প্রসঙ্গটা আগুনসম! এই নিয়ে এখন কোন প্রশ্ন করাটা ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের রে রে করে তেড়ে আসার সমূহ সম্ভাবনা। গেল রে, গেল, মুক্তিযুদ্ধ একটা কাঁচের বাসন; হাত থেকে পড়ামাত্র শতধা হল। একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা ঠেলা চালালে আমাদের বিকার হয় না, কেবল আমরা লাজে ক্রুদ্ধ হই এমন প্রশ্ন সমুখে এলে! অহেতুক রাগ কেবল শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পায়!
ছফার এই বক্তব্যটা আমার পছন্দ হয়েছে,
"আমি এই পরিসংখ্যানটাকে প্রহসন মনে করি। সংখ্যাটার (৩০ লক্ষ) সঠিকত্ব নিয়ে আমি কোন প্রশ্ন তুলতে চাই না। কিন্তু সংখ্যাটার উৎস কোথায়? কিভাবে কোত্থেকে সংগ্রহ করা হল তা না থাকায় তা আমার কাছে ভিক্তিহীন মনে হয়। এখনও সময় আছে। সরকার ইচ্ছা করলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে দশ দিনের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিপুনভাবে বের করতে পারবে।" (আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী)
মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইয়ে লিখেছেন,
"মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা চলাকালে কতজন মানুষ মারা গিয়েছে সে সম্পর্কে গণমাধ্যমে বেশ কয়েক ধরনের সংখ্যা রয়েছে।
১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড আলমানাকে সংখ্যাটি ১০ লক্ষ। নিউইয়র্ক টাইমস (২২ ডিসেম্বর ১৯৭২) অনুযায়ী ৫ থেকে ১৫ লক্ষ। কম্পটনস এনসাইক্লোপিডিয়া এবং এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকা অনুযায়ী সংখ্যাটা ৩০ লক্ষ।
প্রকৃত সংখ্যাটি কত, সেটি সম্ভবত কখনোই জানা যাবে না। তবে বাংলাদেশে এই সংখ্যাটি ৩০ লক্ষ বলে অনুমান করা হয়।"
(মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই উপাত্তটা নিয়েছেন, Mathew White's, Death tells for the major wars and atrocites of twentieth century থেকে।)
ছফার সঙ্গে আমি একমত। ১০ দিনের মধ্যে হয়তো সম্ভব না, কিন্তু চেষ্টা করলে সম্ভব। এখনও সময় আছে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে, এটার প্রকৃত সংখ্যাটা বের করে এই বিতর্কের অবসান করা। নইলে যুগ যুগ ধরে এই কুতর্ক চলতেই থাকবে।
একটা বইয়ে অসংখ্য বানান ভুল থাকলে যেমন বইটার মান নেমে যায়, লেখকেরও। বারবার মিথ্যা বললেও একদা সেটা সত্য মনে হয়। তেমনি একটা সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকলে সেই সংখ্যাটা প্রতি সন্দেহ পোষণ করা বিচিত্র কিছু না। আগামী প্রজন্মের জন্য এটা ভাল ফল বয়ে আনবে বলে আমি মনে করি না।
Tuesday, April 28, 2009
Monday, April 27, 2009
চাল না গান, বিদ্যুৎ না গণতন্ত্র?
অমৃত বচন। "...আগামী অন্তত ৩ বছরে এ যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।"
(সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ১৫ মে ’০৬)
কেয়ারটেকার সরকার মহোদয়রা তো এই দেশের কোন বিষয় নাই যেটায় হাত দেন নাই। হর্সমাউথ- একজন উপদেষ্টা তো মুখ যে হাঁ করে রাখতেন, আর বন্ধ করতেন না। ২৪ ঘন্টাই মুখ চালু। আই বেট, ঘুমের সময়ও তার মুখ চলত, মিডিয়া থাকত না, এই যা!
তো, এরা বিদ্যুৎ নিয়ে কী ঘন্টাটা করেছেন?
টাকার সমস্যা? এই যে হাজার কোটি টাকা দুই-নম্বরিদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছিল, কাজে লাগানো হল না কেন? বগলে চেপে রাখা সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে এটা আছে, খুঁজে পাননি বুঝি?
এখন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক ডিজিটাল মন্তব্য করেছেন, "ঘূর্ণিঝড় নার্গিসকে যেমন নিয়ন্ত্রন করা যায় না, টর্নেডো, সুনামি, যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তেমনি বিদ্যমান বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।"
(প্রথম আলো, ২৩.০৪.০৯)
ডেসকো, ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের উত্তর আরও ডিজিটাল, "বৃষ্টি হলে গরম কমে যাবে। গরম কমে গেলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। তখন গভীর রাতে লোডশেডিং থাকবে না।"
সমস্যা হয়ে গেল। বৃষ্টি নামানো তো চাট্টিখানি কথা না। এজন্য এরশাদ সাহেবের সাহায্য নিতে হবে। তিনি বলেছিলেন, "পৃথিবীতে কোন রাষ্ট্রপতির প্রার্থনায় বৃষ্টি হয়েছে? আমি এরশাদের প্রার্থনায়।"
সমস্যাটা হচ্ছে, লক্ষ করুন, কোন রাষ্ট্রপ্রধান? কেবল এরশাদ বললে সমস্যা ছিল না। পায়ে ধরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু এই জন্য যদি উনাকে রাষ্ট্রপ্রধান বানাতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। জিল্লুর সাহেব কী রাজি হবেন?
সবাই দেখি প্রকৃতির দোহাই দিচ্ছেন। ঘুরিয়ে বললে যার যার স্রষ্টার কাছে কাজটা গছিয়ে দিচ্ছেন। বাহ, বেশ তো! এমনিতে তো সদম্ভে বলেন, এই ব্রীজ, রাস্তা আমি করেছি!
বিদ্যুৎ নিয়ে আমার একটা প্রশ্ন, কত টাকা লাগে এ সমস্যার সমাধান করতে? স্যাররা হয়তো বলবেন, মিয়া, একশতে কয় কুড়িতে হয় তাই আঙ্গুল গুনে বের করতে পারো না, তোমরা কি বুঝবা এতো বড়ো হিসাব!
ফাইন, চাঁদে যেতে পারব, কি পারব না; সে তো অন্য কথা। কিন্তু চাঁদ কত দূরে জানতে তো দোষ নাই!
আমাদের ঠিক ঠিক বলুন না, কত টাকা লাগে? কোত্থেকে টাকা আসবে তাও বাতলে দেব কিন্তু দয়া করে বলুনই না কত টাকা লাগবে? অন্তত এটা আমাদের জানতে তো দোষ নাই।
২৫ এপ্রিল, ২০০৯-এ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৯৫৫ মেগাওয়াট। টাকার হিসাবটা বের করা জটিল কিছু না।
সময়? তাও বলুন। আমাদের প্রয়োজন বিদ্যুৎ। দেশে এই সম্বন্ধে ভাল জ্ঞান যার, তাঁর সঙ্গে বসুন। তাঁকে জিজ্ঞেস করুন, চটজলদি এই সমস্যা সমাধানে পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে কোন মানুষটাকে উড়িয়ে নিয়ে আসতে হবে। ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভাসিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে আসবেন, নাকি উড়িয়ে এতো জেনে তো আমাদের কাজ নাই। আমাদের প্রয়োজন বিদ্যুৎ।
কবে নাগাদ এই সমস্যার সমাধান হবে কেউ পরিষ্কার করে বলছে না। আমরা চুতিয়া জনগণ জানতেও পারছি না।
আচ্ছা, পাওয়ার না থাকলে সমস্যা কি? আমার মতো তেলিবেলি লেখক অন-লাইনে থাকতে না পেরে, কিছু এলেবেলে লেখা পোস্ট করতে না পেরে, রাগের মাথায় ছেঁড়া চটি দিয়ে কম্পিউটারকে দু চার ঘা মারব? বেচারা কম্পিউটার, নিরীহ জান! এতো জুতা খায় কিন্তু কোন বিকার নাই!
একটা মানুষ রাতে ৬ ঘন্টাও ঘুমাতে পারছে না। দেশ চলছে কেমন করে আল্লা মালুম!
লাগবেন বাজি? এই দেশের মানুষকে এই গ্রহের ভেতর-বাইরে যেখানেই নিয়ে যান, কোন অবস্থাতেই এরা মরবে না। কচ্ছপের মত মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে। তবে ঘটা করে ভোট দিতে যাবে। আর নেতা-নেত্রীর জন্য হাসতে হাসতে প্রাণটা খুইয়ে আসবে।
এই যে লোকজনরা রাতে ৬ ঘন্টাও ঘুমাতে পারছে না, এর ফল কী দাঁড়াবে? এটা মনোবিদ, চিকিৎসাবিদ ভাল বলতে পারবেন। খানিকটা অনুমান করলে তো দোষ নাই।
কে জানে, আগামীতে এটা হয়তো গবেষণা করে বের করা হবে। এই সময়ে (সময়টার বিস্তারিত ব্যাখ্যা বুদ্ধিমান পাঠককে আগ বাড়িয়ে বলতে চাচ্ছি না) দিনের পর দিন ঘুমাতে না-পারা, চিড়চিড়ে-খিটখিটে, বাবা-মার রোপন করা সন্তানগুলো একেকটা চরম অশিষ্ট-দুর্বিনীত হয়ে জন্ম নেবে। তুচ্ছ কথায় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ঠা ঠা করে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষদের চু্ইংগাম চিবুতে চিবুতে মেরে ফেরবে।
কেন বাপু, এটাও তো গবেষণার মাধ্যমেই বের করা হয়েছে, বয়স্ক বাবার সন্তান হাবলা হয়। তাহলে এটা হতে দোষ কোথায়?
বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিদ্যুৎচালিত কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র-লাইফ সেভিং মেশিনগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিকল্প জেনারেটরে তেল না থাকার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে যাদের মৃত্যু হয় এই মৃত্যু, খুনগুলো বিচার হবে না?
বার্ন ইউনিটের যেসব রোগির শরীর ৭০ ভাগ পুড়ে গেছে, বিদ্যুতের অভাবে যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো একেক করে বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেইসব রোগীর কষ্ট দেখে একজন ডাক্তার চোখের পানি লুকিয়ে বলেছিলেন, ইচ্ছা করে এদের বিষাক্ত ইন্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলি।
কেউ যদি দোয়া-বদদোয়ায় বিশ্বাস করে তাহলে সে যতবার হজ করুক আর উমরাহ, লাভ কী! ওই রোগীদের ভেতরের হাহাকার-জান্তব কষ্ট এঁদের পিছু ছাড়বে না, নরক অবধি।
গান ভাল জিনিস তবে ঘরে চাল না থাকলে গান কোন কাজের? গণতন্ত্র কাজের জিনিস তবে বিদ্যুৎ না থাকলে এই গণতন্ত্র ধুয়ে ধুয়ে খাওয়ার উপায় নেই। এমতাবস্থায় আমার গণতন্ত্রের চেয়ে বিদ্যুৎ-এর প্রয়োজনই বেশি।
*কার্টুনঋণ: শিশিরের ছাপ আছে।
Sunday, April 26, 2009
ছফা, একজন অন্য ভুবনের মানুষ!
ছফা নামের মানুষটাকে অর্থ-বিত্ত, পদ, পুরস্কার কিছুই দিয়ে আটকে রাখা যায়নি। আমাদের দেশের যে কোন লেখককে বাংলা একাডেমির পুরস্কার দেয়ার কথা বললে তিনি নিজ শরীর থেকে খানিকটা চামড়া খুলে দিতে পিছ পা হবেন বলে তো আমার মনে হয় না।ছফাই ব্যতিক্রম! তিনি কারও তদ্বিরের জোরে তাঁকে যেন বাংলা একাডেমির পুরস্কার দেয়া না হয় এ জন্য কম ধুন্ধুমার কান্ড করেননি।
তৎকালিন বাংলা একাডেমির মহা-পরিচালককে ফোন করে বলেছিলেন, "...আমাকে নির্বাচিত করার যোগ্যতা যেদিন হবে সেদিন আমি পুরস্কার এমনি পেয়ে যাব। কারও তদ্বিরে নয়। হুমায়ূন (হুমায়ূন আহমেদ) যদি তদ্বিরের মাধ্যমে (আমার জন্য) পুরস্কার আদায় করতে সক্ষম হয় তো, আমি বলছি, উক্ত পুরস্কার আপনার মাথায় ভাঙব।"
হুমায়ূন আহমেদকে এ জন্য হাতজোড় করে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয়েছিল।
ছফার মৃত্যুর পর হুমায়ূন আহমেদ ভোরের কাগজে লিখেছিলেন, "...ছফা ভাই আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং কঠিন গলায় বললেন, আপনার কি ধারণা, পুরস্কার (বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রসঙ্গে) প্রতি আমার কোন মোহ আছে?
আমি বললাম, না।
তাহলে কেন আমার জন্য নানান জনের কাছে সুপারিশ করে আমাকে ছোট করলেন। আমার কোনো ব্যাপারে আপনি কখনই কারও কাছে সুপারিশ করবেন না।
(আমি বললাম) জ্বি আচ্ছা, করব না।
আপনি হাত জোড় করে আমার কাছে ক্ষমা চান।
আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলাম।"
আহমদ ছফা মোহাম্মদ আমীনকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "একাডেমি জানে, পুরস্কার আমি কাউন্সিলরদের মাথায় এবং সভাপতির মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বলব, তোমরা যা সম্মানের ভাবো, তা আমার কাছে আধুলি। ভিক্ষুকের কাছে আধুলির মূল্য অনেক বেশি, আমি আধুলি না, গোলাপ চাই...।"
বাংলা একাডেমি নিয়ে ছফার তীব্র ক্ষোভ ছিল। আমি তাঁর ক্ষোভকে যথার্থ মনে করি। বাংলা একাডেমির প্রতি তাঁর মন্তব্যে খানিকটা আঁচ করা যাবে। "বাংলা একাডেমিতে মযহারুল ইসলামের মত কুখ্যাত লোক পর্যন্ত ডাইরেক্টর জেনারেল হয়ে গেল। আমরা কলকাতায় থাকাকালে (মুক্তিযুদ্ধের সময়) একটি পত্রিকায় তার অপকর্মের প্রতিবাদ করেছিলাম। দেশে এসে দেখি তিনি বাংলা একাডেমির ডাইরেক্টর জেনারেল, ওয়াল্লা!"
আমি ছফার ক্ষোভকে যথার্থ মনে করি। বাংলা একাডেমি অভিধান এবং কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করা ব্যতীত এই সুদীর্ঘ বছরে কাজের কাজ কিছুই করেননি এঁরা। অবশ্য ফি-বছর বইমেলার আয়োজন ব্যতীত।
একেকজন চলমান জ্ঞানের ভান্ড! কাত করলেই গড়িয়ে যাবে।
একবার 'উত্তারাধিকার' নামে বাংলা একাডেমির ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি যোগাড় করার জন্য ঢাকা যেতে হল। এই নিয়ে একজন উপ-পরিচালককে বিনীত ভঙ্গিতে বলেছিলাম, 'আপনার দেশব্যাপি এটা বিক্রি করার ব্যবস্থা করলে আমরা যারা ঢাকায় থাকি না, তাদের সুবিধা হয়।'
তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, 'এটা তো সবার জন্য না। যার দরকার হবে সে এখানে এসে যোগাড় করবে।'
অথচ আমি দেখেছি, একাডেমির গুদামে হাজার হাজার কপি অবহেলায় পড়ে আছে, উলু খাচ্ছে। পাঠক হিসাবে উলু, মন্দ না!'
বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। কেন করেন? এটা আমার মোটা-মাথায় ঢোকে না। একজন প্রবীন বিশিষ্ট সাহিত্যিক করলে, কী হয়?
তো, এই বিষয়ে গত হাসিনার সরকার আমলে, বাংলা একাডেমির মহা-পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি পত্রিকাটিকে উত্তর দিয়েছিলেন, "তিনি একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক এই কারণে তিনি উদ্বোধন করছেন।"
এমন জ্ঞানের ভান্ড একাডেমির মহা-পরিচালক হলে, এই একাডেমির যোগ্যতা সহজেই অনুমেয়।
রাজনীতিবিদদের কথা নাহয় বাদ দিলাম। এবারের কেয়ার-টেকার সরকার বাহাদুর কী করেছেন? ফখরুদ্দিন সাহেব লম্বা একটা পাঞ্জাবি লাগিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করেছেন। অথচ তাঁর একটা চমৎকার সুযোগ ছিল, একটা অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করা।
ছফা তার সমস্ত জীবনে নিজের জন্য কারও কাছে কিছু চাননি কিন্তু কারও উপকার হবে এমনটা মনে করলে কাতরতা দেখাতে, নিজেকে ছোট করতে কার্পণ্য করতেন না। কিন্তু তাকে দিয়ে কোন অনায্য কাজ করানো যেত না। যে মোহাম্মদ আমীন ১১ বছর ছফার সহচর্যে ছিলেন। একই সঙ্গে একই বাড়ি থেকেছেন, খেয়েছেন। সেই মোহাম্মদ আমীন বলেন, 'আমি জানতাম, হাসনাত আবদুল হাইয়ের সঙ্গে আহমদ ছফার ভাল জানা-শোনা আছে। হাসনাত সাহেব তখন ভূমি সচিব'।
"আহমদ ছফাকে বললাম, আমাকে ঢাকা জেলার কোন থানায় পোস্টিং দিতে আপনার বন্ধু হাসনাত স্যারকে একটু বলুন না।
আহমদ ছফা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, নো, দিস উজ ব্যাড প্র্যাকটিস। তুমি আমলা হয়ে গেছ, আসল আমলা। বুঝতে পারছ কি, তুমি যে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেলে?
প্রচন্ড লজ্জা পেলেও আমি হাল ছেড়ে দিলাম না। ঢাকা কিংবা আশেপাশে আমার থাকা প্রয়োজন, নেসেসিটি নোজ নো ল।
আমি বললাম, আপনি তো অনেকের জন্য সুপারিশ করেন।
ছফা বললেন, যাদের জন্য সুপারিশ করি তাদের কষ্ট আমার লজ্জা পাওয়ার কষ্ট থেকে বেশি থাকে। তোমার জন্য সুপারিশ না করলে তোমার যে কষ্ট হবে, করলে আমার তার চেয়ে অধিক কষ্ট হবে। কারণ তোমার চাহিদাটা অত্যাবশ্যক না, জৌলুশ মাত্র। আর আমি যাদের জন্য করি তাদেরটা অত্যাবশ্যক।"
পশ্চিম বাংলার সাহিত্যর পাশে বাংলাদেশের সাহিত্যকে মাথা উঁচু করে দাড় করানোর প্রয়াসীদের মধ্যে আহমদ ছফা প্রথম! ১৯৯৪ সালে বুকে পোস্টার ঝুলিয়ে বাংলাদেশে আনন্দ বাজারের বই আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে আসা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন। যেখানে সবাই কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের পায়ে তাদের কলম সমর্পন করেছিলেন।
এই হচ্ছেন ছফা!
*বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বাক্য ছফার। শিল্পী সুলতানকে বর্ণনা করতে গিয়ে প্রায় আধ-পৃষ্ঠা ব্যাপি দীর্ঘ বাক্যটি রচনা করেছিলেন। বাক্যটা খুঁজছি। কোথাও পাচ্ছি না।
**ছবিঋণ: নাসির আলী মামুন।
Saturday, April 25, 2009
মুক্তিযুদ্ধে, একজন আহমদ ছফা।
বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা কোনটি?বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা 'প্রতিরোধ'। এই পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক, প্রচারক ছিলেন আহমদ ছফা।
আহমদ ছফার জবানিতে শুনুন, "শেখ সাহেবের রেসকোর্স মিটিং-এ বিক্রির জন্য আমরা কয়েকজন পত্রিকাটি বার করেছিলাম।...
পত্রিকার একটি কপি আহমদ শরীফের হাতে দিয়েছিলাম। পাওয়ামাত্র চোখ বুলিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে ড. শরীফ বলেছিলেন, 'আমার এখন মনে হচ্ছে, আমি এখন পাকিস্তানে না, স্বাধীন বাংলাদেশে আছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তুমি, তুমিই স্বাধীনতার বরপুত্র, নায়কের জন্মদাতা, প্রতিরোধ তার মাধ্যম'।
ড. শরীফ পত্রিকার বিনিময়ে তার পকেটে যত টাকা ছিল সব আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গুণে দেখেছিলাম, ৯৮ টাকা। সেই সময়ের ৯৮ টাকা, ভাবা যায়!
...প্রতিরোধ পত্রিকাটির বিক্রি ছিল অবিশ্বাস্য! পত্রিকাটি বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে লভ্য দশ হাজার টাকা যুদ্ধ প্রস্তুতি সহায়তা তহবিলে প্রদানের জন্য ফরহাদ মাযহারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বেচারা এখন লম্বা লম্বা বুলি ছাড়ে, কিন্তু ঐদিন টাকাগুলো কোথায় কিভাবে হাওয়া করে দিয়েছিল, সে হিসাব আমাকে এখনও দেয়নি।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লেখক সংঘ করে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে যখন সাহিত্য সংস্কৃতিতে অঙ্গীভূত করার পরিকল্পনায় আমরা মেতে উঠেছিলাম তখন শামসুর রাহমান আমাদেরকে দেশদ্রোহী বলে গালি দিয়েছিলেন।
বাংলা সাহিত্যের বিপ্লব, গৌতম বুদ্ধের ভাষা বিপ্লব। গৌতম বুদ্ধকে আমি ভাষা বিপ্লবী বলি। তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম ভাষা সৈনিক। পালি ভাষায় ত্রিপটক রচনা করে তিনি সংস্কৃত ভাষার গ্রাস হতে সদ্যজাত ভাষা বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। নইলে বাংলা বলে কোন ভাষা আমরা পেতাম না। এরপর বায়ান্ন সাল আসল...।"
...
ছফার মৃত্যুর পর মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক সিটি কর্পোরেশনকে নিষেধ করে দিয়েছিলেন, যাতে ছফাকে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফনের অনুমতি না দেয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরী বলেছিলেন, 'আহমদ ছফা কে? তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা? কোন সেক্টরের যোদ্ধা ছিলেন'?
হায় নির্বোধ, হায় গোডিমওয়ালা বালক! এই বালককে কে বোঝাবে, সব যুদ্ধ স্টেনগান দিয়ে হয় না! একেজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেক রকম।
হারুনুর রশীদ আহাদ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, 'আহমদ ছফাকে না চেনা অজ্ঞতা, ইতরামি, না ক্রইম? আমি আপনার কাছ থেকে এর উত্তর প্রত্যাশা করি'।
তৎকালিন শাসকদের ছফার প্রতি তীব্র রোষ ছিল কী এইজন্য?
