Search

Loading...

Friday, July 6, 2007

মুক্তিযুদ্ধ এবং গোলাম আযম

“৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ এক সরকারী ঘোষণায় অধুনালুপ্ত কতিপয় রাজনৈতিক দলের ১৫ জন নেতাকে ফেরার (পলাতক) ঘোষণা করে তাদেরকে ২২শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে স্ব স্ব এলাকার মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় হয়। যাদের বিরুদ্ধে এই ঘোষণা দেয়া হলো তারা হলেন...
এর মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযম [১] ছিলেন ১২ নম্বরে।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তিদের এবং সাবেক গভর্নর ডাঃ মালেকের মন্ত্রীসভার তিনজন সদস্যের নামে যে সব স্থাবর বিষয় সম্পত্তি আছে তা এবং তাদের বেনামী বিষয় সম্পত্তি ক্রোক করে নেয়া হয়েছে।”
(দৈনিক বাংলা/ ১০ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২)

“সরকারী অপর এক নোটিফিকেশনে বলা হয়ঃ
বাংলাদেশ সরকার ৩৯ ব্যক্তিকে বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণা করেছেন। এই ৩৯ ব্যক্তি বাংলাদেশে নাগরিকত্ব পাবে না। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আদেশের (অস্থায়ী বিধান) তিন নম্বর ধারাবলে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নোটিফিকেশনে এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছেঃ
এসব ব্যক্তি বাংলাদেশ মুক্তির আগে থেকে বিদেশে অবস্থান করছিলেন। এদের আচরণ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে না এবং এরা পাকিস্তানেই অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশে নাগরিকত্ব লাভের অযোগ্য ব্যক্তিরা হলেনঃ সর্বজনাব...। এদের মধ্যে গোলাম আযম হলেন ৮ নম্বর।”
(দৈনিক বাংলা/ ২২ এপ্রিল, ১৯৭৩)

“সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল ১৮ ধরনের অপরাধী ক্ষমা পাবেন না।
(১) ১২১. বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা।
(২) ১২১ ক. বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র।
(৩) ১২৪ ক. রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
(৪) ৩০২. হত্যা ।
(৫) ৩০৪. হত্যার চেষ্টা।
(৬) ৩৬৩. অপরহণ
(৭) ৩৬৪. হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ।
(৮) ৩৬৫. আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ ।
(৯) ৩৬৮. অপহৃত ব্যক্তিকে আটক বা গুম রাখা ।
(১০) ৩৭৬. ধর্ষণ।
(১১) ৩৯২. দস্যুবৃত্তি ।
(১২) ৩৯৪. দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত ।
(১৩) ৩৯৫. ডাকাতি ।
(১৪) ৩৯৬. খুন সহ ডাকাতি ।
(১৫) ৩৯৭. হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি ।
(১৬) ৪৩৫. আগুন বা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন ।
(১৭) ৪৩৬. বাড়ীঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যর ব্যবহার ।
(১৮) ফৌজদারী দন্ডবিধির ৪৩৬ আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন অথবা এসব কাজে উৎসাহদান।
*১৮ নম্বরের অনেকগুলো উপধারা আছে।

...এবং অভিযুক্ত শান্তি বাহিনীর নেতারা ক্ষমা পাবেন না।”
(দৈনিক বাংলা/ ১৭ মে, ১৯৭৩)

গোলাম আযম তার মায়ের অসুস্থতার অজুহাতে সাময়িকভাবে (৩ মাসের ভিসায়) বাংলাদেশে আসেন এবং আর ফিরে না গিয়ে অবৈধভাবে রাজনৈতিক তত্পরতায় লিপ্ত হন।

গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রার্থনা:
১৯৭৬ সালে জিয়া সরকার কর্তৃক অনাকাঙ্খিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করা সম্পর্কে বিবেচনার আশ্বাস পেয়ে সকলেই দরখাস্ত করেন। অনেকেই বিশেষ বিবেচনায় নাগরিকত্ব ফিরে পান কিন্ত গোলাম আযমের বিষয়টি ঝুলে থাকে।

১৯৮৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক এম এ মতিন আজ জাতীয় সংসদে নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেনঃ
"ধন্যবাদ মানননীয় স্পীকার,
...জনাব, গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর পাকিস্তানে গমন করেন।
...বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তত্কালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ১৮-৪-৭৩ তারিখে (নং ৪০০/বহিঃ ৩) জারীকৃত একটি প্রজ্ঞাপন বলে তার বাংলাদেশে নাগরিকত্ব বাতিল ঘোষণা কর হয় এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়।
ইংরাজী ১৯৭৬ সনে তিনি লন্ডন থেকে তার নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট আবেদন করেন। উক্ত আবেদন নাকচ করা হয় এবং এ ব্যাপারে তাকে জানিয়েও দেয়া হয়।
১৯৭৮ সনের ১১ জুলাই জনাব গোলাম আযম পাকিস্তানী পাসপোর্টে বাংলাদেশের (৩ মাসের) ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং তখন থেকেই তিনি এ দেশে অবস্থান করছেন।
...মাননীয় স্পীকার, আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে এই পর্যায়ে এই মহান সংসদকে জানাতে চাই বর্তমানেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাকে নাগরিকত্ব ফেরত দেয়ার কোন ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত কিছুই নাই।”
(জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক এম এ মতিনের বিবৃতি) 


