Search

Loading...

Friday, June 29, 2007

গণতন্ত্র- বড্ডো গুরুপাক!

­গণতন্ত্র ভাল জিনিস নিঃসন্দেহে, ভারী স্বাদু! সমস্যাটা হচ্ছে, স্টমাক ঘি-মাখন হজম করার শক্তি রাখে কি না? দীর্ঘ অনেক কটা বছর ধরে গণতন্ত্রের অর্থ দাড়িয়েছে ক্রমাগত নিয়ম করে হরতাল। এটা নাকি অতীব জরুরি। হরতাল ব্যতীত গণতন্ত্র নাকি নিঃশ্বাস নিতে পারে না। শাসক দল ৫ বছর শাসন করে। বিরোধী দল দিনের পর দিন হরতাল নামের হরতালের চাবুকটা সাঁই সাঁই করে চালাতে থাকে। কিন্তু শাসক দলকে ১ সেকেন্ড আগেও হঠাতে পারে না। নমুনা দেখে মনে হয়, এটা কেয়ামতের আগ পযর্ন্ত চলতে থাকবে।

কী সীমাহীন লুটপাট। ৩ কোটি টাকার গাড়ি যিনি হাঁকান তিনি কিন্তু এ দেশের সবচেয়ে বেশি করদাতা নন!
দেশের সবচেয়ে বেশি করদাতা, তিনি হলেন সাধারণ ব্যবসায়ী মি. অসিত সাহা। একজন আমলা কোটি কোটি টাকা খরচ করে এম. পি হন, ওনার নাকি দেশ সেবা না করলে চলছে না। এ দেশে নাকি ঘুসের টাকা পেলে কাঠের পুতুলও হাঁ করে। সততা নামের জিনিসটা ক্রমান্বয়ে জাদুঘরে স্থানান্তরিত হচ্ছিল। রাবারের মতো প্রসারিত হচ্ছিল ধর্মবাজরা।

একটা পরিবর্তন না এসে উপায় ছিল কি আদৌ? অনেককেই দেখি মুখ অন্ধকার করে রাখেন। তাঁরা নিবাচির্ত সরকার ব্যতীত অন্য কিছু মেনে নিতে চান না। মেনে নেয়াটা তীব্র কষ্টের, এতে আমার কোন অমত নাই। আমি একমত, এটা মেনে নেয়া কঠিন। কিন্তু বিকল্পটা কি, বলেন? ঘুরেফিরে তো ওই গুটিকয়েক দলই এই দেশ শাসন করবে। এরা তো দেশটাকে ১০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। দিচ্ছে।

বলা হচ্ছে, এরা (কেয়ারটেকার সরকার) যে অল্প সময়ের জন্য এসেছেন এই সময়ে নির্বাচন নিয়ে মাথা না-ঘামিয়ে অন্য কিছুর চিন্তা করার অবকাশ নাই। আমার কাছে মনে হয় এমন, তাদের কাছ থেকে যেন আমরা আশা করি; গরু কিনে, ঘাস খাইয়ে, গরুর কাছ থেকে দুধ কালেক্ট করে, গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে, দুধটা খাইয়ে দেবেন, দুধের সর দিয়ে তাদের মুখে লেপে ত্বকের জৌলুশ বৃদ্ধি করবেন। ব্যস। চক্রাকারে এই কাজটা চলতেই থাকবে। আমি তো দেখছি, এই অল্প কয় জন মানুষ দেশটা তো ভালই চালান। এখন যাদের ধরা হচ্ছে বা চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে, এদের টিকিটিও স্পর্শ করার সাধ্য কার ছিল? তবে এদের মধ্যে আমলা গামলাদের খুব একটা দেখছি না। এরা সবাই এখন সাধু হয়ে গেছেন!

আমার চোখে দেখা একটা ঘটনা এখানে শেয়ার করি। যে এডিএম সাহেব অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দিচ্ছেন, অনেকটা গায়ের জোরে, তিনি সাধারণ একজন জেলের কাছ থেকেও ঘুস খেয়েছিলেন। এখন তার কী দবদবা!

আল্লা মালুম, এখনই এই ভাঙ্গাভাঙ্গি করার আইডিয়াটা কার মাথা থেকে বেরিয়েছে? আমি মনে করি, যাদের মাথা থেকে এটা বেরিয়েছে, এরা তাঁদের নিজেদের কফিনে পেরেক ঠুকলেন।
আমাদের জায়গা বড়ো অপ্রতুল, এটা করা প্রয়োজন ছিল অনেক পরে। সব বিগ শটদের কাবু করে, দেশের অধিকাংশ টাকা অন্যায় করে যে সব অল্প মানুষরা দখল করে রেখেছেন, সে সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে, এবং দ্রুত শ্রম বাজার সৃষ্টি করে। তারপর সরকার যদি বলতেন, প্রিয় দেশবাসী, আমরা আমাদের কাজ করেছি এবার আপনারা আমাদের জন্য কিছু কাজ করুন। দখলকারীরা সরকারী জায়গা ছেড়ে দিন। আমার মনে হয় গরীব দেশবাসীরা তখন হাসিমুখেই এই নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হতেন।

ছলিম মিয়ার টং, বস্তী যে ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে, এর শেষ কোথায়! এরা কি আসলেই এর পরিণাম জানেন? এইসব ডিসিশন মেকারদের পেছনে থাকা প্রয়োজন ছিল মানবিক একজন মানুষের। যিনি একজন মানবিক মানুষের পাশাপাশি একজন মনোবিদও বটে। একেকটা পেশার লোকজনদের জন্য ভাবতে হবে একেক রকম করে। অসংখ্য পেশা থেকে একটার কথা বলি: আমরা খুব আমোদ পাই যখন শুনি বস্তি উচ্ছেদ করা হলো। একটা কাজের কাজ হলো যা হোক। শহরটা বড় সাফ সুতরো হলো।
বিশ্বাস করেন, আমি গার্মেন্টস কর্মীদের পায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। এরা যখন হেঁটে যান, আমার কেবল মনে হয় এই দ্রুত হেঁটে যাওয়া পা আমাদের দেশটাকে সচল রাখার পেছনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের স্যারদের যে বাবুগিরি এতে এঁদের অবদান যে কী প্রবল এটা আপনারা আমার চেয়ে ভাল জানেন। এরা থাকবেনটা কোথায়, ফ্ল্যাটে? কয় টাকাই বা এঁদের বেতন? এঁদের ঘরটা ভেঙ্গে দিয়ে উল্লসিত হওয়ার অবকাশ কোথায়? ফিরে এসে যখন কেউ ওই ভেঙ্গে দেয়া বস্তীতে তাঁর প্রিয় মানুষ খুঁজে পাবেন না, যে শিশু সন্তানটি হারিয়ে গেল! এ অন্যায়ের দায় কে নেবে? যেটা করা প্রয়োজন ছিল: সমস্ত দেশে শ্রম বাজার সৃষ্টি হয়, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো ছড়িয়ে দেয়া। নিয়ম করে দেয়া, যারা এই ধরনের প্রতিষ্ঠান করবে তাদেরকে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, বাধ্যতামুলক। যে টাকা এঁরা বস্তীতে থাকার জন্য দিতেন এমন একটা অংক এদের থাকার জন্য নেয়া।

বাংলাদেশের লোকসংখ্যা কত এখন? অথচ ঢাকায় সম্ভবত দেড় কোটি! আমরা সব লাটিমকে বনবন করে ঘুরাচ্ছি ঢাকাকে কেন্দ্র করে, এটা ক্রমশ বন্ধ করতে হবে। যারা রংপুর, খুলনায় শিল্প প্রতিষ্ঠান বসাবেন তাদের জন্য ট্যাক্সসহ অন্যান্য কর আদায়ের বেলায় ছাড় দেয়া হলে অনেকেই আগ্রহী হবেন বলেই আমার ধারণা। এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মান থাকুন এদের জন্য, কত উপায়েই না এঁদের সম্মান জানানো যেতে পারে। বাহে, আইডিয়া কেউ চাইলে গাদাগাদা আইডিয়া দেয়া যাবে নে।

আসলে এই দেশের জন্য টাকা কোন সমস্যা না। বিদেশী লালমুখোদের কাছে শিঁরদাড়া বাঁকা করে কাতর হাত বাড়াবার কোন প্রয়োজনই নেই। আর আমরা এটাও জানি, জানার আর বাকি নাই এরা ১০০ টাকা দিলে ২০০টা উপদেশ দেয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে এদের কাছ থেকেই হেনতেন কত কিছু কিনতে আমাদেরকে বাধ্য করে। দেখুন না, হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিটেন্স যে সব প্রবাসীরা দেশটায় পাঠাচ্ছেন। আমরা এদেরকে কি সম্মান দিচ্ছি, কচু! এদের ভোট দেয়ার অধিকারই নাই। চোরচোট্টা ভোট দিতে পারবে, এঁরা পারবেন না! প্রবাসী অনেকেই দেশে ইনভেস্ট করার জন্য মুখিয়ে আছেন, শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছার।

যে ভদ্রলোক সবচেয়ে বেশি টাকা ট্যাক্স দেবেন তাঁদের জন্য আমরা কি করি, ঘেচু! আমার সাধ্য থাকলে তাঁকে গার্ড অভ অনার দিতাম। তাঁকে গার্ড অভ অর্ডার দেয়ার প্রস্তাব শুনে কি আপনারা ঠা ঠা করে হাসছেন? বেশ, যখন ফিফার ব্লটারকে আমাদের দেশে গার্ড অভ অনার দেয়া হলো, তখন আমরা বড়ো আমোদ পাই, না? কোন দেশ দেয়নি, ব্লটারকে দিলাম, আমরা দিয়ে দেখিয়ে দিলাম! যেন ব্লটারের ব্লাডার আমরা গার্ড অভ অনার দিয়ে দিয়ে ফাটিয়ে ফেলব! ­দেশের ট্যাক্স যদি যথার্থ ভাবে আদায় করা হয়, ভিক্ষা করতে হবে না, আমি নিশ্চিত।

অনেক হাজী সাহেবকে দেখেছি, যাকাত দেন কিন্তু ট্যাক্স দেন না। কিছুটা ভয়ে, অনেকটা অসচেতনার কারণে। যাকাতের মতোই ট্যাক্স হচ্ছে সরকারী যাকাত। একজন কখনোই নিজেকে ভালমানুষ বলে দাবী করতে পারেন না, ট্যাক্স না দিলে। সরকার এই ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা করেন, হাসপাতাল গড়েন। ওই রাস্তায় চোর হাঁটে, সাধুও হাঁটে। চুতিয়ারা বলে, এই রাস্তা ওমুক মন্ত্রী বাহাদুর করেছেন, তমুক হাসপাতাল তমুক মন্ত্রী- যেন এই মন্ত্রী টন্ত্রীদের বাপের তালুক বিক্রির টাকা। যদি এখুনি আমার মতো সাধারন মানুষের জরুরী নিরাময়ের প্রয়োজন হলে, আমি কোথায় ছুটব, অ্যাপোলো হাসপাতালে? বিলের ধাক্কায় মৃত্যু এগিয়ে আসবে গলাগলি করার জন্য। আরও কতো ভাবে টাকার উপায় করা যায়।

আমাদের মাথাপিছু জাতীয় ঋণ কতো? অনুমান করি হাজার দশেক টাকা। আচ্ছা, আমাকে সরকার সার্টিফিকেট দিতে পারবেন, 'আলী মাহমেদ, জাতীয় ঋনমুক্ত ব্যক্তি'? তাহলে আমি টাকাটা দিয়ে দিতে চাই। কেন আমি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াব? আমার মতো হয়তো আরও পাগল পাওয়া যাবে।
কোরবানীর সময় দেশে কতো টাকার কোরবানী হয়? অনুমান করি নিদেনপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা। বেশ, অপশন রাখুন, যিনি কোরবানীর নিয়ত করেছেন তিনি ইচ্ছা করলে দেশের জাতীয় ফান্ডে টাকাটা জমা দেবেন। তাঁকে সমুহ টাকা বুঝে রসিদ দেয়া হবে। যিনি মনে করবেন পশুর গলায় ছুরি না চালানো পর্যন্ত ধর্ম টিকে থাকবে না তিনি ধর্ম পালন করুন না, কে তাকে বাঁধা দিচ্ছে।
কিন্তু, একটা কঠিন কিন্তু রয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষরা চাইব আমাদের প্রতিটা পয়সার পাই পাই হিসাব যেন থাকে। নইলে যা হবে, এক কাপ চায়ে দুই কাপ চিনি!

প্রফেসর ইউনূসকে আমার খোলা চিঠি

(প্রফেসর ইউনূসকে যে মেইলটা করেছি, হুবহু এখানে তুলে দিচ্ছি)।

জনাব, প্রফেসর ইউনূস:
সালাম। আপনি এ দেশের মানুষের কাছে খোলা চিঠি লিখে মতামত জানতে চেয়েছেন। এই যে মতামত জানতে চাওয়া, আপনার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ দেই।

কিন্ত একটা বিষয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না, এ দেশের কত ভাগ মানুষ আপনার কাছে তাঁদের মতামত নিয়ে পৌছতে পারবেন? একজন কৃষক, একজন রিকশা চালক, একজন দিনমজুর, একজন গার্মেন্টস কর্মী- এঁরা কিভাবে আপনার কাছে তাঁদের মতামত জানাবেন? এঁরাই তো এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, না কি? এঁরাই তো এ দেশের চাকা ঘুরাচ্ছেন, অবিরাম।
যাই হোক, এটা আপনার সমস্যা, আমার না।

আমি আমার বক্তব্য বলি: প্রথমেই আপনার নোবেল প্রাপ্তির যথার্থতা তর্ক বিতকের বাইরে রাখি। তদুপরি আপনার নোবেল প্রাপ্তি বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে আবার নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সবুজ পাসপোর্টের প্রতি তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি অনেকখানি নমনীয় করেছে। স্বাধীনতা পর এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা।
আমি মনে করি, জনাব, শেখ মুজিবর রহমান যে ভুলটা করেছিলেন, আপনিও ওই ভুলটা করতে যাচ্ছেন। তিনি যদি সরকারি দায়িত্ব না নিতেন তাইলে এই দেশের প্রত্যেক বাড়িতে একটা করে তাঁর ছবি থাকত, সশ্রদ্ধায়।

যে ভুলটা সোনিয়া গান্ধি করেননি, শত চাপেও। এমন কি তাঁর জন্য আত্মহত্যা করারও নজির আছে- কিন্ত তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। সিদ্ধান্ত আপনার।

ভাল থাকবেন।

শুভেচ্ছান্তে
-আলী মাহমেদ

মি. অসিত সাহা- আমি দুঃখিত!


মি. অসিত কুমার সাহা- আপনি সেই মানুষদের একজন, যাকে আমার মতো মানুষ সেলাম ঠুকে। ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে আপনি সবচাইতে বেশী ট্যাক্স দিয়েছেন।

আমার সাধ্য থাকলে আপনাকে গার্ড অভ অনার দিতাম। সে উপায় তো আমার নেই।

শুভর ব্লগিং নামের আমার একটা বই আপনার উৎসর্গ করেছি।
অনেকেই জানতে চেয়েছেন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে কি না? বা আপনাকে এই বইটা পাঠাবার কোন ব্যবস্থা করা যায় কি না। আসলে আপনার মতো মানুষদের জন্য এর আদৌ প্রয়োজন আছে কি?
আপনার সঙ্গে পরিচয় থাকা অতীব সৌভাগ্য- কিন্ত না হলে এতে আপনার কিছু যায় আসে কী! কিন্ত আমার মতো সাধারণ মানুষ আপনাকে বই উৎসর্গ করে সম্মানিত হই- খানিকটা ভারমুক্ত হই।

আমি দুঃখ প্রকাশ করি, উৎসর্গে আপনার নামটা আমি ভুল করেছি অসিত কুমার সাহার জায়গায় হয়েছে অসিত কুমার পাল। এখন তো আর আমার এটা সংশোধন করার কোন উপায় নাই। এবং এও আশা নাই, বইটা রিপ্রিন্ট হবে আর আমি এ ভুল সংশোধন করতে পারব।
অতএব, হে প্রিয় মানুষ, তাই নতজানু হয়ে বলি, ক্ষমা করুন মোরে···।

অনুবাদ এবং মৌলিক সাহিত্য

আমি মনে করি, অনুবাদ হচ্ছে অন্যের সন্তানকে দুধে ভাতে বড়ো করা। অন্যের সন্তান দেবশিশু হোক তাতে আমার কি; আমার কালো, লিকলিকে, দুবলা সন্তানের সঙ্গে তার কিসের তুলনা, ছাই!
তাছাড়া অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক- এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর। একটা অনুবাদ পড়ার আগে এই ব্যাপারটা আমরা মাথায় রাখি না, এটা কে অনুবাদ করছেন। তিনি অনুবাদ করার বিষয়ে কতটুকু যোগ্যতা রাখেন বা কতটা বিশ্বস্ত।

৯৫ সালে একজন অনুবাদকের সঙ্গে আমার এ বিষয়ে চিঠি চালাচালি হয়েছিল।
আমি তাকে যা লিখেছিলাম, 'আপনার অনুবাদ জ্যক ফিনের 'হারানো লোকগুলো' পড়লাম। আপনার লেখায় একটা আলাদা কাঠিন্য থাকায় আমার বুঝতে খানিকটা সমস্যা হয়েছে। আগে জ্যাক ফিনের এই গল্পটা আমার পড়া ছিল বিধায় বুঝতে সুবিধা হয়েছে। কাজি আনোয়ার হোসেন জ্যাক ফিনের 'অফ মিসিং পার্সন' অবলম্বনে লিখেছিলেন, অন্য কোনখানে। পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

আগেও যেটা বলেছি, আপনাকে আবারও বলি, অন্যের ছেলেকে গভীর মমতায় মানুষ করার অর্থ কী? যেখানে নিজের ছেলেকে নিয়ে মাথা ঘামাবার সীমাহীন সুযোগ রয়ে গেছে। আপনার অনুবাদ করা জ্যাক ফিনের লেখা পাঠকদের ভাল লাগল, ফিন ব্যাটা মরে গিয়েও নাম কামালো, তাতে আপনার কী!
আমার মতে, অনুবাদে আপনি আপনার মেধার অপচয় করছেন। এই আমার মত। বাকিটা আপনার বিবেচনা...।

আহমদ ছফা, দুম করে মরে গেলেন যে!

আহমেদ ছফাকে আমার মনে হয়, চলমান একটা জ্ঞানের ভান্ডার। তাঁর পরিচয় নির্দিষ্ট গন্ডিতে নিয়ে আসা বাতুলতা মাত্র। এই মানুষটাকে বাংলাদেশের এবং কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যমের মতো ভয় করতেন। তিনি কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলতেন না! শেখ মুজিবর রহমানের বিশাল অফার তিনি অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মানুষটা ছিলেন ভারী অহংকারী। কিন্তু ছফা নোবেল পুরষ্কার পেলেন না কেন- এ ক্ষোভ কার কাছে বলি?