ছফাকে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা যায়নি। এই নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
অথচ ছফার জীবিত অবস্থায় কোন বুদ্ধিজীবীকে এমন অপমান করলে হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের উচ্ছেদের মত আরেকটি ঘটনা না ঘটিয়ে ছাড়তেন না। মৃতের খাটিয়া ধরে বলতেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীকে যথাস্থানে সমাহিত করতে হবে, নইলে আমিও তার সাথে কবরে যাব। আমাকেও খাটিয়ায় তোল।
কর্নেল তাহেরকে যখন ফাঁসির আদেশ দেয়া হল, ভয়ে সবাই চুপ, কারও মুখে রা নেই। মনে হয় যেন এটাই হওয়া উচিৎ ছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ছফা। তিনি তাহেরের ফাঁসির আদেশ রদ করার সপক্ষে জনমত সংগ্রহ ও সরকারকে চাপ দিতে বুদ্ধিজীবীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিলেন।
আজ যারা বুদ্ধিজীবীর ছাল গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ান তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন, যিনি ছফার দ্বারা কোন না কোন ভাবে উপকৃত হননি।
আসলে ছফা এই দেশে আগেভাগেই জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর আসার কথা ছিল আরও অনেক কাল বাদে...।
তাঁর অনূদিত 'ফাউস্ট' থেকে ক-লাইন যোগ করি:
"খোদাতালা: অধিক বলার আছে?
নালিশ সে তো তোমার সত্তার অংশ
কিছুই তোমার চোখে ঠেকেনি সুন্দর?
মেফিস্ট: না-হে প্রভু, সত্য কহি
তোমার এ দুনিয়াটা অতিশয় খল
সেখানে মানুষ গেলে
এতো বেশি পাপে ডোবে
শয়তানও বিরক্ত হয় চাতুরি খেলাতে
পাপপুণ্য বোধহীন পামর মানুষ।"
নালিশ সে তো তোমার সত্তার অংশ
কিছুই তোমার চোখে ঠেকেনি সুন্দর?
মেফিস্ট: না-হে প্রভু, সত্য কহি
তোমার এ দুনিয়াটা অতিশয় খল
সেখানে মানুষ গেলে
এতো বেশি পাপে ডোবে
শয়তানও বিরক্ত হয় চাতুরি খেলাতে
পাপপুণ্য বোধহীন পামর মানুষ।"
*ছবি এবং আংশিক তথ্যঋণ: মোহাম্মদ আমীন।
Friday, April 24, 2009
বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি-মারামারি
খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের বাড়ি নিয়ে গোটা দেশ দু-ভাগ হয়ে আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। উঠতে বসতে একে অপরের বাপান্ত করছেন। দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে আমি খুব একটা অবাক হব না। সামান্য ঔচিত্য বোধ থাকলে বাড়িটা অনেক আগেই ছেড়ে দেয়া উচিৎ ছিল। কেননা, এ নিয়ে আগেও কম 'বাহাস' হয়নি।
আর এটাও আমার বোধগম্য হয় না, এই বাড়ির ইস্যুটা নিয়ে এখনই কেন? দেশে যেখানে অনেক বড় বড় ইস্যু রয়ে গেছে। পাওয়ারের সমস্যায় গুটিকয়েক মানুষ ব্যতীত, দেশের মানুষ রাতে ঘুমাতে পারছে না। দেশ চলছে কেমন করে আল্লা মালুম! রাতে না-ঘুমাবার ছাপ কী পড়ছে না?
তো, ওই যে বললাম, ঔচিত্য বোধ। এটার আশা করার অর্থ হচ্ছে, বাতুলাগারে থেকে বাতুল খোঁজা। আমরা কী অনায়াসে না বিস্মৃত হই, ইনি, ইনার অর্থমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করেছিলেন। যখন শেখ হাসিনাকে ১ কোটি টাকা দামের গাড়ি উপহার দেয়া হয় তখন দেখি তিনি অস্বস্তি বোধ করেন না। কই, আমাদের তো কেউ 'টাটা ন্যানো', নিদেন পক্ষে এক ঠোঙা বাদামও দেয় না। আমাদের মেমরি গোল্ড-ফিসের মত। নিমিষেই সব ভুলে বসে থাকি!
গীতিকার, মহাকবি, ঘাতক (আর কিছুদিন ক্ষমতায় থাকলে নিশ্চিত গাতকও হতেন) হোমো এরশাদ যখন বলেন, 'আমি ক্ষমতায় থাকাকালিন যে বাড়িটা বেগম খালেদাকে দিয়েছিলাম, আমি যদি জানতাম তিনি এই বাড়িতে বসে রাজনীতি করবেন তাহলে দিতাম না'।
শুনে মনে হবে এটা ওনার বাপ-দাদার তালুক! অনেকে তার এই বক্তব্য সহজে গ্রহন করতে পারেননি, ঔদ্ধত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি বাড়ি দেয়ার কে? কিন্তু তার এমন ভাবনা আমাকে ভাবায় না কারণ আমরা এতে অভ্যস্থ। এই নিয়ে সবাই ভাবিয়ে ভাবিয়ে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছে এখন এইসব নিয়ে ভাবাভাবির কিছু নাই।
হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত ঘটা করে কলাম (হায়রে বাংলাদেশ!) লিখে বলেন, 'মন্ত্রী-মিনিষ্টারদের আমার ট্রাকের মতো মনে হয়। তাদের কাছ থেকে একশ এক হাত দূরে থাকতে আমি পছন্দ করি কিন্তু নাজমুল হুদা সাহেব আমাকে ছবি বানাবার অনুদান দিয়েছিলেন...'।
মন্ত্রী হলেও নাজমুল হুদা সাহেবের প্রতি তাঁর বিশেষ পক্ষপাতিত্বের কারণ নাজমুল হুদা সাহেব যখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন হুমায়ূন আহমেদকে ছবি বানাবার জন্য বিশেষ সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এজন্য হুমায়ূন আহমেদের কৃতজ্ঞতার শেষ নাই। তাই তেলতেলে, বিগলিত হয়ে বলেন, 'আমাকে ছবি বানাবার অনুদান দিয়েছিলেন...'।
প্রশ্ন দাঁড়ায়, ওই বিশেষ অনুদানের টাকা কি নাজমুল হুদা সাহেব নিজের পকেট থেকে (মতান্তরে সাফারির পকেট থেকে) দিয়েছিলেন? অবশ্যই না, কারণ সেটা সরকারী টাকা প্রকারান্তরে জনগনের টাকা। এই দেশের অধিকাংশ মানুষ যেটা বুঝতে চান না সেটা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে কেউ স্কুল, কলেজ, ব্রীজ, রাস্তার জন্য যেসব টাকা খরচ করেন সেইসব টাকা সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওইসব লোকজনের না, এই দেশেরই জনগনের ট্যাক্সের টাকা।
এই আমি যে এখন নেট ববেহার করছি, সরকার বাহাদুর কিন্তু ব্যবহারের পূর্বেই শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাটের নামে তাদের ট্যাঁকশালে জমা করে নিয়ে নিয়েছেন। যিনি লেখাটা পড়ছেন, তাঁরটাও। প্রবাসি হলে অন্য কথা। হুমায়ূন আহমেদ যখন একের পর এক সিগারেট টানেন, ধোঁয়া জমা হয় বায়ুমন্ডলে আর ট্যাক্সের টাকা জমা হয় সরকারের ট্যাঁকে।
এই দেশের পাবলিক কখনই বিদেশের মতো পাবলিক সার্ভেন্টের কাছে জানতে পারে না তার ট্যাক্সের টাকা কিভাবে খরচ হচ্ছে, মেরুদন্ড হয়ে যায় জেলীর মতো। কী অহংকার করেই না আমরা বলি, এ রাস্তা অমুক মন্ত্রী করেছেন, ওই ব্রীজ তমুক মন্ত্রী করেছেন। যেন রাস্তা, ব্রীজগুলো তাদের তালুকের টাকায় করা।
সমাজ থেকে এক পা এগিয়ে থাকা হুমায়ূন আহমেদের মতো মানুষও যখন মনে করেন, এই ব্রীজ, রাস্তা ওমুক মন্ত্রী করেছেন, তমুক মন্ত্রী ছবি বানাবার অনুদান দিয়েছেন তাঁদের টাকায়। তখন এরশাদ সাহেব এটা বললে আর যে কেউ অবাক হোক; আমি হই না। কেবল বলি, ওরে দুঃখ, তোরে কোথায় রাখি!
Thursday, April 23, 2009
দানবের আবার পোশাক কী!
খেলাফত মজলিশ চাচ্ছে, বাংলাদেশে তালেবানদের মতো শান্তির রাজত্ব কায়েম করতে!খেলাফত মজলিশের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির ও ইসলামি এনজিও আল মারকাজুল ইসলামির চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, 'তালেবানরা সাত বছর শাসন করে আফগানিস্তানে শান্তির রাজত্ব কায়েম করেছিল।...কিন্তু আজ তালেবানরাই হয়ে গেল জঙ্গি।...জিহাদ ছাড়া পৃথিবীতে শান্তি আসতে পারে না।'
একই সভায় সাংবাদিক মোবায়েদুর রহমান বলেন, 'কেউ ধরা পড়লেই বলা হয়, তার কাছ থেকে জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়েছে। তার প্রশ্ন, জিহাদি বই থাকবে না কেন?'
খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুর রব ইউসূফী আরও বলেন, 'আমরা আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের শাসনকে মূল্যায়ন করতে চাই।...খেলাফত মজলিশ বাংলাদেশেও সেই শান্তির রাজত্ব কায়েম করতে চায়।'
(প্রথম আলো, ১৮.০৪.০৯)
তালেবান শাসনের এই একটা নমুনাই যথেষ্ঠ।
এই শহিদুল ইসলাম আফগানিস্তানে যাওয়া মুজাহিদদের একজন! গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জঙ্গি তৎপরতার কারণে আটক হয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে দৈনিক জনকন্ঠ ভবনে ট্যাংকবিধ্বংসী মাইন পেতে রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। একাধিক বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার সুষ্পষ্ট প্রমাণ ছিল।
আমার প্রশ্ন এই মানুষটাকে কী আটক করা হয়েছে? নাকি পাগলা ষাড়ের মত ছেড়ে দিয়ে রাখা হয়েছে?এইসব মানুষদের মুক্ত রেখে চুনাপুঁটি জঙ্গিকে ধরে লাভ কী! এ বড়ো হাস্যকর!
তারচে বরং এদের কাজ নির্বিঘ্নে করতে দিন। বাংলা হোক আফগান। আমাদেরকে সাগরে চুবিয়ে মারা ব্যবস্থা চালু হোক শিগগির।
এরা যে কথায় কথায় জিহাদ-জিহাদ করেন, কোন জিহাদ? কোরানের জিহাদ, নাকি এদের নিজস্ব জিহাদ? কোরানের হয়ে থাকলে আমি কোরান থেকেই উদাহরণ দেই:
"তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যতক্ষণ না আল্লাহ জানেন তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে ও কে ধৈর্য ধরেছে।"
(৩ সুরা আল-ই-ইমরান ১৪২)
"আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব যতক্ষণ না প্রকাশ হয় তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করে ও কে ধৈর্য ধরে। আর আমি তোমাদের খবর পরীক্ষা করে দেখব।
(৪৭ সুরা মুহাম্মদ: ৩১)
এরা যে কথায় কথায় বলেন, তাগুতি আইন-মানবসৃষ্ট আইন মানি না। বাংলাদেশে এমন কোন আইনটা চালু আছে, যেটায় একজন মুসলমানকে তার ধর্ম পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে, নামায-রোজা করতে সমস্যা হচ্ছে?

এদের মাথায় আসলে কেবল ঘুরপাক খায় কোতল, তরবারি, উট...।
*জঙ্গি নামের দানবটার স্কেচ করতে গিয়ে ভাবলাম, এদের পোশাক কী, কেমনতরো হওয়া উচিৎ? বহুল প্রচলিত হচ্ছে, দাঁড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি। আমার মনে হয়, এইসব আসলে মুখ্য বিষয় না। দানবের আবার জাত কী, পোশাক কী! দানব, দানবই।
Wednesday, April 22, 2009
আবারও অগ্নিপুরুষের মুখোমুখি
মুক্তিযুদ্ধের দুধর্র্ষ কমান্ডো, এই মানুষটাকে চা খাবার নাম করে, আবারও ধরে নিয়ে এলাম। তাঁর সঙ্গে চা খাওয়ার যে সুখ, এই মানুষটা কেমন করে বুঝবে? মন্ত্রী-ফন্ত্রীর চা কোন ছার!
আমি অবশ্য ভয়ে ভয়ে ছিলাম, আসবেন তো ঠিক ঠিক! আসার কথা বলার পর বললেন, আপনি আগান, আমি আসতাছি। এসেছেন ঠিকই, কিন্তু আসার আগ পর্যন্ত আমি উদ্বেগে।
পরে আমি বুঝতে পারি, পাঞ্জাবীটা গায়ে দিয়ে এসেছেন, দেরি হয়েছে এজন্যই। আজ সেই পাঞ্জাবীটাই গায়ে দিয়ে এসেছেন, যেটা আগেরবার পরে এসেছিলেন। বুঝতে বাকি থাকে না মানুষটার এই একটাই পাঞ্জাবী।
চা খেতে খেতে আমরা কথা বলি।
মানুষটাকে আমি জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা, আপনি যে জিয়ার সঙ্গে ঠাস ঠাস করে কথা বললেন, আপনার ভয় করেনি? এমন একজন মানুষ, সেক্টর কমান্ডার।
মানুষটা অবাক হয়ে বললেন, ভয করব ক্যান? আমি তো অন্যায় কিছু বলি নাই। খালি বলছিলাম, স্যার, আপনে লিমপেট মাইন চিনেন না, কেমন কমান্ডার আপনে। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমিও মুক্তিযোদ্ধা তাইনেও মুক্তিযোদ্ধা। এমনিতে অবশ্যি অন্য মুক্তিযোদ্ধারা কমান্ডোদের ভয়ের চোক্কে দেখত।
প্রশ্ন করি, কেন ভয় করত?
কি কন! অখন যে বুড়া হইছি, অখনও চাইরজন মানু আমারে ধইরা রাখতে পারব না। এমুন চিকন মাইর দিমু কোন সময় অজ্ঞান হইব, টেরও পাইব না। আমাদের কমান্ডো ট্রনিং-এর সময় এইসবও শিখান হইত। খালি হাতে মারামারি (কমব্যাট ট্রেনিং)। একজন মানুষের শরীরের দুর্বল দিক কোনডা এইসব।
ডেইলি ২৪ ঘন্টার মইধ্যে ১৬ ঘন্টা ম্যালা ট্রেনিং চলত। ভোর ৫টা থিক্যা শুরু হইত ট্রেনিং। ২ ঘন্টা ধইরা চলত পিটি, খালি হাতে মারামারি (জুডো কারাত, আন আর্মড কমব্যাট)। গ্রেনেড মারা, রাইফেল ট্রেনিং, মাটিতে বোম ফুটানো, বোম ঠান্ডা করা (ডিফিউজ করা)।
এরপর নাস্তা এক মগ চা, দুইটা মোটা রুটি। নাস্তা শ্যাষ হইলে ঘন্টার পর ঘন্টা সাতার, নৌকা বাওয়া। পানির নীচে ডুব দিয়া দম বাড়ানো। সন্ধা ৬টা থিক্যা রাত ৯/ ১০টা পর্যন্ত পানিতে থাকতাম। ড্যাগার (কমান্ডো নাইফ) দিয়া জাহাজের নীচে (খোল) শ্যাওলা পরিষ্কার কইরা মাইন ফিট করা। মাইনের চুম্বুক জাহাজের নীচে আটকাইয়া যাইত। দিরং সুইচ(ডি-লে সুইচ)৩০ থিক্যা ৫০ মিনিট টাইম বাইন্ধা দেয়া। গামছা দিয়া লিমপেট মাইন...।
আমি বলি, আচ্ছা, এই মাইনের ওজন কেমন থাকত? জমা দেয়ার জন্য আপনার কাছে কি একটাই মাইন ছিল?
৫ কেজি হইব। না, তিনটা আছিল। আমার একটা, আমার লগের যোদ্ধা কুটির আ: খালেক মিয়ার একটা, পানিস্বরের আরজ মিয়ার একটা। মোট তিনটা। হালুয়াঘাটে থাকতে যুদ্ধ শ্যাষ হইল, আমরা বাড়িত ফেরত আইতাছিলাম। আখাউড়ার কাছে, উজানিশার আসলে আমরা আলাদা হইলাম। তখন হেরা কইল, এইগুলা নিয়া কী হইব, উজানিশার ব্রীজের পানিতে ফালাইয়া দিয়া যাই। আমি রাজি হইলাম না। ট্রেনিং-এর সময় আমাদের বলা হইছিল, এইগুলার ম্যালা দাম। তাছাড়া যেইটা দিয়া বড় বড় জাহাজ, ব্রীজ পাউডার কইরা দেয়া যায়, এইগুলা তো যেখানে সেখানে ফেলা যায় না। তো, হেরার ২টাও আমি নিয়া নিলাম। পরে ৩টাই জমা দিছিলাম।
আমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই, আপনার কী ট্রেনিংগুলো সব মনে আছে, না ভুলে গেছেন?
মানুষটা এবার ইস্পাত-কঠিন ভঙ্গিতে বলেন, সব মনে আছে, কিসসু ভুলি নাই। আবার দরকার হইলে আবার যুদ্ধ করুম।
যুদ্ধে আহত হন নাই?
হই নাই আবার। পা-টা গেছিল এক্কেবারে। আগরতলা থিক্যা আমারে পাঠাইল রাশিয়া। রাশিয়ায় ১২ দিন ছিলাম। এরপর ফিরা আইয়া নৌ-কমান্ডোতে গেলাম।
আজ আমার ব্যস্ততা। মানুষটাকে এগিয়ে দেই।
(মুক্তিযুদ্ধের সময় লিমপেট মাইন নিয়ে জানতে গিয়ে যা জানলাম, এই মাইনগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী জাপানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি করেছিল। যুগোশ্নাভিয়ায় মাইনগুলো এতদিন অব্যবহৃত পড়ে ছিল। ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ২০০০ মাইন ক্রয় করে, প্রতিটি ১২০০ ইউ, এস ডলারে।
নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে বিস্মিত এবং বেদনাহত হয়ে দেখলাম, কী অবহেলাই না করা হয়েছে এঁদের প্রতি এবং এঁদের তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে, স্বীকৃতি দেয়ায়।
বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে নৌ-কমান্ডোরা সবচেয়ে অবহেলিত। খেতাব দিতে প্রভাবিত করার পেছনে সেক্টর কমান্ডারদের অনেকখানি ভূমিকা ছিল, সুপারিশ ছিল। নৌ-কমান্ডোরা আসলে কোন সেক্টর কমান্ডাররের অধীন ছিলেন না। ১০ নম্বর সেক্টরটা ছিল সর্বাধিনায়ক ওসমানির অধীনে। প্রচলিত আছে, ওসমানি এইসব বিষয়ে খুব একটা তৎপর ছিলেন না।
এই নৌ-কমান্ডোদের ভূমিকা কতটা জরুরী ছিল এটার বোঝা যাবে সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানির নৌ-কমান্ডোদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায়, 'নৌ-কমান্ডোদের সফলতার উপর স্বাধীনতা যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনেকাংশে নির্ভর করছে। এই প্রশিক্ষণ গ্রহনের পর সফল প্রশিক্ষণার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত হবে একটি সুইসাইড স্কোয়াড। সুতরাং যারা একটা আত্মত্যাগ করতে রাজি নয়, কিংবা যাদের সাহস কম তারা যেন প্রথম অবস্থাতেই প্রশিক্ষণ ত্যাগ করে চলে যায়।'
এরপরই কমান্ডোদের ফর্মে ছবিসহ সই করতে হয়, '...যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না'।
এদেঁর বীরত্বের খানিকটা আঁচ করা যায় সেক্টর কমান্ডার লে ক: আবু ওসমান চৌধুরীর কথায়, 'যারা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে লিখিত বন্ড দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তাদের প্রত্যেককে সর্বাত্মক বীরত্বের খেতাব দেয়া সমীচীন।'
অন্য কমান্ডো এস এ মজুমদারের বেদনার কথা এখানে তুলে দেই, 'আমাদের দূভার্গ্য, আমাদের সাথে যদি একজন অফিসার থাকতেন তাহলে ১০নম্বর সেক্টরের কমান্ডার তিনিই হতেন। স্বাধীনতোত্তর ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক, বড় বড় লেখক সবাই ছুটে চললেন সেক্টর কমান্ডার আর বড় বড় অফিসারদের কাছে। তথ্য সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ হল ১৬ খন্ডের বিশাল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।...কিন্তু হতভাগ্য নৌ-কমান্ডোদের বীরত্বগাঁথা, দু:সাহসিক অভিযানের কাহিনী সম্পর্কে অবহিত না থাকার কারণে বাদ পড়ে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে।'
আরেকজন বীরপ্রতীক আলমগীর সাত্তার বলেন, '...খেতাব দেয়ার সময় কেন এত কার্পণ্য করা হল? খেতাবপ্রাপ্তদের বেলায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যাই বেশী এবং এটাই স্বাভাবিক। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্য যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তাদের প্রশিক্ষণ ছিল পর্যাপ্ত। এরপরও আমি বলব, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারাই খেতাব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বেশী। খেতাবপ্রাপ্তির ব্যাপারে সুপারিশ করার মত যাঁরা উচ্চপদে আসীন ছিলেন, তাদের অবহেলার কারণেই হয়েছে এমনটা।
...তবে ব্যতিক্রমি সেনানায়ক ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অভ স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। তার মত উদার যদি অন্য সেক্টর কমান্ডাররা হতেন, তাহলে অবশ্যই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা অনেক বেশী হত। অনেক সেক্টর কমান্ডারই মনে হয় বুঝতে পারেনি যে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ বারবার হয় না।...।')
Tuesday, April 21, 2009
কেবল কেষ্ট বেটাই চোর...?
১৮ এপ্রিল ছিল আইনস্টাইনের মৃত্যু দিবস। আইনস্টাইনকে নিয়ে একটা লেখা দিয়েছিলাম। এই লেখাটার জন্য সু-লেখকদের ৫টা গ্রন্থের সহায়তা লেগেছিল।
এই দিনই আমাদের মুক্তচিন্তার (এদের দাবীমতে) দৈনিক, আইনস্টাইনকে নিয়ে 'নানা রঙের আইনস্টাইন' নামে একটা লেখা ছাপে। পড়ে ভাল লেগেছে কিন্তু আমি ভেবে ভেবে হয়রান হই, লেখাটার জন্য এদের কোন বইয়ের সহায়তা লাগেনি, একটা সোর্সেরও উল্লেখ নাই, প্রয়োজনও নাই! দুগগা-দুগগা! স্বয়ং স্বায়ম্ভুব-প্রথম মনু আর কী! চলমান তথ্যভান্ড (কাত করলেই গড়িয়ে পড়বে)!
এখন পত্রিকাওয়ালারা ঘটা করে ছাপে, আজ অনলাইন পাঠকসংখ্যা এত। প্রথম আলো ৬ লাখ ছাপলে যুগান্তর ছাপে ৭ লাখ!
