Thursday, June 5, 2008

খোদেজার অংশবিশেষ

খোদেজার সকাল থেকেই মন ভাল নেই। কারণ তুচ্ছ। ওর পোষা হাসগুলো কেবল ঝিম মেরে থাকে, কাল তো একটা মরেই গেল। কি যে কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বুকটা কেমন যেন হালকা। কাল খোদেজা রাগে দুপুরে ভাতও খায়নি।
কষ্টের চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছিল বাজানের উপর। বাজানটা এমন কেন, খোদেজা ক-দিন ধরে ঝুলাঝুলি করছে হাসগুলো সদরের পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে। বাজান হেসেই উড়িয়ে দেয়: বেটিরে, তুই ফাগলি, ভাত খাইবার ভাত পাই না, সাইকেল লইয়া হাগবার যাই। তিন টেকার হাস, নয় টেকার ভ্যাজাল।
খোদেজার মোটেও ভাল লাগেনি বাজানের কথা। বাজানটা এমন নিষ্ঠুর কেন? ওর হাসগুলোর বুঝি বাজানের কাছে কোন দাম নাই! বাজান কি বুঝবে, এরা তো বাজানকে প্যাঁক প্যাঁক করে ঘিরে ধরে না। হাসের বাচ্ছাগুলো আগের মতো আর নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে না। ঘোলাটে চোখ নিয়ে কেবল ঝিমায় আর ঝিমায়।

বাইরে সূর্যটার কী তেজ! মনে হয় সব পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। বাজান বলছিল এইবার ফসল ভাল হবে না। না হলেই কী, ওদের তো আর নিজস্ব জমি নাই। অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করে যে ধান পাওয়া যায় তিন মাসের মাথায় শ্যাষ। এটা বাজান শুনলে খুব করে বকা দেবেন: কি কস মাইয়্যা, আমাগো কয়ডা ধানই দেখলি; মাইনষের যে এক কুড়ি, দুই কুড়ি গোলা ধান, হের কি হইব চিন্তা কর।
যদি খোদেজা বলে বসত: মাইনষের ধান দিয়া আমাগো কাম কি, মাইনষে কি আমাগো একবেলা খাওয়াইব?
যখন বাজান খুব রেগে যান তখন খোদেজাকে নাম ধরে বলেন। তখন নিশ্চিত বলতেন: খোদেজা, একটা চড় দিয়া তোর সব দাঁত ফালাইয়া দিমু, ফাজিল কুনহানকার, তোর খাওয়াখাওয়ি বাইর কইরা দিমু। তুবা কর, আল্লার কাছে মাপ চা। অণ তুবা করবি, আমার সামনে।
তখন খোদেজা বাজানের এই চন্ডাল রাগ দেখে কাঠ হয়ে থাকত। এমনিতে বড় ঠান্ডা মানুষ, সাত চড়ে রা নাই। কিন্তু বাজান এইসব একদম সহ্য করতে পারেন না।
এমনিতে মন ভাল থাকলে খোদেজার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আমুদে গলায় বলবেন: বেটিরে, সব সুময় মনে রাখবি, আমাগো ভংশের কথা মনে রাখবি। দুনিয়াত দুই ধরনের মানু, চুর-বাটপার আর ভালা মানু। ভালা মানুর চরিত্র শ্যাষ হইলে আর হের দাম নাই। খুদাও হেরে ভালা পায় না। কব্বরের আজাব হেরে ছারখার কইরা দিব।
খোদেজা বাপের এইসব কথা সবটা মনোযোগ দিয়ে শোনে না। বুঝেই না সবটা। কতই বা বয়স ওর,ভাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়?
ওর জন্মের সময় নিয়ে বাজান বলেন: বড় ঢলডার সময় হইছিলি। চাইরদিকে আকাশ-পাতাল ঢলের পানি। তর মার গর্ভযন্ত্রণা শুরু হইল। হেরে লইয়া কই আর যামু? আমি কইলাম, সোহাগের মা, মনডারে শক্ত করো, যাগো কেউ নাই হেগো আল্লা আছে। দেখবা সব ঠিক হয়া যাইব। তুই যখন চিক্কুর দিলি বাইরে ঘুটঘুইট্যা আন্ধার, ঘরে আন্ধার। তোর মা সুমানে চিল্লাইতাছে: সোহাগের বাপ, ঘর আন্ধার থাউন ভালা না। বাচ্চাটার অমঙ্গল হইব। বাত্যি দেও। হুন দেহি তোর মার কতা, বাইত নাই এককিনি কেরাসিন, বাত্যি জালামু কইত্থন?