এর চেয়ে অনেক কম অহংকারী মানুষকে আমি বিভিন্ন লেখায় তুলাধোনা করেছি। এ কারণে অনেকেই আমার প্রতি রুষ্ট হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আমার মতো অখ্যাত কলমচীর এই অধিকার নাই। আমি স্বীকার করি, আমার যোগ্যতা নাই- কিন্ত আমি ‘ধুনকর’ এর ভূমিকা থেকে পিছপা হইনি।

কিন্ত, ছফার বেলায় তাঁর অহংকার ছাপিয়ে আমার চোখ জলে ছাপাছাপি হয়ে যায়। এই ঘটনাটা যখন আমি পড়ি, আমার চোখের পানি আটকাতে পারিনি। গলা ছেড়ে আমার বলতে ইচ্ছা করছিল, আহমেদ ছফা, আপনি কেন মরে গেলেন? এ ভাবে দুম করে মরে যাওয়াটা কি কাজের একটা কাজ হলো! তাঁর অজস্র কান্ড থেকে একটা তুলে দিচ্ছি: 

(উপাত্তটা নেয়া হয়েছে: আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী/ মোহাম্মদ আমীন।)

“স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মায়ের সাথে বাবর রোডের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার শহীদ পরিবারের সম্মানার্থে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের নামে ওই পরিত্যক্ত বাড়িটি বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্ত অল্প কয়েক দিন পর গভীর রাতে রী বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল হুমায়ূন পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দরোজায় তালা লাগিয়ে দেয়। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, কোথায় যাবেন তাঁরা?
সকাল হল, কেউ নেই, কেউ আসার কোনো আশা নেই। চর্তুদিকে গিজগিজ করছে রক্ষী বাহিনী। কার বুকে এত পাটা যে এগিয়ে আসবে। আহমদ ছফা এসে হাজির। ছফার হাতে একটি টিন, কেরোসিনে ভর্তি, কাঁধে মোটা চাদর। এ নিয়ে আমীন এবং ছফার কথোপথন:

মোহাম্মদ আমীন: আপনি কি হুমায়ূনের কাছে একাই গিয়েছিলেন?
আহমদ ছফা: হাঁ, একাই। তবে হাতে একটা কন্টেনার ছিল, তাতে পাঁচ লিটার কেরোসিন, কিনেছিলাম।
আমীন: কেরোসিন কেন?
ছফা: জ্বলব এবং জ্বালাবো বলে।
আমীন: কাকে?
ছফা: নিজেকে এবং গণভবনকে। আমি হুমায়ূনকে বললাম, হুমায়ূন আমার সাথে রিক্সায় উঠুন, আমরা গণভবন যাব। একটি রিনাউন শহীদ পরিবারকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে স্বাধীনতা ও জাতির আত্মদানের গৌরবমন্ডিত ঐশ্বর্যকে। আমি কেরোসিনঢেলে আত্মহুতি দেবার সংকল্পে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলাম সে দিন।

আমীন: কেন?
ছফা: যে দেশের সরকার স্বাধীনতায় জীবন বিসর্জনকারী একজন প্যাট্রিয়ট পরিবারকে বাসা হতে গভীর রাতে উচ্ছেদ করে দেয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে সে দেশে আর যাই থাকুক, আমি নেই। এমন ঘৃণ্য দেশে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল, অনেক। তো, আমি হুমায়ূনকে বললাম, আপনি তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠুন।

হুমায়ূন বললেন, কোথায় যাব?
আমি বললাম (ছফা): গনভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে- তার প্রতিবাদে এ কাজটা করব। আত্মহুতি।
হুমায়ূন: কি বলছেন ছফা ভাই?
ছফা: কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদরও নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালোমত চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমত লাগে।

আহমদ ছফার গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেয়ার সংবাদ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগলেন। বন্ধুরা ছফাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্ত ছফা অনঢ়, তিনি আত্মহুতি দেবেনই। অন্য কেউ হলে ভাবা যেত আত্মহুতি নয়, কেবল হুমকি, কথার কথা। কিন্ত সবাই জানে ছফা অন্য রকম, সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত একচুলও এদিক সেদিক করবেন না, যাই হোক কিংবা যাই ঘটুক।
কবি সিন্দাকার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফার কাছে এলেন। জোর গলায় বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি, এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো।
ছফা বললেন, হুমায়ূন পরিবারকে আবার সস্থানে তুলে না দেয়া পর্যন্ত আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না এবং আপনার হাতে সময় মাত্র ১ ঘন্টা।

পরিশেষ: ছফার জবানীতে শুনুন:
মুজিব সরকার হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে পুনরায় উচ্ছেদকৃত বাসায় তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্তত আমি এই একটি ব্যপারে শেখ মুজিবের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে মরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

ছফার খেসারত!

ছফার জবানীতে শুনুন: (এটা ছফার নিজস্ব মত):
"শেখ মুজিবর রহমান প্রথমে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রদূত হওয়ার জন্য। কিন্ত তিনি যখন বললেন, শর্ত আছে।
আমি (ছফা) বলেছিলাম, শর্ত ছফার জন্য নয়, আপনি অন্য কাউকে দেখুন।

শেখ মুজিবর রহমান আমার উপর প্রচন্ড রুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্ত জেলে দেয়ার সাহস পাননি। পরে শেখ মুজিবর রহমান আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জন্য।
আমি (ছফা): বলেছিলাম সম্ভব নয়। আমাকে ধারণ করার মতো শক্তি আপনার সরকার বা আপনার প্রশাসনের নেই।
এরপর আবুল ফজলকে এই অফার দিলে তিনি আনন্দের সঙ্গে রাজি হন। আবুল ফজল শেখ সাহেবের কেনা গোলাম হয়ে যান। উপদেষ্টা হওয়ার পর শেখ সাহেবকে খুশী করা ছাড়া তাঁর আর কোন পথ অবশিষ্ট ছিল না।

এরপর আমীন জানতে চান: আচ্ছা, আপনি শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলেন না কেন?
ছফা: আমি তোমার বাবাকে বাবা ডাকতে যাব কোন দুঃখে? তোমার বাবাকে পৃথিবীর সমস্ত লোক বাবা ডাকলেও আমি ডাকবো না, তাঁকে অনেকে জাতির পিতা বলে থাকেন, আমি বলি না, একই কারণ। মুক্তিযুদ্ধ আমার মা।

আমীন: তা হলে পিতা কে?
ছফা: সময়। সময়ের দাবি এবং পাকিস্তানীদের কার্যকলাপ। ৪৭ এর পর হতে দেশের উদরে জন্ম যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, যা ১৯৭১ এর মার্চে প্রসব বেদনায় প্রদীপ্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে।"
 

*লেখাটা নেয়া হয়েছে 'আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী', লেখক: মোহাম্মদ আমীন থেকে। মোহাম্মদ আমীন দীর্ঘ ১১ বছর ছফার সহচর্যে ছিলেন। অনেক ক-টা বছর একই বাড়িতে ছফার সঙ্গে থাকতেন।)

**ছফার ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্য অনেক দাম দিতে হয়েছিল। তাঁকে বড় অবহেলায় দাফন করা হয়েছিল!
অনুমান করলে দোষ হবে না, এতে তাঁর কিছুই যায় আসেনি। ভাগ্যিস, তিনি বেঁচে নেই, নইলে ঠোঁট গোল করে বলতেন, বুদ্ধিজীবীদের...-এ আমি মুতিও না! হায়, আমরা এ প্রজন্ম জানিই না বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা বের করেছিলেন আহমদ ছফা!
বাংলা একাডেমির পুরষ্কার পাওয়ার জন্য যেখানে লেখকদের লালা ঝরে পা ভিজে যায় সেখানে তাঁকে যেন পুরস্কারটা না-দেয়া হয় এই নিয়ে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন!
আফসোস, ছফার মত মানুষ যে দেশে জন্মান সেই দেশ ধন্য হয়, নাকি মানুষটা, এটা বলা মুশকিল! উন্নত দেশে জন্মালে তিনি যে নোবেল পেতেন এতে আমার কোন সন্দেহ নাই!

আজিজ- যেন একপেট আবর্জনা!



আজিজ সুপার মার্কেট।

সুরুচির চর্চা হয় এখানে। এ দেশের সুরুচি চর্চার অনেক স্তম্ভের একটি।

আমার মনে হয়, অন্তত যারা লেখালেখির সঙ্গে জড়িত তাঁরা কখনই আজিজে যাননি এর উদাহরণ সম্ভবত অপ্রতুল। লেখালেখির জগতে আমি দুঁদে কেউ নই, ছদুমদু টাইপের মানুষ। তবুও আমাকেও অজস্রবার এখানে যেতে হয়েছে।
কিন্ত একটা বিষয় মেনে নিতে আমার বড়ো কষ্ট হতো, হয়। এই বিল্ডিংটাই নোংরা দাঁত বের করা একটা কাঠামো। লেখকদের যেমন চুলের সঙ্গে চিরুনির কি সম্পর্ক তেমনি চুনকামের সঙ্গে এই বিল্ডিং-এর কি সম্পর্ক এই টাইপের!
ট্রাশ ক্যান নামের জিনিসটার কোন অস্তিত্ব আছে বলে তো মনে হয় না। যত্রতত্র ময়লা ফেলাই যেন ভারী একটা কাজের কাজ! ওয়াশরুমে সামান্য একটা আয়না নাই!

একটা মজার জিনিস আমি দেখেছি সেটা হচ্ছে, অসংখ্য ব্যবহৃত টি ব্যাগ ছাদে ঝুলছে। অনেকের কাছে এইসব ব্যাপারে জানতে চেয়েছি এ নিয়ে কারও বিকার আছে বলে তো আমার মনে হয়নি।

অবাক লাগে আমার কাছে। যেখানে সাহিত্য কপকপ করে গিলে খান আমাদের এ দেশের কলমবাজরা তাঁদের এ নিয়ে বিকার না থাকার কারণটা কি? হবে হয়তো বা কোন মারফতি বিষয়, যা আমাদের জানতে নেই।

বৃত্ত এবং সরলরেখা!

জ্ঞান বলতে আমি মোটাদাগে যা বুঝি, জ্ঞান হচ্ছে একটা সরলরেখার মতো। ক্রমাগত এগুতে থাকবে, থামাথামি নাই, আমৃত্যু।

অ-জ্ঞান হচ্ছে একটা বৃত্ত এই বৃত্তে একজন ঘুরপাক খেতে থাকবেন, তিনি যত দুর্ধর্ষ জ্ঞানধারীই হন না কেন!

আমার অসম্ভব পছন্দের একজন মানুষ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন জ্ঞানী, অকপট, বিনয়ী, অকুতোভয়! তাঁর বিভিন্ন দিক আমাকে আমাকে বড়ো টানে। প্রায়শ ঠান্ডা শ্বাস ফেলি, তাঁর মতো মানুষের এ দেশে বড্ডো অভাব।

তিনি এটা অজস্রবার বলেছেন, সম্প্রতী আবারও বলেছেন বাচ্চাদের উপদেশ দিতে গিয়ে, 'খবরদার টিভি দেখবে না, বই পড়বে'। ভালো উপদেশ সন্দেহ নেই।

তিনি টিভি দেখার ঘোর বিরোধী- অসংখ্যবার এটা জাঁক করে বলেছেন, 'আমার প্রচারিত নাটকগুলো দেখতে পারিনি, আমার তো টিভি নাই কারণ আমি টিভি জিনিসটাকে দু-চোখে দেখতে পারি না'। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আফসোস, এই অসাধারণ মানুষটা যখন বৃত্তে আটকা পড়েন দীর্ঘশ্বাস ফেলতেও কষ্ট হয়।

একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক!

আজ খুব ভোরে ঘুমটা ভাঙ্গল। বড়ো অস্থির অস্থির লাগছিল।

কখনও কখনও মানুষ নিজেকে সহ্য করতে পারে না- তাকাতে পারে না নিজের চোখের দিকে।
আমার আস্ত একটা বই বের হলো অথচ আমি ১ বছর যাদের সঙ্গে কাটিয়েছি, তাদের একটা লেখা ছাপা হবে না! নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছিল। মায়া বড়ো বাজে জিনিস, কাঠের টেবিলে বসে দীর্ঘ সময কাজ করলে সেই টেবিলটার প্রতি মায়া পড়ে যায়। ১০০জন ব্লগারের পছন্দসই লেখার একটা বই বের করতে পারলে আমার চেয়ে সুখি
কেউ হতো না।

অন্যরা চেষ্টা করেছিলেন, ব্লগারদের নিয়ে বই বের করা হয়েছিল কিন্তু ভঙ্গিটা আমার পছন্দ হয়নি। কাহিনীর ভেতর গল্প চলে এসেছিল, নাকি রাজনীতির ভেতর পলিটিক্স ঢুকে পড়েছিল সে এক গবেষণার বিষয়। আমার মনে আছে ওই সাইটেই ওইসব নিয়ে আমি একটা কঠিন পোস্ট দিয়েছিলাম।

যাই হোক, আমি নিশ্চিত, আমার বইয়ের প্রকাশককে বলে লাভ হবে না। বেচারার দোষ দেই কিভাবে? আমার মতো অখ্যাত লেখকের কয়টাই বা বই বিক্রি হয়? প্রকাশকের বিমর্ষ মুখ দেখে দেখে আমি ক্লান্ত। জোর করে একটা দাবী করব সেই শক্তি আমার কই!
আমি যা কখনও করিনি, আজ করলাম, লজ্জার মাথা খেয়ে। কাতর হয়ে তাঁকে বললাম, ১টা বই বের করে দিতে পারেন?
তিনি বললেন, আপনার কি মাথা খারাপ! আপনি জানেন আজ কতো তারিখ?
আমি বললাম, জানি। ১৯ ফেব্রুয়ারি।
মেলার আছে আর ক-দিন? এটা ২৮ শে মাস। কীসব পাগলামীর কথা বলেন...!

তিনি সাফ সাফ বলে দিলেন, আপনার বই হলে আমি ভেবে দেখতে পারি, কিন্ত এটা সম্ভব না।
আমি নাছোড়বান্দা, আপনি একটু ভেবে দেখেন।
তিনি গররাজী হলেন, এই শর্তে, ১০০জন ব্লগারের লেখা নিয়ে বই বের হলে প্রত্যেকে কি ৫টা করে বই কিনবে?
আমি থমকে গেলাম, এটা কি করে বলি!
তিনি বললেন, তাইলে আপনি কি ক্ষতির দায়িত্ব নেবেন?

এই মুহূর্তে এই বিপুল দায়িত্ব নেয়ার অবস্থা আমার নাই। শালার মস্তিষ্ক কি সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়। আমি দুম করে বললাম, নেব।
তিনি বললেন, আপনার ম্যাটার কি রেডি আছে?
আমি আবারও থমকালাম, না। কিন্ত এরা লিংক দিলে ওয়ার্ডে কপি করে কোয়ের্কে কম্পোজ, পেজ মেকআপ করে দেব। রাতদিন কাজ করলে ২ দিনে আমি এটা করতে পারব।
তিনি বললেন, উহুঁ, ব্যাপারটা এত সোজা না। একেকজন একেক ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন, অজস্র বানান ভুল থাকবে। আপনাকে এডিট করার প্রয়োজ হবে। ভেবে দেখেন।
আমি অটল, আমি পারবো।

তিনি হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বললেন, বেশ, এখন বাজে দুপুর ১টা। আপনার হাতে ২ ঘন্টা সময় আছে। আপনাকে প্রচ্ছদের নামটা আমাকে কনফার্ম করতে হবে। কারণ, ৩ টার সময় আমি আমার বাকি বইয়ের প্রচ্ছদ ছাপাতে পাঠাবো। পরে শুধু আপনার এই বইয়ের প্রচ্ছদ আলাদাভাবে পাঠানো সম্ভব না। আপনি কি বইয়ের প্রচ্ছদের নাম ঠিক করেছেন?
একটা নাম আমার মাথায় ছিল: ভার্চুয়াল দেশমা। সঙ্গতিপূর্ণ একটা স্কেচও করা আছে। কিন্ত এই নাম সবাই চাইবে কিনা এটাও তো জানি না। ব্লগে এখনও কিছুই শেয়ার করা হয়নি। প্রকাশকের সঙ্গে কথা না বলে শেয়ার করি কি করে?

প্রকাশক এবার বললেন, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেন। আমার ধারণা, আপনি খুব বড়ো ধরনের সমস্যায় পড়তে যাচ্ছেন। দেদারসে গালি খাবেন, এতে আমার সন্দেহ নাই। অনেকেই আপনার এই উদ্যোগকে ভাল ভাবে নেবে না। ভাল হয়, আপনি আপনার সুহৃদদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। আর আমার পরামর্শ, আপনার মাথা এখন গরম, ভাত খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দেন। মাথা থেকে এটা ঝেড়ে ফেলেন।
তারপরও আমি বলি, নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে লেখা ছাপালে কেন সমস্যা হবে!

ব্লগের ক-জনের সঙ্গে কথা বললাম। আজ আর তাদের নাম বলে বিব্রত করি না কিন্তু হায়রে মিটিং, হায়রে দলবাজি! মিটিং কল দিতে হবে, ওমুককে ডাকা যাবে তমুককে ডাকা যাবে না, এইসব!
অনেকে কঠিন নিষেধও করলেন। তুমি এই সময়ে সব কিছু মিলিয়ে ম্যানেজ করতে পারবে না। খামাখা একটা নাটক হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। তখন কেউ খানিকটা সাহস দিল না, পাশে এসে দাঁড়ালো না।

আমি, একজন হেরে যাওয়া মানুষের মতো বহু দিন পর দুপুরে ঘুম দিলাম। কিন্ত একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল মস্তিষ্ক এই হেরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না। আমার আবেগটা একটা স্বপ্ন হয়েই রইল...। তবুও ক্ষীণ আশা, কেউ-না-কেউ এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে দেখাবে।

হুজুরেআলা সাইদাবাদী, যখন পালিয়ে বাঁচলেন!

না-না, হুজুরেআলা সাইদাবাদী পৃথিবী থেকে পালিয়ে গেছেন এটা বলা হচ্ছে না যে, তিনি দেহ ত্যাগ করে রুহ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন। তিনি কলকাতা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন!

এমনিতে সাইদাবাদী খুব সাধারণ জীবন-যাপন (!)করতেন, একটা নমুনা এই রকম-
তোপখানা রোডের ‘ক্রিসেন্ট’-এ এসে থামল টিনটেড গ্লাসের একটা সাদা মাইক্রোবাস। গাড়ি দিয়ে থেকে নেমে এলেন জেল্লাদার পোশাকে এক লোক। সঙ্গে চেলচামুন্ডা। একটা ঝাড় বাতি কিনলেন । দাম ৭৫,০০০ টাকা!
এটা ৯০ সালের কথা। এই জেল্লাদার লোকটি হচ্ছেন সায়েদাবাদী। আর ঝাড় বাতিটা কেনা হয়েছিল তাঁর আলিশান বসবার ঘরের জন্য, যার দেয়ালে সাঁটানো চকচকে ডামি পিস্তল, শান দেয়া নকল তলোয়ার, শো কেসে ক্রিস্টালের সামগ্রী, পা চুবানো কার্পেট, গলা ডুবানো সোফা!

হুজুরের আবিষ্কৃত জ্যোতি হিমেল আধ্যাত্মিক পাউডারের কথা আপনাদের মনে আছে? ওই সময় বাঘা-বাঘা মানুষ এই পাউডারের বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছিলেন!
বারো জন মন্ত্রী, এবং একজন ডক্টর কাম সম্পাদক মডেল হয়েছিলেন! পরে এটা নিম্নমানের ভুয়া পাউডার প্রমাণ হলে, এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল বাঁধলে পীর সায়দাবাদী পত্রিকান্তরে বিবৃতি দিয়ে মাফও চেয়েছিলেন।

’৯১-এর দিকে ইত্তেফাকসহ প্রচুর পত্রিকায় অজস্র বিজ্ঞাপন ছাপা হতো-বিষয় আর কিছু না, অনেক ভূতপূর্ব পাগলের বক্তব্য, হুজুর নাকি বেত মেরে মেরে এদেরকে ভালো করে ফেলেছেন। এদের মধ্যে দশ বছরের পুরনো পাগলও আছেন!সাইদাবাদীর কাছে এরা পত্রিকার মাধ্যমে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন!

হুজুর সাইদাবাদীর কল্যাণে প্রচুর মহিলা নাকি গর্ভবতী হয়েছেন (কোন এক বিচিত্র কারণে হুজুরের নুরানী চেহারার সঙ্গে ওই বাচ্চাগুলোর চেহারায় নুরানী ভাব থাকলে বা কেউ মিল খুঁজে পেলে এই বিষয়ে লেখককে দায়ী করা যাবে না)।

কলকাতার প্রবীর ঘোষ। ১৯৯০ সালে ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ বই প্রকাশ করে তিনি উম্মুক্ত চ্যালেঞ্জ দিয়ে রেখেছিলেন, বিশ্বের যে কোন দেশের যে কেউ যদি অলৌকিক কিছু প্রদর্শন করতে পারেন- তাকে ইন্ডিয়ান রুপি ৫০ হাজার টাকা দেয়া হবে এবং তিনি পরাজয় স্বীকার করে নেবেন। অসংখ্য পীর-সাধু তার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে হেরেছেন।

প্রবীর ঘোষের প্রতিবেদন অনুসারে, সাইদাবাদী যখন কোলকাতায় তখন একজন দম্পত্তিকে পাঠানো হয়, হুজুর সাইদাবাদীর কাছে। হুজুর সাইদাবাদী নাকি ডিম পড়া দেন। দম্পত্তির হাত থেকে ডিম নিয়ে হুজুর বোতল থেকে পানি ঢাললেন তারপর তোয়ালে দিয়ে মুছে একটি স্টিলের চামচ দিয়ে আঘাত করলে দেখা গেল ডিমটি সিদ্ধ হয়ে গেছে।
প্রবীর ঘোষ যে ডিমটিতে আগেই দাগ দিয়ে রেখেছিলেন, এটা সেই ডিম না।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও মজার। প্রবীর ঘোষ বললেন, আমার কাছ থেকে সাইদাবাদী একটা রিক্সার লোহার বিয়ারিং বল চাইলেন। তারপর সেটা নিয়ে লাল কালি দিয়ে একটা কাগজে উর্দু বা আরবিতে কিছু লিখে, একটা কবচে ঢুকিয়ে মোম দিয়ে বন্ধ করলেন। কালো সুতা দিয়ে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে সাইদাবাদী বললেন, এখন বাজে দশটি পঁচিশ। ঠিক একটা পঁচিশে কবচ খুলে দেখবেন আল্লার রহমতে বিয়ারিং বল সোনার বল হয়ে গেছে, আর না হলে বুঝবেন, আল্লার রহমত আপনার উপর হয়নি, লোহা লোহাই থেকে যাবে।
প্রবীর ঘোষ ওখান থেকে বেরিয়ে একটা চায়ের দোকানে ঢুকলেন এবং কবচটা খুলে দেখলেন, এর ভেতর একটা সোনার বল । তিন ঘন্টা লাগেনি, পনের মিনিটের মধ্যেই লোহা সোনা হয়ে গেছে!

