Tuesday, January 27, 2009

মুক্তিযুদ্ধে, অন্য রকম এক অস্ত্র, প্রিনছা খেঁ!

রাখাইন মেয়ে প্রিনছা খেঁ। মুক্তিযুদ্ধে: একজন আদিবাসী। আমি বলি, একজন আদিমানুষ। একটি ভয়াবহ অস্ত্র! আমরা এমন অস্ত্রের ব্যবহার করতে দেখেছি, ভাগিরথীকে:
https://www.facebook.com/photo.php?fbid=10151306750392335&set=a.10151298132117335.465193.723002334&type=1

...১৯৭১ সালের মাঝামাঝিতে প্রিনছার স্থান হয় শক্র ক্যাম্পে।
প্রিনছা খেঁ সুরেন বাবু নামের সদাশয় এক মানুষের আশ্রয়ে ছিলেন, কন্যাস্নেহে। পাকসেনারা নৃর্শংস ভাবে সুরেন বাবুকে হত্যা করে প্রিনছাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। দিনের-পর-দির জলে শারীরিক চরম নির্যাতন। প্রিনছা হাত বদল হতে হতে বাউকাঠি ক্যাম্পে এসে স্থির হয়।

শক্র ক্যাম্পে পাক-আর্মির দুই বাবুর্চির সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রিনছা হয়ে গেলেন তৃতীয় বাবুর্চি। ক্যাম্পে কাঠ সংগ্রহকারী বাবুলের সঙ্গে তিনি গোপনে পরিকল্পনা করতে থাকেন।

অক্টোবরে প্রিনছা ক্যাম্প অধিনায়ক সুবেদারকে জানালেন তিনি অসুস্থ, ঝালকাঠি যেতে চান ডাক্তার দেখাতে। এক হাবিলদার, এক সিপাইসহ বাবুল আর প্রিনছা এলেন ঝালকাঠি ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার যখন অসুখের জিজ্ঞেস করলেন, তখন প্রিনছা বললেন, তিনি গর্ভবতী, গোপনে কথা বলবেন। পেছনের ঘরে গিয়ে তিনি ডাক্তারকে বললেন, আসলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা নন, কিন্ত পাকিস্তানি হাবিলদারকে যেন ডাক্তার বলে দেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা, প্রতি চার দিন পরপর তাঁকে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষার জন্য আসতে হবে।
পরে একদিন ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রিনছা বললেন, তাঁর বিষ চাই। (কেন চান এটাও বুঝিয়ে বললেন) ডাক্তার কিছুদিন সময় নিয়ে ঝালকাঠি থেকে বিষ এনে দিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় খুবই যত্ন করে রান্না করলেন প্রিনছা। তার আগে রান্নাঘরে দুই পাকিস্তানি বাবুর্চিকে খাইয়ে এসেছেন, খাওয়া শেষে সবাই অচেতন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রিনছা বাবুলের সঙ্গে পালিয়ে যান নাজিরপুলে।
সেই ক্যাম্পের ৪২ জন শক্রর মধ্যে ১৪ জন অচেতন অবস্থায় মারা যায় আর বাকিদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল চিকিৎসার জন্য।
কিন্তু সবাই মারা গেল না-শুনে প্রিনছা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওই ডাক্তারের উপর। তাঁর ধারণা, ডাক্তার ভেজাল বিষ দিয়েছে নইলে সবাই মরল না কেন!
বরিশাল থাকাটা তাঁর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ালে, দুদিন লুকিয়ে থেকে ঢাকার লঞ্চে উঠে পড়েন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার বরিশালে ফিরে আসেন।

যুদ্ধের পরে প্রিনছার সঙ্গে কথা হলে তিনি ঝলসে উঠে বলেছিলেন, 'এখন বলো, আমার এই দেহটা ভয়ংকর অস্ত্র নয় শত্রুকে মারার জন্য? এই অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে লক্ষ-কোটি মানুষের মুক্তির জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য। ...তোমার হাতের অস্ত্র এবং আমার দেহ কী একই অস্ত্র না?' 
*তথ্যসূত্র: জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা/ মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূইয়া।

(প্রিনছা খেঁ নামের এই মানুষটাকে ৩৬ বছর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার যথাযথ সম্মান দেয়া হয়নি, তেমন কেউ মনে রাখেনি। এর পরে কী হয়েছে এটা জানা নাই। ইতিহাসে এদের নাম আসে না কারণ এরা দলবাজ না। ঘুরেফিরে আসবে অল্প কিছু বিখ্যাত মানুষদের নাম। বছরের পর বছর ধরে আমরা এদের কথা শুনতে শুনতে কানের পোকা বের করে ফেলব। আসলে ভাঙ্গা গ্রামোফোনের পিনটা আটকে আছে কোথাও, এ থেকে আমাদের মুক্তি নাই।)
যেমনটা আমরা সম্মানিত করেছি উক্য চিং-কে...১০০ টাকা দিয়ে...।