এত প্রমাণ থাকার পরও একজন মানুষ নাগরিকত্ব পায় কেমন করে? কাউকে নাগরিকত্ব দিলে তিনি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন এ আর বিচিত্র কী! প্রফেসর ইউনুস এবং গোলাম আযমের মধ্যে মুলত কোন তফাত নাই, দু-জনই এদেশের নাগরিক! দেশের প্রচলিত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা এঁদের দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। আসলে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ হয়ে গেছে এখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য [২]

**এই স্কেচ নামের জিনিসটা অন্য কিছু না, মনের অজান্তে কাগজে আঁকাজোঁকাকে সম্ভবত ‘ডুডল’ বলে- এটাকে সম্ভবত ডুডল বলা চলে। একদা কাঠ-পেন্সিলে ঘসাঘসির ফল।


সহায়ক সূত্র:
১. গোলাম আযম: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html
২. বিক্রয়যোগ্য পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html
* মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্যান্য লেখা: http://tinyurl.com/37wksnh


শুধু একবার আমার মাথায় হাত রেখে দিলে

মাহবুব ভাই। আপনি খুব সাধারণ (!) একজন মানুষ। আমার যে বছরে জন্ম সে বছরে আপনি এয়ারফোর্সে জয়েন করেন। আপনার সময়কার কৃতি একজন ফুটবলার।
............
আমার জীবনে যতো সব সু বা ভাল প্রত্যেকটার সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন না কোন একটা সংযোগ আছেই! আমি বারবার গর্তে পড়েছি, আপনি আমাকে টেনে তুলেছেন। আমার প্রতি অপার্থিব মমতা দেখাতে গিয়ে আপনি অন্যায় করেছেন আপনার পরিবারের প্রতি, নিজের প্রতি।

আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে, যখন ভাবি আজ আপনার এ বয়সেও প্রবাসে পড়ে থাকার পেছনে আমার দায়টাই বেশী। আচ্ছা, কয়েকটা নোংরা কাগজ দিয়ে দিলেই বুঝি আপনার এইসব ঋণ শোধ করা যায়! বাহ, বেশ তো!

আমি যখন ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ভাত খাই, নিজের বিছানায় শুই, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে ঝগড়া করি- তখন, আপনি প্রবাসে একাকী, নিঃসঙ্গ...।
আমার বুঝি ইচ্ছে করে না, ঈদে এক চামচ সেমাই আপনাকে খাওয়াই...।

প্রায়শ ভাবি, আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে কি? পিতা পুত্রের, বড়ো ভাইয়ের, বন্ধুত্বের? আমি কনফিউজড-বিভ্রান্ত! এমনিতে আপনার সামনে ধুমসে সিগারেট খাই, যা তা রসিকতা করি, পরষ্পরের সব ভাবনা শেয়ার করি!

এমন কি আমি যে টুকটাক লেখালেখি করেছি এর পেছনেও আপনার অবদানই প্রবল। ভুলে গেছেন বুঝি, কানের পাশে সেই যে অনবরত ঘেনঘেন করতেন, কিছু একটা লেখেন, কিছু একটা লেখেন। । আপনার যন্ত্রণায় এক সময় লিখতে শুরু করলাম। অথচ, আপনি আমার লেখার এক লাইনও কখনো পড়ে দেখেছেন বলে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! অনেক লেখা আমি আপনাকে উৎসর্গ করেছি- এসবে কি আসলেই আপনার কিছু যায় আসে?

আমার প্রিয় মানুষ হাসপাতালে অথচ আমি আমার লেখার বানান সংশোধন করছি, উপায় ছিল না- ছিঃ, এটা একটা জীবন হলো! এই সুতীব্র বেদনার কথাগুলো আমার সেই সময়কার লেখাগুলো যিনি পড়বেন, তিনি কখনোই জানবেন না- তাঁর জানার প্রয়োজন নেই!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই লেখাগুলো ছিল ফানি টাইপ লেখা। পরে অনেকেই বলেছেন, আপনি যে একটা ভাঁড়, এতে আমাদের আর কোন সন্দেহ নাই।

হাসপাতালে ভর্তি ওই প্রিয় মানুষটার সঙ্গে চোখ মেলাবার ক্ষমতা আমার কই? অথচ তিনি রাগারাগি করলে ভাল হতো- বড়ো বড়ো চোখের নির্বাক সেই ভঙ্গি আমি ষ্পষ্ট পড়তে পারছিলাম, আমার প্রাণের চেয়ে তোমার লেখালেখি বড়ো হলো কোন যুক্তিতে...!
ইশ্বর, ওই সময় নিরুপায় আমি, যখন বানানগুলো সংশোধন করছিলাম, আমার চোখের জলে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল- এটা বললেও কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না....।

সেই যে আপনি আমার ঘাড়ে লেখালেখির সিন্দবাদের ভূতটাকে আয়েশ করে বসিয়ে আলগোছে সরে পড়েছিলেন- এই সিন্দবাদের ভূতটাকে আমি তীব্র অনীহায়, অনিচ্ছায় দিনের পর দিন বয়ে বেড়াচ্ছি। কতোবার চেষ্টা করেছি লেখালেখির এই ভূতটাকে ঝেড়ে ফেলতে...। মাহবুব ভাই, আপনি আমার বড় ক্ষতি করে দিলেন, জীবনটাকে এলোমেলো করে দিলেন।
তবুও আমাকে যদি অপশন দেয়া হয়, আমি কি এ গ্রহের সবচে পবিত্র স্থান স্পর্শ করতে চাইবো, নাকি আপনাকে...? মাহবুব ভাই, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে আমি আপনাকে স্পর্শ করার সুযোগ বেছে নেব, বারবার।
আমার বিশ্বাস না, আমি জানি, আপনি শুধু একবার আমার মাথায় হাত রেখে দিলে, আমি পরম নিশ্চিন্তে মরতে পারবো, আই বেট...।

Thursday, July 5, 2007

কেন অন্য রকম?