এরপর রবিবার (২১ এপ্রিল ) যুক্তিবাদী সমিতির থেকে কয়েকজন গিয়ে সাইদাবাদীর কাছে চিঠি হস্তান্তর করেন। ওই চিঠিতে প্রকাশ্যে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয় কিন্তু সাইদাবাদী সেই চ্যালেজ্ঞ গ্রহন করেননি। বরং পরের দিন প্রবীর ঘোষকে টেলিফোন করে ‘বিশেষ সহযোগিতা’ চান। সাইদাবাদী আরও বলেন, প্রবীর ঘোষ সহযোগিতা করতে চাইলে তার সঙ্গে হিরা হোটের অথবা এয়ারপোর্টে দেখা করলে বিশেষ ব্যবস্থা হতে পারে। প্রবীর ঘোষ অনিহা প্রকাশ করলে সাইদাবাদী তার আধ্যাত্মিক সফর সংক্ষিপ্ত করে ২৩ এপ্রিল ঢাকা ফিরে আসেন!

সাইদাবাদী- একজন মহাপুরুষের জীবনী!

১. মাত্র ১০০ পয়সা, ১ টাকার বিনিময়ে প্রায় ৮ কোটি টাকার জমির মালিক হয়েছিলেন হুজুর সাইদাবাদী, ইসলামের সেবা করবেন এ অজুহাতে। ঢাকার প্রাক্তন মেয়র কর্নেল (অবঃ) মালেকের সহায়তায় এবং এরশাদের সম্মতি ছিল এ কাজে।

২. এরশাদ আমলে যখন আলু বীজের অভাব তখন গরীব চাষীদের মাঝে বিতরনের নামে সাইদাবাদী প্রায় ৬০০০ কার্টুন আলু বীজে আমদানির অনুমতি পান মন্ত্রী রুহুল আমীন হাওলাদারের সহযোগীতায়! পরে এই আলু বীজ মুন্সিগঞ্জে ৮০০ টাকা লাভে সাইদাবাদী বিক্রি করেন, এতে তার লাভ হয় ৫০ লাখ টাকা!

৩. ষ্টীল ইঃ কর্পেরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান নেফাউর রহমানের সহায়তায় সাইদাবাদী ঢেউটিন এবং স্ক্র্যাপ-এর বেশ কিছু কৌটা আদায় করেন এবং তার সহযোগীদের মাধ্যমে বাইরে বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন।

৪. সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিজান চৌধুরীর জামাতা ইসলাম সাহেবকে ব্যবহার করে সাইদাবাদী চিনির পারমিট যোগাড় করেন। ইদের সময় সেই চিনি বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন।

৫. ঢাকার মেয়র কর্নেল (অবঃ) মালেকের সহায়তায় সাইদাবাদী অবৈধ পদ্ধতিতে প্রচুর টেন্ডার লাভ করেন বলে ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছিলেন। পরে এইসব টেন্ডার দয়াগঞ্জের জনৈক নাজিম কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে লভ্যাংশ পকেটস্ত করেন।

৬. এরশাদ আমলে সাইদাবাদী তার মাথা ও কানের চিকিৎসার অজুহাতে ব্যাংকক যান। মূলত এটা ছিল বিজনেস ট্রিপ! ফেরার সময় নিয়ে এসেছিলেন আটটি ঢাউস সাইজের সুটকেস- প্রচুর বিদেশী পণ্য ছাড়াও ছিল দুইটি বিদেশী রিভলভার। কোন রকম কাস্টমস চেকিং এবং ডিক্লারেশন ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে তিনি এসব পণ্য দেশে নিয়ে প্রবেশ করেন!

৭. থাইল্যান্ডের একটি নিম্নমানের প্রসাধনীর পেটেন্ট নকল করে সাইদাবাদী বাজারে আধ্যাত্মিক জ্যোতি পাউডার ছাড়েন। নব্বই এর দিকে এই পাউডারের বিজ্ঞাপনে মডেল হন বারো জন মন্ত্রী এবং একজন ডক্টর সম্পাদক! কেমিক্যাল টেস্টে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ উপাদান কর্পুর এবং অন্য এমন সব উপাদানে এই পাউডার তৈরী হয়েছে, যে সব উপাদান উন্নত দেশে নিষিদ্ধ। বিপুল টাকা মুনাফা করেন এই পাউডার দিয়ে, ড্রাগ কন্ট্রোল অথরিটির কোন অনুমতি না নিয়ে। পরে পত্রিকার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করেন!

৮. মুন্সিগঞ্জের রামপাল, ধলা এবং শনির আখড়ায় অর্থ এবং পেশীর প্রভাব খাটিয়ে প্রায় ২০০ বিঘা জমি কেনেন। এইসব জমির অনেকেই নায্য মূল্য পায়নি বলে অভিযোগ করেন।

৯. সাইদাবাদীর আরেকটি ব্যবসা ভক্তদের দেয়া নজরানা। প্রতি দর্শনার্থীর কাছে দশ টাকার টিকেট বিক্রি করে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আয় করেন বলে দরবার শরীফের কর্মচারী সূত্রে জানা যায়।

১০. প্রতি বছর ওরস উপলে দরবার শরীফে আলাদাভাবে বিপুল অংকের নজরানা জমা পড়ে। জনশ্রুতি আছে, অনেক ব্যবসার ডিল সাইদাবাদীর মাধ্যমে এখানে হয়ে থাকে।

১০. বিভিন্ন পত্রিকায় সাইদাবাদীর যে সব আধ্যাত্মিক বিজ্ঞাপন দেখা যায় তার অধিকাংশ বিলই তিনি পরিশোধ করেন না। বিল চাইলে সাইদাবাদী কখনো হুমকীর সুরে, কখনো বা নরম সুরে বলেন, ভাইজান বিল আর কি দিব, যান আপনার জন্যে দোয়া করব।

আমাদের স্ক্রিপ্টের বড্ড অভাব

মার্কিন ৭ম নৌ বহরের টাস্ক ফোর্স ইতিমধ্যে মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে দ্রুত বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। মার্কিন এই বহরে ছিল পারমানবিক শক্তি চালিত বিশাল বিমান জাহাজ এন্টারপ্রাইজ এবং আরও ৬টি যুদ্ধজাহাজ! এ ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অজুহাত ছিলো: বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্যই ৭ম নৌ বহরকে এই এলাকায় (চট্টগ্রামে) আনা হচ্ছে। এই যুক্তি মার্কিন জনসাধারণের কাছেও গ্রহনযোগ্য ছিল না। কারণ আমাদের যৌথ কমান্ড ১১ ডিসেম্বর থেকে বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে ঢাকা বিমানবন্দর মেরামত করার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু মার্কিন নাগরিকদের এই সময় ঢাকা ত্যাগ করার কোন লণ দেখা যায়নি!
…নিয়াজী অবশ্য তখনো নিরাপদে ঢাকায় বসে হুংকার দিচ্ছিল: প্রতি ইঞ্চি জায়গার জন্য একটি প্রাণ বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবো।
…রাও ফরমান আলী কিন্তু ঠিকই বুঝেছিল, খেলা শেষ! অপারেশন জেনোসাইড এর অন্যতম কারিগর ঠিকই বুঝতে পেরেছিল, পরাজয় অবশ্যম্ভাবী! মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে ১১ ডিসেম্বর তিনি যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘ সদর দফতরে এক আবেদন জানান। ফরমান আলী এখানকার সকল পাকিস্তানীকে অপসারণের ব্যবস্তা করার অনুরোধও করেন।

…ইয়াহিয়ার তখনো আশা, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন তাঁকে উদ্ধার করতে নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে। নিয়াজীকে তিনি আরেকটু অপেক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেন।
…চট্টগ্রাম সেক্টরে আমাদের (রফিক-উল-ইসলাম বীর উত্তম) সকল সৈন্য ৯ই ডিসেম্বর বিকেলের মধ্যে শুভপুর সেতু বরাবর ফেনী নদী পার হয়ে যায়। সামনে শত্রুরা কোথায় কি অবস্তায় আছে পর্যবেণের জন্য আমরা যথারীতি টহল দল আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পাকিস্তানীরা মিরেশ্বরাই ছেড়ে যাচ্ছে বলে ১০ই ডিসেম্বর একজন গেরিলা বেস কমান্ডার আমাকে খবর দেন।

…আমি সাথে সাথেই মিরেশ্বরাই দখল করার জন্য একটি ব্যাটেলিয়ান পাঠিয়ে দেই।
…আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
…পথে এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তোমরা জানো না, কিছুদিন আগে ঈদের সময় চাঁটগায়ে একটা লোকাল ট্রেন থামিয়ে ওরা সকল বাঙ্গালী যাত্রীকে খুন করেছে। প্রায় এক হাজার হবে। আমার মেয়ে, নাতী, নাতনী ওরাও ছিল- আর বলতে পারবো না
…তোমরা এগিয়ে যাও, তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাও।

…বঙ্গোপসাগরে ৭ম নৌবহরের অনুপ্রবেশে পরিস্তিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।
…তাই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা চট্টগ্রাম মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেই। সেই উদ্দেশ্যে ভারতের ২৩ ডিভিশনের ৮৩ ব্রিগেড লাকসাম থেকে দ্রুত যাত্রা শুরু করে এবং কুমিরার কাছে আমাদের সাথে যোগ দেয়। অন্যদিকে ভারতের বিমান বাহিনী ও ইস্টার্ন ফিট পাকিস্তানি অবস্তানগুলোর উপর অবিরাম বোমা বর্ষন করে চলছিলো।

…পোর্ট অচল করে দেয়ার জন্যই এই আক্রমণ চলছিল। পোর্টের চ্যানের প্রায় পুরোপুরি বন্ধ!
…মুক্তিযোদ্ধারা খবর নিয়ে এলো যে প্রচুর পাকিস্তানী অফিসার ও সৈন্য কক্সবাজার হয়ে স্থলপথে বার্মায় পালাবার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবার জাহাজে করে কেটে পড়বার চেষ্টা করছে। কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজেকে বিদেশী জাহাজের মতো রং লাগিয়ে এবং বিদেশী পতাকা উড়িয়ে ছদ্মবেশে পালাবার জন্য প্রস্তত রাখা হয়েছে।
…এই খবর মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের ইস্টার্ন ফিটকে পাঠালে ইস্টার্ন ফিট সতর্ক হয়ে যায়। ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজ ভীক্রান্ত এর গোলায় তিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানীদের তখন মনে হচ্ছিল পালিয়ে যায়া ইদুরের মতো!

(সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ/ দলিলপত্র: দশম খন্ড/ সশস্ত্র সংগ্রাম/ পৃষ্ঠা নং: ৪৮-৫১)

মুক্তিযুদ্ধে, তাহের- স্যালুট ম্যান

তখনকার পাকিস্তান আর্মির এক বিস্ময়কর কমান্ডো মেজর আবু তাহের। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

বাংলা একাডেমীর দলিলপত্রের সূত্রমতে, লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের বলেন: জুলাই মাসের ২৫ তারিখ বাংলাদেশের পথে ভারতে রওয়ানা হই। আমার সঙ্গে ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন, ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী, মেজর মঞ্ছুর ও তার স্ত্রী ছেলেমেয়ে এবং ব্যাটম্যান।
২৭শে জুলাই দিল্লী এবং আগস্ট মাসের মাসের প্রথম সপ্তাহে মুজিবনগর পৌঁছাই। আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এম, এ, জি ওসমানী আমাকে ১১ নং সেক্টরের দায়িত্ব দেন।


১৫ আগস্ট আমি মাত্র ১৫০জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সন্ধ্যার দিকে কামালপুরে পাক আর্মির শক্ত ঘাটি আক্রমণ করি। আমাদের অস্ত্র বলতে তখন ছিল কেবলমাত্র কয়েকটা এল এম জি, রাইফেল এবং কিছু স্টেনগান! যুদ্ধ চলে ২ ঘন্টা। আমাদের আক্রমণে পাক আর্মির ১৫/১৬ জন নিহত হয়, আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আহত হয় ১৫ জন।

১১ নং সেক্টরের কমান্ড এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি লক্ষ করলাম, মুক্তিযোদ্ধারা বিশৃঙ্খল এবং বিপর্যস্ত , হতাশ। আমি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য বাহিনীকে পুনর্গঠিত করা শুরু করলাম। সম্মুখসমর বাদ দিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালাবার নির্দেশ দিলাম।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমার সেক্টরে প্রায় ২০ হাজারের মত মুক্তিযোদ্ধা কাজ করছিলেন। …এখানে একটি মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং ক্যাম্প খুলি এবং ট্রেনিং দেয়া শুরু করি। নভেম্বর মাস পর্যন্ত সবার হাতে অস্ত্র না গেলেও ১০ হাজারের মতো মুক্তিযোদ্ধা প্রশিকক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

…আমার হেডকোয়ার্টারে কেবলমাত্র সাধারণ কৃষকদের নিয়ে আলাদা ট্রেনিং ক্যাম্প খুলি। এইসব সাধারণ কৃষক পরবর্তীতে যুদ্ধেক্ষেত্রে যে কোন সামরিক ট্রেইন্ড সৈনিকের চাইতেও বেশী দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। এর কারণ সম্ভবত এই জন্য- ওইসব অধিকাংশ কৃষক ছিলেন পাক আর্মির দ্বারা অত্যাচারিত। তাঁরা পুড়ছিলেন প্রতিহিংসার আগুনে।

…১৩ নভেম্বর, ৫টি কোম্পানী নিয়ে ভোর ৩টায় কামালপুরে আমাদের তীব্র আক্রমনে পাকসেনাদের ১ জন মেজরসহ ২টি কোম্পানী আমরা পুরাপুরি নিচিহৃ করে দেই।
আমরা জয়ের আনন্দে অধীর। তখন সকাল ৯টা। গুলির আঘাতে আমি গুরুতররূপে আহত হই। আমার ১টি পা নষ্ট হয়ে যায় ।
আমার অনুপস্থিতিতে স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহ সেক্টরের দায়িত্ব হাতে নেন।
 

(সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪০-৬৫৭)

*কর্নেল তাহের সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যাবে এই সাইটে:
http://www.col-taher.com/

**তাহেরকে নিয়ে আরও কিছু লেখা। কর্ণেল তাহের তোমাকে কি স্পর্শ করতে পারি: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_8805.html 

৭১ এ হত্যা, চীফ কর্নেল রহমান

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ। চীফ কর্নেল মনজুরুর রহমান। এই কলেজের অসম্ভব প্রিয় একটি মুখ।

যুদ্ধের সময় ক্যাডেট কলেজ থেকে সবাই পালিয়ে যান কিন্তু কর্নেল রহমান কয়েকজনের সঙ্গে থেকে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার পাশাপাশি তিল তিল করে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যেতে তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না।

পাক আর্মি ঘিরে ফেলে একদিন এই কলেজ। নেতৃত্ব দিচ্ছিল ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ইকবাল। সঙ্গে ঝিনাইদহের অল্প কয়েকজন স্থানীয় মানুষ। টমেটো নামের একজন মিথ্যা অভিযোগ করে, কর্নেল রহমান তার পরিবারের লোকজনকে মেরে ফেলেছেন।

পাক আর্মিরা একেক করে মারা শুরু করে।

পাক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কর্নেল রহমানের কথা কাটাকাটি হয়। কর্নেল রহমান বলেন, 'আমি একজন সামরিক অফিসার। আমাকে এভাবে মারা অন্যায়। আমার অপরাধের বিচার একমাত্র সামরিক আদালতেই হতে পারে। একজন আর্মি কর্নেল একজন ক্যাপ্টেনের কাছে যে আচরণ পেতে পারে- আমাকে সেটা দেয়া হচ্ছে না কেন'?

কর্নেল রহমানের কোন যুক্তিই এদেরকে প্রভাবিত করলো না। কর্নেল রহমান মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হলেন। হাত থেকে খুলে দিলেন ঘড়ি, পকেট থেকে বের করে দিলেন কলেজের চাবি, যা ছিল তাঁর কাছে। একজন সিপাই তাঁর ঘড়ি উঠিয়ে নিজের হাতে দিয়ে দেখলো কেমন মানাচ্ছে তাকে আর হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকলো।

কর্নেল রহমান প্রাণ ভিক্ষা চাইতে রাজী হলেন না। শুধু ৫ মিনিট সময় চাইলেন।

ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন নিজ হাতে লাগানো গোলাপ গাছটার দিকে। হাঁটু গেড়ে বসলেন। কি যেন বিড়বিড় করে বলছিলেন। দূর থেকে শুধু ঠোঁট নড়া দেখা গেল। তারপর হাত তুলে মোনাজাত করলেন। মোনাজাত শেষ করে বললেন, আয়্যাম রেডী, তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেনের চোখে চোখ রেখে।

ক্যাপ্টেন ইকবাল পরপর ৩টা গুলি করলো।

লুটিয়ে পড়লেন কর্নেল রহমান। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে প্রায় শোনা যায় না একটা স্বর শোনা গিয়েছিল, 'মা আয়েশা, তোকে দেখে যেতে পারলাম না'।

(সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড, পৃষ্টা: ৬০৫-৬০৮)

সাকা চৌ, রাজকোষে কত টাকা দিলেন?

আমাদের দেশের মহান একজন মানুষ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তার মেয়ের বিবাহ দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ- ফরয কাজ!

তথ্যমতে, তিনি মেয়ের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে ৮ লাখ দাওয়াতীকে খাইয়েছেন! বেশ, ৮ লাখ কেন, তিনি যদি ১৪ কোটি মানুষকেও দাওয়াত করে খাওয়ান, কার কি বলার আছে! মেয়ে ওনার, টাকা ওনার- আমরা বলার কে?

ভারী দিলখোলা মানুষ! নিজের আপন ভাইরা বিয়েতে উপস্তিত ছিলেন না। যাযাদিনে, সাকা চৌ নির্বিকার ভঙ্গিতে, লাখ লাখ দাওয়াতিদের দেখিয়ে বললেন, 'আমার কয়েকজন ভাই আসে নাই তো কি হয়েছে? এই যে লাখ লাখ ভাই এসেছে- এরাই তো আমাকে কফিন কাঁধে করে কবরে নিয়ে যাবে'! বেশ-বেশ!

সব তথ্যই আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে মুগ্ধ হচ্ছি। কিন্তু আমি প্রয়োজনীয় একটা তথ্য খুঁজে পাচ্ছি না। সেটা হচ্ছে: বাংলাদেশে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন নামে একটা আইন চালু আছে। আমার জানামতে, এই আইন এখনো বহাল আছে, বাতিল করা হয়েছে বলে তো শুনিনি! অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ১০০ জনের বেশী অতিথিকে দাওয়াত দিলে, প্রত্যেক অতিথির জন্য নির্দিষ্ট অংকের ফী সরকারী কোষাগারে জমা দিতে হয়। ফীর অংকটা সম্ভবত, প্রতি জনের জন্য ১০ টাকা করে।

ওই হিসাবে মহান সাকা চৌধুরীর ৮০ লাখ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা হওয়ার কথা! হয়েছে কি? সাকাচৌ এই দেশের জন্য বাজে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলেন।

সবই পণ্য, বিক্রির জন্য

আলকাতরা থেকে উড়োজাহাজ- মায় তথ্য, সবই আসলে পন্য, বিক্রির জন্য।

আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, কে কিভাবে বিক্রি করেন, তার উপর! যিনি যতো ভালভাবে সুগার কোটেড মোড়কে মুড়িয়ে, চকচকে করে বিক্রি করতে পারেন- তিনি ততোটাই সফল! তাঁর গুনগানের শেষ নেই! কে মরলো কে বাঁচলো, কে বিরক্ত হলো, তাতে কি আসে যায়!
হকারকে দেখেছি, বাস, রেলগাড়ীতে কান পাকার ওষুধ বিক্রি করতে সবাইকে চরম বিরক্ত করে- কিছু বললে বলে, ভাত খামু কি আপনের ঘরে গিয়া! হক কথা!

কে জানে, কোন একদিন, কেউ হয়তো বিচিত্র কায়দা কানুন করে, নরকে যাওয়ার টিকেট বিক্রি করবেন। পাবলিক হাসিমুখে দেদারসে কিনবে। বেহেশত যাওয়ার টিকেট বিক্রি তো অলরেডি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে!! পাক্কা মুসলিমরা (তাঁদের দাবী মোতাবেক) দেদারসে বিক্রি করছেন, বাদামের খোসার মতো!

১০.০৯.০৬ যায় যায় দিন প্রথম পাতায় বিপুলায়তনে ৬ কন্যার ছবি ছাপে- তিন কন্যার দাঁতসহ, দুই কন্যার দাঁতছাড়া (স্মর্তব্য: আমি ছবির কথা বলছি)! ক্যাপসনে অবশ্য বলা হয়েছে ৬ জন কিন্ত ছবিতে ৫জনের চেহারা মোবারক দেখা যাচ্ছে। একজন মিসিং- ওই কন্যা অদৃশ্য মানবী হয়তো বা! মিসিং ওই কন্যার দাঁত আছে কিনা এটা অবশ্য বোঝা গেল না!

এই কন্যারা দারুচিনি দ্বীপে চারুচিনির বানিজ্য করবে- এই সিনেমার নায়িকা হবে। তা করুক, বানিজ্য ভাল জিনিস। স্টার হতে হতে ম্যাগা স্টার হয়ে যাক! এখানেই শেষ না, এই ৬ কন্যার মধ্যে থেকে মাত্র একজন নির্বাচিত হবে। কে হবেন এটা আপাতত রহস্য!
ব্রাভো ব্রাভো! জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় এমন পৃথুল আকৃতির ছবি, এমন জাতীয় সংকটের ছবি না এসে উপায় কি!