অথচ Alexa Traffic-এ প্রথম আলো হচ্ছে ২৬৫৯, যুগান্তর ৯৬২৭, তাহলে ঘটনা কী? কিছুটা বোধগম্য হয় পত্রিকাগুলোয় একবার ক্লিক করলে। তাৎক্ষণিক রিফ্রেশ করলেই ধাঁ ধাঁ করে হিট বাড়ছে, একেকবার ৩০/ ৪০ করে। প্রথম আলোর তো জবাব নাই, সঙ্গে সঙ্গে রিফ্রেশ করলেও ৩০০ হিট। জুয়েল আইচের যাদুকেও হার মানায়। আচ্ছা, হিট মানেই কী পাঠকসংখ্যা?
অতি উঁচুমার্গের একটা ওয়েব-সাইটে যখনই ক্লিক করি তখনই দেখি সদস্য ৮/ ১০ জন এবং অন-লাইনে আছেন ১২৫ জন! সব মিলিয়ে ১০০/ ১৫০ জন লেখক-পাঠক সর্বক্ষণ আইকার আঠার ন্যায় লেপ্টে আছেন, ছাড়াছাড়ি নাই। অথচ Alexa Traffic-এ সূচক দেখাচ্ছে ১,৬১,০০০!
এখন দেখছি, সদস্য ১০, অনলাইনে ৩৬৩; Alexa Traffic rank-এ সূচক দেখাচ্ছে: ৮০১৩৮।
এই সাইটটার সঙ্গে যদি সামহোয়্যারের তুলনা করি, সামহোয়্যারের সদস্য বা ব্লগার ৮১, অনলাইন বা ভিজিটর ১৫৩। আপাততদৃষ্টিতে মনে হবে সামহোয়্যার এই সাইটটার কাছে নস্যি। কিন্তু এলেক্সা বলে অন্য কথা। সামহোয়্যারের Alexa Traffic rank: ৫১৮৪!
সব দোষ কেষ্ট বেচারার, সেই চোর অন্যরা সব সাধু। কেষ্টর জন্য বড় মায়া হয়, বেচারা!
এই দিনই আমাদের মুক্তচিন্তার (এদের দাবীমতে) দৈনিক, আইনস্টাইনকে নিয়ে 'নানা রঙের আইনস্টাইন' নামে একটা লেখা ছাপে। পড়ে ভাল লেগেছে কিন্তু আমি ভেবে ভেবে হয়রান হই, লেখাটার জন্য এদের কোন বইয়ের সহায়তা লাগেনি, একটা সোর্সেরও উল্লেখ নাই, প্রয়োজনও নাই! দুগগা-দুগগা! স্বয়ং স্বায়ম্ভুব-প্রথম মনু আর কী! চলমান তথ্যভান্ড (কাত করলেই গড়িয়ে পড়বে)!
এখন পত্রিকাওয়ালারা ঘটা করে ছাপে, আজ অনলাইন পাঠকসংখ্যা এত। প্রথম আলো ৬ লাখ ছাপলে যুগান্তর ছাপে ৭ লাখ!
অথচ Alexa Traffic-এ প্রথম আলো হচ্ছে ২৬৫৯, যুগান্তর ৯৬২৭, তাহলে ঘটনা কী? কিছুটা বোধগম্য হয় পত্রিকাগুলোয় একবার ক্লিক করলে। তাৎক্ষণিক রিফ্রেশ করলেই ধাঁ ধাঁ করে হিট বাড়ছে, একেকবার ৩০/ ৪০ করে। প্রথম আলোর তো জবাব নাই, সঙ্গে সঙ্গে রিফ্রেশ করলেও ৩০০ হিট। জুয়েল আইচের যাদুকেও হার মানায়। আচ্ছা, হিট মানেই কী পাঠকসংখ্যা?
অতি উঁচুমার্গের একটা ওয়েব-সাইটে যখনই ক্লিক করি তখনই দেখি সদস্য ৮/ ১০ জন এবং অন-লাইনে আছেন ১২৫ জন! সব মিলিয়ে ১০০/ ১৫০ জন লেখক-পাঠক সর্বক্ষণ আইকার আঠার ন্যায় লেপ্টে আছেন, ছাড়াছাড়ি নাই। অথচ Alexa Traffic-এ সূচক দেখাচ্ছে ১,৬১,০০০!
এখন দেখছি, সদস্য ১০, অনলাইনে ৩৬৩; Alexa Traffic rank-এ সূচক দেখাচ্ছে: ৮০১৩৮।
এই সাইটটার সঙ্গে যদি সামহোয়্যারের তুলনা করি, সামহোয়্যারের সদস্য বা ব্লগার ৮১, অনলাইন বা ভিজিটর ১৫৩। আপাততদৃষ্টিতে মনে হবে সামহোয়্যার এই সাইটটার কাছে নস্যি। কিন্তু এলেক্সা বলে অন্য কথা। সামহোয়্যারের Alexa Traffic rank: ৫১৮৪!
সব দোষ কেষ্ট বেচারার, সেই চোর অন্যরা সব সাধু। কেষ্টর জন্য বড় মায়া হয়, বেচারা!
Monday, April 20, 2009
ডিজিটাল: 'মোস্ট ওয়ান্টেড'
ডিজিটাল জিনিসটা, শব্দটা ভাল করে বুঝে না উঠতেই এখন ডিজিটাল 'মোস্ট ওয়ান্টেড'-এর বাটে পড়েছি! কপাল আর কী!প্রথম আলোর তথ্যমতে, "নারায়নগঞ্জ পুলিশের ওয়েবসাইটে 'মোস্ট ওয়ান্টেড' আসামির তালিকায় ছবিসহ শামীম ওসমানের নাম আছে। র্যাব ১১-এর নারায়নগঞ্জ ক্যাম্প কার্যালয়ে 'মোস্ট ওয়ান্টেড' তালিকায় শামীম ওসমানের নাম সবার আগে!"
শামীম ওসমানের ১১ বছর সাজা হয়ে আছে, ৭ বছর পলাতক থাকার পর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তিনি দেশে সশরীরে হাজির হন। কেবল হাজিরই হননি পুলিশের নাকের ডগায় বললে ভুল হবে নাকের ভেতর (রাইফেল ক্লাবে) প্রকাশ্যে দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, বকতিমার(!) নামে অনল উগড়ে দিচ্ছেন।
আসলে ডিজিটাল এই ভদ্রলোক(!) শরীরজ টাইপের একটা ফিগার মাত্র। আপনারা যারা কম্পিউটার গেইম-টেইম খেলেন তারা বিষয়টা আমার চেয়ে ভাল বুঝতে পারবেন। এই যে, নিড ফ' স্পিডে ২০০ থেকে ৩০০ মাইল গতিতে দ্রুতগামী গাড়িগুলো ঝড়ের বেগে হাঁকান, ১০/২০ বার এক্সিডেন্ট করার পরও বহাল তবিয়তে থাকেন। হয় না এমনটা? আকসার হয়।
এটা আমার স্বকপোলকল্পিত না। বাস্তবে কিন্তু একবার মরলে আপনি আর বাঁচবেন না। বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? আচ্ছা বেশ, অ-ডিজিটাল দুনিয়ায়(বাস্তবে) একবার মরে বেঁচে উঠে দেখান দিকি। কথা দিচ্ছি, আরেকটা পোস্ট দিয়ে আমার ভুল স্বীকার করব।
*ছবিস্বত্ব: সংরক্ষিত (শিশিরের ছাপ এড়ানো গেল না!)
Sunday, April 19, 2009
আইনস্টাইন, অতিমানব একজন
আলবার্ট আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ, জার্মানীর মিউনিখ শহর হতে চুরাশি মাইল দূরে উলম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই মহান বিজ্ঞানী কচুরিপানার মতো সারাটা জীবন কাটিয়েছেন।একজন বিজ্ঞানীর কোনও দেশ হয় না- গোটা পৃথিবীই তার দেশ। তবুও তাঁকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, আপনার দেশ কোনটি? কি বলতেন তিনি, বলার মতো আদৌ কি কিছু ছিল? তাঁর শৈশব কেটেছে জার্মানীতে, কৈশোর ইতালী, যৌবন সুইট্জারল্যান্ডে, পৌঢ়ত্ব জার্মানী আর বার্ধক্য আমেরিকায়।
এ নিয়ে তাঁর বেদনার শেষ ছিলো না। ১৯২০ সালে বন্ধু ম্যাক্স বর্নকে চিঠিতে লিখেন, "AS A MAN WITHOUT ROOTS ANYWHERE..., I MYSELF HAVE WANDERED CONTINUALLY HITHER AND THITHER A STRANGER EVERYWHERE".
আইনস্টাইনের শৈশব মোটেও সুখকর ছিল না। শিক্ষকদের মতে তিনি ছিলেন হাবা শিষ্য- গাধার গাধা। বিখ্যাত গণিতজ্ঞ মিনস্কি তাঁর ওপর এমন খেপেছিলেন, প্রায়ই গালির খই ফোটাতেন, 'তুমি একটা অলস কুত্তা'।
এই অলস কুত্তাই, আইনস্টাইন আপেক্ষিক মতবাদ দিয়ে সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিলেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালে ক্যানসাস সিটিতে তার তৃতীয় প্রবন্ধের পান্ডুলিপি ৬০ লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়। সারাটা জীবন যেমন দু-হাতে টাকা কামিয়েছেন তেমনি দুস্থদের অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। দুস্থদের জন্যে বেহালা বাজিয়েছেন। চমৎকার বেহালা বাজাতেন তিনি। তৎকালীন নামকরা পত্রিকাগুলো বিখ্যাত বেহালাবাদক আইনস্টাইন শিরোনামে বাড়াবাড়ি রকম প্রশংসা করেছিল।
একবার জাপানে মানুষে টানা রিকশায় তাঁকে উঠতে বলা হলে, ব্যথিত হয়ে তিনি বলেন: 'একজন মানুষ পশুর মতো টানবে, আমি নির্বিকারচিত্তে বসে থাকব তা কি করে হয়'!
বহু অনুরোধ করেও ফল হয়নি। উঠানো যায়নি রিকশায়।
অহংকারী ছিলেন না, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। জার্মানী শেষবার ছাড়ার পর সে সময়কার একশ বিজ্ঞানী তার তত্ত্ব ভুল বলে মহা হইচই শুরু করে। আইনস্টাইন রাগ করলেন না, ব্যাপারটা সহজভাবেই নিলেন। অসম্ভব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন: 'আরে এসব কি, একশ জনের কি প্রয়োজন, মাত্র একজন ভুল ধরিয়ে দিলেই তো হয়'!
নিউইয়র্কে প্রথমবার যাবার পর সাংবাদিকরা তাঁকে ছেঁকে ধরল। একজন মজার এক প্রশ্ন করল: 'আচ্ছা বিষয়টা কি বলুন দেখি, আপনার আপেক্ষিকবাদের নাম শুনে মেয়েরা এতো উচ্ছ্বসিত কেন'?
আইনস্টাইন হা হা করে হেসে বললেন: 'কেন আবার, ফি বছরই তো নতুন নতুন ফ্যাশনের হুজুগ শুরু হয়, লেটেস্ট হলো আপেক্ষিকবাদ।
ঢিলেঢালা আটপৌরে বেশভূষা, মাথায় কাকের বাসা, প্রায় সবসময়ই ঠোঁটে ঝুলছে সিগার, বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ- এসব নিয়েই আইনস্টাইন।
তার ধারণা ছিল, নাৎসীরা যদি আণবিক শক্তির প্রয়োগ করে তাহলে ভয়াবহ অবস্থা হবে। কিন্তু জাপানের ওপর আমেরিকার আণবিক বোমা নিক্ষেপ এবং এর পরিণাম দেখে ভীষণ আঘাত পান। মানুষের কল্যাণে এ শক্তি মুঠোয় আটকাতে গিয়ে ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। নিমিষেই হাজার হাজার প্রাণ জড় পদার্থ হলো, লাখ লাখ লোক চিরতরে পঙ্গু।
আইনস্টাইন চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলেছিলেন: 'ফর গড সেক, শুধু যদি একটু ইঙ্গিত পেতাম জার্মানরা আণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে না, তাহলে কখনই এ বোমা বানাতে সহায়তা করতাম না, কখখনো না'।
আইনস্টাইন ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। একটা নমুনা এরকম, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চৌদ্দজন বিজ্ঞানীর নাম বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে গোপন ভোটের মাধ্যমে চাওয়া হলে, বিভিন্ন নাম ওঠে এলো। কিন্তু আইনষ্টাইনের নাম কারও পছন্দ থেকে বাদ পড়ল না।
তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল: 'আপনার ল্যাব কোথায়'?
উত্তরে মাথায় টোকা মেরে বললেন: 'এই তো, এটাই'। এক টুকরো কাগজ আর একটা পেন্সিল দেখিয়ে বললেন, 'এটাই আমার ল্যাব-ইন্সট্রুমেন্ট'।
সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল: আচ্ছা ধরুন আপনার আপেক্ষিকতত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হল। ফল কি দাঁড়াবে মনে করেন?
তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে থেমে থেমে বললেন: 'হবে আর কি, ফ্রান্সের লোকেরা বলবে: ওহ, ঐ ব্যাটা তো জার্মান আর জার্মানরা ঠোঁট ওল্টে বলবে, ও তো ইহুদী'।
অশান্ত নরকতুল্য পৃথিবী দেখে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলেছিলেন: আহ, আবার যদি যৌবন ফিরে পেতাম। নিজ ইচ্ছার পেশা বেছে নিতে বলা হলে, মোটেও বিজ্ঞানী হতাম না। হকার হতাম। ক্ষীণ আশা, কিছুটা হলেও স্বাধীনতা পেতাম।
যে ছোট বালক বাবার কাছ থেকে কম্পাস উপহার পেয়ে বিজ্ঞানের যাদু দেখে প্রবল নাড়া খেয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই বালকটি বিজ্ঞানের চমক দেখিয়ে পৃথিবীর জড়শুদ্ধ নাড়িয়ে দিল। এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট হারব্লক সৌরজগত এঁকে পৃথিবীর ওপর লিখে দিলেন, "ALBERT EINSTEIN LIVED HERE..."।
*যেসব প্রবন্ধের সহায়তা নেয়া হয়েছে:
আণবিক নয় মানবিক: রশীদ হায়দার,
আইনস্টাইন: তপন চক্রবর্তী,
আইনস্টাইনের জগৎ: আব্দুল্লাহ আলমুতী,
আইনস্টাইন শতবর্ষের আলোক: শাহজাহান তপন,
আইনস্টাইন এত বিখ্যাত কেন: আলী আসগর।
**ছবিসূত্র: প্রথম আলো। প্রথম আলোর সূত্র কী এটা এরা উল্লেখ করেননি (হোমওয়ার্ক হয়ে থাকলে ঠিক আছে!)।
Saturday, April 18, 2009
বেলের শরবত বনাম কর্মফল!
স্বামী বিবেকানন্দ খুব মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখে বললেন, আপনার সভার কাজটা কি একটু বুঝিয়ে বলুন তো?
সন্ন্যাসী: আমরা কসাইদের হাত থেকে গো-মাতাদের রক্ষা করি।
স্বামী: কিন্তু যেসব গরু বুড়া হয়ে যাবে এদের গতি কী- চাষী বা গোয়ালার কাছে তো এদের কোন মূল্য নাই!
সন্ন্যাসী: এইসব গরুদের জন্য আমরা আশ্রম করে সেবা করব।
স্বামী: উত্তম! তা এখন তো দেশে মহা দুর্ভিক্ষ, নয় লক্ষ লোক মারা গেছে। এই বিষয়ে আপনাদের চিন্তা ভাবনা কি?
সন্ন্যাসী: এসব বিষয়ে আমরা মাথা ঘামাচ্ছি না। গো-মাতা রক্ষা না পেলে হিন্দু ধর্ম রসাতলে যাবে!
স্বামী: কী আশ্চর্য, এত প্রাণ যাচ্ছে আর আপনি বলছেন-, আশ্চর্য! যাই হোক, অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও গো-মাতা রক্ষা কাজ বাদ দিয়ে এদিকে একটু সময় দিলে হয় না?
সন্ন্যাসী: গো-মাতার কথা ভুলে যাব! মশায়, আপনি বেশ লোক যা হোক! মানুষ মরছে তো আমরা কি করব? মানুষের পাপেই তো দুর্ভিক্ষ। যেমন কর্ম তেমন ফল, মানুষ মরে তার কর্মফলে...।
প্রসঙ্গটা এখানে দেয়ার শানে-নযুল হচ্ছে: একজন এফসিপিএস ডাক্তারের সঙ্গে মৃদু বাদানুবাদ হল আমার। ডাক্তার সাহেবের বক্তব্য, সমস্ত কিছুর জন্য দায়ি তার কর্মফল।
আমার মেমরি গোল্ড-ফীসের [১] মত। প্রয়োজনের সময়, প্রয়োজনীয় কথাটা কখনই আমি খুঁজে পাই না। বলার সময় শব্দের পিছু ধাওয়া করতে হয়, শব্দগুলো কেবল ফাঁকি দেয় আমায়! প্রায়শ কিচেন, চিকেন গুলিয়ে ফেলি, পাক খেয়ে গুলিয়ে যায় দরজা, জরদা। এ নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়, কী আর করা, কপালের ফের! কিন্তু এইবার মেমরি তার দায়িত্ব পালনে পিছপা হল না।
আমি বিমলানন্দে বললাম, বোমা মেরে ফিলিস্তানি শিশুদের যে মেরে ফেলা হল, এই শিশুদের কী অপরাধ?
ডাক্তার সাহেব খানিকটা থমকালেন। সামলে নিয়ে বললেন, তাদের বাবারা নিশ্চয়ই কোন না কোন অন্যায় [২] করেছেন।
আমি হতভম্ব হয়ে মানুষটা দিকে তাকিয়ে রইলাম। এমন পড়াশোনা জানা মানুষটা এইসব কী বলছে! আমি দেখলাম এর সঙ্গে তর্ক বৃথা। এর সঙ্গে বাদানুবাদ করার শিক্ষা এখনও অর্জন করতে পারিনি!
ভলতেয়ারের স্পষ্ট কথা, 'কোনো দেশের নিয়তি নির্ভর করে সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কতটুকু পেটের পীড়ায় আক্রান্ত তার উপর'।
তাঁর কথা ধার করে আমি বলি, এ গ্রহের নিয়তি নির্ভর করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কতটুকু পেটের পীড়ায় আক্রান্ত তার উপর। তাঁর বাহ্যে ত্যাগ করা, কোষ্ঠশুদ্ধির উপর। ঠিকঠাক মত ডেলিভারি দিচ্ছেন কিনা তার উপর! কোষ্ঠ নিয়মিত পরিষ্কার থাকলে ভাবনার কিছু নেই। নইলে এর জন্য বেলের শরবতের বিকল্প নাই।
সকাল সকাল হোয়াইট হাউজের বাটলার ঝলমলে মুখে বলবে, খানা লাগানো হয়েছে, মি. প্রেসিডেন্ট। তার আগে বেলের সরবতে চুমুক দিন।
যীশু, এ গ্রহের মঙ্গল করুন, আমেন। জয় হো, জয় হো বেলের শরবত! জয় হো, জয় হো কর্মফল!
*ছবিস্বত্ব: আলী মাহমেদ (সংরক্ষিত)
সহায়ক সূত্র:
১. মেমরি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post.html
২. অন্যায়...: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_10.html
মুক্তিযুদ্ধে, একজন ঠেলাওয়ালা!
কমান্ডো মো: খলিলুর রহমান, তাঁর মুক্তিযুদ্ধ, নাবিক ও নৌকমান্ডোদের জীবন গাঁথা বইয়ের ২৪০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:
"ফজলুল হক ভূঁইয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মৃত্যুঞ্জয়ী বীর।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে এদেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার আম্রকাননে 'সুইসাইডাল স্কোয়াডে' নাম লিখিয়েছিলেন।
৩ মাস ঝুকিপূর্ণ ট্রেনিং নিয়ে নিজেকে একজন চৌকশ নৌকমান্ডো হিসাবে প্রস্তুত করতে সমর্থ হন।
এর আগে ২৫ মার্চ পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য ২৭ মার্চ সকালে আখাউড়া ইপিআর ক্যাম্প শক্রমুক্ত করেন।
এরপর তিনি চুনারুঘাট যুদ্ধ, বাল্লা যুদ্ধে অংশ নেন। দুটি যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ এবং কয়েকদিন ব্যাপি বিরামহীন ভাবে চলে।
অত:পর মেজর শফিউল্লা (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) তাঁকে নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য পলাশী পাঠিয়ে দেন।
(ভয়ংকর কঠিন) প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নারায়নগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশন এবং জামালপুর ফেরীঘাট অভিযানে অংশ নেন।
ভারতে প্রত্যাবর্তনের পর মিত্রবাহিনীর সাথে হোসেনপুরে একটি বড় ব্রীজ ধ্বংস করেন।"
(লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে উল্লেখ করলাম)
নৌ-কমান্ডো ফজলুল হককে নিয়ে লেখাটা পড়ে আমি চমকে উঠি। এই মানুষটা তো আমার এলাকার। খোঁজ করতে গিয়ে দেখলাম, মানুষটা সম্বন্ধে তেমন কেউ বিশেষ কিছু জানে না। এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা বছরের পর বছর ধরে বাতচিত করেন, তাঁদের মধ্যে এই মানুষটাকে কখনও দেখা যায়নি। মানুষটা কোন দল করেন না এবং প্রায় নিরক্ষর এটাই কী কারণ?
ভাগ্যক্রমে মানুষটাকে পেয়ে যাই। না পেলেই সম্ভবত ভাল হত। মানুষটা ঠেলাগাড়ি চালান- আমি থরথর করে কাঁপতে থাকি! অন্তত আমাকে এই বাড়তি কষ্টটা পেতে হত না। কখনও নিজেকে আমার এমন অসহায় কাতর মনে হয়নি। যে বাড়িটার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি এটাকে কী আদৌ বাড়ি নামের কিছু বলা যায়? জানি না, জানি না আমি। এই ছাপড়ার একটা ঘরে গাদাগাদি করে থাকে এতগুলো মানুষ! এ দেশের সেরা(!) সন্তান। যাদের জন্য আমি মুক্ত শ্বাস নিচ্ছি? হা ঈশ্বর...!
