Thursday, August 21, 2008

ভূত দিবস:


বুকিন ঘুমাচ্ছে।
মাঝরাতে ওর ঘুম ভাঙ্গানো হলো। অবশ্য এ জন্য অনেক কায়দা-কানুন করতে হয়েছে। বুকিনের ছোট্ট খাটটা অনেকক্ষণ ধরে বেদম ঝাঁকানো হলো। পর্যায়ক্রমে ফোস্কা পড়া গরম, বরফ ঠান্ডা বাতাস, কান ফাটানো শব্দে ওর ঘরটা ভরে গেল। এত কাঠখড় পুড়িয়েও ফল মিললো না দেখে বুকিনের ছোট্ট খাটটা উল্টে ফেলা হলো।

অবশেষে বুকিন চোখ মেলে বিকট হাই তুলল, অবিকল টারজানের মতো শোনাল। ঘুমঘুম চোখে দেখল, অদ্ভুত এক অবয়ব। আকৃতিটা অনেকটা কঙ্কালের মতো। আশ্চর্য, আকৃতিটার মুন্ডু নেই! না আছে, মুন্ডুটা হেলমটের মতো বগলে চেপে রেখেছে!
বুকিন অসম্ভব বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কি জিনিস তুমি?’
আকৃতিটা অবাক হলো, এ আবার কেমন প্রশ্ন? কি জিনিস তুমি, সে কি জিনিস, আলু-পটল? বাচ্চাটা ভয়ে আধমরা হয়ে মুর্ছা যাওয়ার আগে বলবে, ক্কে-কে, কে আপনি, তা না...আবার জিগায় কি জিনিস তুমি!
‘আমি রাগী ভূত,’ বলল, আকৃতিটা চিবিয়ে চিবিয়ে।
বুকিন ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘বলার ভঙ্গিটা আরও রপ্ত করতে হবে তোমায়, একদম মানাচ্ছেনা। আর ফড়ফড় করবে না। ভূত বললেই হয়, তা না রাগী ভূত, এইসব কী! মানুষ হলে বলতে পারতে আমি ডক্টর অমুক তমুক। তুমি তো আর মানুষ না, ভূত। অবশ্য তুমি যে ফাজিল টাইপের ভূত এতে আমার আমার কোন সন্দেহ নাই। ভূত, হেহ! ছাগল-ছাগল, ছাগল না হলে কেউ অযথা গভীর রাতে কারো ঘুম ভাঙ্গায়! আমি ডিস্টার্ব হইলাম, বড়ো ডিস্টার্ব হইলাম । হুশ-হুশ!’

ভূত স্তম্ভিত । ওর ধারণা ছিল ওকে দেখামাত্র পুঁচকে ছেলেটা বিছানা ভাসিয়ে ফেলবে। মুন্ডুটা হেলমেটের মতো কোমরের কাছে কায়দা করে ধরে রাখতে কতো অনুশীলনই না করতে হয়েছে। গুড লর্ড, এইসব হচ্ছেটা কী! ও কী কুত্তা- একবার না, দুইবার হুশ বলল! ভূতদের মান-সম্মান বলে কিছুই রইল না। অপমানে মরে যেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু ভূতদের তো আবার দ্বিতীয়বার মরে যাওয়ার কোন নিয়ম নাই।
ভূত রাগী গলায় বলল, ‘অযথা ঘুম ভাঙ্গিয়ে রসিকতা করব- আমি কি গোপাল ভাঁড়, নাকি মি. বীন, না টেলি সামাদ! ব্যাপারটা খুবই জরুরী। আজ আমাদের ভূত দিবস।’