আমরা নির্বোধ পাঠকরা কেন যে বুঝতে চাই না, প্রথম পাতায় জায়গা কী অপ্রতুল! মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ মিয়া না খেতে পেয়ে দড়িতে ঝুলে পড়বে- বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের খালি বাক্স দেশে আসবে, এগুলো ভেতরের পাতায় ছোট করে অদৃশ্য অদৃশ্য ভঙ্গিতে না ছাপিয়ে উপায় নেই? ওখানে জায়গার সমস্যা হলে, না হয়, এন্টারটেইনমেন্ট পাতা বরাদ্দ থাকবে এইসব ছাইপাশ খবর ছাপাবার জন্য।

এক দফা এক দাবী- যে দিন ৬ কন্যার ১ কন্যা নির্বাচিত হবে, সেই দিন প্রথম পাতায় পুরোটা জুড়ে তার ছবি ছাপতে হবে। প্রথম পাতায় আর কোন খবর থাকবে না, এই দাবী করা কি খুব অন্যায় একটি জাতীয় দৈনিকের (দাবীমতে) কাছে ?

সব যুদ্ধ স্টেনগান দিয়ে হয় না!

মুক্তিযুদ্ধের তেমন বিশেষ ছবি আমাদের নাই!

ওই সময় আধুনিক তো দূর অস্ত - ক্যামেরাই বা আমাদের দেশের কয়জনের কাছে ছিল! নাইব উদ্দিন আহমেদ। যে অল্প ক-জন মানুষ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দূর্লভ কিছু ছবি আমাদের উপহার দিয়েছেন তাঁদের একজন!
একজন মুক্তিপাগল মানুষের সবটুকু শক্তি নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, সামান্য একটা ক্যামেরা নিয়ে! স্টেনগানের চেয়েও ঝলসে উঠেছে তাঁর হাতের ক্যামেরা!
একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে তিনি পাক আর্মি এবং এ দেশে তাদের সহযোগী রেজাকার, আল বদর, আল শামসদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বর্হিবিশ্বে পাঠিয়েছেন তাঁর দূর্লভ ছবিগুলো। সমস্ত পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে পাক আর্মির নৃশংসতা, বর্বরতা! গঠিত হয়েছে জনমত, বেড়েছে আন্তর্জাতিক ধিক্কার! সব বিশ্ববিদ্যালয় তখন পাক আর্মির টর্চার ক্যাম্প।

একদিন নাইব উদ্দিন আহমেদকে আটকানো হয়। ফটোগ্রাফারের পরিচয়পত্র দেখে পাক আর্মির মেজর কাইয়ুম নাইব উদ্দিনকে বললেন, তুমি কি ক্যামেরা ঠিক করতে পারো, আমার ক্যামেরাটায় সমস্যা হচ্ছে?
নাইবউদ্দিন ক্যামেরাটা দেখেই বুঝলেন, ক্যামেরা ঠিক আছে। শুধু লক করা অবস্থায় আছে, লকটা খুলে দিলেই হয়ে যাবে। ক্যামেরার লক ওপেন করে দেখলেন, আসলেই ঠিক আছে এবং ক্যামেরায় ফিল্ম ভরা। এ সময় তিনি দেখতে পেলেন, এখানে কিছু লোককে বেঁধে রাখা হয়েছে। খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় এলিয়ে পড়ে আছে একজন ধর্ষিতা। কাছেই কিছু বাড়ি পুড়ছে দাউ দাউ করে।

তিনি ক্যামেরা ঠিক করার ছলে, খুব দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিলেন পাক মেজরের ক্যামেরা দিয়েই! তারপর আবার লক করে মেজরের হাতে ক্যামেরা ফেরত দিয়ে বললেন, এখানে তো ঠিক করা সম্ভব না, ময়মনসিংহে তার অফিসে আসলে ক্যামেরা ঠিক হয়ে যাবে। পরদিন মেজর নাইব উদ্দিনের অফিসে এলে, নতুন একটা ফিল্ম কিনে আগের ফিল্মটা মিছে ছল করে রেখে দিলেন।

সেই দূর্লভ ছবির অনেকগুলো মুক্তিযুদ্ধের ১৬ খন্ডে ছাপা হয়! একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসে নাইব উদ্দিন খবর পেলেন ধর্ষিতা এক তরুণী ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে রয়েছে। কিন্তু ডাক্তাররা তাঁর পরিচয় জানালে চাচ্ছিল না!
খেয়াল করলেন, ওয়ার্ডের এক কোনে এক তরুণী বুক ফাটা শব্দ করছে, আধ জবাই পশুর মতো। হাত দিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ছে। কোন হুঁশ নেই। বদ্ধ পাগল। নাইবউদ্দিন বুঝতে পারলেন, এই সেই তরুণী!

ওই অবস্থায় তিনি সেই তরুণীর কিছু ছবি তুললেন। তখন তরুণীটির অমানুষিক, জান্তব চিত্কারে নাইব উদ্দিনের মাথা খারাপের মতো হয়ে গিয়েছিল, তাঁর হাত থেকে ক্যামেরা পড়ে গিয়েছিল। তিনি সেই জ্বলন্ত চোখের কথা ভুলতে পারছিলেন না! অন্যরা ছবি তুলতে নিষেধ করছিল কিন্তু সেই কুমারী তরুণীটির মা ছবি তোলার জন্য বলেন এবং নাইব উদ্দিনের হাত ধরে বলেছিলেন, বাবা, ওর ছবি তুলে বিদেশে পাঠাও। সবাই দেখুক পাকিস্তানীরা আমাদের উপর কী অত্যাচার করছে!
নাইব উদ্দিন সে রাতে ঘুমাতে পারেননি। সেই জ্বলন্ত চোখ, সেই অপার্থিব দৃশ্য! তাঁর এক পর্যায়ে হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেল। পরেরদিন তিনি চিকিত্সার জন্য ইসলামাবাদ চলে যান। সঙ্গে নিয়ে যান তাঁর তোলা ছবিগুলো!

*পাক আর্মিরা যে কোরআন শরীফ পুড়িয়েছিল এ ছবিও তিনি তুলেছিলেন। কিন্তু এখন ছবিটা আমি খুজেঁ পাচ্ছি না।
**এখানে জনাব, নাইব উদ্দিন আহমেদের ২টা ছবি দেয়া হলো।
***নাইব উদ্দিন আহমেদের এই সাক্ষাত্কারটি নিয়েছিলেন: আনন্দ রোজারিও/ ভোরের কাগজ, ১৫.১২.৯৩

অপারেশন জ্যাকপট

…আমার ক্যাম্পে আগত অফিসার বললেন, আমি কয়েকজন নিপুন সাতারু বাছাই করতে চাই, তাদেরকে তরুণ এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। (পাক সৈন্যদের) নৌ পথে সৈন্য অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহনের ব্যবস্থা বানচাল করা এবং নৌযানগুলে কে ধ্বংস করা।

অভিযানের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় অপারেশন জ্যাকপট!

…২৮ জুলাই আমি ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং এর সঙ্গে বসে চুড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরী করছিলাম।

…চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্নফুলি নদীর ম্যাপ ও চার্ট পর্যালোচনা করি। চন্দ্রতিথি, আবহাওয়ার অবস্থা, জোয়ার ভাটার সময় বাতাসের গতি প্রকৃতি, স্রোতের গতি এবং আরো অসংখ্য তথ্য আমাদের আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করে।

…অপারেশনে আমাদের নৌ মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় কোন ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করবে অখবা পাক আর্মীদের অবস্থান ইত্যাদি। ১০ আগস্ট অপারেশন জ্যাকপট শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ৬০ জন তরুণকে তিন ভাগে ভাগ করি। তিনটি গ্রুপেই সার্বিক কমান্ডে থাকবেন একজন কমান্ডার। তাদের সকলের কাছে থাকবে লিমপেট মাইন, এক জোড়া ফিন (সাতারের সময় পায়ে লাগানো হয়) এবং শুকনো খাবার। প্রতি তিনজনের কাছে থাকবে একটা করে স্টেনগান। গ্রুপ কমান্ডারকে দেয়া হলো হালকা অথচ শক্তিশালী ট্রানজিস্টার।

…তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রতিটি সঙ্গীত অনুষ্ঠান শুনতে হবে খুব মন দিয়ে। ওই সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই জানানো হবে কখন অপারেশন শুরু করতে হবে!

…১৩ আগস্ট কলকাতা রেডিও থেকে প্রচারিত হলো বাংলা গান আমার পুতুর আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ী। এই গানটির মাধ্যমেই কমান্ডার প্রথম সংকেত লাভ করেন। তিনি জানেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে দ্বিতীয় গান প্রচারিত হবে, ওই গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে ট্রানজিস্টার ফেলে দিতে হবে, শুরু হয়ে যাবে অপারেশন জ্যাকপট!

…১৪ আগস্ট প্রচারিত হলো, দ্বিতীয় গান, আমি তোমায় যতো শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাইনি কোন দান। শুরু হয়ে গেল অপারেশন জ্যাকপট! গেঁয়ো পোশাক পরা একদল লোক ফলমুল মাছ, শব্জীর ঝুড়ি নিয়ে ফেরী নৌকায় উঠলো। পাক আর্মিও সন্দেহও করতে পারেনি, ওইসব ঝুড়ির নীচে আছে লিমপেট মাইন, ফিন, স্টেনগান!
…কিন্তু দূর্ভাগ্য, এই দলের অভিযান একদিন পিছিয়ে গেল- ৩ নং গ্রুপ ছাড়া সকলেই রাতের মধ্যেই চরলায় পৌঁছে গিয়েছিল। জেটিতে নোংগর করা পাক আর্মিদের এমভি আব্বাসে আছে ১০৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম। এমভি হরমুজ এ আছে ৯৯১০ টন সামরিক সরজ্ঞাম।
…মাথাটা পানির উপর রেখে আমাদের ছেলেরা পৌঁছে গেছে। তারা পাক আর্মির জাহাজগুলোতে লিমপেট মাইন লাগিয়ে দিয়েই নিঃশব্দে নদীর ভাটিতে ভেসে যায়।

…রাত ১টা ৪০ মিনিট। কান ফাটানো আওযাজে বন্দর নগরী কেঁপে ওঠে।

…১টা ৪৫। আরেকটি বিস্ফোরণ। তারপর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম। একটির পর একটি বিস্ফোরনে চট্টগ্রাম তখন থরথর করে কাঁপছে।

…পাক আর্মির আল আব্বাস, হরমুজ দ্রুত ডুবতে থাকে! আশেপাশের জাহাজগুলো প্রচন্ড রকম তিগ্রস্থ হয়। একদিকে যেমন শত্রুর বিপুল সম্পত্তির, সমরাস্ত্রের ক্ষতি হয় তেমনি পাক আর্মিদের মিথ্যা দম্ভ এবং অহংকার, অহমিকা হয় চুর্ণ!

(একাত্তরের মার্চে রফিক-উল-ইসলাম সাবেক ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্র্টার, চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন পদে সেক্টর এ্যাডজুটেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।)
সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ (১০ম খন্ড)। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে-মেজর (অবঃ)রফিক-উল ইসলাম, বীর উত্তম।
*আফসোস, এইসব দুর্ধর্ষ নৌকমান্ডোদের প্রতি সুবিচার, যথার্থ সম্মান দেয়া হয়নি।

অটোগ্রাফ কড়চা

বইমেলায় অটোগ্রাফ দেয়ার ভয়ে স্টলে বসি না, এটা শুনে লেখালেখি ভুবনের মানুষদের কী হাসাহাসি! থু-থু, নিজের লেখা নিজেই পড়ে, হুহ, আবার কী একটা বা... হইছে!
অটোগ্রাফ জিনিসটার প্রতি আমার এলার্জি আছে, অন্য কারণে।
তবুও আমার যে দু-চারজন পাঠক আছেন, তাঁরা যখন দুম করে অটোগ্রাফ চেয়ে বসেন, তখন আমার মাথায় সব কেমন জট পাকিয়ে যায়! কি লিখব ভেবে পাই না।
 

দূর-দূর, দু-কলম লেখার চেষ্টা করলেই বুঝি লেখক হওয়া যায়! আগেও লিখেছিলাম: আমি নিজেকে বলি লেখার রাজমিস্ত্রি। একজন রাজমিস্ত্রি যেমন একের পর এক ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলেন; তেমনি আমিও একের পর এক শব্দের ইট বসিয়ে একটা কাঠামো দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। ওই নিষ্প্রাণ কাঠামো নামের বাড়িটার সবগুলো আলো জ্বলে উঠে যখন কোন পাঠক লেখাটা পড়েন, প্রকারান্তরে ছুঁয়ে দেন। 
তো, বললেই বুঝি অটোগ্রাফে কিছু লিখে দেয়া যায়! নিরুপায় আমি, পালাতে না-পারলে লজ্জায় লাল-নীল হয়ে হাবিজাবি কিছু একটা লিখে দেই।
একবার একজনকে কিছুই লিখে দিলাম না। উপরে কেবল একটা গোঁফ নীচে একটা চশমা। এই মানুষটার ছিল পেল্লাই গোঁফ আর আমার চশমা। তবে এও সত্য, যিনি একবার আমার অটোগ্রাফ নিয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার ভুলেও অটোগ্রাফের নাম নেননি। তিনিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন, আমিও।
কী আর করা, কপালের ফের!

আসলে সত্যি সত্যি লেখক যারা, তাঁরা ওড়নার মত গলায় একটা চাদর ঝুলিয়ে অটোগ্রাফে করকমলেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু টাইপের কঠিন কঠিন কিছু বাতচিত লেখেন। গালে হাত দিয়ে ফটো খিঁচান, ভাবুক যে। এঁরা আকাশ পানে তাকিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন- আকাশলোকের বাসিন্দা যে!

যাই হোক, এবারের বইমেলায় সহ-ব্লগার একজন, আমাকে পাকড়াও করলেন অটোগ্রাফ দেয়ার জন্য। আমি বললাম, অটোগ্রাফ যে দেব, ২ টাকা দেন, ক্যাশ। তিনি ভাবলেন, আমি রসিকতা করছি, সম্ভবত ২ টাকা নেব না। আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে ২ টাকা পকেটস্থ করলাম। আমি নিশ্চিত, বেচারা ভাবছিলেন, আরে, এমন লালচি মানুষ তো আর দেখি নাই!


হা হা হা, হলামই না-হয় লালচওয়ালা! আমাদের জীবনে গল্প করার মতো গল্পের বড় অভাব, তাঁর জন্য থাকুক না
একটা গল্প কে জানে, এই মানুষটা একদা তার নাতি-পুতির কাছে তিতিবিরক্ত ভাব নিয়ে গল্প করবেন: জানিস রে বেটা, 'মিথ্যা মিথ্যি' এক লেখক এক লাইন লেইখা ২ টাকা নিয়া নিল, চিন্তা কর! কী ডাকাতি!

আমি শুভ নামে প্রায় ১ বছর একটা ওয়েবসাইটে বেশ কিছু লেখা লিখেছিলাম, যার চালু নাম ব্লগিং। ওইসব ছাতাফাতা নিয়ে 'শুভ-র ব্লগিং' নামের একটা বই বের হয়েছিল। প্রথমে প্রকাশকের ঘোর আপত্তি ছিল। তিনি চাচ্ছিলেন, প্রেমের উপন্যাস। বই বের হওয়ার পর দেখি মানুষটা হড়বড় করে ফোনে একগাদা কথা বলেই যাচ্ছেন, আরে শোনেন, একটা না বিরাট ঘটনা হয়ে গেল।
আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাই, কি ঘটনা?
তিনি বিমলানন্দে বলে চলেন, এই দেশে বাংলা ব্লগিং-এর উপর এটাই হচ্ছে প্রথম বই।
আমি বললাম, আচ্ছা। 

আমার উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোন কারণ ছিল না। কারণ বইমেলা শেষ হলে এই মানুষটাই মুখ কালো করে বলবেন, মেলায় যে একটা মাত্রই বই বিক্রি হলো এটা কি আপনি নিজেই কাউকে দিয়ে খরিদ করিয়া ছিলেন।

ওই ওয়েবসাইটের বিখ্যাত প্রাপ্তির পু, সারিয়া তাসনিম, সহ-ব্লগারের একটা মন্তব্য ছিল এমন: "শুভ, একটা কথা দিতে হবে। আজ এখুনি। আপনি ঢাকায় আসবেন, আমরা মেলায় যাবো এবং 'শুভর ব্লগিং' নামের একটা বই আমি আপনাকে উপহার দিবো। এর আগে খবরদার বইয়ে হাত দিবেন না"।
কী সর্বনাশ! এ দেখি মার্শাল ল আইন!

আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তিনি
'শুভর ব্লগিং' বইটা কিনে দিলেন। আমি বললাম, এটায় একটা অটোগ্রাফ দেন। তিনি অটোগ্রাফ দিলেন কিন্তু মজা হচ্ছে, অটোগ্রাফটা ছিল বইয়ের উল্টা দিকে। তিনি চাচ্ছিলেন, ঠিক করে দিতে। আহা, তাহলে যে মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়, কি দরকার থাকুক না এমনই।

প্রাপ্তির জন্য আমি আমার একটা প্রেমের উপন্যাস দিলাম, 'তিতলি তুমিও '। লিখে দিলাম: "প্রাপ্তি, প্রবল আশা, একদিন তুমি এই বইটা পড়বে"।
সারিয়া তাসনিম আমার লেখার উদ্দেশ্যটা সম্ভবত ধরতে পারেননি। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম তাঁর ভাবনা, এই মানুষটা বেকুব নাকি, এইটা দিল কি মনে কইরা, এইটা কী বাচ্চার বই!

পুরনো যারা তাদের জানা আছে, প্রাপ্তি দুরারোগ্য রোগে ভুগছিল। অন্তত এই প্রেমের উপন্যাসটা পড়ার জন্য এবং তার ভালবাসা-বাসি মানুষের সঙ্গে হাত ধরে ঘুরে বেড়াবার জন্য, প্রকারান্তরে তার আয়ু প্রার্থনা করলাম; মন থেকে।
...
আমার মনে আছে, আমার বইয়ের প্রকাশকের কাছ থেকেও আমি একটা অটোগ্রাফ চেয়ে তাঁকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছিলাম। বিষয়টা এমন। একজন পাঠক একটা বই ফেরত নিয়ে এলেন, ভেতরের ম্যাটার হচ্ছে আমার একটা উপন্যাস 'তিতলি তুমিও'-এর কিন্ত প্রচ্ছদ আমারই অন্য একটা উপন্যাস 'নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না'র।

আমি গম্ভীর মুখ করে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে বললাম, এই বইটায় একটা অটোগ্রাফ দেন।
তিনি ভাল করেই জানেন, আমার মাথায় খানিকটা সমস্যা আছে। মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, আজ তো আমবস্যা পূর্ণিমা না, ঘটনা কী, কোন কারণে পাগলটা আজ খেপেছে!
তিনি মুখ শুকিয়ে বললেন, বিষয় কী, কি হয়েছে?

আমি বইটা দেখালে তিনি বললেন, উপস, বড়ো ভুল হয়ে গেছে। বাইন্ডিং ব্যাটা...।
আমি গম্ভীর, বেটা-মেটা বুঝি না।
ছাড়াছাড়ি নাই, অটোগ্রাফ। বইটা আমি হাতছাড়া করছি না। রেখে দেব।
তিনি হাসি গোপন করে বললেন, আমি লিখতে চাই,
ম্যান ইজ মর্টাল!
আমি বললাম, যা খুশি লেখেন, মর্টাল লেখেন, মর্টার লেখেন।
তিনি আটকে রাখা শ্বাস ছেড়ে খসখস করে লিখে দিলেন, ম্যান ইজ মর্টাল!


ওই বইটা যেমন আজও আছে আমার কাছে, সারিয়া তাসনিমের বইটাও যত্মে থাকবে এবং ২ টাকার নোটটাও।

কফিনের শক্ত পেরেকটা


আমি আগেও বলেছিলাম, আবারও বলি, ভাংচুরের নামে এরা সবচেয়ে মোটা পেরেকটা ঠুকছে এদের কফিনে। এ নিয়ে আমার একটা পোস্ট আছে, গণতন্ত্র- বড্ডো গুরুপাক।

৪ দিন আগে আমার অফিসটা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বুলডজার দিয়ে। যদিও এটা আমার নিজস্ব সম্পদ না, কিন্ত আমার বুক ভেঙ্গে আসছিল। পিতা যেমন তাঁর সন্তানের লাশ কবরে নামাবার সময় অস্ফুটে বলতে থাকেন, আহা, আস্তে নামাও না, ও বুঝি দুকখু পায় না। তেমনি আমারও গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছা করছিল, আহারে আহারে! হায়রে নির্বোধ মানুষ- জড় পদার্থের জন্য কী মায়া!

