি একজনের পিছু পিছু বাথরুমে যাচ্ছি, লজ্জার একশেষ! অনেক বলে-কয়ে আগের নিয়মটাই চালু রাখলাম।
এই সহৃদয় মানুষটা বিদায় দেয়ার সময় নীচ পর্যন্ত কেবল এগিয়েই দিতেন না, রিকশাও ঠিক করে দিতেন। প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিতেন, রিকশাওয়ালা কমলাপুর স্টেশন ঠিক ঠিক চেনে কিনা! লেখার জগতের এই মানুষটার এ ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। 

তবে প্রত্যেকবার কঠিন হুমকিও দিতেন, কে বলে আপনাকে ঢাকা আসতে, নেক্সট টাইমে যেন আপনাকে ঢাকায় যেন আর না দেখি!

ঢাকায় আমার থাকার কোন জায়গা নাই অথচ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নেই যে এমন না
(আমি ঠিক জানি না, মনে হয় এমন, শহুরে লোকজনকে বিব্রত করা ঠিক হবে না) তবুও কেন জানি না কোথাও থাকা হয় না। অথচ অনেক যন্ত্রণা করে রাতের ট্রেনে সারা রাত কাবার করে ফিরেছি, পরের দিন ফেরা যাবে না এমন কোন দিব্যি কেউ দেয়নি, তবুও। কখনও সারারাত কমলাপুর স্টেশনে কাটিয়েছি, আমি নিশ্চিত মশারা সবগুলো দাঁত বের করে বলেছে, এমন গাধামানবকেই তো আমরা খুঁজছিলুম...। মশককুলের মধ্যে নিশ্চই এটা রটিয়ে দেয়া হয়েছিল, এমন ভালোমানুষের ছা আজকাল কোথায়! জানি না এইসব নিয়ে মশক মহোদয়গণ কোন সাহিত্য-ফাহিত্য রচনা করেছিলেন কিনা কিন্তু আমার যে ভারী লোকসান হয়েছে এমনও না।
এখানেই আমি পেয়েছি 'খোদেজা' উপন্যাসের একটা চরিত্র সোহাগকে। এর সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি জানতেই পারতাম না এইসব অভাগা শিশুদের অধিকাংশই ড্যান্ডি নামের নেশায় আসক্ত।
এখানেই আমি দেখেছি, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসা শিক্ষিত ছেলেগুলো কেমন করে পত্রিকা বিছিয়ে দিব্যি রাত পার করে দেয়।
তবে মানুষ হিসাবে নিজেকে বড় দীন-হীনও মনে হতো। কী অল্প ক্ষমতা নিয়েই না এসেছি! এই দেশে কী এমন কেউ নাই? এদের জন্য স্টেশনের কাছে একটা ডর্ম খুলবে? যেখানে প্রায় বিনামূল্যে এইসব শিক্ষিত ছেলে-মেয়েগুলো থাকতে পারবে। জটিলতার তো কিছু নাই। যারা চাকরির ইন্টাভিউর কার্ড দেখাতে পারবে তাঁরাই থাকবেন। দস্তরমতো নাম-ঠিকানা, সই-টিপসই যা যা প্রয়োজন রাখা হলো, একটা সফটওয়্যার বানিয়ে ডাটাগুলো রেখে দিলেই হয়। চাকরি পেয়ে পরে এরা সাধ্যমত পরিশোধ করবে। কেউ করবেন, কেউ করবেন না; তাতে কী আসে যায়?
আফসোস, কী একটা চুতিয়া জীবন নিয়েই এসেছি! শালার জীবন, কুতুয়া জীবন, আমি জুতা মারি এমন জীবনের!

মওলানা ভাসানী কর্তৃক স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা

...মহান নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল শুক্রবার ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মরণপণ সংগ্রামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করিয়াছেন। 
এই জনসভায় ভাষণ দানকালে তিনি জনগণকে সকল ভীরুতা-জড়তা ত্যাগ করে উক্ত সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।

মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই দাবী আইনসঙ্গত- এই সংগ্রামও আইনসঙ্গত। এটি নিছক হুমকির বা চাপ সৃষ্টির আন্দোলন নয়; স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই সংগ্রামের প্রতি এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার শান্তিকামী ও মুক্তিকামী জনগণের পূর্ণ নৈতিক সমর্থন থাকবে।’