আহা, বাজানের আদরের সোহাগ। খোদেজা মন খারাপ করা শ্বাস ফেলে। ওর ভাইটাকে দেখেছে কবে মনেও করতে পারছে না। কেবল মনে আছে যেইবার খুব শিলাবৃষ্টি হল, আকাশ থেকে হুড়মুড় করে পড়া শিলা দু-জন মিলে জমাল, তার পরই সোহাগ ভাইজান চলে গেল।
খোদেজা, বাড়ির সবার কী কান্না। বাজান গামছা দিয়ে চোখ ডলছিলেন আর ভাঙ্গা গলায় একটু পরপর ধমক দিচ্ছিলেন: সবাই আল্লারে ডাকো, মন শান্ত হইব। আমার বেটা শহরে ভালা থাকব, ভালা খাইব, ডাঙ্গর হইব। আমরা ঘুরতাম যামু। আমার বেটা ঢাহা শহর ঘুরাইয়া দেহাইব।
ইশ, খোদেজা বুঝি মাকে বলা কথাগুলো শোনেনি! বাজান নিচুস্বরে যে বলছিলেন: সোহাগের মা, খিদার কষ্ট বড় কষ্ট। আমার পুলাটারে ঠিকমতন খাওন দিতাম ফারি না। আল্লা ভরসা, দেখবা সংসারের অভাব আর থাকব না। তুমি রাজরানি হয়া সুখ করবা।
মা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিলেন: পিছা মারি এমুন রাজরানির মুখে। আমার তেনাই ভালা, পুলার টেকায় আমার ভালা কাপড় পিন্দনের কাম নাই। অ সোহাগের বাপ, তুমি আমার বুক খালি কইরা দিয়ো না, তুমার দুইটা পায়ে পড়ি। আমার এমন অনিষ্ট কইরো না, তুমার আল্লার দুহাই লাগে।

খোদেজা ভাল লাগছে না, কিচ্ছু ভাল্লাগছে না। ইচ্ছা করছে ছনের ঘরটায় আগুন ধরিয়ে দিতে। পায়ে কিসে যেন ঠোকর দিতে ও লাফিয়ে উঠে খিলখিল করে হেসে ফেলল। অমা, এইটা দেখি চিনি। খোদাজার হাসের বাচ্চাগুলোর আলাদা আলাদা নাম আছে। নামগুলোও অদ্ভুত। কোনটার নাম চিনি কোনটার লবন। এ নিয়ে সবার কী হাসাহাসি! আসলে নাকি এদের নামের কোন গুরুত্ব নাই, সব হাসের বাচ্চাই নাকি একরকম। ইশ, রঙ্গ করলেই হল, বললেই হল! এরা দাগ দিয়া রাখুক না। চিনিকে ডাকলে চিনিই আসবে। ঠিক না হলে পিঠে দুমাদ্দুম করে দুই কুড়ি কিল বাজি।
খোদেজা গলা দিয়ে বিচিত্র শব্দ বের করছে তই তইই তইইই। জট পাকানো চুলগুলো ঝাঁকিয়ে বলল, কিরে চিনি, ঠুক্কুর দিলি ক্যা, আমি বুঝি দুক্কু পাই না।
সরলদৃষ্টিতে চিনি নামের হাসের বাচ্চাটিকে কেউ কিছু বলতে শোনেনি কিন্তু খোদেজার নাকি বুঝতে কখনই সমস্যা হয় না। খোদেজা নিচুস্বরে বলল, কি কইলি খেলা করস, একটা আছাড় দিয়া পেডা গাইল্যা ফালামু। তহন বুঝবি নে মজা। অমা, আমাগো লবন বিবির কি হইছে, রাগ হইছে, চিনির লগে কতা কইছি দেইখ্যা। তোর পেটটা ভরা হিংসা। আয় কাছে আয়, অই-অইত, বেশি ভংচং করিস না তাইলে কিন্তু তোর লগে কথা কমু না। তোরে কাউয়া ঠুকুর দিলেও ফিরা চামু না।
খোদেজা একমনে এদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যায় আবার এটাও লক্ষ রাখে কেউ দেখে না ফেলে, তাইলে লজ্জার একশেষ! এমনিতেই হাসদের সঙ্গে এইসব কথা চালাচালি নিয়ে ওকে সবাই খেপায়। আর হাসগুলোও বজ্জাত কম না, এমনিতে কী ফড়ফড় করে কথা বলে, অন্য কাউকে দেখলেই চুপ। এই বজ্জাতগুলো ইচ্ছা করে ওকে অপদস্ত করে। একদিন তো খোদেজা রাগ করে এদেরকে খাবার পর্যন্ত দেয়নি। পায়ের কাছে কেমন ঘুরঘুর করে, রাগ করে থাকা যায় বুঝি!
রাগ ভুলে খোদেজা চোখ পাকিয়ে বলে, আর যুদি একটারেও মরতে দেহি এমুন মাইর দিমু। আইচ্ছা আয়, কয়ডা শামুক খুঁইজা দেই।