আমার নিজের না, ভাড়ার অফিস ছিল। কিন্ত পৈত্রিকসূত্রে আমরা প্রায় ৪৫ বছর ধরে ভাড়া ছিলাম। এখানে আমি আমার অফিসের পাশাপাশি লেখালেখি করেছি, কত লেখা লিখতে গিয়ে চোখের জলে ভেসেছি। কত স্মৃতি- এক লহমায় সব হারিয়ে গেল! অনেক প্রয়োজনীয় উপাত্ত হারিয়ে গেল। বিশেষ করে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অমূল্য উপাত্ত আমি হারিয়েছি। বুলডজারের সামনে আমার মতো ৩ টাকা দামের কলমবাজের দাঁড়াবার শক্তি কই! নপুংসক আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।

বেচারা বাড়িওয়ালার তো দোষ আমি খুঁজে পাই না। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে নিয়মিত খাজনা দিয়েছেন। এটা তাঁর কেনা জমি। ওদিন দুম করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, ব্রিটিশ আমলের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটা ম্যাপ নিয়ে এসে বলল, এটা তাদের জায়গা।

কাহিনীটা হচ্ছে, মহারাজা থেকে আসাম বেঙ্গল রেলরাস্তা করার জন্য জায়গা চেয়ে নিয়েছিল। রেলরাস্তা বানাবার পর এরা যখন দেখল, তাদের আর জমির প্রয়োজন নেই- মহারাজার কাছে উদ্বৃত্ত জমি ফেরত দিয়ে দেয়। মহারাজা তাঁর এই জমিগুলো বিভিন্ন লোকজনকে দান করেন, বিক্রি করেন।


বেশ, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, এই জায়গা রেলের। তাইলে ভূমি মন্ত্রানালয় ৫০ বছর ধরে নিয়ম করে খাজনা নিল কেন? এটা ভেঙ্গে ফেলার পেছনে যুক্তি কি? সরকার নিজের দখলে নিয়ে নিলেও তো পারত। বা বলত, ১ মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে এটা নিয়ে কি করা হবে। এটা রেলের, না ভূমির- এটা এরা নিজারা ঠিক করে নিয়ে বললেই তো পারত, এখন থেকে এটা অমুক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রনে। আপনি অমুক মন্ত্রণালয়কে রেভিনিউ দেবেন। এইসব সম্পদ ধ্বংস করে লাভটা কার হচ্ছে? কী পার্থক্য- আগে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সম্পদ বিনস্ট হতো, এখন কার নামে সম্পদগুলো বিনস্ট করা হচ্ছে।

লোকজন যে বলাবলি করে, ...ফকির বানায়া দিব। এটা কী সত্যি হবে?

এর পরিণাম কি সুদুরপ্রসারী এটা কি এঁরা বুঝতে পারছেন? এঁরা যে অসাধারণ কাজগুলো করছেন সব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জনগণকে কষ্ট দিয়ে। আজ যে সব অধিকাংশ সরকারী কর্মকর্তারা সাধু সাজছেন- জেলে, মজুর, পতিতা কার কাছ থেকে এরা ঘুস খাননি?

অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুনতে বড়োই ভালো লাগে। তিনি অবৈধ দখলদার হয়ে থাকলে কেন সরকার ৫০ বছর ধরে তাঁকে স্বীকার করল? তাইলে কি ধরে নেব ভূমি মন্ত্রণালয় এক সরকারের এবং রেল মন্ত্রণালয় অন্য সরকারের। আরেকটা বিষয়, যদি ব্রিটিশ আমলের ম্যাপ দিয়ে অবৈধ স্থাপনা নিশ্চিত করা হয়, বেশ তো, ভালই। তাইলে আমরা ব্রিটিশ আমলে ফিরে যাই! ওয়েল, ওই সময় লোকসংখ্যা কত ছিল? ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের এই পরিধিতে লোকসংখ্যা কত হবে- বড় জোর ৫০ লাখ।

রেল তার জায়গা সমস্ত খালি করে ফেলল- এখন এই আনুমানিক বাড়তি সাড়ে ১৩ কোটি মানুষের কি হবে? উপায় একটা আছে। এই বাড়তি সাড়ে ১৩ কোটি মানুষকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া হোক। সব সমস্যার সমাধান।

হরতাল নাকি গণতন্ত্রের ঢাল!

 
হরতাল নিয়ে আমি আরও লিখব, ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত- নাথিং গনা স্টপ মী! হরতালে আমার নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়- একটি পাখির কাছ থেকে গোটা আকাশটা ছিনিয়ে, ছোট্ট একটা খাঁচায় আটকে ফেলা! তার কানের কাছে অশুভ মন্ত্র অনবরত পড়তে থাকা। তুমি স্বাধীন, তুমি মুক্ত- উড়ে বেড়াও ডানা মেলে; ডানা তোমার ছিড়তে থাকুক একেক করে!

হরতাল প্রসঙ্গে এ দেশের সেরা সন্তান বা শক্তিশালী মানুষদের প্রতি আমার সীমাহীন রাগ আছে। এঁরা কী তুচ্ছ বিষয় নিয়েই না হইচই করেন অথচ হরতাল নিয়ে গা করেননি! কয়েকটা উদাহরণ দেই:
১. হুমায়ূন আহমেদ, এমন খুব কম বিষয় আছে, যেটা নিয়ে লেখেননি কিন্তু হরতাল নিয়ে তার কোন উপন্যাস নাই, বই নাই, নাটক নাই। অথচ মানুষটার কী বিপুল শক্তি! তাঁর লেখালেখির গভীরতা নিয়ে সংশয় আছে কি নাই, সেই বিতর্কে
আমি যাব না । কিন্ত তাঁর আছে লক্ষ-লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করার যাদু কিন্ত তিনি এ নিয়ে টুঁ-শব্দও করেননি!
অথচ হরতাল নিয়ে গোটা একটা বই লিখল কিনা আমার মত 'তেলিবেলি' একজন মানুষ! লাভ কী, তেলিবেলি কলমচির বই ক-জন পড়ে?

২. শফিক রেহমান। যুবকদের প্রভাবিত করার যাদুদন্ড ছিল একদা তার হাতে। তার দিনের পর দিন কলামে লিখলেন, ‘হরতাল তো আইন করে বন্ধ করা যাবে না’।

কী বালখিল্য কথা- যেন ওহী নাজিল হয়েছে, এটা পরিবর্তন করা যাবে না! হায় দল, হায় দলবাজি! কেমন করে একজন মানুষের গ্রে-মেটার 'হলুদ-মেটার' বানিয়ে দেয়! অথচ তিনি চিঠি লিখে বলেছিলেন, আমরা হরতালের বিপক্ষে ছিলাম, আছি।

৩. আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। যিনি নির্ভীক, স্পষ্টবাদী হিসাবে সুপরিচিত। তিনি একটা কলামে লিখলেন, 'শিক্ষা বিভাগকে হরতালের আওতার বাইরে রাখা হউক'।
উত্তম-উত্তম, তা ছাত্ররা কি গাধার পিঠে চড়ে চলাফেরা করবে? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকা থেকে একজন ছাত্রী যখন
সিলেট যাবে, সে কি এম্বুলেন্স নিয়ে যাবে, নাকি পালকিতে চড়ে?
প্রকারান্তরে জাফর ইকবাল স্বীকার করে নিলেন, হরতাল হউক অসুবিধা নাই কিন্ত শিক্ষা বিভাগকে ছাড় দেয়া হউক। তিনি শিক্ষক বলেই সম্ভবত এমনটা চিন্তা করেছেন।  
এমন বড় মাপের মানুষ যখন ছোট্ট একটা গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ব্যতীত কিছুই করার থাকে না! আফসোস, এঁরা তাঁদের বিপুল শক্তির কী অপচয়ই করছেন! লেজার গান দিয়ে চড়ুই পাখি শিকার...!

*ছবিঋণ: সানাউল হক, জনকন্ঠ

আর কতটা রক্ত দিলে শেষ হবে হরতাল?


আগেও বলেছিলাম, আমাদের দেশে এখন, হরতালের নামের এই কুৎসিত, গা ঘিনঘিনে প্রাণীটার জন্ম পৃথিবীর সবচেয়ে জঘণ্য বেশ্যার গর্ভে। 

এটা একটা দানব! এমন দানব যে তার মাকে খেয়ে ফেলে, আমরা তো কোন ছার!

গণতন্ত্রের নামে হরতাল নামের এই অসভ্য কান্ডটির আমাদের খুব প্রয়োজন, না? এই যে দেশ অচল করে দেয়া হয়, ক্ষতিটা কার হবে, আমাদের! যে সব সম্পদ বিনস্ট হবে, এটা কাদের, আমাদের! যারা মারা যাবেন, তারা কারা, আমাদেরই কেউ! তাহলে কাদের জন্য হরতাল?

এই যে এতগুলো হরতাল দেয়া হয়েছিল; এতো প্রাণ, সম্পদের অপচয় হলো, লাভ কী হলো? বিএপি তো তার পাঁচ বছরের টার্ম প্রায় শেষ করে ফেলল! নেতাদের কোন সমস্যা নাই, এদের সন্তানরা থাকে দেশের বাইরে, হরতাল ডাক দিয়ে বিদেশ চলে গেলেই হয়! শেখ হাসিনা ঠিক এই কাজটিই করেছেন!

একটা ছবি আছে, হরতালে কিছু নেতা নেত্রী রাজপথে বসে শশা খাচ্ছেন, দেখলেই মনটা অন্য রকম হয়ে যায়- আহা, আমাদের নেতাদের কী ত্যাগ! এদের মধ্যে শুধু একজন তালু ছোলার কথা বলি, তিনি ৫০০০ ডলার দামের স্যুট গায়ে দেন!

হরতালের নামে ১৪ কোটি মানুষকে একটা বিশাল কারাগারে আটকে ফেলা হয়। এ গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগার!
যারা প্রবাসে থাকেন- তাদের নিশ্চয়ই কিঞ্চিত অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারপরও কল্পনা করুন, আপনি দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরছেন, লম্বা জার্নি- এয়ারপোর্টে আটকা পড়ে আছেন। বাড়িতে আপনার সব প্রিয়মানুষরা অপেক্ষা করছে কবে তারা আপনাকে স্পর্শ করবে! আপনার তখনকার অনুভূতি কেমন হবে?

এবার কিছু তথ্য আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা যাক:
১. গত ১৮ মে ০৫ বুধবার আওয়ামী লীগ হরতাল আহ্বান করেন, দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। কিন্তু জলিলের প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে শেরাটনে। আবদুল জলিল সেদিন হরতাল ভেঙ্গে গাড়িতে চড়ে হোটেল শেরাটনে এসে সেই সভায় যোগদান করেন। এবং ব্যাংকটির অন্যতম ডিরেক্টর সাবের হোসেন চৌও যোগ দেন। তারা সেদিন হরতালের সমর্থনে বের হওয়া কোন মিছিল বা সমাবেশে অংশগ্রহন করেননি।
(দৈনিক সংবাদ/ ২. ১৮ মে ০৫ )

২. আওয়ামী লীগের সকাল সন্ধা হরতাল পালিত হয়। এই হরতালের সময় এইচ এস সি , ফাজিল, আলিম, কামিল পরীক্ষা চলছিল। পরে নেতারা বলেন, দেশে যে পরীক্ষা চলছে এটা নাকি তারা জানতেন না! 

ন্যাতা বটে!

৩. 'আমরা ভালোবাসা দিবস ও ভালোবাসার প্রকাশকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগের জন্যই আন্দোলন করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারী ভালোবাসা দিবসে হরতাল হয়ে তো সুবিধাই হলো'।
(মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, যা যা দিন)

*এই পোস্টের সঙ্গে যে ছবিটা এটা স্কুটার চালক আমির হোসেনের। যাকে হরতালে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার অপরাধে গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাঁর সমস্ত গা ঝলসে যায়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে এক সময় হাল ছেড়ে মারা যান!

ড. ইউনূস এবং ছদুমদুর মধ্যে পার্থক্য কি?


ছবিটা আমাদের ড. ইউনূস সাহেবের। ক-দিন আগে বিএসইসি ভবনে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল, পুড়ে যাওয়া ওই ভবনের তারতুরের(!) সামনে বিমর্ষ ভঙ্গিতে জটিল একটা পোজ দিয়েছেন। মনটা অন্য রকম হয়। আহারে, মানুষটার মনে কী মায়া গো! এমন বড়মাপের মানুষ জড় পদার্থ ভবনের পাশে দাঁড়িয়েছেন- এই ভবনের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার না হয়ে উপায় আছে! ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে, ভবনটায় কেন আগুন ধরল এর একটা হেস্তনেস্ত না করে ছাড়বেন না।

বস্তি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। আমরা বড়ই উল্লসিত, একটা কাজের কাজ হচ্ছে যা হোক। মাত্র ক-দিন আগে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে সাততলা বস্তি। হাজার হাজার মানুষ এক নিমিষেই চলে এসেছে রাস্তায়। শত শত গার্মেন্টসের মেয়ে কর্মীরা খোলা আকাশের নীচে বাস করছে, নিরুপায় তাঁরা সম্ভবত দেহ বিক্রির জন্য।

আমাদের নোবেলধারী ড. ইউনূস সাহেব এটা নিয়ে কাতর বা সোচ্চার বলে তো প্রতিয়মান হয় না। তিনি পুড়ে যাওয়া ভবনের পাশে হাঁ করে তাকিয়ে না থেকে এদের পাশে এসে দাঁড়ালে ওনার নোবেলটা কেউ ছিনিয়ে নয়ে যেত বলে তো মনে হয় না।

এলোমেলো কথা: ১

আমার লেখালেখি বন্ধ ছিল লম্বা একটা সময়। অনেকদিন হলো সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলাম। কারণ তুচ্ছসব, প্রদীপের চকচকে আলোয় বনিবনা হচ্ছিল না, আমি ঠিক ওই জগতটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। এটা লেখা যাবে না, ওটা লেখা যাবে না- ফরমায়েশী লেখা লেখো। ফরমায়েশী লেখা হয়তো বিখ্যাত মানুষরা লিখতে পারেন- আমার দ্বারা ও কম্ম হয় না।
এখনই যদি আমাকে বলা হয়, নির্দিষ্ট একটা বিষয়ে লিখতে- এক লাইনও লিখতে পারব না। তাছাড়া আমার এক সময় মনে হলো, ধুর, লেখালেখি করে কী হবে- শুধু শুধু আবর্জনা বাড়িয়ে লাভ কী!

আজ আর ওই সোনালী, ধুসর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবি না, অবলীলায় সব ছেড়ে আসতে পেরেছিলাম। কারণ, আমার বড় মানুষ হওয়ার তেমন কোন উচ্চাশা ছিল না- ইস রে, এখন পর্যন্ত মানুষই হতে পারলাম না! আমার স্বপ্ন, চাওয়া খুব অল্প- সিম্পল খাবার, সিম্পল পোশাক- চলে যায়, সমস্যা হয় না।
এমনিতে গড়িয়ে যাওয়া পানিকে কে আটকাতে পেরেছে? পাখি ওড়ে যায় রেখে যায় পালক, মানুষ চলে যায় থেকে যায় স্মৃতি!

অনেকের কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি হবে এটা শুনে, আমাকে যদি কেউ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশের নাগরিত্ব দেয়া হয়, নিশ্চিন্ত জীবন দেয়া হয় তবুও আমি দেশ ছেড়ে যাব না, কচ্ছপের মতো শেষ সময় পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকব! দেশের প্রতি ভালোবাসা-টাসা এসব জটিল কথা বুঝি না; আমি কুয়ার ব্যাঙ, কুয়াটাই আমার বড়ো প্রিয়। কে জানে, হয়তো আমার জেনেটিক কোডে কিছু সমস্যা আছে, সৃষ্টিকর্তা যখন বানাচ্ছিলেন তখন কোন বিচিত্র কারণে তাঁর তাড়া ছিল, নইলে তিনি ভেকেশনে ছিলেন ! জইতুনের তেল নাকে দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন না এই দিব্যিই বা কে দিয়েছে!

আরেকটা মজার কথা শেয়ার করি। আমি একটা ওয়েবসাইটে শুভ নামে দীর্ঘ ১ বছর লিখেছিলাম। ওখানে আমার প্রোফাইলে বয়স দেই নাই কিন্ত কিভাবে কিভাবে জানি ওই সাইটের অনেকের ধারণা হয়ে গিয়েছিল- শুভ নামের যে ব্ল­গার, এর বয়স খুব অল্প, পুতুপুত-আলাভোলা টাইপের একটা বালক। কী জানি, হয়তো আমার আচরণে বালকসুলভ কিছু ঝামেলা ছিল! এঁরা বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন, আমি খুব এনজয় করতাম। কারণ এর সঙ্গে মিশে ছিল নিখাদ ভালোবাসা। ভালবাসা তো পাগলও বোঝে! আমি হাসতাম। ভাগ্যিস, এরা আমার হাসিটা দেখতে পেতেন না।

আমি যখন ছাপার অক্ষরে লেখালেখি করতাম, অন্য জায়গায়, তখন পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারতাম না। কেউ হয়তো দয়া করে বলতেন, আরে তোমার তো একটা চিঠি আসছিল। দাঁড়াও খুঁজে দেখি; বলে তিনি ট্রাশ ক্যান হাতানো শুরু করতেন। আবধারিতভাবে, ওই চিঠি আর খুঁজে পাওয়া যেত না। একটা চিঠি, একটা মন্তব্য যে কী অমূল্য এইসব ছাগলমানবরা কি করে বুঝবে। কিন্ত ওই ওয়েবসাইটে; ওখানে যেটা হত, লেখা পোস্ট করলেই একজন সঙ্গে সঙ্গে তার ভালোলাগা মন্দলাগা জানাতে পারতেন- অনেকটা টিভি নাটক আর মঞ্চ নাটকের মধ্যে পার্থক্যর মতো!

ওই সময় আমার বাংলা টাইপ খুব স্লো ছিল, এক আঙ্গুলে টাইপ করতাম! কিন্ত অনেকদিন এমন গেছে টাইপ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে। ক্লান্তি আমায় ছুঁতে পারেনি, অনাবিল ভালোলাগা নিয়ে শুতে গেছি। ওখানে কেটেছে আমার সোনালী সময়- একেকটা মন্তব্য আমার কাছে মনে হতো একটা স্পর্শ ! 

আমার চেষ্টা থাকত, লেখার সূত্রগুলো নির্ভূল দেয়ার জন্যে। তারপরও একবার ভয়াবহ একটা ভুল হয়ে গেল- মুক্তিযুদ্ধের একটা ছবির জায়গায় অন্য একটা ছবি চলে গেল। আমি ভুল স্বীকার করে পোস্ট লিখেছিলাম। কিন্ত আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, বুড়া শিয়াল যখন ফাঁদে পড়ে তখন মৃত্যু ভয়ের থেকে বেশী থাকে ফাঁদে পড়ার লজ্জা!

লিখতাম হাবিজাবি অনেক কিছু- লেখার কোন আগামাথা ছিল না! আমার পড়ার যেমন কোন ঠিক-ঠিকানা নাই, তেমনি নাই লেখারও। নাই গান শোনারও- রকওয়েলের নাইফ যেমন আলোড়িত করে, তেমনি মনটা অন্য রকম হয়ে যায় মমতাজের বুকটা ফাইটা যায় শুনে। যার কাছেই এটা বলেছি, তিনি ছি-ছি ছাড়া আর কোন শব্দ উচ্চারন করেননি। কী করব? ভালোলাগা, এটা তো আর আমার হাতে নাই! আগেও এবং ওই ব্লগেও কিছু লেখা যখন টাইপ করেছি, আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। হয়তো আমার মধ্যে আবেগ বেশী, যেটা থাকে কেবল কুকুরমানবের মধ্যে! হোক, কুকুরমানবই সই! আমি কুকুরমানব, কোন অসুবিধা?

ওই সাইটে আমি আরেকটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম, অধিকাংশদের মধ্যেই সহিষ্ণুতা বড়ো অভাব- অন্যকে সহ্য করার প্রবণতা অল্প। কেউ ধর্ম নিয়ে লিখলেন তো সঙ্গে সঙ্গে কেউ ঝাপিয়ে পড়লেন। কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলেন, ব্যস, ফালাফালা করে ফেলা হলো! যেন ধর্ম একটা কাঁচের বাসন- হাত থেকে পড়ল আর খানখান হয়ে গেল!

ওই সাইটে এসে আমি অনেক কিছুই শিখেছিলাম। অনেকের মনন-প্রতিভা দেখে আমি বিস্মিত হতাম। অনেকের লেখার হাত আমি ঈর্ষা করতাম! কিন্তু অনেকেই তাঁদের মনন অনায়াসে অপচয় করতেন। তখন মনে হয়, তিনি আমাদের প্রতি কী অবিচারই না করছেন-
কেউ আত্মহত্যা করলে কার কি বলার আছে! এদের হাতে আছে লেজার গান অথচ গুলতি দিয়ে মারামারি করছেন।! আফসোস, বড়ই আফসোস!

মুক্তিযুদ্ধে: সুইপার

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্দিষ্ট বিশেষ কোন মাসে লিখতে ইচ্ছা করে না। কারণ ডিসেম্বরে, সবাই ঝাপিয়ে পড়ে লিখবে। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব অভিমত হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আবেগ থাকা প্রয়োজন সর্বক্ষণ। কিন্ত নির্দিষ্ট একটা সময়ে আমরা প্রবলভাবে আবেগক্রান্ত হয়ে পড়ি।
মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে আমাদের শেকড়। একটা গাছের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা- হৃদপিন্ড যেমন ধুকধুক করে চলে অবিরাম, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের আবেগ থাকবে বুকের ঠিক মাঝখানটায়, নিরবচ্ছিন্নভাবে! অনবধানবশত হঠাৎ মনে পড়ল আর কিছুটা সময় খুব আলোচনা হলো, এরপর আমরা ভুলে গেলাম, এর আসলে কোন অর্থ হয় না!