আমার মাথায় কেবল ফাদার মারিনো রিগনের কথাটা ঘুরপাক খাচ্ছিল, "যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁরাই জয়ী। আমরা যারা বেঁচে আছি তারা স্বাধীনতার সুখ বা সুবিধাভোগী।"
ফজলুল হক নামের মানুষটা আমাকে দেখে বিব্রত হচ্ছিলেন, বসার কোন জায়গা দিতে পারছিলেন না বলে। তিনি বারবার বলছিলেন, অন্য কোথাও বসে কথা বলি? আমি ভয়ে ভয়ে বলি, আপনি কী আমার বাসায় কষ্ট করে যাবেন, আমরা একসঙ্গে চা খাব। মানুষটা সানন্দে রাজি হয়ে যান।
আমরা চুকচুক করে চা খাই আর কথা বলি।
মানুষটা আমাকে বলেন, 'পুরনো দিনের কথা বইলা কী লাভ? আমার তো কারও প্রতি কোন দাবী নাই'।
আমি আমার আস্তিনে লুকানো ব্রক্ষ্মাস্ত্র ছুঁড়ে দেই। বলি, এই দেশে এখনো কিছু লোক আছে যারা আপনাদেরকে ভুলেনি। উদাহরণ দিয়ে বলি, অনেক আগে এখানে চাকরি করতেন, ডা: রুমিকে চেনেন না? তিনি এখন মস্ত বড় ডাক্তার। এই মানুষটা কখনও চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ট্রেনে আসলে; গঙ্গাসাগরের কাছে এসে সীট ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। ততক্ষণ পর্যন্ত বসতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না ট্রেনটা বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের সমাধিস্থল ত্যাগ না করে।
মানুষটা কাঁদেন। আমি তাকে কাঁদতে দেই। কী হাহাকার করা একটা দৃশ্য! এই অগ্নিপুরুষের এমন কষ্টের ছবি উঠাতে মন সায় দেয় না। কিন্তু আমরা জাতি হিসাবে কতটা সভ্য এর নমুনা থাকাটা বড্ড জরুরি।মানুষটা খানিকটা সুস্থির হয়ে বলেন, 'এই দেখেন, আমার শইলের রোম দাড়ায়া গেছে'।
আমি অবিশ্বাস করার জন্য না, মানুষটাকে ছোবার লোভে তাঁর হাতে হাত রাখি।
এরপর মানুষটা থেমে থেমে বলতে থাকেন আমাদের অজানাসব কথা! তাঁদের দুর্ধর্ষ ট্রেনিং-এর কথা। নাম লিখিয়েছিলেন, সুইসাইডাল স্কোয়াডে। সই করতে হয়েছে, "...যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না" এই কাগজে।
ভারতের কমান্ডার জি, এম, মার্টিস কেমন করে তাঁদের ট্রেনিং দিয়েছেন। প্রত্যেককে ১টা করে কাফনের কাপড়ও দেয়া হয়েছিল। অ্যামবুশ বা কোন কারণে সহযোদ্ধার মৃত্যু হলে যেন কাফনের কাপড় মুড়িয়ে কবরস্থ করা হয়। সেই রেডিও থেকে প্রচারিত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের "আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ী"। ব্যস, পেটে লীমপেট মাইন গামছা দিয়ে বুকে বেঁধে পানিয়ে ঝাপিয়ে দৈত্যাকারসব পাকিস্তানিদের অস্ত্র-খাবার ভর্তি পানির জাহাজগুলো উড়িয়ে দেয়া। অপরারেশন জ্যাকপটের মাধ্যমে এক নিমিষেই গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছিল, ভয়াবহ এক ঘটনা ঘটে গেছে!
গা হিম করা সব কথা বলে যাচ্ছিলেন। তার চোখ দিয়ে আমি দেখছিলাম, অপারেশন জ্যাকপট-এর সেই সিনেমাকে হার মানানো দুর্ধর্ষসব বীরত্ব!
আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতটুকু পড়েছি, কোথাও কাফনের কাপড়ের প্রসঙ্গ শুনিনি। আজ জানলাম। আরও জানলাম, মানুষটা জিয়াকে কেমন নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছেন! এখন মানুষটার স্বরূপ আমূল বদলে গেছে- সেই দাপিয়ে বেড়ানো কমান্ডো। 'পাপা-মামা ডোন্ট ক্রাই, কামান্ডো সোলজার নেভার ডাই'!
মানুষটা বলতে থাকেন, 'যুদ্ধ যখন শেষ হইল, আখাউড়া আসলাম। তখন সবাই অস্ত্র জমা দিতেছে। আমার অস্ত্র কেউ জমা নেয় না। আমার অস্ত্র তো বন্দুক-রাইফেল না, লিমপেট মাইন। আমারে কুমিল্লা পাঠান হইল। সেক্টর কমান্ডার জিয়ার কাছে। জিয়া বললেন, এইটা কী! আমি বললাম, আপনে একজন সেক্টর কমান্ডার, লিমপেট মাইন চেনেন না!
জিয়া বললেন, না, আমি বুঝতেছি না, আমি ল্যান্ড-ফোর্সের লোক। এরপর একবার এইখানে, আরেকবার ওইখানে পাঠায়...'।
মানুষটা হা হা করে হাসতে থাকেন।
আমি চাতকের মত দেখি মানুষটার হাসি, ঝকঝকে চোখ!
মানুষটার কাজে বেরুবার তাড়া। আরেকদিন আমরা বসব এই প্রতিশ্রুতি আদায় করে মানুষটাকে বিদায় দেই।
এই দেশের সেরা সন্তানদের ( মনে পড়ে যায়, দুলা মিয়ার কথা) কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে পদে পদে অসম্মানিত হওয়া। আর ধান্দাবাজদের ধান্দাবাজীর সুযোগ করে দেয়া। গ্রামীন ফোন, প্রথম আলোর চোখের পানিতে দেশে বন্যা হয়ে যাওয়ার দশা। এদের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে, এরা মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠির মালিক বনে গেছে। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, এই 'একাত্তরের চিঠি' বই বিক্রিলদ্ধ টাকা কী চিঠির মালিকরা পাবেন?
*এই পোস্ট আমি উম্মুক্ত রাখব। যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে, তখনই যোগ করব। পরবর্তি লেখা...।
**রাসেল পারভেজ, এই মানুষটাকে নিয়ে 'আমার ব্লগ' সাইটে লিখেছেন। বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর কাছে তুলে ধরার জন্য কৃতজ্ঞা প্রকাশ করি। লেখাটার লিংক
***ইত্তেফাকের ভৌতিক সাক্ষাৎকার!: http://www.ali-mahmed.com/2011/03/blog-post_26.html
****সম্প্রতি ফজলুল হক ভূঁইয়াকে নিয়ে ডয়চে ভেলে থেকে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। তাঁর এই সাক্ষাৎকারের রেডিও লিংক পাওয়া যাবে এখানে: http://bit.ly/muXJIp
Thursday, April 16, 2009
খাল কাটো রে, কুমির এনো না
তো, একদেশের এক রাজা এক রাতে এক অদ্ভূত স্বপ্ন দেখলেন। আমাদের এই সময়ে এরকম একটা স্বপ্ন দেখলে বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রায় শূন্য গ্রে-মেটার শেষ করে ফেলতেন।
কেউ হয়তো বলতেন, কিছু ঘটনা চেতন মন অবহেলায় এড়িয়ে যায়- অবচেতন মন ওসব যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখে। স্বপ্নের মাধ্যমে অন্যরকম বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। কেউ বা বলতেন, গুরুপাক খাবার এজন্যে দায়ী, হজমের সমস্যাই স্বপ্নের জন্যে সহায়ক হয়েছে।
কিসব কথা, গুরুপাক খাবারে রাজা-ফাজার সমস্যা হবে কেন! বরঞ্চ গুরুপাক না খেয়ে সাধারণ খাবার খেলেই রাজার হজমে সমস্যা হওয়ার কথা।
তবে এও সত্য, এই রাজার দাঁতগুলো ছিল অসম্ভব খারাপ। অনেক সময় খাবার চিবাতে গিয়ে দাঁত চিবিয়ে ফেলতেন, টেরটিও পেতেন না। ইনার সভাসদদের একজন, প্রধান ভাঁড় প্রায়ই ঠাট্টা করতেন: রাজা মশায়, আপনার দাঁতের যে অবস্থা, একদিন দেখবেন আপনার অজান্তেই টুপ করে মাটিতে দাঁত পড়ে, দেখবেন শেষে সেই দাঁতে হোঁচট খেয়ে নিজের পা নিজেই কেটে ফেলেছেন।
রাজা-টাজাদের সঙ্গে কেউ এরকম রসিকতা করলে তাদের মুণ্ডু মাটিতে গড়াগড়ি খায়। কিন্তু এ রাজা হা হা করে হাসতেন। এমনিতেও আংটির ছাপ মেরে লিখে দিয়েছিলেন, রাগ করে রাজা এই ভাঁড়কে হত্যার আদেশ দিলেও তা যেন পালন না করা হয়। তো, রাজা দাঁতের জন্যে খাবার ভালো চিবাতে পারতেন না, এজন্যে হজমে ব্যাঘাত ঘটলেও ঘটতে পারে।
তো যাই হোক, রাজা স্বপ্ন দেখলেন একটা গায়েবি আওয়াজ তাকে বলছে, এই রাজা তোর যে দু-চারটা দাঁত এখনো ঝুলে আছে এগুলো ফেলে দে।
রাজার দেহ থরথর করে কাপছে। ভয়াবহ রকম লাফাচ্ছে দেখে হৃদপিণ্ডটা মুঠোয় চেপে লাফালাফি কমালেন।
রাজা (গোঁ-গোঁ করে): এসব কি বলছেন, আমি খাব কি করে!
গায়েবী আওয়াজ: আরে ব্যাটা খাবার থাকলে তো খাবি! অচিরেই তোর দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে, এককিনি, একটা শস্যও থাকবে না।
রাজা (বিলাপ করে): কী সর্বনাশ, আমার কি হবে গো, তাহলে উপায়!
গা. আওয়াজ: উপায় আছে। তার আগে তুই বল, কোন জিনিস কাটলে বাড়ে?
রাজা: গায়েবী ভাইয়া, আমার মাথা ঠিক নাই, দয়া করে রসিকতা করবেন না।
গা. আওয়াজ: হাহ, পারলি না তো। পুকুর রে ব্যাটা, পুকুর। খাল আর পুকুর কাটলে বাড়ে।
রাজা: বাড়লে বাড়ূক আমার কি! দুর্ভিক্ষের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক?
গা. আওয়াজ: আরে কি ফড়ফড় করছে। সোজা ব্যাপারটা ধরতে পারছিস না? তোর দেশে এমন তো না ইন্ডাস্ট্রি-ফিন্ডাস্ট্রি আছে, মাটির নিচে যে সব সম্পদ আছে তাও তুলতে পারবি না। কৃষি নির্ভর দেশ। চাষাবাদই ভরসা। জানিস না, সূর্য দুহাত নিচে নেমে এসেছে, দেশটা মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। খাবি কি, বালি? খাল কেটে পানির ব্যবস্থা কর। বাট রিমেম্বার, খাল কেটে কুমির আনিস না।
ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই রাজা তার সভাসদদের জরুরি তলব করলেন। সভা যখন শেষ হলো, ভোর হয় হয়। রাজা তখন চোখ ধাঁধানো আলখেল্লা (সাফারীর মত মত একটা জিনিস), মুকুট, নাটবল্টু যা যা ঠুন ঠুন করছিল সব খুলে ফেলে গেঞ্জির মতো একটা ফতুয়া পড়লেন। সাঙ্গোপাঙ্গোসহ হাতিয়ার নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। হাতিয়ার মানে কোদালের মতো একটা জিনিস। সাঙ্গোপাঙ্গো, প্রজাদের বললেন, বাদ্য বাজাও। হাজার হাজার নাকাড়া বেজে উঠল। আকাশলোকের বাসিন্দা চমকে উঠলেন, ভুল করে কেউ বজ্রপাতের সুইচ টিপে দেয় নাই তো!
রাজা মাটিতে কয়েক কোপ দিয়ে ভুড়ি ভাসিয়ে ওখানেই বসে পড়লেন। কৃষক, আপামর প্রজা এ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলো। তাদের মুগ্ধতা চুয়ে মাটি ভিজে গেল। দেশের লোকজন খাওয়া আর ওই কাজটার (ভদ্রসমাজে বিস্তারিত বললাম না, মতান্তরে এতে জনসংখ্যা ধাম ধাম বাড়তে থাকে) সময় বাদ দিয়ে খাল কাটায় লেগে গেল। খাল কাটতে কাটতে এক সময় রাজার মৃত্যু হল। পাওয়ার মধ্যে পাওয়া গেল ছেঁড়া গেঞ্জি আর তোবড়ানো শাহী তোরঙ্গ।
রাজার বউ রাণী হলেন। এটাই নিয়ম।
এই রাণীও পূর্ণ উদ্যমে খাল কাটার কর্মসূচি হাতে নিলেন। সমস্যা দেখা দিল কাটার মতো খাল পাওয়া যাচ্ছিল না। যাও বা আছে, কোমর সমান থকথকে কাদা।
ঝানু সভাসদরা অনেক মাথা খাটিয়ে একটা উপায় বের করলেন। সেই অনুযায়ী কোমর সমান কাদার ওপর হাজার হাজার লোক টনকে টন মাটি ফেলল। শত শত হাতি এনে মাটি বসিয়ে সমান করা হল। রাণী এলেন, আওয়াজ উঠল, বাদ্য বাজাও। বাদ্য বাজল। রাণী আলতো কোপ দিয়ে জমাট মাখনের মতো এক খাবলা মাটি তুলে ফেললেন।
সে দেশে এমন ফসল ফলল যে, উদ্ধৃত্ত খাদ্য সাগরে ফেলে দিতে হল। উপায় কী, এতো গোলা কই! ওই দেশে এমন সুখ নেমে এল যে কেউ স্বর্গে যেতে চাইত না। পরিজনহীন, একাকী, অভুক্ত শীর্ণ দেহে কেউ বিশাল আকাশের নিচে আবর্জনায় শুয়ে থাকত না। কোন যুবতী মাকে নির্দয় হাতে বুকের শিশুকে একপাশে সরিয়ে দেহ বিক্রির আশায় বিমর্ষ মুখে ঘুরে বেড়াতে হত না।
শান্তি আর শান্তি...।
*আমি যেটা বলি, ফিকশনের জন্ম রিপোর্টিং-এর গর্ভে। মোটা দাগে ফিকশনের মা হচ্ছে রিপোর্টিং (বাবা কে এটা অবশ্য আমার জানা নাই)। এই লেখাটা লিখেছিলাম যে ঘটনার উপর সেটা খানিকটা বলি। সালটা ১৯৯১। রিপোর্টটা পত্রিকা থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি:
"২২ নভেম্বর, শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ডিএনডি-তিতাস খাল পুন:খননের মাধ্যমে খাল কাটা কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। ডিএনডি-তিতাস খাল ছিল খনন অনুপযোগী (মানে আদৌ খননের প্রয়োজন ছিল না)।
এজন্য উদ্বোধনের ১০ দিন আগে থেকেই সংস্কার কাজ শুরু হয়, যাতে খালেদা জিয়া নির্বিঘ্নে কোদাল চালাতে পারেন। প্রথমে কোমর সমান কাদা সরানো হয়। তারপর সেখানে বালি ফেলা হয়, বালির উপর মাটি দেয়া হয়। এভাবেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে খালটিকে খনন উপযোগী করে তোলা হয়। মন্ত্রীরাসহ খালেদা জিয়া যে মাটি কেটেছিলেন তা মাত্র ২দিন আগে ফেলা।"
*বিটিভি-তে প্রচারিত সেই অনুষ্ঠান এ দেশের আপামর জনতা প্রত্যক্ষ করলেন। তাদের মধ্যে এ অধমও একজন।
**'একালের প্রলাপ' থেকে
***ছবিস্বত্ব: সংরক্ষিত
Wednesday, April 15, 2009
বুক্কা এবং ধ্রুব'র এক চিলতে আকাশ!
"বুক্কা শ্বাস বন্ধ করে বাবার গল্প শুনছে। হাতি-ঘোড়া, ভূত-প্রেতের গল্প না। সত্যি গল্প। বাবার শৈশব-কৈশোরের গল্প। কী রোমাঞ্চকর সব গল্প!
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বেটারে, আহা, কী সব দিন ছিল।
বুক্কা বলল, বাবা, ছোটবেলায় তুমি কি কি করতে? খুব দুষ্ট ছিলে বুঝি?
বাবা লাজুক গলায় বললেন, হুঁ, একবার মৌমাছির চাকে ঢিল দিলাম। দিল কামড়। মুখ ফুলে ঢোল। বাবা ছাতা দিয়ে দিলেন এক বাড়ি। জীবনে সেই প্রথম বাবার হাতে মার খেলাম। কেন জানি বাবার মেজাজ সেদিন খুব খারাপ ছিল।
বুক্কা বলল, মৌমাছির চাক কি বাবা?
বাবা বললেন, এই যে মধু; অ, তুই চিনবি কি করে! তুই তো ব্রেডের সঙ্গে খাস জ্যাম-জেলী। ফুল থেকে মৌমাছি মধু নিয়ে তার বাসায় জমায়। আগুনের ধোঁয়া দিলে মৌমাছিরা বাসা ছেড়ে চলে যায়। তখন ওদের বাসা ভেঙ্গে মধু সংগ্রহ করা হয়।
বুক্কা অবাক হয়ে বলল, বাবা আগুনে মৌমাছিরা মারা যায় না?
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, তাতো মরবেই। তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌমাছি চাষ করলে অবশ্য মৌমাছিরা মরে না।
বুক্কা চোখ গোল গোল করে বলল, বাবা মৌমাছির বাসা কি রকম দেখতে, এ্যাকুরিয়ামের মতো?
বাবা হাসলেন, ধুর পাগল। দাড়া তোকে সিডি এনে দেব। খুঁজে দেখি পাই কিনা, কম্পিউটারে দেখতে পারবি।
বুক্কা ঠোঁট উল্টে বলল, সে তো আমিই পারি। জিসানের কাছে কত্তো সিডি।
বাবা অবাক হলেন, জিসান কে?
বুক্কা হড়বড় করে বলল, আমার বন্ধু। বাবা, তুমি ওকে চেন না, আশ্চর্য! ওর বাবা একজন মন্ত্রী!
বুক্কার বাবা গভীর শ্বাস ফেললেন, তোর বন্ধু-বান্ধব, সচিব-মন্ত্রীর ছেলে। অথচ আমার শৈশব-কৈশোরের বন্ধু ছিল কেউ ধোপার ছেলে, কেউ বা মুচির ছেলে।
বুক্কা আর্তনাদ করে উঠল, হোয়াট দ্য হেল য়্যু আ টকিং এবাউট . . .!
বাবা তীব্র গলায় বললেন, শাটআপ বুক্কা । এসব কি অভদ্র কথা!
বুক্কা মাথা নীচু করে বলল, সরি বাবা
বাবা বললেন, তো, যা বলছিলাম, আমার শৈশব-কৈশোর এদের কাছে ঋণী। আজ আমি যা কিছু, এর পেছনে এদের অনেক অবদান আছে। এটাই বাস্তব, আমি ওখান থেকেই উঠে এসেছি। আহা কী সব দিন! এদের সঙ্গে কতো ডাংগুলি খেলেছি।
বুক্কার বিস্মিত গলা, ডাংগুলি কি বাবা?
বাবা ঝলমলে মুখে বললেন, খুব মজার একটা খেলা। এক লাল হলে আস্ত একটা গুদাম কেনা যেত। এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ . . . এভাবে গুণে গুণে এক লাল হত। মুচির ছেলে গাদুরার কাছে আমি নিয়মিত হারতাম। সে গুদাম-টুদাম, নদী সব কিনে ফেলত। আমি ফতুর হয়ে যেতাম। পরে অসংখ্য কিল নিতে হতো।’
কিল কি বাবা?
বাবা হাসলেন, ইসরে বেটা বলিস না, পিঠে দুমদুম করে মার!
বুক্কা এবার সত্যি সত্যি আগ্রহী হলো, বাবা এই খেলার কি সিডি পাওয়া যাবে?
বাবা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, মনে হয় না। আজকাল তোরা কী সব খেলা খেলিস- ব্যাকগ্যামন, পেসেন্স, গল্ফ, বিলিয়ার্ড, তাও কম্পিউটারে!
বুক্কা বলল, আর কি খেলা ছিল তোমাদের সময়, বাবা?
বাবা বললেন, কতো ধরনের খেলা- দাড়িয়াবান্ধা, এক্কা-দোক্কা। গুলতি দিয়ে একবার বিরাট একটা পাখি মেরেছিলাম।
বুক্কা থেমে থেমে বলল, কী নিষ্ঠুর ছিলে তুমি, বাবা!
বাবা দুঃখিত হলেন, জানিস এখন মনে পড়লে বড় কষ্ট হয়। আমার এক বন্ধুর এয়ারগান ছিল। ওরা শুধুমাত্র একবেলা খাওয়ার জন্য চল্লিশ-পঞ্চাশটা চড়ুই পাখি মারত!
বুক্কা শিউরে উঠলো, কী বিভৎস!
বাবা এক বুক কষ্ট নিয়ে বললেন, বুক্কা, জীবনে একবার আমি খুব বড় একটা অন্যায় করেছিলাম। বন্ধুর এয়ারগান দিয়ে একটা কাক মেরেছিলাম। ওই সময় কষ্ট লাগেনি। হতভম্ব হয়েছিলাম, যখন বন্ধুটি মৃত কাককে ফুটবলের মতো লাথি দিয়েছিল!
বুক্কা আর্তনাদ করে উঠলো, বাবা, তোমার পায়ে পড়ি আর বলো না।
বাবা কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, জানিস আমার না একটা রাখাল বন্ধুও ছিল। নামটা মনে নাই। ছোটবেলা থেকে আমি তো খুব বই পড়তাম। ক্লাসের বই না, আমাদের ভাষায় আউট বই। স্কুলের নাম করে বের হতাম, বাসা থেকে একটু দুরে ওই রাখালের গোয়ালঘর ছিল। আমার রাখাল বন্ধু আমাকে ভেতরে রেখে তালা বন্ধ করে গরু চরাতে বেরিয়ে যেত। আমি ধুমসে বই পড়তাম। কোন অনুবাদ, দস্যু বনহুর, দস্যু রাণী, ফাল্গুণি, নিহার রঞ্জন, যা পেতাম তাই।
বুক্কা চোখ বড় বড় করে বলল, তুমি স্কুল ফাঁকি দিতে, বাবা!
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, হুঁ। ওই আর কি, মানে সব সময় যেতাম না আর কি।
বাবা টিচাররা তোমায় কিছু বলত না?
বাবা উত্তর দিলেন না। স্কুল ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারটা বুক্কার সঙ্গে আলোচনা করতে ভাল লাগছিল না, কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, বুক্কা, তোরা তো আবার বিদেশী লেখা ছাড়া এখন আর পড়িস না। কীসব যেন হ্যারী পটার . . . ।
বুক্কা মন খারাপ করা গলায় বলল, দেশে আমাদের জন্য দেশে কেউ লেখে নাকি?
বাবা বললেন, দেশে তোদের জন্য লেখালেখি করেন না এমন না, অনেকেই আছেন. . .। ছোট বেলায় রাশিয়ান একটা গল্প পড়েছিলাম, জানিস। লেখকের নামটা মনে নাই।
বুক্কা বলল, কি ছিল গল্পটা?