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম জীবন-মরণের সংগ্রাম। পূর্ব পাকিস্তানের ১৪ লক্ষ মানুষ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ দিয়েছে। আমাদের সংগ্রামের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা হলে আরও ১৫/২০ লাখ লোক জীবন দিয়ে হয় অভীষ্ট সিদ্ধ করবে, না হয় মৃত্যু বরণ করবো।’

মওলানা বলেন, ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান বন্ধ করার জন্য কোন সৈন্য দেওয়া হয় নাই। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বললে যদি সৈন্য নিয়োগ করা হয়, তাহলে বিরাট ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।’

ইতিহাসের নজীরবিহীন প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলায় লক্ষ লক্ষ মৃতদেহের উপরে দাঁড়িয়ে যারা নির্বচনী প্রচারণার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে তাদের সম্পর্ক-এ মওলানা ভাসানী বলেন, ‘তাঁদের ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে চাই না, তারা নিজেরোই বলুন যে তারা জনতার শত্রু না মিত্র।’

‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে’ শরিক হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নব্বই বছরের বৃদ্ধ জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, ‘মুজিব, তুমি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সংগ্রামে যোগ দাও। যদি আমেরিকা ও ইয়াহিয়ার স্বার্থ-এ কাজ কর তাহলে আওয়ামী লীগের কবর ’৭০ সালে অনিবার্য। ...।'

এই প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী আরও বলেন, ‘যারা বলে নির্বাচনে শতকরা একশটি আসনে জয়ী হয়ে প্রমাণ করবে জনতা তাদের পেছনে রয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের মতের মিল নেই। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দেশপ্রেমিক গেরিলারা যখন লড়াই করেছে তখনও সংগ্রামের মুখে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা একথা প্রমাণ হয়নি যে নির্বাচনে বিজয়ীরা জনগণের বন্ধু। বরং তারা সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচারের তল্পীবাহক।’

মওলানা ভাসানী বলেন, ‘শুধু শ্লোগানে সংগ্রাম হয় না। হয় মরে যাব, নয়তো সার্বভৌমত্ব পাব এই কি আপনারা চান? বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করুন। যদি কোরবানী দিতে প্রস্তুত থাকেন তবে হাত তুলুন।’
জনতা মুহুমূহু শ্লোগানের সাথে হাত তোলেন। মওলানা ভাসানী তখন নিজেই শ্লোগান দেন, নারায়ে ‌'তকবীর-আল্লাহু আকবর’ ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান-জিন্দাবাদ’। 

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ কণ্ঠ থেকে তাদের প্রিয় নেতার শ্লোগান প্রতিধ্বনি ভেসে আসে।...’।"

(সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র দ্বিতীয় খন্ড)

*আমাদেরকে এটা প্রতি পদে পদে শেখানো হয়, দেশের সেরা সন্তানদেরদের কত প্রকারে নিচু-অসম্মান করা যায়। অতি উঁচু শ্রেণীর (এদের দাবী মোতাবেক) প্রিন্ট মিডিয়া মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীর খবরটা ছাপিয়েছে বিজ্ঞপ্তি আকারে। এই লজ্জা লুকাই কেমন করে আসলে কাপড় পরলেই মানুষ হটেনড জাতি থেকে সভ্য জাতি হয়ে যায় না!


সহায়ক সূত্র
১. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_17.html

**হুবহু-অবিকল, প্রতিটা অক্ষর আবু জুবায়ের নামের একজন, একটা ওয়েবসাইটে কপি-পেস্ট করে দিয়েছেন।
যেখানে প্রথম আলোর মত পত্রিকা ওয়েবসাইট থেকে একটা লেখা নিয়ে 'ওয়েবসাইট অবলম্বনে' লিখে দায় সারে সেখানে এই মানুষটাকে কী আর বলব! তবে সোর্স উল্লেখ করলে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত বলে আমার মনে হয় না। এ অন্যায়!

গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, গরীব মানুষ নামের নিক, ব্লগারের প্রতি যিনি এই বিষয়টা উল্লেখ করায় আমারও জানা হলো।

Wednesday, August 5, 2009

আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি

মুক্তিযোদ্ধা দুলা মিয়াকে (link)নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম।
এই অসমসাহসী বে-সামরিক মানুষটার সাহস দেখে সামরিক লোকজনরা পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি সাবেক সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ পর্যন্ত!