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···? আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?
একই শব্দ বারবার আউড়ে যাওয়া তো ভাল কাজ নয়- পাগলের কাজকারবার। আচ্ছা, এটা কি মনোবিদদের আগ্রহের বিষয়? কে জানে, হবে হয়তো বা!
আচ্ছা, ওই মানুষটা কি প্রভাব ফেলেছে কোনো ভাবে? যে মানুষটা বারবার আউড়ে যাচ্ছিল, ‘গন্দম খায়া জোলাপ নাইমা গেছে’। সামান্য একজন হকার টাইপের মানুষের মুখে, আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ অথচ তখন মনে হচ্ছিল, উঁচুমার্গের কথা। কোনভাবে কি এটা মস্তিষ্কে প্রবল ছাপ ফেলেছে?


আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?
কই, যথারীতি সূর্যের উদয় হয়েছে, অস্তও গেছে- এমন দিনে তো বিশেষ কোন বিশেষত্ব নাই!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

মনে হয় না এমন, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হনহনিয়ে হেঁটে গেলে বেশ হতো? কই, রোদ্দুরে হাঁটা তো আমোদময় কিছু নয়!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

হয় কী ভ্রম, গাছের পাতাগুলো কী চকচকে, না? কই, শীতে তো পাতা নিষ্প্রভ, ধুসর; হায়, গেল-গেল পাতাটা যে ঝরে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

যে আজ কোথাও যাওয়া যাবে না? আহা, যেতে তো হবে কোথাও না কোথাও- নইলে শেকড় বেরিয়ে যাবে যে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

জীবনের কাছ থেকে আজ কোথাও পালানো যাবে না? হায়, দুর্বল একজন মানুষের না-পালিয়ে তো বাঁচার উপায় নেই!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

শীতার্তের জন্য সুর্য কি নেমে আসবে আধ হাত? পাগল, সুর্য বেচারার কী দায় পড়েছে! আরশের নীচ থেকে উকি না-মারলে নিভে যাবে যে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

চরম শত্রুকেও ভালবাসতে ইচ্ছা করবে? ধ্যাত, তাই কি হয় কখনো- একটাই মাত্র জীবন যে! জীবনটাকে বটি দিয়ে চাক চাক করবে কে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

হয়তো, হয়তো না···

(৩১·০১·০৭/ ১২.০১/ এলোমেলো ভাবনা।)

সত্যের মত পাজি আর নাই

আমার স্পষ্ট মনে আছে, তখন হুমায়ূন আহমেদের তুমুল জনপ্রিয় এইসব দিনরাত্রি দেখাচ্ছিল। হুমায়ূন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বললেন, আমার একটা কালার টিভি দরকার- এই টাকা হয়ে গেলেই...।
মোদ্দা কথা, ধারাবাহিকটা লিখছেন কালার টিভির প্রয়োজনে। এটা পড়ে নিমিষেই আমার বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল। কেবল মনে হচ্ছিল, মানুষটা কী মানুষ, না পিশাচ!
আজ বুঝি লেখকদের কেবল কপকপ করে জ্যোৎস্না খেয়েই দিন যায় না। এবং লেখকদের কোন অধিকার নাই তার প্রিয় মানুষদের সামান্য সাধ-আহ্লাদগুলোর জলাঞ্জলি দেয়ার।

আজ তাই আমার জানতে বাকি নাই লেখকের তুচ্ছ চাওয়া-পাওয়ার কথাটা চলে এলে একজন পাঠক কেমনটা বোধ করেন। লেখকের ধপধপে ইমেজে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যায়। মনে হয় মানুষটা কী লালচি-লোভী!
কি বলেন বাহে, হয় না, হয়?

আমাদের দেশে লেখকদের তার পাওনা-প্রাপ্যটুকু দেয়ার মনোভাব এখনও গড়ে উঠেনি। এমনকি ন্যূনতম সম্মানও। কোন পত্রিকায় লিখলে পত্রিকাওয়ালাদের ভাবখানা এমন, বাহে, এখানে যে লিখতে দিচ্ছি এই তো ঢের।
এটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না, কখনও পত্রিকার কারণে একজন লেখক দাঁড়িয়ে যান, তেমনি একটি পত্রিকাও লেখককে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