শামুক খুঁজতে গিয়ে রাস্তায় বড়ই গাছের টসটসে বড়ই ঝুলতে দেখে খোদাজের জিভে পানি চলে এল। হাতটা কেমন নিশপিশ করছে, কখন ঢিল ছুঁড়েছে বলতেও পারবে না। দূর থেকে কে যেন তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, আইল্যা বাড়ি জাইল্যা বাড়ি, বড়ি পাইরা লাইল্য, লাইল্য। খোদাজা ঝেড়ে দৌড় দিল, থামল গিয়ে বিলের পারে। খোদেজা রেল লাইনের বিলটায় সাবধানে নামে। আনন্দে বিড়বিড় করে, আল্লাগো পানি কী ঠান্ডা! শামুক খোঁজার কথা ভুলে যায়। আচ্ছা করে দাপাতে থাকে।
ওই মায়া, দিলি তো ভিজায়া।
নিমিষেই খোদেজার দাপাদাপিতে ভাটা পড়ে। হায়-হায়, এ দেখি ওদের গ্রামের শফিক ভাই। কী শরমের কথা, ওর কারণে শফিক ভাইয়ের উপর পানির ছিটা পড়েছে। কিন্তু ও যখন পানিতে নামল তখন কি শফিক ভাই এখানে ছিল? থাকলে তো দেখার কথা।
খোদেজা জিভে কামড় দিয়ে বলল, মাফ কইরা দেও শফিক ভাই, আমি দেহি নাই।
শফিক মুখে বলল, চোউককানি, যাঃ তোরে মাফ কইরা দিলাম।
মুখে কথাগুলো বলছে ঠিকই কিন্তু মানুষটার ভঙ্গিতে কি যেন একটা অসঙ্গতি আছে। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে খোদেজার ভেজা কাপড়, ভেজা অপুষ্ট শরীরে। এই দৃষ্টি খোদেজার কাছে দুর্বোধ্য কিন্তু কেন জানি শফিক নামের মানুষটাকে ওর ভয় করছে। মানুষটা কেমন বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। নাক দিয়ে কিছু একটা শোঁকার চেষ্টা করছে।
শফিক ভাই, এমন করতাছেন ক্যান? হুংগেন কিতা, মনে হইতাছে গুয়ের গন্ধ পাইতাছেন?
শফিকের আরও এগিয়ে এসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে জড়ানো গলায় বলল, হ, গুয়ের গন্ধই। এই গন্ধেই আমার মাথা খারাপ হয়া যাইতাছে।
খোদেজার কিছুই মাথায় আসছে না। এই লোকটা এখন একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর শরীর থেকে তামুকের বোটকা গন্ধ ছাড়াও কেমন একটা অজানা গন্ধ মিশেছে। গন্ধটা খোদেজার সহ্য হচ্ছে না।
শফিকের কোমল গলা, লক্ষী মাইয়া, কিতা করতাছ এইখানে। ডুবাইতে আইছ? একলা একলা ডুইবা যাইবা তো। আইও, একলগে ডুবাই। দেইখো, খুব মজা হইব।
খোদেজার মুখের কথা মুখেই থেকে যায়। লোকটা ওকে সমস্ত শরীর দিয়ে আটকে ফেলেছে। মুখ দিয়ে কেমন বিচিত্র শব্দ বের হচ্ছে।
খোদেজা বিস্মিত হতেও ভুলে গেছে। লোকটার আচরণ ওর কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। সম্বিত ফিরল ট্রেনের হুইসেলের শব্দে। ট্রেনটা কাছের ব্রীজটায় কোন কারণে গতি কমিয়ে দিয়েছে।
শফিক নিমিষেই খোদেজাকে ছেড়ে নিরাপদ দূরুত্বে সরে এসে পশুর আক্রোশে ড্রাইভারকে গাল দিচ্ছে, চুতমারানির পোলা, খানকি বেডির পোলা...।
খোদেজার মাথায় ঢুকছে না। ট্রেনের ড্রাইভার এর কী ক্ষতি করল! এত ভাবাভাবি না করে খোদেজা রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে।