Search

Loading...

Friday, May 1, 2009

প্রথম প্রেমসম, প্রথম লিখে আয়!

সেই যে দিয়ে এলাম পরে আমি আর বাইন্ডিং খাতার কথা জিজ্ঞেস করি না। রশীদ হায়দারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হত। কেবল এই বিষয়টা বাদ দিয়ে।

একদিন বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় একটা উত্তরাধিকার ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও।
তখনও বুঝিনি। পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখি, অরি আল্লা, গোটা উপন্যাসটাই দেখি ছাপা হয়েছে। কী আনন্দ-কী আনন্দ!
ফিরে গিয়ে দেখি রশীদ ভাই ব্যস্ত। দরোজা দিয়ে নাক গলাতেই বললেন, উঁহু, বসবা না, আমার দম ফেরার ফুরসত নাই।

পরে এক যন্ত্রণা হয়েছিল। লেখা ছাপা হওয়ার কথা শুনে কেউ যখন বলত, এটা যোগাড় করব কেমন করে? আমি ভয়ে ভয়ে বলতাম, ইয়ে, বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্রে। কথা এখানেই শেষ। কারণ প্রশ্নকর্তা উত্তরদাতা দু-জনেই ভাল সমঝদার, ২০ টাকার উত্তরাধিকারের জন্য কেউ ২৫ গুণ টাকা খরচ করবে না।

পরে বাংলা একাডেমির একজন উপ-পরিচালককে এই কথাটাই বলাতে তাঁর দাম্ভিক উত্তর আমার পছন্দ হয়নি! তার সাফ কথা, 'যার প্রয়োজন হবে সে এখান থেকে যোগাড় করবে। অন্য কোথাও আমরা বিক্রি করতে যাব কেন'!

ওয়াল্লা, কিছু দিন পর দেখি ২০০১ টাকার চেক এসে হাজির। বাহরে, এরা দেখি লেখার জন্য টাকাও দেয়। লিখে আমার সেটাই প্রথম আয়। এই আনন্দ কীসের সঙ্গে তুলনা করা যায় আমি জানি না। সদ্যজাত শিশুর গায়ের গন্ধের সঙ্গে? আমি জানি না, কলমের কসম; জানি না।


তবে ১টাকার মরতবা কী বুঝিনি। এটা কী বাদাম খাওয়ার জন্য! ৯৩ সালে ১ টাকায় এক ঠোঙা বাদাম পাওয়া না গেলেও বাদামওলারা অন্তত বাদাম দিত।
জিজ্ঞেস করব করব করেও জিজ্ঞেস করা হয়নি। কে জানে, হয়তো না জেনে ভালই হয়েছে। নইলে এমন একটা উত্তর শুনতাম, যাতে নিঃশব্দে ওখান থেকে উঠে আসতে হত। চেয়ার সরাতে গিয়ে ভুলে যদি টেবিলে ধাক্কা লাগে।
খোদা না খাস্তা, সেই মৃদু ধাক্কায় ওই মানুষটা নড়ে গেলে যদি তাঁর জ্ঞান গড়িয়ে পড়ে...। 

*প্রথম প্রেমপত্র যেমন ফেলে দেয়া যায় না, তেমনি লিখে প্রথম আয়ের নমুনা ফেলা যায় না। কালে কালে কাগজ লালচে হোক, তাতে কী!

আমার আনন্দ-বেদনার অপকিচ্ছা: ২

আমি খুঁজে খঁজে কিছু প্রকাশকের নাম-ঠিকানা যোগাড় করলাম। এদের এখানে গিয়ে আমার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়েছে! ঘুরেফিরে একটাই কথা; ফেলো কড়ি, মাখো লাউয়ের জুস! পাগল, আমি টাকা পাবো কোথায়, আমার তো ১০০ পয়সায় এক টাকা হয়!