সালটা ৯২/ ৯৩। আমি তখন লিখছিলাম, এক্ষণ বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত (এদের দাবীমতে) একটি দৈনিকে। ‘একালের রূপকথা’ নামে লিখেছিলাম প্রায় দেড় বছর। ফি হপ্তা, প্রতি সপ্তাতে ১টা করে লেখা। প্রত্যেক লেখার জন্য পেতাম ৫০ টাকা করে। মাসে কত হতো, ২০০?
মজার ব্যাপার হচ্ছে টাকাটা আমাকে পাঠিয়ে দিলেই হয়। উহুঁ, সশরীরে নেয়ে আসতে হবে। হায়রে সশরীর! বডিটাকে ঢাকা পর্যন্ত নেয়াটা কী কম ঝক্কির, কম খরুচে ব্যাপার! তো, দুই তিন মাসের টাকা জমিয়ে গেলাম।
আবার সুকঠিন নিয়ম ছিল, মাসের ২১ তারিখ থেকে ২৪ তারিখে যেতে হবে। ২০ তারিখে গেলেও হবে না, আবার ২৫ আরিখ গেলেও হবে না। তো, গেলাম নির্দিষ্ট তারিখেই। হায়, তখন যদি বলা হয় ফান্ড নাই, কেমন লাগে? কি জানি কার কার কাছে ভাল লাগে- আমার নিজেকে ভিক্ষুক-ভিক্ষুক মনে হত!

আমার একবার মেজাজ খুব খারাপ হলো, রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল। ফকিরের আবার রাগ!

ওই পত্রিকার জন্যই একটা লেখা লিখলাম, ‘সহনশীল প্রাণী’ নামে। পত্রিকাওয়ালারা খুব রাগ করলেন। বিভাগীয় সম্পাদক বললেন, এইটা কি লিখেছেন? সম্পাদক সাহেব খুব রাগ করেছেন।
বিভাগীয় সম্পাদক নামের মানুষটাকে আমি পছন্দ করতাম, কথা হত খোলাখুলি। আমি বললাম, যা লিখেছি তা কি অসত্য?
বিভাগীয় সম্পাদক মিনমিন করে বললেন, তা না, কিন্তু ভাইরে সব সত্য কি আমরা বলতে পারি! আর আপনি এইসব লিখলে আপনার লেখা কি আর ছাপা হবে? ক্ষতিটা কার হবে, আপনার হবে না? তাছাড়া আপনার সমস্যাটা কি, আপনি কী টাকার জন্য চাল কিনতে পারছেন না?

আমি মনে মনে বললাম, আমার ক্ষতি হবে, কচু- আমার মতো অগাবগা না লেখলে ঘেঁচু হবে! মুখে বললাম, চাল কেনার কথা আসছে কোত্থেকে- এটা তো আলোচ্য বিষয় না! আমার প্রাপ্যটা দেয়া হবে না কেন? আচ্ছা, আপনি কি এটা বলবেন আমায়, একজন ফটো সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবি উঠান অথচ আপনারা তাঁর নামটা পর্যন্ত দেন না; পত্রিকার নাম দেন কেন, এর কোন উত্তর আপনাদের কাছে নাই। আছে?

সুখের বিষয়, দীর্ঘ ১ মাস পর লেখাটা ছাপা হয়েছিল। ওই সময়কার তীব্র আনন্দ আমার স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট। কেবল মনে হচ্ছিল মফঃস্বলের অখ্যাত একজন অলেখকের বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিজয়।


একালের প্রলাপ থেকে ‘সহনশীল প্রাণী’ লেখাটি এখানে যোগ করছি।

"সহনশীল প্রাণী...
ভূত অপ্রার্থিব গলায় বলল, ‘এই আবর্জনা লেখক, তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। ফাঁসি-টাসি না, জাস্ট একটানে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলব।’
একজন লেখক অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা, কী সীমাহীন তার ক্ষমতা। ইচ্ছে হলেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে হাসান, কাঁদান- বিষণবোধ করলে মেরে ফেলেন। কাল্পনিক সৃষ্টির মিছে স্রষ্টার এ সম্বোধন ভালো না লাগারই কথা।

লেখক রাগ চেপে বলল, ‘ভাই ভূত, আপনি সভ্য না অসভ্য দেশের ভূত?’
ভূত দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘পেটা গাইল্যা ফালামু (এটার অর্থ হবে সম্ভবত এরকম, অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে নাড়ী ভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হবে)। রাস্কেল, ইউ নো, আমার গায়ে নীল রক্ত বইছে।’

লেখক: আ বেগ য়্যু’ পার্ডন স্যার। নীল রক্ত আপনি দেখি অতি সভ্য ভূত! তা আপনি স্যার একটু ভুল বললেন এখন আপনার ধমনীতে নীল রক্ত দূরের কথা, লাল-সবুজ-সাদা কোনো রক্তই এক ফোঁটা বইছে না।
ভূত (জাঁক করে): ইয়েস, সভ্য দেশের অতি সভ্য ভূত আমি।
লেখক: সভ্য দেশে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেয়া হয়েছে অথচ আপনি দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? তুই-তোকারি করছেন এটাই বা কেমন!
অতি সভ্য ভূত: তুই-তাই না করলে ভূতদের বাজার পড়ে যায়। তাছাড়া মানুষ নামধারী অমানুষদের বিচার করে মেরে ফেলতে হবে না, আশ্চর্য! পৃথিবীটাকে চমৎকার বানাতে গিয়ে মানুষকে নিষ্ঠুর হতে হয় যে।

