Friday, March 20, 2009

মমতায় ছাপাছাপি নিষ্প্রভ চোখ।

 
­আমরা যারা দেশে থাকি, আমাদের অনেকের বদ্ধমূল ধারণা থাকে, যারা প্রবাসে থাকেন তাঁদের চেয়ে সুখি আর কেউ এ গ্রহে নাই! আমরা মুখ ফুটে বলি না কিন্তু মনে গোপন ইচ্ছা লালন করি, এঁরা যেন আজীবন প্রবাসেই থাকেন। রিয়াল-ডলার-পাউন্ড হালের ইউরো স্রোতের মত দেশে পাঠাতে থাকবেন। দেশে ফেরার আবশ্যকতা কী!

খোদা না খাস্তা, কেউ যদি বলে বসেন দেশে ফেরার কথা চিন্তা করছি, নিমিষেই আমাদের মুখ শুকিয়ে আসে। আমরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা শুরু করি, 'মাথা খারাপ হইছে তোমার। দেশে আইসা কী করবা? এইটা একটা থাকার জায়গা হইলো! তোমাগো দেশের কুত্তা-বিলাইও এই দেশে মুতব না'।
আহ, তোমাগো দেশ...।

আমরা যারা দেশে থাকি, সাদা-সাদা গরম-গরম ভাত দেখে আমাদের গা গুলায়। প্রবাসি একজনের কেবল ধোঁয়াওঠা ভাতের কল্পনা করেই চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। পাগল!
আহা, পানি চলে আসলেই হলো বুঝি, পুরুষ মানুষদের কী কাঁদতে আছে! তাই বলে কী কান্না থামে শা..., ঠিক সময়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাটাই হলো আসল কথা। মরদ বটে একটা!

দেশে মার শরিরের গন্ধে আমাদের দমবন্ধ ভাব হয়। কখনও কখনও অমানুষের মত অস্ফুটে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, 'তুমি যে কী মা, শরিরে পেয়াজ-রসুনের গন্ধ। ওয়াক'!
মা অজান্তে শ্বাস চাপেন। তাঁর আর্দ্র চোখে আটকে থাকে গোটা সূর্যটা, পলক ফেললেই উপচে পড়বে। তাই কী তিনি পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন?

প্রবাসিরা গায়ে কত কিছু মাখেন, সুগন্ধের মৌতাত হপ্তাহ ছাড়িয়ে যায় কিন্তু কী এক বিচিত্র কারণে মার গায়ের গন্ধের জন্য পাগল হয়ে থাকেন। পাগলসব!

একবার এক ঈদে প্রবাসি এক বন্ধুর অর্থহীন মেইল পেলাম, 'খাওয়াতে পারিস এক চামচ সেমাই? আল্লার কসম তোকে ১০০০ হাজার ইউরো দেব'। এ উম্মাদ, বদ্ধউম্মাদ!
দেখো দিকি কান্ড, এ আবার আল্লার কসম খায়। ওরে ব্যাটা শুয়োরখেকো! তুই যে হরদম পর্ক-চপ খাস, গলায় শুয়োর আটকে গেলে গলা ভেজাবার ছলে ভদকা গিলিস এটা বুঝি জানতে বাকি আছে আমাদের?
তবে এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না, আমার চোখ কী খানিকটা চকচক করেনি? ইশরে, ১০০০ ইউরো! এক চামুচ সেমাইয়ের জন্য ১০০০ ইউরো?


মুদ্রার অন্য পিঠ নেই যে এমন না। আমার এক স্বজনকে তার মা একটা কিছু (বলার মত কিছু না, নারকেলের নাড়ু) দেয়ার কথা বলতেই সু-পুত্র হড়বড় করে বলে উঠেন, 'আরে না, দরকার নাই-দরকার নাই'।
তবুও তার মা চিঁ চিঁ করে বলেন, 'না মানে...তোর লাইগা...'।
'আরে, জ্যাকসন হাইটসে সব পাওয়া যায়। সব-সব'।
 

আমি গোপনে শ্বাস ফেলি। মুখে বলি, বিলক্ষণ। আজকাল বাইরের শপিং-মলগুলোয় এইসবও বিক্রি হওয়া শুরু হয়েছে। বেশ-বেশ! কী জানি, হবে হয়তো বা! সব পাওয়া যায়? বাহ, বেশ তো!
এইসব তাহলে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে? বর্ষায় কাগজের নৌকা ভাসানো, হচ্ছে? নিজের হাতে লাগানো সেই গাছটা, পাওয়া যাচ্ছে? পুকুরপাড়ে বসার সেই নোংরা জায়গাটা, অবশেষে এটাও? বাতিল হয়ে যাওয়া সেইসব মুখ, সত্যি?
আহারে, সেই যে মুখটা কেবল অনর্থক বকেই মরত, খোকা এইটা খাস নে, ওইটা খাস নে। রোদে ঘুরতাছিস ক্যান রে, বান্দর! চামড়াডা পুইড়া কেমুন ছালি-ছালি হইছে। তোর শইলের রঙ দেইখা কাউয়াও হাসব। পাগলা, না-খায়া যাস নে কইলাম, গেলে তুই কিন্তুক আমার মাথা খাবি। তুই এমন হইলি ক্যান রে? তুই না, তুই না, তুই একটা পাগলু।


অনেক আগে লেখাটা একটা কম্যুনিটি ব্লগিংসাইটে দিয়েছিলাম [১]। ওখানে তখন শুভ নামে লেখালেখি করতাম, ওখানকার ভাষায় ব্লগিং করতাম। মার কাছে লেখাটায় কারও কারও মন্তব্য পড়ে মনটা বিষণ্ন হয়ে গিয়েছিল। একজন সহ-ব্লগার লিখেছিলেন, "...শুভ, দাঁড়ান, চোখটা মুছে নেই..."।
এটা আসলে লেখার গুণে না। দেশের বাইরে থাকলে মনটা থাকে অসম্ভব তরল। কিন্তু একজন, আলাদা করে মেইল করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, "ওপেন ফোরামে এটা লিখতে চাইনি। বলতে পারেন আমি কার কাছে ফিরব, কেন ফিরব"?
একেকজনের একেক রকম জীবন-গল্প। আমার বলার কিছু ছিল না। এই পোস্টের কিছু ভাবনা তাঁর কাছ থেকে ধার করা। ওই দু:খী মানুষটাকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।


*ছবিস্বত্ব: আলী মাহমেদ

সহায়ক সূত্র:
১. মার কাছে ফেরা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_9329.html