Saturday, November 8, 2008

অহেতুক আবেগ- মূল্য মাত্র ৫০ টাকা।

সালটা ৯৩। 'বীরশ্রেষ্ঠ' নামের লেখাটার জন্য পেয়েছিলাম ৫০ টাকা। তখন আমি দৈনিক 'ভোরের কাগজ'-এ ফি হপ্তাহে 'একালের রূপকথা' নামে নিয়মিত লিখি। হাবিজাবি বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে।

থাকি গ্রাম টাইপের একটা জায়গায়, দায়ে না পড়লে ঢাকা যাওয়া হয় না। কিন্তু একবার ঢাকায় পা রেখেই আমার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাকিস্তানি পতাকায় ছেয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পাকিস্তানি প্রাইম-মিনিস্টার আসছেন। বেশ। তর্কের খাতিরে, শিস্টাচারের দোহাই দিলেও এমন করে পাকিস্তানি পতাকা দিয়ে ঢাকা শহর মুড়িয়ে দেয়ার যুক্তি কী এটা আজো বোধগম্য হয় না। প্রচন্ড মনখারাপ করে তখন বীরশ্রেষ্ঠ লেখাটা লিখেছিলাম।

তখন ওই পাতাটা দেখেতেন সঞ্জীব চৌধুরী। তাঁকে আমি অনুরোধ করেছিলাম এই লেখাটার জন্য কোনো টাকা আমাকে না-দিতে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোনো লেখা লিখব টাকার বিনিময়ে এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। তিনি বিষয়টা গুরুত্ব দেননি নাকি নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম ছিল না এটা জানার আজ আর উপায় নেই! বাধ্য হয়ে টাকাটা আমাকে নিতে হয়েছিল- অনেক লেখার বিল একসঙ্গে দেয়া হত। হায়, এই ৫০ টাকার আমি কী করব, কোথায় রাখব?

৫০ টাকাটা আমি রেখে দিয়েছিলাম। আজও আছে। কখনও ইচ্ছা হয়নি এটা খরচ করে ফেলি। সজ্ঞীবদা, আপনি আসলে(!) দেখাব নে আপনাকে...।

"বীরশ্রেষ্ঠ
দেশের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত অঝোরে ঝরে এক জায়গায় জমা হলো। সে সাগরে উঠল উথাল-পাতাল ঢেউ। সে ঢেউ ক্রমশ ফুঁসে উঠল। ছাড়িয়ে গেল এ দেশ- মহা বিশ্ব, সবকিছু। সৃষ্টিকর্তার ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। একাগ্রচিত্তের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শাসন কার্য, সৃষ্টিকর্তার জন্যে এরচেয়ে লজ্জার কিছু নেই। পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে বললেন: এতো অপাপবিদ্ধ রক্ত, এতো রক্ত- এ নিয়ে আমি কি করব, কোথায় রাখব!

এদেশের ক’জন সেরা সন্তান, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ একই সঙ্গে আবেদন করলেন, অল্প সময়ের জন্যে হলেও প্রিয় মাতৃভূমি দেখার অনুমতি দেয়া হোক। তাঁদেরকে জানানো হলো, এ রকম কোনো নিয়ম নেই। বীরশ্রেষ্ঠরা গোঁ ধরে রইলেন। অবশেষে অনুমতি মিলল কিন্তু নিয়মকানুনও বলে দেয়া হলো:
কোনো অবস্থাতেই নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না, সাত জনকেই একসঙ্গে থাকতে হবে, এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ফেরা যাবে না।

ঢাকা। ১২ ডিসেম্বর। আর মাত্র একদিন পর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, মাত্র তিনদিন পর বিজয় দিবস।
চোখের পলকে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ প্রিয় মাতৃভূমিতে উদয় হলেন। মৃত্যুনীল যন্ত্রণায় তাঁদের দেহ মোচড় খাচ্ছে, ভুল করে তাঁরা পাকিস্তানে চলে এসেছেন। আহ-আহ, কী কষ্ট! চারদিকে উড়ছে পাকিস্তানি পাতাকা পতপত করে। চারদিক ছেয়ে গেছে পাকিস্তানি পতাকায়।