লেখক: স্যার, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা। সৌদির মতো কিছু বর্বর দেশ অবশ্য এ বিষয়ে বহু এগিয়ে আছে। এরা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল জায়গায় উন্মুক্ত শিরচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। রেডিও টেলির্ভিশনে আগাম ঘোষণা দিয়ে টেলির্ভিশনে ঘটা করে দেখানো হয়। অবশ্য এরা দয়ার সাগর ঘোষণা করে দেয়, শিশু এবং অসুস্থ লোকজনকে যেন এ অনুষ্ঠান দেখতে না দেয়া হয়। দলে দলে লোকজন শিরচ্ছেদ দেখে। অপার আনন্দ লাভ করে।
অ. স. ভূত: ভালোই তো, অপরাধীদের জন্যে উদাহরণ সৃষ্টি হবে।

লেখক: ‘অপরাধীর পায়ের চেয়ে আইনের হাত লম্বা’ এটা অন্যভাবেও বোঝানো যায়। ভারতে অসংখ্য প্রাণ হরণকারী একজন ডাকাতকে ধরার জন্যে এক হাজার সামরিক, আধা-সামরিক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। একে ধরতে গিয়ে এ পর্যন্ত পঁচিশ কোটি রুপী খরচ হয়েছে। ডাকাতের মাথার দাম ধরা হয়েছে চল্লিশ লাখ রুপী। একে আটকে মেরে ফেললে কি হবে? মৃত্যুর পর সবাই আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে? হেনরী শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’-এর প্যাপীকে ‘আইলস ডু স্যালুট’-এর নির্জন সেলে যে রকম আটকে রাখা হয়েছিল ওরকম অন্ধকূপে চরম অপরাধীদের আজীবন আটকে রাখা উচিত। মাঝে মধ্যে এদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলাও করে জানানো যেতে পারে। প্যাপীলনের মতো এদেরও সময় থেমে যাবে মনে হবে এ কষ্ট পৃথিবীর কষ্ট না ।

অ. স. ভূত: দরিদ্র দেশগুলোর টাকা কই, ফটাফট মেরে ফেললেই তো সুবিধা?
লেখক: যে মানুষ তার মতো কাউকে সৃষ্টি করতে পারে না সে কোন অধিকারে একটা প্রাণ নষ্ট করবে। এসব থাক, এখন বলেন, আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দিলেন।

অ. স. ভূত: তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে বলেছিস ‘রাম ছাগল ভূত’। এসব কি, অন্তত ‘জন ছাগল ভূত’ বললেও তো হতো। এসব ছাই ভস্ম লিখে মাল কামিয়ে লাল হচ্ছিস।
লেখক (বেদনাহত হয়ে): স্যার-স্যার, এমন কুৎসিত ভঙ্গিতে বলবেন না। লাল-নীল জানি না এরকম একটা লেখা লিখে পাই পঞ্চাশ টাকা।
অ. স. ভূত: পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কি করিস?
লেখক: এটা তো সম্মানী এ দিয়ে আবার কি করবো, বাঁধিয়ে রাখি। এটা সম্মানী তো তাই বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। লেখককে সৌজন্য কপি দেয়ার নিয়ম নাই বিধায় ‘অসৌজন্য কপি’ কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি।
এরা অন্য ভুবন থেকে এসে আলো দেখান- এতো আলো দেখিয়ে ফেলেন, আলোর ছটায় নিরূপায় হয়ে জানালা বন্ধ রাখতে হয়। প্রিয় মানুষদের ন্যূনতম সাধ-আহ্লাদের জলাঞ্জলি দিয়ে, ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না- নিয়ম নেই। লেখক থাকবেন অপরিচ্ছন্ন, চুলে পাখি না হোক অন্তত তেলাপোকা ডিম দেবে, মদ্যপান করে ল্যাম্পপোস্ট রাস্তার মাঝখানে কেন এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া করবেন, বড় বড় নোখ দিয়ে বেশ্যাকে খামচাবেন। এরা কপাকপ জ্যোৎস্না খান, সরষে তেলের মতো গায়ে জ্যোৎস্না মাখেন, জ্যোৎস্না রাত না হলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান না।

তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোবাসার কথা যদি বলেন, তখন পৃথিবীর সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়। তখন মনে হয় জীবনটা এত ছোট কেন!

Monday, July 2, 2007

লেজার গান দিয়ে পাখি শিকার!

যমুনা গুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলের মাতা আলহাজ জমিলা খাতুনের ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি···রাজেউন)। যুগান্তর, ০৩·০৫·০৬
প্রত্যেকটা মৃত্যুই কষ্টের, আমরা বাবুল সাহেবের মা’র রূহের মাগফেরাত কামনা করি।

এই খবরটা বাবুল সাহেব তার নিজ পত্রিকা যুগান্তরে বিশাল করে প্রথম পৃষ্ঠায় দুই কলামে ছবিসহ ছাপান। শোভন হতো যদি এ খবরটা অন্য পত্রিকা এভাবে ফলাও করে ছাপাত। এটা করে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন। কারণ পত্রিকাটি ছাপিয়ে তিনি নিজে, একা একা বাসায় বসে দু-পা উপরে তুলে পড়লে সমস্যা ছিল না। কিন্ত পড়েন পাঠক। পাঠকের বাবুল সাহেবের মা’র মৃত্যুর চেয়ে অন্য জরুরী খবরের প্রয়োজন বেশী।

এটিএন বাংলা নামের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চেয়ারম্যান সাহেবের বউ নাকি বিরাট মহিলা গাতক (রিমেম্বার, ঘাতক না)। তো এই মহিলা গাতকের গান ননস্টপ এটিএন পর্দায় দেখাচ্ছেই! এর শেষ নেই, তাও আবার কয়টা জানি দেশের অসংখ্য লোকেশনে চিত্রায়িত! 'মন মানে না' গানটা হয়ে গেছে, শরম মানে না!

