Sunday, June 29, 2008

নব্য মুক্তিযোদ্ধা বনাম নব্য রাজাকার।

মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে হৃদপিন্ড- সবিরাম না, অবিরাম ধুকধুক করবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ থাকাটা অতীব জরুরি কিন্তু এই আবেগ যখন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় তখন আবেগে ছাপাছাপি মস্তিষ্ক যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। ক্রমশ মস্তিষ্ক এবং ...দ্বারের তফাত কমে আসে। তখন ওই মানুষটা পরিণত হয় গলাবাজ, গালিবাজ একটা মানুষে, তখন তার লেবেল কোন পর্যায়ে নেমে আসে এটা থাকে তার বোধগম্যের বাইরে। অনেকটা বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত একটা ফার্নিচার।

ওয়েব-সাইটে এই বিষয়টার ছাপ প্রবল। ‘বাংলার ওয়েবাকাশ রাখিব রাজাকারমুক্ত’। অনেককে দেখেছি, পড়াশোনার প্রয়োজন নাই, জেনে না জেনে অযথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লাফালাফি। ছাদে মাথা ঠুকে যাওয়ার দশা!
এমনিতে কারও যদি এমন মনে হয়, মাঠ কাঁপাবার সহজ উপায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলাম ধর্ম তাইলে বলার কিছুই নাই।
কিন্তু গোলাম আজম যে এ দেশের নাগরিক, মান্যবর আপনারা এটা কি ভুলে যান? বাহ্যদৃষ্টিতে নাগরিক অধিকারে ড, ইউনুস আর গো আজমের মধ্যে তফাতটা কী? সরকার দু-জনেরই নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য।

অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও আজ পর্যন্ত একজন গোলাম আজমকে (Link) যুদ্ধাপরাধি বলে ১দিনের জন্য শাস্তি দেয়া যায়নি। কেন যায়নি? সামান্য মুরগি চুরি করলে এর জন্য শাস্তি পেতে হয় অথচ ভয়াবহসব অন্যায় করেও একজন মানুষ পার পেয়ে যায় কেমন করে? তখন বিচারের বাণী কার কাছে কাঁদে? বিচিত্র এ দেশ, প্রমাণ থাকার পরও একজন অন্যায় করে পার পেয়ে যায়, এই দেশের জন্য যার বিন্দুমাত্র দরদ-আবেগ নাই তাইলে এই দেশের নাগরিক হওয়ার এত লালচ কেন? কেন আপনি, আপনারা এই দেশ আঁকড়ে পড়ে থাকতে চাইছেন? গো আজমের এই দেশের প্রতি অন্যায় বক্তব্যগুলো (Link) ৩৭ বছর কেন ৩৭০ বছরেও মুছে ফেলা যাবে না- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না।


এমনিতে প্রবাসিরা আরও এককাঠি সরেস। স্যাররা বৈদেশে বসে যেসব ওহী নাজিল করেন তা অতুলনীয়। ব্যাটল-ফিল্ডে থাকা আর নিরাপদ দূরত্বে বসে যুদ্ধের ছবি দেখায় যে যোজন তফাত তা এদের কে বোঝাবে! দেশ থেকে হাজার হাজার মাইলে দূরে থেকে ধর্ম নিয়ে লম্বা লম্বা বাতচিত করা সহজ বটে। আহা, এই লম্বা বাতচিত পাড়ার কোন মসজিদে জুম্মার নামাজে করে দেখুন না, সযতনে রাখা আপনাদের ২টা বলস জায়গায় আছে কিনা, পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেবে?
আপনারা অবলীলায় বলতে পারেন বটে রাজাকার ভাবাপন্ন কারও ছায়া মাড়াব না। আফসোস, আমাদের সে উপায় নেই। ট্রেন ছাড়ার পূর্বে যাত্রীদের লিস্ট চেক করা সম্ভব হয়ে উঠে না, যে যাত্রীদের মধ্যে কেউ রাজাকার ভাবাপন্ন আছে কি না?

এমনিতে কেউ কেউ রাজাকার, কাচ্চা-বাচ্চা রাজাকার, ছানাপোনা রাজাকারের প্রকাশ্যে কোতলে বদ্ধপরিকর। ৯২ সালে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের চেয়ারম্যান মওলানা শামসুল হক জেহাদী বলেছিলেন, "গোলাম আজমসহ ৩০ লাখ জামাত-শিবির কর্মীকে জনসমক্ষে কতল করতে হবে"(ভোরের কাগজ, ৩০/১১/৯২)।
এমন মানুষের হাতে এই দেশ পরিচালনার ভার থাকলে দেশের গতি কী হবে এটা ভেবে শিউরে উঠি! যেমন শিউরে উঠি বানরের হাতে ক্ষুর থাকলে!
বেশ-বেশ, তর্কের খাতিরে না-হয় মেনেই নিলাম। ওহে
নির্বোধ মহোদয়, এত বিপুল রক্ত কোথায়, কোন সাগরে ফেলা হবে তা ঠিক করেছেন কি? ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার পর অন্তত ৩ কোটি মানুষ যে মারা যাবে মড়ক লেগে এতে সন্দেহ আছে কী! রাস্তায় হাঁটাহাঁটি তো আর বন্ধ রাখা যাবে না।
নব্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়াটা মনে হয় একটা ফ্যাশানের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিশেষ বিশেষ দিনে ঘটা করে অনুষ্ঠান করে চোখের জল নাকের জল মিশিয়ে ফেলা আর অহেতুক গলাবাজি-গালিবাজি করা। বাংলার ব্লগাকাশ রাখিব নব্য রাজাকারমুক্ত।

একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলাগাড়ি চালান, এতে আমাদের কোন লাজ নাই, দায় নাই? হায়, কোথায় ১০বছরের মুক্তিযোদ্ধা লালু (Link) , কে রাখে তাঁর খোঁজ? ক-বছর পূর্বে জানা গেল তিনি মিরপুরে রাস্তায় একটা চা’র দোকান চালান। আজ তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চই এতদিনে উন্নতি হয়েছ, নির্ঘাত হাত পেতে ভিক্ষা করছেন।

আমরা বিস্মৃত হই ভাগীরথীর (Link) কথা। এদের নিয়ে জানার অবকাশ কই? আমরা তো বড় হয়েছি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অবদানের কথা জেনে। কে কোন তেলের ড্রামে উঠে কোন ঘোষণা দিয়েছেন, এইসব। বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই, কেন? এই প্রশ্ন রাজাকার হওয়ার ভয়ে কে উত্থাপন করবে?

আমাদের দেশে ক-টা শহীদ মিনার বা ক-টা কালভার্ট, সেতুর নামকরণ হয়েছে বীরাঙ্গনার নামে। বীরাঙ্গনা রিনা (Link) এই প্রজন্মের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে নিতলে হারিয়ে যাবেন, খোঁজ করার সময় কই আমাদের? সুরুজ মিয়া (Link) যে আমাদের মুখে জুতা মেরে চলে গেলেন। আমাদের গালে এই জুতার দাগ কী শুকিয়ে গেছে?

এবার আসি নব্য রাজাকারদের কথায়। কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলল বা খানিকটা সন্দেহ পোষণ করল, ব্যস আর যায় কোথায়! তাকে অবলীলায় রাজাকার ঘোষণা দিয়ে গায়ে রাজাকারের তকমা এঁটে দেয়া হলো। খেলা থেকে বাদ।
ইশশ, অতীতে যেন আমরা এই প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মালকোচা মেরে দুর্দান্ত কাজ করেছি আর কী! বিভিন্ন সময়ে, ক্ষমতাবাজদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধের অকাট্য সত্যের অবিরাম ধর্ষণ ব্যতীত আর দিয়েছি কী!

আর এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়বে কি ঘন্টা! মাশাল্লাহ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলোর যে লাগামছাড়া মূল্য! শালার দেশ, মদের জন্য ছাড় আছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের জন্য কোন ছাড় নাই! বলিহারি আমাদের বুদ্ধির ঢেঁকিরা, কাউকে দেখলাম না মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের দাম কমাবার জন্য আদাজল খেয়ে লাগতে।
টাকার বস্তায় শুয়ে থাকা মান্যবর হুমায়ূন আহমেদ, তিনি প্রকাশককে যদি বলেন চিনি (পদ্ধতিটা আমি বলব না, যার দায় সে খুজেঁ নিক) কালেক্ট করার জন্য তার পেছন পেছন পট নিয়ে ঘুরতে, অনেক প্রকাশক বিমলানন্দে রাজি হবেন। মহিষের দুধের দইয়ের ভাঁড় নিয়ে হাজির হতে পারলে, খানিকটা কষ্ট করে ছেঁকে চিনি বের করতে পারবেন না, এও কি বিশ্বাসযোগ্য?
তো, এই হুমায়ূন আহমেদেরও মুক্তিযুদ্ধের একটা বইয়ের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এই প্রজন্মের অনেকের পক্ষে (ঘুষখোর, দু-নম্বরির সন্তান ব্যতীত) চট করে ৪০০ টাকা দিয়ে একটা বই কেনার কথা ভাবা যায়! অথচ এই বই নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কী কান্না- চোখের জলে ভেসে যায় কপাল! হায়, গায়ে যে তার লোভের ছাল!

যাক গে, যা বলছিলাম, ইচ্ছা হল দুম করে কাউকে রাজাকার বলে দিলাম। ওহে নব্য মুক্তিযোদ্ধা , ওদের রাজাকার না বলে রাজাকার ভাবাপন্ন বলুন, নইলে নব্য রাজাকার বলুন। এই প্রজম্মের রাজাকার হওয়ার সুযোগ কই- বয়সে কুলাবে না!

পাশাপাশি জামাত-ই-ইসলামির যে উদাত্ত আহ্বান, আহা, গলা কী সুললিত-মধুর! জামাত ফ্রি-ফাও দিচ্ছে ধর্মের চিনির প্রলেপ। এদের খপ্পরে না পড়ে উপায় কী- কিই বা বয়স এদের? মগজ ধোলাই করার আদর্শ সময়।
পাশাপাশি আমরা কঠিন হাতে এদের দূরে ঠেলে দিচ্ছি। রোপণ করছি একেকটা বিষবৃক্ষ। তাকে শেখানো হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ একটা গন্ডগোল, তখন গুটিকয়েক লোক, বিধর্মীর মৃত্যু হয়েছিল।
হাবিজাবি প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাবে এ তো বিচিত্র কিছু না। কোন ফোরামে এই খটকা নিয়ে আলাপ সে করতেই পারে, রে রে করে তেড়ে আসার কোন কারণ দেখি না। আমাদের করণীয় হচ্ছে সঠিক তথ্য দিয়ে তার ধোলাইকৃত মগজে আঁচড় কাটা। আমরা নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের এত সময় কই!
একমাত্র একজন নিষ্ঠুর, নির্বোধই একজন ড্রাগ এডিক্টকে দূরে সরিয়ে দেবে, তাকে চিকিত্সা করাবার বা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে না।