Friday, June 20, 2008

একরত্মের আলাপ এবং আমার প্রলাপ।

কী কপাল, অন্য কারণে গুগলে সার্চ দিয়েছিলাম। লেখাটা পেয়ে গেলাম, আমাকে নিয়ে। এমন লেখা পড়লে কান-টান লাল হয়ে যায়। আমার মত পোকামানবকে মানুষমানব বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা, মমতায় অন্ধ হলে যা হয় আর কী!
বছরখানেক আগে 'ত্রিরত্ম' একদা ঘুরতে ঘুরতে আমার এখানে এসেছিলেন। ‍‌"ত্রিরত্মের আখাবিহার"। এই নিয়ে এক রত্ম ইতিহাস লিখে ফেলেছেন [১] । অরি আল্লা, কেউ কেউ এত অল্পতে মুগ্ধ হয়!


দীর্ঘ সময় ধরে আমার ব্যক্তিগত কারণে ভারী বিমর্ষ থাকি, লেখাটা পড়ে অজান্তেই মন ভাল হয়ে গেল। দুম করে অনেকগুলো স্মৃতি ফিরে এল। আশ্চর্য, ১ বছর চলে গেছে, না? কি জানি, টেরটিও পাইনি। হায় সময়!
ওই লেখায় মন্তব্য ইচ্ছা করেই করিনি, এখানে করছি। ওই পোস্টে যেভাবে বাড়িয়ে লেখা হয়েছে, আমার লজ্জা করে না বুঝি!
তবে সবিনয়ে এও বলি, কিছু-কিছু বিষয় পাবলিক ফোরামে শেয়ার করা সমীচীন না। কিন্তু এতে আমি কিছু মনে করিনি কারণ এর পেছনে আছে মমতায় মাখামাখি হাত, মমতায় বাড়ানো হাতের নোখের দিকে তাকাতে নেই যে।


অসাধারণরা তীব্র আনন্দ উপভোগ করেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে, আমি অতি সাধারণ বলেই তুচ্ছসব আনন্দ-বেদনায় কাবু হই। যেমন মনটা কী তরলই হয়ে গিয়েছিল এই লেখাটা পড়ে! কেবলই কী ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ, নাকি নিজের সম্বন্ধে ভাল ভাল কথার লোভ? উঁহু...।
আজ আমার কঠিন সময়ে ঘোলাটে হয়ে আসা চোখটা কেমন ঝকঝকে হয়ে উঠে। মানুষের উপর, এমনকি নিজের উপর থেকে হারিয়ে ফেলা বিশ্বাস খানিকটা ফিরে আসে। এক্ষণ এই বাড়ানো হাতটাও কী কম?
তবে আজ একটা কঠিন সত্য বলি, আমরা বড্ডো নাগরিক, শখের বশে ফুল তো কিনি কিন্তু এই ফুলের উত্স বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি না। চকচকে শার্ট গায়ে দেই কিন্তু বোতাম কয়টা বলতে পারি না, কেননা এর প্রয়োজন বোধ করি না, শার্ট গায়ে দেয়া নিয়ে কথা। আমরা লম্বা লম্বা বাতচিত করি, হাতি-ঘোড়া মারি কিন্ত হাতের রেখাটা ভাল করে চিনি না। ...। এই প্রসঙ্গ থাকুক...।