বাবা বললেন, বলি শোন: 'কুয়োতলায় সব মায়েরা জড়ো হয়েছেন। মারা একসঙ্গে হলে যা হয় আর কি? রান্না-বান্না, শাড়ি-গহনা, এইসব নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। সবশেষে প্রসঙ্গ এলো কার সন্তান কতো প্রতিভাবান এই নিয়ে। দূরে সবার সন্তানরা খেলা করছিল।
এক মা তার এক সন্তানকে কাছে ডাকলেন। তার সন্তান চমৎকার ডিগবাজী খেল। সবাই মুগ্ধ। ওই সন্তানের মার মুখ ঝলমলে।
অন্য একজন মার সন্তান চমৎকার গান গাইল। কেউ বা কবিতা আবৃত্তি করল।
কেবল মাত্র একজন মা বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা বলল: কিগো তোমার ছেলেকে ডাকলে না। ওই মা চোখ নীচু করে বললেন, আমার খোকার যে কোন গুণ নাই, বলে ভারী বালতিটা উঠিয়ে তিনি গুটিগুটি পায়ে এগুতে লাগলেন। রোগা দুবলা কালো কালো মতো তার সন্তান কোত্থেকে জানি ঝড়ের গতিতে এলো, মার ভারী বালতিটা ছিনিয়ে নিল। সোজা বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগল।'
বাবার চোখে জল। কিন্তু বাবা বুক্কার কাছ থেকে লুকাবার কোন চেষ্টাই করলেন না।
বাবা সামলে নিয়ে বললেন, মজার আরেকটা খেলা ছিল- রস, কস, সিঙ্গা, বুলবুল, মালেক, মুসতাক। জানিস, ঘুড়ি উড়ানো খেলায় আমার সঙ্গে কেউ পারত না। সুতোয় এমন মাঞ্জা দিতাম. . . ।
বুক্কার বিস্ময়ের শেষ নেই, মাঞ্জা কি বাবা?
বাবার শিশুর উচ্ছ্বাস, সুতোয় কাঁচ ভাঙ্গার গুড়ো, হেনতেন মিশিয়ে একটা দ্রবণের মতো তৈরী করা হতো। বিশেষ পদ্ধতিতে সুতোয় মিশিয়ে নাটাইয়ের ওই সুতোয় মেশানো হতো। ব্যস, কেল্লা ফতে। অন্য ঘুড়ির সুতো লাগলেই, ঘ্যাচ ঘ্যাচ ঘ্যাচ। হা, হা, হা। কী মজা!
বুক্কা হ্যারী পটারের চশমার মতো চোখগুলো গোল করে অপার বিষ্ময়ে দেখছে বাবাকে। তাঁকে কী ছেলেমানুষই না দেখাচ্ছে! বাবা যেভাবে লাফাচ্ছেন, ছাদে না মাথা ঠুকে যায়! কী আশ্চর্য- বয়স্ক এই মানুষটার মধ্যে লুকিয়ে আছে কী ছোট্ট একটা শিশু!
বুক্কারা থাকে বিশতলা এপার্টমেন্টে। চারপাশে উঁচু উঁচু দালান। বুক্কার কোন খেলার মাঠ নাই। আকাশ নাই!"
*পুরনো লেখা। এখানে দিলাম এই কারণে...।
'বুক্কা এবং একচিলতে আকাশ' এই লেখাটা লিখেছিলাম তা বছর দশেক হবে। লিখেছিলাম কিশোর-ছোটদের জন্য। প্রকাশক সাহেব ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন এই ধরনের আলাদা আলাদা লেখা নিয়ে ৫টা বই বের করবেন। ৫টা বইয়ের একটা প্যাকেট। 'এক ব্যাগ কিশোর' এই টাইপের।
আমি সানন্দে লিখে দিলাম। কী এক লোভে আমার চোখ লোভে চুঁইয়ে পড়ছিল। অন্য কিছু না, শিশুদের জন্য কখনও লেখা হয়নি আমার। এই দেশে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার কাজটা খুব কম মানুষই করেছেন।
লেখাগুলো ছিল যতটুকু মনে পড়ে:
ভূত দিবস
মা হাতি
খুকি এবং দৈত্য
কিটি মাস্ট ডাই: ১
কিটি মাস্ট ডাই: ২
২ টা বইয়ের ইলাস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পর আর্টিস্ট ভদ্রলোক উধাও। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। প্রকাশক সাহেবের এক গোঁ, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে করাবেন না, ইনি নাকি আঁকাআঁকির ভুবনে 'পাকোয়াজ'। এবং প্রকাশক সাহেব ৫টার কমে বইও করবেন না, 'এক ব্যাগ কিশোর'না-করলে তাঁর নাকি পোষাবে না।
আমি বললাম, আমি আঁকার চেষ্টা করে দেখব।
তিনি মুখ লম্বা করে বললেন, আপনি কী আর্টিস্ট, আশ্চর্য! সোজা একটা লাইনও তো টানতে পারে না। আপনার আঁকা দেখলে যে কেউ বলবে এটা বাচ্চারাদের হাতের কাজ।
আমি বললাম, এক কাজ করলে কেমন হয় আর্টিস্টের নামের আগে খুদে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়, খুদে-আর্টিস্ট। দেখেন না, খুদে-গানরাজ?
প্রকাশক সাহেব মুখ আরও লম্বা করে ফেললেন। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। রসিকতাটা সম্ভবত তাঁর পছন্দ হয়নি।
পরে শুনলাম তিনি (আর্টিস্ট সাহেব) নেশা-টেশা করেন, আর্টিস্টরা নাকি এমনিই হন। যাই হোক, প্রকাশক সাহেবের ওই প্রজেক্ট আর আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি বুক্কার মত একজন, ধ্রুব'র বাসায় গেলাম। ধ্রুব'র বাবার আপ্রাণ চেষ্টা তার ছেলেকে মাটির কাছাকাছি রাখার। এই চেষ্টাটুকু দেখে আমার চোখ নতুন গজানো চকচকে পাতার মত চকচক করে। 'পশ ফ্ল্যাট' নামের ঝা-চকচকে সিমেন্টের বস্তীর মাঝেও খানিকটা অন্য রকম।
ধ্রুব নাকি দৌড়াতে পারে না, মাঠে দৌড়ালেও আড়ষ্ট হয়ে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গারাজে কাগজের বল বানিয়ে ফুটবলের নামে লাত্থালাত্থি করে। এই হচ্ছে বুক্কার শৈশব!
তার বাবাকে বলতে ভুলে গেছি, এরা থাকে দোতলায় না তিনতলায় মনে পড়ছে না, ওখানে যেতেও লিফট- তাহলে ধ্রুব কেমন করে শিখবে দুদ্দাড় করে সিড়ি ভাঙ্গার মজা?
এই ফ্ল্যাটটার যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বেশ অনেকখানি মাটি, সত্যি সত্যি মাটি (মাটি নিয়ে একটা লেখা ছিল...স্বপ্ন বিক্রি করব)। কেবল গাছ লাগাবার জন্যই না। বৃষ্টি আসলে বৃষ্টির পানিতে এই মাটি ভিজবে, নিশ্চিত সোঁদা গন্ধ বেরুবে। যে গন্ধে রোবটদের পাথুরে মুখ ক্রমশ মানবীয় হয়ে উঠে। কমনীয়, ঢলঢলে। একজন মানুষ, প্রকৃতির সন্তান মিলেমিশে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে- ইচ্ছা করলেই প্রকৃতির বাইরে যেতে পারে না। তখন প্রকৃতির সব কিছুর জন্য জন্ম নেয় প্রগাঢ় মায়া, ভালবাসায় ছাপাছাপি দু-চোখ। একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আধাআধি শিশু, পশু। বার করতে চায় না কেউ তবুও পশুটা বেরিয়ে পড়ে ফাঁকতালে!
কিন্তু তিল তিল করে গড়ে উঠা প্রকৃতির সন্তান তার ভেতরের পশুটার সঙ্গে মারামারিতে অনায়াসে জিতে যায়। প্রকৃতির, তার সন্তানের কাছে এরচেয়ে বড় আর চাওয়ার কিছু নাই।
আসলে বুক্কা এবং ধ্রুব'র একচিলতে আকাশে খুব একটা তফাৎ নাই- তফাৎ কেবল ওই মাটির অংশটুকুই!
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বেটারে, আহা, কী সব দিন ছিল।
বুক্কা বলল, বাবা, ছোটবেলায় তুমি কি কি করতে? খুব দুষ্ট ছিলে বুঝি?
বাবা লাজুক গলায় বললেন, হুঁ, একবার মৌমাছির চাকে ঢিল দিলাম। দিল কামড়। মুখ ফুলে ঢোল। বাবা ছাতা দিয়ে দিলেন এক বাড়ি। জীবনে সেই প্রথম বাবার হাতে মার খেলাম। কেন জানি বাবার মেজাজ সেদিন খুব খারাপ ছিল।
বুক্কা বলল, মৌমাছির চাক কি বাবা?
বাবা বললেন, এই যে মধু; অ, তুই চিনবি কি করে! তুই তো ব্রেডের সঙ্গে খাস জ্যাম-জেলী। ফুল থেকে মৌমাছি মধু নিয়ে তার বাসায় জমায়। আগুনের ধোঁয়া দিলে মৌমাছিরা বাসা ছেড়ে চলে যায়। তখন ওদের বাসা ভেঙ্গে মধু সংগ্রহ করা হয়।
বুক্কা অবাক হয়ে বলল, বাবা আগুনে মৌমাছিরা মারা যায় না?
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, তাতো মরবেই। তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌমাছি চাষ করলে অবশ্য মৌমাছিরা মরে না।
বুক্কা চোখ গোল গোল করে বলল, বাবা মৌমাছির বাসা কি রকম দেখতে, এ্যাকুরিয়ামের মতো?
বাবা হাসলেন, ধুর পাগল। দাড়া তোকে সিডি এনে দেব। খুঁজে দেখি পাই কিনা, কম্পিউটারে দেখতে পারবি।
বুক্কা ঠোঁট উল্টে বলল, সে তো আমিই পারি। জিসানের কাছে কত্তো সিডি।
বাবা অবাক হলেন, জিসান কে?
বুক্কা হড়বড় করে বলল, আমার বন্ধু। বাবা, তুমি ওকে চেন না, আশ্চর্য! ওর বাবা একজন মন্ত্রী!
বুক্কার বাবা গভীর শ্বাস ফেললেন, তোর বন্ধু-বান্ধব, সচিব-মন্ত্রীর ছেলে। অথচ আমার শৈশব-কৈশোরের বন্ধু ছিল কেউ ধোপার ছেলে, কেউ বা মুচির ছেলে।
বুক্কা আর্তনাদ করে উঠল, হোয়াট দ্য হেল য়্যু আ টকিং এবাউট . . .!
বাবা তীব্র গলায় বললেন, শাটআপ বুক্কা । এসব কি অভদ্র কথা!
বুক্কা মাথা নীচু করে বলল, সরি বাবা
বাবা বললেন, তো, যা বলছিলাম, আমার শৈশব-কৈশোর এদের কাছে ঋণী। আজ আমি যা কিছু, এর পেছনে এদের অনেক অবদান আছে। এটাই বাস্তব, আমি ওখান থেকেই উঠে এসেছি। আহা কী সব দিন! এদের সঙ্গে কতো ডাংগুলি খেলেছি।
বুক্কার বিস্মিত গলা, ডাংগুলি কি বাবা?
বাবা ঝলমলে মুখে বললেন, খুব মজার একটা খেলা। এক লাল হলে আস্ত একটা গুদাম কেনা যেত। এড়ি, দুড়ি, তেলকা, চুড়ি, চম্পা, ডেগ, সুতেগ . . . এভাবে গুণে গুণে এক লাল হত। মুচির ছেলে গাদুরার কাছে আমি নিয়মিত হারতাম। সে গুদাম-টুদাম, নদী সব কিনে ফেলত। আমি ফতুর হয়ে যেতাম। পরে অসংখ্য কিল নিতে হতো।’
কিল কি বাবা?
বাবা হাসলেন, ইসরে বেটা বলিস না, পিঠে দুমদুম করে মার!
বুক্কা এবার সত্যি সত্যি আগ্রহী হলো, বাবা এই খেলার কি সিডি পাওয়া যাবে?
বাবা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, মনে হয় না। আজকাল তোরা কী সব খেলা খেলিস- ব্যাকগ্যামন, পেসেন্স, গল্ফ, বিলিয়ার্ড, তাও কম্পিউটারে!
বুক্কা বলল, আর কি খেলা ছিল তোমাদের সময়, বাবা?
বাবা বললেন, কতো ধরনের খেলা- দাড়িয়াবান্ধা, এক্কা-দোক্কা। গুলতি দিয়ে একবার বিরাট একটা পাখি মেরেছিলাম।
বুক্কা থেমে থেমে বলল, কী নিষ্ঠুর ছিলে তুমি, বাবা!
বাবা দুঃখিত হলেন, জানিস এখন মনে পড়লে বড় কষ্ট হয়। আমার এক বন্ধুর এয়ারগান ছিল। ওরা শুধুমাত্র একবেলা খাওয়ার জন্য চল্লিশ-পঞ্চাশটা চড়ুই পাখি মারত!
বুক্কা শিউরে উঠলো, কী বিভৎস!
বাবা এক বুক কষ্ট নিয়ে বললেন, বুক্কা, জীবনে একবার আমি খুব বড় একটা অন্যায় করেছিলাম। বন্ধুর এয়ারগান দিয়ে একটা কাক মেরেছিলাম। ওই সময় কষ্ট লাগেনি। হতভম্ব হয়েছিলাম, যখন বন্ধুটি মৃত কাককে ফুটবলের মতো লাথি দিয়েছিল!
বুক্কা আর্তনাদ করে উঠলো, বাবা, তোমার পায়ে পড়ি আর বলো না।
বাবা কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, জানিস আমার না একটা রাখাল বন্ধুও ছিল। নামটা মনে নাই। ছোটবেলা থেকে আমি তো খুব বই পড়তাম। ক্লাসের বই না, আমাদের ভাষায় আউট বই। স্কুলের নাম করে বের হতাম, বাসা থেকে একটু দুরে ওই রাখালের গোয়ালঘর ছিল। আমার রাখাল বন্ধু আমাকে ভেতরে রেখে তালা বন্ধ করে গরু চরাতে বেরিয়ে যেত। আমি ধুমসে বই পড়তাম। কোন অনুবাদ, দস্যু বনহুর, দস্যু রাণী, ফাল্গুণি, নিহার রঞ্জন, যা পেতাম তাই।
বুক্কা চোখ বড় বড় করে বলল, তুমি স্কুল ফাঁকি দিতে, বাবা!
বাবা বিব্রত গলায় বললেন, হুঁ। ওই আর কি, মানে সব সময় যেতাম না আর কি।
বাবা টিচাররা তোমায় কিছু বলত না?
বাবা উত্তর দিলেন না। স্কুল ফাঁকি দেয়ার ব্যাপারটা বুক্কার সঙ্গে আলোচনা করতে ভাল লাগছিল না, কথা ঘুরাবার জন্য বললেন, বুক্কা, তোরা তো আবার বিদেশী লেখা ছাড়া এখন আর পড়িস না। কীসব যেন হ্যারী পটার . . . ।
বুক্কা মন খারাপ করা গলায় বলল, দেশে আমাদের জন্য দেশে কেউ লেখে নাকি?
বাবা বললেন, দেশে তোদের জন্য লেখালেখি করেন না এমন না, অনেকেই আছেন. . .। ছোট বেলায় রাশিয়ান একটা গল্প পড়েছিলাম, জানিস। লেখকের নামটা মনে নাই।
বুক্কা বলল, কি ছিল গল্পটা?
বাবা বললেন, বলি শোন: 'কুয়োতলায় সব মায়েরা জড়ো হয়েছেন। মারা একসঙ্গে হলে যা হয় আর কি? রান্না-বান্না, শাড়ি-গহনা, এইসব নিয়ে তুমুল আলোচনা হচ্ছে। সবশেষে প্রসঙ্গ এলো কার সন্তান কতো প্রতিভাবান এই নিয়ে। দূরে সবার সন্তানরা খেলা করছিল।
এক মা তার এক সন্তানকে কাছে ডাকলেন। তার সন্তান চমৎকার ডিগবাজী খেল। সবাই মুগ্ধ। ওই সন্তানের মার মুখ ঝলমলে।
অন্য একজন মার সন্তান চমৎকার গান গাইল। কেউ বা কবিতা আবৃত্তি করল।
কেবল মাত্র একজন মা বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যরা বলল: কিগো তোমার ছেলেকে ডাকলে না। ওই মা চোখ নীচু করে বললেন, আমার খোকার যে কোন গুণ নাই, বলে ভারী বালতিটা উঠিয়ে তিনি গুটিগুটি পায়ে এগুতে লাগলেন। রোগা দুবলা কালো কালো মতো তার সন্তান কোত্থেকে জানি ঝড়ের গতিতে এলো, মার ভারী বালতিটা ছিনিয়ে নিল। সোজা বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগল।'
বাবার চোখে জল। কিন্তু বাবা বুক্কার কাছ থেকে লুকাবার কোন চেষ্টাই করলেন না।
বাবা সামলে নিয়ে বললেন, মজার আরেকটা খেলা ছিল- রস, কস, সিঙ্গা, বুলবুল, মালেক, মুসতাক। জানিস, ঘুড়ি উড়ানো খেলায় আমার সঙ্গে কেউ পারত না। সুতোয় এমন মাঞ্জা দিতাম. . . ।
বুক্কার বিস্ময়ের শেষ নেই, মাঞ্জা কি বাবা?
বাবার শিশুর উচ্ছ্বাস, সুতোয় কাঁচ ভাঙ্গার গুড়ো, হেনতেন মিশিয়ে একটা দ্রবণের মতো তৈরী করা হতো। বিশেষ পদ্ধতিতে সুতোয় মিশিয়ে নাটাইয়ের ওই সুতোয় মেশানো হতো। ব্যস, কেল্লা ফতে। অন্য ঘুড়ির সুতো লাগলেই, ঘ্যাচ ঘ্যাচ ঘ্যাচ। হা, হা, হা। কী মজা!
বুক্কা হ্যারী পটারের চশমার মতো চোখগুলো গোল করে অপার বিষ্ময়ে দেখছে বাবাকে। তাঁকে কী ছেলেমানুষই না দেখাচ্ছে! বাবা যেভাবে লাফাচ্ছেন, ছাদে না মাথা ঠুকে যায়! কী আশ্চর্য- বয়স্ক এই মানুষটার মধ্যে লুকিয়ে আছে কী ছোট্ট একটা শিশু!
বুক্কারা থাকে বিশতলা এপার্টমেন্টে। চারপাশে উঁচু উঁচু দালান। বুক্কার কোন খেলার মাঠ নাই। আকাশ নাই!"
*পুরনো লেখা। এখানে দিলাম এই কারণে...।
'বুক্কা এবং একচিলতে আকাশ' এই লেখাটা লিখেছিলাম তা বছর দশেক হবে। লিখেছিলাম কিশোর-ছোটদের জন্য। প্রকাশক সাহেব ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন এই ধরনের আলাদা আলাদা লেখা নিয়ে ৫টা বই বের করবেন। ৫টা বইয়ের একটা প্যাকেট। 'এক ব্যাগ কিশোর' এই টাইপের।
আমি সানন্দে লিখে দিলাম। কী এক লোভে আমার চোখ লোভে চুঁইয়ে পড়ছিল। অন্য কিছু না, শিশুদের জন্য কখনও লেখা হয়নি আমার। এই দেশে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখার কাজটা খুব কম মানুষই করেছেন।
লেখাগুলো ছিল যতটুকু মনে পড়ে:
ভূত দিবস
মা হাতি
খুকি এবং দৈত্য
কিটি মাস্ট ডাই: ১
কিটি মাস্ট ডাই: ২
২ টা বইয়ের ইলাস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পর আর্টিস্ট ভদ্রলোক উধাও। খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ। প্রকাশক সাহেবের এক গোঁ, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে করাবেন না, ইনি নাকি আঁকাআঁকির ভুবনে 'পাকোয়াজ'। এবং প্রকাশক সাহেব ৫টার কমে বইও করবেন না, 'এক ব্যাগ কিশোর'না-করলে তাঁর নাকি পোষাবে না।
আমি বললাম, আমি আঁকার চেষ্টা করে দেখব।
তিনি মুখ লম্বা করে বললেন, আপনি কী আর্টিস্ট, আশ্চর্য! সোজা একটা লাইনও তো টানতে পারে না। আপনার আঁকা দেখলে যে কেউ বলবে এটা বাচ্চারাদের হাতের কাজ।
আমি বললাম, এক কাজ করলে কেমন হয় আর্টিস্টের নামের আগে খুদে লাগিয়ে দিলে কেমন হয়, খুদে-আর্টিস্ট। দেখেন না, খুদে-গানরাজ?
প্রকাশক সাহেব মুখ আরও লম্বা করে ফেললেন। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। রসিকতাটা সম্ভবত তাঁর পছন্দ হয়নি।
পরে শুনলাম তিনি (আর্টিস্ট সাহেব) নেশা-টেশা করেন, আর্টিস্টরা নাকি এমনিই হন। যাই হোক, প্রকাশক সাহেবের ওই প্রজেক্ট আর আলোর মুখ দেখেনি।
সম্প্রতি বুক্কার মত একজন, ধ্রুব'র বাসায় গেলাম। ধ্রুব'র বাবার আপ্রাণ চেষ্টা তার ছেলেকে মাটির কাছাকাছি রাখার। এই চেষ্টাটুকু দেখে আমার চোখ নতুন গজানো চকচকে পাতার মত চকচক করে। 'পশ ফ্ল্যাট' নামের ঝা-চকচকে সিমেন্টের বস্তীর মাঝেও খানিকটা অন্য রকম।
ধ্রুব নাকি দৌড়াতে পারে না, মাঠে দৌড়ালেও আড়ষ্ট হয়ে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের গারাজে কাগজের বল বানিয়ে ফুটবলের নামে লাত্থালাত্থি করে। এই হচ্ছে বুক্কার শৈশব!
তার বাবাকে বলতে ভুলে গেছি, এরা থাকে দোতলায় না তিনতলায় মনে পড়ছে না, ওখানে যেতেও লিফট- তাহলে ধ্রুব কেমন করে শিখবে দুদ্দাড় করে সিড়ি ভাঙ্গার মজা?
এই ফ্ল্যাটটার যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বেশ অনেকখানি মাটি, সত্যি সত্যি মাটি (মাটি নিয়ে একটা লেখা ছিল...স্বপ্ন বিক্রি করব)। কেবল গাছ লাগাবার জন্যই না। বৃষ্টি আসলে বৃষ্টির পানিতে এই মাটি ভিজবে, নিশ্চিত সোঁদা গন্ধ বেরুবে। যে গন্ধে রোবটদের পাথুরে মুখ ক্রমশ মানবীয় হয়ে উঠে। কমনীয়, ঢলঢলে। একজন মানুষ, প্রকৃতির সন্তান মিলেমিশে থাকে প্রকৃতির সঙ্গে- ইচ্ছা করলেই প্রকৃতির বাইরে যেতে পারে না। তখন প্রকৃতির সব কিছুর জন্য জন্ম নেয় প্রগাঢ় মায়া, ভালবাসায় ছাপাছাপি দু-চোখ। একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আধাআধি শিশু, পশু। বার করতে চায় না কেউ তবুও পশুটা বেরিয়ে পড়ে ফাঁকতালে!