যুদ্ধে এই মানুষটার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গিয়েছিল। গামছা দিয়ে বেঁধে গুলির পর গুলি চালিয়েছেন, পিছ-পা হননি। একজন মানুষের এমন সাহস রগরগে মুভিকেও হার মানায়! মানুষটা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাঁর ছোট্ট মেয়েটির তাগিদে। পরবর্তীতে এই মেয়েটির সম্বন্ধে কোথাও কোন তথ্য পাইনি। কিন্তু খুব ইচ্ছা করছিল মেয়েটির সম্বন্ধে জানার। সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন কেমন আছেন- কেমনই বা আছেন দুলা মিয়া নামের সিংহবলোকনন্যায় মানুষটা?


দুলা মিয়া বলেছিলেন, তিনি কুমিল্লার শালদানদিতে থাকেন। কিন্তু শালদানদি তো বিশাল এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চল। কোথায়-কোথায় খুঁজব? তবুও বেরিয়ে পড়ি।
শালদানদির কেউ কিচ্ছু জানে না এই মানুষটা সম্বন্ধে। ‘অষ্টজঙ্গল’ নামের একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছি। নামের মতই জায়গা, ঝোপ-জঙ্গলের অভাব নাই! একজন মসজিদ রং করছিলেন, তিনি চিনতে পারলেন, 'আরে ওই ভটলা (মোটা) মানুষটা'।
মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অপমানসূচক কোন মন্তব্যে এখন আর অবাক হই না। তবুও এখন এই কথাটা বুকে ধক করে লাগে, চোখ ভিজে আসে। এমন একজন মানুষের এমন পরিচিতি,
তাঁর প্রতি এই অশ্রদ্ধা- হা ঈশ্বর! এলাকার লোকজনরা জানেই না এই মানুষটা দেশের জন্য কী করেছেন! কেন এদের জানানো হয়নি, এই দায় অবশ্যই আমাদের উপর বর্তায়।

video
অনেক চেষ্টায় তাঁর কবর নামের যে স্থান খুঁজে বের করি, নামফলক দূরের কথা কোন সামান্য চিহৃও নাই। এটা এবং জঙ্গলের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। অথচ পাশেই কোন এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি দস্তরমতো টিন-ছনের ঘর বানিয়ে লালশালু দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। ভাগ্যিস, মখমল দিয়ে যে মুড়িয়ে রাখা হয়নি!
যে দেশের যে দস্তুর- এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি, আমাদের আচরণে এর ব্যত্যয় হবে কেন? আমরা অসভ্য না হলে এমন একজন অগ্নিপুরুষকে এমন অবহেলায় ফেলে রাখব কেন? আর কেনই বা এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি মাথায় তুলে রাখব!
এখন (১৬ ডিসেম্বর, ২০০৯) এই ফকিরের সমাধি পাকা করা হচ্ছে, ক্রমশ জৌলুশপূর্ণ হবে।

কিন্তু তাঁর সেই ছোট্ট মেয়ের খোঁজ কেউ দিতে পারে না। কেউ বলল, এরা এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকায় চলে গেছে। ভাগ্যক্রমে খোঁজ পাওয়া যায়, তিনি নাকি বেড়াতে এসেছেন। অবশেষে সেই মেয়েটির মুখোমুখি হওয়া। বকুল আক্তার নামের সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ আর ছোট্ট নাই, অকালে বুড়িয়ে গেছেন। যুদ্ধের সময়কার কোন স্মৃতিই আজ আর তাঁর মনে নাই। তাতে কিছুই যায় আসে না- আমাদের তো মনে আছে। এও কী কম পাওয়া?
কিন্তু বারবার ঘুরেফিরে যে কথাটা বলছিলেন, 'আমার কোন টাকা-পয়সার দরকার নাই। আমার বাপেরে একটা খেতাব দিল না ক্যান? তাইনে কী দেশের লাইগা যুদ্ধ করে নাই'?

আমি আকাশপানে তাকিয়ে থাকি- একজন নপুংসক আর কী-ই বা করতে পারে...।
আমার কাছে অসংখ্য প্রশ্নের মতো এটারও কোন উত্তর নাই!

কতশত প্রশ্ন, এর উত্তর কে দেবে? বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই, কেন? একজন
কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা ঠেলা চালায়, কেন? আমি অতি সামান্য মানুষ হয়েও দুলা মিয়ার সেই ছোট্ট মেয়েটির খোঁজ এত বছর পরও বের করতে পারলে, এই দেশের দুর্ধর্ষ মিডিয়া ভাইয়ারা বেসুমার টাকা, হাতি-ঘোড়া থাকার পরও এই জজ সাহেবের খোঁজ আজ-অবধি বের করতে পারলেন না, কেন? একজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করার জন্য ১৬ ডিসেম্বর বেছে নেন, কেন? তাঁর লাশ ১২ ঘন্টা গাছে ঝুলে থাকবে,
কেন? বীরাঙ্গনা রিনার এইসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে, এই মানুষটা আজ কোথায়? আমরা জানি না, কেন?
আসলে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ একটি পণ্য!

(এখানে বীরপ্রতীক আলমগীর সাত্তারের বক্তব্যটা প্রাসঙ্গিক বিধায় তুলে দিচ্ছি:
'...খেতাব দেয়ার সময় কেন এত কার্পণ্য করা হল? খেতাবপ্রাপ্তদের বেলায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যাই বেশী এবং এটাই স্বাভাবিক। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্য যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তাদের প্রশিক্ষণ ছিল পর্যাপ্ত। এরপরও আমি বলব, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারাই খেতাব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বেশী। খেতাবপ্রাপ্তির ব্যাপারে সুপারিশ করার মত যাঁরা উচ্চপদে আসীন ছিলেন, তাদের অবহেলার কারণেই হয়েছে এমনটা।
...তবে ব্যতিক্রমি সেনানায়ক ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অভ স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। তার মত উদার যদি অন্য সেক্টর কমান্ডাররা হতেন, তাহলে অবশ্যই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা অনেক বেশী হত। অনেক সেক্টর কমান্ডারই মনে হয় বুঝতে পারেনি যে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ বারবার হয় না...।')

*আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই: দুলাল ঘোষ, সোহরাব হোসেনকে।
**ঋণ: 'দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি' এই বাক্যটা বলেছিলেন মাহাবুব আহমাদের। বাক্যটা ঠিক তাঁরও না, তাঁর বাবার। তিনি তাঁর বাবার মুখে শুনেছিলেন।
***দুলা মিয়ার একটা
সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এইচ. এম. ইকবাল।


সহায়ক সূত্র:
১. চাউল বিক্রি করে কফের সিরাপ খাওয়া...: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_16.html

Sunday, August 2, 2009

এ কষ্ট কোথায় রাখি ?

video
আমার দীর্ঘ দিনের সুতীব্র ইচ্ছা ছিল, মুক্তিযোদ্ধা, সুরুয মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম) পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলি, জানার চেষ্টা করি এই দেশের সেরা সন্তান সুরুয মিয়ার সম্বন্ধে। কেন মানুষটা ঠিক ১৬ ডিসেম্বর ভোরেই নিজেকে মেরে ফেললেন- আত্মহত্যা করলেন?

ইচ্ছা এবং বাস্তবতায় অনেক তফাত। আমি ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার টাইপের মানুষ। নিজের খেয়ে মনের বাঘ তাড়াই। কতশত সীমাবদ্ধতা! একটা ভাল ক্যামেরা নাই, লজিস্টিক সাপোর্ট নাই, পকেটে যথেষ্ঠ ময়লা কাগজ নাই...।

দেরিতে হলেও, অবশেষে মুখোমুখি হই, মুক্তিযোদ্ধা সুরুয মিয়ার পরিবারের সঙ্গে। শ্বাস চেপে দেখি, যেখানটায় তিনি ফাঁসি লাগিয়েছিলেন। সেই পেয়ারা গাছটা! পরবর্তীতে ভয়ে গাছটা কেটে ফেলা হয়েছে। আমার গা ছমছম করে, আপ্রাণ চেষ্টায় ভয় চেপে রাখি।

তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। কখনও ছবি তুলতে গিয়ে হাত কেঁপে যাচ্ছিল, কখনও দুর্দান্ত রাগে ইচ্ছা করছিল, কাউকে এক কোপে দু-টুকরা করে ফেলি। আবার কখন যে গাল ভিজে গেছে জানি না। বিষ-পিপড়া কখন পায়ে কামড় দিয়েছে টেরটিও পাইনি। পরে তীব্র ব্যথা কাবু করে ফেলেছিল। তবুও তীব্র ভাললাগায় মাখামাখি হয়ে থাকি।

তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের ভাষারীতি সামান্য পরিবর্তন করে প্রায় হুবহু তুলে দেই:

"মানুষটা গলায় ফাঁস দিব এইটা স্বপ্নেও ভাবি নাই। সারাদিন সারারাত পেটের যন্ত্রণায় চিল্লাইত, হাঁটত, দৌড়াইত। মানুডার চিকিৎসা করাইতে কোন বাকি রাখি নাই। বাড়ির অর্ধেকটাই বেইচা আগরতলা (ভারত) নিছি। পরে টাকা শ্যাষ হইলে ওষুধ কিনতে পারতাম না। তহন হের পেটের যন্ত্রণা আরও বাড়ছিল। সারারাত দৌড়াইত, চিল্লাইত। একদিন রাইতে রুটি বানায়া দিছি। রাইত ১২টা হইব, জাইগা দেখি, মানুডা রুডি খায় নাই, বিড়ির বান্ডিল ছুইয়াও দেহে নাই, হের হাতের লাডি পইরা রইছে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ারা গাছে গিয়া দেহি, মাগগো...। মানুডা ঝুলতাছে।

এই বুইড়া মানুডার লাশ ১২ ঘন্টা গাছে ঝুইল্যা ছিল। কেউ নামায় নাই, নামাইতে দেয় নাই। চেয়্যারমেন, মেম্বার হগলের হাতে-পায়ে ধইরাও কুনু লাভ হয় নাই। আমার সোয়ামি করত আম্লিগ, আমার সোয়ামির ভাতা বন্ধ কইরা দিছিল যে ইশকুল মাস্টার, বিএনপির তোতা মিয়া, হে একটু চেষ্টা করলেই হইত কিন্তুক হে থানাত ফোন কইরা কইল, লাশ যেন নামান না হয়। ইউএনও অফিসে গেলে হেরা কইল, চেয়্যারমেন মেম্বারের কাছে যাও। ইতা কইরা মানুডা ঝুলতাছিল, কেউ আগায়া আসে নাই।
মামুন ডাক্তার এই ভালা মানুডার লিগা আমার বুইড়া মানুষটারে কাডাকাডি (পোস্ট-মর্টেম)করে নাই।

দাফন লইয়াও অনেক ঝামেলা হইছিল। হেষে হের দাফন হইল। দাফনের পর মিলাদের লিগা সরকার থিক্যা দশ হাজার টেকা দিছিল। এক টেকাও পাই নাই, এই টেকা মাইরা দিছে। আমার সোয়ামির, মুক্তিযুদ্ধার কাগজগুলা কে নিয়া গেল কইতামাও পারতাম না।
আমার এক পুত থাইকাও নাই, হে বউ লইয়া আলগা হইছে। আরেকটা চিটাগাং-এ ছুড একটা চাকরি করে, ঠিকমত টেকা-পয়সা দিতে পারে নাই। দেহার আমার কেউ নাই। খালি সোহরাব সাম্বাদিকরে টুক্কুর কইরা ফোন করলে টাক্কুর কইরা আয়া পড়ে। পুলাডা কী ভালা, আমার মাতার চুলের সমান হেতে আয়ু পাক।"

*ভাল ক্যামেরা যোগাড় করা সম্ভব হয়নি। সাধারণ সেলফোনে এটা ধারণ করা হয়েছে। ছবি এসেছে যাচ্ছেতাই- তবুও আমার আনন্দের শেষ নাই! অন্তত, এই ভদ্রমহিলার বেদনা-অকৃত্রিম অভিব্যক্তি ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। ধারণকৃত অংশ অনেক বড়ো, আমার নেটের যা স্পীড তাতে পুরোটা আপলোড করা প্রায় অসম্ভব। কাটছাঁট করে যতটুকু দেয়া সম্ভব হলো এতেই আমার সম্তুষ্ট থাকা ব্যতীত উপায় কী!

Saturday, August 1, 2009

খোদেজা: ৪

নিশির প্রচন্ড ক্ষুধা বোধ হচ্ছে। এতটা সময় পেরিয়ে গেছে, আশ্চর্য!
নিশি ডাকল, সোহাগ, এই সোহাগ।
উত্তর নেই। আশ্চর্য, গেল কই! ও তো কখনও না বলে ঘরের বাইরে যায় না। অনিচ্ছায় উঠে সোহাগকে পেল বারান্দার গ্রিল ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। চোখ আকাশে। কতক্ষণ ধরে এ এভাবে দাঁড়িয়ে আছে? এইটুকুন ছেলে কী দেখে আকাশে? ওর দাঁড়াবার ভঙ্গিতে কি যেন একটা আছে, বুকটা কেমন করে উঠে।