হুমায়ূন আহমেদ শাওনকে বিয়ে করার কারণ হিসাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'শাওনের গান শুনে আমি মুগ্ধ'।
অতি উত্তম, গান ভাল জিনিস। মন উৎফুল্ল রাখে। মুশকিল হচ্ছে, গানকে বিবাহ করার সিস্টেম এখনও চালু হয়নি!

তা এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান সাহেব এবং হুমায়ূন সাহেব আপনার এতো যন্ত্রণা না করে গান রেকর্ড করার যন্ত্র দিয়ে আপনাদের বিবি সাহেবাদের গান রেকর্ড করে রাত দিন শোনেন না, এ নিয়ে তো কারো কোন দ্বিমত নাই। আপনারাও বেঁচে যেতেন আমরাও বেঁচে যেতাম!

ড· মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অনুষ্ঠানে বিচারক হতে অসম্মত হন কারণ তাঁর সন্তানরা সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেছিল। বড় মাপের মানুষদের কাছে আমরা তো এমনটাই আশা করব! কিন্তু বাবুল, হুমায়ূন সাহেবা বুঝতে চান না, এসব কান্ড অভব্যতার পর্যায়ে পড়ে। লেজার গান দিয়ে পাখি শিকার!

কনক পুরুষ: ১


(আমার ইচ্ছা ছিল চালবাজি করার জন্য। অনেক পুরনো উপন্যাস ছিল এটা। আমার ধারণা ছিল, এটা ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করব। আফসোস, ধরা খেয়ে গেলাম। হা ঈশ্বর, এমন মানুষও আছেন। ‘কনক পুরুষ’ উপন্যাসটার কথা এখনও মনে রেখেছেন!
যাই হোক, এই পোস্টটা আমি উৎসর্গ করছি মোসতাকিম রাহী এবং তাঁর মেজদা মোরসালিনকে। কেন?
লেখকরা গল্প বলেন, এই তাঁদের কাজ। আমার মতো অগাবগা লেখকও লেখকদের অনুকরণ করে চেষ্টা করেন গল্প বলতে।
কিন্তু মোসতাকিম রাহী এবং তাঁর মেজদা মোরসালিন গল্প সৃষ্টি করেন, উপাদান যোগান। আমার মতো মানুষকে বিভ্রান্ত, হতবাক করে দেন তাঁদের ভালবাসায়-মমতায়...)।

 ...
"জয় যথাসম্ভব নিঃশব্দে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে, সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, উফ-ফ, কি ধকলটাই না গেল আজ!
ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেল। মেয়েটা বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সেই চোখে আছে রাজ্যের ভয়। এর মানে কী! আজ ওর বাসর রাত। বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়ে গেল। এর আগে মা বেশ কয়েকটা মেয়ে দেখে কোন না কোন খুঁত খুঁজে বের করেছেন।

এ বিয়েতেও মা গররাজি ছিলেন। জয়ের এককথা, এ বিয়ে না হলে আর বিয়ে করব না। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! তাছাড়া এ মেয়েকে দেখতে গিয়ে সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল, চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল ওর সব কেমন জট পাকিয়ে গেল।
ফুলের তীব্র গন্ধে ওর কেমন দমবন্ধ ভাব হচ্ছে। ফ্যানের রেগুলেটর এক থেকে পাঁচে নিয়ে এল। চরম বিরক্তি নিয়ে গা থেকে আচকানটা খুলল। এসব পরার কোন মানে হয়, নিজেকে কেমন ক্লাউন ক্লাউন মনে হচ্ছিল!

আড়চোখে তাকিয়ে বিস্ময়ের সীমা রইল না। মেয়েটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে, ভয়ে মনে হচ্ছে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসবে! এসব কী, ও বাঘ না ভালুক! যথেষ্ট দূরত্ব রেখে খাটে বসে কোমল গলায় বলল, ইভা এমন করছ কেন, কি হয়েছে!
ইভা চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলল, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছোঁবেন না। ইভা সত্যি সত্যি জয়ের পা ধরতে গেল।
জয় বিদ্যুৎগতিতে সরে যেতে গিয়ে মশারীর একটা স্ট্যান্ড ফেলে দিল। মশারীর স্ট্যান্ডটা একপাশে দাঁড় করাতে করাতে ভাবছে , আরে, এ এমন রকম করছে কেন!
জয় সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল, নিষেধ করে তুমিই দেখি আমাকে ছুঁয়ে ফেলছ, শান্ত হও, আমি তোমার গায়ে হাত দেব না। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? ইভার গা ভয়ে কাঁপছে। খুব ইচ্ছা করছে কথাগুলো বিশ্বাস করতে- বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে?
জয় হাঁই চেপে বলল, তোমার নিশ্চই ঘুম পাচ্ছে, শুয়ে পড়ো। আমার মনে হয় আমি অন্য ঘরে শুলে তুমি আরামে ঘুমাতে পারতে। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না, এ নিয়ে ভারী গোলমাল হবে। সবাই তোমাকেই দুষবে। তুমি খাটে শোও, আমি শোফায় শুচ্ছি। প্লিজ আমার উপর বিশ্বাস রাখো। কি রাখা যায় বিশ্বাস?