কিন্তু তিল তিল করে গড়ে উঠা প্রকৃতির সন্তান তার ভেতরের পশুটার সঙ্গে মারামারিতে অনায়াসে জিতে যায়। প্রকৃতির, তার সন্তানের কাছে এরচেয়ে বড় আর চাওয়ার কিছু নাই।
আসলে বুক্কা এবং ধ্রুব'র একচিলতে আকাশে খুব একটা তফাৎ নাই- তফাৎ কেবল ওই মাটির অংশটুকুই!
Tuesday, April 14, 2009
টাকা, তোমার আবার জাত কিহে!
এই ছবি এবং ছবির ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপি দেখি সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে! ঝড়ের গতিটা সম্ভবত এই কারণেও প্রবল, শাহআলম সাহেব ঠিক আওয়ামী ঘরানার না বলে।আমি খুব একটা অবাক হইনি! আসলে অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়ে গেছে এখন। কাল যদি শুনি, বিগত ২ বছর সেনাপ্রধান দেশে ছিলেন না, এতেও আমি অবাক হব না।
নিজের জাগতিক ছোট-ছোট বেদনার সঙ্গে যোগ হয় দেশের বড় বড় অসঙ্গতি, সব মিলিয়ে পাগল পাগল লাগে নিজেকে। কেবল মনে হয় ইচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত। সুইচ টিপলাম, আহ, আরামের ঘুম।
কালে কালে অবাক হই না আর!
সাম্প্রতিক ঘটনা, আমার এই দু:সময়ে যেখানে ১০০ পয়সায় ১ টাকা হয়, কাছের মানুষদের হাত ধরে কাতর হয়ে যখন বলি, আমাকে একটা চাকরি-বাকরি যোগাড় করে দেন তখন মানুষগুলো হা হা করে হাসেন। একজন তো বললেন, 'এইটা নিয়া একটা লেখা দেন'।
সেখানে দূরের একজন মোটা অংকের চেক ধরিয়ে ম্রিয়মান হয়ে, বিমর্ষমুখে যখন বললেন, এই সামান্য টাকা...আমার ক্ষমতায় কুলালে।
আমার উচিৎ ছিল, মানুষটার কাছে এমন একটা কিছু ভঙ্গি করা যাতে তিনি অন্তত আমাকে অকৃতজ্ঞ না ভাবেন। কিন্তু ওই যে বললাম, অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই নষ্ট হয়ে গেছে, পুরোপুরি!
মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে এসেছি। আমি ৫০০ টাকার বাজীতে হেরে গিয়েছিলাম। ৫০০ (ভাগ্যিস বেশি ধরিনি। নিয়মানুযায়ী দু-পক্ষকেই টাকাটা নগদ তৃতীয় পক্ষের কাছে জমা রাখতে হয়েছিল। খোদা মেহেরবান, এরচে বেশী টাকা তখন আমার কাছে ছিল না) টাকা হেরে যাওয়ার প্রসঙ্গটা বলি, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই আমি আমার এক সুহৃদের সঙ্গে বাজী ধরেছিলাম, জয়নাল হাজারীরা আর পুনর্বাসিত হবে না। আমার ট্রাম-কার্ড ছিল (এটা আবার বহুল বিতর্কিত শব্দ, জলিল সাহেব এটার পেটেন্ট নিয়ে রেখেছেন কিনা কে জানে?) বিগত ২ বছরে আমরা সবাই কিছু না কিছু শিখেছি। দিনশেষে দেখা গেল, আমরা কিছুই শিখিনি। কেউ কেউ আসলে কখনও শেখে না, মৃত্যুর আগপর্যন্ত। পুনর্মূষিকোভব। দেশের কী হল, যা হওয়ার তাই হল, আমি গরীব বেচারার ৫০০ টাকা জলে গেল।
ফুটবলার, হালের ফুটবলের হালধারী সালাউদ্দিন সাহেব আবার এককাঠি সরেস। তিনি বলেছেন, 'আমি আবার নিয়ম খু্ব মানি।...বসুন্ধরার কাছ থেকে টাকা নেয়ায় আমি বিব্রত না। এমন প্রশ্ন উঠেছে বলে দু:খিত'।
বেশ-বেশ। ইনার সাফ কথা, টাকার গায়ে কারও নাম লেখা থাকে না, কেবল লেখা থাকে বাংলাদেশ গভর্নরের নাম।
গুণদাদার কবিতা থেকে ধার করে বলতে হয়:
"'টাকা হ'লে বাঘের চোখও মেলে'
এই কথাটার যথার্থতা প্রমাণ করতে হ'লে
যেতে হবে সুদূর সুন্দরবনে। নব্য ধনিক
পুঁজিপতি ভাবেন মনে মনে, যাই দেখি গে
ওখানে তো অনায়াসেই বাঘের দেখা মেলে।"
(শান্তির ডিক্রি, নির্মলেন্দু গুন)
এই কথাটার যথার্থতা প্রমাণ করতে হ'লে
যেতে হবে সুদূর সুন্দরবনে। নব্য ধনিক
পুঁজিপতি ভাবেন মনে মনে, যাই দেখি গে
ওখানে তো অনায়াসেই বাঘের দেখা মেলে।"
(শান্তির ডিক্রি, নির্মলেন্দু গুন)
শুনেছিলাম টাকা দেখলে নাকি কাঠের পুতুলও হাঁ করে। আসলেই তো, টাকার চেয়ে জোর আর কিছুতে নাই- টাকা থাকলে একজন মানুষকে কোন রশারশিই আটকে রাখতে পারে না।
শাহআলম সাহেবের সুযোগ্য পুত্রধন 'সানবীর' কোন এক ককটেল পার্টিতে রসিয়ে রসিয়ে-তারিয়ে তারিয়ে বলবেন, জানিস, বান...কে মেরে যে গন্ডগোলটা হল না। শ্লা, ড্যাডের ২০০ খরচ হল। কাট মাই শিট!
২০০ মানে ২০০ কোটি।
ছবিসূত্র: প্রথম আলো।
Monday, April 13, 2009
'খোদেজা'র কঠিন সমালোচনা এবং আমার স্বল্প উত্তর
ওই সাইটে রাসেল পারভেজ হামেশাই 'ডেঞ্জার জোনে' থাকেন। কখন তার সমস্ত লেখালেখিসহ গোটা ব্লগ উধাও হয়ে যায় এই ভাবনায় সমালোচনাটার অংশবিশেষ এখানে দিয়ে দিলাম।
গোটা ব্লগ উধাও করে দেয়া- ওখানে নাকি এটার চল আছে! যে-দেশের যে চল! এইজন্য ব্লগারদের মিটিং-মিছিল পর্যন্ত করতে হয়! এই ভাবনাটা আমার কাছে কেবল অমানবিকই মনে হয় না, অসুস্থ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমার কাছে আমার লেখা সন্তানসম। আমার সন্তানকে আমি স্পর্শ করতে পারব না এমন কোন আইনকে আমি মানি না, স্বীকার করি না।)
রাসেল পারভেজ তাঁর সমালোচনায় লিখেছেন:
আমরা সাহিত্যের অপমৃত্যু দেখি এ রকম আত্মঘাতি প্রবনতায়। খোদেজা উপন্যাসটির পেছনের পাতায় খোদেজা উপন্যাসের যেই কাঠামোর তথ্য বিদ্যমান ভেতরে প্রবেশ করে সেই কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় না। লেখকের অসাবধানতা কিংবা অযোগ্যতা কিংবা প্রকাশকের কূণ্ঠা কোনটাকে দায়ী করবো ভেবে পাই না আমি।
সামান্য কথায় ঘটনাটা বলতে গেলে লেখকের সবিনয় নিবেদন থেকে তুলে দিতে হয় এ উপন্যাস লেখার পশ্চাত কথনটুকু। খোদেজা নামের এক শিশু ধর্ষিত হয় বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে, তার প্রতি এই নির্মমতার কোনো দ্বিতীয় উদাহরন নেই। সম্প্রতি মগবাজারে ২জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ধর্ষন করবার পরে হত্যা করা হয়েছে তবে তাদের ধর্ষণ এতটা নির্বিকার নির্মম ধর্ষণ না। তাকে হত্যা করে ঘাতকেরা তার জানাজায় অংশ নেয়। এই মর্মবেদনা লিখে রাখবার কারণেই এই উপন্যাস লিখবার তাড়না তৈরি হয় লেখকের ভেতরে।
উপন্যাসটি একটা পরিনতিতে পৌছালেও আমার কাছে অসম্পূর্ণ এবং ফাঁকিবাজির কাজ মনে হয়। প্রথমত উপন্যাসে ঢুকতে না পারার অক্ষমতা। মূলত এমন সব চরিত্র নিয়ে নাড়াচাড়া হচ্ছে এখানে যাদের সাথে খোদেজার সংশ্লিষ্ঠতা সামান্য, এবং এই চরিত্রগুলো কখনই খোদেজার সাথে সম্পর্কিত হয় না কিংবা তাদের সাথে সংযুক্ত হতে পারে না উপন্যাসের ব্যপ্তিতে।
মূলত গত বছর অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, প্রতিটা ঘটনাই কোনো না কোনো ভাবে অমানবিক, লেখক এই ঘটনাগুলোকে পূঁজি করে একতা মায়াময় আবহ তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন, তবে যেহেতু ঘটনাগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন তাই জুড়ে দেওয়ার নিপূন সূচীশৈলীর অভাবটা প্রকট।
(আমার বক্তব্য, ফিকশনের জন্ম রিপোটিং-এর গর্ভে। একটু অন্য রকম বললে, পৃথিবীর সব কলাই প্রকৃতির নকল। একেকজন একেক রকম নকলবাজি করে এই যা! চোখে দেখা, পড়ে শোনা ঘটনা নিয়ে লিখতে বাধা কী!)
উপন্যাসের মূল ঘটনা ৩টি। বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রুদের জন্য অমানবিক একটা অলিখিত নিয়ম আছে, গর্ভবতী হলেই তাদের বরখাস্ত করা হবে, এই নিয়ে তারা একটা মামলা করেছিলেন, সেটায় রায় হয়েছে, সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া এবং এর অমানবিকতা একটা প্রসঙ্গ, দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হচ্ছে শিশু মাদকাসক্তি এবং মূলত যা এই উপন্যাস লিখবার তাড়না সেই খোদেজা উপাখ্যান।
লেখক নিজে তাদের সাথে কোনো সংযুক্ততা বোধ করেন না। তারা নেহায়েত খবরের কাগজের করুণ রিপোর্ট হয়ে থাকে, রক্তমাংসের শরীর নিয়ে সামনে উপস্থিত হতে পারে না। মূলত তারা নিজের চরিত্রের কয়েকটা আঁচর হিসেবে থেকে যায়। কয়েকটা রেখা দিয়ে একটা মানুষের মুখ চিহ্নিত করা যায়, তবে সে মুখে আদল আর অনুভূতি ফোটাতে অনেক রঙ খরচ করতে হয়। এখানে লেখক শুধুমাত্র কয়েকটা আঁচর দিয়ে নিজের দায়িত্ব সমাপ্ত করেছেন।
কেনো এমনটা হলো এটা লেখক ছাড়া অন্য কেউ বলতে পারবে না।
(আমার উত্তর: এই বিষয়ে অনেক কথা বলার ছিল। আমি ওই পথ ধরে হাঁটলাম না। কেবল পোস্টের সঙ্গে এই স্কেচটা দিলাম। এই স্কেচটা আমি দাঁড় করেছি কেবল ৩টা রেখা দিয়ে। এখানে একটা ফিগার দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এটা বলার আবশ্যকতা দেখি না: এটা একজন মার স্কেচ। মা-টার গর্ভ হয়েছে। তাঁর সন্তান ছেলে না মেয়ে এইসব নিয়ে বলারও আগ্রহ নাই! আমি পাঠককে অসম্ভব বুদ্ধিমান মনে করি- চলমান একেকটা ক্ষুরধার ব্রেন। সবই বলে দিলে পাঠককে নিবোর্ধ ভাবা হয়। পাঠককে এমনটার ভাবার সাহস আমার নাই।)
লেখার আরও একটা সীমাবদ্ধতা হলো লেখকের উপস্থিতি এবং ভাববিনিময়। এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই যে লেখক নিজে চরিত্র হয়ে তার লেখায় উপস্থিত থাকতে পারবে না, তবে এখানে লেখক প্রথম পুরুষে বর্ণনার ভার নেওয়া কোনো চরিত্র নয়।
ব্যক্তিগত পরিচয় এবং অনেক দিন ধরে তার লেখা পড়বার সুবাদে জানি এখানের অনেকগুলো লেখা এবং মন্তব্য সামহোয়্যারের অতীতের পাতা থেকে তুলে নেওয়া। হয়তো সাময়িক ভাবশূন্যতা কিংবা কিছু একটা দিয়ে পৃষ্টা ভরাতে হবে এমন কোনো ভাবনা থেকেই অসম্পাদিত অবস্থায় সেটা সরাসরি খোদেজা উপন্যাসের অংশভুক্ত হয়েছে।
(ভাল! যে দু-চারজন পাঠক বইটা পড়বেন তাঁদের ওয়েবে আমার সঙ্গে পরিচয় নাই এটা ভেবে খানিকটা আরামের শ্বাস ফেলি।)
চরিত্র বিশ্লেষনঃ নাগরিক চরিত্র নিশি, যে একজন এয়ারহোস্টেস এবং গর্ভবতী তার সাথে লেখকের পরিচয় হয় কোনো এক ব্লগ সাইটে। নিশি এখানে পাঠক, তার নিজের প্রবল আকাঙ্খা সে এই সন্তানের জননী হবে।
তার স্বামী জাবীর মূলত স্বপ্নভুক মানুষ, পরিবারবিচ্ছিন্ন এবং যথাযোগ্য রকমের ভাববিলাসী, পলায়নপ্রবন চরিত্র, তার কোনো আগ্রহ নেই এই সন্তান গ্রহনের। তার নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার গল্প এখানে জড়িত।
(ওয়েবের লেখালেখির অংশবিশেষ বইয়ে দেয়া যাবে না এমন তো কোন কথা নাই। কেন, এ গ্রহের কোথাও বসে কোন চরিত্র, যে ওয়েবে তার কোন পছন্দের লেখকের লেখা পড়ছে? এমনটা কী হতে পারে না!)
সোহাগ, নিশি জাবীরের পরিবারের শ্রম সহায়ক শিশু, সে খোদেজার ভাই।
এইটুকু স্মৃতিময় যোগাযোগ ছাড়া আর কোথাও উপন্যাসে এই ৩ জনের সাথে খোদেজা কিংবা লেখকের যোগাযোগ নেই।
(ওই ৩ রেখার স্কেচটার কথাই আবার বলব।)
খোদেজা এবং তার বাবা, উপন্যাসের মূল চরিত্র না হয়েও পুলিশ অফিসার জুনাব আলী এবং ওবায়েদ যারা ঘটনার সমাপ্তি ঘটান মেলোড্রামাটিক উপায়ে, তারাই মূলত সবচেয়ে বেশী লেখকের অনুকম্পা পেয়েছেন।
(ওবায়েদ সাহেব, হুঁ। আসলে এটা চরিত্র না, একটা স্বপ্নের নাম।)
নিশি চরিত্রটির নিজস্ব দ্বিধা এবং যাতনা , জাবীরের পলায়নপ্রবনতা, সোহাগের ছিটকে পড়া এবং সাময়িক উদ্ধার অমীমাংসিত, খোদেজাও তেমনভাবে প্রাণ পায় না, যতটা ওবায়েদের প্রতিক্রিয়ায় পায়। এবং ওবায়েদ স্বর্গচ্যুত এক দেবতার মতো হঠাত এসে উদয় হয় খোদেজার গ্রামে, এক দিনে সে সামাজিক দায়বদ্ধতা চুকিয়ে বিদায় নেয়।
এই চরিত্র লেখকের ন্যায় দেওয়ার প্রবল আন্তরিকতায় সৃষ্ট। লেখকের এই প্রাণপন প্রচেষ্টার কারণে শেষ পর্যন্ত এই ওবায়েদের উপরেই একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্মায়। তবে পাঠক ভীষণভাবে প্রতারিত হয়। অন্তত লেখক শিশু নির্যাতন এবং এই অমানবিকতার প্রতি যে সীমাহীন ঘৃণা নির্মাণের একটা পটভূমি পেয়েছিলেন, এই নির্যাতিতকে ন্যায় দিতে গিয়ে তিনি এই সুযোগটা হেলাফেলায় নষ্ট করলেন, এবং সম্ভবত তার নিজস্ব কষ্টবোধ লাঘব হলেও সামাজিক সচেতনতা এবং প্রতিবাদী মনন তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে গেলো।
উপন্যাসটির পরিশিষ্টে এই দায়মোচনের চেষ্টা ছিলো লেখকের তবে আমার মনে হয় লেখকের নির্মোহ অমানবিক রুঢ়তা থাকলে এটা চমৎকার একটা উপন্যাস হতে পারতো। মানবিকতার চিত্রায়ন যেভাবে এসেছিলো তাতে এটার গন্তব্য ছিলো অনেক দূর, তবে এই যাত্রা কেনো ব্যর্থ হলো, কেনো চমৎকার একটা হতে পারতো উপন্যাসের অপমৃত্যু ঘটলো, এটার উত্তর কার কাছে?
(আমার উত্তর নাই। এই ছড়িটা পাঠকের হাতে)। পাঠক দুয়েক ঘা মারলে সহ্য করা ব্যতীত উপায় কী!)
আমাদের ফর্মা ধরে উপন্যাস লিখবার প্রকাশকীয় চাপ কিংবা আমাদের লেখকের অতিরিক্ত করূণা এবং ন্যয় প্রত্যাশী মনন, কিংবা লেখার সাবলীলতা স্বত্ত্বেও যদি বলি লেখকের নিজস্ব ব্যর্থতা। লেখক নিজেও অলিখিত চাপে ভুগছেন তবে?
(এখানে আমি নিরুত্তর। এও সত্য বটে, অখ্যাত লেখকের কাছে প্রকাশক হচ্ছেন দ্বিতীয় ঈশ্বর!)
...............
পরিশেষে অন্য প্রসঙ্গ,
পৃথিবীর সেরা শেফ অসম্ভব যত্ন নিয়ে রান্না করলেন। সমালোচক খেয়ে, তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, লবন আরেকটু বেশি হলেই সর্বনাশ হয়ে যেত আর কী!
হা হা হা।
খোদেজা: ৩
Saturday, April 11, 2009
জয়তু ডিজিটাল !
ডিজিটাল, এর মানেটা কী? বুঝে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। নেটে সার্চ দিয়েও কাজের কাজ হল না!ডিজিটাল এর সঙ্গে সম্ভবত কিছু একটা যোগ থাকতে হবে। চোখ, মেইল ইত্যাদি ইত্যাদি...।
অ আচ্ছা, ডিজিটাল চোখ? ধরা যাক, আমরা যে অহরহ ব্যবহার করি কথাটা, আমি নিজের চোখে ঘটনাটা দেখেছি। (অন্যের চোখে দেখার নিয়ম নাই!)
চোখ তো দুইটা। আমরা কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করি না, কোন চোখে দিয়ে দেখেছেন? ডান, না বাম?
আহা, আগে শুনুনই না কেন বলছি এমনটা। যদি এমনটা হয় দুই চোখের একটা চোখ ডিজিটাল? তখন এই প্রশ্ন করাটা কী অবান্তর যে মনুষ্য-চোখ দিয়ে দেখেছেন, নাকি ডিজিটাল-চোখ দিয়ে?

এই ডিজিটাল-চোখা শিশুটির মত কী এমনটা হতে পারে না, তার এক চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে, অন্য চোখ শুকনো খটখট? কে মাথার দিব্যি দিয়েছে বাপু, এমনটা হতে পারবে না?
অথবা এমন হতে পারে কী? ডিজিটাল দরোজা [১]? নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেলিভারি না দিলে ওয়াশ-রুমের ডিজিটাল দরোজা খুলবে না; মাথা কুটে মরলেও!
বা এমনও কী হতে পারে না, ডিজিটাল মমতা? মা পড়ে থাকেন গ্রামে, সুযোগ্য পুত্রধন থাকেন শহরে ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটে। বছরে একবার 'মা দিবসে' এই পুত্রধন মাকে ডিজিটাল মমতা জানাবেন। কেমন করে? আহা, কেন, ডিজিটাল পত্রাঘাতের মাধ্যমে। ই-মেইল করে।
গ্রামে মা মেইল পাবেন কেমন করে? আরে, এত যন্ত্রণার কী উত্তর হয়! এটাই তো ডিজিটাল। গ্রামে গ্রামে নেটে নেটে গিট্টু লেগে যাবে। মন্ত্রী মহোদয়গণ সেই গিট্টু খুলবেন, কম্পিউটার সম্বন্ধে অগাধ জ্ঞান নিয়ে (মন্ত্রীদের জ্ঞান আবার ব্যাপক। সাইফুর রহমান তো বলেই বসেছিলেন, 'এই দেশ হইতে বিল গেটস কম্পিউটার বিকরি করিয়া কোটি কোটি টাকা নিয়া যাইতাছে...')।
আহারে, আমার টাকা থাকলে বেচারা গেটসকে বসুন্ধরা সিটিতে একটা শো-রুম খুলে দিতাম। গেটসের জন্য কম্পিউটার বিক্রি করা সহজতর হত।
তো, মন্ত্রী বাহাদুররা নিজেদের কম্পিউটারকে একুরিয়াম বানিয়ে মাছ চাষ করবেন। প্রসব হবে ডিজিটাল মাছ! সেই মাছ কপকপ করে খাবে ডিজিটাল মানুষ...।
জয় ডিজিটাল, জয়তু ডিজিটাল!
সহায়ক লিংক: পাই থেরাপী: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_12.html
*স্কেচস্বত্ব: সংরক্ষিত
**শিশিরের কার্টুনের অসম্ভব ভক্ত আমি। অনেক আগের পত্রিকায় তার কার্টুনটা লেখাটার জন্য দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু নিউজ-পেপারটা ছিঁড়ে অবস্থা গুরুতর বিধায় দেয়া গেল না।
নিরুপায় আমি ভাবলাম, নিজেই পেন্সিল দিয়ে ঘসাঘসি করে একটা কিছু দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। আফসোস, শিশিরের কার্টুনের ছাপ এড়ানো গেল না।
একটি ভাল ভুল- একটি খারাপ ভুল!
৭ই মে। বরাবর যা হয়, এবারও তাই হল! যথারীতি এবারও ৭ই মে। অন্যান্য দিনের মত করে সব কাজ সারছি, তারে-নারে ভাব। সকাল গড়িয়ে দুপুর। হোম মিনিস্ট্রি থেকে হোম মিনিস্টারের ফোন। ইস্তারি(!) সাহেবার ফোন। ফোনে উত্তাপ স্পষ্ট টের পাচ্ছি।
ইস্তারি(!) সাহেবা: আজ তারিখটা কত?
আমি অবাক: কেন, বাসায় কি তারিখের যন্ত্র, আ মীন, কেলেন্ডার-ফেলেন্ডার কিছু নাই!