কি করিস, সোহাগ?
কিসছু না, আপা।
এভাবে কি দেখিস?
সোহাগ উত্তর দিল না। চোখ কেমন ভেজা। এ কাঁদছিল নাকি?
নিশি কোমলস্বরে বলল, সোহাগ, সারাদিন জানালা দিয়া কি দেখিস?
কিসছু না আফা, এমনই।
আহা, বল না, বলতে তো দোষ নাই। আমার কাছে তোর লজ্জা কী! বাড়ির কথা মনে পড়ছে?
সোহাগ কেঁদে না ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ন-না। তয় আমার ভইনের কথা মনে পড়তাছে। আফা, ফাপর লাগে।
ক-ক্কি, কি বললি বুঝলাম না। ফাপর কি!
মন পুড়ে আফা। কেমুন কেমুন লাগে। বুঝাইতে পারুম না গো, আফা।
সেটা বল, মন খারাপ লাগে। কেন রে?
আমার গেরামের কথা মনে অয়, আমার ভইনডা-।
সোহাগ, তোর বোন তোর চেয়ে বড়ো, না ছোট?
ছোড আফা।
তোর বোনের বয়স কত রে?
হেইডা তো জানি না। বড় ঢলডার সুময় হইছিল।
কি কস, বুঝি না। ঢল কি।
ফানি গো আফা, ফানি। যেইদিকে দুই চোক যায় হেই দিকে ফানি।
ফানি নারে গাধা, বল পানি।
শুদ্দু ভাষা কইতে ফারি না, আফা। ফাপড় লাগে।
ভালা মুসিবত। ইয়ে তোর বোন তোর থেকে কত ছোট রে?
তা ক্যামনে কই! মইদ্যে এক ভাই মইরা গেল। তয়, আমরা পিট্টাপিট্টির মতন আছিলাম। আফা, হের কতা মনে হইলে বুকে ফাপড় লাগে। দম আটকায়া আসে।

নিশি অনুমান করল, সোহাগের বয়স আট-দশ হলে এর বোনের বয়স ছয়-সাত হবে। গ্রামে তো লম্বা সময় গ্যাপ দিয়ে বাচ্চা নেয়ার কথা কেউ ভাবে না। ফি বছর বাচ্চা হয়।
তোর বোনের নাম কি, সোহাগ?
খোদেজা। আফা, হে না এমুন পাগলি, হি হি হি, হে হাসের লগে কথা কয়।
কি বলিস!
হ আফা। হের মেলা হাস। আফা, আমি নিজের চোককে দেখছি ছিনি কয়া ডাক দিলে ল্যাংড়া হাসটা আগাইয়া আসে। খোদেজারে ঠুক্কুর দেয়।
চিনি কি!
আফা, নাম গো, হাসটা নাম। হের একেটডা হাসের একেক নাম। ছিনি, লবন, মিঠাই।
বলিস কী!
মিছা কইলে আমারে য্যান বক্কিলা খায়।
বক্কিলা কি?
সোহাগ ভাবনায় তলিয়ে গিয়েছিল, বক্কিলা শব্দটার অর্থ এর জানা নাই। কে জানে, ভয়ংকর কিছু একটা হবে। যেটা নাম বলে সোহাগের বয়সের শিশুরা কঠিন শপথ করে। অজানা ভয়ে থরথর করে কাঁপে!
নিশির বুকের কোন এক গহীন থেকে একটা বেদনা পাক খেয়ে উঠে। এই শিশুটির অজানা বেদনাগুলো আজ বড়ো স্পষ্ট হয়ে উঠে। নিশিরা সময়মতো বাচ্চা নিলে কে জানে এর বয়সী একটা শিশু থাকত তাদের!

নিশি কথা ঘুরাবার জন্য বলল, তুই ভাত খেয়ে নিয়েছিস তো?
ভুক নাই।
আরে পাগল, বলিস কী! এত বেলা হলো তুই এখনও খাস নাই কেন! আমারও ক্ষিধা লেগেছে, আয় একসাথে খাই।
আপা, ভাইজান আইব না?
নিশি মনখারাপ করা শ্বাস ফেলল, না। কেন যেন নিশির এক্ষণ পা ছড়িয়ে খুব করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। সোহাগের জন্য নাকি নিজের জন্য, কে জানে!

Facebook Share