সিপাহী মোঃ মোস্তফা কামাল চেঁচিয়ে বললেন: কিন্তু একী আশ্চর্য! ওই, ওই তো দেখা যায় বায়তুল মোকারম মসজিদ?
ল্যান্স নায়েক নুর মোহাম্মদ সুর মেলালেন: আরে, বাহ, আমিও তো স্টেডিয়াম দেখতে পাচ্ছি।
কিছুদূর এগুতেই নায়েক মুন্সী আব্দুর রব অবাক হয়ে বললেন: অবাক কাণ্ড, এটাই তো সেই ঘড়িঅলা বিল্ডিংটা!
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ফুটপাতের অসংখ্য পত্রপত্রিকা নেড়েচেড়ে দেখলেন, সব বাংলা।

ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার রুহুল আমীন অস্ফুট স্বরে বললেন: সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলছে, এটা পাকিস্তান হতেই পারে না, আউট অভ কোশ্চেন!

মতিঝিলে জ্যামে অনেকক্ষণ আটকে রইলেন। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে নাকি সবুজ চত্বরে স্বাগত জানানো হবে।
এঁরা এদিক ওদিক বেশ অনেকটা সময় ঘুরে বেড়ালেন। একসময় সচেতন হয়ে ভারী লজ্জিত হলেন। আসার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু...!


জাতীয় স্মৃতিসৌধের চারপাশে মানব-প্রাচীর ঘিরে আছে। বীরশ্রেষ্ঠরা অলৌকিক ক্ষমতার ব্যবহার না-করে এ ব্যুহ ভেদ করতে পারবেন না। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহার করার উপর নিষেধাজ্ঞা আছে।
একজন বীরশ্রেষ্ঠ, কঠিন নিষেধ বিস্মৃত হয়ে মুখ ফসকে বলে ফেললেন: কেন স্মৃতিসৌধে ঢুকতে দেবেন না, আমরা বীরশ্রে..., আমাদের কি এইটুকু অধিকারও নেই?


ভাগ্যিস, বীরশ্রেষ্ঠরা কি করে এখানে এ নিয়ে সৈনিক মাথা ঘামাল না। পাথরমুখে একচুল আঁচড় না ফেলে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলল, পাকিস্তানের প্রাইম মিনিস্টার এখন ফুল দিচ্ছেন। আপনারা যেই হোন আর যাই হোন ওনার চেয়ে বড় না।

বীরশ্রেষ্ঠদের সবারই যেন কী হলো, সমগ্র বিশ্ব আধার হয়ে আসছে। চোখ জলে ছাপাছাপি কিন্ত কেউ কারো দিকে ভুলেও তাকাচ্ছেন না। বীরপুরুষদের চোখের জল যে দেখতে নেই। তাঁরা ফিরে আসছেন, একেকজনের থুতনী নীচু হতে হতে বুকে গিয়ে ঠেকছে।
সবাই জামার ভেতর আটকে থাকা মেডেলটা খুলে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মেডেলগুলো ফেলে দিতে গিয়ে তারা জমে গেলেন, এগুলোর গায়ে দৈববাণী জ্বলজ্বল করছে: 'ও আমার বীর সন্তান, তোমাদের চেয়ে প্রিয় আমার আর কেউই নাই।"

দুঃখ প্রকাশ:
ভোরের কাগজের অধিকাংশ লেখা নিয়ে যে বইটি 'একালের প্রলাপ' ছাপা হয় ওখানে 'বীরশ্রেষ্ঠ' নামের এই লেখাটিতে স্কোয়াডন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ রুহুল আমীন ছাপা হয়েছে। যা হবে, ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার মোহাম্মদ রুহুল আমীন। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের কারণে দুঃখ প্রকাশ করি।