এখানেই পরিচয় হলো আহমাদউল্লাহ নামের একজন অসম্ভব হৃদয়বান মানুষের সঙ্গে। যিনি নিজেও একজন লেখক। আমার যখন ইচ্ছা করছিল ৩৬ তলা থেকে ঝাঁপ দেই, ঠিক সেই মুহুর্তে তিনি মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আমার লেখাগুলো মনোযোগ নিয়ে পড়ে কিছু সদাশয় মন্তব্য করেছিলেন। আমার ধারণা, এটা তাঁর মজ্জাগত অভ্যাস, এ কাজটা তিনি জীবনে বহুবার করেছেন।
(
আহমাদউল্লাহ, অনেক কটা বছর তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল না। এই মানুষটাকে পাগলের মত খুঁজেছি। পাইনি। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেব এমনটাও ভেবেছিলাম। কেউ কোন খোঁজ দিতে পারে না। এক বইমেলায় দন্তস্য রওসন বললেন, তিনি নাকি যুগান্তরের ইসলামি পাতা দেখেন। অনেক যন্ত্রণা করে একদিন মানুষটাকে ফোনে পেলাম। মানুষটা আর আগের সেই মানুষ নাই। কেমন শীতল-শীতল! প্রতি শ্বাসে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।)

এক দিন তিনি বললেন, চলেন বাংলা একাডেমী যাই, ওখানে রশীদ ভাইকে পাই কিনা দেখি। আমার ধারণা ছিল, তাঁর নিজের কোন কাজ হবে টবে হয়তো বা! কিন্তু তিনি যখন আমাকে মি. রশীদ হায়দারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, 'রশীদ ভাই, এর লেখাটা একটু পড়ে দেখবেন তো'।

আমি তখন আমার বাইন্ডিং খাতাসহ এখন থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বেঁচে যাই। নিদেনপক্ষে, অন্তত মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারলে রক্ষা হয়!

মি. রশীদ হায়দার তখন ‘উত্তরাধিকার’ নামের সাহিত্য-ত্রৈমাসিকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তিনি সহজভঙ্গিতে খাতাটা নিলেন। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বললেন, 'কলম ধরতে লাগে দশ বছর আর কলম কাগজে ছোঁয়াতে লাগে দশ বছর'।
কথাটা ছিল রূপকার্থে, কিন্তু আমার আক্কেল গুড়ুম । আমি বললাম, ইয়া রব, মারিছে ( অবশ্যই মনে মনে )!

পরে বিভিন্ন সময় আমি রশীদ হায়দারের কাছে গিয়েছি। ব্যস্ত থাকলে বলতেন, খবরদার বসবা না, তোমাকে এক মিনিট সময় দিলাম, যা বলার বলে বিদায় হও।

অবশ্য অবসর থাকলে চুটিয়ে গল্প করতেন।
একদিনের কথা আমি আজীবন ভুলব না। কথা বলছি, এরিমধ্যে তাঁর একটা ফোন আসল। তিনি ফোনে বললেন, ‘ওমুক জায়গা থেকে আমার এক লেখক বন্ধু এসেছেন, কথা বলছি, তুমি একটু পরে ফোন করো’।

নিমিষেই আমার গোটা পৃথিবীটা আধার হয়ে এলো। আমি ঝাপসা চোখে এই অসাধারণ মানুষটা, একজন স্বপ্নবাজ, একজন লেখক বানাবার মেশিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। হা ঈশ্বর, যার এক লাইন লেখা কোথাও এখনও ছাপা হয়নি তার মতো অগাবগা নাকি রশীদ হায়দারের লেখক বন্ধু! আমি আজীবন এটা ভুলব না!

এইসব মানুষরা নিজে কি তারচেয়ে বড়ো হচ্ছে এঁরা আমাদের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বপন করেন! নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক নাকি বলেছিলেন, যারা স্বপ্ন দেখে আমি তাদেরকে স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করি। সেই...!