ইস্তারি সাহেবা (হিম গলায়): থাকুক, তুমিই বল না, শুনি একটু?
আমি (গলায় আলগা কাঠিন্য এনে): এটা রসিকতা করার সময় না। কাজের সময়।
ইস্তারি সাহেবা: আমার সঙ্গে চালবাজী করবা না, তুমি কলম চালানো ছাড়া যে অন্য কোন কাজ পার না সে আমি বিলক্ষণ জানি। আমি তোমার ছাতাফাতা আবর্জনা লেখার পাঠক না। তোমার কলমবাজী ওদের জন্য তুলে রাখো। এ্যাহ, ভারী একজন কলমবাজ হয়েছেন তিনি, এক পাতা লেখতে ১০টা বানান ভুল!
আমি (চিঁ চিঁ করে): বিষয় কি, তারিখের সঙ্গে লেখালেখির সম্পর্ক কী! আজ ৭ই মে, তো?
ইস্তারি সাহেবা: তো! লজ্জা করে না তো বলতে, চশমখোর কোথাকার। বুড়া কুইচ্চা মাছ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে এখন আর ভাল্লাগছে না।
আমি (হড়বড় করে): শোনে শোনো, ফোন...।
ফোন কেটে দিলে আমি আকুল পাথার ভাবছি। কাহিনী কী! ৭ই মে, এই দিনে কি প্রলয় হয়েছিল যে মনে না রাখলে মাথা কাটা যাওয়ার দশা। এই দিন কী আমেরিকা জাপানে আনবিক বোমা ফেলেছিল, কেন আমার মনে রাখা প্রয়োজন? ১৩১০ গ্রাম মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়ছে। লাভ কী, এই দুর্বল মস্তিষ্কের সেই শক্তি কই! আচ্ছা, আজ সকালেই বাসায় ফোটা মে ফ্লাওয়ার দেখে কি যেন একটা ভাবনা এসেও তাল কেটে গিয়েছিল? ইয়া মাবুদ, আজ থেকে ১০ বছর আগে এই দিনই বিবাহ করেছিলাম। একটি ভাল ভুল!
পায়ে কুড়াল মারা হলো নাকি কুড়ালে পা মারা হলো এ নিয়ে গবেষণা করার আর কোন অবকাশ নাই। কিন্তু দেখো দেখি লোকজনের কান্ড, এরিমধ্যে আমার এক সুহৃদ ফোন করে ইস্তারি সাহেবাকে ১০ বছর আগের করা আমার এই ভুলটার জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। কেন রে বাবা, এটা উনাকে না বলে আমাকে বললে কী আকাশ ভেঙ্গে পড়ত!
ইস্তারি সাহেবাকে কি ভাবে ম্যানেজ করলাম সে কাহিনী বলে অন্যদের বিরক্ত করার কোন মানে হয় না। সন্ধ্যায় শুধু একবার তিনি চিড়বিড় করে বলেছিলেন, ভাঁড় কোথাকার।
ভাঁড় বলার কারণটা অতি তুচ্ছ। সন্ধ্যায় আমি ১০ বছর আগের বিবাহের পোশাকটা শখ করে পরেছিলাম। এই বিবাহের পোশাকটা, বরাবর যা পরি তাই পরেই বিবাহ করেছিলাম। সেই জিনস, সুতি শার্ট।
বিবাহের সময় কিছু অনায্য শর্ত ছিল আমার। পোশাক থাকবে এই। কন্যা ব্যবহারের কিছু কাপড় ছাড়া অন্য কিছু আনতে পারবে না। বরযাত্রী থাকবে সর্বসাকুল্যে ৭/ ৮ জন।
বিবাহের সময় মজার অনেক ঘটনার একটা ছিল এই রকম। আমি বসে আছি। কাজী সাহেব অনেকটা সময় বসে থেকে উসখুস করে বললেন, জামাই এখনও আইলো না, আমার তো আরেকটা বিয়া পড়াইতে হইব। একজন যখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, জামাই তো আপনার সামনেই বসা। কাজী সাহেব সময় নিয়ে চশমা ঠিক করে ভাল করে আমাকে দেখলেন। টুঁ শব্দও করলেন না। কিন্তু তাঁর মনের ভাব বুঝতে আমায় বেগ পেতে হয়নি। তিনি যা ভাবছিলেন, এই বান্দর কোত্থিকা আমদানী হইল! আমি তাঁর দোষ ধরি না। পালিয়ে বিয়ে করলে এক কথা কিন্তু সেটেল ম্যারেজে একজন কাজীর এমনটা ভাবা বিচিত্র কিছু না।
আমার এই পাগলামির অন্য কোন কারণ ছিল না। আমার প্রবল আশা ছিল, আমার এই পাগলামি অন্য কোন একজন যুবকের মধ্যে সংক্রামিত হয় যদি। একটা অন্য রকম লোভ! লাভের লাভ হল কচু। ফাঁকতালে পাগল হিসাবে কুখ্যাতির পাল্লা ভারী হল। জোর গুজব, কারা কারা নাকি আমাকে দেখেছে ছাদে নাংগুপাংগু হয়ে আকাশের সঙ্গে কথা বলতে। এতে আকাশের কি এসে গেল জানি না তবে আমার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয় বাতাস!
যাই হোক, বিবাহের দিনটা ভুলে যাওয়া কাজের কোন কাজ না। একটা খারাপ ভুল!
ইস্তারি(!) সাহেবা: আজ তারিখটা কত?
আমি অবাক: কেন, বাসায় কি তারিখের যন্ত্র, আ মীন, কেলেন্ডার-ফেলেন্ডার কিছু নাই!
ইস্তারি সাহেবা (হিম গলায়): থাকুক, তুমিই বল না, শুনি একটু?
আমি (গলায় আলগা কাঠিন্য এনে): এটা রসিকতা করার সময় না। কাজের সময়।
ইস্তারি সাহেবা: আমার সঙ্গে চালবাজী করবা না, তুমি কলম চালানো ছাড়া যে অন্য কোন কাজ পার না সে আমি বিলক্ষণ জানি। আমি তোমার ছাতাফাতা আবর্জনা লেখার পাঠক না। তোমার কলমবাজী ওদের জন্য তুলে রাখো। এ্যাহ, ভারী একজন কলমবাজ হয়েছেন তিনি, এক পাতা লেখতে ১০টা বানান ভুল!
আমি (চিঁ চিঁ করে): বিষয় কি, তারিখের সঙ্গে লেখালেখির সম্পর্ক কী! আজ ৭ই মে, তো?
ইস্তারি সাহেবা: তো! লজ্জা করে না তো বলতে, চশমখোর কোথাকার। বুড়া কুইচ্চা মাছ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে এখন আর ভাল্লাগছে না।
আমি (হড়বড় করে): শোনে শোনো, ফোন...।
ফোন কেটে দিলে আমি আকুল পাথার ভাবছি। কাহিনী কী! ৭ই মে, এই দিনে কি প্রলয় হয়েছিল যে মনে না রাখলে মাথা কাটা যাওয়ার দশা। এই দিন কী আমেরিকা জাপানে আনবিক বোমা ফেলেছিল, কেন আমার মনে রাখা প্রয়োজন? ১৩১০ গ্রাম মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়ছে। লাভ কী, এই দুর্বল মস্তিষ্কের সেই শক্তি কই! আচ্ছা, আজ সকালেই বাসায় ফোটা মে ফ্লাওয়ার দেখে কি যেন একটা ভাবনা এসেও তাল কেটে গিয়েছিল? ইয়া মাবুদ, আজ থেকে ১০ বছর আগে এই দিনই বিবাহ করেছিলাম। একটি ভাল ভুল!
পায়ে কুড়াল মারা হলো নাকি কুড়ালে পা মারা হলো এ নিয়ে গবেষণা করার আর কোন অবকাশ নাই। কিন্তু দেখো দেখি লোকজনের কান্ড, এরিমধ্যে আমার এক সুহৃদ ফোন করে ইস্তারি সাহেবাকে ১০ বছর আগের করা আমার এই ভুলটার জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। কেন রে বাবা, এটা উনাকে না বলে আমাকে বললে কী আকাশ ভেঙ্গে পড়ত!
ইস্তারি সাহেবাকে কি ভাবে ম্যানেজ করলাম সে কাহিনী বলে অন্যদের বিরক্ত করার কোন মানে হয় না। সন্ধ্যায় শুধু একবার তিনি চিড়বিড় করে বলেছিলেন, ভাঁড় কোথাকার।
ভাঁড় বলার কারণটা অতি তুচ্ছ। সন্ধ্যায় আমি ১০ বছর আগের বিবাহের পোশাকটা শখ করে পরেছিলাম। এই বিবাহের পোশাকটা, বরাবর যা পরি তাই পরেই বিবাহ করেছিলাম। সেই জিনস, সুতি শার্ট।
বিবাহের সময় কিছু অনায্য শর্ত ছিল আমার। পোশাক থাকবে এই। কন্যা ব্যবহারের কিছু কাপড় ছাড়া অন্য কিছু আনতে পারবে না। বরযাত্রী থাকবে সর্বসাকুল্যে ৭/ ৮ জন।
বিবাহের সময় মজার অনেক ঘটনার একটা ছিল এই রকম। আমি বসে আছি। কাজী সাহেব অনেকটা সময় বসে থেকে উসখুস করে বললেন, জামাই এখনও আইলো না, আমার তো আরেকটা বিয়া পড়াইতে হইব। একজন যখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, জামাই তো আপনার সামনেই বসা। কাজী সাহেব সময় নিয়ে চশমা ঠিক করে ভাল করে আমাকে দেখলেন। টুঁ শব্দও করলেন না। কিন্তু তাঁর মনের ভাব বুঝতে আমায় বেগ পেতে হয়নি। তিনি যা ভাবছিলেন, এই বান্দর কোত্থিকা আমদানী হইল! আমি তাঁর দোষ ধরি না। পালিয়ে বিয়ে করলে এক কথা কিন্তু সেটেল ম্যারেজে একজন কাজীর এমনটা ভাবা বিচিত্র কিছু না।
আমার এই পাগলামির অন্য কোন কারণ ছিল না। আমার প্রবল আশা ছিল, আমার এই পাগলামি অন্য কোন একজন যুবকের মধ্যে সংক্রামিত হয় যদি। একটা অন্য রকম লোভ! লাভের লাভ হল কচু। ফাঁকতালে পাগল হিসাবে কুখ্যাতির পাল্লা ভারী হল। জোর গুজব, কারা কারা নাকি আমাকে দেখেছে ছাদে নাংগুপাংগু হয়ে আকাশের সঙ্গে কথা বলতে। এতে আকাশের কি এসে গেল জানি না তবে আমার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয় বাতাস!
যাই হোক, বিবাহের দিনটা ভুলে যাওয়া কাজের কোন কাজ না। একটা খারাপ ভুল!
খাইব পান্তা, মরিব অসুখে
বৈশাখ ঘাড়ের উপর শ্বাস ফেলছে। বঙ্গালরা(!) কি পিছিয়ে থাকবেন, নাকি তাদের ছানাপোনারা?
বাংলা অক্ষর দেখে যাদের ছানাপোনাদের নাঁকিসুরে এটা না বললে যে মাথা কাটা যাবে, ড্যাড-মম, এটা কি বা-ং-লা? এরা কি এমন একটা দিনে ‘পান্তা ভাত’ খাবেন না, এটা কী ভাবা যায়! সেইসব পান্তাখেকোদের এই লেখাটা উৎসর্গ করছি।
গত বছর পহেলা বৈশাখে, মহাখালির ট্রাস্ট মিলায়তনে ৩০০ শিল্পী এবং তাদের পরিবারের লোকজনদের পান্তা খেয়ে পেট নেমে গেল। হাসপাতালে টানাটানি। যাচ্ছেতাই অবস্থা!
এবারও নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হবে। অপেক্ষায় আছি।
আসলে পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত না খেলে আমাদের চলেই না। কিন্তু পান্তা বানানো নয়কো সোজা। ট্রাস্ট মিলনায়তনের শিল্পীদের পেট নেমে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করা হয়েছিল যেটা:
সকালে গরম ভাত রেঁধে দ্রুত পান্তা বানানোর জন্য এতে দেয়া হয়েছিল বরফ। সম্ভবত ওই বরফের পানি ছিল দুষিত।
তো...? লজ্জা-লজ্জা!
এই দেশের মত বিচিত্র মানুষ সম্ভব এ গ্রহে আর নাই। বিচিত্র জাতি, এরা নিজেরাই নিজেদেরকে ফাঁকি দেয়। লাল চামড়াদের অনুকরণ না করলে আমাদের পশ্চাদদেশের কাপড় ঠিক থাকে না- সারা বছর মার খোঁজ না রেখে বছরে একটা কার্ড পাঠিয়ে দায় সারা।
হায়, পান্তাখেকো এস বি সাহেবের বাবা হওয়া! বা একজন স্ত্রী বিরহী, যেদিন স্ত্রী মারা গেছেন সেই দিনই শোক প্রকাশে কাল কন...পরে ফিঁয়াসের কাছে যাওয়া...।
বাংলা অক্ষর দেখে যাদের ছানাপোনাদের নাঁকিসুরে এটা না বললে যে মাথা কাটা যাবে, ড্যাড-মম, এটা কি বা-ং-লা? এরা কি এমন একটা দিনে ‘পান্তা ভাত’ খাবেন না, এটা কী ভাবা যায়! সেইসব পান্তাখেকোদের এই লেখাটা উৎসর্গ করছি।
গত বছর পহেলা বৈশাখে, মহাখালির ট্রাস্ট মিলায়তনে ৩০০ শিল্পী এবং তাদের পরিবারের লোকজনদের পান্তা খেয়ে পেট নেমে গেল। হাসপাতালে টানাটানি। যাচ্ছেতাই অবস্থা!
এবারও নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হবে। অপেক্ষায় আছি।
আসলে পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত না খেলে আমাদের চলেই না। কিন্তু পান্তা বানানো নয়কো সোজা। ট্রাস্ট মিলনায়তনের শিল্পীদের পেট নেমে যাওয়ার কারণ খুঁজে বের করা হয়েছিল যেটা:
সকালে গরম ভাত রেঁধে দ্রুত পান্তা বানানোর জন্য এতে দেয়া হয়েছিল বরফ। সম্ভবত ওই বরফের পানি ছিল দুষিত।
তো...? লজ্জা-লজ্জা!
এই দেশের মত বিচিত্র মানুষ সম্ভব এ গ্রহে আর নাই। বিচিত্র জাতি, এরা নিজেরাই নিজেদেরকে ফাঁকি দেয়। লাল চামড়াদের অনুকরণ না করলে আমাদের পশ্চাদদেশের কাপড় ঠিক থাকে না- সারা বছর মার খোঁজ না রেখে বছরে একটা কার্ড পাঠিয়ে দায় সারা।
হায়, পান্তাখেকো এস বি সাহেবের বাবা হওয়া! বা একজন স্ত্রী বিরহী, যেদিন স্ত্রী মারা গেছেন সেই দিনই শোক প্রকাশে কাল কন...পরে ফিঁয়াসের কাছে যাওয়া...।
Thursday, April 9, 2009
খোদেজা: ৩
খোদেজা: ২
খোদেজার বাপ ভয় চেপে আছেন। মাতব্বর তাকে কেন ডেকেছেন এটা বুঝতে তার বাকি নেই। এই মাতব্বর পারে না এমন কোন কাজ নেই। থানা নাকি এ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে এর জুড়ি নেই।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত খোদেজার বাপ গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন। তিনি আকুল হয়ে ভাবছেন, কী এমন অন্যায় করলেন যে খোদা তাকে এমন শাস্তি দিলেন। নাহয় নামাযটা সময় করে পড়তে পারেন না কিন্তু এই একটা অন্যায়ের জন্য খোদা তাকে শাস্তি না দিয়ে এইটুকুন দুধের বাচ্চাটাকে কেন দিলেন?
পা টেনে টেনে হাঁটছেন। সাঁকোটা পার হতে গিয়ে খরস্রোতা নদিটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। খুব ইচ্ছা করছিল লাফিয়ে পড়তে। এভাবে চলে গেলে যে খুব গোনাহ হয় এটা ওর জানা নেই এমন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সোয়াব-গোনাহ নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই।
কেবল মাথায় যেটা ঘুরছে, আম্মাজানরে যারা এইভাবে কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে, ভয়াবহ শাস্তি। আচ্ছা, দাঁ দিয়ে এদের দুইজনকে দুইটা কোপ দিলে কেমন হয়? নাহ, আমি এটা করব না। আইন এদের শাস্তি দিবে, দুনিয়ার অন্য বাপ-মাদের এটা জানা দরকার। আইন শাস্তি না দিলে জমিতে দেয়া বিষ খেতে তার হাত একটুও কাঁপবে না।
মাতব্বর দবির মিয়াকে বাড়িতেই পেলেন। মাতব্বর দবির মিয়া খুব খাতির করার ভান করল। এই গ্রামে চেয়ার আছে কেবল অল্প কটা বাড়িতে। জোর করে চেয়ারের আয়োজন করল। কড়িকাঠে বাঁধা চেয়ার, দড়ির গিট ছেড়ে বেশ কায়দা-কানুন করে নামানো হল। খোদেজার বাপ যতই না না করেন কিন্তু কে শোনে কার কথা!
'আরে মিয়া, তুমি হইলা গিয়া মেহুমান-কুটুম্ব। তুমার একটা ইজ্জত আছে না, এইটা তুমি কি কইলা মিয়া।'
খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এইসব কথার আসলে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। অন্য কোন সময় তিনি মাতব্বরের বাসায় চেয়ারে বসতে গেলে মাতব্বর লাথি মেরে চেয়ার ফেলে দিত।
খোদেজার বাপ জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসলেন। অভ্যাস নেই বলে বসে ঠিক জুত করতে পারছেন না।
'মিয়া তামুক খাইবানি একটু?'
'জ্বে না-জ্বে না।'
'না খাইলেই ভালা, তামুক-টামুক শাইস্তের লিগ্যা ভালা না, বুঝলা।'
'জ্বে। খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এর সামনে এখন নারকেলের হুক্কা খেলে পরে এটা নিয়ে চরম অপমান করবে।'
'তো মিয়া, দারগারে কয়া দেই তুমার মত আছে।'
খোদেজার বাপের বিভ্রান্ত চোখ, 'কুন বিষয়ে?'
'আরে, তুমি দেখি আজব মানু- আমি কই কি আর দারগা লেহে কি! কইলাম তুমার মাইয়ার বেপারে মিটমাট হয়া গেছে এইডা দারগারে কয়া দি।'
'মাতব্বর সাব, এটাডা আফনে কি কন। এমুন অন্নাই-অনাছার আল্লাও সইব না।'
'হারে, মসিবত হইল। আল্লারে আবার টানাটানি কর ক্যা! গাংয়ের মড়া কুডা দিয়া টাইন্যা লাভ আছে, কও?'
'আমার মাইয়াডা-।'
'দেহো মিয়া, আগুন খাইলে আংড়াই তো লেদাইবা- মাইয়া জন্ম দিছ, ভেজাল হইব এইটা তো নতুন কিছু না। পুলাপাইন মানু, হেগো মাথা গরম হয়া গেছিল, একটা ভুল কইরা ফালাইছে, কি করবা কও। তুমার পুলা হইলে কি করতা, ফালায়া দিতা?'
'মাতবর সাব-!'
'হুনো মিয়া, হেরা ভুল স্বীকার করছে। দরকার হইলে গামছা গলায় দিয়া মাপ চাইব। হেরা টাউনের পুলাপাইন না যে এইটা কইলে কইব, মাতবর সাব, গামছাডা নতুন দেইখ্যা দিয়েন। তুমার মনে আছে নি, হেই বিচারটার কতাডা? গামছা গলাত দিয়া মাপ চাইব এই রায় দিয়া শেষও করতাম পারি নাই, বাড়ির পিছে কুয়াটায় ডুপ্পুস কইরা আওয়াজ হইল। আমরা গিয়া দেখলাম, সব শ্যাষ, মানুডা অফমানে কুয়াতে ঝাপ দিছে। আমি কই কি সোহাগের বাপ, তুমি এইসব ঝামেলাতে যাইও না, হেষে মার্ডার কেইসে পরবা। আল্লার কিরা, যতখন তুমি মাফ না দিবা, হেরা ততখন তুমার ঠ্যাং ধইরা বয়া থাকব, তুমারে কতা দিলাম। লড়ছড় হইলে জুতাত কামুড় দিমু।'
'এইডা আমি পারুম না, মাতবর সাব।'
'দেহো, আমি সুজা-সরল মানু, ছ্যাপ লেপ দিয়া কুনু বিছার করি না। আমি হেরারে কয়া দিমু নে, তুমারে দুই পুলার বাপ দুইডা হালের গরু দিব। না দিলে পুংগির পুতরারে কি করি তুমি দেইখো। এমুন বেদা দিমু, হাগা বাইর হয়া যাইব। আমি এমুন মাতবর না যে, মুইত্যা চিড়া ভিজত না।'
খোদেজার বাপ চুপ করে বসে রইলেন। তিনি পায়ের কাঁপুনি থামাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
'হুনো, দাদার বিয়ার পর তো আর ঢোলের বাড়ি পড়ে নাই। তুমার হালের গরুগুলা দেখছ, ঠ্যাং-এ ঠ্যাং বাড়ি খায়।'
'মাতবর সাব, আমারে মাফ কইরা দেন, আমি পারুম না।'
'দেখ মিয়া, আমার লগে হিলিঝিলি-বদরসদর কথা কইবা না। যা কইবা সাফ সাফ হও। টেটনামি কইরো না।'
'মাতবর সাব, আমি আইনের কাছে বিচার চাই।'
'মিয়ার বেটা হুমন্ধির পুত, বেশি বেলাইনে যাইও না কইলাম। মিজাজ বিলা কইরো না কইলাম। কামডা বালা করতাছ না কইলাম।'
'আমারে মাফ করেন, মাতবর সাব।'
'মিয়া, তুমার কতা হুইনা মনে পড়তাছে, ছাল উডা কুত্তা বাঘা তার নাম। বাপজাইট্যা কোনখানকার! হালা তোরে আমি বেদাও মারি না।'
'মাতবর সাব, আল্লার দুহাই আমারে-।'
মাতবর নামের মানুষটা অপলক তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে মানুষটার স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। এখন যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে এই মানুষটা মধ্যে কেমন একটা অশুভ লুকিয়ে আছে। এর দৃষ্টিতে বিষ, নিঃশ্বাসে বিষ। মানুষটা গলায় বিষ ছড়িয়ে বলল, 'তোর মাইয়্যা হইল পেটলাগানি- পেটলাগানি গো যা হয় তোর মাইয়ার তাই হইছে, আফসোস তোর মাইয়ার লগে আমি করতে পারলাম না।'
খোদেজার বাপ এখান থেকে বেরিয়ে নদির কিনারে উবু হয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদলেন। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে মানুষটা প্রাত্যহিক জরুরি কোন কাজ সারছে। তাঁর চোখের জল মিশে যাচ্ছে নদির জলে। ক্ষণে ক্ষণে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন।
মানুষটা সেলিব্রেটি হলে কোন একটা উচুমার্গের কথা চলে আসত নিশ্চয়ই। নদির জলের সঙ্গে, আকাশ-বাতাস টেনে এনে কাব্যিক কোন একটা বাক্য চলে আসত অনায়াসে। কিন্তু খোদেজার মতো সামান্য একটা মেয়ের হতদরিদ্র বাবার এই কষ্টের কথা জানার খুব একটা প্রয়োজন নাই এই ব্যস্ত পৃথিবীর। তাঁর চোখের পানি যেমন অনাদরে মিশে যায় নদির পানিতে, তেমনি তার চাপা আর্তনাদও মিশে যায় বাতাসে।...