অবশ্য এটা আমাদের বৈশিষ্টও বটে। সমস্তটা জীবন আমরা চলি এলোমেলোভাবে, অন্যায় অত্যাচার করে- খানিকটা বয়স হয়ে গেলেই দাড়ি টাড়ি ছেড়ে একেবারে সাধু হয়ে যাই। ইশ-শ, গড় আয়ুর সমান আমরা প্রত্যেকে বাঁচব এমন গ্যারান্টি কার্ড যেন আছে আমাদের কাছে! সেল ফোনে যেন সৃষ্টিকর্তা ফোন করে কনফার্ম করেছেন আর কী!

মুক্তিযুদ্ধের মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, ঘুরেফিরে চলে আসে অল্প কয়েক জন মানুষের অবদানের কথা- এদের কথা বলে বলে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি। যেন এরাই দেশটা স্বাধীন করে ফেলেছেন- আর কারো অবদান ছিল না! আমরা বিস্মৃত হই, ‘ভাগিরথী নামের হিন্দু সেই বালিকাটির কথা! আমরা অবলীলায় ভুলে যাই ‘লালু নামের ১০/১২ বছর বয়সী সেই বালকটির কথা। যে অসমসাহসী বালকটি গ্রেনেড মেরে পাকিস্তানী আর্মীর বাংকার উড়িয়ে দিয়েছিল!
.........................
"মিসেস রাবেয়া খাতুন। সুইপার। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ কেন্টিনের তখন কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। পাক বাহিনী অতর্কিতে হামলা করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। ২৬শে মার্চ সকাল পর্যন্ত বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান কিন্ত পাক বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। নিরুপায় তাঁদের প্রাণ ব্যতীত দেয়ার মতো আর কিছুই ছিল না!

বাঙ্গালী পুলিশদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে পাক বাহিনীর শুরু করে তাদের তান্ডবলীলা। অনেকের সঙ্গে মিসেস রাবেয়া খাতুনকেও বের করে নিয়ে আসে। রাবেয়া খাতুনসহ সবাইকে শারীরিক চরম অত্যাচার করে একে একে মেরে ফেলা শুরু করে।
মিসেস রাবেয়া খাতুন এই বলে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন: আমি সুইপার, আমাকে তোমরা মেরে ফেললে তোমাদের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার মতো কেউ থাকবে না।
নিজেদের সুবিধার কারণে পাক বাহিনী তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে এই শর্তে, তিনি এখানে সুইপারের কাজ চালিয়ে যাবেন। মিসেস রাবেয়া খাতুন, এখানে থাকার সূত্রে জানতে পারেন, না-জানা অনেক কথা। পাক সেনারা সাময়িক ক্যাম্প বানায় রাজারবাগ ব্যারাককে।

পাক সেনারা তাদের দালালদের সহায়তায় রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অভিজাত এলাকা থেকে অসংখ্য বাঙ্গালী বালিকা, যুবতীদের এখানে ধরে নিয়ে আসে। এদের উপর শুধু চরম শারীরিক অত্যাচারই করেই এরা থেমে থাকেনি- অবলীলায় কেটে ফেলেছে, ছিড়ে ফেলেছে শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো। এমন কোন অন্যায় নেই যা ওই সময় এরা করেনি। মেয়েদের রোমহর্ষক চিত্কার, ঢাকা পড়ে গেছে মদ খাওয়া এইসব পশুদের হ্যা হ্যা হাসির তোড়ে।

মিসেস রাবেয়া খাতুন তাঁর কাজ করার ছল করে যে অবর্ননীয় দৃশ্য দেখেছেন, পরে বর্ণনা দিয়েছেন, একজন মানুষকে অসুস্থ করে দেয়ার জন্য, মাথায় সমস্যা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট! এই বর্ণনাগুলো পড়তে কষ্ট হয়- বড় কষ্ট হয়, বুক ভেঙ্গে আসে।
এই অভাগা মেয়েদের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত- তখন তাঁদের ময়লা পরিস্কার করার জন্য ডাক পড়তো মিসেস রাবেয়া খাতুনের। অসহায় তিনি, নির্বাকদৃষ্টিতে দেখা ছাড়া তাঁর কোন উপায় ছিল না। তারপরও তিনি সময়ে সময়ে সুযোগ পেলেই এখান থেকে কিছু মেয়েদেরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেন।" (তথ্য ঋণ: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড, পৃষ্টা: ৫৩-৫৬)
.....................

'মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের একেকটি সুইপার কলোনি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একেকটি আশ্রয়স্থল। চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, ঈশ্বরদি, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জাত সুইপাররা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খবর এনে দিয়েছেন, আর্মস লুকিয়ে রেখেছেন, এমনকি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহনও করেছেন। কিন্তু দলিত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা সাধারনত কোথাও উল্লেখ করা হয় না।' কথাগুলো ক্ষোভের সঙ্গে বলেন সুইপারদের নেতা বিজি মূর্তি।

মিরনজল্লা কলোনির হরিজন সেবক বাবুর চন্দ্র দাস বলেন,
'মিরনজল্লা সুইপার কলোনিতে মুক্তিযোদ্দাদের আশ্রয় দেয়ার খবর পৌছেছিল পাকিস্থানি বাহিনীর কাছে। তাই হানাদার বাহিনি ১৯৭১ সালের ২২ নবেম্বর কলোনি ঘেরাও করে কলোনির প্রধান সরদান মহাবীর সামুন্দসহ ১০ নেতৃস্তানীয় ব্যক্তিকে ধরে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করে।'
সুইপাররা দু:খের সঙ্গে জানান, মুক্তিযুদ্ধে তারা অবদান রাখলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকায় তাদের নাম নাই, কোন স্বীকৃতি দেয়া হয় না।
(তথ্যঋণ: দৈনিক যায়যায়দিন ১৮.১০.০৬)

রীচ ফুড আমাদের জন্যে বড়ো গুরুপাক

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী সে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে প্রতিবছর ১৫ এপ্রিলের মধ্যেই তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। সে অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার স্ত্রী লরা বুশ ২০০৫ সালের জন্য ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৮ ডলার আয়কর দিয়েছেন। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

আমাদের দেশের শীর্ষ আয়করদাতারা হচ্ছেন:
১.চট্টগ্রামের অসিত কুমার সাহা, তিনি ট্যাক্স দিয়েছেন ৮৪ লাখ টাকা।
২.আদিত্য মজুমদার ভাই।
৩. অশোক কুমার সাহা। অসিত এবং অশোক এঁরা আপন দুই ভাই।

আমাদের সৌভাগ্য আমরা চট করে জেনে যাই যুক্তরাষ্ট্রের খবর- ওই দেশের প্রেসিডেন্ট কতো টাকা ট্যাক্স দেন সেই খবর। কিন্তু আমরা জানতে পারি না আমাদের প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বিরোধী দলের নেত্রী, মতিউর রহমান নিজামী, হোমো এরশাদ কত টাকা ট্যাক্স দেন! আসলে বেচারাদের কোন আয়ই নাই, টেক্স দেবেন কোথা থেকে!

জানি-জানি, অনেকেই বলবেন- পার্টি সদস্যদের চাঁদা দিয়েই সব কিছু চলছে। তা হবে হয়তো- আমার জানা মতে বি এন পি’র শেষ চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছিল বছরে ১ টাকা করে! অন্য দলগুলোর কত করে চাঁদা আমার জানা নাই!

আমাদের দেশে সাংসদরা যে সব গাড়ি আমদানী করেছেন, সে গুলোর মধ্যে আছে- পোরশে, হামার, বিএমডব্লি­ও, মার্সিডিজ বেঞ্জ, ক্যাডিলাক, ইনফিনিটি ইত্যাদি! পোরশের দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত, হামার প্রায় ১ কোটি টাকা …।

লিস্টটা বিরাট- আমি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি- পোরশে: আমদানী করেছেন সাংসদ মোসাদ্দেক আলী ফালু, বেগম রওশন এরশাদ! হামার: ড, আবদুর রাজ্জাক, মার্সিডিজ বেঞ্জ: শেখ হাসিনা। টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার: মতিউর রহমান নিজামী, দেলওয়ার হোসেন সাইদী। লেক্সাস: শেখ ফজলুল হক সেলিম, সাদেক হোসের খোকা। (সুত্র: প্রথম আলো, ০৫.০৪.০৬)

প্রধানমন্ত্রী গাড়ি আমদানী করেননি- আদৌ তার কোন প্রয়োজন পড়ে না! হোমো এরশাদের নাম পাওয়া যায় নি- তিনি সম্ভবত পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন অথবা রওশন এরশাদের কাছে লিফট চান, কাতর হয়ে, আমাকে নেবে? (অন্য অর্থ করবেন না) বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে সব কিছুর মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দেয়ার পেছনে হোমো এরশাদের হাত ছিল- এই যে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানী করার ফাজিল কান্ডটা এরশাদই চালু করেছেন!

আমাদের দেশে গণতন্ত্র নামের সুগার কোটেড ট্যাবলেটটার বড়ো প্রয়োজন- এই আফিম ট্যাবলেটটা আমাদের খাইয়ে যা খুশী তা করা যায়! আমরা কেয়ামতের আগ পর্যন্ত ঘুরেফিরে এই মুখগুলোই দেখব, এ থেকে আমাদের মুক্তি নেই! পাঁচ বছরের জন্য এরাই কেউ না কেউ শাসক।

বিরোধীদল অনবরত হরতাল দেবেন, বেছে বেছে ২ দিন ছুটির আগের দিন- গণতন্ত্রের জন্য এটা বড়ো প্রয়োজন! আমাদেরকে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে, আমরা ঘুম থেকে জেগে চেঁচিয়ে ওঠবো- পেয়েছি-পেয়েছি আমরা, গণতন্ত্র!

অতীতে কেয়ারটেকার সরকার মাত্র কয়েকজনকে নিয়ে অনায়াসে দেশ চালিয়েছেন। এই বিশাল মন্ত্রী সভার চেয়ে অনেক অনেক ভালো ভাবে!

আসলে আমরা পান্তাভাত, আলুভর্তা খাওয়া ছা পোষা মানুষ- রীচ ফুড আমাদের জন্যে বড়ো গুরুপাক

সম্পাদক সাহেব, থাকা- খাওয়া ফ্রি!

২৪.১২.০১ প্রথম আলো একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর (ক.) ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলে ১ পৃষ্টাব্যাপী বিজ্ঞাপন।

এতে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী এম মোরশেদ খান, মন্ত্রী আবদুল্লাহ-আল-নোমান, মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম এবং সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রফিকুল আনোয়ার।

ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, এই দুইজন পন্ডিত মিলে মাইজভান্ডারীর জীবন ইতিহাস লিখেছেন বিতং করে।
এই পন্ডিতদের কল্যাণেই আমরা জানলাম, ইঞ্জিনে পানি ভরে তেল ছাড়াই মাইজভান্ডারীর গাড়ি চলত। তেল ছাড়া ১৯২ মাইল কক্সবাজার পর্যন্ত গাড়ি চলেছে! …এমন কেরামতি নাকি হাজার পৃষ্ঠা লিখেও বর্ণনা করা সম্ভব না।

বুশ, ব্যাটা ভারী বেকুব! খামাখা তেলের জন্যে ইরাকের এতগুলো লোককে মারল! আমার এমন একটা গাড়ির খুব প্রয়োজন, আমি এই গাড়িটা কিনতে চাই; প্রয়োজনে ভিক্ষা করে হলেও। একবার কিনে ফেললেই তো কেল্ল­াফতে। পানি ভরব আর চালাব, কাউকে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ব। পানির অভাব হলে…। কী মজা-কী মজা!

আর প্রথম আলো, প্রথম শ্রেণীর দৈনিক! মুক্ত-শক্ত চিন্তার দৈনিক, এদের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি এরা নিজেরাই! টাকা পেলে প্রথম আলো যখন সব ধরনের বিজ্ঞাপনই ছাপায় তাহলে আমি একটা বিজ্ঞাপন দিতে চাই:
আমার বাংলা টাইপ খুব স্লো। একজন বাংলা টাইপ জানা লোক প্রয়োজন। প্রথম শ্রেণীর দৈনিকের সম্পাদক সাহেব ইচ্ছা করলে এ পদে যোগ দিতে পারেন, থাকা-খাওয়া ফ্রি...।

বঙ্গাল ব্লগ!

বাড়িতে মুখ খারাপ করতে পারি না, মন ভাল না, কারো সঙ্গে ঝগড়া করেছি, তো চলো শালার গালি দিয়ে সবাইকে একহাত নেই! যেন ভারী একটা কাজ হলো! এই কাজটা আমরা অবলীলায় করি কোন একটা ব্লগ-সাইটে এসে!

ফ্লাডিং একটা সমস্যা! কেউ কেউ ইচ্ছা করে এ ন্যাক্কারজনক কাজটা করেন সবার আপত্তি উপেক্ষা করে। সবাই তিতিবিরক্ত। কে শোনে কার কথা! এরা সগর্বে ঘোষণা দিয়ে এই কাজটা করেন। অনেকে আবার এদেরকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেরাও এ কাজে নেমে পড়েন। সব মিলিয়ে একটা যা তা, যাচ্ছেতাই অবস্থা। এটলিস্ট একটা লেখা পোস্ট করে অন্য ব্লগারদের পড়ার জন্য অন্তত সময়টুকু তো দিতে হবে। আমি আগেও বলেছি আমাদের মধ্যে সহনশীলতার বড়ো অভাব- এর সঙ্গে যোগ হয় অন্যের প্রতি অসম্মান করার প্রবণতা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ডিগবাজী। এটা এখন একটা ফ্যাশনের পর্য়ায়ে চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলাগাড়ি চালান, সুরুয মিয়ার মত মুক্তিযোদ্ধা ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন, একজন মুক্তিযোদ্দাকে ১০০ টাকা দিয়ে জুতা মারি। আর আমরা লম্বা লম্বা বাতচিত করি। কবে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদিবস গেল এটা আমরা কোন ছার প্রথম শ্রেণীর দৈনিকেরই বা এতো সময় কই!
অল্প কিছু নেতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্ন দো...রোগ বাধিয়ে বসে আছেন। হায়রে, ভার্চুয়াল শিশুরা- এদের জন্য করুণা করতেও করুণা হয়! মুক্তিযুদ্ধ মানেই বিশেষ একটা দলের নিজস্ব তালুক বানিয়ে ফেলবেন, এমন চুতিয়া অধিকার কে তাকে দিয়েছে! বিচিত্র দেশ- গোলাম আযম এই দেশের নাগরিক হতে পারবেন কিন্তু ফাদার রিগন পারবেন না!

আহ ধর্ম! আহ ধার্মিক! এটা নিয়ে অনেকে এমন আচরণ করেন, তাঁর ধর্মটা যেন একটা কাঁচের বাসন- হাত থেকে পড়ামাত্র খানখান হয়ে যাবে। ধর্মকে এহেন তুচ্ছ পর্যায়ে নামিয়ে এনে প্রকারন্তরে ধর্মকে হেয় করা হয়! অথচ ধর্ম নিয়ে আলোচনাটা খুব জরুরী।
ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই- ওই দিন পড়লাম, একজন দায়িত্বশীল মানুষ বলছেন, বাংলায় ‘আল্লাহ মহান’ এটা লিখে লাভ নাই কারণ আল্লাহ তো আর বাংলা পড়তে পারেন না । এইসব মূর্খ মন্তব্যকারী, এরা ধর্মকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে! সৌদি আরবের লোকজনরা গালি কি ভাষায় লেখে, বাংলায়?

আর কারো যদি কোন ধর্মের প্রতি আবেগ না থাকে তো অহেতুক অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার সার্থকতা কোথায়? পাশাপাশি কারো কোন ধর্মের প্রতি দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেই তো হয়। কলমের উত্তর কলম দিয়ে, এটা আমরা প্রায়শ ভুলে যাই। হুমায়ুন আজাদকে কেন হত্যা করার চেষ্টা করা হবে, তিনি তো কাউকে হত্যা করেননি! একজন মানুষ যেখানে প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে না তার কি অধিকার আছে একজন সৃষ্টির সেরা জীবের প্রাণ নষ্ট করার! তাঁর কোন লেখায় কারো অমত থাকতেই পারে, তা কলমের মাধ্যমে উত্তর দিলে তো সমস্যা নাই।

ইনকিলাব জাতীয় পত্রিকা পড়লে সাবান দিয়ে আমার হাত ধুতে ইচ্ছা করে, কিন্ত এদের একটা ব্যাপার আমার মনে এখনো দাগ কেটে আছে। হুমায়ুন আজাদ ‘পাক সার জমিন…’ লেখার পর ওখানে একজন কলাম লিখেছিলেন, 'হুমায়ুন আজাদ কি তাঁর মেয়েদেরকে এ বইটা পড়তে দিতে পারবেন'? ইনকিলাবের মতো পত্রিকার এই সহনশীলতা ভালো লেগেছিল কারণ এদের উত্তরটা ছিল কলম দিয়ে এবং ওই কলামে মি. আজাদের প্রতি একটা খারাপ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি, অন্তত ওই সময়টাতে।

শ্লীল-অশ্লীল, এটা অসম্ভব একটা জটিল বিষয়। এ নিয়ে কঠিন কঠিনসব মতবাদ আছ্। ব্লগে অনেকেই বলেন এটা ওপেন ফোরাম- এখানে যা কিছু আলোচনা হতে পারে, পারে যে কোন শব্দের প্রয়োগ। আমি আমার স্বল্প বুদ্ধিতে যা বুঝি, আসলে এটা বিচারের ভারটা ছেড়ে দিতে হবে আমাদের হাতেই। কিন্ত অবস্থান এবং সময় একটা বিচার্য বিষয়। আমেরিকার একজন ব্ল­গারের কাছে যেটা অতি শ্লীল মনে হবে আমদের দেশে এটা হয়তো অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে। অনেক দেশেই অনেক আগে থেকেই বাথরুমের দরোজা বলে কোন জিনিসই থাকে না- এটা আমাদের দেশে অকল্পনীয়! এখন প্রবাসের ঢং এদেশে চালু করার চেষ্টা করে তো লাভ নেই!

বাক স্বাধনীতা, খুব প্রিয় একটা শব্দ কিন্ত এর নামে তো যা খুশী লেখা যায় না, কারণ একজন লেখকের পায়ে অসংখ্য শেকল থাকে। কঠিন শেকলটা হচ্ছে তার নিজের। একজন লেখককে দাঁড়াতে হয় তার নিজের কাঠগড়ায়, তেমনি একজন ব্ল­গারকেও! কলম একটা ভয়াবহ অস্ত্র- এর প্রয়োগ কিভাবে হবে এটা নির্ভর করে কলমটা কার হাতে, তার উপর!

হায় ইংরাজি ভাই!

স্বর্গ এবং নরকের দেয়াল প্রায়ই নানা কারণে ভেঙ্গে যায় (ভেতরের খবর হচ্ছে ভেঙ্গে ফেলা হয়)। স্বর্গবাসীরা বিরক্ত, নরকবাসীরা হুটহাট করে ঢুকে পড়ে। নরকের কীটদের গায়ে কী বদবু- ছি!

স্বর্গ এবং নরকবাসীদের জরুরী সভা বসল।
নরকের সভাপতি আমাদের জঙ্গল বা বুশ ভাই! সভায় সিদ্ধান্ত হলো, দু-দলই পর্যায়ক্রমে ভাঙ্গা দেয়াল ঠিক করবে।

স্বর্গবাসীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যথাসম্ভব দ্রুত ভাঙ্গা দেয়াল ঠিক করে ফেলল। যথারীতি আবারও দেয়াল ভেঙ্গে গেল! এইবার নরকবাসীদের পালা কিন্তু নরকবাসীরা গড়িমসি শুরু করল। দেয়াল ভাঙ্গা থাকলেই তো মজা। হুট করে স্বর্গে ঢুকে নাচাগানা করা যায়, কী মজা!

আবার সভা ডাকা হলো। এইবার নরকবাসীদের পাত্তা নাই, একজনও সভায় আসেনি। যা হওয়ার তাই হলো, গডের কাছে বিচার গেল। নরকবাসীরা এইবার চোখে অন্ধকার দেখল, গডের কাছে যাবে কে? দলের নেতা তো আবার ইংরাজী জানেন না, গড আবার ইংরাজী ছাড়া বুঝেন না! মহা সমুস্যা(!)।

রব উঠলো, হায় ইংরাজী ভাই- হায় ইংরাজী ভাই! শেষ পর্যন্ত একজন বুদ্ধি দিল, বাংলা কোন সাইট থেকে কোন ইংরাজি ভাইকে ধরে আনো (বাংলা সাইটে যিনি ইংরাজিতে পোস্ট দেন), রিমেমবার, জীবিত না, মৃত!

সম্পাদক সাহেবদের জন্য ইশকুল!