ইভা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। নতুন জীবনের শুরুটা তো ভালই মনে হচ্ছে- সামনে কি আছে কে জানে! সব কথা জানলে এরা কি অনর্থই না করবে! আচ্ছা, তাইলে কি এরা সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলবে?
জয় সোফায় একটা বালিশ আর কোল বালিশ ফেলল। ওর এই একটা বদভ্যাস। কিছু আঁকড়ে না শুলে ঘুম হয় না। সিগারেট ধরিয়ে অপ্রসন্ন হয়ে বলল, সরি, তোমার কথা মনে ছিল না, সিগারেটের ধোঁয়ায় নিশ্চই তোমার সমস্যা হচ্ছে। ইয়ে, জাস্ট এক টান দিয়ে নিবিয়ে ফেলব, প্রমিজ। মনে মনে ভাবছে, ধ্যাত, নিজের ঘরে আরাম করে সিগারেট টানা না গেলে বেঁচে থেকে সুখ কী!

ইভা হাসি গোপন করে শংকিত চোখে তাকিয়ে আছে, এর এক টানের নমুনা ভয়াবহ। ভাব দেখে মনে হচ্ছে এক টানে পুরো সিগারেটটা শেষ করে ফেলবে। চোখ কেমন বড়ো হয়ে গেছে! জয় তাড়াহুড়ো করে অ্যাশট্রেতে সিগারেট নিভিয়ে খকখক করে কাশতে লাগল। অসতর্কতায় পানি খেতে গিয়ে টেবিলের কিনারায় রাখা কাঁচের জগ ফেলে দিয়েছে। কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ সুনসান রাতে কানে তালা লাগার উপক্রম। ইভার কেমন মায়া হচ্ছে, আহা, বেচারা ধীরে-সুস্থে শেষ করলে কি হত। ও তো আর নিষেধ করেনি।

মা দমাদম দরজা পেটাচ্ছেন। খোকা-খোকা, কি হইল, দরজা খোল।জয় লাফিয়ে দরজা খোলার চেষ্টায় পায়ে জড়িয়ে গেছে আচকানটা, আচকানসহ পা টেনে টেনে হাঁটতে চেষ্টা করছে- ঘন ঘন পা ঝাঁকিয়ে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। একহাতে হেলমেটের মতো ধরে রেখেছে বিয়ের পাগড়ি, অন্য হাতে ছিটকিনি খোলার আপ্রাণ চেষ্টা। অনেক কসরৎ করে অবশেষে আটকে যাওয়া দরজাটা খুলতে পারল। ইভার মজা লাগছে মানুষটা উদ্ভটসব কান্ড দেখে!

জয় বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, তুমিও মা, এমন করে কেউ দরজা পেটায়! জয়ের মা ভেতরে না ঢুকে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আগুন গলায় বললেন, থাপড়াইয়া কানপট্টি ফাটায়া ফেলব। গোটা ফ্লাটের লোক জেগে গেছে। অপদার্থ, হইছেটা কী! তোর পায়ে এইটা কি, ব্যান্ডেজ! অরি আল্লা, পাও কাটছে!
জয়ের লাজুক ভঙ্গি, কিছু না মা, পানির জগ ভেঙ্গেছে। জয়ের মা হাহাকার করে উঠলেন, কাঁচ দিয়ে পা কেটেছিস?
আরে না মা, তুমিও! আর এইসব কি কথা, আচকানটা তোমার কাছে ব্যান্ডেজ মনে হচ্ছে, আশ্চর্য।

জয়ের মা এইবার কাশি দিয়ে ঘরে ঢুকে চোখে বুলিয়ে ধোঁয়া দেখে আঁচ করে নিলেন। তীব্র কন্ঠে বললেন, এই বান্দর, অন্য একজন মানুষ ঘরে আছে সেই খেয়াল নাই। আবার নতুন জগটাও ভেঙ্গে ফেলেছিস দেখি! জয় বিব্রত হল, সরি মা।
জয়ের মা এইবার ইভার দিকে ফিরে বললেন, ইভা মা, তুমি একটু কানে আঙ্গুল দাও তো। এই বান্দরটার সাথে আমি বান্দরের ভাষায় একটু কথা বলি। না-না, সত্যি সত্যি কানে আঙ্গুল দাও।

ইভা বিভ্রান্ত হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে মা-ছেলের কান্ডকারখানা দেখছে। আল্লা জানে, সামনের দিনগুলো কেমন যাবে জয়ের মা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ইভাকে কোমল গলায় বলে গেলেন, ইভা মা, ওর দিকে একটু খেয়াল রেখ, মাঝেমাঝে ওর শ্বাসকষ্টের মত হয়।
জয়ের মা বেরিয়ে গেলে জয় মাথা নীচু করে হাসল। ইভা, মার কথায় কিছু মনে করো না। দেখবে, তোমার সঙ্গে ভাব হতে সময় লাগবে না।


জয়ের দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। সোফায় লম্বা হলো। কিছুটা সময় চশমা পরেই নাক বরাবর ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, উসখুস করে চশমা সোফার হাতলে ঝুলিয়ে দিল। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবল, এই মেয়েটি তাইলে সারা জীবন এখানে থাকবে। ওর, ওর পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নেবে! আজন্ম পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এ পরিবেশে মানিয়ে চলতে হবে। আগে হয়তো সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাত। এখন এ পরিবারের সকাল ছ-টায় হলে ওকেও কি ছ-টায় উঠতে হবে?"... 