বুকিনের দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। এপাশ ওপাশ ঢুলতে ঢুলতে বলল, ‘ভাত দিবস, বেশ-বেশ। আমরা করছি ফাস্ট ফুড দিবস আর তোমরা করছ ভাত দিবস, মন্দ না! কিন' ব্রাদার, ভাত খেয়েও তোমার শরীরে দেখি এক ছটাক মাংসও নাই, বিষয়টা কী!’
‘খোকা, আমি একজন বয়স্ক ভূত। আমার সঙ্গে তোমার আচরণ দেখে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে আমি বলছি ভূত দিবস আর তুমি কিনা-’ এই মুহুর্তে ভূতটাকে দেখে মনে হচ্ছে কাঁদার উপায় থাকলে এ নির্ঘাত ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলত। কিন্তু কাঁদার জন্য এর চোখ তো দূরের কথা, চোখের মনিই নাই!
বুকিন এবার কোমল গলায় বলল, ‘সরি, তোমার, মানে আপনার কথা ঠিক শুনতে পাইনি। ভূতদের আবার দিবস-টিবস আছে নাকি?’
ভূত রাগে গসগস করে বলল, ‘হোয়াই, হতে পারে না কেন! তোমরা গাছ দিবস, পশু দিবস, ভাল্লুক না কি যেন ভালুবাসা দিবস, লাখ লাখ দিবস করো আর আমরা বছরে একটা দিবস, ভূত দিবস করতে পারব না, এটা কেমন বিচার!’
বুকিনের গলায় উষ্মা, ‘আহা ওভাবে বলবেন না, গাছ দিবস না, আমরা বৃক্ষ রোপন দিবস পালন করি।’
ভূত বলল, ‘হাতির ডিম।’
বুকিনের বিভ্রান্ত চোখ, ‘মানে!’
‘আমরা ভূতরা তাচ্ছিল্য করে ঘোড়ার ডিম না বলে হাতির ডিম বলি। যা বলছিলাম, একটা গাছ লাগাতে লাখ খানেক টাকা খরচ করো। অনুষ্ঠান শেষ হলে নার্সারী থেকে ভাড়া করে আনা ক্রিসমাস ট্রিগুলো নার্সারীর লোকজনরা উপড়ে নিয়ে যায়। হাহ!’
বুকিন উষ্ণ হয়ে বলল, ‘আপনি ভূত বলেই খারাপটা দেখছেন। জানেন, গাছ না লাগালে কি হবে, পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মানুষ মরে সাফ হয়ে যাবে।’
ভূত হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলল, ‘পৃথিবীতে মানুষ না থাকলেই আমরা ভূতরা মজা করে থাকব। মানুষ বড়ো যন্ত্রণা করে। একে একে সব গাছ কেটে ফেলছে। ভাবো দেখি, আমরা গেছো ভূতরা যাবোটা কোথায়! গাছের চেয়ে ভূতের সংখ্যা বেশি। আমার গাছটা কেটে ফেলার পর এক বছর ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরেছি। গাছ দখলে চ্যাংড়া ভূতদের সঙ্গে কি আমি পারি, বুড়া হয়েছি না, গেটিং ওল্ড!’
বুকিন ছলছল চোখে বলল, ‘আহা-আহা, আপনার থাকার জায়গা নাই।’
ভূত মুন্ডুবিহীন ধড় নাড়িয়ে বলল, ‘না-না, ক-দিন হলো থাকার সমস্যার সমাধান হয়েছে। সার্ক ফোয়ারা দেখেছ তো। ওটা দেখতে অনেকটা গাছের কঙ্কালের মতো। আমার বড়ো মনপসন্দ হইছে। তাছাড়া কয়েক কোটি টাকার গাছ। হাক্কু, হাক্কু, হাক্কু!’
হাড়ে খটখট শব্দ তুলে ভূতটা হাক্কু, হাক্কু হাসতে গিয়ে মুন্ডুটা গড়িয়ে গেল।
বুকিন চোখ বড় বড় করে বলল, ‘আলাদা মুন্ডুটা হাতে নিয়ে রাখেন কেন?’
‘শরীরের একটা অংশ ফেলতে মায়া লাগে। তাছাড়া খুব বিষণ্ন বোধ করলে এটা দিয়ে লাউয়ের জুস না খেয়ে এটা দিয়ে ফুটবল খেলি।’
বুকিন অবাক হলো, ‘একা-একা?’
‘হুঁ।’
বুকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আহা, আপনার বড়ো কষ্ট! আচ্ছা ভূত দিবস কী?’
‘এইদিন আমরা মানুষের ক্ষতি-টতি করি। ভয় দেখাই। এই ধরো কারও প্রিয় কোন জিনিস ফেলে তাকে দুঃখ দেয়া। সরি, আমি তোমার খেলনাগুলো বাইরে ফেলে দিয়েছি।’

বুকিন চুপ করে রইল, খানিক পর ঠোঁট উল্টে বলল, ‘বেশ করেছেন। যেসব বাচ্চাদের খেলনা নেই ওরা কুড়িয়ে নেবে। জানেন, আমার না ইচ্ছা করে ওদের কিছু খেলনা দেই। আমার কত্তো খেলনা। কিন্তু মা’র জন্য পারি না। খুব কষ্ট হয়। এখন আমার মন খুব খারাপ হয়েছে।’
ভূতটা এক পাক নেচে বলল, ‘আচ্ছা বুকিন, তোমায় একটা গান শুনাই, তোমার মন ভালো হবে:
‘হে-হে-এ। আমি একটা বৃদ্ধ ভূত,
বুকিনের সঙ্গে খেলি কুত কুত ।
হে-হে-এ, হে- হে- এ- এ-এ।’
বুকিনের মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে ওর চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। কী এক বিচিত্র ভঙ্গিতে ততোধিক বিচিত্র গান গেয়ে বুকিনের মন ভাল করার চেষ্টা করছে। আহা, ভূতটার মনে কী মায়াই না গো!
বুকিন থেমে থেমে বলল, ‘আচ্ছা, মরে গেলে আমিও কি আপনার মত ভূত হবো?’
ভূতটা হাহাকার করে উঠল, ‘না-না-না, বুকিন না, গড ব্লেস য়্যু। তুমি কেন ভূত হবে, অসৎ- দূর্নীতিবাজ মানুষরা মরে গেলেই কেবল ভূত হয়।’
‘আপনি কি দূর্নীতিবাজ ছিলেন?’
ভূত ভাঙ্গা গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। জীবিত থাকতে আমি দেদারসে ঘুষ খেতাম।’
‘ঘুষ কি?’
‘থাকগে এতো জেনে তোমার কাজ নেই। এসব বড়দের ব্যাপার। কুত্সিত ব্যাপার।’
বুকিন বলল, ‘বলেন না, প্লিজ।’
ভূত নিশ্চুপ।
বুকিন অসহিষ্ণু, ‘না না, চুপ করে থাকবেন না, বলতে হবে।’
ভূত অনেকক্ষণ চুপ থেকে থেমে থেমে বলল, ‘এটা তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করো। বিদায়। ভাল থেক, এই রকমই, পানির মতো টলটলে। আর বুকিন তোমাকে এ কথাটা বলতে বুকটা ফেটে যাচ্ছে খুব শিগগির তোমার বাবার সঙ্গে আমার দেখা হবে, তারও একটা গাছের প্রয়োজন হবে!’

* 'একালের প্রলাপ' বই থেকে