২৮ ফ্রেব্রুয়ারী প্রথম আলোর একটা নিউজ ছিল এ রকম: সাততলা বস্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। রিপোর্টটির কিছু অংশ আমি এখানে তুলে দিচ্ছি:
১. এই বস্তিটা না ভেঙ্গে ফেলার জন্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ছিল।
২. ৫০০ ঘর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
৩. আনুমানিক ৫ হাজার মানুষ গৃহহারা হয়েছেন।
৪. সকালে শিশু মনিরুলকে রেখে তাঁর বাবা মা গার্মেন্টসে গিয়েছিলেন কাজে।
৫. উচ্ছেদের সময় শিশু মনিরুল গুরুতর আহত হয়।
৬. গার্মেন্টসের শত শত নারী কর্মী এ বস্তিতে থাকতেন। উচ্ছেদের পর, রাতে খোলা আকাশের নিচে তাঁদের থাকা এবং নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে আছেন তাঁরা।
৭. উচ্ছেদের পর শত শত শিশুসন্তানকে নিয়ে খোলা মাঠে তরুণী মারা রাত কাটাচ্ছেন।
৮. হাইকোর্টের রায়ের কপি ম্যাজিষ্ট্রেটের হাতে তুলে দেয়ার পরও তিনি উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখেন।
৯. নারী এবং শিশুদের মারধর করা হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথম আলো ২রা মার্চ এ ঘটনা নিয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য ছাপে। বেশ! কিন্ত সম্পাদকীয়তে এই খবরটার চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্ব পায় অন্য একটা সংবাদ এবং প্রচুর স্পেস নিয়ে। ওই সংবাদটা ছিল, 'লুটপাটের সেতু- সেতু আছে রাস্তা নেই'। কোন এক প্রভাবশালীর জমি বাঁচাতে রাস্তার কাজ আটকে আছে। বেশ বেশ! বস্তি উচ্ছেদের চাইতে এই নিউজটার গুরুত্ব তাইলে অনেক গুরুত্ব বহন করে?

কে জানে, হবে হয়তো বা- সম্পাদক বলে কথা। কে জানে, সম্পাদক সাহেবরা সর্বজ্ঞ হন নিশ্চয়ই। তারা যা বলেন তা আমাদের মেনে না নিয়ে উপায় কী! কিন্ত আমি এতে অমত পোষণ করি। আমি মনে করি, আমাদের সর্বজ্ঞ সম্পাদক সাহেবদের জন্য ইশকুল খোলা আবশ্যক। নইলে এসি রুমে বসে কলমবাজি করলে এই জিনিস প্রসব না করে উপায় কি!

‘কয়েদি’ থেকে অংশবিশেষ

"কাঁটায় কাঁটায় বারোটা।
থাই এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান যথাসময়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।

যাত্রীদের মধ্যে একজন রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া, জাপানী ব্যবসায়ী। লম্বা জার্নি ওঁকে অনেকখানি কাবু করে ফেলেছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে। থেকে থেকে গা কেমন গুলাচ্ছে। হোটেলের বরফ-ঠান্ডা বাথটাবের পানিতে গা ডুবিয়ে চিল্ড বিয়ারে চুমুক দিতেই অবসাদ অনেকখানি কেটে যাবে এটা ভাবতেই শরীরে ঝিরঝিরে একটা স্বস্তির একটা পরশ বয়ে গেল।

ঘোষণা দেয়ার মতো কিছু নেই বলেই গ্রিনচ্যানেল দিয়ে গুটিগুটি পায়ে পেরিয়ে আসতেই পেটমোটা একজন কাষ্টমস অফিসার হড়বড় করে ইংরাজীতে কি সব বলতে লাগল। আকুতাগাওয়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বিনীত ভাবে বললেন, ‘মাফ করবে, তোমার কথা বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবে?’
কাষ্টমস অফিসার ঝড়ের গতিতে একগাদা কথা বললেন, আকুতাগাওয়া এবারও বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারলেন না। ভারী লজ্জিত হয়ে বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, 'মার্জনা করো, আমার ইংরাজী জ্ঞান খুব সীমিত তবে শব্দগুলো আলাদা-আলাদাভাবে বললে আমি বুঝতে পারব।'
কাষ্টমস অফিসার এবার থেমে থেমে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আয়্যাম নট আ ব্লাডি টিচার, ইউ নো, কাষ্টমস অফিসার আয়্যাম।’

আকুতাগাওয়া হকচকিয়ে গেলেন। এমনিতেই ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েতে চাইছে, এই ভদ্রলোক এমন অভব্য আচরণ করছেন কেন? অলক্ষ্যে গালে হাত বুলালেন তার কি দাড়ি বড়, তাকে কি ড্রাগ স্মাগলারদের মতো দেখাচ্ছে।

আকুতাগাওয়া নিচুস্বরে বললেন, ‘আমি বড় ক্লান্ত, কি জানতে চাইছ দয়া করে বলো?’
‘তুমি যে বড় গটগট করে গ্রিন চ্যানেল পেরিয়ে এলে!’
আকুতাগাওয়া গটগট শব্দটার মানে বুঝতে পারলেন না তবে মূল বক্তব্য বোধগম্য হল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘কেন চ্যানেল ব্যবহার করা নিষেধ নাকি, অফিসার?’

‘অবশ্যই নিষেধ, যদি তুমি ঘোষণা না দিয়ে এবং যথার্থ ট্যাক্স না দিয়ে কোন দ্রব্য নিয়ে আসো,’ কাষ্টমস অফিসারের গলা একধাপ চড়ে গেল।
আকুতাগাওয়া এতক্ষণে হাসলেন, ‘তেমন কিছুই আমার কাছে নেই।’
কাস্টমস অফিসারের কথা এবার হুমকির মতো শোনাল, ‘বেশ, সেটা দেখা যাবে। তোমার সঙ্গের জিনিসপত্র আমি দেখব।’
‘অবশ্যই, আনন্দের সঙ্গে।’
কাস্টমস অফিসার আকুতাগাওয়ার নামিয়ে রাখা একটি মাত্র হাত ব্যাগ দু-মিনিটেই তছনছ করে রাগী গলায় বললেন, ‘তোমার আর লাগেজ কোথায়?’
‘এই-ই।’
‘এই-ই’, কাস্টমস অফিসার গভীর সন্দেহ পোষণ করলেন!
‘বিশ্বাস না হলে দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখো।’

এতক্ষণে কাস্টমস অফিসারের মুখের কঠিন রেখাগুলো নরোম হয়ে এল। একদৃষ্টে পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছেন। আসলে অন্য কিছু দেখছেন না ঠোঁট না নাড়িয়ে নাম মুখস্ত করছেন। কী কঠিন নাম রে বাবা!
‘সো, আকুতাগাওয়া, এ দেশে আগমনের উদ্দেশ্য কি?’
আকুতাগাওয়া এবার অসহ্য রাগে ফেটে পড়লেন, ‘লিসেন অফিসার, তুমি ভব্যতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছ এ দেশে কেন এসেছি এটা তোমার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে যথার্থ কাগজপত্র ভিসা নিয়ে আমি এসেছি। ভাল কথা, আবার যখন আমার নাম ধরে সম্বোধন করবে তখন নামের পূর্বে জনাব যোগ করবে। আমাদের দেশে তো আমরা যে কাউকে যা-তা লোককেও জনাব ছাড়া সম্বোধন করার কথা ভাবতেই পারি না।’

হইচই-এ লোক জমে গেল। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নম্রভঙ্গিতে বললেন, ‘সার, দয়া করে বলো সমস্যাটা কি?’
আকুতাগাওয়া আদ্যোপান্ত সব খুলে বললেন, ওই ভদ্রলোক গভীর মনোযোগ নিয়ে শুনলেন, শুনতে শুনতে ওঁর চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে গেল।

যে কাস্টমস অফিসারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তাকে পরিস্কার ইংরাজিতে বললেন, ‘তুমি যখন গায়ের এই পোষাকটা পরে এখানে দাঁড়াও তখন একটা দেশ, গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করো। বাইরের গেষ্টদের সামনে তোমার একটা অসভ্য আচরণে তোমার পোশাক গায়ে থাকে ঠিকই কিন্তু আমরা তেরো কোটি মানুষ নগ্ন হয়ে পড়ি। তোমার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া হবে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব তোমার যেন কঠিন শাস্তি হয়,’ এবার আকুতাগাওয়ার দিকে ফিরে বললেন, ‘সার, সব কিছুর জন্য আমি ওর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি প্লিজ সার, প্লিজ।’

আকুতাগাওয়া এই বাঙালী কর্মকর্তার আচরণে অভিভূত হয়ে পড়লেন। সামনে অনেকখানি মাথা ঝুকিয়ে সশ্রদ্ধ বো করলেন।

কাস্টমস ব্যারিয়ারের বাইরে জটলার মধ্যে একজন বাঙালীকে দেখে হাত নাড়লেন। ইংরাজি ক্যাপিটাল লেটারে বড় বড় করে তার নাম লেখা প্লাকার্ড উঁচিয়ে রেখেছে। আকুতাগাওয়া লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন।
তিনি লোকটার দিকে সহাস্যে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি কি জনাব আহমেদের সঙ্গে কথা বলছি?’

পরিচিতি এবং সৌজন্য বিনিময় চলাকালে তিনি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন আহমেদ ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি কেমন যেন একটু অন্যরকম। কেমন ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে।

কোথায় যেন ভারি একটা অসঙ্গতি আছে। এমন তো হওয়ার কথা না, তিনি মূলত বাংলাদেশে এসেছেন কাপড় কেনার জন, দু-একটা কাপড় না লক্ষ লক্ষ কাপড়। চলতি ভাষায় তিনি একজন বায়ার। জামিল আহদের জোর আমন্ত্রণে এই দেশে এসেছেন।
জামিল আহমেদের ঢাউস কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো কাপড়ের নমুনা দেখে তিনি চমত্কৃত- এমন কাপড় এই দেশে তৈরী হয় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। স্বচক্ষে দেখাই আসার মূল উদ্দেশ্য। তিনি যথাসম্ভব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন কথাবার্তা চুড়ান্ত হলে এগ্রিমেন্ট সই করে ফিরে যাবেন।

কিন্তু সমস্যটা কী! আসার পূর্বে যথারীতি ফ্যাক্স চালাচালি হয়েছে। কোথায় উঠবেন তাও ঠিক করা হয়েছে। জামিল আহমেদ চাচ্ছিলেন সোনারগাঁয়ে রিজার্ভেশন করার জন্য। এই পাঁচতারা হোটেলটার ব্যাপারে আকুতাগাওয়ার প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। ক-দিন আগে হোটেলের লোকজনরা নিজেরাই ভাংচুর করেছে। এই হোটেল তাকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে এতে ঘোর সন্দেহ আছে। যদিও এ হোটেলে ওঁর দেশের স্বার্থ আছে তবু যে কান্ড কদিন আগে হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আই টি টির শেরাটনকে বেছে নেয়া হল।


আকুতাগাওয়া লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করো না বড় ক্লান্ত লাগছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোটেলে যেতে চাচ্ছি।’
কথাটা বলেই তিনি ভারি কুন্ঠিত হলেন। ভদ্রলোক আহমেদ এমন হাঁ করে তাকিয়ে আছে কেন- তিনি কী কোনো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন? তার আচরণে কী কোনো অসৌজন্য আচরণ প্রকাশ পেয়েছে? নাকি এই ভদ্রলোক তার ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বুঝতে পারছেন না। অবশ্য তিনি প্রথমেই বলে রেখেছিলেন তাঁর ইংরাজি বুঝতে খানিকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, পাশাপাশি এ অনুরোধও করেছিলেন দ্রুত কথা না বলার জন্য। এই কথাটাই গুছিয়ে আবারও বললেন।

জামিল আহমেদ ইতস্তত করে বললেন, ‘ইয়ে, ব্যাপারটা হলো গিয়ে তোমার-।’
‘তুমি প্লিজ আমার নাম ধরে বলো বন্ধুরা আমাকে আকু বলে, প্লিজ আহমেদ। আর তোমার নামটা কি আমি ঠিকভাবে বলতে পারছি?’
জামিল আহমেদের মধ্যে এতক্ষণে সহজভাব ফিরে এসেছে। ‘ধন্যবাদ আকু, ভালই বলেছ। বিদেশিরা আমাদের নাম সঠিকভাবে বলে না সম্ভবত ইচ্ছা করেই।’

আকুতাগাওয়া লাজুক হাসলেন, তার ঝুলিতে আরও কটা চমক আছে। জাপানে জামিল আহমেদের যেসব ফ্যাক্স পেতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন, নাম-ধাম, এমন কি ফ্যাক্টরী ম্যানেজারের নাম পর্যন্ত। যে দেশের সঙ্গে ব্যবসা করবেন সে দেশ, মানুষ, এদের সম্বদ্ধে না জানলে চলবে কেন?
‘তোমাকেও ধন্যবাদ আহমেদ, আকু উচ্চারণটাও তোমার চমত্কার হয়েছে।’

জামিল আহমেদের নাম ভুলে যাওয়ার সমস্যা আছে কিন্তু এ নাম ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুলের পেছনে ঝুঁটি বাধে এমন একজনের নাম প্রায়শ খবরের কাগজে চোখে পরে অবশ্য ওই লোকের নাম আকু না আক্কু। একটা বাড়তি ক আছে।
‘ওয়েল, আহমেদ, চলো যাওয়া যাক।’
জামিল আহমেদ অসম্ভব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আকু, একটা সমস্যা হয়ে গেছে, বিরাট সমস্যা। আমাদের দেশে এখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য।’
আকুতাগাওয়া নির্বিকারভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকালেন, ‘এত টেনস হচ্ছ কেন! ব্যাপারটা কি একটু বুঝিয়ে বলো তো।’
'সমগ্রদেশে সমস্ত ধরনের কাজকর্ম বন্ধ কিছুই চলবে না। তুমি নিশ্চই লক্ষ করোনি টার্মিনাল ফাঁকা একটা গাড়িও নেই।'
আকুতাগাওয়ার মুখ ঝুলে পড়ল, ‘তুমি এসব কী প্রলাপ বকছ। সব কিছু বন্ধ?’
জামিল আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ, কেবল মাত্র আকাশ পথ খোলা আছে; এটা খোলা থাকা না-থাকা সমান। কারণ আকাশপথ ব্যবহার করতে হলে রাজপথ ব্যবহার করতে হবে।'
‘হোটেল এখান থেকে কত দূর?’
‘হেঁটে-হেঁটে গেলে বহু দূর।’
‘আশে-পাশে কোনো হোটেল নেই,’ আকুতাগাওয়ার মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছে।
‘দুঃখিত, আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি, গেষ্ট উপচে পড়ছে, কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘তোমার গাড়ি থাকলে ফোন করিয়ে আনিয়ে নাও।’
‘আকু, পরিস্থিতি বুঝতে পারছ না, কোন অবস্থাতেই গাড়ি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না, অলৌকিক কোন উপায়ে যদি পৌঁছেও আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না। গাড়ি ভেঙেচুরে আগুন তো ধরাবেই আমাদেরকেও প্রাণে মেরে ফেলবে।’

আকুতাগাওয়ার থমথমে মুখ। এবার ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, ‘এবার তুমি বলো কোন বুদ্ধিতে এমন নরকে আমাকে আসতে বললে। বলো, চুপ করে থেকো না।’
জামিল আহমেদ ম্লান গলায় বললেন, ‘আমার বক্তব্য শুনে যা ইচ্ছা তা বলো। তোমাকে আমি যখন আসতে ফ্যাক্স করেছিলাম তখন অবস্থা এমন ছিল না। সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে মনে করা হচ্ছিল। যখন নিশ্চিত হলাম অসংখ্যবার তোমাকে ফ্যা করার চেষ্টা করেছি, ফোন করেছি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। অবশেষে তোমার এমব্যাসীকে অনুরোধ করেছি তোমার আসা পিছিয়ে দেয়ার জন্য। আমার দুর্ভাগ্য কোনভাবেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’

আকুতাগাওয়ার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছে। এই কদিন ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওখানে মাত্র দুদিন ছিলেন, কী শখ চাপল, ফুজি মাউন্টেন দেখতে চলে গেলেন। এরপর ডমেষ্টিক ফ্লাইট ধরে নারিতা, নারিতা থেকে সরাসরি এখানে। ভারি লজ্জিত হলেন, ছি-ছি, কী লজ্জা-কী লজ্জা!
লজ্জিত দু-হাতে জামিল আহমেদকে ধরে বললেন, ‘তোমার প্রিয় মানুষের দোহাই আমাকে ক্ষমা করো, ভুলটা আমারই। তুমি এলে কিভাবে?’
‘হেঁটে-হেঁটে কিছুদুর তারপর রিকশায়,’ জামিল আহমেদ ভাবছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে রিকশাকে এবার ছাড় দেয়া হয়েছে এটাই ভরসা। যে রিকশা নিয়ে এয়ারপোর্ট এসেছিলেন মোটা টাকার লোভ দেখিয়েও ওই লোককে রাখা সম্ভব হয়নি।

আকুতাগাওয়া এখন বুঝতে পারছেন কেন বোয়িংটা ছিল ফাঁকা-ফাঁকা। হাত-পা ছড়িয়ে শুতে ইচ্ছা করছিল বলে এয়ার হোস্টেসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আসন পরিবর্তন করা যাবে কিনা? এয়ার হোস্টেস মুচকি হেসে বলেছিলঃ যেখানে তোমার পছন্দ হয়, ভাল করে বিশ্রাম নাও আমি নিশ্চিত আগামী সময়টা তোমার জন্য হবে কষ্টকর।

প্রচন্ড মাথাব্যথা হচ্ছিল বলে কথা বাড়াননি। নয়তো তখই জেনে যেতেন, অবশ্য আগাম জেনেও অবস্থার খুব একটা হেরফের হত না।

জামিল আহমেদ ছুটাছুটি করায় গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কিচ্ছু নেই, একটা রিকশাও না! রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়ি জাতীয় একটা ভ্যানে গাছের ছায়ায় একজন মহা আরামে ঘুমাচ্ছে।

জামিল আহমেদ নিচু গলায় ডাকলেন, ‘এই-এই।’
কাজ হচ্ছে না দেখে গা ধরে ঝাঁকুনি দিলেন। লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। ট্রাফিক পুলিশ না দেখে বিকট হাই তুলে উপুড় হল।

জামিল আহমেদ নাছোড়বান্দার মতো বললেন, ‘এই-এই।’
‘এই-এই, হেই মিয়া বিষয়ডা কী।
‘যাবে?’
‘জ্বে না, এইবার যান গিয়া ঘুমাইতে দেন।'
‘চলো না, ভাল টাকা পাবে।’
লোকটা এবার উঠে বসল, কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এই মিয়া হুনেন নাই, একবার যে কইলাম যামু না আবার টেকার গরম দেখায়। আপনার টেকায় আমি হাগি।’

জামিল আহমেদ হতভম্ব। দেশের অস্থির-অসুস্থ পরিবেশ সবাইকে কেমন বদলে দিচ্ছে। মাথা গরম করলে হবে না। মুহুর্তে ভোল পাল্টে ফেললেন, ‘ভাই, সঙ্গে বিদেশি মেহমান আছে, বিপদে পড়েছি, একটু কষ্ট করে পৌছে দাও না।’
‘কোন জায়গায় যাইবেন?’
হোটেলের নাম বললে চিনতে পারল না, লোকেশন বলা মাত্রই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল, ‘হ-হ চিনছি, ওই বড় বড় ঢুলাওয়ালা হঢলডা তো। তয় হেইডা তো বিআইবি রোড যাইতে দিব না।’
জামিল আহমেদ চকচকে চোখে বললেন, ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে।’
‘ওরি আল্লা, ম্যালা দূর পাঁচশো টেকা লাগব। দরদাম নাই। এইডা মাছ বাজার না।’
জামিল আহমেদ থ মেরে গেলেন। এ বলে কী, পাঁচশো টাকা!