*পরের পর্ব: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_17.html

আমার আনন্দ বেদনার অপকিচ্ছাঃ ৩

লেখালেখির জগতে আমার দেখা অল্প ক’জন অসাধারণ মানুষদের একজন, কাজী আনোয়ার হোসেন। মাসুক নানার(!) সৃষ্টা এ দেশে বইয়ের জগতে বিপ্লব নিয়ে আসা একজন মানুষ! 

শেখ আবদুল হাকিমের উপর আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। সেই যে বললেন ঢাকা আসলে যোগাযোগ করবেন, অনেক যন্ত্রণা করে একবার ঢাকা গেলাম। গিয়ে শুনলাম, উনি প্রত্যেকদিন অফিসে আসেন না। বারটা ঠিক মনে নাই, সম্ভবত এ রকম ছিল, তিনি শনি এবং মঙ্গলবারে অফিসে বসেন।

আমার খুব অস্থির লাগছিল, মেজাজ খারাপ হচ্ছিল! হায়, আবর্জনা লেখকের মেজাজ, পক্ষীর বিষ্টা! কেন রে বাবা, কোন বারে বসেন, এটা আমাকে আগে বললে আপনি কি ক্রমশ বড়োমাপের মানুষ থেকে ছোটমাপের মানুষের দিকে ধাবিত হতেন?
আমার মতো আবর্জনা লেখকের এইসব রাগ মানায় না, কিন্তু আমরা কি সব সময় মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার করি, বিশেষ করে আমার মতো দুর্বল মানুষ! প্রস্থান করার পর আর ওমুখো হইনি! পরে আর এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

কি জানি কেন এটা করেছিলাম, এই স্ক্রিপ্টটাই (কনক পুরুষ) বাই পোস্টে কাজী আনোয়ার হোসেনকে পাঠিয়েছিলাম। ক’দিন পর তিনি আমাকে একটা চিঠি লিখলেন, চিঠিতে তিনি কিছু সদাশয় মন্তব্য করেছিলেন। আমার ধারণা, এমন মন্তব্য তিনি অহরহই করে থাকেন। কিন্তু তখন আমার মনে হয়েছিল, মৃত্যুর পরও এঁরা অমর হয়ে থাকবেন, এ কারণে, এঁরা লেখক বানাবার মেশিন। এঁরা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখান, আলোর ভূবনের!
চিঠিতে আরো লেখা ছিল, ঢাকা আসলে দেখা করবেন। আপনার মতো...একজন লেখকের সঙ্গে দেখা হলে সুখি হবো।
হা ঈশ্বর, এও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে, আমার মতো তিন টাকা দামের একজন কলমবাজের জন্যে তিনি কাজকাম ফেলে দেখা করার জন্যে মুখিয়ে আছেন... ওই যে বললাম, এঁরা স্বপ্ন দেখান!

ফোন করলে তিনি বললেন, আপনি কি বিকালে আসতে পারেন, সকালে তো খুব ঝামেলা থাকে, বেশীক্ষণ কথা বলতে পারবো না?
আমি মনে মনে বলি, এটা একটা কথা হলো, বিকাল কেন, রাত বারোটা হলে আমার অসুবিধা কি!

আমি আগেভাগেই পৌঁছে গেলাম, যদি দেরী হয়ে যায়।
অফিসের চৌবাচ্চায় কি-সব মাছ; ধুর ব্যাটা মাছ, তোদের সার্কাস দেখে কে! অফিসে এন্ট্রির ঝামেলা শেষ হলে আমাকে বলা হলো তিনি এখন মেডিটেশন করছেন, নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করবেন।

এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করা খুব জটিল। একজন বডিগার্ডের মতো মানুষ আমাকে তাঁর রুমে এগিয়ে দিয়ে আসলেন। একপাশের পুরোটা দেয়াল জুড়ে বিশাল এক্যুরিয়াম, নাম না জানা সব মাছ, ভদ্রলোকের দেখি মাছের ভারী শখ!
জিন্সের প্যান্টপরা সপ্রতিভ এই মানুষটার যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল, অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা কিন্তু একজন মানুষের সঙ্গে অন্য একজন মানুষের যেমনটা আচরণ হওয়া উচিৎ, তাঁর আচরণে এর একরত্তি কমতি নেই!
এমন একজন লেখক, যার লেখা পড়ে কতো রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। কতো দুঃসময়ই না পার করেছি অথচ তিনি আমার মতো আবর্জনা লেখকের সঙ্গে এমন আচরণ করছিলেন যেন উল্টো আমি তাঁকে সাক্ষাত দিয়ে কৃতার্থ করছি! আহারে, লেখা ছাপা না হলেই বা কী আসে যায়!


সবই ঠিক ছিল কিন্তু ফেরার সময় গুলিয়ে ফেললাম কারণ তখন বডিগার্ডের মত কেউ ছিল না। কাজীদার অন্য রুমে ঢুকে পড়ে ওঁদের বিব্রত হওয়ার চেয়ে নিজে বিব্রত হয়েছিলাম বেশী। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 


* কাজীদা, একজন লেখক বানাবার মেশিন: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_13.html