খোদেজার বাপ ভয় চেপে আছেন। মাতব্বর তাকে কেন ডেকেছেন এটা বুঝতে তার বাকি নেই। এই মাতব্বর পারে না এমন কোন কাজ নেই। থানা নাকি এ পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়- দিনকে রাত, রাতকে দিন করতে এর জুড়ি নেই।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত খোদেজার বাপ গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন। তিনি আকুল হয়ে ভাবছেন, কী এমন অন্যায় করলেন যে খোদা তাকে এমন শাস্তি দিলেন। নাহয় নামাযটা সময় করে পড়তে পারেন না কিন্তু এই একটা অন্যায়ের জন্য খোদা তাকে শাস্তি না দিয়ে এইটুকুন দুধের বাচ্চাটাকে কেন দিলেন?
পা টেনে টেনে হাঁটছেন। সাঁকোটা পার হতে গিয়ে খরস্রোতা নদিটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন। খুব ইচ্ছা করছিল লাফিয়ে পড়তে। এভাবে চলে গেলে যে খুব গোনাহ হয় এটা ওর জানা নেই এমন না। কিন্তু এই মুহূর্তে সোয়াব-গোনাহ নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র ভাবনা নেই।
কেবল মাথায় যেটা ঘুরছে, আম্মাজানরে যারা এইভাবে কষ্ট দিয়েছে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে, ভয়াবহ শাস্তি। আচ্ছা, দাঁ দিয়ে এদের দুইজনকে দুইটা কোপ দিলে কেমন হয়? নাহ, আমি এটা করব না। আইন এদের শাস্তি দিবে, দুনিয়ার অন্য বাপ-মাদের এটা জানা দরকার। আইন শাস্তি না দিলে জমিতে দেয়া বিষ খেতে তার হাত একটুও কাঁপবে না।
মাতব্বর দবির মিয়াকে বাড়িতেই পেলেন। মাতব্বর দবির মিয়া খুব খাতির করার ভান করল। এই গ্রামে চেয়ার আছে কেবল অল্প কটা বাড়িতে। জোর করে চেয়ারের আয়োজন করল। কড়িকাঠে বাঁধা চেয়ার, দড়ির গিট ছেড়ে বেশ কায়দা-কানুন করে নামানো হল। খোদেজার বাপ যতই না না করেন কিন্তু কে শোনে কার কথা!
'আরে মিয়া, তুমি হইলা গিয়া মেহুমান-কুটুম্ব। তুমার একটা ইজ্জত আছে না, এইটা তুমি কি কইলা মিয়া।'
খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এইসব কথার আসলে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই। অন্য কোন সময় তিনি মাতব্বরের বাসায় চেয়ারে বসতে গেলে মাতব্বর লাথি মেরে চেয়ার ফেলে দিত।
খোদেজার বাপ জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসলেন। অভ্যাস নেই বলে বসে ঠিক জুত করতে পারছেন না।
'মিয়া তামুক খাইবানি একটু?'
'জ্বে না-জ্বে না।'
'না খাইলেই ভালা, তামুক-টামুক শাইস্তের লিগ্যা ভালা না, বুঝলা।'
'জ্বে। খোদেজার বাপ ভাল করেই জানেন, এর সামনে এখন নারকেলের হুক্কা খেলে পরে এটা নিয়ে চরম অপমান করবে।'
'তো মিয়া, দারগারে কয়া দেই তুমার মত আছে।'
খোদেজার বাপের বিভ্রান্ত চোখ, 'কুন বিষয়ে?'
'আরে, তুমি দেখি আজব মানু- আমি কই কি আর দারগা লেহে কি! কইলাম তুমার মাইয়ার বেপারে মিটমাট হয়া গেছে এইডা দারগারে কয়া দি।'
'মাতব্বর সাব, এটাডা আফনে কি কন। এমুন অন্নাই-অনাছার আল্লাও সইব না।'
'হারে, মসিবত হইল। আল্লারে আবার টানাটানি কর ক্যা! গাংয়ের মড়া কুডা দিয়া টাইন্যা লাভ আছে, কও?'
'আমার মাইয়াডা-।'
'দেহো মিয়া, আগুন খাইলে আংড়াই তো লেদাইবা- মাইয়া জন্ম দিছ, ভেজাল হইব এইটা তো নতুন কিছু না। পুলাপাইন মানু, হেগো মাথা গরম হয়া গেছিল, একটা ভুল কইরা ফালাইছে, কি করবা কও। তুমার পুলা হইলে কি করতা, ফালায়া দিতা?'
'মাতবর সাব-!'
'হুনো মিয়া, হেরা ভুল স্বীকার করছে। দরকার হইলে গামছা গলায় দিয়া মাপ চাইব। হেরা টাউনের পুলাপাইন না যে এইটা কইলে কইব, মাতবর সাব, গামছাডা নতুন দেইখ্যা দিয়েন। তুমার মনে আছে নি, হেই বিচারটার কতাডা? গামছা গলাত দিয়া মাপ চাইব এই রায় দিয়া শেষও করতাম পারি নাই, বাড়ির পিছে কুয়াটায় ডুপ্পুস কইরা আওয়াজ হইল। আমরা গিয়া দেখলাম, সব শ্যাষ, মানুডা অফমানে কুয়াতে ঝাপ দিছে। আমি কই কি সোহাগের বাপ, তুমি এইসব ঝামেলাতে যাইও না, হেষে মার্ডার কেইসে পরবা। আল্লার কিরা, যতখন তুমি মাফ না দিবা, হেরা ততখন তুমার ঠ্যাং ধইরা বয়া থাকব, তুমারে কতা দিলাম। লড়ছড় হইলে জুতাত কামুড় দিমু।'
'এইডা আমি পারুম না, মাতবর সাব।'
'দেহো, আমি সুজা-সরল মানু, ছ্যাপ লেপ দিয়া কুনু বিছার করি না। আমি হেরারে কয়া দিমু নে, তুমারে দুই পুলার বাপ দুইডা হালের গরু দিব। না দিলে পুংগির পুতরারে কি করি তুমি দেইখো। এমুন বেদা দিমু, হাগা বাইর হয়া যাইব। আমি এমুন মাতবর না যে, মুইত্যা চিড়া ভিজত না।'
খোদেজার বাপ চুপ করে বসে রইলেন। তিনি পায়ের কাঁপুনি থামাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
'হুনো, দাদার বিয়ার পর তো আর ঢোলের বাড়ি পড়ে নাই। তুমার হালের গরুগুলা দেখছ, ঠ্যাং-এ ঠ্যাং বাড়ি খায়।'
'মাতবর সাব, আমারে মাফ কইরা দেন, আমি পারুম না।'
'দেখ মিয়া, আমার লগে হিলিঝিলি-বদরসদর কথা কইবা না। যা কইবা সাফ সাফ হও। টেটনামি কইরো না।'
'মাতবর সাব, আমি আইনের কাছে বিচার চাই।'
'মিয়ার বেটা হুমন্ধির পুত, বেশি বেলাইনে যাইও না কইলাম। মিজাজ বিলা কইরো না কইলাম। কামডা বালা করতাছ না কইলাম।'
'আমারে মাফ করেন, মাতবর সাব।'
'মিয়া, তুমার কতা হুইনা মনে পড়তাছে, ছাল উডা কুত্তা বাঘা তার নাম। বাপজাইট্যা কোনখানকার! হালা তোরে আমি বেদাও মারি না।'
'মাতবর সাব, আল্লার দুহাই আমারে-।'
মাতবর নামের মানুষটা অপলক তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে মানুষটার স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। এখন যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে এই মানুষটা মধ্যে কেমন একটা অশুভ লুকিয়ে আছে। এর দৃষ্টিতে বিষ, নিঃশ্বাসে বিষ। মানুষটা গলায় বিষ ছড়িয়ে বলল, 'তোর মাইয়্যা হইল পেটলাগানি- পেটলাগানি গো যা হয় তোর মাইয়ার তাই হইছে, আফসোস তোর মাইয়ার লগে আমি করতে পারলাম না।'
খোদেজার বাপ এখান থেকে বেরিয়ে নদির কিনারে উবু হয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদলেন। দূর থেকে কেউ দেখলে ভাববে মানুষটা প্রাত্যহিক জরুরি কোন কাজ সারছে। তাঁর চোখের জল মিশে যাচ্ছে নদির জলে। ক্ষণে ক্ষণে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন।
মানুষটা সেলিব্রেটি হলে কোন একটা উচুমার্গের কথা চলে আসত নিশ্চয়ই। নদির জলের সঙ্গে, আকাশ-বাতাস টেনে এনে কাব্যিক কোন একটা বাক্য চলে আসত অনায়াসে। কিন্তু খোদেজার মতো সামান্য একটা মেয়ের হতদরিদ্র বাবার এই কষ্টের কথা জানার খুব একটা প্রয়োজন নাই এই ব্যস্ত পৃথিবীর। তাঁর চোখের পানি যেমন অনাদরে মিশে যায় নদির পানিতে, তেমনি তার চাপা আর্তনাদও মিশে যায় বাতাসে।...
Wednesday, April 8, 2009
মুক্তিযুদ্ধে একজন 'অখেতাবধারী' দুলা মিয়া।
১৯৭১ সাল। তৎকালীন ক্যাপ্টেন এস এ ভূইয়া জবানীতে একজন 'অখেতাবধারী', দুলা মিয়ার কথা।
"২৬ বছরের, দুলা মিয়া। সমগ্র মুক্তিবাহিনীতে দুলার মত সাহসী যুবক আর কজন ছিল আমার জানা নেই। তেলিয়াপাড়া যুদ্ধে সে যে সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার তুলনা হয় না। বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণেন মধ্যেও এই অকুতোভয় যুবক লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেনি কিংবা রণক্ষেত্র ছেড়ে দূরে সরে যায়নি।
...
২১ জুন রাতে শত্রুবাহিনী যখন আমাদের উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায় সেই একই সময় তারা কলকলিয়াতেও আক্রমণ চালায় (দুলা, ক্যাপ্টেন মোর্শেদের অধীনে যুদ্ধ করছিল)। মোর্শেদের সৈন্যরা শক্রদের সাথে সারারাত যুদ্ধ করে। কিন্তু শত্রুর সংখ্যা বহুগুণ বেশী থাকায় মোর্শেদের দল সেখান থেকে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সে সময় দুলা মিয়ার হাতে ছিল একটা হালকা মেশিনগান। সে তার হালকা মেশিনগান দিয়ে অনবরত গুলি ছুঁড়ে যাচ্ছিল এবং শক্রুর অগ্রগতিকে সারারাত ব্যাহত করে রেখেছিল। নি:শঙ্কচিত্তে অপারবিক্রমে সে এক ভয়াবহ শক্রুর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিল।
অবস্থা বেগতিক দেখে যখন দুলা মিয়ার সংগীরা আত্মরক্ষা করতে পিছু হটছিল তখন দুলা পিছিয়ে না এসে নির্ভয়ে তার হালকা মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়েই যাচ্ছিল।
তার অসমসাহসীকতা এবং গুলি ছোড়ার ফলে অন্যরা পিছু হটবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু দুলার বড়ই দুর্ভাগ্য, সে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে এক মহা বিপদে আটকা পড়ল। শত্রুপক্ষের মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি এসে তাকে বিদ্ধ করে।
... অবশেষে শত্রুরা দুলাকে আহত করতে সক্ষম হয়ে কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল।
কিন্তু নিদারুণ আহত অবস্থায়ও দুলা মিয়া গুলি চালানো বন্ধ করেনি। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রাণ দেবে কিন্তু জীবিত অবস্থায় ধরা দেবে না।
...
রাত ভোর হল। বেলা তখন ১১টা। সবাই ফিরে এল কিন্তু দুলা এল না। খবর এল, দুলার পেটে এবং ডান পায়ে কয়েকটি গুলি লেগেছে। সে কাদা-পানির মধ্যে অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে।
...
অনেক চেষ্টায় উদ্ধার করে যখন দুলাকে আমাদের সামনে আনা হল তখনকার দৃশ্য এত করুণ এবং বেদনাদায়ক তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। মুমূর্ষু দুলা বাম হাত দিয়ে তার গুলিবিদ্ধ পেট চেপে ধরে আছে, কেননা ক্ষতস্থান থেকে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম করছিল। ডান পায়ে গুলি লেগে ছিন্নভিন্ন মাংসগুলো কোনক্রমে পায়ের হাড়ের সংগে লেগে ছিল। আর তার সমস্ত শরীর রক্তে রঞ্জিত।
দুলা একটা গুলিবিদ্ধ বাঘের মত ছটফট করছিল। তখনও সে বাকশক্তি হারায়নি। আমাদের চোখের দিকে চোখ রেখে সে বলল, "স্যার, আমি আর বাঁচব না, এক্ষুণি মারা যাব। আমার আফসোস রয়ে গেল স্বাধীন বাংলার মাটিতে মরতে পারলাম না। ...আমাকে কথা দিন আমার লাশ স্বাধীন বাংলায় কবর দেবেন, আজ হোক কাল হোক দেশ স্বাধীন হবেই।"
আমাদের সবার চোখে পানি। সে আরও বলল, "স্যার, পাঞ্জাবী দস্যুরা যখন আমাদের বাঙালীদের নির্মমভাবে, নির্বিচারে হত্যা শুরু করে তখন আমার ৮ বছরের মেয়ে আমাকে কি বলেছিল, জানেন? 'বলেছিল, আব্বা, তুমিও মুক্তিফৌজে যোগ দাও, পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, দেশকে স্বাধীন কর'।"
আমার হাত ধরে দুলা মিয়া বলল, "স্যার আপনার বাড়ী কুমিল্লায়, আপনি নিশ্চয়ই কুমিল্লার শালদা নদী চেনেন? সেখানে আমার বাড়ী। দয়া করে আমার মেয়েকে এবং কাউকে আমার মৃত্যুর খবর দেবেন না। আমার মৃত্যুর খবর পেলে মেয়েটা আর বাঁচবে না। তবে আমার একটা দাবী, আমার হতভাগিনী মেয়েটিকে আপনি দেখবেন। স্যার, আমার এই একটি কথা ভুলে যাবেন না।"
দুলার এমন মুমূর্ষু অবস্থায় এ্যাম্বুলেন্স আসতে কিছুটা দেরী হবে মনে করে লে: কর্নেল শফিউল্লা (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) তাকে নিজের জিপে করে আগরতলা পিজি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
দুলার অবস্থা দেখে সেদিন আমার মত অনেকেই ধারণা করেছিল, দুলা আর বাঁচবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেড় মাস পর দুলা আরোগ্য লাভ করে ফিরে আসে এবং পুনরায় ক্যাপ্টেন মোর্শেদের কোম্পানি যোগদান করল। পরবর্তীকালে অসীম বীরত্বের সংগে দুলা অনেক রণক্ষেত্রে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে।
(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১০ খন্ড, সশস্ত্র সংগ্রাম)
*ভাষারীতি প্রায় অবিকল রাখা হলো।
**পরে জানা যায় দুলা মিয়াকে কোন খেতাব দেয়া হয়নি!
আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় দুলা মিয়ার ওই মেয়েটি এখন কেমন আছে [১]? আরও প্রশ্ন, বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই। কেন?
কতটা সাহস দেখালে একজন খেতাব পায়? কতটা রক্ত ঝরালে একজন দেশপ্রেমিক হয়? কেমন ট্রেনিং নিলে একজন সিভিলিয়ান সামরিক মর্যাদা পায়? আর কেমন করেই বা মারা গেলে একজন বীরশ্রেষ্ঠ হয়?
***নির্বোধ আমরা কেবল এটা জানি না খেতাব না-দিলে কারও কারও কিছুই যায় আসে না [২]।
সহায়ক সূত্র:
১. দুলা মিয়ার সেই মেয়েটি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html
২. একজন ট্যাংকমানব: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html
"২৬ বছরের, দুলা মিয়া। সমগ্র মুক্তিবাহিনীতে দুলার মত সাহসী যুবক আর কজন ছিল আমার জানা নেই। তেলিয়াপাড়া যুদ্ধে সে যে সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার তুলনা হয় না। বৃষ্টির মত গোলাবর্ষণেন মধ্যেও এই অকুতোভয় যুবক লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করেনি কিংবা রণক্ষেত্র ছেড়ে দূরে সরে যায়নি।
...
২১ জুন রাতে শত্রুবাহিনী যখন আমাদের উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালায় সেই একই সময় তারা কলকলিয়াতেও আক্রমণ চালায় (দুলা, ক্যাপ্টেন মোর্শেদের অধীনে যুদ্ধ করছিল)। মোর্শেদের সৈন্যরা শক্রদের সাথে সারারাত যুদ্ধ করে। কিন্তু শত্রুর সংখ্যা বহুগুণ বেশী থাকায় মোর্শেদের দল সেখান থেকে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সে সময় দুলা মিয়ার হাতে ছিল একটা হালকা মেশিনগান। সে তার হালকা মেশিনগান দিয়ে অনবরত গুলি ছুঁড়ে যাচ্ছিল এবং শক্রুর অগ্রগতিকে সারারাত ব্যাহত করে রেখেছিল। নি:শঙ্কচিত্তে অপারবিক্রমে সে এক ভয়াবহ শক্রুর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিল।
অবস্থা বেগতিক দেখে যখন দুলা মিয়ার সংগীরা আত্মরক্ষা করতে পিছু হটছিল তখন দুলা পিছিয়ে না এসে নির্ভয়ে তার হালকা মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়েই যাচ্ছিল।
তার অসমসাহসীকতা এবং গুলি ছোড়ার ফলে অন্যরা পিছু হটবার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু দুলার বড়ই দুর্ভাগ্য, সে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে এক মহা বিপদে আটকা পড়ল। শত্রুপক্ষের মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলি এসে তাকে বিদ্ধ করে।
... অবশেষে শত্রুরা দুলাকে আহত করতে সক্ষম হয়ে কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলল।
কিন্তু নিদারুণ আহত অবস্থায়ও দুলা মিয়া গুলি চালানো বন্ধ করেনি। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রাণ দেবে কিন্তু জীবিত অবস্থায় ধরা দেবে না।
...
রাত ভোর হল। বেলা তখন ১১টা। সবাই ফিরে এল কিন্তু দুলা এল না। খবর এল, দুলার পেটে এবং ডান পায়ে কয়েকটি গুলি লেগেছে। সে কাদা-পানির মধ্যে অসহায় অবস্থায় পড়ে আছে।
...
অনেক চেষ্টায় উদ্ধার করে যখন দুলাকে আমাদের সামনে আনা হল তখনকার দৃশ্য এত করুণ এবং বেদনাদায়ক তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। মুমূর্ষু দুলা বাম হাত দিয়ে তার গুলিবিদ্ধ পেট চেপে ধরে আছে, কেননা ক্ষতস্থান থেকে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম করছিল। ডান পায়ে গুলি লেগে ছিন্নভিন্ন মাংসগুলো কোনক্রমে পায়ের হাড়ের সংগে লেগে ছিল। আর তার সমস্ত শরীর রক্তে রঞ্জিত।
দুলা একটা গুলিবিদ্ধ বাঘের মত ছটফট করছিল। তখনও সে বাকশক্তি হারায়নি। আমাদের চোখের দিকে চোখ রেখে সে বলল, "স্যার, আমি আর বাঁচব না, এক্ষুণি মারা যাব। আমার আফসোস রয়ে গেল স্বাধীন বাংলার মাটিতে মরতে পারলাম না। ...আমাকে কথা দিন আমার লাশ স্বাধীন বাংলায় কবর দেবেন, আজ হোক কাল হোক দেশ স্বাধীন হবেই।"
আমাদের সবার চোখে পানি। সে আরও বলল, "স্যার, পাঞ্জাবী দস্যুরা যখন আমাদের বাঙালীদের নির্মমভাবে, নির্বিচারে হত্যা শুরু করে তখন আমার ৮ বছরের মেয়ে আমাকে কি বলেছিল, জানেন? 'বলেছিল, আব্বা, তুমিও মুক্তিফৌজে যোগ দাও, পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, দেশকে স্বাধীন কর'।"
আমার হাত ধরে দুলা মিয়া বলল, "স্যার আপনার বাড়ী কুমিল্লায়, আপনি নিশ্চয়ই কুমিল্লার শালদা নদী চেনেন? সেখানে আমার বাড়ী। দয়া করে আমার মেয়েকে এবং কাউকে আমার মৃত্যুর খবর দেবেন না। আমার মৃত্যুর খবর পেলে মেয়েটা আর বাঁচবে না। তবে আমার একটা দাবী, আমার হতভাগিনী মেয়েটিকে আপনি দেখবেন। স্যার, আমার এই একটি কথা ভুলে যাবেন না।"
দুলার এমন মুমূর্ষু অবস্থায় এ্যাম্বুলেন্স আসতে কিছুটা দেরী হবে মনে করে লে: কর্নেল শফিউল্লা (পরবর্তীতে সেনাপ্রধান) তাকে নিজের জিপে করে আগরতলা পিজি হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
দুলার অবস্থা দেখে সেদিন আমার মত অনেকেই ধারণা করেছিল, দুলা আর বাঁচবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেড় মাস পর দুলা আরোগ্য লাভ করে ফিরে আসে এবং পুনরায় ক্যাপ্টেন মোর্শেদের কোম্পানি যোগদান করল। পরবর্তীকালে অসীম বীরত্বের সংগে দুলা অনেক রণক্ষেত্রে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে।
(বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১০ খন্ড, সশস্ত্র সংগ্রাম)
*ভাষারীতি প্রায় অবিকল রাখা হলো।
**পরে জানা যায় দুলা মিয়াকে কোন খেতাব দেয়া হয়নি!
আমার মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় দুলা মিয়ার ওই মেয়েটি এখন কেমন আছে [১]? আরও প্রশ্ন, বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই। কেন?
কতটা সাহস দেখালে একজন খেতাব পায়? কতটা রক্ত ঝরালে একজন দেশপ্রেমিক হয়? কেমন ট্রেনিং নিলে একজন সিভিলিয়ান সামরিক মর্যাদা পায়? আর কেমন করেই বা মারা গেলে একজন বীরশ্রেষ্ঠ হয়?
***নির্বোধ আমরা কেবল এটা জানি না খেতাব না-দিলে কারও কারও কিছুই যায় আসে না [২]।
সহায়ক সূত্র:
১. দুলা মিয়ার সেই মেয়েটি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/08/blog-post_05.html
২. একজন ট্যাংকমানব: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html
Subscribe to:
Posts (Atom)