সমস্যা দেখা দিল বসা নিয়ে। আকুতাগাওয়া উবু হয়ে বসেছিল বলে কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছিল। জামিল আহমেদ দেখিয়ে দিলেন পা ঝুলিয়ে কেমন করে ভ্যানে বসতে হয়।
‘সরি, আকু, তোমার কষ্ট হচ্ছে, রিকশা পেলে আরাম করে বসতে পারতে। ও দুঃখিত, তুমি তো আর আমাদের রিকশা দেখো নি।
‘দেখি নি তবে এ সম্বন্ধে পত্রপত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। আমাদের জাপানে ১৯৯৪ সালে ‘ফুফুওকা’ শহরে Rickshaw Painting- Traffic Art in Bangladesh আর্ট শো হওয়ার কথা ছিল।

ঠেলাওয়ালা ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে গলা ছেড়ে গান ধরেছে। জামিল সাহেবের গা কাঁপছে, রাগ হচ্ছে, ভয়াবহ রাগ। রাগ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যত বদ দেখেছেন এদের মধ্যে এই ঠেলাওয়ালা হারামজাদা হচ্ছে বদের হাড্ডি। হারামজাদা ওদের নিয়ে রসিকতা করছে।
ঘুরে ফিরে একটাই গান গাইছে ‘ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে-এ-এ।’

রাস্তায় যে দু-চারজনকে দেখা যাচ্ছে এরা দাঁত বের করে হাসছে। জামিল আহমেদ মনে মনে বললেন, ‘ধরণী ····’ ।

আকুতাগাওয়া আনন্দিত। গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন। এক পর্যায়ে বললেন, ‘আহমেদ, ভাষা না বুঝলেও ওর গান শুনে আমি মুগ্ধ, তুমি কি গানের কথাগুলো ইংরেজীতে অনুবাদ করতে পারো?’ জামিল আহমদে উদাস হলে বললেন, ‘এই আকাশ বাতাস দেখে আমাদের ড্রাইভার সাহেবের মাথা আউলা-ঝাউলা হয়ে গেছে। এরই বর্ণনা এ গানের মূল ভাবার্থ। আমি সম্ভবত তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম না। আসলে অনুবাদ কাজটা খুব জটিল কিনা।’

আকুতাগাওয়া খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘আহমেদ, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ব্যাপারটা তোমাদের নেহায়েত ব্যক্তিগত তাই তোমার ইচ্ছা না করলে এই উত্তর দিয়ো না। এই যে তোমরা দেশ অচল করে দিচ্ছ, এটা কেন?’
‘সরকার দেশ ঠিকভাবে চালাতে পারছে না এই বিষয়ে বিরোধীদলের প্রবল আপত্তি আছে, এর ফলাফল এই।’
‘দেখো, হুজ রাইট হুজ রং আ ডোন্ট নো, আমার ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনও মন্তব্যও করতে চাচ্ছি না। কিন্তু এভাবে গোটা দেশ অচল থাকলে ক-বছরের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছ সেটা নিশ্চয়ই জানো? জাপানের চেয়েও ধনী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ লুক্সেমবার্গ যাদের মাথাপিছু আয় প্রায় চল্লিশ হাজার ডলার, ওরাও তো এভাবে একদিনের জন্যও দেশ অচল করে দেয়ার কথা কল্পনাও করবে না। তেমাদের মাথাপিছু আয় কত এখন?’
জামিল আহমেদ ক্ষীণ গলায় বললেন ‘আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এক পর্যায়ে হরতাল না করে উপায় থাকে না। ক্ষমতাবান কেউ যখন কোন কথাই শুনবে না তখন তো জনগণের শেষ অস্ত্র হরতাল।’
‘প্লিজ আহমেদ, দয়া করে ভুল তথ্য দেবে না। আজই প্রথম এ দেশে হরতাল হচ্ছে না, পূর্বেও বহুবার হয়েছে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। আমাদের পত্র-পত্রিকায়ও কিছু লেখালেখি হয়েছে। তুমি বললে জনগনের ইচ্ছায় এ হরতাল, এই দেশের বেশিরভাগ জনগণ কি এটা চাচ্ছে? তোমরা মাঝে মধ্যে সমীক্ষা করো হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে । সেখানে তো হরতালের বিপক্ষের পাল্লাই ভারী। আর যে-সব সমীক্ষা করা হয় এদের মধ্যে কারা থাকে? একজন কৃষক, একজন মজুর, নিম্ন আয়ের এইসব মানুষ কি চাচ্ছে হরতাল হোক? এরাই তো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, নাকি ভুল বললাম? আহমেদ তুমিই কি চাও?
জামিল আহমেদ মুখ নিচু করে বললেন, ‘না।’

‘আহমেদ একটা অন্যায় হলে প্রতিবাদ হবে অবশ্যই কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কি এই-ই! একটা ক্রাইমকে থামানোর জন্য ক্ষমার অযোগ্য আরেকটা ক্রাইম করা কি সমর্থনযোগ্য? যখন খুশি, যে- কারোর একটা মুখের কথায় কোটি-কোটি শ্রম ঘন্টা নষ্ট করবে আমরা এটা স্বপ্নেও ভাবি না। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ, ফ্রান্সে পরমাণু বিরোধী কর্মীরা পরমাণু চুল্লি সুপার ফিনিক্স বন্ধের দাবিতে চুল্লিটির বাইরে প্রায় দশ হাজার জোড়া পুরনো জুতা জড়ো করে রাখে। প্রতি জোড়া জুতার ভেতর একটি করে কাগজ। ওই কাগজে লেখা সুপার ফিনিক্স বন্ধ কর। এ নিয়ে সমগ্র বিশ্বে তোলপাড় পড়ে গেছে। যুগোশ্লাভিয়া একবার কি হল শোনো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানালেন এভাবে এঁরা ওইদিন পড়াবেন ঠিকই কিন্তু একদিনের বেতন নেবেন না, এ নিয়ে হই হই পড়ে গেল।’
‘আকু, আমি বিস্মিত হচ্ছি এটা ভেবে তুমি কোন যুক্তিতে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করছ?’
‘কেন তোমরাই তো বলো তোমরা পৃথিবীর সেরা জাতি। তোমাদের রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অতুলনীয় ইতিহাস। ওয়েল, তোমরা খোঁজ হরতালের বিকল্প তোমাদের দেশের সেরা সন্তানরা কোথায়? তোমাদের দেশেও তো অসম্ভব প্রতিভাবান সন্তান আছে যারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে একজনকে মি. ইউনুস, ওঁরা আজ কোথায়?’

জামিল আহমেদ চুপ করে রইলেন। কথা বাড়াতে ইচ্ছা করছে না। প্রখর রৌদ্র চামড়া পুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছে। এই জাপানি ভদ্রলোক কি উপায়ে নির্বিকার আছেন এর রহস্য বুঝতে পারছেন না।
এবার আকুতাগাওয়া বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমার কথায় আহত হয়েছ, এ জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। কী আশ্চর্য, আমার ঘড়ির সময় এখন ছটা, তোমার ঘড়িতে এখন সময় কত?’
‘তিনটা।’
জামিল আহমেদ এইবার ঠেলাভ্যান থামাতে বললেন। ঠেলাওয়ালা অবাক হয়ে বলল, ‘হোডল তো এইহানো না।’
‘চুপ থাক ব্যাটা,’ রাগ চেপে রাখতে পারছেন না। ভাড়া মিটিয়ে বললেন,‘সরি, আকু, কিছু দূর হাঁটতে হবে।’
‘কেন, এটা কি শেরাটন পর্যন্ত যাবে না?’
‘দুঃখিত, না, এটা ভি আই পি রোড, ধীরগতির যানবাহন চলা নিষেধ।’

এই কপটতা জামিল আহমেদ ইচ্ছা করেই করলেন। এমনিতেই সমস্তটা রাস্তায় নিজেকে কেমন বাঁদর-বাঁদর মনে হচ্ছিল। সবই কেমন হাঁ করে তাকাচ্ছিল। একটা ঠেলাভ্যান শেরাটনে পার্ক করল এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে!

ভাগ্য ভাল রিকশা পেয়ে গেলেন। টিমেতালে রিকশা এগুচ্ছে।
‘আহমেদ তুমি কি দয়া করে এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করবে ইনি আসলেই হরতাল চাচ্ছেন কি না?’ এই ভদ্রলোক মানে রিকশাওয়ালা। জামিল আহমেদ এইবার অসন্তুষ্ট হলেন, এই জাপানি ভদ্রলোকের এই দেশ নিয়ে এত কৌতুহল কেন? তিনি মুখের ভাব অপরিবর্তিত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি-ও, কি বুঝতেছেন দেশের অবস্থা এই হরতাল···’
রিকশাওয়ালা মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমারে কন?’
‘জ্বী’ ।
‘দুই টেকার আকিজ বিড়ি অখন হইল গিয়া দশ টেকা, কি বুঝবার পারলেন? এইবার আল্লার কুদরতে হরতালের সময় রিকশা চালাইবার পারতাছি অন্যবার তো রিকশা ভাইঙা ফালাইত। হেছা কই, এইবার হরতালে আল্লার রহমতে রুজি রুজগার ভালা খুব ভালা, তয় মনে শান্তি নাই, জীবনের কুনু গিরান্টি নাই এই দেখছেন বাইচা আছি এই দেখছেন নাই, মইরা গেছি। অহন জেবনডা হইল কচু পাতার পানি। চামার কি করে জানেননি যতজন মরা গরু দেখব ততজনের ভাগ। এই দেশডা হইল গিয়া আপনের মরা গরু।’
বলতে গিয়ে জামিল আহমেদের চোখের পাতা কেঁপে গেল, ‘আকু, এ বলছে গণতন্ত্রের জন্য এইসব হরতাল-টরতালের প্রয়োজন আছে।’

আকুতাগাওয়া তাঁর পাসপোর্টের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে রিসেপশনিষ্টকে বললেন, ‘আমার যাবতীয় বিল এই ক্রেডিট কার্ডে চার্জ হবে। আশা করি ভিসা ক্রেডিট কার্ডে আপনাদের সমস্যা হবে না?’

জামিল আহমেদের শত-অনুরোধেও কান দিলেন না, বিনীত ভাবে তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। জামিল আহমেদ ক্রমাগত বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেনঃ তুমি আমার গেষ্ট, তোমার সেবা করার সুযোগ দিলে আমার আনন্দের শেষ থাকবে না। এ জাতীয় বাক্য আকুতাগাওয়াকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না।

জামিল আহমেদের একগাদা টাকা বেঁচে যাচ্ছে তাতে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু তাকে ভারি হতাশ দেখাল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অলিখিত একটা নিয়ম প্রচলিত আছে যাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হবে তাঁর যাবতীয় ব্যয়ভার আমন্ত্রণকারী বহন করবে। জামিল আহমেদ পরবর্তীতে জাপান গেলে তাঁরও সমস্ত খরচাপাতি বহন করতেন আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদের মনে হল এই জাপানি ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তাঁকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্ট করছেন।
হা ইশ্বর, এ ডিলটার উপর তাঁর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। দয়া করো ইশ্বর, দয়া করো। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাটাই করতে হবে অন্তত এদের কথা ভেবে দয়া করো।

আকুতাগাওয়া এরি মধ্যে কোথায় কোথায় যেন ফোন করছে।
চেক-ইন পর্ব সমাপ্ত হলে আকুতাগাওয়া গাঢ় গলায় বললেন, ‘আহমেদ, আমার প্রিয় বন্ধু তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই। তুমি যেভাবে কষ্ট করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছ তোমার এ আতিথেয়তার কথা আমি ভুলব না। ওয়েল, এমব্যাসীকে ফোন করেছি হরতাল চলাকালীন এরা আমাকে হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে ওদের ফোন করলে ওরা নাকি কোনও একটা ব্যবস্থা করত। যাই হোক হরতাল শেষ হলে তুমি এখানে যোগাযোগ কোরো। প্লিজ আহমেদ, প্রাণের ঝুকি নিয়ে হরতালের মধ্যে তুমি কিন্তু আসবে না এমন হলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব।’

বিদেশিরা যে কাজ সচরাচর করে না আকুতাগাওয়া তাই করলেন। জামিল আহমেদকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন, হোটেলের টেরেস পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। তাঁকে ভারি বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বারবার জানতে চাইছিলেন, জামিল আহমেদ ফিরতে পারবেন তো বাসায় ফিরতে কোনো সমস্যা হবে না তো?

.................
আজ ২৬ শে মার্চ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আজ। চারদিকে উত্সব উত্সব ভাব। জামিল আহমেদেরও দু-চোখে আনন্দ উপচে পড়ছে। ৯ মার্চ থেকে যে টানা অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল আজ এবং আগামীকাল দু-দিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এই ক-দিন তাঁর সমস্ত ফ্যাক্টরীতে তালা ঝুলেছে। মেশিনের সুতা থেকে এক ইঞ্চি সুতাও খরচ হয় নি, একটা কাপড়ও তৈরি হয়নি।

জামিল আহমেদ এই ক-দিন বাসা থেকে বের হননি, সম্পূর্ণ বন্দি জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা নিরাপত্তার অভাব, কিছুটা স্বেচ্ছায়। এক ধরনের অভিমানও কার উপর তিনি জানেন না। সন্ধ্যায় অবশ্য নিয়মিত তার ফ্যাক্টরির ম্যানেজাররা আসতেন তারা গোল হয়ে বি,বি,সি শুনতেন।
এই দেশ যখন ইংরেজদের কাছে পরাধীন ছিল তখন ইংরেজদের সব কথাই অবিশ্বাসের চোখে দেখা হত আজ এদের কথাই বেদবাক্য মনে হয়। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকেরকে নির্ভর করতে হয় অন্য দেশের তথ্য মাধ্যমের উপর। এ যে কি নিদারুন অপমান।

প্রতিদিন তারা তীব্র উৎকন্ঠায় খবর শুনতেন এই বুঝি বিবিসি থেকে বলা হবে আগামীকাল থেকে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হল। আগামীকাল থেকে তাঁরা পূর্ণ উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

একদিন তার এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে অসম্ভব মন খারাপ করে ফোন করেছিলেনঃ রশিদ, আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার লোকসান না-হয় মেনে নিলাম, কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না, এদের যে কিভাবে দিন চলছে?
রশিদ সাহেব বলেছিলেন: তোর ইচ্ছা হলে এদের বেতন দিলেই তো পারিস।
কোত্থেকে দিব বল, হাজার হাজার পিস তৈরি কাপড় বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। ভেবেছিলাম বিক্রি হলে এদের বোনাস দেব জাপানি একজন বায়ার এসে শেরাটনে বসে আছে। কিছুই হচ্ছে না।
রশিদ হাসতে হাসতে বলেছিলেন: তোর শ্রমিক মানে তো মেয়ে?
তো!
আরে, এরা বসে আছে নাকি দেহ ব্যবসায় নেমে পড়েছে না!
জামিল আহমেদ প্রচন্ড ক্রোধে থরথর করে কাঁপছিলেন: রশিদ, তুই যদি কুত্তার বাচ্চা না হোস আমার সঙ্গে কোন দিন কথা বলবি না।
টেলিফোন আছড়ে ফেলেছিলেন। তাতেও স্বস্তি পাননি। ফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছিলেন।

জামিল আহমেদ নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পাথ ফাইন্ডারটা ইচ্ছা করেই বের করেননি। অসহযোগ আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ঝামেলা বাঁধতে কতক্ষণ। গাড়ি ভেঙে ফেলা আগুন লাগিয়ে দেয়া একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। একটা গন্ডগোল হলেই সরকারী-বেসরকারী সম্পদ নষ্ট করা এখনকার নষ্ট রাজীতির ফসল। দেশের অস্থির অবস্থা সব কিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। অসংখ্য ফ্রাঙ্কেষ্টাইন তৈরি হচ্ছে। এখন চোখের সামনে একজন মানুষকে মরে যেতে দেখলে গা গুলায় না।
জনসমুদ্রের মাঝে ইচ্ছা করলেই একজন মানুষকে উলঙ্গ করে ফেলা যায়। সেই উলঙ্গ মানুষটার ছবি আবার ঘটা করে পত্রিকায় ছাপানো হয়। সেই মানুষটার অপরাধ এটুকুই ছিল হরতালের দিনে তিনি অফিস করতে যাচ্ছিলেন। জনগণ স্বতস্ফুর্ত হরতাল পালন করেছে এর নমুনা এই!
একটা সভ্য দেশের অসভ্য এমন কান্ডের জন্য মরে যেতে ইচ্ছা করে।

জামিল আহমেদের প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে দম বন্ধ হয়ে এল। রিসেপশনে দাঁড়ানো লোকটা পাগলের মত কী সব বলছে। আকুতাগাওয়া প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন, তার জন্য মেসেজ ছেড়ে গেছেন। জামিল আহমেদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ম্যানিলা এনভেলাপ নাড়াচাড়া করলেন খোলার কথা মনেই রইল না। এক সময় খাম ছিঁড়ে ফেললেন। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:
“প্রিয় বন্ধু আহমেদ,
তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না তবুও ক্ষমা চাই তোমার সঙ্গে দেখা না করে, না জানিয়েই দেশে ফিরে যাচ্ছি। প্লিজ, চিঠি সবটা না পড়ে ফেলে দিয়ো না। আমরা বিদেশীরা চট করে মুগ্ধ হই না। তোমাকে আজ আমার খুশি করার প্রয়োজন নেই তাই বলি অল্প সময়ে তোমাকে আমার অসম্ভব পছন্দ হয়েছিল- কেন, এটা ঠিক আমি বলত পারব না। তুমি ঠিকভাবে বাসায় পৌছলে কিনা এ নিয়ে আমি খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। তুমি হোটেল থেকে রওয়ানা হওয়ার একঘন্টা পর থেকে প্রতি দশ মিনিট অন্তর তোমার বাসায় ফোন করেছি। যেই মাত্র তুমি বললে জামিল আহমেদ স্পিকিং তখন আমি টেলিফোন রেখে দিলাম। কেন, বলছি। ওই অল্প সময়েই তুমি আমাকে যথেষ্ঠ মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিলে আমি মায়া বাড়াতে চাচ্ছিলাম না।

আহমেদ, আমরা ব্যবসায়ী, আবেগ এবং ব্যবসা গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। যে জন্য তোমার সঙ্গে দেখা করে আসিনি, এমন করলে হয়তো আমি দুর্বল হয়ে যেতাম। এ দেশে আসার উদ্দেশ্য ব্যবসা সেখানে আবেগপ্রবণ হওয়ার স্থান কোথায় বলো? এক নাগাড়ে যে হরতাল চলছিল পনের দিন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশেই ছিলাম। বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হরতাল চলছিল। কখন এ দুঃসহ অবস্থার অবসান হবে কেউ জানে না।

এই পনের দিন মূলত আমি নিজেকে একজন প্রিজনার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনি। অতিথিদের জন্য জুয়া খেলা ছাড়া হোটেলে সমস্ত সুবিধাই ছিল। তাতে কী। আমার সমস্ত জীবনে কখনোই এত শ্রমঘন্টা নষ্ট করিনি!
আহমেদ, বন্ধু আমার, জীবনটা একটা লম্বা দৌড় এখানে থমকে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। পনের দিন কাজের মানুষ কোনো কাজ করবে না এ-ও কী সম্ভব! যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান সেখানে প্রায় তেরো লক্ষ সেকেন্ড একজন মানুষ ঝিম মেরে বসে থাকবে!

এটা লিখতে ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, আমি নিরুপায় আহমেদ, সব কিছু মিলিয়ে দেখলাম তোমার সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব না। তোমাকে বলিনি, এ কপটতার জন্য ক্ষমা করো, বাংলাদেশে আসার আগে বাংলার ভাষার উপর একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম। এই দেশের উপর যথাসম্ভব পড়াশুনা করেছি। তুমি একজন ব্যবসায়ী বলেই বুঝতে পারবে যে দেশে আমি মিলিয়ন-মিলিয়ন ইয়েন ইনভেষ্ট করব সেই দেশ সম্বন্ধে কিছুই জানব না তা তো হয় না।
তোমাদের দেশের অবস্থা খারাপ এটা জানতাম কিন্তু এমন শোচনীয় অবস্থা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

রিকশাওয়ালার সঙ্গে তোমার যখন বাংলায় কথা হচ্ছিল কিছু কিছু বুঝতে পারছিলাম যে তোমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। তুমি কিন্তু আমাকে মিথ্যা বললে।
আমি অবাক হয়ে ভালছিলাম তোমরা দেশকে এত ভালবাসো। তুমি আমি আমরা এশীয়ান এ টান তো আছেই এছাড়াও তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা তোমাদের দেশে জাপানি দুতাবাসে কিছুদিন চাকরি করেছেন। ফিরে এসে বাবা তোমাদের কত গল্পই না করেছেন। সব মিলিয়ে তোমাদের দেশের প্রতি একটা টান অনুভব করতাম। তোমাদের দেশের প্রতি ভালবাসার ছোট্ট একটা নমুনা দেবো। জাপানের কোবো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োশিতাকা মাসুদা তোমাদের জাতীয় সঙ্গীত অনুবাদ করেন। গোটা জাতীয় সঙ্গীত আমার মুখস্ত। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছ না? বেশ ভুলচুক হলে ক্ষমা করো-

‘ওয়াগা ওউগুন নো বেংগাল ইয়ো,
আই সরু ওয়াগা সোকোকু ।
আতাকামো ফুরুতো নো নেইরো নো ইয়োনা
সোরা ইয়া কুকি ইয়ো এইএননি।
আ ওয়াগা সোকোকু কিয়ো,
হারু নিওয়া, ম্যাংগো নো কাওরিগা ওতাশি ও
ইয়োরোকোবি দে ওয়াইল দো নি সাসেতে কুরেরু ।
আ নান তো ইউ কানগোকি দা।'
বিদায় বন্ধু, বিদায়।”

জামিল আহমেদের চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে তিনি আর পড়তে পারছিলেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের অজান্তেই গাইতে শুরু করলেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”
হোটেলের সিকিউরিটির লোকজন ছুটে এসেছে। লবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

সিকিউরিটির একজন চেষ্টাকৃত কঠোর হয়ে বলল, আপনি এরকম করছেন কেন আপনার সমস্যাটা কী?’
জামিল আহমেদ ভেজা চোখে হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘নাথিং, কেন তোমাদের হোটেলে কি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিষেধ আছে?’

*কয়েদী: ২

Facebook Share