লেখাটায় কিছু বিষয় ঠিক না। বাথরুমের দরোজায় গোআ'র ছবি ছিল না। বাথরুমের দরোজায় ছিল আমেরিকা এবং ব্রিটেনের ছোট্ট পতাকা আড়াআড়ি করে লাগানো। আমার কাছে যখন কেউ জানতে চাইত, খাস দেশি ভাষায় আপনার টাট্টিখানা বা লেট্রিন, বাথরুম বা বৈদেশের ভাষায় রেস্টরুম কোথায়? আমি হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলতাম, আমেরিকা এবং ব্রিটেন যেখানে কুপরামর্শ করছে, ওটাই। আমার এমন কু-ভাবনার উত্স কী? কোন নিতল থেকে উঠে আসে এমন অসভ্য কল্পনা? তাই মনে হয় বুঝি! প্যালেস্টাইনি সেই শিশুদের মুখ আমি এখনো বিস্মৃত হইনি। ফুটফুটে মেয়েটা মরে পড়ে আছে বাতিল পুতুলের মত। শিশুর লাশ নিয়ে বাবার সেই অমানুষিক, জান্তব চিত্কার। রাইস বসে বসে পিয়ানো বাজায়, তার বাজনা শুনে রথি-মহারথিরা মাথা নাড়ে। কে জানে, ঈশ্বরও বাজনাটা উপভোগ করছিলেন কিনা?
খোদার কসম, তখন আমার নিজেকে পাগল-পাগল লাগত, মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, স্বেচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত, আমি ওই মুহূর্তে মৃত্যু কামনা করতাম। আকাশপানে তাকিয়ে বিড়বিড় করতাম। আকাশলোকের বাসিন্দার আমার এই বিড়বিড়ানি শোনার সময় কই! আমি নপুংসকের, এমন অসভ্য চিন্তা করা ব্যতীত কিই-বা করার ছিল!


আর হুমায়ূন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' বইয়ের প্রচ্ছদ? হুমায়ূন আজাদ আপনার প্রিয় লেখক বলছেন, কষ্ট পেয়েছিলেন বুঝি? আর হুমায়ূন আজাদ আমার যে অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ, অসম্ভব প্রিয়। বিচিত্রসব বিষয়ে তাঁর লেখার কী হাত, ক্ষমতা থাকলে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম। এরশাদের সময় এই দেশের তাবড়-তাবড় লেখকরা যখন তাদের কলম এরশাদের পায়ে সমর্পন করে দিয়েছিলেন ঠিক তখন হুমায়ূন আজাদ এরশাদকে নিয়ে 'পূর্বাভাষ' সাপ্তাহিকে কীসব কলাম লিখতেন! সিংহাবলোকনন্যায় না, অবিকল যেন একটা রাগি সিংহ।
অতি ভীরু আমি, লেখালেখিতে যে খানিকটা সাহস যোগাতে পেরেছি এটাও সম্ভবত তাঁর অবদান। মানুষটার প্রতি আমার ভাললাগার আর কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে, বাডি? কিন্তু এই বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, একজন মানুষ লেজার গান দিয়ে চড়ুই পাখি শিকার করছেন! হায়, ক্ষমতার কী অপচয়!
অথচ বইটার থিম চমত্কার, জঙ্গিদের সম্বন্ধে তাঁর আগাম ভাবনা তখন অবিশ্বাস্য মনে হত কিন্তু পরবর্তীতে আমরা বিপুল বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, তাঁর অনুমান কী নির্ভুল; যেখানে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বের বিভিন্ন এজেন্সি ঘুণাক্ষরে টেরটিও পায়নি। কিন্তু এই বইটার পাতার পর পাতা আরোপিত, অহেতুক চাপিয়ে দেয়া খিস্তি, এর কোন মানে আছে, বলুন? আমার ধারণা, বইটা লেখার সময় ক্রোধ তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এমন প্রবলপুরুষকে পোকার মত দেখতে ভাল লাগে না।


যাই হোক, ত্রিরত্ম যেদিন আসলেন আমি কিন্তু খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। তখন আমার মাথায় ঝুলছে বড় ধরনের বিপদ, অবশ্য এখনকার বিপর্যয়ের তুলনায় নস্যি। তো, কেবলই আমার মনে হচ্ছিল, আহারে, এত দূর থেকে এঁরা এসেছে; আমার বিমর্ষতা এরা টের পেয়ে বিব্রত না হন। এমনটা হলে নিজের চোখের দিকে তাকাতাম কেমন করে...।

সহায়ক লিংক:
১. http://www.somewhereinblog.net/blog/hariblog/28801891